মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮ | বাংলার জন্য ক্লিক করুন
  
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

   শিল্প সাহিত্য
  বাঙালির রক্তের বন্ধন ও জাতি-পরিচয়
  20, July, 2017, 12:02:3:PM

॥ হাসান আলী ॥

বাঙালি একটি ভাষা-জাতির নাম, যেমন ছিল আর্যরা, ছিল দ্রাবিড়রা। ইতিহাসের নানা গ্রন্থিতে বাধা ডিঙিয়ে এই ভাষা-জাতির বিকাশ। এই বিকাশের ইতিহাস যেমন বিচিত্র, তেমনি দীর্ঘকালের। এই ভূখন্ডে বিকশিত জাতির পরিচয় খুঁজে বের করা এবং কালের পথ ধরে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস খুঁজে নেওয়া। আমাদের দেশটিকে আমরা যেমন চিনি তেমনি ভাষা-জাতি-পরিচয়ের সংকটে না ভূগে সত্যটা জানার চেষ্টা করাই মঙ্গল। সারা বিশ্বের মানুষকে অন্তত তিনটি মহাজাতিতে ভাগ করা যায়। যেমন, নিগ্রোয়েড, ইউরোপয়েড এবং মঙ্গোলয়েড। নিগ্রোয়েড মহাজাতিকে অনেক সময় নিগ্রোয়েড-অষ্ট্রালয়েড অথবা নিরক্ষীয় মহাজাতি বলা হয়।
আমরা নিরক্ষীয় অঞ্চলের মানুষ। আমাদের আদি পুরুষ নিরক্ষীয় বা নিগ্রোয়েড মহাজাতির মানুষ হবে এটাই স্বাভাবিক। এই নিগ্রোয়েড মহাজাতির দুটি শাখা –একটি আয়্রিকান ও আরেকটি মহসাগরীয় শাখাটিরই আরেক নাম অষ্ট্রালয়েড বা আদি-অস্ত্রাল। এর মধ্যে যেসব নৃজাতি-শাখা আছে তা হল-আন্দামানি , মেলানেশীয়, অষ্ট্রেলীয়, কুরিলীয় এবং শ্রীলঙ্কাবাসী।
শাখা জাতিগুলোর পরিচয় খুঁজলে দেখা যাবে এদের সাথে আমাদের রয়েছে বংশধারাগত সম্পর্ক। আন্দামানি মানে ভারত মহাসাগরের আন্দামান দ্বীপের অধিবাসী; মেলানেশীয় দ্বীপ-যেমন, সালোমন দ্বীপপুঞ্জ, ফিজি, সামোয়া, নিউক্যালি-ডনিয়া, টোঙ্গা, কুক আইল্যান্ড, ইষ্টার আইল্যান্ড প্রভৃতির আদিবাসীদের বোঝায়।
অষ্ট্রেলীয় বলতে বহিরাগত ইউরোপয়েড জাতির বসতি স্থাপনের আগে থেকে যেসব আদিবাসিন্দা অষ্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন তাদের বোঝায়। শ্রলঙ্কাবাসী বলতে আদি সিংহলী, যাদের অন্য নৃতাত্ত্বিক নাম ভেদ্দা, তাদের বোঝায়নো হচ্ছে। আর কুরিলীয় বলতে জাপানের উত্তর-পূর্বের কুরিল দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসিদের বোঝানো হয়েচ্ছে। সাংস্কৃতিক নৃতত্বের সূত্রে মাইক্রোনেশিয়া ও পলিনেশিয়া তথা প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত সকল দ্বীপেরই অধিবাসী অস্ত্রাল সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর এ সূত্রে বলা চলে বাঙালির আদি আত্মীয়তা পৃথিবীর সর্বাধিক বিস্তৃত নরগোষ্ঠীর সঙ্গে স্থাপিত। বাংলার পশ্চিম ও উত্তর প্রান্তিক অঞ্চলে যে সব উপজাতি যেমন-সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডা প্রভৃতি আমাদের আদিবাসীও বটে। এ গোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক নাম আদি-অস্ত্রাল বা ভেদ্দা। এটাই আমাদের প্রথম পরিচয়।
নৃতত্ত্ববিদরা মানেন যে এক সময় আদি-অস্ত্রালদের ব্যাপ্তি উত্তর ভারত থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের ইষ্টারদ্বীপ পর্যন্ত ছিল। ধারণা করা হয় আনুমানিক ৩০ হাজার বছর আগে প্রথম তারা ভারত থেকে অষ্ট্রেলিয়া মহাদেশে গিয়ে পৌঁছায়। এদের গায়ের রঙ ও গড়ন গঠনে প্রাচীন সাহিত্যে নিষাদ জাতির উল্লেখ দেখা যায় সে বর্ণনার সাথে এদের মিল পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক বা অন্য কোনো কারণে এই মূল জাতির এক শাখা ভারত-ভূমি ত্যাগ করে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সিংহল, ইন্দোনেশিয়া ও মেলানেশিয়া এবং অষ্ট্রেলিয়ায় যায়। এভাবে রক্তের বন্ধনে আমরা নিজেদের অজান্তেই বাঁধা আছি এশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিস্তীর্ণ জুড়ে। এই আদি নরগোষ্ঠীর সাথে যে সব জাতি বা শাখাজাতির মিশ্রণ ঘটেছে তার ধারাবাহিক ইতিহাস পাওয়া না গেলেও মোটামুটি একটা চিত্র পাওয়া যায়।
দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড়ভাষী জনগোষ্ঠী ইউরোপয়েড মহাজাতির ভারত-ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের একটি অন্তর্বর্তী দল। সম্ভবত আমাদের পূর্বপুরুষদের খাঁটি জাতি-চরিত্র প্রথম এদের সাথে সংমিশ্রণের ফলেই খোয়া যায়। বর্তমানকালে বাঙালির মূল বুনিয়াদ আদি-অস্ত্রাল ও দ্রাবিড়ভাষী ভূমধ্যনগরগোষ্ঠীর লোকদের সংমিশ্রণে গঠিত হয়েছিল। ভূমধ্যনগরগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য ; দীর্ঘ দেহ, পাতলা কেশ, চওড়া নাক, গাঢ় মধ্যমবাদামি রঙ, দীর্ঘ মাথা ইত্যাদি।
ঐতিহাসিককালের মঙ্গোলয়েড মহাজাতির মধ্যে এশীয়, ভোটব্রহ্ম, ভোট-চৈনিক, প্রভৃতির শাখার জনগোষ্ঠী এখানে আসে এবং এদের সাথেও  বাংলার আদিবাসীদের রক্তসম্পর্ক পর্যন্ত গড়ায়। উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ প্রান্তিক অঞ্চলের মগ, চাকমা, মুরং, কোচ, রাজবংশী, ত্রিপুরা, মারমা, প্রভৃতি উপজাতি এদেরই সাক্ষাৎ বংশধর। মঙ্গোলয়েড জাতির স্বকীয় বৈশিষ্ট ; হলুদ বা হলদেটে গায়ের রঙ, সোজা চুল, প্রকট গন্ডস্থি ও চ্যাপ্টা মুখ, চিকনচেরা চোখ এবং উর্ব্ধ অক্ষিপুটের প্রকট ভাঁজ, অনুচ্চ নাক, পাতলা ঠোঁট। এই তিন ধারার সংমিশ্রণেই শেষ নয়। সংমিশ্রণের প্রক্রিয়া চলেছে পৃথিবীর অন্যত্রও। সে সব জায়গায় নানান সহযোগি বর্গের নরগোষ্ঠীও এসেছে, মিসেছে এবং এভাবে আমাদের চেহারায় ও মানসে নতুন বৈশিষ্ট যোগ করেছে।
মানব সভ্যতার প্রচীন পর্বের শেষভাগে আর্যভাষী জনগোষ্ঠীর প্রভাব বাড়তে থাকে খুব বেশি। এরা ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে দিগি¦জয়ী মহাজাতি বলে এদের কোন শখা পারশ্যে, ভারতবর্ষে, আনাতোলিয়া-গ্রিসে সভ্যতা-সংস্কৃতির উচ্চতম শিখরে আরোহণ করেছিল বলে পরবর্তীকালের মানুষ নিজেদের আর্য বলে জাহির করতে চেয়েছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় হিটলার আর্যজাতি হিসেবে জার্মনদের শ্রেষ্টত্ব প্রমাণের জন্য ভয়ঙ্কর কান্ডই না করল।
আর্যভাষী জনগোষ্ঠী ইউরোপয়েড মহাজাতিরই একটি শাখা। আদিতে এরা ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগর তীরবর্তী দেশসমূহের মানুষ। অনেকের মতে এরা কৃষ্ণসাগর তীরবর্তী ককেশীয় মালভূমী অঞ্চল থেকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। আরও পরে ইউরোপয়েড ধারার সেমেটিক আরব, ভূমধ্যসাগরীয় পর্তুগিজ, নিগ্রোয়েড ধারার হাবশি বা মঙ্গোলয়েড ধারার দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর অল্পসল্প সংমিশ্রণও ঘটেছে। বাঙালির বিভ্রান্তিকর জনবৈচিত্রের মূলে এইসব মিশ্রণের ঘটনা।
যেমন চেহারায় ও আকারে বৈচিত্র, অন্যদিকে তেমনি মানসিকতায়ও বিভিন্নতা দেখা যায়। একই মনুষের মধ্যে পরস্পরবিরোধী মনোভাবও কোনো আকস্মিক নয়। ভাষাগোষ্ঠী আষ্টিকদের সারল্য ও জড়তা, দ্রাবিড়দের কল্পনাপ্রবণতা ও আলস্য, আর্যদের চিন্তা ও উদ্যেমশীলতা, ভোটচৈনিকদের দুঃসাহস ও নির্মমতা বাঙালির মনের মধ্যে আজও ক্রিয়াশীল।
এ প্রসঙ্গে সপ্তম শতকের চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং এর দেওয়া বাংলার বিভিন্ন জনপদের প্রকৃতি সম্পর্কিত বিবরণ উল্লেখ করা যায়। তার মতে কজঙ্গলের মানুষ স্পষ্টাচারী, গুণবান এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবান। পুন্ডবর্ধনের লোকেরাও জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধাবান; কামরূপের মানুষ সদাচারী হলেও হিংস্র প্রকৃতির; তাম্রলিপির লোকদের ব্যবহার রূঢ় হলেও তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুরাগী, কর্মঠ ও সাহসী; সমতটের লোকেরা কর্মঠ; কর্ণসুবর্ণের মানুষ ভদ্র, সচ্চরিত্র এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক।
এই বৈচিত্রা অতীত এবং বর্তমানেও সত্য। [ সূত্র : বাংলা ও বাঙালির কথা ]।



সংবাদটি পড়া হয়েছে মোট : 352        
   শেয়ার করুন
Share Button
   আপনার মতামত দিন
     শিল্প সাহিত্য
চলতি বছরের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার স্থগিত
.............................................................................................
ময়মনসিংহে সাহিত্য উৎসব অনুষ্ঠিত, পুরস্কৃত হলেন ৪ গুণীজন
.............................................................................................
প্রথম মৃত্যু
.............................................................................................
শুভংকরের ফাঁকি
.............................................................................................
বউ যেভাবে ঘরে আসে
.............................................................................................
মধ্যরাতের কথা
.............................................................................................
বাঙালির রক্তের বন্ধন ও জাতি-পরিচয়
.............................................................................................
মোহময়ী পিরামিড
.............................................................................................
৮২তম জন্মদিনে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত কবি আল মাহমুদ
.............................................................................................
পাবনা বইমেলা সাহিত্যকে সম্মৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে
.............................................................................................
প্রসঙ্গ: ঐতিহাসিক জ্বীনের মসজিদ
.............................................................................................
তেহরানে প্রথম বিশ্বের স্বাধীনতাকামী আন্দোলন
.............................................................................................
একলা মানুষ
.............................................................................................
নৈশভোজে আসছিস্ তো
.............................................................................................
স্বপ্ন ছিলো
.............................................................................................
ফেরা
.............................................................................................
ডি.লিট ডিগ্রি পাচ্ছেন হাসান আজিজুল হক ও সেলিনা হোসেন
.............................................................................................
বিশ্ববিখ্যাত ১০ নারীর জীবনীগ্রন্থ
.............................................................................................
কবি রফিক আজাদ আর নেই
.............................................................................................
পরপারে চলে গেলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি রফিক আজাদ
.............................................................................................
অমর একুশে গ্রন্থমেলায় শামস সাইদ এর দুটি কিশোর উপন্যাস
.............................................................................................
ঘুম আছে স্বপ্ন নেই
.............................................................................................
নীলফামারীতে পাল আমলের নিদর্শন পাওয়া গেছে
.............................................................................................
কবি শামসুর রাহমানের ৮৭তম জন্মদিন
.............................................................................................
ম্যান বুকার পেলেন জ্যামাইকার মারলন জেমস
.............................................................................................
১৪ অক্টোবর সরদার ফজলুল করিম দর্শন পদক
.............................................................................................
স্মরণ : ছোটোলোকের বাবা ॥ মোঃ আতিকুর রহমান ॥
.............................................................................................
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: জীবন, সাহিত্য ও দর্শন
.............................................................................................

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আখলাকুল আম্বিয়া
নির্বাহী সম্পাদক: মাে: মাহবুবুল আম্বিয়া

সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: স্বাধীনতা ভবন (৩য় তলা), ৮৮ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০। Editorial & Commercial Office: Swadhinota Bhaban (2nd Floor), 88 Motijheel, Dhaka-1000.
সম্পাদক কর্তৃক রঙতুলি প্রিন্টার্স ১৯৩/ডি, মমতাজ ম্যানশন, ফকিরাপুল কালভার্ট রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত ।
ফোন : ০২-৯৫৫২২৯১ মোবাইল: ০১৬৭০৬৬১৩৭৭

Phone: 02-9552291 Mobile: +8801670 661377
ই-মেইল : dailyswadhinbangla@gmail.com , editor@dailyswadhinbangla.com, news@dailyswadhinbangla.com

 

    2015 @ All Right Reserved By dailyswadhinbangla.com

Developed By: Nytasoft