মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮ | বাংলার জন্য ক্লিক করুন
  
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

   শিল্প সাহিত্য -
                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                 
চলতি বছরের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার স্থগিত

স্বাধীন বাংলা ডেস্ক:  যৌন ও আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে চলতি ২০১৮ সালের নোবেল পুরস্কার স্থগিত করা হয়েছে। শুক্রবার এক বিবৃতিতে সুইডিশ অ্যাকাডেমি এ ঘোষণা দিয়েছে। সুইডিশ অ্যাকাডেমি জানায়, ২০১৮ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কারটি ‘রিজার্ভড প্রাইজ’ হিসেবে ২০১৯ সালের পুরস্কারের সঙ্গে ঘোষণা করা হবে। বৃহস্পতিবার নোবেল কমিটির ১০ সদস্য একটি বিশেষ বৈঠক করে এ সিদ্ধান্ত নেন।

এর আগে গত সপ্তাহে এবার সাহিত্যে পুরস্কার ঘোষণা স্থগিত হতে পারে বলে সুইডিশ অ্যাকাডেমির সদস্য পার ওয়াস্টবার্গ জানিয়েছিলেন।

প্রসঙ্গত, সাহিত্যে নোবেল পদক বিজয়ী নির্বাচনকারী কমিটি সুইডিশ একাডেমির প্রধান সারা দানিউস গত ১২ এপ্রিল পদত্যাগ করেন। কমিটির এক সদস্যের স্বামীর বিরুদ্ধে ওঠা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তদন্তের প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনার মুখে তিনি এ পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের পর সাংবাদিকদের সারা বলেছেন, ‘ইতিমধ্যে এটা নোবেল পুরষ্কারের ওপর অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছে এবং এটা অনেক বড় একটি সমস্যা। একাডেমির ইচ্ছা আমি যেন স্থায়ী সচিব পদ থেকে সরে দাঁড়াই। আমি দ্রুত তা কার্যকর করতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

উল্লেখ্য, গত বছরের নভেম্বরে ১৮ বছরের এক নারী অভিযোগ করেন, সুইডিশ একাডেমির সদস্য ক্যাটরিনা ফ্রস্টেনসনের স্বামী জন ক্লড আরনাল্টের হাতে তিনি যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। গত সপ্তাহে ফ্রস্টেনসনকে তার পদ থেকে সরানোর বিপক্ষে ভোট দিলে একাডেমির তিন সদস্য এর প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে  ফ্রস্টেনসনও তার পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলে পরে পরে  পদত্যাগ করেন সারা দানিউস।

চলতি বছরের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার স্থগিত
                                  

স্বাধীন বাংলা ডেস্ক:  যৌন ও আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে চলতি ২০১৮ সালের নোবেল পুরস্কার স্থগিত করা হয়েছে। শুক্রবার এক বিবৃতিতে সুইডিশ অ্যাকাডেমি এ ঘোষণা দিয়েছে। সুইডিশ অ্যাকাডেমি জানায়, ২০১৮ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কারটি ‘রিজার্ভড প্রাইজ’ হিসেবে ২০১৯ সালের পুরস্কারের সঙ্গে ঘোষণা করা হবে। বৃহস্পতিবার নোবেল কমিটির ১০ সদস্য একটি বিশেষ বৈঠক করে এ সিদ্ধান্ত নেন।

এর আগে গত সপ্তাহে এবার সাহিত্যে পুরস্কার ঘোষণা স্থগিত হতে পারে বলে সুইডিশ অ্যাকাডেমির সদস্য পার ওয়াস্টবার্গ জানিয়েছিলেন।

প্রসঙ্গত, সাহিত্যে নোবেল পদক বিজয়ী নির্বাচনকারী কমিটি সুইডিশ একাডেমির প্রধান সারা দানিউস গত ১২ এপ্রিল পদত্যাগ করেন। কমিটির এক সদস্যের স্বামীর বিরুদ্ধে ওঠা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তদন্তের প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনার মুখে তিনি এ পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের পর সাংবাদিকদের সারা বলেছেন, ‘ইতিমধ্যে এটা নোবেল পুরষ্কারের ওপর অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছে এবং এটা অনেক বড় একটি সমস্যা। একাডেমির ইচ্ছা আমি যেন স্থায়ী সচিব পদ থেকে সরে দাঁড়াই। আমি দ্রুত তা কার্যকর করতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

উল্লেখ্য, গত বছরের নভেম্বরে ১৮ বছরের এক নারী অভিযোগ করেন, সুইডিশ একাডেমির সদস্য ক্যাটরিনা ফ্রস্টেনসনের স্বামী জন ক্লড আরনাল্টের হাতে তিনি যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। গত সপ্তাহে ফ্রস্টেনসনকে তার পদ থেকে সরানোর বিপক্ষে ভোট দিলে একাডেমির তিন সদস্য এর প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে  ফ্রস্টেনসনও তার পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলে পরে পরে  পদত্যাগ করেন সারা দানিউস।

ময়মনসিংহে সাহিত্য উৎসব অনুষ্ঠিত, পুরস্কৃত হলেন ৪ গুণীজন
                                  

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নবীন-প্রবীণ কবি সাহিত্যিকদের সমন্বয়ে ময়মনসিংহে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হল সাহিত্য উৎসব-২০১৭। জাতীয় সাহিত্য সংগঠন কাব্যকথা সাহিত্য পরিষদ ময়মনসিংহ বিভাগের আয়োজনে ২০ অক্টোবর বেলা ৪টায় মুসলিম ইনিস্টিটিউটে এ সাহিত্য উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন- বিভাগীয় আহবায়ক কবি ও শিক্ষাবিদ সুমি সরকার। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শতাধিক কবি কবিতা উৎসবে অংশগ্রহণ করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করে বক্তব্য রাখেন ময়মনসিংহ পৌরসভার মাননীয় মেয়র জনাব ইকরামুল হক টিটু, সম্মানিত অতিথির আসন অলংকৃত করেন কেন্দ্রীয় কাব্যকথা সাহিত্য পরিষদ ও মাসিক কাব্যকথা’র উপদেষ্টা, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি কাজী রোজী এমপি, শুভ-উদ্বোধন করেন সত্তরের অন্যতম প্রধান কবি ফরিদ আহমদ দুলাল, প্রধান অলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সম্পাদক, বাংলা একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্ত শিশুসাহিত্যিক, কাসাপের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা কবি আসলাম সানী, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্ত শিশুসাহিত্যিক খালেক বিন জয়েনউদ্দিন, কবি শামসুল ফয়েজ, কবি মাহমুদ আল মামুন, মাসিক কাব্যকথার সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি কবি সুফিয়া বেগম।

স্বাগত বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি কবি লুৎফর চৌধুরী , শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সহিদ আমিনি রুমী, কবি শফি উল্লাহ আনসারী, ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন কেন্দ্রীয় বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জিহাদ চৌধুরী, অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা দেয়া হয় কাব্যকথা সাহিত্য পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কবি, কথাশিল্পী,  পুঁথিসাহিত্য গবেষক, ১৫টি সুর ও ছন্দে পুথি রচয়ীতা, পুঁথিসম্রাট জালাল খান ইউসুফীকে।

উৎসবে বৃহত্তর ময়মনসিংহের তিনজন ও ঢাকার একজন কবিকে ময়মনসিংহ সাহিত্য পুরস্কার-২০১৭ প্রদান করা হয়। পুরস্কার প্রাপ্তরা হলেন কবি কাজী রোজী, গল্পকার মঞ্জুরুল আলম, কবি আছমা জামান, উপন্যাসিক মাহমুদ বাবু।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা প্রায় ৫০জন কবিকে স্থানীয় আরেক শিক্ষঙ্গনের শিক্ষক শিক্ষিকাগণ উত্তরীয় পরিয়ে স্ম্মান জানান। স্বরচিত কবিতা পাঠে অংশগ্রহণ করেন ঢাকা থেকে আগত আমন্ত্রিত কবি বীরমুক্তিযোদ্ধা নূরুদ্দীন শেখ, কবি আতিয়ার রহমান, কবি সৈয়দ রোকন, ছড়াকার এম আর মনজু, প্রকাশক শওকত হোসেন লিটু, কবি শাহজাহান আলী ভূইয়া, কবি মোহাম্মদ মাসুম শেখ, কবি মেহেদী সম্রাট, কবি হোসনে আরা রাণী, কবি মাসুমা ট্রফি একা সহ শতাধীক কবি ছড়াকার। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন কবি-সাহিত্যিক, ছড়াশিল্পী, গীতিকার, কণ্ঠশিল্পী, বাচিকশিল্পী ও সাংবাদিকগণ।

প্রথম মৃত্যু
                                  

জাহেদ মোতালেব

১.
তখন সকাল। রিকশা চলছে। রিকশার সিটের নিচে সামনে দুটো রড আছে। রডগুলোকে বলা হয় টানা। ওই রডের সাথে শিকল দিয়ে ছেলেটির দুই হাত বাঁধা। সিটে তার মা বসা। মা ডান হাতে ছেলের চুল মুঠো করে ধরে রেখেছে। তাকে নেওয়া হচ্ছে হেফজখানায়। বার বার পালিয়ে আসে, তাই এভাবে নেওয়া। আশপাশের লোকজন অবাক চোখে তাদের দেখছে।
ছেলেটির দুই চোখে কান্নার ¯্রােত। বাড়ির পাশের বর্ষার খাল যেন। ¯্রােতে ¯্রােতে কোথায় চলে যায় সে জানে না। এই দৃশ্য কিসমত ভুলতে পারে না, প্রায় মনে পড়ে। মনে পড়লে কষ্ট হয়। কষ্ট পাকা আমের পোকা হয়ে যায়। ওরা বলে কিরা। কালো কিরা মাথার ভেতর কুটকুট কামড়ায়।
২.
রেললাইনের পাশে খোলা জায়গা, এরপর দেয়াল। দেয়ালে লেখা : মুনাফাখোরদের রুখে দাঁড়াও। আঁকাবাঁকা অক্ষরগুলো কিসমত পড়তে পারে।
দেয়ালের ওপারে কলোনির গাছপালা। আরো উপরে আকাশ। আকাশটা এখন নীল। তার ছায়া পড়ে দুপুরটাও নীলচে। প্ল্যাটফরমের থামে হেলান দিয়ে বসে আছে সে। রোদ মাখা নীল আভা চোখে-মুখে। একটা শান্তির ভাব। পেটের দিকে যেতে যেতে শান্তি আর থাকে না। কেননা এখনো খাওয়া হয় নি।
শ্রাবণের দুপুরে আজ সে একা। একা হলে মনটা পাখি হয়ে যায়। ভাবে, উড়ে উড়ে রাসপুরে যাবে। রাসের দেশে আছে লোহার খাঁচা। খাঁচায় একটা পাখি। জুনু খালা বলেছিল, এই পাখি মানুষের ইচ্ছে পূরণ করে। রাক্ষস মেরে পাখিটাকে নিয়ে আসবে।
তাদের মাদ্রাসার পেছনে জঙ্গলে একবার অজগর একটা ছাগল গিলে খেয়েছিল। খিদে তাকে অজগর সাপের মতো গিলে খেতে চায়। গত রাত থেকে পেটে কিছু পড়ে নি। মাকে খুব মনে পড়ছে।
মাঝে মাঝে কোনো কাজই পাওয়া যায় না। তখন শুধু ক্ষুধার্ত বসে থাকা। অন্যদিন বন্ধুরা থাকে, একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে খায়।
দুই রেল পুলিশ হাঁটছে। একজন লাঠির গুঁতা দিয়ে বলে, ভাগ এখান থেকে।
সে দেখে, পুলিশটার চোখ কৈ মাছের চোখের মতো। চারপাশে মাছির ঝাঁক। ডান হাতের কনুইয়ের নিচে ফোঁড়াটা ব্যথায় টনটন করছে। ফোঁড়ায় চাপ দিলে পুঁজ বের হবে। খিদেও যদি ওভাবে বেরিয়ে যেত!
একদিন তারা প্যান্ট খুলে পুতুলিকে দেখেছে। পুতুলির সেকি কান্না আর গালি!
অদূরে বুড়ো কোমর দুলিয়ে নেচে বিরানি বিক্রি করছে। সুর করে বলে, বাংলা বিরানি খাইবানি অ আমার বাঙালি।একটু আগে একটুখানি বিরানি চেয়েছিল। বুড়ো বলেছিল, হারামজাদা শয়তান, কাজ করে খা-গা।
৩.
কিসমত শুয়ে পড়ল দুই নম্বর প্ল্যাটফরমে। ঘুমিয়েও পড়ল। স্বপ্ন দেখে, পেট ভরে মেজবানের মাংস খেয়েছে। হাত ভাঁজ করে বাহু টিপে দেখে। বাঘের থাবার মতো শক্ত বাহু। মুসলিম হলের পাশে হাতুড়ি চালিয়ে ইট ভাঙছে। শরীরে ইটের রং। বন্ধু মেহরাজকে বলে, আমি সব পারি। মেহরাজ ফেলে দেওয়া দইয়ের হাঁড়ি দেয়। হাঁড়িটা সে আকাশের দিকে ছুঁড়ে মারে।
এই স্থানে সকালে তারা নেচেছিল। পেপসি ও কোকের বোতলের ছিপি নিয়ে গোলাকার বসে যায়। ওখান থেকে চারটা আলাদা করে। শুরু হয় কড়ি খেলা। বড় কেঁচোর মতো তাদের আঙুল। কেতকুতুনি দিলে বুড়োরা যেভাবে হাসে, ছিপিগুলো তাদের হাতে তেমন নাচে। দুই হাতের তালুয় ঝাঁকায়। তারপর দারুণ কায়দায় ছুঁড়ে মারে। চারটা ছিপি একসাথে চিত হয়ে পড়লে রাজা হওয়া যায়। তিনটা একসাথে চিত থাকলে কুকুর। দুটা চিত থাকলে সাক্ষী। একটা ছিপি চিত থাকলে চোর।
ওদের মধ্যে আছে কিসমত, মেহরাজ, পুতুলি, ফোকলা দাঁতের মেয়ে কফি, আল-আমিন, সাইফুল, সুজন ও সুমন। খেলছে কিসমত, মেহরাজ, কফি ও আল-আমিন।
কেউ চোর, কেউ সাক্ষী বা কুকুর হয়। শেষে মেহরাজ হয় রাজা। পুলিশকে আসতে দেখে খেলা ফেলে দৌড় দেয়। কয়েকজন ঘুমপাতালি উঠে দৌড়ায়। পাগলিটা ইট নিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। বলে, আমার নাম আফ্রিকা, দেশ আমার আফ্রিকা। তোরে খাইয়া যাইবাম।
কিছুক্ষণ পর একই দৃশ্য। তাদের আসরও বসে। কফি বলে, রাজা রাজা কেমুন আছ?
মেহরাজ বলে, ভালা আছি।
আল-আমিন বলে, রাজা রাজা কী করছ?
রাজা বলে, আল্লারে ডাকছি।
কিসমত বলে, এই-ওই, আই-ঢাই, হেনতেন অনেক করছে। এর বিচার কর।
রাজা বলে, দুইজনের পা ধইরা মাপ চা, দুই গালে দশবার থাপ্পড় খা।
খেলতে খেলতে হাসে, হাসতে হাসতে ছিপিগুলো আকাশের দিকে ছুঁড়ে দেয়।
রেলযাত্রীর ব্যাগ বহন, কাগজ টোকাই, রেয়াজউদ্দিন বাজারে মুটেগিরিÑএমন কোনো কাজ নেই করে না। সুমনের পছন্দ ক্রিকেট খেলা। সে প্রায় বলে, আমি অলরাউন্ডার। তাই সবাই তাকে অলরাউন্ডার বলে ভেঙায়।
রোজগার ভালো হলে নানা রকম খেলা, হৈ হল্লা আর হাসি-ঠাট্টায় সময় কাটায়। দুপুরে একসাথে ফুটপাতের বিরানি খায়। কয়েকজন সিগারেট টানে, কেউ মিথ্যা মিথ্যা কোক খায়। দেয়ালের চিপায় গিয়ে কেউ কেউ গাঁজা বা ডান্ডি খায়।
মেহরাজের বয়স বার/তের। সে একবার সাজুগুজু করে বগির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক মেয়ের কাছে গিয়েছিল। মেয়েটা গালি দিলে সে টাকা বের করে। তখন মেয়েটা তাকে অন্য এক জগতে নিয়ে যায়। সে এসে তাদের সব বলেছে। সেইসব কথা তারা আগে শোনে নি। এরপর একদিন তারা প্যান্ট খুলে পুতুলিকে দেখেছে। পুতুলির সেকি কান্না আর গালি!
আবার বাঁশি বাজে। সবাই একটু আগের মহড়া দেয়। পুলিশ ঘুমন্ত বালিকাকে হেঁচকা টানে তোলে। মেয়েটার কণ্ঠার হাড় দেখে মনে হয় বহুদিন কিছু খায় নি। তখন পাগলি চিৎকার করে, মারে মা, ও মা। ইটটা মেহগনিগাছের দিকে ছুঁড়ে মারে।
এ সময় ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়। সবাই ছাদের তলে আসতে থাকে। গ্রিলের পশ্চিম পাশে সেজেগুজে বাচ্চা কোলে মেয়েটা অপেক্ষা করছে। অদূরে লুঙ্গির মধ্যে ডুবে একজন ঘুমাচ্ছে।
তারা ছিপিগুলো নিয়ে রাজাকে কেন্দ্র করে ঘোরে, নাচে। কফি বলে, রাজা খাইছে গাঁজা।
সুজন বলে, রাজা খায় ডান্ডি। সে একটা পলিথিনে ফুঁ দিয়ে ফুলিয়ে খাওয়ার ভঙ্গি করে।
সাইফুল মুখে গামছা পেচিয়ে শুয়ে পড়ে। আল-আমিন তার পাশে বসে থাকে। সে কয়েক দিন আগে ঢাকা থেকে এসেছে।তার বাড়ি যশোর আর সাইফুলের কুমিল্লায়।
কিসমত বলে, কাইল রাইতে একখান স্বফন দ্যাখছি।
কী?
দ্যাখছি, বড় অ্যাকটা ঘরে শুইয়া আছি।
তারপর?
লাম্বা কাইল্লা একখান বাঘ লাফ দিয়া ঢুকছে। আমি তো ডরাইয়া অক্করে আইগ্গা দিছি।
সবাই হাসে। কিসমত বলে, বাঘডা আমারে না খাইয়া কী করল, গু খাইতে লাগল।
সবাই হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খায়।
আমি আস্তে আস্তে লুকাইলাম।
কোথায়?
প্যান্টের ভিত্রে।
অলরাউন্ডার সুমন বলে, প্যান্ট হয়ে গেছস?
তারা একজন আরেকজনের গায়ে ঢলে পড়ে। পুতুলির বগলের কাছে জামা ছেঁড়া। সেদিকে তাকিয়ে কিসমত বলে, গু খাইয়া বাঘডা আর আমারে খুঁইজ্জা পায় না।
৪.
দুপুরের রোদ সরে গেছে। মাথার উপর জমেছে এক খ- মেঘ। আট বছরের কিসমতের পকেটে দলামোচড়া একটা ফাইভ স্টার। অদূরে বাদাম বিক্রেতা ঝিমাচ্ছে। তার কাছ থেকে ম্যাচ নেয়। সিগারেট ধরিয়ে আগের জায়গায় বসে। ধোঁয়াগুলো উড়ে ধোঁয়ার দিঘি হয়ে যায়। দিঘির পাশে দেখা যায় একটা বাড়ি। বাড়ির আশপাশে অনেক গাছপালা। পেয়ারাগাছে পেয়ারা ধরেছে। বড় জামগাছটার নিচে লাল কুকুরছানা বসে আছে। ছানাটার নাম ভুলু। মাদ্রাসা থেকে যখন বাড়ি আসত, সে যেখানে যেত, ভুলুও লাফিয়ে লাফিয়ে যেত।
তার কয়েকজন বন্ধু আছে। তাদের সঙ্গে খেলতে যায়। ফুটবল তার প্রিয় খেলা। সে মেসিকে চেনে। বড় হলে মেসির মতো হবেÑএই স্বপ্নের কথা বন্ধুরা জানে। তাই খেলার সময় তারা তাকে ডাকে মেসি। কী সুন্দর পাস দিত! তার সাথে কেউ পারত না।
বল খেলার কথা ভাবতে ভাবতে শান্তির পরশটা আবার পায়। আকাশের দিকে তাকায়। জুনু খালা গল্প বলার সময় একবার বলেছিল, মানুষ হইল আসমানের লাহান। সেই কথা মনে পড়ে।
এ সময় হিজড়াটা এসে পাশে বসে। গালে গুঁতা দিয়ে বলে, হাই লালুভুলু, ভুলাইয়া দিমু ভুলভুলাইয়া। তার মুখে স্নিগ্ধতা।যাহ্ বলে মুখ সরায় কিসমত। খিদে আবার করাত চালায়। একটু আগে দোকানদারের কাছে হাত পেতেছিল। ঝাঁঝাল কণ্ঠে দোকানদার বলেছিল, যদ্দুর খাইছস তদ্দুর পায়খানা কর। কয় ট্যাকা আছে বাইর কর। দোকানদার যেন প্যান্ট খুলে দিয়েছে। খুব লজ্জা পেয়েছিল।
তাদের দুটি রাজহাঁস আছে। অনেক সময় সে ভাত খাওয়াত। দোকানদারের কথায় ওগুলো মাটির হাঁস হয়ে যায়। হাঁসগুলো তার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। তখন সে ভাবতে চায়, তার কাছে একটা ইচ্ছেপূরণ পাখি থাকবে। পাখিকে বলবে, আকাশটাকে পায়ের কাছে নিয়ে আয়। আকাশ হবে কুপি বাত্তি। কুপির ভেতর থেকে একটা দৈত্য বেরিয়ে জিজ্ঞেস করবে, কী চাও মালিক? সে বলবে, আইসক্রিম খাব। দৈত্য তখন মেঘ দিয়ে আইসক্রিম বানাবে। বন্ধুদের নিয়ে ইচ্ছে মতো খাবে।
জিন্নার কথা মনে পড়ল এ সময়। জিন্নাকে কখনো হাসতে দেখে নি। মুখের বাম পাশে একটা ঘা। ওটা দেখলে মনে হয়, তার মা-বাবা ওই ঘায়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে। সবসময় ধুলায় ভরা কালো সুয়েটার পরে। মানুষের পা ধরায় ওস্তাদ। মাঝে মধ্যে তারা জানতে চায়, ভিক্ষা করস ক্যান? অসহায় মুখে সে বলে, ভাত খামু।
অদ্ভুত ভঙ্গিতে হিজড়া বলে, আমি? আমি হইলাম নাই মানুষ।
নিজের নাম কাউকে বলে না। জিজ্ঞেস করলে বলে, জানি না। তারা তাকে প্রথমে ডাকত জানি না। একসময় জানি না হয়ে গেল জিন্না। সে বলে, তার কেউ নাই। কিসমত ভাবে, নিশ্চয় কেউ না কেউ আছে। তারা তো কেউ একা না। এখানে তারও কত বন্ধু।
ছেলেটা খুব ক্ষুধার্তÑহিজড়া তা বুঝতে পারে। তার কাছে একটা ডায়নিস ছিল। বের করে অর্ধেক ছিঁড়ে দেয়। দুই কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে আয়েশ করে বসে।
ডায়নিস পেয়ে কিসমতের মনে জোয়ার আসে। যেন ভরা জোয়ারের কর্ণফুলী। সদরঘাট ও ব্রিজঘাটে কত ঘুরেছে!ঘড়ঘড় করা রেলের ইঞ্জিনটার দিকে তাকায়। মনে হয়, অনেক বাঘ-সিংহ ওখানে লুকিয়ে আছে। রাস্তায় মাইকে লোকটা চিৎকার করে, আসেন আসেন, লটারি নেন। মাত্র দশ টাকায় চল্লিশ লাখ টাকা পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ।
হিজড়াটা দেখে, ছেলেটার চোখের কোনায় পানি। চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, হায় হায়রে, ওই ব্যাটা, কান্দস ক্যান?
কিসমতের কান্নার ফোঁটা চায়ে পড়ে।
হিজড়ার কী যেন মনে পড়েছে, মেঘের দিকে তাকিয়ে বলে, জগতে মানুষ দুই রহম। অ্যাকডা মানুষরে টাইনা বুকে নেয়। আরেকডা মানুষ কিথা করে জানস? মানুষরে পকেটে রাহে।
কিসমত জিজ্ঞেস করে, তুমি?
অদ্ভুত ভঙ্গিতে হিজড়া বলে, আমি? আমি হইলাম নাই মানুষ।
আমি?
তুই? তুই ত ছেঁড়া মানুষ।
ক্যান?
তুই স্টেশনে পড়ে থাহিস। মা-বোন নাই, নেশা-ভান করস, বিড়ি খাস।
নেশা-উশা করি না ত।
নেশা-উশা করি না ত। হিজড়াটা ভেঙায়। তারপর বলে, মিথ্যা কইস না শয়তানের ছা।
সে হাসে। গত রাতে গাঁজায় টান দিয়েছিল। সেই কথা মনে পড়ে। মনে হয়েছিল নাকের ভেতর রেলগাড়ি চলছে। হিজড়ার চোখের দিকে চায়। তার কিছু ভালো লাগে না। মেঘটা ভেঙে পড়লে বেশ হতো। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ত, সে বকের মতো উড়ে জুনু খালার বাড়ি যেত। খালা পিঠা বানাত। গল্প শুনতে শুনতে ধোঁয়া ওঠা পিঠা খেত।
৫.
গত বছর শীতের কথা। ঘরের পেছনে ছোট্ট জলাশয়ে বাবা ও সে মাছ ধরছিল। একটা শিং মাছ ধরতে গিয়ে কাঁটার গুঁতা খায়। গুঁতা খেয়েই কান্নাকাটি করে। মা কানে থানকুনি পাতা দেয়। এটা দিলে নাকি ব্যথা কমে যায়। কানে থানকুনি পাতা নিয়ে বাবার মাছ ধরা দেখে। টাকি, শিং, কৈ মাছ ধরা পড়ল। গোসল করে পান্তাভাত খেয়ে বাবা বাজারে যায়। সেও সঙ্গে যায়। নতুন লাগানো ধানের চারার মতো ঝুঁকে বসে। হাতায় শিং মাছ নাচে।
বানরমুখো বুড়ো মাছ বিক্রেতা বলে, শিং পরি নাচেরে, বিষ ঝাইড়া নাচে।
পৌষের শীত কানের লতিতে কাঁপন তুলছে। সারা সকাল ভিজে আঙুলগুলো গর্ত গর্ত। বাবা বিড়ির ধোঁয়া ছাড়ছে। সে খেজুর রসে যে মজা পায়, বাবা মনে হয় বিড়িতে তা পাচ্ছে।
ভাবে, মাছগুলো না বেচলে ভালো হতো। মাকে বলত, শিমের বিচি দিয়ে রাধ। মা রাঁধত। চাকা চাকা কেটে আলুও দিত। খেতে কত মজা হতো!
৬.
পালিয়ে এসেছে প্রায় বছরখানেক হলো। বেশ কয়েক বার চট্টগ্রামের মেজবান খেয়েছে। একবার গলায় ছোট হাড় আটকে গিয়েছিল। সঙ্গীরা নিয়ে গিয়েছিল ডাক্তারের কাছে। অনেক কষ্ট পেয়েছে। তখন স্টেশনের কোনায় শুয়ে বিরানি বুড়োর ছড়া শুনত। মাঝেমধ্যে বুড়ো বলত, ‘যশুরে কই খাইবিনি?’
অনেক কথা মনে পড়ছে। বাবা হেফজখানায় ভর্তি করানোর পর কতবার পালিয়ে এসেছে! কত পিটা খেয়েছে, তার কি হিশাব আছে! সবাইকে খুব নিষ্ঠুর মনে হতো।
তবে মা-বাবার মনে ছিল আনন্দ। বিশেষ করে বাবার মনে। ধান রোপণ হয়ে গেলে কিংবা ফসল কাটার আগে কিছুদিন বাবার কাজ থাকত না। তখন আড্ডা দিয়ে সময় পার করত। ওই সময়ে প্রায় মাকে বলত, যে কোরানে হাফেজ হয়, মৃত্যুর পর তার বুক পচে না। ছেলে হাফেজ হলে মা-বাবাও বেহেশতে যায়।
কিসমতের মনে পড়ে, তাকে বেঁধে রিকশায় করে নেওয়ার সময় অনেক কেঁদেছিল। হেফজখানায় যাওয়ার পর হুজুর এমন মার মারল, রাগে, অভিমানে সে টু শব্দ করে নি।
মাকে বলত, আসার আগের দিনও বলেছে, মারে, আমার ভাল্লাগে না।
হাফেজ হলে কী লাভ হবে মা তাকে বোঝাত। সে বুঝতে চাইত না। তখন মা বলত, তোর বাবায় মারব।
ছাগলছানা উঠানে তিড়িং বিড়িং করে। সে ভাবে, কেউ বুঝে না।
তাকে আরো অপেক্ষা করতে হয়। দুই মাস পর ছুটি পায়। বাড়ি যায় দুদিনের জন্য। প্রথম রাত কাটানোর পর ভোরে কেউ কিছু বোঝার আগেই পালিয়ে যায়। সকালে ট্রেন ছিল না। বাসে ময়মনসিংহ যায়। সেখান থেকে ট্রেনে চেপে ঢাকা। কমলাপুর থেকে সন্ধ্যার পর আরেকটা ট্রেনে চড়ে। কোথায় যাচ্ছে জানে না। ভোরে শেষ স্টেশনে ট্রেন থামলে জানতে পারে সে চিটাগাং এসেছে। টিটির কানমলা খায়। শরীরে ত্রিশ-চল্লিশ ভাগ পিটা, কানমলায় কী হবে?
৭.
অগ্রহায়ণ মাসের শেষের দিকে চলে যেত খালার বাড়ি। তখন ধান কাঁটা শেষ, ধান নেওয়াও প্রায় শেষ। উঠানে, ঘাটায় খড়। চারপাশে ধানের গন্ধ। মোটামুটি শীত পড়ে।
জুনু খালার শাশুড়ি তো গল্পের খনি। বড় মা উঠানে খড়ের গাদায় বসে গল্প বলত : বহু দূরে ছিল একটা দেশ। সেই দেশে ছিল অত্যাচারী এক রাজা। রাজার দুই রানি। বড় রানি খুবই ভালো। প্রজাদের দুঃখে তার মন কাঁদে। তাদের জন্য যথাসাধ্য করে। ছোট রানির ষড়যন্ত্রে একদিন রাজা তাকে তাড়িয়ে দিল।
রানি কোথায় যাবে? হাঁটতে হাঁটতে রাজ্যের বাইরে চলে যায়। পথে পড়ে একটা বন। আশপাশে কোনো মানুষ নেই। বনের মধ্যে একটা কুঁড়েঘর। ঘরে একটা পাখি। তাকে দেখে পাখিটা বলে, মেহমান এসেছে। কী সুন্দর পাখি! পাখির কথা শুনে রানি অবাক।
রানি ওই ঘরেই থেকে যায়। পাখিকে আদর করে, তার সঙ্গে কত কত গল্প করে! গল্প শুনতে শুনতে পাখিটা একদিন রূপবান এক রাজপুত্র হয়ে যায়। তারপর রানিকে বলে, মা! আমি তোমার ছেলে। জন্মের পর ছোট মার ষড়যন্ত্রে পাখি হয়ে গিয়েছিলাম।
ওইদিন সে দাঁতের ফাঁকে ব্লেডের টুকরো রেখেছিল। মাঝেমধ্যে ব্লেডে একটু চাপ দেয়। এতে মাড়ি কেটে রক্ত বের হয়। ডান্ডির গন্ধ শুঁকার পর রক্তের নোনতা স্বাদে নেশা জমে।
৮.
রেলের পুরনো বগি। কয়েক জায়গায় রং উঠে গেছে। দরজার বাম পাশে গু লেগে আছে। রাত আটটা-নয়টা হবে। কিসমত বগির ভেতর শুয়ে আছে। পাশে বসে আছে জিন্না।
বিকালে হিজড়া বলেছিল, তোরে দেখলে মায়া হয়রে। এখন সেই কথা মনে পড়ে।
সে জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি এত সাজুগুজু করো ক্যান?
হিজড়া হেসে বলেছিল, সাজতে হয়রে।
তুমি তো ওই মাইয়াগুলার মতন না।
ও কোনো জবাব দেয় নি।
জিন্না দলামোড়চা হয়ে সুয়েটারের ভেতর ঢুকে পড়ে। একটু পর তার নাক ডাকা শুরু হয়।
কিসমতের মনে পড়ে মায়ের মুখটা। মায়ের কথা ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়ে। স্বপ্ন দেখে, সে বল খেলছে। মেসির মতোই বল নিয়ে এগিয়ে যায়। গোল করে, একটা, দুইটা, তিনটা। হ্যাট্রিক করার পর তার ঘুম ভেঙে যায়।
৯.
পরদিন সন্ধ্যায় মেহরাজ তাকে ডেকে নেয়। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের উল্টোদিকে ফুটপাতের এক কোনায় বসে। ওখানে আরো কয়েকটা ছেলে আছে। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। তাদের হাতে পলিথিন। মেহরাজ ফুঁ দিয়ে একটা পলিথিন ফুলিয়ে নাক-মুখ তাতে ঢুকিয়ে কিছুক্ষণ চেপে ধরে। ভেতরে হলুদাভ আঠাল জিনিস। ওটা আসলে গাম। কিছুক্ষণ গন্ধ শোঁকার পর কিসমতকে দেয়। সে ইতস্তত করে। মেহরাজ তার মুখে চেপে ধরে বলে, খিদা লাগত না, নাক দিয়া টান।
কিসমত দেখে, একটা ছেলে ফুটপাতে চোখ বুঁজে শুয়ে আছে। সাহস করে টান দেয়। ফুটপাতে শুয়ে থাকা ছেলেটি বলে, ডান্ডি খাস? তারপর হেসে সাহস দেয়, এইডা লইলে নিশা অয়, ঘুম আইয়ে। খিদা লাগে না, দুনিয়াদারির কুনু হুঁশ থাহে না।
মেহরাজ বলে, এডি খাইলে দুনিয়াদারি রঙিন রঙিন লাগে।
কয়েক দিন আগে মেহরাজ একটা কাজ করেছিল। কিসমতকে সে কথা জানায়। ওইদিন সে দাঁতের ফাঁকে ব্লেডের টুকরো রেখেছিল। মাঝেমধ্যে ব্লেডে একটু চাপ দেয়। এতে মাড়ি কেটে রক্ত বের হয়। ডান্ডির গন্ধ শুঁকার পর রক্তের নোনতা স্বাদে নেশা জমে।
বিতিকিচ্ছিরি একটা স্বাদ কিসমতের নাকে-মুখে, মগজে ছড়িয়ে পড়তে চায়। খকখক কেশে চোখ বুঁজে শুয়ে থাকা বুড়ো মনে হয় নিজেকে। অদূরে রাস্তার মাঝখানে মাজারের কাঠচাঁপার ফুলগুলোকে মনে হয় একেকটা বেলুন। সে বলে, মা বেলুন, বোন বেলুন, খালা বেলুন। বেলুন হয়ে উড়ে বাড়িতে চলে যেতে ইচ্ছে করে।
এ সময় তালগাছের মতো লম্বা টহল পুলিশটা এসে তার পাছায় লাথি মারে।
শিং মাছের বিষের মতো রাগ এসে ভর করে। দৌড়ে পালাতে পালাতে সে গালি দেয়, বিশ্রী একটা গালি।

শুভংকরের ফাঁকি
                                  

রুজি মতিন

আশ্চর্য্য! সংসার মরুর
তপ্ত প্রান্তরে দেখা আমাদেরই।
সত্যি আমি পিপাসিত প্রবল,
ব্যথিত ছিলামনা,
কেননা অলক্ষ্যে তোমার ভালবাসা
প্রসারিত ভেবে,
দীয়া জ্বেলেছিলাম স্বপনের বুকে সংগোপণে।
আমার থুতুনির ব্যাথা গুনে গুনে
বিস্ময় কন্ঠে ভালবেসে বলেছিলে,
কি করে এতো ব্যাথা নীলে গুজে
রাখো প্রিয়তমা!
আমার চোখে তখন আবেগী জল,
আমার ভেতরে ভালবাসার হারিকেন।
দোলাচলে দোলে দোলে
শান্তির মেঘ মেখে
তোমাকে নিয়ে
বালিয়াড়ী বেলা ভূমিতে
কাটিয়ে দিলাম রাত।
এখন সমুদ্রে যাবার সময় ভেবে
যখনি দিবো ঝাপ,
তুমি নেই কোথাও তুমি নেই,
মণি নয় মরিচীকা
আলো নয় আলেয়া,
ভগ্ন হৃদে রেখে দিই
অবশেষে দীর্ঘশ্বাস আর ভাবি
শুভংকরের ফাঁকি!

বউ যেভাবে ঘরে আসে
                                  

সোহেল হাসান গালিব

বছর দশ আগের একদিন। ২০০৮ সাল। বলা ভালো, সেটা দিন নয়, ডিসেম্বরের একটা রাত। নির্বাচন-শেষের ভাগ্যরজনী। যখন অন্ধকারে ক্রমে ফুটে উঠছে ক্ষমতার নতুন বিন্যাস। নাবালক চিত্তে সাবালক অনুভূতির একটা উত্তেজনা চারদিকে।
এইসব উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার জন্য কনকনে শীতও তেমন আর টের পাওয়া যায় না। কিংবা হয়তো ঠিকঠাক মতো বাড়ি ফেরার টেনশনে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা সাজ্জাদুল ইসলাম কিছুটা ঘেমে উঠেছিল। আশলে তার মন তেতে ছিল নির্বাচনের আগের রাত থেকেই। এই বালের মাস্টারি জীবন বেছে না নিলে এটা নিশ্চিত যে, ভোটের ঠিকাদারি করতে এমন ভাঙা স্কুলের বেঞ্চিতে শুয়ে রাত কাটাতে হতো না।
সকালবেলা আনসার-পুলিশের সাথে ডাল-খিচুড়ি খেয়ে নির্বাচন ভালোই চালানো গেল। আর্মি টহল দিচ্ছে এমন একটা খবর ছিল বাতাসে। ফলে কোনো উৎপাত ছিল না। ব্যালট গুনতে গুনতে সন্ধ্যা সাড়ে ছটা।
মুরব্বি গোছের একজন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা বারবার ফিসফিস করে বলছিল, ‘স্যার এট্টু তাড়াতাড়ি করেন। গেছেবার কিন্তু মেলা রাইত অইছিল। ব্যালট বাক্স ছিনতাই অইছিল নদীর মদ্দে।’ পুলিশের এএসআই হুংকার দিয়ে বলল, ‘এইবার ওইসব কিছু অইবে না। আম্মহে নিশ্চিত থাহেন স্যার।’
গদ্দার হাটের এই স্কুল থেকে সন্ধ্যানদীর পাড় দুমিনিট হাঁটার দূরত্ব। নদী পেরোলে রিক্সা। রিক্সায় বিশ মিনিটে রিটার্নিং অফিস। ব্যালট-বস্তা-সিল জমা দিয়ে বেরিয়ে আসার পথে অফিসের একজন এসে কানে কানে বলল, ‘স্যার আপ্যায়নের ব্যবস্থা আছে।’ বলার ধরনে বোঝা গেল এ ব্যবস্থা সবার জন্য নয়। সম্ভবত, কেবল প্রিসাইডিং অফিসারদের জন্য।
আপ্যায়ন মন্দ নয়। ভুনা খিচুড়ি আর মুরগির মাংস। এই প্রথম সাজ্জাদের মনটা শান্ত হলো। যাক বাসায় ফিরে আর রান্না-বান্নার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু আশল সমস্যাটা টের পাওয়া গেল খাওয়া শেষ করে। বাড়ি ফিরবে কিভাবে? রাত তখন দশটা। বানারীপাড়া থেকে বরিশাল ফেরার কোনো গাড়ি নাই। ইনফ্যাক্ট, রাস্তা প্রায় ফাঁকা।
ভাগ্যই বলতে হবে। কলেজের পিয়ন জামিলের সাথে দেখা হয়ে গেল। ‘স্যার, রাইতে থাকবেন কোনহানে?’ ওর প্রশ্ন শুনে প্রথমে হতাশ হয়ে পড়েছিল সাজ্জাদ, ‘বলো কী! ফেরার কোনো ব্যবস্থা নাই?’ একটু ভেবে পিয়নটা যা বলল তাতে ওকে প্রায় জড়িয়ে ধরতে যাচ্ছিল সে। মোদ্দা কথা হলো এই, পরিচিত এক ড্রাইভার আছে এখানে, যার গাড়িটা পুলিশ রিকুইজিশনে নিতে পারে নাই, কারণ গত দুদিন সে বাড়ি ছিল না। আজ বাড়ি এসেছে। এখন তাকে বললে হয়তো একটা ট্রিপ দিতে পারে।
ঘণ্টাখানেক লাগল সেই ড্রাইভারকে ম্যানেজ করতে। ৪০০ টাকায় তাকে রাজি করানো গেল। বানারীপাড়া ব্যাসস্ট্যান্ড থেকে বরিশাল ফরেস্টার বাড়ি। আলফা নামে পরিচিত এই তিনচাকা-গাড়ির ড্রাইভার মাঝবয়সী, নাম রুস্তম। যাত্রী সাজ্জাদ, একাই।
কাছে আসতে বোঝা গেল অল্পবয়সী একটা মেয়ে। তরুণী বলাই ভালো। গাড়ি থামল তরুণীর একেবারে পায়ের কাছে।
বাজারে প্রচুর লোক-সমাগম। টেলিভিশন চলছে। চারদিক সরগরম। কিন্তু রাস্তায় গাড়ি নেই। বাজার পেরোতেই একরাশ অন্ধকার। পথের দুধারের গাছগাছালি নিঃশব্দে ঢালছে আরও অন্ধকার কুয়াশা। বাতাসে কনকনে ঠান্ডা এবার যেন টের পাওয়া যাচ্ছে। গাড়ি গুয়াচিত্রা পৌঁছবার খানিক আগে রুস্তম বলল, ‘স্যার, একটা মাইয়া রাস্তায় হাত তুইলা থামতে কইতাছে। থামমু?’
‘এত রাতে একটা মেয়ে! আচ্ছা কাছে যাও দেখি।’ সাজ্জাদ মাথা নিচু করে বাইরে দেখতে চেষ্টা করল।
কাছে আসতে বোঝা গেল অল্পবয়সী একটা মেয়ে। তরুণী বলাই ভালো। গাড়ি থামল তরুণীর একেবারে পায়ের কাছে। গাড়িটা থামল সে তরুণী বলেই। তরুণ কেউ হলে নিশ্চয়ই থামত না।
‘যাইবেন কোনহানে?’ রুস্তম ইঞ্জিনের আওয়াজ ছাপিয়ে হাঁক দিল।
মেয়েটি কিছুই না বলে গাড়ির মধ্যে উঁকি দিয়ে দেখল। মনে হলো, সে খুব আশ্বস্ত হলো সাজ্জাদকে দেখে।
‘বরিশাল যাইবেন তো ওঠেন গাড়িতে।’ রুস্তম বুঝে গেছে স্যার আপত্তি করবে না।
মেয়েটি গাড়িতে উঠে পড়ল চুপচাপ। বসল এসে ঠিক পাশে। মুখে চোরা হাসির একটা ঢেউ খেলে গেল যেন। সাজ্জাদের নজর এড়াল না।
গাড়ি আবার ছুটল বিকট আওয়াজ তুলে। রাস্তার দুপাশের শীতার্ত গ্রামকে ধমক দিয়ে।
মেয়েটি বিপজ্জনক নয় ঠিকই, কিন্তু সরলও তো মনে হচ্ছে না। সাজ্জাদ ভাবছে। কিভাবে কথা শুরু করা যায়? তাকে কি আপনি বলবে, না তুমি?
‘আপনি থাকেন কোথায়?’
হিহি করে হেসে উঠল মেয়েটি। সাজ্জাদ বোকা হয়ে গেল।
‘হাসছেন যে!’
‘আমারে আপনি বলতেছেন ক্যান?’
স্যালোয়ার-কামিজ পরা, চাদরে মোড়ানো মেয়েটিকে সাজ্জাদের এবার একটু বাচ্চাই মনে হলো। একে আপনি বলা ঠিক হয় নি।
‘আচ্ছা। তোমার বাড়ি কোথায়?’
ঝিলিক-দেয়া চোখে মেয়েটি তীব্র চাহনিতে দেখে নিল সাজ্জাদকে। কী দেখল কে জানে।
‘খলিশাকোটা গ্রাম।’
মনে মনে হিশাব কষল সাজ্জাদ। এটা তো চাখার কলেজেরও পেছনে। অতদূর থেকে একা একা গুয়াচিত্রা এল কিভাবে এই মেয়ে? প্রশ্নটা জেরামূলক হয়ে যায়। তাই ও-পথে গেল না। সিম্পলি জানতে চাইল, কোথায় যাচ্ছে সে।
‘যাচ্ছি বরিশাল। শ্বশুরবাড়ি।’
বলে কী এই মেয়ে! ইয়ার্কি করছে নাকি! এ তো বেশ বেয়াদব!
‘মানে তোমার বিয়ে হয়েছে?’
রাস্তার পাশ থেকে হৈচৈ শোনা গেল। গাড়ি পার হচ্ছে গুঠিয়া বন্দর। বাজারে মিছিল-মিছিল ভাব। হয়তো এতক্ষণে ফল ঘোষণা শুরু হয়ে গেছে।
‘বিয়ে হয় নি, হবে।’
খুবই ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। বিয়ে হবার আগেই মেয়ে যাচ্ছে শ্বশুরবাড়ি ঘুরতে। তাও মধ্যরাতে। একা একা।
‘তুমি তো দারুণ সাহসী মেয়ে। কী নাম তোমার?’
‘রাজিয়া সুলতানা।’ গাড়ির শব্দে নামটা ঠিক শোনা গেল না।
এমন সময় মোবাইল বেজে উঠল। ইংরেজির শিক্ষক আকমল স্যার ফোন করেছেন। উনি থাকেন ঢাকায়। প্রিন্সিপালকে বলে, ইউএনও অফিসে তদবির করে তার নামটা বাদ দিতে পেরেছেন নির্বাচনি কাজ থেকে।
‘কী স্যার, নির্বাচন কেমন করলেন?’ বেশ টেনে টেনে সুরেলা একটা প্রশ্ন করলেন আকমল স্যার। এমনিতেই উনি কথা বলেন অ্যাবনর্মাল টোনে। ভরাট গলায়। কিছুক্ষণ কথা বললেই আবৃত্তির ক্লাস হয়ে যায়।
‘জি স্যার, ভালো?’
‘আপনার দল তো জিতে গেল।’
‘আমার দল কোনটা! রেজাল্ট হয়ে গেছে নাকি?’
‘ম্যাক্সিমাম।’
‘তো আপনি কি ব্যথিত না আনন্দিত?’
‘পরিবর্তনকে স্বাগত জানাই।’ ক্লিশে, ডিপ্লমেটিক, হাল্কা রসিকতা।
‘ভোট কিন্তু ফেয়ার। আমার কেন্দ্রে কোনো ঝামেলা হয় নাই।’
‘যাক আপনার এবার একটা হিল্লে হবে।’
‘আমার আর কী!’
‘না, এখন চাইলে ভালো জায়গায় পোস্টিং নিতে পারবেন।’
‘ভাই রে, আমার কোনো লাইন নাই। আপনার থাকলে বইলেন।’
জানা গেল, আগামি পরশুদিন উনি কলেজে আসছেন। ঢাকা থেকে যারা এসে ক্লাস করেন, তারা কলেজেই একটা বড় ক্লাসরুমে থাকেন, সেটাকে মেস বানিয়ে। তিনতলায় সেই রুমের জানালা খুললেই দেখা যায় বড় বড় কাঁঠাল গাছ। সেই গাছ বেয়ে তড়তড় করে নেমে আসে কাঠবিড়ালি। ধূসর রঙের কাঠবিড়ালিটা তখন নেমেই আসছিল। কিন্তু তার আগেই ঘুমে টলে পড়ল সাজ্জাদ। যখন ঘুম ভাঙল, গাড়ি ততক্ষণে গড়িয়ার পাড় চলে এসেছে।
মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠল। ‘স্যার, আপনি তো খুব ভালো অভিনয় জানেন!’
‘আচ্ছা, জিজ্ঞেস করা হয় নাই, তুমি নামবে কোথায়?’ এবার যেন আশল কথাটা মনে পড়ল সাজ্জাদের।
‘হাতেম আলী কলেজের উল্টো পাশে।’
বলে কী! এ তো দেখি আমার বাসার কাছেই। সাজ্জাদ বিস্মিত হলেও সেটা প্রকাশ করল না। ড্রাইভারকে বলল হাতেম আলী কলেজের সামনে মেইনরোডে গিয়ে থামতে। সে নিজেও মেইনরোডেই নামল। সম্ভবত মেয়েটার শ্বশুরবাড়ি কোনটা সেটা দেখার একটা কৌতূহল।
রুস্তম ভাড়া বুঝে নিয়ে সালাম-টালাম জানিয়ে চলে গেল। তারপর সাজ্জাদও যখন মেয়েটিকে বিদায় দিতে গেল তখনই ঘটল কা-টা।
সৌজন্যবশত সে মেয়েটিকে বলেছিল, ‘ঠিক আছে, তাহলে যাওৃ বাসা চিনবে তো!’
মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠল। ‘স্যার, আপনি তো খুব ভালো অভিনয় জানেন!’
‘মানে?’
‘থাক থাক। অনেক হয়েছে, এখন আর কেউ নাই যে অ্যাকটিং করবেন।’
‘মানে কী?’
‘আমিও তো তাই বলি, মানে কী?’
‘তুমি কি আমার স্টুডেন্ট?’
‘জি স্যার। এবার আমি ইন্টার পরীক্ষা দিয়েছি। চাখার কলেজ থেকে।’
‘এনি ওয়ে, আমি তোমাকে চিনতে পারছি না। কিছু মনে করো না, আমি আশলে মানুষের চেহারা মনে রাখতে পারি না।’
‘তাই!’
‘হ্যাঁ, তাই। যা হোক, রাত অনেক হয়েছে। এখন বাড়ি যাও।’
‘সে জন্যই তো এতদূর আসা।’
‘ওকে।’
কিন্তু দুজনেই ফুটপাতে দাঁড়িয়ে রইল। কেউ নড়ছে না। সাজ্জাদ ঠিক বুঝতে পারছে না, মেয়েটার উদ্দেশ্য কী।
‘চলেন, বাসায় যাই।’ মেয়েটিই ইশারা করল তাকে যেতে।
‘কোন বাসায়?’
‘স্যার, আমাকে এতদূর নিয়ে এসে এখন কি নাটক করবেন?’
‘নাটক?’
‘নয়তো কী? আমি আপনার জন্য সেই সকালে বেরিয়েছি। সারাটা দিন, সন্ধ্যাটাও কাটালাম সলিয়াবাকপুর আমার এক বান্ধবীর বাড়ি।’
‘কিন্তু কেন?’
‘কেন মানে? আপনিই তো বললেন, নির্বাচনের দিন রাতে গুয়াচিত্রা অপেক্ষা করতে। আমিও বাড়িতে বলে এসেছি, বরিশালে খালার বাসায় থাকব আজকে।’
‘দ্যাখো, ইয়েৃ কী নাম যেনৃ যা হোক, তুমি নিশ্চয়ই কোথাও ভুল করছ। আমি সত্যিই তোমাকে চিনি না।’
‘আপনি কিন্তু আমাকে অপমান করছেন।’ মেয়েটি এবার কান্না শুরু করল।
ভীষণ মুশকিলে পড়া গেল। রাগে গা কাঁপছে সাজ্জাদের। ভয়ে শরীর ওজনশূন্য হয়ে পড়ছে।
‘এত রাতে আমি কোথায় যাব?’ বলে মেয়েটি ফুটপাতের ওপর জাস্ট বসে পড়ল।
‘জানি না।’ বলে সাজ্জাদও হাঁটা দিল তার বাসার গলির দিকে। কিন্তু দুপা এগিয়েই থেমে গেল। ঘটনার ভয়াবহ দিকটা সে টের পেল এবার। সত্যিই যদি মেয়েটিকে এখন ফেলে যায়, এটা নিশ্চিত, কিছুক্ষণের মধ্যে এখানে লোকজন জড়ো হয়ে যাবে। তারপর ঘটনার সূত্রে ফাঁস হয়ে পড়বে তার নাম-পরিচয়। মহল্লার সবাই একটা মিথ্যা গল্প দাঁড় করাবে তাকে নিয়ে। একটা কেলেঙ্কারি ব্যাপার।
ফলে ফিরে আসতে হলো। যতটা সম্ভব বেশ রাশভারি কণ্ঠে সাজ্জাদ বলল, ‘শোনো মেয়ে, কান্না থামাও। আসো আমার সাথে।’
কান্নাভেজা মেয়েটির মুখে হাসি ফুটে উঠল। কোনো কথা না বলে অনুসরণ করল সাজ্জাদকে। সাজ্জাদের কাছে বাসার গেটের চাবি থাকে সবসময়ই। ভাগ্য ভালো যে দারোয়ান বেটা ঘুমিয়ে পড়েছে। চারতলার ফ্ল্যাটে ওঠা পর্যন্ত কারো মুখোমুখি হতে হলো না।
‘তোমাকে একটা কথা বলি। যেহেতু তুমি আমার স্টুডেন্ট, আমি তোমাকে একটা ফেবার করছি মাত্র। আজ রাতটা তুমি থাকো আমার বাসায়। কাল সকালে সোজা বাড়ি ফিরে যাও।’ ফ্ল্যাটে ঢুকেই সাফ সাফ জানিয়ে দিল সাজ্জাদ।
মেয়েটি এ কথা শুনল কি শুনল না ঠিক বোঝা গেল না। শুধু বলল, ‘আমার খুব খিদে পেয়েছে।’
‘ভেরি গুড।’ সাজ্জাদ ফ্রিজ থেকে মাছের তরকারি বের করে বলল, ‘রান্নাঘরে যাও। এটা গরম করে খাও।’
‘আচ্ছা।’
‘ওখানে চাল আছে। ভাত রান্না করে নাও।’
‘আপনি খাবেন না?’
‘না, আমি খেয়ে এসেছি।’
সাজ্জাদ গোসল-টোসল সেরে ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে মেয়েটা ডাইনিং টেবিলে খেতে বসেছে।
তবে গুজব রটে যে, কলেজের এক শিক্ষকের সঙ্গে তার নাকি সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সেই শিক্ষকও পরে চলে যায় কলেজ ছেড়ে।
এরপরে আশলে কী ঘটেছিল, কিছুই মনে করতে পারে না সাজ্জাদ। সে তার বাড়ি অরক্ষিত রেখে কিভাবে ঘুমাতে গেল ভেবে পায় না। অ্যাটলিস্ট তার উচিত ছিল দরজায় তালা দিয়ে ঘুমানো। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে মেয়েটি নেই। যাক, আপদ বিদায় হয়েছে।
কিন্তু বাড়ির কী কী জিনিশ খোয়া গেল সেটা কে খুঁজে দেখবে এখন! অবশ্য এটা ঠিক যে, তার বেডরুম ছাড়া অন্য কোথাও এমন মূল্যবান কিছু নেই যা চুরি গেলে বিশেষ কোনো ক্ষতি হবে।
ঘটনার পর তিন দিন পর্যন্ত একটা চাপা উদ্বেগ ছিল সাজ্জাদের মনে। আফটার-ইফেক্ট নিয়ে ভাবছিল। কিছুই ঘটল না দেখে শেষমেশ আকমল স্যারের সাথে শেয়ার করল ব্যাপারটা। তখন সে যা শুনল তা ভয়ঙ্কর।
রাজিয়া সুলতানা নামে সত্যিই একটা মেয়ে পড়ত চাখার কলেজে। এবং তার বাড়িও খলিশাকোটা। যতদূর জানা যায়, বছর চারেক আগে কলেজের ছাঁদ থেকে পড়ে মারা যায় সে। সেটা দুর্ঘটনা নাকি আত্মহত্যা তা জানা যায় না। তবে গুজব রটে যে, কলেজের এক শিক্ষকের সঙ্গে তার নাকি সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সেই শিক্ষকও পরে চলে যায় কলেজ ছেড়ে। একেবারে মেলোড্রামা।
কিন্তু এই ঘটনা শুনে সাজ্জাদের কোনো সুরাহা হলো না। ‘চলেন একবার সেই মেয়েটার বাড়ি ঘুরে আসি।’ আকমল স্যারকে এমন প্রস্তাব দিলে উনি একটু দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন, ‘যাবেন! চলেন ঘুরে আসি।’
একদিন বিকেলে সত্যি সত্যি তারা দুজন হাঁটতে হাঁটতে খলিশাকোটা গ্রামে ঢুকে পড়ল। পুরনো সেনবাড়ির মস্ত বড় পুকুর, ভাঙা শিবমন্দির পার হয়ে একটা বাড়ির সামনে গিয়ে তারা যখন দাঁড়াল তখন প্রায় সন্ধ্যা। বাড়ির কর্তা তাদের দেখে চিনতে পারলেন।
‘স্যার, আপনারা এদিকে!’
‘এই হাঁটতে হাঁটতে চলে আসলাম।’
‘ভেতরে আসেন স্যার, একটু বইসা যান।’
আমন্ত্রণটা যথেষ্ট জোরালো ছিল না। স্বাভাবিক সৌজন্য বলা যায়। কিন্তু সেটাকেই লুফে নিতে হলো আপাতত।
বসার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বাড়ির কর্তা, মানে বাদশা মিয়া, হাঁক দিলেন, ‘এই সাজু, দ্যাখ তোর কলেজের স্যাররা আইছে।’
সাজ্জাদ আর আকমল পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে নিল চকিতে। বাদশা মিয়া বললেন, তার এই মেয়ে এবার ইন্টার পাশ করেছে। বরিশালে খালার বাসায় থেকে এখন কোচিং করছে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির জন্য।
আকমল স্যার একটুও অবাক না হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার ছেলে-মেয়ে কয়জন?’
‘ছিল দুইজন। একটা মেয়ের কথা তো আপনারা সবাই জানেন। এইডা অইল তার ছোট।’
যে মেয়েটি সামনে এসে সালাম দিয়ে দাঁড়াল তাকে দেখে সাজ্জাদের চোখ কপালে উঠে গেল। এ তো সেই মেয়ে!
‘ওর নাম সাজু। সাজিয়া সুলতানা’, বাদশা মিয়া মেয়ের দিকে ফিরে বললেন, ‘স্যারদের জন্য একটু চায়ের আয়োজন করো।’
মেয়েটা একসময় চা নিয়ে এল। সাজ্জাদ অপার বিস্ময় চায়ের চুমুকে গিলে কোনো মতে শুধু বলল, ‘তোমার নাম যে সাজিয়া, তা তো জানতাম না।’
‘কী বলেন স্যার! আপনার কাছে পরীক্ষার আগে এক মাস পড়লাম, এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন!’
ভীষণ পাজলড হয়ে পড়ল সাজ্জাদ।
‘বাদ দাও তোমার স্যারের কথা। উনি কারো নাম মনে রাখতে পারেন না।’ আকমল স্যার সাজ্জাদকে কায়দা করে বাঁচিয়ে দিলেন এ যাত্রায়।
ফিরে আসার পথে সাজ্জাদ বারবার আকমল স্যারকে বোঝাতে লাগল, মেয়েটা ডাহা মিথ্যা বলেছে। সে কখনো ক্লাসের বাইরে কাউকে পড়ায় নি। ব্যাচে পড়ানোর অভ্যাস তার নাই।
‘হয়তো ক্লাস শেষেই মেয়েটা আসছে হেল্প নিতে। সে জন্যেই হয়তো মনে নাই আপনার। কিন্তু মেয়েটা মিথ্যা বলবে কেন?’ আকমল স্যার সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন।
‘ওর তো পুরোটাই মিথ্যা। সেদিন রাতে ওই তো গিয়েছিল আমার বাসায়।’
‘বলেন কী? আপনি না বললেন, সে ছিল রাজিয়া সুলতানা!’
‘নাম তো তাই বলেছিল।’
‘বেশ মজার তো!’
আকমল স্যার একদিন সাজ্জাদকে ডেকে বললেন, ‘শোনেন, আমি মেয়ের বাবার সাথে কথা বলেছি। ওঁরা রাজি।’
এরপর দুজন অন্ধকারে হাঁটতে লাগল। খলিশাকোটা গ্রাম থেকে কলেজের পথে। বেশ কিছুক্ষণ পর আকমল স্যারই মুখ খুললেন, ‘তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াল এই যে, সাজিয়া নামের মেয়েটা আপনার বাসায় গিয়েছিল রাজিয়া নাম ভাঙিয়ে। যে কিনা তার বড় বোন। এত নাম থাকতে সে ওই নাম কেন বলবে আপনাকে? আর কেনইবা সে যাবে আপনার কাছে?’
‘সেইটাই তো কথা।’
‘এই মিয়া প্রেম করেন নাই তো! এখন উল্টাপাল্টা বলে আমারে বেকুব বানাচ্ছেন!’
‘আরে ধুর, কী বলেন স্যার! আমি কি এতই সেয়ানা?’
‘কললিস্ট চেক করব?’
‘করেন। তবে আপনার জেনে রাখা ভালো, ওর কোনো সেল ফোন নাই।’
‘বলেছে আপনাকে?’
‘হুম।’
সেদিন আর কথা হলো না। এর পরের ঘটনা আরও নাটকীয়। আকমল স্যার একদিন সাজ্জাদকে ডেকে বললেন, ‘শোনেন, আমি মেয়ের বাবার সাথে কথা বলেছি। ওঁরা রাজি।’
‘রাজি মানে, কিসের রাজি?’
‘সাজিয়ার সাথে আপনার বিয়ের ব্যাপারে কথা বলেছি।’
‘স্যার, এটা কী বলেন!’
‘বেশি নাটক কইরেন না। আমি কিন্তু সব রাষ্ট্র করে দেব।’
‘কী রাষ্ট্র করবেন! আপনি কি রসিকতা করতেছেনৃ’
শেষমেশ সাজ্জাদকে বিয়ে করতেই হলো। এবং কন্যার নাম সাজিয়া সুলতানা। মা মারা যাবার পর তেমন কোনো আত্মীয়-পরিজন ছিল না সাজ্জাদের। আকমল স্যারই তার লিগাল বা ইলিগাল গার্জিয়ান। বিয়েটা হয়েছিল এক ঐতিহাসিক দিনে। সেদিন নির্বাচনে বিজয়ী দল শপথ নিয়েছিল সরকার গঠনের জন্য।
বাসর-রাতে সাজ্জাদ সাজিয়াকে একটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করে, ‘তুমি কি আগে কখনো আমার বাসায় এসেছ?’
‘কী বলেন, আপনার মাথা ঠিক আছে! আমি আপনার বাসায় আসব কেন?’
‘না, মানে কখনো পড়তে এসেছ কিনা।’
‘আপনি বাসায় ব্যাচ পড়ান?’
‘না তো।’
‘তাহলে?’
‘ও, তাই তো!’

মধ্যরাতের কথা
                                  

অনিকেশ দাশগুপ্ত
❑❑
আবেশ শব্দে লোভাতুর চাকা থাকে
গ্লাস ভরে ওঠে-তখন না এর দিকে
গল্প গড়িয়ে যায় প্রসঙ্গে দ্রৌপদী
সুনসান হাইওয়ে জানে হেনস্থার মাস্কারা;
অসুখ রপ্ত হওয়ার আগে বেড়ে গেছে
উদ্বৃত্ত খাবার, আত্ম সঙ্গ মুছতে অবচেতন
প্রেমে নিজেকে বিলিয়ে ফেলি,
পূর্ণাঙ্গ চাঁদের দিকে আমি
এক তর্জনীর সূক্ষ্ম
রুহ্-ছন্দ আমার প্রতিটি
দেহে আছড়ে পড়ে।

বাঙালির রক্তের বন্ধন ও জাতি-পরিচয়
                                  

॥ হাসান আলী ॥

বাঙালি একটি ভাষা-জাতির নাম, যেমন ছিল আর্যরা, ছিল দ্রাবিড়রা। ইতিহাসের নানা গ্রন্থিতে বাধা ডিঙিয়ে এই ভাষা-জাতির বিকাশ। এই বিকাশের ইতিহাস যেমন বিচিত্র, তেমনি দীর্ঘকালের। এই ভূখন্ডে বিকশিত জাতির পরিচয় খুঁজে বের করা এবং কালের পথ ধরে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস খুঁজে নেওয়া। আমাদের দেশটিকে আমরা যেমন চিনি তেমনি ভাষা-জাতি-পরিচয়ের সংকটে না ভূগে সত্যটা জানার চেষ্টা করাই মঙ্গল। সারা বিশ্বের মানুষকে অন্তত তিনটি মহাজাতিতে ভাগ করা যায়। যেমন, নিগ্রোয়েড, ইউরোপয়েড এবং মঙ্গোলয়েড। নিগ্রোয়েড মহাজাতিকে অনেক সময় নিগ্রোয়েড-অষ্ট্রালয়েড অথবা নিরক্ষীয় মহাজাতি বলা হয়।
আমরা নিরক্ষীয় অঞ্চলের মানুষ। আমাদের আদি পুরুষ নিরক্ষীয় বা নিগ্রোয়েড মহাজাতির মানুষ হবে এটাই স্বাভাবিক। এই নিগ্রোয়েড মহাজাতির দুটি শাখা –একটি আয়্রিকান ও আরেকটি মহসাগরীয় শাখাটিরই আরেক নাম অষ্ট্রালয়েড বা আদি-অস্ত্রাল। এর মধ্যে যেসব নৃজাতি-শাখা আছে তা হল-আন্দামানি , মেলানেশীয়, অষ্ট্রেলীয়, কুরিলীয় এবং শ্রীলঙ্কাবাসী।
শাখা জাতিগুলোর পরিচয় খুঁজলে দেখা যাবে এদের সাথে আমাদের রয়েছে বংশধারাগত সম্পর্ক। আন্দামানি মানে ভারত মহাসাগরের আন্দামান দ্বীপের অধিবাসী; মেলানেশীয় দ্বীপ-যেমন, সালোমন দ্বীপপুঞ্জ, ফিজি, সামোয়া, নিউক্যালি-ডনিয়া, টোঙ্গা, কুক আইল্যান্ড, ইষ্টার আইল্যান্ড প্রভৃতির আদিবাসীদের বোঝায়।
অষ্ট্রেলীয় বলতে বহিরাগত ইউরোপয়েড জাতির বসতি স্থাপনের আগে থেকে যেসব আদিবাসিন্দা অষ্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন তাদের বোঝায়। শ্রলঙ্কাবাসী বলতে আদি সিংহলী, যাদের অন্য নৃতাত্ত্বিক নাম ভেদ্দা, তাদের বোঝায়নো হচ্ছে। আর কুরিলীয় বলতে জাপানের উত্তর-পূর্বের কুরিল দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসিদের বোঝানো হয়েচ্ছে। সাংস্কৃতিক নৃতত্বের সূত্রে মাইক্রোনেশিয়া ও পলিনেশিয়া তথা প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত সকল দ্বীপেরই অধিবাসী অস্ত্রাল সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর এ সূত্রে বলা চলে বাঙালির আদি আত্মীয়তা পৃথিবীর সর্বাধিক বিস্তৃত নরগোষ্ঠীর সঙ্গে স্থাপিত। বাংলার পশ্চিম ও উত্তর প্রান্তিক অঞ্চলে যে সব উপজাতি যেমন-সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডা প্রভৃতি আমাদের আদিবাসীও বটে। এ গোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক নাম আদি-অস্ত্রাল বা ভেদ্দা। এটাই আমাদের প্রথম পরিচয়।
নৃতত্ত্ববিদরা মানেন যে এক সময় আদি-অস্ত্রালদের ব্যাপ্তি উত্তর ভারত থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের ইষ্টারদ্বীপ পর্যন্ত ছিল। ধারণা করা হয় আনুমানিক ৩০ হাজার বছর আগে প্রথম তারা ভারত থেকে অষ্ট্রেলিয়া মহাদেশে গিয়ে পৌঁছায়। এদের গায়ের রঙ ও গড়ন গঠনে প্রাচীন সাহিত্যে নিষাদ জাতির উল্লেখ দেখা যায় সে বর্ণনার সাথে এদের মিল পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক বা অন্য কোনো কারণে এই মূল জাতির এক শাখা ভারত-ভূমি ত্যাগ করে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সিংহল, ইন্দোনেশিয়া ও মেলানেশিয়া এবং অষ্ট্রেলিয়ায় যায়। এভাবে রক্তের বন্ধনে আমরা নিজেদের অজান্তেই বাঁধা আছি এশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিস্তীর্ণ জুড়ে। এই আদি নরগোষ্ঠীর সাথে যে সব জাতি বা শাখাজাতির মিশ্রণ ঘটেছে তার ধারাবাহিক ইতিহাস পাওয়া না গেলেও মোটামুটি একটা চিত্র পাওয়া যায়।
দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড়ভাষী জনগোষ্ঠী ইউরোপয়েড মহাজাতির ভারত-ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের একটি অন্তর্বর্তী দল। সম্ভবত আমাদের পূর্বপুরুষদের খাঁটি জাতি-চরিত্র প্রথম এদের সাথে সংমিশ্রণের ফলেই খোয়া যায়। বর্তমানকালে বাঙালির মূল বুনিয়াদ আদি-অস্ত্রাল ও দ্রাবিড়ভাষী ভূমধ্যনগরগোষ্ঠীর লোকদের সংমিশ্রণে গঠিত হয়েছিল। ভূমধ্যনগরগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য ; দীর্ঘ দেহ, পাতলা কেশ, চওড়া নাক, গাঢ় মধ্যমবাদামি রঙ, দীর্ঘ মাথা ইত্যাদি।
ঐতিহাসিককালের মঙ্গোলয়েড মহাজাতির মধ্যে এশীয়, ভোটব্রহ্ম, ভোট-চৈনিক, প্রভৃতির শাখার জনগোষ্ঠী এখানে আসে এবং এদের সাথেও  বাংলার আদিবাসীদের রক্তসম্পর্ক পর্যন্ত গড়ায়। উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ প্রান্তিক অঞ্চলের মগ, চাকমা, মুরং, কোচ, রাজবংশী, ত্রিপুরা, মারমা, প্রভৃতি উপজাতি এদেরই সাক্ষাৎ বংশধর। মঙ্গোলয়েড জাতির স্বকীয় বৈশিষ্ট ; হলুদ বা হলদেটে গায়ের রঙ, সোজা চুল, প্রকট গন্ডস্থি ও চ্যাপ্টা মুখ, চিকনচেরা চোখ এবং উর্ব্ধ অক্ষিপুটের প্রকট ভাঁজ, অনুচ্চ নাক, পাতলা ঠোঁট। এই তিন ধারার সংমিশ্রণেই শেষ নয়। সংমিশ্রণের প্রক্রিয়া চলেছে পৃথিবীর অন্যত্রও। সে সব জায়গায় নানান সহযোগি বর্গের নরগোষ্ঠীও এসেছে, মিসেছে এবং এভাবে আমাদের চেহারায় ও মানসে নতুন বৈশিষ্ট যোগ করেছে।
মানব সভ্যতার প্রচীন পর্বের শেষভাগে আর্যভাষী জনগোষ্ঠীর প্রভাব বাড়তে থাকে খুব বেশি। এরা ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে দিগি¦জয়ী মহাজাতি বলে এদের কোন শখা পারশ্যে, ভারতবর্ষে, আনাতোলিয়া-গ্রিসে সভ্যতা-সংস্কৃতির উচ্চতম শিখরে আরোহণ করেছিল বলে পরবর্তীকালের মানুষ নিজেদের আর্য বলে জাহির করতে চেয়েছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় হিটলার আর্যজাতি হিসেবে জার্মনদের শ্রেষ্টত্ব প্রমাণের জন্য ভয়ঙ্কর কান্ডই না করল।
আর্যভাষী জনগোষ্ঠী ইউরোপয়েড মহাজাতিরই একটি শাখা। আদিতে এরা ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগর তীরবর্তী দেশসমূহের মানুষ। অনেকের মতে এরা কৃষ্ণসাগর তীরবর্তী ককেশীয় মালভূমী অঞ্চল থেকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। আরও পরে ইউরোপয়েড ধারার সেমেটিক আরব, ভূমধ্যসাগরীয় পর্তুগিজ, নিগ্রোয়েড ধারার হাবশি বা মঙ্গোলয়েড ধারার দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর অল্পসল্প সংমিশ্রণও ঘটেছে। বাঙালির বিভ্রান্তিকর জনবৈচিত্রের মূলে এইসব মিশ্রণের ঘটনা।
যেমন চেহারায় ও আকারে বৈচিত্র, অন্যদিকে তেমনি মানসিকতায়ও বিভিন্নতা দেখা যায়। একই মনুষের মধ্যে পরস্পরবিরোধী মনোভাবও কোনো আকস্মিক নয়। ভাষাগোষ্ঠী আষ্টিকদের সারল্য ও জড়তা, দ্রাবিড়দের কল্পনাপ্রবণতা ও আলস্য, আর্যদের চিন্তা ও উদ্যেমশীলতা, ভোটচৈনিকদের দুঃসাহস ও নির্মমতা বাঙালির মনের মধ্যে আজও ক্রিয়াশীল।
এ প্রসঙ্গে সপ্তম শতকের চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং এর দেওয়া বাংলার বিভিন্ন জনপদের প্রকৃতি সম্পর্কিত বিবরণ উল্লেখ করা যায়। তার মতে কজঙ্গলের মানুষ স্পষ্টাচারী, গুণবান এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবান। পুন্ডবর্ধনের লোকেরাও জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধাবান; কামরূপের মানুষ সদাচারী হলেও হিংস্র প্রকৃতির; তাম্রলিপির লোকদের ব্যবহার রূঢ় হলেও তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুরাগী, কর্মঠ ও সাহসী; সমতটের লোকেরা কর্মঠ; কর্ণসুবর্ণের মানুষ ভদ্র, সচ্চরিত্র এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক।
এই বৈচিত্রা অতীত এবং বর্তমানেও সত্য। [ সূত্র : বাংলা ও বাঙালির কথা ]।

মোহময়ী পিরামিড
                                  

ধু ধু মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল অট্টালিকা। পথিক পথ চলে আর ভাবে কারা নির্মাণ করেছিল এই অট্টালিকা! কীভাবে নির্মাণ করেছিল! এটি কি মানুষের তৈরি নাকি অন্য কোন গ্রহ-নক্ষত্রের বুদ্ধিমান প্রাণী নির্মাণ করেছে এ পরম রহস্যময় কীর্তি! এ প্রশ্নের কোন শেষ খুঁজে পায়নি পথিক। যা নিয়ে কালে কালে রচিত হয়েছে অজস  কথা উপকথা। অবাক কৌতূহল নিয়ে মানুষ বারে বারে ছুটে গেছে তার পানে, তার নির্মাণ কাঠামো আর বিশালত্বের কাছে মাথা নুইয়ে এসেছে। তবুও বিস্ময়ের শেষ হয়নি। এটি আর অন্য কিছু নয় মিসরের পিরামিড। পিরামিড এমন এক স্থাপনা যার বিস্ময়ের বুঝি শেষ নেই।

পিরামিড শব্দটি প্রাচীন গ্রিকদের দেয়া নাম। গ্রিক ভাষায় পিরামিড শব্দের অর্থ হল খুব উঁচু। পিরামিড হল পাথরের তৈরি বিশাল সমাধি সৌধ। এ পর্যন্ত মিসরের প্রায় ৮০টি পিরামিড বা তার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে এবং প্রায় ৭০টি কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে। মিসরের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ ও আকর্ষণীয় পিরামিডগুলোর মধ্যে হচ্ছে ফারাও খুফুর পিরামিড, চেপরেনের পিরামিড, খাপরার পিরামিড, মেন কাউরার পিরামিড, তুতেন খামেনের পিরামিড। এসব বিখ্যাত পিরামিড মিসরের প্রাচীন রাজবংশের আমলে খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ থেকে ২৫০০ অব্দের মধ্যে স্থাপিত।

পিরামিডগুলোর মধ্যে যেটি সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে উঁচু সেটি মিসরের প্রাচীন রাজবংশের আমলে তৈরি হয়েছিল। এটি বর্তমান কায়রো শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে মরুময় গিজা অঞ্চলে অবস্থিত, বিখ্যাত ফারাও খুফুর পিরামিড নামে পরিচিত। ফারাও খুফুর পিরামিডটি নির্মাণ করেছিল বলে ঐতিহাসিকরা ধারণা করেন। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হল কীভাবে নির্মাণ কাজ সমাধা করা হয়েছিল। কত লোক লেগেছিল! তারা কত বছরের পরিশ্রমে এরকম একটি স্থাপত্য তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল!

গ্রিক দার্শনিক হেরোডোটাস মনে করেন, এ কাজে বিপুল সংখ্যক দাসকে নিয়োগ করেছিল ফারাওরা। তিনি এ সংখ্যাকে ১ লাখ বলে উল্লেখ করেন। আর ১ লাখ লোকের বিশ বছর লেগেছিল। মিসর বিষয়ক অধিকাংশ গবেষক হেরোডোটাসের বক্তব্য গ্রহণ করেছেন। তবে, পোলিশ আর্কিটেকচার ওয়েলসলো কোজিনাছকির ধারণা আরও বেশি। পিরামিডের মূল ক্ষেত্রে লোক লেগেছিল প্রায় ৩ লাখ। অফ সাইডে আরও ৬০ হাজার লোকের দরকার পড়েছিল। আবার গণিতবিদ মেন্ডেলসনের ধারণা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার লোকের ১০ বছর লেগেছিল পিরামিড তৈরির কাজে। কীভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল গ্রেট পিরামিড বা খুফুর পিরামিড এ ব্যাপারে বিভিন্নজন বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন। মিসর বিষয়ক গবেষক বারবারা মটের্জের ধারণা খ্রিস্টপূর্ব ২৬৮৭-২৬৬৭ সালে খুফুর পিরামিড নির্মাণ করা হয়। পিরামিড নির্মাণের জন্য বিপুল সংখ্যক পাথরের দরকার পড়েছিল। এক গ্রেট পিরামিড (সর্ববৃহৎ) তৈরির জন্য ২-২৮ মিলিয়ন ব্লক তৈরি করা হয়েছিল। কোন কোন পাথরের ওজন ছিল কয়েক টন পর্যন্ত। এত ভারি ভারি পাথর কীভাবে এত উপরে উঠানো হয়েছিল ভাবলে বিস্ময় লাগে। এক্ষেত্রে নানা মুনি নানামত দিয়েছেন।

বেশির ভাগ লোকের ধারণা ব্লকগুলো টেনে তুলে পিরামিড নির্মাণ কাজ হয়েছিল। গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোসের মন্তব্য হচ্ছে, পিরামিড নির্মাণ করা হয়েছিল সিঁড়ির মতো। স্টেডিয়ামের সিঁড়ির মতো ক্রমশ উঁচু সমান্তরালভাবে, প্রথম ধাপ সমাপ্ত হওয়ার পর শ্রমিকরা পাথর ও অন্যান্য উপাদান টেনে উপরে তুলত। যখন প্রথম ধাপের উপর বিভিন্ন উপকরণ তোলা শেষ হতো, তার পরের ধাপ নির্মাণ কাজে হাত দিত। এভাবে পর্যায়ক্রমে এক একটা ধাপ শেষে নির্মাণ হয়েছিল পিরামিড। এদিকে আরেক ইতিহাসবিদ ডায়াডোরাস সেকুলাসের মতে, সিঁডি নয় বরং ডালু পথে যাবতীয় উপকরণ টেনে তোলা হয়েছিল। আর এ কাজে ব্যবহারের পাথর টেনে তোলা হতো ৫০০ কিলোমিটার দূর থেকে। ডায়াডোরাস নিজেও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এত বড় বড় পাথর কীভাবে টেনে তোলা হতো। কারণ এ যুগের মতো তখনও টেনে তোলার মতো কোন মেশিন ছিল না। আরেক বিস্ময়ের ব্যাপার যে, এত বড় বড় স্থাপত্য দাঁড়িয়ে আছে বালির উপরে। হেরোডোটাস এবং ডায়াডোরাসের মতামতকে অবশ্য আধুনিক মিসর গবেষকরা খারিজ করে দিয়েছেন। বিশেষ করে ডায়াডোরাসের আরব থেকে পাথর নিয়ে আসার তত্ত্ব। যদিও তারা সিঁড়ির পর সিঁড়ি তৈরি করে তার উপরে পাথর তোলার তত্ত্ব বাতিল করে দিতে পারেননি।

পিরামিড নির্মাণে শক্ত পাথরের পাশাপাশি প্রচুর নরম চুনাপাথরের প্রয়োজন পড়েছিল। আর এজন্য পিরামিডের দূরেই স্থাপন করা হয়েছিল চুনাপাথর তরল করার ব্যবস্থা। পাথর গুঁড়ো করে তাতে জল মেশানো হতো। পানি নিয়ে আসা হতো নীল নদ হতে সরু নালা খনন করে। তরল চুনাপাথরের সঙ্গে এরপর মেশানো হতো নাইট্রান লবণ। আর এ লবণ পাওয়া যেত পাশের মরুভূমিতে। এরপর এর সঙ্গে চুন মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করা হতো যা ছিল পিরামিড তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এরপর সঙ্গে কষ্টিক সোডা, সিমেন্ট তৈরি করে রোদে শুকানো হতো। আর এভাবে তৈরি করা হতো চুনাপাথরের ব্লক। এই ব্লক সিঁড়ি কিংবা সিঁড়ির বিকল্প পথে টেনে তোলে সঠিক স্থানে বসানে হতো আর এভাবেই চুনাপাথরের ব্লক ও পাথর উপরে টেনে তুলে নির্মাণ হয়েছে অপর বিস্ময় পিরামিড।

আসলে পিরামিড কারা তৈরি করেছিল তা নিয়ে বহু মিথ প্রচলিত রয়েছে। তবে এ কথা সত্য যে মিসরের গ্রেট পিরামিড বা খুফুর পিরামিড নির্মাণ করেছিল ফারাও খুফুর। তবে সময়ের ব্যাপারটাও রহস্যাবৃত বলেই মনে হয়। খেয়ালি ফারাও সত্যি এটা নির্মাণ করেছিলেন কিনা তাতে সন্দেহ আছে অনেকেরই। হিসাব করে দেখা গেছে, পাহাড় থেকে কেটে চেঁছে একটার ওপর একটা পাথর এরূপ ২৩ লাখ পাথর দিয়ে পিরামিডটি নির্মাণ করতে সময় লাগবে ২ লাখ ৬০ হাজার দিন। তবে ফারাও কি ততদিন বেঁচেছিলেন। প্রশ্ন থেকেই যায়। এমনও তো হতে পারে খুফুর আগেই কেউ পিরামিডটির নির্মাণ কাজ শুরু করেছিল। সে নিজের কীর্তির কথা ঘোষণা করেনি। প্রাচীন মিসরের একটি পুঁথি আছে অক্সফোর্ডের কেডলেয়ার লাইব্রেরিতে। পুঁথির এক জায়গায় লেখা আছে, গ্রেট পিরামিডের নির্মাতা রাজা সুরিদ। পিরামিডটি নির্মাণ করে, পুরোহিতদের দিয়ে নিজ শাসন আমলে অনেক তথ্য তা নাকি পিরামিডের ভেতরে লুকিয়ে রেখে গেছে রাজা সুরিদ। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হল রাজা সুরিদের শাসনকাল ছিল মহাপ্লাবনেরও অনেক আগে। সুতরাং এর যথার্থতার প্রশ্নটি প্রচলিত মিথগুলোকে আরও পাকাপোক্ত করে দানা বাঁধতে সাহায্য করে।

অনেকেই আবার প্রশ্ন করে প্রাচীনকালে বৈজ্ঞানিক কাঠামোতে গড়া সুবিশাল পিরামিড তৈরি করা মানুষের দ্বারা সম্ভব নয়। এই পরম কীর্তি নির্মাণ করেছে অন্য কোন গ্রহ বা নক্ষত্রের জীবেরা প্রাচীন মিসরের পুঁথিগুলোতে এ প্রমাণ মেলে। মিসরীয়রা সূর্য দেবতার পূজা করত। সূর্য বা নক্ষত্র থেকে দেবতারা এসে মানুষকে শিখিয়ে দিয়েছিল পিরামিড তৈরির কৌশল, এমন মিথ ও প্রচলিত আছে যে, আসলে দেবতা-টেবতা নয়। তারা ছিল বহির্জাগতিক বুদ্ধিমান কিছু প্রাণী যারা প্রাচীন পৃথিবীতে এসেছিল আর নিজেদের সভ্যতার কিছু নিদর্শন পৃথিবীতে রেখে গেছে।

প্রাচীন মিসরীয়রা বিশ্বাস করত মৃত্যুর পর দেবতা আবার তাদের জাগ্রত করবে। তাই তাদের মৃতদেহকে পচনের হাত থেকে রক্ষা করার প্রয়োজন অনুভব করে। আর তাই নির্মাণ করে পিরামিড। রাজা খুফুও তার দেহ রক্ষার জন্য নির্মাণ করে বিশাল পিরামিড। প্রায় সাড়ে চার হাজার বছরের পুরনো গ্রেট পিরামিড বা খুফুর পিরামিডের উচ্চতা ছিল ৪৫০ ফুট, প্রতি সাইডে দৈর্ঘ্য ৭৭৬ ফুট।

খুফুর পিরামিডে অনেক কক্ষ বা চেম্বার রয়েছে। রাজা যেখানে অতিথিদের বসাতেন সেই কক্ষ বা গ্রান্ড গ্যালারির দৈর্ঘ্য ৮.৮৪ মিটার।  গ্রান্ড গ্যালারির পাশেই ছিল কিংস চেম্বার যেখানে রাজা খুফুর মৃতদেহ মমি করে রাখা হয় এবং পাশে ছিল কুইন্স চেম্বার।

প্রাচীন মিসরীয়রা প্রথাগতভাবে সমাধি সৌধের ভেতরে মৃতদেহ মমি করে রাখার সময় প্রচুর ধন-সম্পদ সঙ্গে দিত। তাদের বিশ্বাস ছিল পরকালে এই ঐশ্বর্যের প্রয়োজন পড়বে। এ ধন-ঐশ্বর্য আহরণের জন্যই হয়তোবা আরবের বাদশা হারুর-অর-রশিদ ৮২০ খ্রিস্টাব্দে খুফুর পিরামিডের অনুসন্ধান চালায়। মাটি খুঁড়ে ভেতরে প্রবেশ করার পর কিছুই খুঁজে পায়নি, এমনকি খুফুর মমিও না। তবে কোথায় গেল ফারাও খুফুর মমি? আর কোথাইবা গেল তার ঐশ্বর্য-ধনসম্পদ। আধুনিক মিসর বিশ্লেষকরা মনে করেন, প্রাচীনকালেই চোরেরা সব লুট করে নিয়ে গেছে। তবে প্রশ্ন হল কিভাবে চোরেরা প্রবেশ করল এই সমাধি সৌধে? এ প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে কি খুফুর প্রাচীন চোরদের ও আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিকদের মনে ব্যথা দিয়ে গেছেন তার নির্মিত পিরামিড পরম আশ্চর্যের কীর্তি হয়ে পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য। এ কথা শুধু ফারাও খুফুর আর ঈশ্বরই জানেন।  


-রফিকুল ইসলাম

৮২তম জন্মদিনে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত কবি আল মাহমুদ
                                  

স্বাধীন বাংলা ডেস্ক: বরেণ্য কবি, সমকালীন বাংলাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি ও কথাশিল্পী আল মাহমুদ তাঁর ৮২তম জন্মদিনে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হয়েছেন। কবি ভক্ত, বিভিন্ন সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিতে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।


জন্মদিন উপলক্ষে অনেকেই নিয়ে আসেন জন্মদিনের কেক, মিষ্টি, ক্রেস্ট ও বিভিন্ন উপহার সামগ্রী। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কবির বাসায় ভক্তদের ভিড় লেগেই থাকে। সকালে কবির বাসায় গিয়ে দেখা যায়, ফুলে ফুলে ভরে গেছে বসার কক্ষটি।

কবি আল মাহমুদ ফাউন্ডেশন নামের নবপ্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে আনুষ্ঠানিকভাবে কবির ফ্ল্যাটে বসার কক্ষে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। জন্মদিন উপলক্ষে খুব সকালেই কবি আসাদ চৌধুরী ও সাঈদ চৌধুরী কবিকে শুভেচ্ছা জানাতে চলে আসেন। তাদের সঙ্গে আসেন একদল কবি-সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী।

দুপুরের দিকে কবিকে শুভেচ্ছা জানাতে আসেন কিংবদন্তি গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার, চিত্রনায়ক উজ্জ্বল, কবি আবদুল হাই শিকদার, টিভি ব্যক্তিত্ব শরীফ বায়জীদ মাহমুদ, ড. মামুন আহমেদ প্রমুখ।

জন্মদিন উপলক্ষে কবি আল মাহমুদ তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘আমি খুবই কৃতজ্ঞ। দেশবাসী যে আমাকে ভুলে যাননি, আমার শুভাকাঙ্খিরা যে আমাকে ভুলে যাননি, তা দেখে আমি সত্যিই আপ্লুত। আমি সবার কাছে দোয়া চাই।

পাবনা বইমেলা সাহিত্যকে সম্মৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে
                                  

হাসান আলী

প্রতি বছর মাসব্যাপি পাবনা বইমেলা ও পুস্তক প্রদর্শনী আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সম্মৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলসহ পশ্চিম বাংলার সাথে সৃষ্টি করছে সাংস্কৃতিক বন্ধন। দীর্ঘদিনের বিভক্ত দুই বাংলার সীমানা পেরিয়ে লেখক, কবি, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের আগমনের ফলে নতুন মাত্রায় যোগ হবে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত। যার উপলক্ষ পাবনা বইমেলা। পাবনায় সর্বপ্রথম একুশে বইমেলা উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে ‘পাবনা বইমেলা’ শুরু হয়। এরপর থেকে গত ৫ বছর ধরে বইমেলার আয়োজন করে আসছে অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরী।
ঐতিহ্য সম্মৃদ্ধিময় পাবনা জেলায় বহুকাল আগে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অসংখ্য কবি সাহিত্যিকের আবির্ভাব ঘটেছে। যাদের অবদানে আমাদের সাহিত্য হয়ে উঠেছে সম্মৃদ্ধ। প্রতিবছর ভাষার মাসব্যাপি পাবনা বইমেলা আমাদের ভাষা, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বাঙালি জাতীয়তাবোধকে বিকশিত করার একটা উত্তম প্রেরণা যোগাচ্ছে। উজ্জীবিত হচ্ছে নবীন-প্রবীণ লেখক, সাহিত্যিক ও নতুন প্রজন্ম। পাবনা হয়ে উঠেছে সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। পাবনার আলো-বাতাসে ভাসে সত্যিজ্ঞানের আলো। সেই আলোয় আলোকিত হয় পাবনার মানুষের সাহিত্যমন।

পাবনায় অসংখ্য নদী, বিল, হাওড়, বাওড়, মাটি, জল, আলো-বাতাস, গাছ-পালা, পশু-পাখি, মসজিদ, প্রাচীন মন্দির, শিক্ষালয় ও স্থাপত্যশিল্প সাহিত্য বিকাশের যেমন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তেমনি এ জেলায় জন্ম নিয়েছে অসংখ্য কবি, সাত্যিতিক, শিল্পী, সাধক ও বাউল। তারাই গড়েছে সাহিত্যের গৌরবময় ইতিহাস। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুষ্টিয়ার শিলাইদহ থেকে পদ্মা ও ইছামতি নদী বয়ে শাহজাদপুর কুঠিবাড়ী যাতায়াতের ইতিহাস রয়েছে আমাদের সাহিত্যে। সাহিত্য ও সাংস্কৃতি গবেষণায় অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মঞ্চায়নে পাবনা বনমালী ইনস্টিটিউট (বর্তমান বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্র) এবং শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকুলচন্দ্র সৎসঙ্গ ধর্মজ্ঞান সাধনার একটি তীর্থস্থান।

বাংলা সাহিত্যে ইতিহাসের গর্ভে জন্ম নিয়েছে পাবনা জেলার অসংখ্য দেশ বরেণ্য শিল্পী-সাহিত্যিক। ইতিহাসের গর্ভে তাদের নাম মেলে। তাদের মধ্যে মধ্যযুগের অঙ্কুত আচার্য, উনবিংশ শতকের প্রথম দিকের কৃষ্ণকিশোর রায়, শশধর রায়, প্রসন্নময়ী দেবী, প্রমথ চৌধুরী, রজনীকান্ত সেন, প্রিয়ম্বদা দেবী, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, অম্বুজাসুন্দরী দাশগুপ্ত, রাধাচরণ চক্রবর্তী, আবুল হাশেম, বন্দে আলী মিয়া, মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, গুপ্তপ্রসাদ সেন, বিহারীলাল গোস্বামী, শচীন্দ্র মোহন সরকার, আবু লোহানী, শেখ আব্দুল গফুর জালালী, সৈয়দ আসাদউদ্দৌলা সিরাজী, জ্যোতি-রিন্দ্র মৈত্র, মণীন্দ্র রায়, বাণী রায় চৌধুরী, ওসমান, আব্দুল গণি হাজারী, মযহারুল ইসলাম, তরুণ সান্যাল, আনন্দ বাগচী, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, জিয়া হায়দার, জাহান-আরা বেগম, ওমর আলী, মহাদেব সাহা, ফজলে খোদা, মাকিদ হায়দার, জুল-ফিকার মতিন, দাউদ হায়দার প্রমুখ সাহিত্যিকদের নাম পাওয়া যায়। সাহিত্যের ক্ষেত্রে এঁদের বিশেষ অবদানে সম্মৃদ্ধি পেয়েছে পাবনা। এ বছর কবি ওমর আলী মরনোত্তর একুশে পদক (২০১৭) পাওয়ায় গর্বিত পাবনাবাসী।

বর্তমান পাবনায় লেখক ও সাহিত্যিদের মধ্যে বিশেষ করে যাদের নাম পাওয়া যায় তারা হলেন, সাইদ হাসান দারা, মজিদ মাহমুদ, খান সুরুজ্জামান, প্রফেসর মনোয়ার হোসেন জাহেদী, আখতার জামান, এনামূল হক টগর চৌধুরী, কবি সোহানী হোসেন, মানিক মজুমদার, মরিয়ম বেলারুশী, মোঃ সজীব আলী, আতাউর রহমান, আসাদুর রহমান রূপম, আল আমিন হোসেন খান, নিন্দুক বিশ্বাস, মোঃ মহসিন আলী, সিফাত রহমান সনম, সমীর আহম্মেদ, জুলকার নাঈন, শফিক লিটন, সমতোষ রায়, মুখলেছ মুকুল, গোবিন্দলাল হালদার,  রেহেনা সুলতানা শিল্পী, আলমগীর কবির হৃদয়, কথা হাসনাত, লতিফ জোয়াদ্দার, সরদার নজরুল, রিংকু অনিমেক, আদ্যনাথ ঘোষ, মেহজাবিন খান, সাহাব উদ্দিন আকাশ, খান আনোয়ার হোসেন, ক্যাপ্টেন (অবঃ) ডাঃ সারওয়ার জাহান ফয়েজ, এড. আজিজিুল হক, করুণা নাসরিন, আব্দুস সালাম, ইদ্রিস আলী, ইদ্রিস আলী মধু, মুহা. আব্দুস শুকুর, আছাদ আলী প্রমুখ সাহিত্যিকগণ কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, ঔপন্যাস ইত্যাদী সাহিত্য সাধনায় বিশেষ বিশেষ গুণের অধিকারী। শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকুলচন্দ্র একজন বড়মাপের সাধক ছিলেন। বাংলাদেশ ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে অগণিত ভক্ত তার।

সম্প্রতি পাবনার কয়েকজন লেখকের আলোচিত কিছু সংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ড. আব্দুল আলীমের পাবনা জেলা সম্পর্কিত গ্রন্থের মধ্যে ‘পাবনা অঞ্চলের লোক সংস্কৃতি’,‘বন্দে আলী মিয়া: কবি ও কাব্যজন’, ‘পাবনায় ভাষা আন্দোলন’, ‘সূচীত্রা সেন’, ‘মুক্তিযুদ্ধের কিশোর ইতিহাস: পাবনা জেলা’, ‘পাবনার ইতিহাস’, মোঃ জহুরুল ইসলাম বিশুর ‘পাবনা জেলার মুক্তিযুদ্ধের কথা’, রবিউল ইসলাম রবির ‘পাবনা ১৯৭১’ এবং সাইদ হাসান দারার ইতিহাস ভিত্তিক গবেষণাধর্মী ২৫ টি উপন্যাস গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে, ‘অপারেশন সার্চলাইট’, ‘উপাখ্যান: মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টো এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’, ‘১৯৭১: একটি পূর্ব ঘোষিত গণহত্যার ঘটনাপুঞ্জি’, ‘১৯৭১: দিনপুঞ্জি, ‘৭১ উপাখ্যান’, ‘সৈনিকটি এসেছিল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে’, ‘থিয়েটার:স্টার্ন রিয়েন ফোর্সমেন্ট’, ‘প্রণয়ে হলুদ উপাখ্যান’, ‘সাত বীর শ্রেষ্ট ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’। এর আগে প্রকাশিত হয়েছে রাধারমন সাহার ‘পাবনা জেলার ইতিহাস’। পাবনায় আরও অনেক লেখক, সাহিত্যিক আছেন তাদের নাম এবং প্রকাশিত গ্রন্থের তালিকা অল্প সময়ে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
বিগত বছর কয়েক পাবনা বইমেলা ও পুস্তক প্রদর্শনীতে লেখক, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ সর্বস্তরের শ্রেণি পেশার মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। রাজধানী ঢাকার পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে পাবনার এ বইমেলা। প্রতি বছরের মতো এবারের ২০১৭ এর বইমেলা ও পুস্তক প্রদর্শনী ভাষার মাসের প্রথম দিন থেকে আনষ্ঠানিক ভাবে শুরু হয়েছে। প্রতিদিন পাবনাসহ দেশ-বিদেশের মানুষ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বইমেলায় এসে নানা অনুষ্ঠান উপভোগ এবং পছন্দের বই সংগ্রহ করছেন।

এ বছর পাবনার স্থানীয় ৪ টি প্রকাশনী থেকে ৭৭ টি নতুন বই প্রকাশিত হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত প্রকাশনী মালিকগণ। এর মধ্যে মহীয়সী প্রকাশ ৪৫ টি বই, রূপম প্রকাশনীর ২৪ টি বই, উত্তরণ প্রকাশনীর ৭ টি বই, নীলাকাশ প্রকাশনীর ১ টি বই প্রকাশিত হয়ে পাবনা বইমেলার স্টলগুলোতে বিক্রি হচ্ছে। পাঠকেরা বিভিন্ন স্টল থেকে তাদের পছন্দের বই কিনছেন। প্রতিবছর বইমেলা ও পুস্তক প্রদর্শনীতে লেখক, কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ঔপন্যাসিকদের যেমন লিখনীর প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। তেমনি বই প্রকাশনার ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হচ্ছে। এবারের বইমেলায় পাবনাসহ বাংলাদেশ ও ভারতের নামি দামী লেখকদের প্রচুর বই স্টলগুলোতে বিক্রি করছেন স্টল মালিকেরা।

প্রতিদিন বিকেল থেকেই কবি, সাহিত্যিক, লেখক, লেখিকা, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী, ব্যবসায়ী, সরকারি, বেসরকারি চাকরিজীবী, স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীসহ সকল শ্রেণি পেশার মানুষের মিলনমেলা মহোৎসবে পরিণত হয়।

মেলা চত্বরে দেখা যায়, স্টলগুলোতে পাঠকদের বই কেনার ভিড়। বই কিনতে আসা কয়েকজন পাঠক এড. কামরুল হাসান বলেন, এবারের বইমেলায় স্টলগুলোতে মনে হচ্ছে বইয়ের সংগ্রহ কিছুটা কম এবং দামেও বেশি। একজন গৃহিনী সালমা খাতুন বলেন, পাবনা বইমেলা আমাকে বই কিনতে আকৃষ্ট করেছে। আমি তিন দিন মেলায় এসে পছন্দের বিশেষ করে ধর্মীয় বই কিনেছি।

কয়েকজন বইপ্রেমি বলেন, প্রতিবছর পাবনায় মাসব্যাপি বইমেয় নতুন ও পুরাতন সবরকম বই কেনার সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিগত বছরের তুলনায় এবারের বইমেলায় অনেক নতুন ও পুরাতন লেখকের প্রকাশিত বই পাঠকদের আকৃষ্ট করেছে। প্রকাশনীর নতুন বইয়ের প্রতি আমাদের আকর্ষণ বেশি। আমরা বইমেলায় এসে অনেক সময় ঢাকার প্রকাশনীর কোন কোন নতুন বই পাই না। ঢাকার প্রকাশনীর নতুন বই যাতে পাবনা বইমেলার স্টলগুলোতে পাওয়া যায় সে দিকে মেলা কর্তৃপক্ষের গুরুত্ব দেওয়া সুপারিশ করেন তারা।

বইমেলায় স্টল মালিকদের মধ্যে পাঠশালা বইঘর মালিক শিশির ইসলাম, বিকিনিকি মার্ট বইঘরের মালিক মোস্তাফিজুর রহমান আরজু, প্রজন্ম একুশে বইঘরের মালিক সামসুল সাব্বির, আলোক বর্তিকা পাঠচক্র বইঘর মালিক সুবর্ণা নদী বলেন, এবারের বইমেলায় গণিত বিজ্ঞান, বিদেশি বইয়ের বাংলা অনুবাদ, সায়েন্সফিকশন, ডিটেকটিভ, প্রবন্ধ ও গবেষণামূলক বইয়ের পাঠকদের চাহিদা বেশি। সেই সাথে শিশুদের বই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে।
প্রতিদিন বিকেল থেকে মেলা মঞ্চে শুরু হয় শিশু শিল্পীদের নৃত্য ও সংগীতানুষ্ঠান। রাত ৮ টা হতে শুরু হয় বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক আলোচনা সভা। এ সভায় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক-ছাত্র, সরকারি, আধা-সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিগণ আলোচনা সভায় অংশ নেন। সভায় সঞ্চলনার দায়িত্ব পালন করেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও বাংলাদেশ স্টাটিজ বিভাগের চেয়ারম্যান ও বইমেলা উদযাপন পরিষদের সহ-সভাপতি ড. মোঃ হাবিবুল্লাহ এবং এড. মোসফেকা জাহান কণিকা। সঞ্চালকগণ আলোচনা সভায় চমৎকার উপস্থাপন করেন। আলোচনা পর্ব শেষে সংগীতানুষ্ঠান ও পরে নাট্য প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগীতা, অভিনয় ও সুন্দর হাতের লেখা প্রতিযোগীতার মধ্যদিয়ে দিনের কর্মসূচী সমাপ্ত হয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন বইমেলা সাংস্কৃতিক উপ-কমিটির আহ্বায়ক সংগীত শিল্পী প্রলয় চাকী। প্রতিদিনের আলোচনা সভায় সর্বশ্রেণি পেশার প্রতিনিধিসহ গুণিজনদের আগমনের জন্য আরও উম্মুক্ত করার ব্যাপারেও সুপারিশ করেছেন অনেকে।

বইমেলা সম্পর্কে সাবেক পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক (৭২-৭৫) ও বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা আ,স.ম. আব্দুর রহিম পাকন অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লইব্রেরীর মাসব্যাপি বইমেলার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, নিঃসন্দেহে বইমেলা পাবনার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিকে সম্মৃদ্ধ করেছে। বইমেলায় প্রতিদিনের সন্ধ্যাকালীন আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ভাল লাগে তাই প্রায়ই এ অনুষ্ঠান দেখতে যাই। তিনি বলেন, স্থানীয় সংগীত শিল্পীদের গান ভাল লাগে। প্রতিদিনের আলোচনা সভায় পাবনার বাইরের বিজ্ঞজনদের অংশগ্রহণ করালে আরও ভাল হতো। তিনি মেলা চত্বরের জায়গা স্বল্পতায় দর্শক-স্রোতাদের সমস্যার কথা উল্লেখ করে শৃংখলা বজায় রাখার জন্য দুই চাকা প্রবেশ করতে না দেয়ার সুপারিশ করেন।
একই ভাবে পাবনা চেম্বার অব কমার্সের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সাংস্কৃতিক কর্মী মাহবুব-উল-আলম মুকুল ভাষার মাসব্যাপি বইমেলা ও পুস্তক প্রদর্শনীর প্রথম উদ্যোক্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, তাদের আয়োজনে প্রথম বইমেলার ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর বইমেলায় দিনে দিনে পাঠকদের আগ্রহ বাড়ছে, নতুন প্রজন্মকে উৎসাহ ও আগ্রহ বিকশিত হচ্ছে। তিনি বর্তমান বইমেলা উদযাপন পরিষদকে ধন্যবাদ জানিয়ে বইমেলায় আলোচনা সভায় দেশের বড় মাপের লেখক, সাহিত্যিক, গবেষক ও গুণি ব্যাক্তিদের আগমন ঘটাতে এবং আগামী বছর হতে মুক্তমঞ্চের পরিবর্তে বড় কোন স্থানে মেলার আয়োজন করার সুপারিশ করেন। বইমেলা সাংস্কৃতিক উপ-কমিটির আহবায়ক প্রলয় চাকী বলেন, গত বছর বইমেলায় পশ্চিম বাংলার বেশ কয়েকজন লেখকের একটি টিম এসেছিলেন।

পাবনার ঐতিহ্যবাহী অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরীর উদ্যোগে প্রতিবছর মাসব্যাপি বইমেলা ও সপ্তাহব্যাপি পুস্তক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। শহরের আব্দুল হামিদ সড়কে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী এই লইব্রেরীর সামনেই বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল পৌর মুক্তমঞ্চ চত্ত্বর। এর সাথেই পশ্চিমে বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্র অবস্থিত। পৌর মুক্তমঞ্চ চত্ত্বরে বইমেলার প্রস্তুতি অন্তত দু’ একমাস আগে থেকেই নেওয়া হয়। বইমেলাকে স্বার্থক ও সফল করার জন্য মেলাচত্ত্বরে বইয়ের স্টল তৈরি, মঞ্চ তৈরি, প্রতিদিনের অনুষ্ঠানসূচী কী হবে তার পরিকল্পনা তৈরি করে থাকে অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরী কর্তৃপক্ষ ও বইমেলা উদযাপন পরিষদ।

প্রতিদিনের নানা অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বইমেলা উদযাপন পরিষদকে উপ-কমিটি সহযোগীতা করে থাকে। বইমেলার মূলকৃতিত্ব অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লইব্রেরী কর্তৃপক্ষের। পাবনা অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরীর বর্তমান সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু এবং মহা-সচিব পাবনার বিশিষ্ট সাংবাদিক আব্দুল মতীন খান। তিনি পাবনা সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি এবং বিটিভি পাবনা প্রতিনিধি এবং স্থানীয় দৈনিক জোড় বাংলা’র সম্পাদক। বইমেলা উদযাপন পরিষদের সভাপতি প্রফেসর শিবজিৎ নাগ এবং সাধারণ সম্পাদক মোঃ আব্দুল হান্নান। প্রফেসর শিবজিৎ নাগ পাবনা প্রেসকাবের বর্তমান সভাপতি। আব্দুল হান্নান পাবনা বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক। তিনি একজন সাংস্কৃতিমনা মানুষ।

পাবনা বইমেলার সার্বিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বইমেলা উদযাপন পরিষদের সভাপতি  প্রফেসর শিবজিৎ নাগ এবং সাধারণ সম্পাদক মোঃ আব্দুল হান্নান বলেন, বিগত বছরের তুলনায় এবারের বইমেলার অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এবার মেলাচত্বরে ৩৩ টি বইয়ের স্টল স্থাপন করা হয়েছে। পাবনার বিভিন্ন এলাকার ১১০টি সাংস্কৃতিক সংগঠন বইমেলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছে। বিগত বছরের তুলনায় দর্শণার্থীদের ভীঁড়ে জমে উঠেছে এবারের বইমেলা। আগামীতে বইমেলা আরও সুন্দর করার পরিকল্পনা আছে বলে জানান বইমেলা উদযাপন পরিষদের এ দুই শীর্ষ কর্তা।
পাবনা বইমেলার সাথে জড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরী ও বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্র দু’টি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু পাবনার অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরী এবং বনমলী শিল্পকলা কেন্দ্রের সভাপতি। তিনি পাবনা বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্রকে একটি আধুনিকমানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে নতুন আঙ্গীকে গড়েছেন। সেই সাথে পাবনার সাংস্কৃতিক অঙ্গণকে বিকাশের পথে এগিয়ে নিতে অসামান্য অবদান রেখে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে তার পিতা স্যামসন এইচ চৌধুরী অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরীর পুরাতন ভবন ভেঙে সেখানে উন্নত মানের বহুতল ভবন নির্মাণ করে ঐতিতিহ্যবাহী এ লাইব্রেরীর উন্নয়ন সাধন করে গেছেন। তিনি পাবনাবাসীর কাছে কৃতজ্ঞতার সাথে চির স্মরনীয় থাকবেন। নতুন প্রজন্মকে সত্য জানার জন্য সাংস্কৃতিক অঙ্গণে স্কয়ার পরিবারের অবদান উল্লেখ করার মতো।

কেবল বাদ পড়েছে ‘পাবনার ইতিহাস ঐতিহ্য বহনকারী ‘ইছামতি নদী’র সংস্কার। যে নদীতে পাবনা জেলা ও শহরের গুরুত্ব এবং সৌন্দর্য্য লুকিয়ে আছে। পাবনা শহর গড়ে উঠেছে যে নদীকে কেন্দ্র করে, সেই ইছামতি নদী ভাগাড় বা নরদামায় সরু খালে পরিণত হয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য বিগত কয়েক মাস আগে পাবনার সর্বস্তরের মানুষ আন্দোলন করে ‘ইছামতি নদী উদ্ধার আন্দোলন’ নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে। তারা ১০ দয়া বাস্তবায়নের দাবীতে মনববন্ধন ও প্রচারপত্র বিলিসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করে। এ আন্দোলন সমর্থন করে বর্তমান দায়িত্বরত পাবনা জেলা প্রশাসক রেখা রানী বালো নদীটি সংস্কার করার জন্য পাবনাবাসীকে এগিয়ে আসার আহবান জানান। নদীটি সংস্কার করা হলে পাবনার সোন্দর্য্যবৃদ্ধিসহ সাহিত্য ও সাংস্কৃতি বিকাশে  গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এমন মনে করেন সচেতন মহল।

প্রসঙ্গ: ঐতিহাসিক জ্বীনের মসজিদ
                                  

কথিত আছে প্রায় দু’শ বছর পূর্বে জ্বীনেরা নিজেরাই শ্রমিক সেজে গভীর রাতে এক যোগে হাজার হাজার জ্বীন কাজ করে নির্মাণ শৈলীসহ এই মসজিদটি এক রাতেই নির্মাণ করে ফেলেন। পুরানো এই মসজিদের ইতিহাস ঐতিহ্য বলতে গিয়ে এলাকার বয়োজৈষ্ঠ্যরা এমনটাই বলেছেন বলে দাবী বর্তমান প্রজন্মের। এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা য়ায়, এলাকাটি একটি উঁচু ও পিরামিড আকৃতির ছিলো। বন জঙ্গলের মধ্যেই ছোট্ট একটি মসজিদ ঘর নির্মাণ করে এলাকার মানুষ নামাজ আদায় করতো। কিন্তু হটাৎ এক দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মানুষজন দেখতে পান এক রাতের মধ্যে এই নির্মাণ শৈলীসহ মসজিদটির নির্মাণ কাজ শেষ করেন জ্বীনেরা। ফলে পরের দিন হটাৎ মাটির উপরে এই মসজিদটি দেখতে পান এলাকাবাসী। জনশ্রুতি আছে, সে সময়ে মসজিদ দেখতে এবং সেখানে নামাজ আদায় করতে দুর-দুরান্ত থেকে মুসল্লিরা আসতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে দিনের পর দিন মসজিদটি সংস্কার কাজে হাত দেয়নি কেউই। কারন হিসেবে এলাকাবাসীরা জানান, যেহেতু মসজিদটি নির্মাণ করেছে জ্বীন, তাই তারাই এই মসজিদের দেখভাল করেন। প্রয়োজনে জ্বীনেরাই মসজিদের সংস্কার কাজ করে দিবেন। এই ভ্রান্ত ধারণা থেকেই নিরব থাকেন এলাকাবাসী। ফলে এভাবেই কেটে যায় প্রায় দুই’শ বছর। ধীরে ধীরে এক সময় মসজিদের নির্মাণ শৈলীগুলিও বিলীন হতে থাকে। ভেঙে যেতে থাকে কথিত জ্বীনদের হাতে গড়া কারুকার্যপূন্য এই মসজিদটির নির্মাণ শৈলীগুলো। দিনের পর দিন বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও মসজিদের সংস্কার করা হয়নি। এভাবেই কেটে যায় শত বছর বয়সী এই পুরনো মসজিদটির দিন। মসজিদে নামাজ আদায়কারী মুসল্লীদের সংখ্যাও কমতে থাকে ধীরে ধীরে। এই মসজিদটির সামনেই মাত্র ১’শ গজ পূর্বে সেই সময় নির্মান করা হয়েছিল একটি মসজিদ। যা এখনও রয়েছে। এত বড় একটি মসজিদ এখানে কথিত জ্বীনেরা নির্মাণ করে দিলেও আজো স্মৃতি সরুপ মানুষের হাতে গড়া ছোট্ট সেই মসজিদ এখনও ভেঙ্গে ফেলেননি এলাকাবাসী। কথিত এই জ্বীনের মসজিদটি দেখতে হলে যেতে হবে ঠাকুরগাঁও জেলা শহর।  পঞ্চগড়-ঠাকুরগাঁও মহাসড়কে ঠাকুরগাঁও থেকে ১২ কিলোমিটার অতিক্রম করে ভুল্লী বাজার নামক স্থানে নেমে পাঁচপীর অভিমুখে রওয়ানা দিয়ে মাত্র ৭ কিলোমিটার রাস্তা গিয়েই ছোট বালিয়া ঐতিহাসিক জামে মসজিদটি চোখে পড়বে। এই ছোট্ট মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা বালিয়া চৌধুরী পরিবারের প্রথম পুরুষ হাজী মেহের বকস চৌধুরী। এই চৌধুরীর পুত্র মরহুম বসরত আলী চৌধুরী। তারই সুযোগ্য কন্যা বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি মেহের বকস চৌধুরীর দৌহিত্র আলহাজ তসবিফা খাতুন। মসজিদটি ভেঁঙ্গে জরাজীর্ন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তিনি পরবর্তীতে পুনরায় ১৯ নভেম্বর’ ২০১০ সালে ইতিহাস ঐতিহ্য’র এই জামে মসজিদটির সংস্কার কাজ শুরু করেন। এদিকে ঠাকুরগাঁও জেলা পরিষদ প্রশাসক মুহ: সাদেক কুরাইশী এর সৌজন্যে ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ইতিহাস ঐতিহ্য’র জামে মসজিদটির পার্শ্বেই এক লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ওযুখানা। ঠাকুরগাঁও জেলার সদর উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের ছোট বালিয়া গ্রামে ইতিহাস ঐতিহ্য’র এই জামে মসজিদটি কথিত জ্বীনেরা নির্মাণ করে দিয়েছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। জনশ্রুতির এই গল্প মানুষের মুখে শুনে এখনও প্রতিদিন দুর-দুরান্ত থেকে শতশত মানুষ ভীড় করে অপরুপ এই মসজিদটি দেখতে। স্থানীয় কিংবা জেলা শহর থেকে ছেলে-মেয়েরা ছুটে আসে মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের সেলফি কিংবা ফটো তুলতে। গত ৬ জানুযায়ী মসজিদটির দেখতে গিয়ে দেখা মেলে বেশকিছু ছেলে-মেয়েদের সাথে, তারা নিজেদের ছবি তুলছে মসজিদের সাথে দাঁড়িয়ে। তাদের সাথে কথা হলে এই প্রতিবেদককে তারা জানান, যদি ইতিহাস ঐতিহ্য’র এই মসজিদটি হারিয়ে না যায়, তাহলে আরো হাজার বছর দাঁড়িয়ে থাকবে এই মসজিদ। তাই তারা সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, সরাসরি সরকার এর দায়িত্ব নিয়ে এবং সরকার পৃষ্টপোষেক ভূমিকায় মসজিদটি সংস্কার করা হলে ইতিহাস খ্যাত কথিত জ্বীনের এই মসজিদটির আরো নির্মাণ শৈলী করে গড়ে তুলে হাজার হাজার বছর বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। স্থানীয় বাসিন্দারা একই সুরে বলেন, শত বছর বয়সী অপরুপ এই জামে মসজিদটি এখন রক্ষা করা এ প্রজন্মের প্রাণের দাবী। যেন যুগের পর যুগ ধরে এই মসজিদটি দাঁড়িয়ে থেকে কালের স্বাক্ষী হয়ে রবে হাজারো বছর ধরে।
লেখক -সাংবাদিক

তেহরানে প্রথম বিশ্বের স্বাধীনতাকামী আন্দোলন
                                  

স্বাধীন বাংলা ডেস্ক: ১৯৮০ সালের আজকের এ দিনে ইরানে রাজধানী তেহরানে প্রথম বিশ্বের স্বাধীনতাকামী আন্দোলনগুলোর সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। এই সমাবেশে বিশ্বের স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের সাথে জড়িত ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত হয়েছিলো। ইরানের ইসলামী বিপ্লব সর্ম্পকে বিশ্বের স্বাধীনতা আন্দোলনকারীদের গভীর ধারণা দেয়াই ছিলো এই সমাবেশের মূল উদ্দেশ্য। এ ছাড়া সাম্রাজ্যবাদীদের মোকাবেলায় স্বাধীনতাকামী আন্দোলন গুলোর মধ্যে গভীর ঐক্য গড়ে তোলাই ছিলো এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য।

একলা মানুষ
                                  

অনিকেত রাজেশ

আমিও খুব একলা মানুষ
অনেক অনেক লোকের মাঝে;
ভিড়ের ভেতর হারাই যখন
আরও বেশি একলা লাগে।

একলা থাকার খুব সুবিধা;
যেমন তেমন চলাফেরায়
কেউ তোলে না বাঁধার দেয়াল,
ভুলত্রুটিতে কেউ বকে না,
কেউ রাখে না তীক্ষ্ণ খেয়াল।
জ্বরে পড়ে শুয়ে থাকলেও
কপালে কেউ হাত রাখে না
রুটিন মেনে ওষুধ খাবার
কোনরকম চাপ থাকে না।

আমি তো এক ভিড়ের মানুষ; তেমন করে
আমার আপন স্বত্বাটাকে কেউ বোঝে না

কখনো-বা নিজের কাছেও খুব অচেনা,
মাঝে মাঝে মনের মাঝে মন থাকে না।
অভিমানের পারদটাকে নামিয়ে দিতে
একটুখানি স্নেহের পরশ কেউ যাছে না।

নিজের মাঝেই একাকীত্ব ঢেকে রাখি,
শূন্যতাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকি।
একলা মানুষ কেমন থাকি
কেমনে বাঁচি-- কার তাতে কী?

নৈশভোজে আসছিস্ তো
                                  

বিদ্যুৎ ভৌমিক

শুভদ্র দুপুর ; তদানুরূপ এখানে স্মৃতি চাঁদ জ্বলছে
বৃন্তচ্যুত বৃষ্টির গতিবন্ধ মেঘ — দু’চোখের দরজা ভাঙে খিল
ওই হলুদ গেঞ্জির ভেতর বন্ধু তোমার গদ্যময় ফুসফুস
সেখানে অশ্রুময় বাতাস – বাতাস অন্ধকারে
আঁকা ছিল পচাগলা এক ভারতবর্ষ !
শেষবার গোল চক্রযানে চলে যাবার সময়
বলার ইচ্ছে কী ছিল ; নৈশভোজে আসছিস্ তো বিদ্যুৎ ?
মাটির গন্ধ মেখে শ্মশান ডাকে আয় – আয় – আয় চলে আয়
কবিতার নীরব জমিতে তুমি রোজ হেঁটে যেতে
আর পত্রিকা – মালার গভীরে স্মৃতির কালো বর্ণমালাগুলো
দধীচির হাড়ের মতো বেমালুম শক্তকণ্ঠে উচ্চারিত হ’তো
আর প্রত্যন্ত অন্তস্থল থেকে বলে উঠতো আমার আমিত্ব, —
ভালো – বেশ – ভালো ” !!

স্বপ্ন ছিলো
                                  

-সৈয়দ শরীফ

স্বপ্ন ছিলো আকাশ হবো মাখতে গায়ে নীল,
আমার মাঝে উড়বে হেসে নানান শঙ্খচিল !
স্বপ্ন ছিলো নদী হবো পদ্মা-মেঘনার মতো,
আমার কোলে ধরবে যে মাছ জেলে আছে যতো ।

স্বপ্ন ছিলো বৃক্ষ হবো বিরাট আকার হয়ে,
আমার তলে আসবে সবাই রোদ-বৃষ্টির ভয়ে ।
স্বপ্ন ছিলো সবুজ মাঠে- হবোই পাকাধান,
আমায় পেয়ে গাইবে কৃষক নবান্নেরও গান।

স্বপ্ন ছিলো সন্ধ্যায় হবো ভূতুমপ্যাঁচার ডাক,
আমার ভয়ে ডাকবে না আর- সব পাখি ও কাক।
স্বপ্ন ছিলো আঁধারে হবো রঙিন সুদর্শন,
আমার ঝলকে থাকবে না আর আঁধারও বর্ষণ।

স্বপ্ন ছিলো ডাকবো যে রোজ কোকিল পাখির মতো,
আমার ডাকে সবার ঘুমই করবে মাথা নতো !
স্বপ্ন ছিলো সবই হবো এই পৃথিবীর মাঝে,
মানুষ হয়ে সে-সব তো আর হতে পারলাম না যে।

ফেরা
                                  

তরিকুল জনি

অনেক দিন পর সুনসান গ্রামটা আজ সকালেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। অন্ধকারকে মাড়িয়ে, ভোরে যতটা তাড়া ছিল পূব-আকাশে সুর্য উঠার, তারচে বেশি তাড়া গ্রামেও মানুষজনের। যা কেউ ভাবিনি তাই ঘটে গেলো আজ গাইদগাছি গ্রামে। সবাই ছুটছে হামিদের বাড়ি। এই সাত সকালে কারো কোথাও কাজ নেই। সব কাজ যেনো থমকে গেছে। হামিদের বাড়ি যেন কী একটা ঘটেছে। কী একটা সংবাদে সবাই ছুটছে। পাড়ার কোনো কোনো মহিলা স্বামীর কোল থেকে উঠে ব্লাউস ছাড়া শাড়ি কোনো রকমে দেহে পেচিয়ে ছুটেছে হামিদের বাড়ি। কারো বুকের দুধ খাওয়া শিশু কাঁদছে সে দিকে খেয়াল নেই। কারো তিন বছরের বাচ্চা শাড়ির আঁচল ধরে মায়ের পেছন পেছন ছুটছে। শুধু কি পাড়ার মহিলারা ছুটছে ! কোনো কোনো বাড়ি থেকে পুরুষরাও যাচ্ছে। যার ঘুম আগে ভাঙছে সেই যাচ্ছে। এ যেনো ঘুম থেকে উঠেই হামিদের মুখ দর্শন।

হামিদ বসেছিল বারান্দায়। সে সচরাচর এত ভোরে ঘুম থেকে ওঠে না। তার আলফা সিগারেটমিলে নাইট ডিউটি থাকে। রাত একটা দুইটার দিকে বাড়ি ফিরতে হয়। তাই সে ভোরে ঘুম থেকে উঠতে পারে না।
ডাবকুলের মত তার চোখ দুটো ফোলা। রাতেও ঠিক মত ঘুম হয়নি। সাধারণত শেষ রাতের দিতে তার গাঢ় ঘুম আসে। আজ শেষ রাতে সে ঘুমাতে পারেনি। যখন ঘুম চোখে বসতে যাবে ঠিক তখন মেয়ে আবেদা ফিরে আসে।
‘ও আব্বা ও আব্বা...’ বলে ঘরের দরজা ধাক্কায়।
অনেকটা ঘুমের ঘোরে সে দরজা খোলে। যতটা ঘুম বসেছিল তার চোখে ততটা ঘুম উধাও হয়ে গেলো মেয়েকে দেখে। মেয়েটা হাওমাও করে কেঁদে বাপের বুকে ঝাপিয়ে পড়ে।
হামিদ যেনো কিছুই বুঝতে পারে না। তার মুখে কোনো কথা নেই। শুধু মেয়েটার হাত ধরে ভিতরে এনে খাটের উপর বসায়। কোনো কিছুই সে জানতে চায় না। মেয়েকে ফিরে পাওয়ায় যেনো তার সব প্রশ্নর উত্তর পাওয়া। তাই সে কোনো কিছু জানার প্রয়োজন বোধ করে না।
কিন্তু ভোরের আলো ফুটে উঠতে উঠতেই সে অনেক কিছু জেনে যায়। মেয়ের উপর যে সব ঝড় বয়ে গেছে সেটা শুনেই সে আরো চুপ হয়ে যায়। স্তব্ধ নিঃসাড় হয়ে যায় তার ঠোঁট। গত রাতে সে যা খেয়েছিল তা যেনো হজম হয়নি। মাঝে মাঝে টক ঢেঁকুর উঠছে। একটু পানি খেতে পারলে হতো। কিন্তু সেই পানিও খেতে ইচ্ছে করছে না।
 
আলেফ এ গ্রামে ছিল না। সে ছিল হাটখোলা বাজারে। তার বড় খালার অসুখ। এখন যায় তখন যায়-অবস্থা। খালা আর বাঁচবে না। চারটা ঝোলসহ রসগোল্লা নিয়ে সে বড় খালাকে দেখতে গিয়েছিল। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই সরাসরি চলে আসে মাঠে। সে গ্রামে ঢুকিনি। তাই গ্রামের কোনো সংবাদ তার কাছে নেই।

আলেফ খবরটা প্রথমে শোনে নুরুর মুখে।
নুরুই আলেফকে বলে “এ আলেফ কোনো খবর শুনিছিস, আবেদা ফিরে আয়ছে। আজকের বিহান বেলায় বাড়ি আয়ছে।”
আলেফ কোনো কথা বলছে না, সে গরু তাড়াচ্ছে। চাষ ঠিক মত করতে পারছে না। মাটি শক্ত হয়ে গেছে। শুকিয়ে একেবারে পাথর হয়ে গেছে। লাঙ্গলের ফালা মাটির ভেতর ঢুকছে না। সূর্য মাথার উপর উঠে যাচ্ছে-রোদের তেজ বেড়ে যাচ্ছে। সকাল সকাল চাষ না হলে -এ জমি আর চাষ হবে না। শালার রোদের তেজ বেড়ে গেলে মাঠে আর থাকা যায় না। রোদ তো নয় যেনো দজোকের আগুন।
নূরু আবার বলে, “কি রে আলেফ তুই খুশি হসনি”
আলেফ তার বুক ভরা ক্রোধে ফেঁটে পড়ছিলো। সব রাগ যেনো পড়লো গরুর উপর। সে মোটা কুঞ্চির লাঠি দিয়ে গরুর পিটে বাড়ি দিলো। শালার গরুও ঠিক মত কথা শোনে না। দ্বিতীয়বার বাড়ি দিয়ে বললো, “ হাঁট হুট ডানি ডানি-বা-বা।”
তারপর বা হাত দিয়ে গরুর লেজ মুড়িয়ে ধরে। গরু এবার ছুটতে থাকে।
কিছুণ ছুটার পর আবার থেমে যায়। না, হারামির গরু নিয়ে আর হলো না।
আলেফ গরু দুটো দাঁড় করিয়ে খেজুর গাছের তলে বসে। মাথা থেকে গামছাটা খুলে মুখটা মোছে।
এতণ নুরু কাঁছি দিয়ে জমির আগাছা কাটছিল। মাঠ ভর্তি শেয়াল কাঁটা। সেগুলো কাটতে-কাটতে বেশ কয়েকটা কাঁটা হাতে ফুটে গেছে। নুরু শেয়াল কাঁটার গাছ কাটা বন্ধ করে এসে আলেফের পাশে বসে।
আলেফের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে, হাতে গেঁথে যাওয়া কাঁটা নোখ দিয়ে তুলতে তুলতে বলে, “এই আলেফ শুনিছিস আবেদা ফিরে আয়ছে।”
আলেফ আকাশের দিকে তাকালো। রোদ দেখলো- না কী আবেদার কথা ভাবলো তা ঠিক বোঝা গেলো না। সে লুংগির গিট থেকে বিড়ি আর ম্যাচ বের করে, বিড়ি ধরিয়ে -দুই টান দিয়ে খুক খুক করে দুটো কাশি দিয়ে বলে,“ আবেদা ফিরে আয়ছে তা দিয়ে আমি কিয়ারবো। সে আমার কিডা ?”
নুরু আলেফের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আকাশের সূর্য যতটা লাল না - তার চেয়ে বেশি লাল আলেফের চোখ দুটো। নাক-মুখ দিয়ে বিড়ির ধোঁয়া বের হচ্ছে। আর তার চোখ আস্তে-আস্তে গাঢ় লাল হয়ে যাচ্ছে।
নুরু আবার বলে, “ও বলে আর স্বামীর বাড়ি ফিরে যাবে না। কি বলে গন্ডগোল হয়ছে। ওরে বলে ভারতে বিক্রি করে দিলো। বোম্বেরতে পালায় আয়ছে।”
আলেফের মুখে চিন্তার ছাপ পড়ে গেলে। অনেক কথা জমা হতে থাকে-তার বুকে; কিন্তু মুখ ফুটে কিছুই বলে না। সে হাতের লাঠি ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
বিড়িটা সম্পূর্ন না শেষ করে নিভিয়ে ডান কানের উপর গুজে রাখে।
নুরু আর কোনো কথা বলে না। সে উঠে শেয়াল কাঁটা কাটতে শুরু করে। আলেফ জোরে জোরে গরু তাড়াতে থাকে “ডানি ডানি-বা-বা হুটহুট হাঁটহাঁট।”
দুপুরে বাড়ি এসে আলেফের মেজাজ বিগড়ে গেলো। এখনো রান্না হয়নি। সেই সাত সকালে এক থালা পান্তা ভাত দুটো কাঁচা মরিচ আর একটা পিয়াজ খেয়ে  বড় খালার বাড়ি থেকে এসেছিল। পান্তা ভাত পেটে পড়লে তা পানির আগেই হজম হয়ে যায়। এতো বেলা হয়েছে পেটে কিছু থাকে ?
খিদের জ্বালা মুখে নিয়ে আলেফ বলে, “এই মা এ্যহোনো রান্দা হয়নি ? সারাদিন কি এ্যারিস ?
মা তার রান্নার কথা এড়িয়ে যায়। রান্নাটা যেনো আজ কোনো বিষয় না। তার বড় বোনোর খোঁজ-খবরও নেয় না। জানতে চায় না বোনটা তার কেমন আছে। সে বলে, “জানিস আলেফ, আবেদা ফিরে আয়ছে। ও বলে আর স্বামীর ঘর করবে না।’
আলেফের মেজাজ আরো বিগড়ে গেলো-ঘরে আবেদার কথা, মাঠে আবেদার কথা, তার আর ভালো লাগে না। ও মাগীর কথা শুনলি দেহপিত্তি জ্বলে যায়।
আলেফের মা বললো, “যাবি না রে একবার আবেদার কাছে ?’
মাজা থেকে ময়লা গামছা খুলে, রোদে পুড়া মুখ মুছতে মুছতে আলেফ বলে, “বাড়ার কথা বাদ দিবি, ও আমার কিডা যে ওর কাছে যাওয়া লাগবে ?”
মা এবার যেনো কথা ঘুরাতে চায়। সে বলে, তোর বড় খালা কিরাম আছে ?
আলেফ কোনো কথা বলে না। মাও আর কথা বলে না। আপন মনে চুলা থেকে ভাতের হাড়ি নামাতে থাকে। সে ছেলের কষ্ট বোঝে।
ছেলেটা অনেক কেঁদেছিল। কত রাত যে ঘুমাতে পারে নি। একটার পর একটা বিড়ি ধরিয়েছে আর খুকখুক করে কেশেছে রাতভোর। এখন অনেকটা ভুলেই গিয়েছিল। কিন্তু থৈথৈ জলের ভেতর থেকে ডুবা চর জেগে উঠার মত কোত্থেকে আবেদা ফিরে এলো ?
আলেফের মা আড়চোখে একবার আলেফের দিকে তাকালো। আহারে বেচারা কত কষ্টই না বুকে লালন করে।
মা একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বললো, “যা বাপ গা ধুয়ে আয়, রান্দা হতি গেলো। ডাল তেলে দিলিই হয়ে যাচ্ছে। আমি তোর ভাত খুলতি লাগদিছি। তুই গা দুয়ে আয়।
অলেফ আর কোনো কথা না বলে উঠে গেলো।

আলেফ বড় পুকুরে গোছল করতে যেয়ে মেজাজ আরো বিগড়ে গেলো। পাড়ার সব মহিলারা এক হয়ে আলেফ আর আবেদার কথা বলে যাচ্ছে। আলেফ মহিলাদের দেখে পুকুর পাড়ে না যেয়ে-পুকুর পাড়ের আম বাগানে বসলো।
সে বিড় বিড় করতে লাগলো, “শালার বিটিদের কামকাজ নেই-খালি পাঁচাপাঁচি করে, আরে শালার বিটি মানুষ আবেদা ফিরে আয়ছে তা তোদের কি ?’
আলেফের খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে-তারপরও গোছল করতে পারছে না। তার একটু একটু লজ্জাও লাগছে। হাজার হলেও তার ঘরের বৌ। কারো বৌ রাতের অন্ধকারে অন্যের হাত ধরে পালিয়ে গেলে তো লজ্জা করবেই।

নুরু তো একদিন বলে ছিলো, “পারিস নে বৌ রাখতি তুই কিরাম বিটা মানুষ।”
আলেফ মনের ভুলে একদিনও বৌর গায়ে হাত তুলেনি। খুব ভালবাসতো। তার পরও বৌ থাকলো না। কিসের সুখে-কিসের আশায় বৌ কাউকে কিছু না বলে চলে গেলো।
আলেফ এখন আর আবেদাকে বৌ ভাবে না। বৌ ভাবতে ঘৃণা হয়। ঘরের মানুষ একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। আর ফিরে আসলেও তাকে কি আর ঘরে নেওয়া যায় ? আবেদা এখন অন্য মানুষ।

পুকুর পাড় থেকে সবাই চলে গেলে আলেফ একা একা গোছল করে বাড়ি ফেরে। তার মা দুপুরের খাবার নিয়ে অপো করছে।


   Page 1 of 2
     শিল্প সাহিত্য
চলতি বছরের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার স্থগিত
.............................................................................................
ময়মনসিংহে সাহিত্য উৎসব অনুষ্ঠিত, পুরস্কৃত হলেন ৪ গুণীজন
.............................................................................................
প্রথম মৃত্যু
.............................................................................................
শুভংকরের ফাঁকি
.............................................................................................
বউ যেভাবে ঘরে আসে
.............................................................................................
মধ্যরাতের কথা
.............................................................................................
বাঙালির রক্তের বন্ধন ও জাতি-পরিচয়
.............................................................................................
মোহময়ী পিরামিড
.............................................................................................
৮২তম জন্মদিনে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত কবি আল মাহমুদ
.............................................................................................
পাবনা বইমেলা সাহিত্যকে সম্মৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে
.............................................................................................
প্রসঙ্গ: ঐতিহাসিক জ্বীনের মসজিদ
.............................................................................................
তেহরানে প্রথম বিশ্বের স্বাধীনতাকামী আন্দোলন
.............................................................................................
একলা মানুষ
.............................................................................................
নৈশভোজে আসছিস্ তো
.............................................................................................
স্বপ্ন ছিলো
.............................................................................................
ফেরা
.............................................................................................
ডি.লিট ডিগ্রি পাচ্ছেন হাসান আজিজুল হক ও সেলিনা হোসেন
.............................................................................................
বিশ্ববিখ্যাত ১০ নারীর জীবনীগ্রন্থ
.............................................................................................
কবি রফিক আজাদ আর নেই
.............................................................................................
পরপারে চলে গেলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি রফিক আজাদ
.............................................................................................
অমর একুশে গ্রন্থমেলায় শামস সাইদ এর দুটি কিশোর উপন্যাস
.............................................................................................
ঘুম আছে স্বপ্ন নেই
.............................................................................................
নীলফামারীতে পাল আমলের নিদর্শন পাওয়া গেছে
.............................................................................................
কবি শামসুর রাহমানের ৮৭তম জন্মদিন
.............................................................................................
ম্যান বুকার পেলেন জ্যামাইকার মারলন জেমস
.............................................................................................
১৪ অক্টোবর সরদার ফজলুল করিম দর্শন পদক
.............................................................................................
স্মরণ : ছোটোলোকের বাবা ॥ মোঃ আতিকুর রহমান ॥
.............................................................................................
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: জীবন, সাহিত্য ও দর্শন
.............................................................................................

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আখলাকুল আম্বিয়া
নির্বাহী সম্পাদক: মাে: মাহবুবুল আম্বিয়া

সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: স্বাধীনতা ভবন (৩য় তলা), ৮৮ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০। Editorial & Commercial Office: Swadhinota Bhaban (2nd Floor), 88 Motijheel, Dhaka-1000.
সম্পাদক কর্তৃক রঙতুলি প্রিন্টার্স ১৯৩/ডি, মমতাজ ম্যানশন, ফকিরাপুল কালভার্ট রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত ।
ফোন : ০২-৯৫৫২২৯১ মোবাইল: ০১৬৭০৬৬১৩৭৭

Phone: 02-9552291 Mobile: +8801670 661377
ই-মেইল : dailyswadhinbangla@gmail.com , editor@dailyswadhinbangla.com, news@dailyswadhinbangla.com

 

    2015 @ All Right Reserved By dailyswadhinbangla.com

Developed By: Nytasoft