শনিবার, ২২ জানুয়ারী 2022 বাংলার জন্য ক্লিক করুন
  
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

   এক্সক্লুসিভ -
                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                 
সৌন্দর্যের লীলাভূমি ‘আশুরার বিল’

মাসুদ রানা :
দিনাজপুর জেলার বিরামপুর ও নবাবগঞ্জের আশুরার বিল প্রকৃতির একটি অপার দান, সৌন্দর্যের লীলাভূমি। বিলটির মোট আয়তন ৮৫৭ একরেরও বেশি, যার প্রায় ৫৯০ একর পড়েছে নবাবগঞ্জ উপজেলার মধ্যে, বাকিটা বিরামপুর উপজেলায়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা আশুরার বিলকে নিয়ে রয়েছে নানান পৌরাণিক কাহিনী। কথিত কাহিনিগুলোর একটি হলো, অতি প্রাচীনকালে আধিপত্য বিস্তারে লড়াই শুরু হয় দেবতা এবং অসুরদের মধ্যে। সেই লড়াইয়ে পরাজিত হয় অসুরেরা। দেবতাদের খঞ্জরের আঘাতে অসুরদের শরীর থেকে ঝরা রক্তে ভরে গিয়েছিল তাদেরই পায়ে দেবে যাওয়া গর্ত। অসুরদের সেই কাহিনী থেকে লোকমুখের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এটির নাম হয়ে ওঠে আশুরার বিল।

শালবনের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর আশুরার বিল হয়ে উঠেছে আরো বেশি মোহময়। উদ্ভিদ, বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং পর্যটন সুবিধাদির উন্নয়নের লক্ষ্যে সেই শালবনকে ২০১০ সালে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার, যা স্থানীয়ভাবে শেখ রাসেল জাতীয় উদ্যান নামে পরিচিত। আগে এটি শুধু শালবন হিসেবে থাকলেও এখন সেখানে রয়েছে ২০-৩০ প্রজাতির গাছ। আর ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সমগ্র উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম বিল আশুরাতে রয়েছে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন ধরনের মাছ। শাপলা আর পদ্মফুলের সমারোহে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কলতানে মায়াবী আবেদনে হাতছানি দিয়ে ডেকে যায় আশুরার বিল। ঐতিহ্যবাহী বিলটি এক সময় উত্তরাঞ্চলের ভ্রমণপিপাসুদের কাছে হয়ে ওঠে অন্যতম দর্শনীয় স্থান। কিন্তু অবৈধ দখলদারদের কারণে অচিরেই বিলটি হারাতে বসে তার ঐতিহ্য। স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু মানুষের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে অপার সম্ভাবনার এই জলাশয়। বাঁশের বেড়া আর মাচা দিয়ে শত ভাগে ভাগ করে ফেলে তারা। শীতে ধান চাষ করে তাতে কীটনাশক ব্যবহার করায় হারিয়ে যেতে থাকে দেশি প্রজাতির বহু মাছ। কচুরিপানা আর বিভিন্ন ধরনের আবর্জনায় জরাজীর্ণ রূপ নেয় আশুরা। সুষ্ঠু পরিকল্পনা আর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বিলটিকে কৃষি জমি হিসেবে ব্যবহার শুরু করায় এর পানি কমতে থাকে আশঙ্কাজনকভাবে। বিলের অধিকাংশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় হারিয়ে যেতে থাকে এর সৌন্দর্য। অথচ আইনগতভাবে বিলের জমির শ্রেণি পরিবর্তনের সুযোগ নেই।

একটা সময় আর চুপ করে বসে না থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলে থাকা দর্শনীয় এই স্থান নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন আশুরা বিলের হারানো জৌলুস ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে কয়েক জন জনপ্রতিনিধির সহায়তায়। আগের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে বিলের পূর্ব অংশে পানি ধরে রাখার জন্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের অর্থায়নে নির্মাণ করা হয় একটি ক্রস ড্রাম। ফলস্বরূপ বিলটিতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পদ্ম আর শাপলা ফুটতে থাকে যেন প্রতিযোগিতা করে। বৃদ্ধি পেতে থাকে লাল খলশে, কাকিলা, ধেধলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। দীর্ঘ দুই দশক পর শীতের ঠিকানা খুঁজে নিতে আবারো আশুরায় ছুটে আসতে থাকে বালিহাঁস, গিরিয়াহাঁস, শামুকখোল, হট্টিটি, সাদা মানিকজোড়, রাঙ্গামুডিসহ অন্যান্য প্রজাতির হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি। বিল আর বনের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য গড়ে তোলা হয় দেশের বৃহত্তম আঁকাবাঁকা কাঠের সেতু। বন আর বিলকে একই সুতোয় গেঁথে দেওয়া ইংরেজি জেড আকৃতির এই সেতুর নামকরণ করা হয় ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা কাঠের সেতু’। আশুরার বিল আর শেখ রাসেল জাতীয় উদ্যান অন্যতম গন্তব্যে পরিণত হয় ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে। আশুরার বিলকে কেন্দ্র করে এলাকার আর্থ-সামাজিক এবং প্রাকৃতিক গুরুত্ব অনুধাবন করে স্থানীয় প্রশাসন হাতে নেয় উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড

সৌন্দর্যের লীলাভূমি ‘আশুরার বিল’
                                  

মাসুদ রানা :
দিনাজপুর জেলার বিরামপুর ও নবাবগঞ্জের আশুরার বিল প্রকৃতির একটি অপার দান, সৌন্দর্যের লীলাভূমি। বিলটির মোট আয়তন ৮৫৭ একরেরও বেশি, যার প্রায় ৫৯০ একর পড়েছে নবাবগঞ্জ উপজেলার মধ্যে, বাকিটা বিরামপুর উপজেলায়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা আশুরার বিলকে নিয়ে রয়েছে নানান পৌরাণিক কাহিনী। কথিত কাহিনিগুলোর একটি হলো, অতি প্রাচীনকালে আধিপত্য বিস্তারে লড়াই শুরু হয় দেবতা এবং অসুরদের মধ্যে। সেই লড়াইয়ে পরাজিত হয় অসুরেরা। দেবতাদের খঞ্জরের আঘাতে অসুরদের শরীর থেকে ঝরা রক্তে ভরে গিয়েছিল তাদেরই পায়ে দেবে যাওয়া গর্ত। অসুরদের সেই কাহিনী থেকে লোকমুখের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এটির নাম হয়ে ওঠে আশুরার বিল।

শালবনের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর আশুরার বিল হয়ে উঠেছে আরো বেশি মোহময়। উদ্ভিদ, বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং পর্যটন সুবিধাদির উন্নয়নের লক্ষ্যে সেই শালবনকে ২০১০ সালে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার, যা স্থানীয়ভাবে শেখ রাসেল জাতীয় উদ্যান নামে পরিচিত। আগে এটি শুধু শালবন হিসেবে থাকলেও এখন সেখানে রয়েছে ২০-৩০ প্রজাতির গাছ। আর ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সমগ্র উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম বিল আশুরাতে রয়েছে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন ধরনের মাছ। শাপলা আর পদ্মফুলের সমারোহে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কলতানে মায়াবী আবেদনে হাতছানি দিয়ে ডেকে যায় আশুরার বিল। ঐতিহ্যবাহী বিলটি এক সময় উত্তরাঞ্চলের ভ্রমণপিপাসুদের কাছে হয়ে ওঠে অন্যতম দর্শনীয় স্থান। কিন্তু অবৈধ দখলদারদের কারণে অচিরেই বিলটি হারাতে বসে তার ঐতিহ্য। স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু মানুষের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে অপার সম্ভাবনার এই জলাশয়। বাঁশের বেড়া আর মাচা দিয়ে শত ভাগে ভাগ করে ফেলে তারা। শীতে ধান চাষ করে তাতে কীটনাশক ব্যবহার করায় হারিয়ে যেতে থাকে দেশি প্রজাতির বহু মাছ। কচুরিপানা আর বিভিন্ন ধরনের আবর্জনায় জরাজীর্ণ রূপ নেয় আশুরা। সুষ্ঠু পরিকল্পনা আর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বিলটিকে কৃষি জমি হিসেবে ব্যবহার শুরু করায় এর পানি কমতে থাকে আশঙ্কাজনকভাবে। বিলের অধিকাংশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় হারিয়ে যেতে থাকে এর সৌন্দর্য। অথচ আইনগতভাবে বিলের জমির শ্রেণি পরিবর্তনের সুযোগ নেই।

একটা সময় আর চুপ করে বসে না থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলে থাকা দর্শনীয় এই স্থান নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন আশুরা বিলের হারানো জৌলুস ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে কয়েক জন জনপ্রতিনিধির সহায়তায়। আগের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে বিলের পূর্ব অংশে পানি ধরে রাখার জন্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের অর্থায়নে নির্মাণ করা হয় একটি ক্রস ড্রাম। ফলস্বরূপ বিলটিতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পদ্ম আর শাপলা ফুটতে থাকে যেন প্রতিযোগিতা করে। বৃদ্ধি পেতে থাকে লাল খলশে, কাকিলা, ধেধলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। দীর্ঘ দুই দশক পর শীতের ঠিকানা খুঁজে নিতে আবারো আশুরায় ছুটে আসতে থাকে বালিহাঁস, গিরিয়াহাঁস, শামুকখোল, হট্টিটি, সাদা মানিকজোড়, রাঙ্গামুডিসহ অন্যান্য প্রজাতির হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি। বিল আর বনের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য গড়ে তোলা হয় দেশের বৃহত্তম আঁকাবাঁকা কাঠের সেতু। বন আর বিলকে একই সুতোয় গেঁথে দেওয়া ইংরেজি জেড আকৃতির এই সেতুর নামকরণ করা হয় ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা কাঠের সেতু’। আশুরার বিল আর শেখ রাসেল জাতীয় উদ্যান অন্যতম গন্তব্যে পরিণত হয় ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে। আশুরার বিলকে কেন্দ্র করে এলাকার আর্থ-সামাজিক এবং প্রাকৃতিক গুরুত্ব অনুধাবন করে স্থানীয় প্রশাসন হাতে নেয় উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড

আতঙ্ক বাড়াচ্ছে করোনা
                                  

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশে করোনা পরিস্থিতি দিনে দিনে ভয়াবহ হয়ে উঠতে শুরু করেছে। চলতি মাসের শুরুর দিন রাজধানীসহ সারাদেশে ৫৮৫ জন নতুন করোনা রোগী শনাক্ত হয়। একই সময়ে মৃত্যু হয় আটজনের। সেদিন করোনা শনাক্তের হার ছিল ৪ দশমিক ৩১ শতাংশ। তিন সপ্তাহের ব্যবধানে গতকাল মঙ্গলবার সারাদেশে দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা এক লাফে সাড়ে তিন হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যা আট মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ৩ হাজার ৫৫৪ জনের মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে; মৃত্যু হয়েছে আরও ১৮ জনের। গত ২৪ ঘন্টায় নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ছিল ১৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ।

করোনা রোগী এভাবে বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য ও রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, গত ১০ দিন যাবত যে হারে রোগী বেড়েছে সেটা আগামী কয়েকদিন অব্যাহত থাকলে রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা দিতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যে অবকাঠামো রয়েছে তা ভেঙে পড়তে পারে।  তারা আরও বলেন, ইতোমধ্যেই রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তি করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে আইসিইউতে বেড একেবারেই ফাঁকা পাওয়া যাচ্ছে না। করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে গত বছরের মতো রোগী নিয়ে হাসপাতাল হাসপাতাল ঘুরতে হতে পারে বলে মন্তব্য করেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা মহানগরীর ১০টি করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে আইসিইউতে শয্যা সংখ্যা ৯৫টি। হাসপাতালগুলো হলো- উত্তরার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, কুর্মিটোলা হাসপাতাল, ২৫০ শয্যার শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল, সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ৫০০ শয্যা মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়-বিএসএমএমইউ। গত সোমবার পর্যন্ত আইসিইউতে রোগী ভর্তি ছিল ৯০ জন। সেই হিসাবে আইসিইউ বেড ফাঁকা ছিল মাত্র ৫টি। বেসরকারি পর্যায়ের করোনা হাসপাতালের ২৬৩টি আইসিইউ বেডের মধ্যে সোমবার পর্যন্ত রোগী ভর্তি ছিল ২১১ জন।

এদিকে কোভিড সংক্রমণ পরিস্থিতির সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় ২২ মার্চ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের উপসচিব ড. বিলকিস বেগম রাজধানীর পাঁচটি সরকারি হাসপাতালকে সার্বিকভাবে নতুন করে প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে চিঠি দেন। হাসপাতাল পাঁচটি হলো- মিরপুরের লালকুঠি হাসপাতাল, বাবুবাজারের ঢাকা মহানগর হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মহাখালীর ডিএনসিসি করোনা আইসোলেশন সেন্টার এবং ফুলবাড়িয়ার সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল।

বিএসএমএমইউ’র ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে করোনা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে আশঙ্কা করে বলেন , গত কয়েকদিন যাবত ক্রমাগতভাবে শনাক্তকৃত রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। ফলে গত বছরের মার্চের চেয়ে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি এবার আরও ভয়াবহতার দিকে চলে যাচ্ছে। করোনার এ গতিকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো যেটা আছে সেটা ভেঙ্গে পড়বে। তিনি বলেন, সব দেশেরই করোনা রোগীদের চিকিৎসা দানের নির্ধারিত সামর্থ্য রয়েছে। তার বাইরে চলে গেলেই শনাক্তকৃত রোগী ও মৃত্যু বাড়ে। ফলে সামাজিকভাবেও তখন নৈরাজ্য, অস্থিরতা ও অসহায়ত্ব চলে আসে।

সরকারি হিসাবে হাসপাতালে বেড এখনও অনেক ফাঁকা রয়েছে এমন তথ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারিভাবে সারাদেশের বেড সংখ্যার কথা বলা হয় কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আজও যদি রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তি ও বেড সংখ্যা হিসাব করা হয় তখন দেখা যাবে, হাসপাতালগুলোর সামর্থ্যরে শেষ দিকে চলে এসেছে। যেসব এলাকায় রোগী বেশি যেমন- ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে হাসপাতালগুলোর সামর্থ্য প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তিনি বলেন, ভ্যাকসিন কোনো সমাধান নয়, এটি সহায়ক মাত্র। মুখে মাস্ক পরিধান করা, ঘর থেকে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়া এবং জনসমাগম এড়িয়ে চলাটাই এখন করোনা সংক্রমণ রোধের উপায় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ৩ হাজার ৫৫৪ জনের মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে; মৃত্যু হয়েছে আরও ১৮ জনের। এর আগে গতবছরের ১৬ জুলাই এর চেয়ে বেশি রোগী শনাক্তের খবর দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সেদিন মোট ৩ হাজার ৭৩৩ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার বেড়ে ১৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ হয়েছে, যা ৫ ডিসেম্বরের পর সবচেয়ে বেশি। নতুন শনাক্ত ৩ হাজার ৫৫৪ জনকে নিয়ে দেশে এ পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ৫ লাখ ৭৭ হাজার ২৪১ জনে। আর গত এক দিনে মারা যাওয়া ১৮ জনকে নিয়ে দেশে করোনাভাইরাসে মোট ৮ হাজার ৭৩৮ জনের মৃত্যু হল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে বাসা ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও ১ হাজার ৮৩৫ জন রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন গত এক দিনে। তাতে এ পর্যন্ত সুস্থ রোগীর মোট সংখ্যা বেড়ে ৫ লাখ ২৫ হাজার ৯৯৪ জন হয়েছে।

বাংলাদেশে গত বছর ৮ মার্চ করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ার এক বছর পর গত ৭ মার্চ শনাক্ত রোগীর সংখ্যা সাড়ে ৫ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে গত বছরের ২ জুলাই ৪ হাজার ১৯ জন কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়, যা এক দিনের সর্বোচ্চ শনাক্ত।

প্রথম রোগী শনাক্তের ১০ দিন পর গত বছরের ১৮ মার্চ দেশে প্রথম মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ বছর ১১ মার্চ তা সাড়ে আট হাজার ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে গত বছরের ৩০ জুন এক দিনেই ৬৪ জনের মৃত্যুর খবর জানানো হয়, যা এক দিনের সর্বোচ্চ মৃত্যু।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বিশ্বে শনাক্তের দিক থেকে ৩৪তম স্থানে আছে বাংলাদেশ, আর মৃতের সংখ্যায় রয়েছে ৪১তম অবস্থানে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ২১৯টি ল্যাবে ২৫ হাজার ৯৫৪টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত পরীক্ষা হয়েছে ৪৪ লাখ ৬০ হাজার ১৮৪টি নমুনা।

২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ, এ পর্যন্ত মোট শনাক্তের হার ১২ দশমিক ৯৪ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৯১ দশমিক ১২ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৫১ শতাংশ। সরকারি ব্যবস্থাপনায় এ পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৩৩ লাখ ৯৬ হাজার ৯২৩টি। আর বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হয়েছে ১০ লাখ ৬৩ হাজার ২৬১টি।

গত এক দিনে যারা মারা গেছেন, তাদের মধ্যে ১২ জন পুরুষ আর নারী ৬ জন। তাদের ১৭ জন হাসপাতালে ১ জন বাড়িতে মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ১০ জনের বয়স ছিল ৬০ বছরের বেশি, ৬ জনের বয়স ৫১ থেকে ৬০ বছর, ২ জনের বয়স ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ছিল। মৃতদের মধ্যে ২৪ জন ঢাকা বিভাগের, ৪ জন চট্টগ্রাম বিভাগের, ১ জন খুলনা বিভাগের এবং ১ জন সিলেট বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন।

দেশে এ পর্যন্ত মারা যাওয়া ৮ হাজার ৭২০ জনের মধ্যে ৬ হাজার ৫৯৫ জনই পুরুষ এবং ২ হাজার ১২৫ জন নারী। তাদের মধ্যে ৪ হাজার ৮৮৫ জনের বয়স ছিল ৬০ বছরের বেশি। এছাড়াও ২ হাজার ১৬২ জনের বয়স ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে, ৯৮৬ জনের বয়স ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে, ৪২৯ জনের বয়স ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে, ১৭৩ জনের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে, ৬৬ জনের বয়স ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে এবং ৩৭ জনের বয়স ছিল ১০ বছরের কম।

এর মধ্যে ৪ হাজার ৯২৯ জন ঢাকা বিভাগের, ১ হাজার ৬০৩ জন চট্টগ্রাম বিভাগের, ৪৮৮ জন রাজশাহী বিভাগের, ৫৭০ জন খুলনা বিভাগের, ২৬৫ জন বরিশাল বিভাগের, ৩১৫ জন সিলেট বিভাগের, ৩৬৯ জন রংপুর বিভাগের এবং ১৯৯ জন ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন।

বাংলাদেশে কী ধরণের সমরাস্ত্র বিক্রি করতে চায় তুরস্ক
                                  

স্বাধীন বাংলা ডেস্ক:
মাত্র দু’দশক আগে ১৯৯৯ সালেও তুরস্ক ছিলো বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অস্ত্র আমদানীকারক দেশ, আর সেই দেশটিই ২০১৮ সালে এসে বিশ্বের ১৪তম বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকায় এসে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলিত শাভিসলু বলেছেন, যে তাদের অস্ত্র আমদানিকারকদের তালিকায় এখন বাংলাদেশকেও পেতে চাইছেন তারা।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেনের সাথে সাক্ষাতের পর তিনি জানান, তুরস্কের প্রতিরক্ষা পণ্যের গুনগত মান ভালো, দামে সুলভ এবং বিক্রির ক্ষেত্রে কোন আগাম শর্ত তারা দেন না। অতীতে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর কাছ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনতে গিয়ে সমস্যা পড়ে তুরস্ক নিজেই অস্ত্র উৎপাদন শুরু করে, এ কথা জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন যে তুরস্ক প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বাংলাদেশের সাথে যৌথ উৎপাদনে যেতেও রাজি আছে।

বাংলাদেশের দিক থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রস্তাবে রাজি হওয়ার বিষয়ে সরাসরি কোন ঘোষণা না আসলেও বিশ্লেষকেরা মনে করছেন যে প্রস্তাবটি বাংলাদেশ বিবেচনা করতে পারে। তবে তুরস্ক ঠিক কী ধরণের অস্ত্র উৎপাদন করে এবং বাংলাদেশে কোন ধরণের অস্ত্র তারা রপ্তানি করতে চাইছে, তার বিস্তারিত তথ্য কোন পক্ষ থেকেই প্রকাশ করা হয়নি।

তুরস্কের সরকারি তথ্য বলছে, ২০১৮ সালে তারা ছিলো বিশ্বের ১৪তম বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ। তবে রপ্তানি বিষয়ে তুরস্কের সরকারি সংস্থা টার্কিশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসেম্বলির প্রকাশ করা তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে অগাস্ট সময়কালে তুরস্কের প্রতিরক্ষা রপ্তানি উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গেছে। গত বছর একই সময়ের তুলনায় এবার এই সময়ে রপ্তানি কমেছে প্রায় ২৬ শতাংশ। তবে এটিও ঠিক যে একদিকে করোনাভাইরাস মহামারি, অন্যদিকে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে তুরস্কের মুদ্রার অবনমন হয়েছে, পাশাপাশি দেশটিতে বেড়েছে মুদ্রাস্ফীতি এবং বেকারত্বের হার।

এর আগের বছরগুলোতে অবশ্য ক্রমশই বাড়ছিল তুরস্কের প্রতিরক্ষাসামগ্রী রপ্তানি। গত বছরের অক্টোবরে সিরিয়ায় কুর্দি মিলিশিয়াদের ওপর হামলার পর থেকে ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, চেক প্রজাতন্ত্র, নেদারল্যান্ড, স্পেন এবং জার্মানি-সহ অনেক দেশ তুরস্কের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলো।ম২০১৮ সালে দেশটির সব রফতানি খাতের মধ্যে প্রতিরক্ষাসামগ্রীর রপ্তানির প্রবৃদ্ধিই ছিলো সবচেয়ে বেশি। ওই বছরই প্রথমবারের দেশটি ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের প্রতিরক্ষাসামগ্রী রপ্তানি করতে সক্ষম হয়।

এরপর তুরস্ক ২০১৯-২৩ সাল সময়ের জন্য কৌশলগত পরিকল্পনা করে, যাতে ২০২৩ সাল নাগাদ প্রতিরক্ষাসামগ্রীর রপ্তানি ১,০০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার কথা বলা হয়। একই সাথে, চাহিদার ৭৫ ভাগ দেশেই উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। গত অগাস্টে যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক ডিফেন্স নিউজ ম্যাগাজিন তাদের টপ গ্লোবাল ফার্মের তালিকায় স্থান দিয়েছিলো তুরস্কের সাতটি প্রতিরক্ষাসামগ্রী উৎপাদক প্রতিষ্ঠানকে।

আবার সুইডেন-ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউট বা সিপরির তথ্য অনুযায়ী, সামরিক খাতে তুরস্ক গত বছর ব্যয় করেছে ২,০০০ কোটি ডলারের বেশি। তুরস্কের প্রতিরক্ষা খাত নিয়ন্ত্রণ করে মূলত টার্কিশ আর্মড ফোর্সেস ফাউন্ডেশন, যার মূল কর্তৃত্ব প্রেসিডেন্ট রেজেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের হাতে।

সামরিক বিষয়ের একজন বিশ্লেষক এবং বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট ফর পিস অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান জানান যে তুরস্কের ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পখাত। ‘সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর দরকার এমন সব কিছুই তারা এখন তৈরি করে। বাংলাদেশ আগেও সমরাস্ত্র আমদানি করেছে তাদের কাছ থেকে। তাদের প্রযুক্তিও আধুনিক বলেন তিনি।

তিনি আরো জানান, স্থল বাহিনীর জন্য ট্যাংক, কামান-সহ যুদ্ধাস্ত্র, আর্টিলারি ইকুইপমেন্ট, গোয়েন্দা কার্যক্রম বা নজরদারিতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে সব কিছু এবং নৌ বাহিনীর যুদ্ধজাহাজ থেকে সব কিছুই এখন তুরস্ক তৈরি করছে।

কোন কোন ক্ষেত্রে কেবল অস্ত্র নয়, বরং অস্ত্র কেনার পর দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষুদ্রাংশ সরবরাহ এবং ব্যাকআপ সার্ভিস দিতে পারে তুরস্ক। এছাড়া, সামরিক কোন বিষয়ে প্রশিক্ষণের দরকার হলে, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া ক্ষেত্রেও তুরস্কের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ওদিকে প্রতিরক্ষা বিষয় বিভিন্ন জার্নাল কিংবা তুরস্কের প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে যে ধারণা পাওয়া যায়, তাহলো দেশটি শটগান, রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল, লাইট মেশিন গান, হেভি মেশিনগান, ল্যান্ডমাইন, হ্যান্ড গ্রেনেড, রকেট, সেল্ফ প্রপেল্ড গ্রেনেড, অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গান-সহ নানা ধরণের অস্ত্র ও সেন্সর তৈরি করে।

আবার নিজেদের তৈরি করা ল্যান্ডমাইন ডিটেক্টর ব্যবহার করে সিরিয়ায় সাফল্য পাওয়ার দাবি করেন দেশটির সামরিক বিশ্লেষকরা। তাছাড়া তুরস্কের একটি কোম্পানি এন্টি ড্রোন ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক গান তৈরি করেছে, যা কম উচ্চতায় থাকা ড্রোনকে ভূপাতিত করতে সক্ষম বলে জানানো হয়েছে। তবে যেটি নিয়ে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে, সেটি হলো তুরস্কে বানানো ড্রোন। দেশটির চারটি কোম্পানি ড্রোন উৎপাদন করে থাকে। এগুলোর মধ্যে মেশিনগান এবং গ্রেনেড বহনকারী ড্রোনও রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে যে আজারবাইজান সাম্প্রতিক যুদ্ধে আরমেনিয়ার বিরুদ্ধে তুরস্কের তৈরি ড্রোন ব্যবহার করে ব্যাপক সাফল্য পায়। নিজস্ব স্যাটেলাইট এবং ভালো মানের রাডার আছে তুরস্কের। এখন তারা ক্রুজ মিসাইল তৈরির কাজ করছে বলে জানা যাচ্ছে।

এর পাশাপাশি নৌ বাহিনীর জন্য তারা যেসব যুদ্ধ সরঞ্জাম তৈরি করছে, তার মধ্যে রয়েছে অ্যান্টি শিপ মিসাইল, লাইটওয়েট টর্পেডো এবং সোনার সিস্টেম। তারা আন্ডারওয়াটার অ্যাটাক ড্রোন তৈরি নিয়েও কাজ করছে। একই সাথে যুদ্ধজাহাজের ইঞ্জিন তৈরি করা শুরু করেছে দু`বছর আগে।

সুইডেন-ভিত্তিক সিপরির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখনই তুরস্ক থেকে কিছু সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করছে। এর বাইরে বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে অস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করে, সেব দেশের তালিকায় রয়েছে চীন, ইতালি, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, সার্বিয়া, ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং জার্মানি। তবে তুরস্ক এখন চাইছে বাংলাদেশ আরও বেশি পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম তাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করুক এবং দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার সাম্প্রতিক সফরে সেই প্রস্তাবই দিয়েছেন। সূত্র: বিবিসি

কুষ্টিয়ার যতীন্দ্রনাথ যেভাবে হলেন ‘বাঘা যতীন’
                                  

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি:
বিংশ শতাব্দীর শুরুর একটা সময় কুষ্টিয়ার কয়া গ্রামের মানুষ আতংকিত হয়ে উঠল। পাশের জঙ্গলে বিশাল একটি বাঘ দেখা গেছে। বাঘটির ভয়ে দিনের বেলায়ও কেউ রাস্তা-ঘাটে বের হয় না। রাতে তো কথাই নেই। বাঘটি প্রায়ই গ্রামের গরু, ছাগল খেতে শুরু করল। অতিষ্ঠ হয়ে উঠল গ্রামের মানুষ। কয়া গ্রামে একটিই বন্দুক আর তা ছিল ফণিভূষণ বাবুর। গ্রামের জান-মাল রক্ষায় তিনি জীবনবাজী রেখে বাঘটিকে মারার সিদ্ধান্ত নিলেন।

সে সময়ে কৃষ্ণনগর থেকে মামা বাড়ি বেড়াতে এসেছিলেন তরুণ যতীন্দ্রনাথ। মামাত ভাই ফণিভূষণ বাঘ মারতে যাবেন শুনে যতীন্দ্রনাথ তাঁর সাথে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। মামাবাড়ির সবাই যতীন্দ্রনাথকে যেতে নিষেধ করলেন। কারণ বন্দুক একটি, খালি হাতে যতীন্দ্রনাথ যাবেন কি করে, বাঘ যদি তাকে আক্রমণ করে? কিন্তু যতীন্দ্রনাথ কারও কথা শুনলেন না। খালি হাতে যাওয়া ঠিক হবে না ভেবে তিনি একটি ভোজালি নিয়ে দুপুরের পর ভাই ফণিভূষণের সাথে বাঘ মারতে রওনা হলেন। শুরু হল বাঘ খোঁজা। ফণিবাবু ও যতীন্দ্রনাথ গ্রামের পাশের জঙ্গলের কাছে একটি বড় মাঠের মাঝে গিয়ে উপস্থিত হলেন। যতীন সেই মাঠের চারদিক দেখছিলেন আর ফণিভূষণ মাঠের এক প্রান্তে বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে আছেন। গ্রামের মানুষ জঙ্গলের পাশে দাঁড়িয়ে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে চলেছে।

কিছুক্ষণ পর যতীন যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন, সেইদিক দিয়ে বাঘ বেরিয়ে এল। বাঘ দেখে গ্রামের মানুষ ভয়ে পালাতে শুরু করল। ফণিভূষণ বাঘটি লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ল। গুলি বাঘের মাথা স্পর্শ করে চলে গেল। বাঘ আহত না হয়ে বরং আরো ক্ষিপ্ত হয়ে যতীনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আক্রান্ত যতীন বাঘটিকে বাম বগলের মধ্যে চেপে ধরে বাঘের মাথার উপর সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে ভোজালি দিয়ে আঘাত করতে শুরু করল। বাঘও যতীনকে কামড়াবার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। চলতে থাকে বাঘে-মানুষে লড়াই। বাঘ নখ দিয়ে যতীনের সমস্ত শরীর ক্ষত-বিক্ষত করে চলল। তাঁর হাঁটুতে একটা কামড়ও বসিয়ে দিল। কিন্তু যতীন জানতেন বাঘটিকে না মারতে পারলে তাঁর রক্ষা নেই। তাই জীবন বাঁচানোর লড়াই চালিয়ে গেলেন তিনি। অন্যদিকে বাঘটিকে গুলি করার জন্য ফণিভূষণ বারবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছিলেন। কারণ বাঘের সাথে যতীন যেভাবে গড়াগড়ি করছিলেন, তাতে গুলি ছুড়লে সেটি যতীনের শরীরে লেগে যেতে পারে। এভাবে প্রায় ১০ মিনিট লড়াই করবার পর যতীন বাঘটিকে মেরে ফেললেন এবং নিজে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন।

মৃত বাঘ ও অচেতন যতীনকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল। গ্রাম্য ডাক্তার দেখানোর পর যতীন একটু সুস্থ হলেন। কিন্তু তার শরীরের প্রায় ৩০০ স্থানে ক্ষত দেখা গেল। ডাক্তার তাঁর অবস্থা দেখে তাড়াতড়ি কলকাতায় নিয়ে যেতে বললেন। যতীনের মেজ মামা হেমন্তকুমার তখন কলকাতায় ডাক্তারি করতেন। মামার কাছে তাঁকে পাঠানো হল। হেমন্তকুমার ভাগ্নের অবস্থা আশংকাজনক দেখে কলকাতার সেকালের বিখ্যাত সার্জন লেফটেন্যান্ট কর্ণেল সুরেশপ্রসাদ সর্বাধিকারীর উপর চিকিৎসার ভার দিলেন। প্রখ্যাত এই ডাক্তারও যতীন্দ্রনাথকে বাঁচানোর ও পুরাপুরি সুস্থ করার আশা প্রায় ছেড়েই দিলেন। যতীন মাসখানেক পর একটু সুস্থ হলেন কিন্তু তাঁর পায়ে পচন ধরল। ডাক্তার তাঁর পা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু যতীনের মামাদের আপ্রাণ চেষ্টা ও ডাক্তারদের সুচিকিৎসার ফলে শেষ পর্যন্ত তাঁর পা দুটি রক্ষা পেল। ডাক্তার সুরেশ প্রসাদ সর্বাধিকারী যতীনের বীরত্ব আর অদম্য আত্মবিশ্বাসে বিস্মিত হলেন এবং তাঁকে ‘বাঘা যতীন’ নামে ভূষিত করলেন। মানুষের কাছে যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় হয়ে উঠলেন ‘বাঘা যতীন’।

বাঘা যতীন যার পূর্ণ নাম যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, জন্মেছিলেন ১২৮৬ সালের ২১ অগ্রহায়ণে (১৮৭৯ সালের ৭ ডিসেম্বর)। তৎকালীন নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার কয়া গ্রামের মাতুলালয়ে। বাবা উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। মা শরৎশশী দেবী। তাঁদের আদি নিবাস ছিল যশোর জেলার ঝিনাইদহ মহকুমার রিশখালী গ্রামে। বাঘা যতীনের ৫ বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যান। এরপর মা ও বড়বোন বিনোদবালার সাথে তিনি মাতামহের বাড়ি কয়া গ্রামে চলে আসেন। স্বভাব কবি মায়ের আদর-স্নেহে মাতুলালয়েই তিনি বড় হতে থাকেন। এখানেই কেটেছে তাঁর শৈশব-কৈশোর।

পরিবারেই যতীনের লেখাপড়ায় হাতেখড়ি। শরৎশশী দেবী ছেলেকে আদর্শবান ও স্পষ্টভাষী হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। প্রাথমিক লেখাপড়া শেষে বড় মামা বসন্ত কুমার দুরন্ত স্বভাবের যতীনকে কৃষ্ণনগরের অ্যাংলো ভার্ণাকুলার হাইস্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। স্কুলের পড়াশুনা আর খেলাধূলার পাশাপাশি ঘোড়ায় চড়া, শিকার করা, মাছ ধরা, গাছে চড়া, দৌড়-ঝাঁপসহ নানা দুরন্তপনায় মেতে থাকতেন যতীন। পড়াশুনায় ভাল, দুষ্টমিতে সেরা ও স্পষ্টভাষী, এসব গুণের কারণে যতীন তাঁর সহপাঠী ও শিক্ষক মহলে প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। পাড়া-মহল্লা ও স্কুলে নাটকে অভিনয়ও করতেন তিনি।

চালের দাম বাড়িয়ে টাকা লুটছে অটোমিল সিন্ডিকেট
                                  

নিজস্ব প্রতিবেদক : অটো মিল মালিকদের একটি সিন্ডিকেটই সারাদেশের চালের বাজার নিয়স্ত্রণ করছে। ওই চক্রটি প্রতি বছরই নানা বাহানায় চালের দাম বাড়িয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অংকের টাকা। মূলত দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগেই তারা এসব অপকর্ম চালাচ্ছে। চাল নিয়ে কারসাজিতে জড়িত অটো মিলগুলোর অধিকাংশই কুষ্টিয়া জেলায় অবস্থিত। হাসকিং মিল মালিকদের অভিযোগ, অটো মিল মালিকদের হাতেই চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ। তারা দাম বাড়িয়ে দিলে বাজারেও চালের দাম বেড়ে যায়। বাজার সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিগত কয়েকদিনের ব্যবধানে কুষ্টিয়া মোকামে সব ধরনের চালে কেজিতে এক টাকা বেড়েছে। অনেক মিল মালিকই আড়তে চাল সঙ্কট দেখিয়ে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ মিল মালিক ও জেলা প্রশাসনের কাছে তথ্য রয়েছে, কুষ্টিয়া মোকামে গত এক সপ্তাহে ১০ হাজার টন চাল মজুদ আছে। তারপরও দাম বাড়ানোর বিষয়টি খুচরা ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা পুরোপুরি অযৌক্তিক বলে জানায়। মূলত ধানের দাম বৃদ্ধি ও মোকামে চাল সঙ্কটের অজুহাতে নতুন করে সব ধরনের চালে কেজিতে এক টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে মিল মালিকরা।

অথচ ধানের দাম গত এক সপ্তাহে নতুন করে বাড়েনি। বরং নতুন ধান ওঠায় কোনো কোনো জাতের ধানের দাম কমেছে। তাছাড়া গত এক সপ্তাহে পরিবহন ধর্মঘট চলায় কুষ্টিয়া মোকাম থেকে চাল সরবরাহ নিম্ন পর্যায়ে চলে আসে। ওই কারণে অটো ও হাসকিং চালকলগুলোতে প্রচুর চাল জমে যায়। যার পরিমাণ ১০ হাজার টনের বেশি। গত শুক্রবার থেকে দেশের বড় বড় আড়তে সরবরাহ শুরু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও চালের দাম মোকামে অর্থাৎ মিল গেটে এক টাকা বেড়েছে। ফলে খুচরা পর্যায়ে পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ যোগ করে ভোক্তাকে আরো তিন টাকা বেশি দিয়ে চাল কিনতে হবে।

সূত্র জানায়, চালের বাজার কয়েকদিন ধরে স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু গত শনিবার সকাল থেকে নতুন করে মিল গেটে কেজিতে এক টাকা দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে নতুন করে মিনিকেট এক টাকা বেড়ে ৫০ কেজির প্রতি বস্তা দুই হাজার ৩০০ টাকা, বাসমতি এক টাকা বেড়ে দুই হাজার ৫০০ টাকা, কাজললতা এক হাজার ৮৫০ টাকা, আঠাশ এক হাজার ৯৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই চাল কয়েকদিন ধরে মিনিকেট মিল গেটে ৪৫ টাকা, বাসমতি ৪৯ টাকা, কাজললতা ৩৬ টাকা ও আঠাশ ৩৭ টাকা ৫০ পয়সা কেজিতে বিক্রি হচ্ছিল। কোনো কোনো চালে কেজিতে দেড় টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

বর্তমানে কুষ্টিয়া জেলায় অটো চালকলের সংখ্যা  ৪৬টি। তার মধ্যে কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় ৪৩টি, দৌলতপুরে দুটি ও কুমারখালীতে একটি। কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় দেশের বড় মোকামগুলোর অবস্থান। তাছাড়া দৌলতপুরেও দুটি মিল থেকে প্রচুর চাল উৎপাদন হয়। কয়েক বছর আগে দেশের বাজারে চালের বাজার অনেক বেড়ে গিয়েছিল। ওই সময় কুষ্টিয়ার রশিদ এগ্রো ফুডসহ জেলার অটো চালকল মালিকদের বিরুদ্ধে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ ওঠে। তখন অভিযান চালিয়ে রশিদের গোডাউনে প্রচুর ধান ও চালের মজুদ পাওয়া যায়। তাছাড়া অন্য কয়েকটি মিলেও প্রচুর ধান ও চাল মজুদের বিষয়টি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে আসে।

সূত্র আরো জানায়, সারাদেশে অটো মিল মালিকদের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। তারা যোগাযোগ করে দাম বাড়িয়ে দেয়। এবার এ সময়ে ধানের দাম অল্প বেড়েছে। তবে যে দাম বেড়েছে, তাতে চালের বাজার প্রতি কেজিতে তিন থেকে চার টাকা বাড়ার কথা নয়। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠকের পর অনেকেই দাম বাড়ায়নি। তবে কেউ কেউ বাড়িয়ে দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে কুষ্টিয়া জেলার ৪৬টি অটো মিলের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তার মধ্যে ৫ থেকে ১০ জন ব্যবসায়ী চালের বাজারে কারসাজি করে। ধান কেনা থেকে শুরু করে মিলে নিয়ে আসা ও চাল তৈরি পর্যন্ত খরচ ও বিক্রির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে এবারও আমন মৌসুমে চালের দাম বাড়ার পর জেলা প্রশাসন ও বাজার নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তার পক্ষ থেকে জোরদার কোনো অভিযান দেখা যায়নি। এর মাঝে জেলা প্রশাসন সব চালকল মালিকদের ডেকে চালের দাম না বাড়ানোর অনুরোধ করেছে। তবে মিল মালিকরা দাম না বাড়ানোর আশ্বাস দিলেও অনেক মিল মালিক ইতিমধ্যে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।

এ ব্যাপারে হাসকিং মিল মালিকরা বলছেন, তাদের হাতে চালের ব্যবসা নেই। অটো মিল মালিকরা সব চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এখন নতুন ধান উঠছে, তাতে বাজার বাড়ার কথা না। কারণ নতুন ধান কাটা চলছে। বাজারেও আসতে শুরু করেছে। ধানের বাজার কিছুটা বাড়লেও সহনীয় রয়েছে। আর কৃষকের ঘরেও এখন পর্যাপ্ত ধান নেই। বরং ফড়িয়াদের মজুদ করা ধান বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আর ধানের দাম ৯০০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে থাকলেও চালের বাজার সহনীয় পর্যায়ে থাকার কথা। সরকার এ বছর ৬ লাখ টন ধান কিনবে।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন প্রধান জানান, পরিবহন এক সপ্তাহ বন্ধ থাকায় চাল সরবরাহ বন্ধ ছিল। শুক্রবার থেকে ফের পরিবহন চলাচল শুরু হয়েছে। সারাদেশে চাল যাচ্ছে। মোকামে প্রচুর চাল রয়েছে। নতুন করে দাম বাড়ানো হয়নি।

এ প্রসঙ্গে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক মো. আসলাম হোসেন জানান, মিল মালিকদের ডেকে চালের দাম না বাড়াতে অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু যৌক্তিক কোনো কারণ না থাকলেও তারা দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। অটো মিল মালিকরা এ কাজটি করছে। তাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হবে। মোকামে ধান ও চালের মজুদের বিষয়টি নজরদারিতে আছে। তাছাড়া তারা অন্যখানে গোডাউনে কোনো মজুদ করেছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ইয়াবার চালান থামছে না
                                  

বিশেষ প্রতিনিধি : মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে। মরণ নেশা ইয়াবা বন্ধে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, সাঁড়াশি অভিযান, মামলা, আত্মসমর্পণ- সবই চলছে। কিন্তু তবু বন্ধ হচ্ছে না ইয়াবার কারবার। বরং সড়কপথ, আকাশপথ, নৌপথ আর পাহাড়ি এলাকা দিয়ে পাচার হয়ে রাজধানীসহ সারাদেশে আসছে ইয়াবার বড় বড় চালান। ইয়াবা সাম্রাজ্য টেকনাফে নৌপথে ইয়াবা ঢুকছে। পরবর্তীতে টেকনাফ থেকে নৌপথে কুয়াকাটা, বরিশাল হয়ে তা ঢাকায় আসছে। আবার ঢাকা থেকে বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে যাচ্ছে। সেখান থেকে নানা হাতবদল হয়ে সারাদেশের গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমানে বিকল্প রুটে ভারত থেকে সিলেটের জকিগঞ্জ ও বাল্লা এবং কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্ত দিয়েও অবাধে ঢুকছে ইয়াবা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের ফলে শহরে ইয়াবার ব্যবহার কমলেও গ্রামে বিস্তার বেশি। গ্রামাঞ্চলেই এখন ইয়াবার রমরমা ব্যবসা চলছে। তবে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানে আগের চেয়ে ইয়াবা ব্যবসার জৌলুস অনেকটাই কমেছে। এখন কেউ প্রকাশ্যে ইয়াবা বিক্রি করছে না। কার্যক্রম চলছে গোপনে। এমন পরিস্থিতিতে নৌপথে ইয়াবা পাচার রোধ করতে আগামী ১০, ১১ ও ১২ অক্টোবর বাংলাদেশ-ভারত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ডিজি পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

সূত্র জানায়, দেশের গ্রামাঞ্চলে ইয়াবা এখন অনেকটা মহামারি রূপ নিয়েছে। প্রায় প্রতিটি গ্রামের আনাচেকানাচে পর্যন্ত বিস্তার ঘটেছে নীরব ঘাতক ক্রেজি ড্রাক ইয়াবার। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও বহন করছে এই মরণ বড়ি। রাজনীতিকদের একটি অংশ এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। ইয়াবায় আসক্ত নেই এমন কোনো পেশার লোক পাওয়া যাবে না। শ্রমজীবী থেকে শুরু করে একেবারে সব পেশার মধ্যে ইয়াবা আসক্ত রয়েছে।

গ্রামে ইয়াবা খাওয়ার যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, নিয়মিত ইয়াবা খেলে শরীরে শক্তি বাড়ে। তবে ইয়াবায় আসক্ত হওয়ার পর প্রথমে শক্তি বাড়লেও পরে ধীরে ধীরে শক্তি কমিয়ে দেয়। উত্তেজিত হয়ে আসক্তরা নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। ধর্ষণ ও খুনের মামলার আসামিদের অধিকাংশই ইয়াবায় আসক্ত।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সামাজিক অবক্ষয়ের মূলে এই ইয়াবা সেবন। এর কারণে সন্তান মা-বাবাকে মারছে। খুন, চুরি, ডাকাতির ঘটনাও ঘটছে। ইয়াবার ভয়াবহ আগ্রাসন আগামী প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। ইয়াবার ভয়াবহ আগ্রাসন নিয়ে সরকার যেমন উদ্বিগ্ন, চিন্তিত অভিভাবক মহলও। ইয়াবা পাচারে একশ্রেণির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা জড়িত থাকায় এটা নিয়ন্ত্রণ অনেকটা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র আরো জানায়, বর্তমানে নতুন কৌশেলে দেশজুড়ে ইয়াবা পাচার করা হচ্ছে। পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী সড়কপথে তৎপরতা বৃদ্ধি করায় ইয়াবা ব্যবসায়ীরা বড় চালান পাচারের জন্য নৌপথকে নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে। শহরাঞ্চলে ইয়াবা এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আর প্রশাসনের কড়াকড়ির কারণে সাগরপথে মানব পাচার প্রায় বন্ধ থাকায় ইয়াবা পাচারে জড়িয়ে পড়েছে পাচারকারীরা। নৌপথে ইয়াবা পাচারে সহায়তা করছে কিছু ফিশিং ট্রলারের মালিক এবং জেলে। একশ্রেণির জেলে মাছ ধরার নামে তা বহন করে। তাদের হাত ধরে ইয়াবার চালানগুলো কূলে উঠে। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ‘বোট টু বোট’ ইয়াবার চালান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে। গভীর সমুদ্রেও ইয়াবা চালানের হাতবদল হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের মাধ্যমে, কন্টেইনারের মাধ্যমেও ইয়াবা আসছে।

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ছাড়াও টেকনাফ, খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ভোলাসহ দেশের প্রায় সব নৌপথ দিয়ে ইয়াবা পাচার হচ্ছে। তাছাড়া পার্বত্য অঞ্চলের ২৫ কিলোমিটার বর্ডার অরক্ষিত। সেখান দিয়েও প্রবেশ করছে ইয়াবা। পাশাপাশি সিলেটের জকিগঞ্জ ও বাল্লা সীমান্ত দিয়েও ইয়াবা আসছে। এটি ইয়াবা পাচারের নতুন রুট। ওপারে ভারতের আসাম, মিজোরাম ও মেঘালয়ে ইয়াবা তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে। সেখান থেকে ইয়াবা আসছে। এ বিষয়টি দুই দেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ডিজি পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ তুলে ধরবে বলে জানা গেছে।

এদিকে চট্টগ্রামে হঠাৎই বেড়েছে ইয়াবার চোরাচালান। ঈদুল আজহার কয়েক দিন আগে থেকে এই প্রবণতা শুরু হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ইয়াবার ছোটো-বড়ো চালান ধরা পড়ছে। গত কয়েকদিনে ইয়াবা পরিবহনে ব্যবহৃত কাভার্ড ভ্যান, বাস, ট্রাকসহ কমপক্ষে ২০ জনকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে একজন রাতারাতি ধনী হওয়ার আশায় মধ্যপ্রাচ্যের চাকরি বাদ দিয়ে দেশে এসে ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। চট্টগ্রাম কারাগারের ভেতরেও চলছে ইয়াবার রমরমা ব্যবসা।

অভিযোগ রয়েছে, কারারক্ষীদের সহায়তায় কিছু কিছু বন্দি এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ১৫ জুন ইয়াবাসহ একজন কারারক্ষী এবং তার পরদিন এক বন্দির পেট থেকে ৩০০ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। কারা কর্তৃপক্ষের দাবি, মামলার হাজিরা দিতে গিয়ে আদালত চত্বর থেকে ইয়াবা নিয়ে আসে বন্দিরা। ইয়াবা ব্যবসায় পুলিশ, ছাত্র, জনপ্রতিনিধির পাশাপাশি এমনকি গৃহবধূরাও জড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে মিয়ানমার থেকে পশু আমদানির পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ ইয়াবাও এসেছে। সুস্পষ্ট তথ্য ছাড়া যত্রতত্র গরুর ট্রাক না থামাতে পুলিশের ওপর নির্দেশনা থাকায় ইয়াবা পাচারকারীরা অনেকটা বিনা বাধায় বড়ো বড়ো চালান নিয়ে এসেছে।

প্রশাসনের কঠোর নজরদারির কারণে মাঝখানে অনেকদিন ইয়াবা ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য কম ছিল। কিন্তু ঈদ সামনে রেখে মিয়ানমার থেকে গরু আসা শুরু হলে পাশাপাশি ইয়াবাও আসতে শুরু করে। যার কারণে গত কয়েকদিনে অনেকগুলো ইয়াবার চালান ধরা পড়েছে। মিয়ানমার থেকে আনা ইয়াবার চালান চট্টগ্রামকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া হতো।

তবে চট্টগ্রাম ভিত্তিক সিন্ডিকেট অনেক আগেই ভেঙে দেয়া হয়েছে। গডফাদারদের অধিকাংশই হয়তো কারাগারে, নয়তো বিদেশে পলাতক। কয়েকজন বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। এ কারণে চট্টগ্রাম আর সেভাবে রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। তবে বিকল্প রুট হিসেবে ভারত হয়েও কিছু চালান এবার দেশে এসেছে। দেশের অন্যান্য স্থানে যেসব ইয়াবা ধরা পড়েছে তা মূলত ভারত থেকে আসা।

বর্তমানে রুট পরিবর্তন করে ভারতের মিজোরাম, ত্রিপুরা হয়ে বাংলাদেশে ইয়াবা আসা শুরু হয়েছে। তবে দেশে ইয়াবার চাহিদা যতদিন না কমবে ততদিন এর চোরাচালানও রোধ করা যাবে না। চোরাকারবারিরা বিকল্প রুট দিয়ে যে কোনো মূল্যে ইয়াবা নিয়ে আসবেই।

এ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) মাসুম রাব্বানি জানান, রাজধানীসহ বড়ো বড়ো শহর এলাকায় শক্তিশালী অভিযানের কারণে ইয়াবা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। তবে গ্রামাঞ্চলে ইয়াবা ছড়িয়ে পড়েছে। তাই গ্রামে শক্তিশালী অভিযান পরিচালনা করতে হবে। ইয়াবার পাশাপাশি মাদকের নতুন সংযোজন এলএসডি এখন দেশে আসছে। নৌপথ, আকাশ পথ ও সীমান্ত দিয়ে এখনো দেশে মাদক আসছে।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার জানান, ইয়াবা পাচারকারীদের রুট পরিবর্তন হয়েছে- এমন তথ্য আমাদের কাছে আছে। কুড়িগ্রামের রৌমারীসহ উত্তরাঞ্চলে সীমান্ত দিয়ে ইয়াবাসহ মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। নৌপথেও র‌্যাবের পক্ষ থেকে টহলের ব্যবস্থা রয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীরা যে ধরনের কৌশলের আশ্রয় নেবে, নিয়ন্ত্রণে আমরাও সেই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

বিশেষ অভিযানে মাঠে পুলিশ
                                  

বিশেষ প্রতিনিধি : আসন্ন পবিত্র ঈদ-উল-আযহা ঘিরে অপরাধমূলক তৎপরতা ঠেকাতে বিশেষ অভিযানে নেমেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। কারণ ঈদ এলেই রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি, চামড়া পাচার, অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি, জাল নোটের ব্যবসা, প্রতারক চক্রের সদস্যরা মারাত্মকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের অপরাধ কঠোরহস্তে দমনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তারপরও কোরবানির ঈদ যতোই ঘনিয়ে আসছে, ততোই ঈদকেন্দ্রিক অপরাধী চক্রের তৎপরতা বেড়ে চলেছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ঈদ ঘিরে সব ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতা বন্ধে পুলিশ, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড, র‌্যাব ও আনসারের প্রতিটি ইউনিটকে মাঠে নামানো হয়েছে। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় ওয়াচ টাওয়ার, সিসিটিভি ক্যামেরা ও চেক পোস্ট স্থাপন, টহল টিম গঠন করে মহাসড়ক টহল জোরদার শুরু করেছে। কারণ প্রতিবছরই ঈদের আগে ছিনতাই, ডাকাতি, মলম পার্টি, জাল নোট ব্যবসার দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়। বেড়ে যায় পথে-ঘাটে চাঁদাবাজি।

অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কথা মাথায় রেখে ঈদকেন্দ্রিক অপরাধমূলক তৎপরতা প্রতিরোধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুলিশ সদর দফতরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নির্দেশ পেয়ে ইতোমধ্যেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তৎপরতা শুরু করেছে। নির্বিঘেœ, নিরাপদে, নিশ্চিন্তে পবিত্র ঈদ-উল-আযহা উদযাপন নিশ্চিত করার জন্য বাস টার্মিনাল, নৌবন্দর, ফেরিঘাট ও রেলস্টেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে র‌্যাব, পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ইউনিফর্মের পাশাপাশি সাদা পোশাকে মোতায়েন করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান পরিচালনা শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ইতিমধ্যে রাজধানী ঢাকার ১৯টি এলাকা থেকে অজ্ঞান পার্টির ৪০ সদস্যকে আটক করেছে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। গত ৩১ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত বিশেষ অভিযানে তাদেরকে আটক করা হয়। আটক করার সময় অজ্ঞান পার্টির সদস্যদের কাছ হতে চেতনানাশক ট্যাবলেট, ট্যাবলেট মিশ্রিত খেজুর, হালুয়া ও জুস উদ্ধার করা হয়েছে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা জানিয়েছে- কোরবানির ঈদ সামনে রেখে ঢাকা শহরের বিভিন্ন মার্কেট, শপিং মল, পশুর হাট, বাসস্ট্যান্ড, সদরঘাট ও রেলস্টেশন এলাকায় টার্গেট করে ব্যক্তিদের সঙ্গে সখ্য তৈরি করে। পরে অপর সদস্যদের টার্গেট করা ব্যক্তি ও তাদের সদস্যকে খাদ্যদ্রব্য (ট্যাবলেট মিশ্রিত) গ্রহণের আমন্ত্রণ জানায়। টার্গেট করা ব্যক্তি রাজি হলে ট্যাবলেট মিশ্রিত খাদ্যদ্রব্য তাকে খাওয়ায় এবং নিজেদের সদস্যরা সাধারণ খাবার গ্রহণ করে। খাদ্যদ্রব্য গ্রহণের পর টার্গেট ব্যক্তি অচেতন হলে মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে তারা দ্রুত সটকে পড়ে।

এ ক্ষেত্রে অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা খাদ্যদ্রব্য হিসেবে চা, কফি, জুস, ডাবের পানি, পান, ক্রিমজাতীয় বিস্কিট ব্যবহার করে সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে সটকে পড়ে। পবিত্র ঈদ-উল-আযহাকে সামনে রেখে এই ধরনের অপরাধী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, গত ৩১ জুলাই রাত থেকে রাজধানী ঢাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা শুরু হয়েছে। গত চব্বিশ ঘণ্টায় রাজধানী ঢাকায় অজ্ঞান ও মলম পার্টি, জাল টাকা তৈরি চক্রের সদস্য, প্রতারক, চাঁদাবাজ ধরা পড়েছে। ঈদ পর্যন্ত বিশেষ অভিযান পরিচালনা অব্যাহত থাকবে।

পুলিশে শুদ্ধি অভিযানের উদ্যোগ
                                  

বিশেষ প্রতিনিধি : নানা কেলেঙ্কারি সংঘটনকারী কিছুসংখ্যক কর্মকর্তার জন্য পুলিশ বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ সদর দফতর পুলিশ প্রশাসনের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার উদ্যোগ নিচ্ছে। ওই লক্ষ্যে দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, মাদকসেবী, অনৈতিক কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরিসহ নজরদারি করা হচ্ছে। সদর দফতরের পক্ষ থেকে অসৎ, দুর্নীতিবাজ, অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যাবস্থা গ্রহণ করতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। পুলিশ সদর দফতর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, রাজধানীর ৫০ থানাসহ ঢাকা মহানগরীর পুলিশের সব পর্যায়ের সদস্য কর্মকর্তার গতিবিধির ওপর ইতিমধ্যে নজরদারি শুরু করা হয়েছে। এ বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার সম্প্রতি এক আদেশে বলেন, সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশের কতিপয় সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধমূলক ও অনৈতিক কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েক সদস্য ছিনতাইয়ে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ কিংবা জনতার হাতে আটক হয়েছেন। বিভিন্ন মাদক- যেমন গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা ইত্যাদি সেবনের জন্য অনেকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। মাদক কারবারিদের সহায়তা কিংবা প্রশ্রয় দেয়ার অভিযোগে কয়েকজন অভিযুক্ত হয়েছেন। তাছাড়া টহল পার্টির কতিপয় সদস্যের বিরুদ্ধে (বিশেষ করে রাত্রিকালীন) নিরীহ জনসাধারণকে সন্দেহভাজন হিসেবে আয়ত্তে নিয়ে টহল গাড়িতে তুলে নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে বিভিন্ন জায়গা প্রদক্ষিণ করে থানায় না নিয়ে অর্থ আদায় করে পথিমধ্যে তাদের ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ উঠার ঘটনা ওপেন সিক্রেট।

সূত্র জানায়, বিতর্কিত ডিআইজি মিজান, সোনাগাজীর ওসি মোজাম্মেল, পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত গাজী মোজাম্মেলসহ কয়েক পুলিশ কর্মকর্তা এখন আলোচিত নাম। পুলিশে কনস্টেবল নিয়োগের বিষয়ে নিয়োগ বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্যের টাকা ফেরত দান ইত্যাদি ঘটনা দুর্নীতিমুক্ত পুলিশ প্রশাসনের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এমন পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে দুর্নীতিবাজ, অসৎ পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নজরদারিসহ কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে পুলিশ সদর দফতর। দুর্নীতিবাজ ও দুশ্চরিত্র বিতর্কিত ডিআইজি মিজান কা-ের ঘটনার প্রায় একই সময়ে ফেনীর সোনাগাজি থানার ওসি মোজাম্মেলের ঘটনা পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তির জন্য নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আবার ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তার কেলেঙ্কারির রেশ না কাটতেই অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে এক বয়োবৃদ্ধের জমি নিজ নামে জোরপূর্বক লিখে নেয়ার অভিযোগ উঠে। তাছাড়া পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগ নিয়ে কয়েকটি জেলায় নিয়োগ বাণিজ্য হয়েছে এমন অভিযোগও উঠেছে। শুধু তাই নয়, ঘুষ, দুর্নীতির টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে এমন অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়েছে।

এদিকে, পুলিশ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অপকর্মের দায় নিতে রাজি নয়। সেজন্যই পুলিশ বাহিনীর হাতেগোনা যেসব কর্মকর্তার দুর্নীতি, অনৈতিক কার্যকলাপ, ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদির অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। পুলিশের ভাবমূর্তির প্রশ্নে কোন আপোস করা হবে না। অনেক সদস্যের ত্যাগ ও তিতিক্ষা ও জীবনের বিনিময়ে গড়ে ওঠা পুলিশের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি নষ্ট হতে দেয়া যাবে না। যে কোন মূল্যে পুলিশের ইমেজ বিল্ডআপ করা হবে।

অন্যদিকে পুলিশের আইজিপি ড. জাবেদ পাটোয়ারী নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই বিভাগীয় দুর্নীতি, ঘুষ, অনৈতিক কার্যকলাপ বন্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে সফলও হন। আইজিপি বাহিনীর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য গত বছর থেকে পুলিশে নিয়োগ বাণিজ্য বন্ধে নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। তার সক্রিয় পদক্ষেপে ’১৮ সালের কনস্টেবল নিয়োগে স্বচ্ছতা অনেকটাই নিশ্চিত হয়। এবার ’১৯ কনস্টেবল নিয়োগে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার ঘোষনা দিয়েছেন স্বয়ং আইজিপি। গত মাসের ২২ তারিখ থেকে সারাদেশে কনস্টেবল নিয়োগ শুরু হয়। ইতোমধ্যে আইজিপি ড. জাবেদ পাটোয়ারী ৬৪ জেলার এসপি এ বিষয়ে সতর্ক থাকার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও দু-একটি জেলায় কনস্টেবল নিয়োগ নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে, যা এখন তদন্তনাধীন।

 

আয়ু থাকে না বিআরটিসি বাসের
                                  

বিশেষ প্রতিনিধি : রাষ্ট্রীয় সড়ক পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের (বিআরটিসির) জন্য সরকার বিপুল টাকা খরচ করে নতুন বাস কিনলে স্বল্পসময়েই তা নষ্ট হয়ে যায়। বিআরটিসির নতুন বাসগুলো লাইফ টাইমের তিন ভাগের একভাগ সময়ও রাস্তায় চলার নজির নেই। বরং খুব স্বল্পসময়ের মধ্যে মেরামত কারখানায় ওসব বাসের ঠাঁই হয়। আর সংস্থায় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট চক্রের কারসাজির কারণে লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি বছরের পর বছর ডিপোতে পড়ে থাকে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকা ও আধুনিক মেরামত কারখানার অভাবে ওসব বাস সহজেই সংস্কারের মুখ দেখে না। এমনও রয়েছে নতুন আমদানি করা বাসে দুই মাসের মাথায় ছাদ ফুটো হয়ে পানি পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে বিআরটিসির বাসগুলো এতো স্বল্পসময়ে কীভাবে নষ্ট হচ্ছে। বিআরটিসি সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত প্রায় দুই দশকে বিআরটিসির জন্য কেনা সব বাস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিগত ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে বিআরটিসির জন্য প্রগতির কাছ থেকে মাসিক কিস্তিতে ৪১৭টি ভারতীয় টাটা কামিজ বাস কেনা হয়েছিল। ওসব বাস ১০ বছর সচল থাকার কথা থাকলেও পাঁচ বছরের মাথায় বিকল হয়ে পড়ে। বর্তমানে সংস্থাটির প্রায় শ’খানেক বাস কোন মতে সচল রয়েছে। বিগত  ২০০৯ সালে চীন থেকে ১২২ কোটি ৪৯ লাখ টাকায় কেনা হয় ২৭৯ ডং ফেং বাস। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দুই বছরের মাথায় ওসব বাস নষ্ট হতে শুরু করে। এখন ১৫৯টি বাসই চলাচলের একেবারে অযোগ্য। বাকিগুলো বিভিন্ন ডিপোতে অচল রয়েছে। ২০১৩ সালে ২৮২ কোটি টাকায় আনা হয় দক্ষিণ কোরিয়ার দাইয়ু কোম্পানির ২৫৫টি বাস। প্রতিটি বাসের দাম পড়ে কোটি টাকার বেশি। কারিগরি শাখার তথ্যানুযায়ী ৬ বছর পার না হতেই ৮১ বাস নষ্ট হয়ে যায়। সেগুলো এখন মেরামত অযোগ্য। আর  ২০১৩ সালে ভারত থেকে ঋণ নিয়ে কেনা আর্টিকুলেটেডসহ ৪২৮ বাসের ৩৩টি বিকল হয়ে গেছে।

সূত্র জানায়, সর্বশেষ দুই মাস আগে নতুন গাড়ি বহর যুক্ত হওয়ার আগে বিআরটিসির অধীনে ছিল ১ হাজার ৪৪৫ বাস। সেগুলোর মধ্যে সচল ৯২১টি। আর অকেজো অবস্থায় ডিপোতে পড়ে আছে ৫২৪ বাস। তার মধ্যে ৩৬০টি বাস বড় ধরনের মেরামত প্রয়োজন। তার বাইরে সময়ে সময়ে আরো প্রায় আড়াইশ’ বাস নষ্ট হয়ে থাকে। আর মেরামত করা ১৬৪ বাস আর্থিকভাবে কার্যকর লাভজনক নয়। বর্তমানে বিআরটিসির বাস চলাচল করে ৩৯১ রুটে। সব মিলিয়ে সংস্থাটির প্রায় ৮০০ বাস নষ্ট। রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থাটি গত আড়াই বছর ধরে লোকসান গুনছে। এ প্রতিষ্ঠানের বর্তমানে ৯ কোটি টাকার বেশি লোকসান। যে কারণে কল্যাণপুর ডিপো ছাড়া দেশের সবকটি বাস ডিপোতে বেতন বকেয়া পড়েছে। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ চলছে। তাছাড়া গত কয়েক বছরে বিআরটিসির কেনা ৫শ’ বাসই এখন ভাঙ্গাড়ি হিসেবে বিক্রির অপেক্ষায় রয়েছে। যাত্রীবাহী বাস ২০ থেকে ২৫ বছর রাস্তায় সচল থাকলেও বিআরটিসির বাস কেন ৩-৫ বছরের বেশি চলে না। অথচ যথাযথ পরিচর্যা করলে একেকটি বাস ২০ বছর পর্যন্ত সচল রাখা যায় বলে জানান পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র আরো জানায়, বাস কেনার জন্য মন্ত্রণালয় ও বিআরটিসি মিলে গঠিত কমিটি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দেশে গিয়ে বাস দেখে এলেও শেষ পর্যন্ত শতভাগ মান নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। মূলত মান যাচাই না করেই প্রতিবার বাস আমদানি করা হয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে ওসব পরিবহন নষ্ট হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, ক্রয় সংক্রান্ত কমিটির উদাসীনতা ও দুর্নীতির কারণেই বিআরটিসি বারবার বাস আমদানিতে ধরা খাচ্ছে। এক পর্যায়ে ওসব বাস ডিপোতে ঢুকিয়ে মেরামতের চেষ্টা চলে। মেরামতের নামে যন্ত্রপাতি আরো বিকল ও হারিয়ে যায়। ওই প্রেক্ষিতে কিছুদিন পর বেশিরভাগ বাস মেরামতের অযোগ্য ঘোষণা হয়। নিলামে বিক্রি হয় যন্ত্রপাতি। আবারও তৎপরতা শুরু হয় নতুন পরিবহন আমদানির।

এদিকে ১৯৯৯ সালে সুইডেন থেকে ৫০টি দোতলা ভলভো বাস কেনা হয়েছিল। এগুলো রাস্তায় নামানো হয়েছিল ২০০২ সালে। ৬ বছরের মাথায় নষ্ট হতে শুরু হলে ৪৮টিরইি মেরামত করা হয়নি ৪৮টির। ৫০টি দ্বিতল ভলভো বাসের মধ্যে এখন চলছে মাত্র দুটো। অচল বাসগুলো মিরপুর-১২ ও গাজীপুর ডিপোতে পড়ে আছে। একেকটি বাসের দাম পড়েছিল এক কোটি তিন লাখ টাকা। সুইডেন থেকে আমদানি করা এ বাসগুলোর জীবনকাল ধরা হয়েছিল ১৫ বছর। কিন্তু যথাসময়ে যন্ত্রাংশ লাগানো না হওয়ায় সেগুলো অচল হয়ে গেছে।

জানা যায়, ভলভো বাসগুলো মানসম্মত ছিল না। বাস কেনা হলেও যন্ত্রপাতি কেনা হয়নি। তাছাড়া এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বেশি। তাছাড়া দোতলা ভলভোর চেয়ে বেশি দাম দিয়ে কেনা হয়েছিল ৫০টি জোড়াবাস। ৫৪ ফুট লম্বা এ জোড়াবাসের বাহারি নাম ‘আর্টিকুলেটেড বাস’। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলতে দেখে শখের বশেই এদেশেও এটি আনা হয়। একেকটি জোড়াবাসের দাম পড়েছিল এক কোটি ১১ লাখ টাকা। ওসব বাস কেনার সময় জোড়া লাগানো অংশগুলো পুর্নস্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া হয়নি। খুচরা যন্ত্রাংশ কেনা হয়নি। ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই বেশিরভাগ বাস অচল হয়ে পড়ে। আর সিঙ্গেল ডেকার বাসের মধ্যে কোরিয়া থেকে আনা হয় ২৫৩টি, এর মধ্যে ১৮৫টি নষ্ট। চীন থেকে আনা হয় ২৪৫টি সিঙ্গেল ডেকার বাস। তার মধ্যে নষ্ট হয়ে আছে ১২৭টি। ভারত থেকে আনা হয়েছিল ৪৪৩টি সিঙ্গেল ডেকার বাস। নষ্ট হয়ে আছে ১৮৮টি। ভারত থেকে কেনা হয়েছিল ৪৫৮টি ডাবল ডেকার বাস। তার মধ্যে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে ১৫২টি। ২০১২ সালে কোরিয়া থেকে কেনা ৪৫টি বাস এবং ভারত থেকে কেনা ৩০টি বাসই বিকল হয়ে গেছে। তাছাড়া রাজনৈতিক সহিংসতায় আগুনে পুড়ে অচল হয়েছে ৫টি বাস। এর আগে ২০১০ সালে নরডিক ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (এনডিএফ) ঋণে চীন থেকে কেনা ২৭৫টি বাসের মধ্যে ১১৫টিই অচল হয়ে আছে বিভিন্ন ডিপোতে।

বিআরটিসি কর্মকর্তারা বলছেন, রাষ্ট্রীয় এই পরিবহন সংস্থায় হাজারো ভূতে ঘর বেঁধেছে। সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ডিপো ও মেরামত কারখানা পর্যন্ত সিন্ডিকেট চক্রের কারণেই মূলত অনেক সময় ভাল বাসও অচল হয়ে যায়। বারবার আক্রান্ত হয় রোগে। কিন্তু রোগ আর সারে না। বাংলাদেশের কাছে ২০১৩ সালে ৩০০ সিএনজিচালিত বাস বিক্রি করেছিল দক্ষিণ কোরিয়া। দাইয়ু কোম্পানির বাসগুলোর অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল বলা হয়েছিল ১৫ বছর। অথচ ৬ বছর না হতেই বেশিরভাগ বাস লক্কড়-ঝক্কড় হয়ে যায়। ওসব বাস মেরামতে বাংলাদেশ সরকারকে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ)।  দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আনা ৫২ আসনের ৩০০ দাইয়ু বাসের মধ্যে ১৫০ এসি ও ১৫০টি নন-এসি। তার মধ্যে ৮টি একেবারেই মেরামতের অযোগ্য। চারটি পুড়েছে রাজনৈতিক আগুনে। বাকি সব বাসেরই লক্কড়-ঝক্কড় অবস্থা। কিছু বাস ঢাকা-গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিআরটিসি ডিপোতে রেখে একদিন মেরামত করে দু’দিন চালানো হয়। তবে ১৪১টি বাসের জরুরি মেরামত প্রয়োজন ছিল। সেক্ষেত্রে বিআরটিসি হিমশিম খাচ্ছিল বিধায় তারা দক্ষিণ কোরিয়ারই উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ইডিসিএফের দ্বারস্থ হয়। আর ওই আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনুদানের হাত বাড়িয়েছে দিয়েছে দক্ষিণ কোরীয় সংস্থাটি। তারা যে অনুদান দিয়েছে তাতে এখন ৪০ বাসের মেরামত সম্ভব। নিজস্ব অর্থায়নে মেরামত চলছে আরো ২০টির। তারপরও আরো ৮১ বাসের মেরামত জরুরী। বিআরটিসির বিভিন্ন ধরনের বাসের সংখ্যা ১ হাজার ৪৪৫টি। এর মধ্যে নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে ৫২৪টি। আর সচল বাসের মধ্যে ঢাকায় চলছে ৬২০টি। তার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারী অফিসের স্টাফ বাস ২৭২টি। সাধারণ যাত্রীসেবায় নিয়োজিত রয়েছে ৩৪৮টি বাস। এর মধ্যে আবার বেসরকারী খাতে ইজারায় চলছে ৮৮টি বাস। আর ঢাকার বাইরে চলাচল করছে ৩০১টি বাস।

অন্যদিকে বিআরটিসির নিজস্ব দুটি ওয়ার্কশপ থাকলেও সেখানে বাস মেরামতের তেমন একটা সুযোগ নেই। তার মধ্যে গাজীপুরে লগোপাড়ায় অবস্থিত সমন্বিত কেন্দ্রীয় ওয়ার্কশপটি (মেরামত কারখানা) দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। আর রাজধানীর তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় ওয়ার্কশপটি মূলত সরকারী, আধাসরকারী ও স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন সংস্থার হালকা গাড়ি (জীপ, মাইক্রোবাস) এবং অল্পসংখ্যক বাস-ট্রাক মেরামতের কাজ করে থাকে। তবে এ ওয়ার্কশপে বিআরটিসির কোন বাসের মেরামত হয় না। গাজীপুরের ওয়ার্কশপটি ১৯৮১ সালে ১৪ একর জায়গার ওপর জাপানী কারিগরি ও আর্থিক অনুদানে নির্মিত হয়। ওই ওয়ার্কশপে গাড়ি সংযোজন, বডি নির্মাণ ও গাড়ি মেরামত করা হতো। সেখানেই ভলভো দ্বিতল বাস-এর বডি সংযোজন করা হয়েছিল। তাছাড়া ২০০৯ সালে সরকারের কাছ থেকে ৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ১১১টি একতলা ও দ্বিতল গাড়ির ভারি মেরামত কাজ সম্পন্ন করা হয় এখানে। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে বর্তমানে ওয়ার্কশপের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বিআরটিসির বাস চলাচল করে মূলত ১৯ ডিপো থেকে। এর মধ্যে মাত্র দুটি ডিপোতে (কমলাপুর ও কল্যাণপুর) রয়েছে শেডের ব্যবস্থা। সেসব স্থানে গাড়ির সামান্য ত্রুটি সারাতেও দৈনিক ভিত্তিতে বাইরে থেকে টেকনিশিয়ান নিয়ে আসতে হয়। এছাড়া সংস্থাটির গাড়ি ধোয়ার জন্য নেই কোন ওয়াশিং প্ল্যান্ট। গাড়ি পরিষ্কারের কাজ ম্যানুয়ালি করা হয়।

এ বিষয়ে বিআরটিসির চেয়ারম্যান ফরিদ আহমদ ভূঁইয়া জানান, দক্ষিণ কোরিয়া সহজ ঋণে আমাদের বাস সরবরাহ করেছিল। এখন বাসগুলো মেরামতেও চার লাখ ডলার অনুদান দিয়েছে। এই অনুদান ও সরকারী অর্থায়নে মোট ৬০টি বাস মেরামত করা হচ্ছে। কিছু বাস ইতোমধ্যে সড়কে চলাচলও করছে। আরও ৮১ বাস মেরামত জরুরী। সেজন্য দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে আরো ৩০ লাখ ডলার অনুদান চাওয়া হয়েছে। আর ইন্ডিয়া থেকে আনা বাসের ইঞ্জিন টাটার তৈরি হলেও, বডি এসিজিএল গোয়া নামের একটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের তৈরি। চুক্তি অনুযায়ী, তারা দুই বছর বিক্রয়োত্তর সেবা দেবে। তাদের প্রতিনিধিদের ডাকা হয়েছে। তারা বাংলাদেশে এসে সমস্যার সমাধান করে দেবে। ভারত থেকে কেনা বাসগুলোর আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে ২০ বছর।

জামায়াতীদের নাগরিক মর্যাদা বদলানো দরকার
                                  

বশীর আহমেদ : বিগত কুড়ি-শতক কালপর্ব মানব সভ্যতার অভাবনীয় অগ্রগতিতে যেমন আলোকিত, তেমনি সভ্যতার চরম অধোগতির কালিমালিপ্ত ঘটনাতেও আকীর্ণ সে ইতিহাস। বিগত শতকে বিশ্ববাসী মানবতার চরম অবমাননা প্রত্যক্ষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে, যখন হিটলারের নাৎসী জার্মানী জাতিগত ইহুদী-নিধন অভিযান সুসংগঠিত-বিস্তৃত আকার দেয়। হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের গ্যাস চেম্বারে লাখ লাখ মানুষ হত্যার ঘটনা যুদ্ধ চলাকালে কেউ ধারণাও করতে পারেননি। একেবারে চুড়ান্ত লগ্নে সোভিয়েত লাল ফৌজ এবং মার্কিন বাহিনী জার্মান ভূখন্ডে প্রবেশ করলে আবিস্কৃত হয় গ্যাস চেম্বাররুপী রক্তহীম করা জল্লাদখানা।

যুদ্ধ-সংঘাতের অনুসঙ্গ যুদ্ধাপরাধ বিচারের জন্য যে আলদা দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন সে শিক্ষা মানবজাতি প্রথম উপলব্ধি করে দ্বিতীয় মহাসমরের নির্মমতা প্রত্যক্ষ করার পর। বিশ্বযুদ্ধের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অতঃপর বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠা করে জাতিসংঘ এবং ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার সনদের পাশাপাশি গণহত্যা প্রতিরোধে গৃহীত হয় জেনোসাইড কনভেনশন।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, জেনোসাইড কনভেনশন প্রণীত হলেও বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর অনৈতিক খেলায় নিপীড়িত মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোর কোন লক্ষ্যণীয় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ পরে আর দেখা যায়নি। যুদ্ধাপরাধের প্রতিবিধান বা বিচার সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিরাজমান এ বন্ধ্যা সময়টিতে বাংলাদেশসহ আর্জেন্টিনা, চিলি, ইন্দোচীনের কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, আফ্রিকার রুয়ান্ডা, বলকান অঞ্চলের বসনিয়া-হার্জেগোভিনা এবং ক্রোয়েশিয়ায় সংঘটিত হয় লোমহর্ষক গণহত্যা এবং জাতিগত নিশ্চিহ্নকরণ অভিযান।
সে যাই হোক, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর যুদ্ধক্লান্ত দেশগুলোতে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তিদের বিচারের পাশাপাশি তাদের পরবর্তী বংশধারা সম্পর্কে নেয়া হয় বিশেষ উদ্যোগ। জার্মানীতে নাজিবাহিনীর নৃশংসতা অনুধাবনের সুযোগ দেয়া হয় অপরাধীচক্রের পরবর্তী বংশধরদের। তাদের দেখানো হয় যুদ্ধাপরাধের সাইটগুলো এবং মোটিভেশনের মাধ্যমে ঘৃণা করতে উদ্বুদ্ধ করা হয় পূর্বপুরুষের কৃতকর্ম। নাজীবাদের রাজনীতি চিরতরে নিষিদ্ধ, নাগরিক অধিকার সীমিতকরণসহ সামাজিক নানা বিধিনিষেধের আওতায় রাখা হয় তাদের। বিশ্বযুদ্ধের শিকার অপরাপর দেশগুলোতেও গৃহীত হয় অনুরূপ ব্যবস্থা।   
ইন্দোচীনে মার্কিন হামলার শিকার ভিয়েতনাম আগ্রাসন-মুক্তির পর দখলদার মার্কিন বাহিনীর সহযোগী দেশীয় অপরাধীদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করে আরও কঠোর ব্যবস্থা। সেখানে অপরাধী পরিবারগুলোর সদস্যদের নাগরিক মর্যাদা অবদমন, ভোটাধিকার হরণ এবং সরকারী কর্মক্ষেত্রে তাদের নিষিদ্ধ করা হয়। একজন ভিয়েতনামীর পাশে এদের অবস্থান হয় স্রেফ ভারবাহী পশুর মত। এরা ভিয়েতনামে নানা অবরোধের শিকার হয়েই আছে। জাতির মূলধারায় ফিরতে চাইলে অনেক বাধাবিপত্তি অতিক্রম করেও তা সম্ভব করা এখনও অত্যন্ত কঠিন।

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পর অস্ত্র হাতে মুক্তিযোদ্ধারা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্বাধীনতা বিরোধীদের ‘ফাইনাল স্যলিউশন’ টানতে বঙ্গবন্ধুর ফেরার অপেক্ষায় থাকেন। ১০ জানুয়ারী দেশে ফিরে পরিস্থিতি আঁচ করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নিরস্ত্র করার উদ্যোগ নেন এবং আরেকটি নিশ্চিত ‘ব্লাডশেড’ পরিহার করেন। বাহাত্তরের ২৪ জানুয়ারী সরকার ‘বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) অধ্যাদেশ-১৯৭২’ ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এদেশীয় সহযোগীদের বিচারের জন্য গঠন  করে ৭৩টি ট্রাইব্যুনাল। ‘৭৩ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত দালাল অধ্যাদেশে অভিযুক্ত হয় ৩৭,৪৭১ ব্যক্তি, অভিযোগ নিষ্পত্তি হয় ২,৮৪৮টি এবং মাত্র ৭৫২ অভিযুক্তকে দেয়া হয় দণ্ডাদেশ। একই বছরের ৩০ নভেম্বর দালালদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাঙালীরা জানে, কিভাবে ক্ষমা করতে হয়’।

পঁচাত্তরের পনের আগষ্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি জামায়াত-বান্ধব বললে অত্যুক্তি হবে না। এ সময়টিতে কুখ্যাত স্বাধীনতা-বিরোধীদের উত্থান ঘটে সর্বত্র। অনুকূল পরিস্থিতির পূর্ণসুযোগ নিয়ে জামায়াত সংগঠন গোছাতে লেগে পড়ে। শিক্ষাঙ্গণে আগমন ঘটে চরম প্রতিক্রিয়াশীল ছাত্রশিবিরের। একইসাথে আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়তে উদ্যোগী হয় জামায়াত। বলাবাহুল্য, এ সবকিছুতে তারা সফল হয় দারুণভাবে।
পঁচাত্তর পরবর্তী চৌত্রিশ বছর দেশের রাজনীতিতে জামায়াত সদম্ভেই ছড়ি ঘুরিয়েছে। বাঙালী জাতির মহানুভবতার কোন মূল্য না দিয়ে ¯স্বাধীন দেশের মুক্ত বাতাসে অবাধ বিচরণের সুযোগ তারা অপব্যবহার করেছে চরমভাবে। নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ বা জাতির মূলস্রোতে মিশে যাবার পরিবর্তে তারা জাতিকেই নিয়ন্ত্রণের চক্রান্ত করেছে বারবার। জামায়াতের ধারাবাহিক এই চক্রান্ত প্রথমবারের মত কঠিন বাধার সম্মুখীন হয় ২০০৯ সালের পর- মানবতাবিরোধী  অপরাধ বিচারের জন্য গড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কাজ শুরু করলে। এর আগে রাজনীতিতে জাপা, বিএনপি এমন কি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগকেও তারা ঘোলা পানি খাইয়েছে। রাজনীতির ফাঁদে ফেলে আওয়ামী লীগকে রাজাকার-আলবদর শব্দ উচ্চারণই করতে দেয়নি ‘৯৬ সালে বেশ কিছুদিন। বিএনপিকে বাধ্য করেছে নিজস্ব রাজনীতি ভূলে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর গাড়ীতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তুলে দিতে। সেই সাথে স্বাধীনতাপ্রিয় বাংলাদেশের মানুষের মনে সর্বদা ভীতিকর অস্তিত্ব নিয়ে বিরাজ করে আসছে জামায়াতে ইসলামী।

জামায়াতের এই বিধংসী রাজনীতি বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতিতে কি মাত্রায় ক্ষতিকর প্রভাব ছড়িয়েছে তা ভালভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। আরও দরকার, রাজনৈতিক সম্প্রীতি কলুষিত করার মধ্য দিয়ে একাত্তরে পরাজিত জামায়াতের শবাধারে বিজয় কেতন উড়ানো বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় বাধা সৃষ্টির সুদূরপ্রসারী জামায়াতী অশুভ প্রয়াস নিয়ে কার্যকর গবেষণা।  ভাল হয়, কাজটি যদি জামায়াতের হটকারী রাজনীতির খপ্পরে নাজেহাল ভূক্তভোগী রাজনীতিকরা করেন।

বাস্তবতা হলো, শান্তির ধর্ম ইসলামকে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ প্র্যাকটিস করায় মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনের অসন্তুষ্টিতে পড়া স্বাধীনতা-বিরোধী  জামায়াতী তরিকায় আসক্তদের ‘মানুষ’ হওয়াটা করুণাময় আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তবে ‘মান এবং হুঁশ’ নিয়ে যে মানবসত্ত্বা, তাতে ঘাটতিজনিত কারণে আজন্ম হটকারী জামায়াত সমর্থনকারীরা বুঝতে অক্ষম যে, পবিত্র কুর’আন শরীফের বয়ান শুনিয়ে আসলে তাদের কোন্ গাড্ডায় টেনে নামানো হয়েছে। এ হলো মানবজাতির চিরশত্রু ইহুদী জায়নবাদের ‘আমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি’ তত্ত্বের ভয়ানক বর্ণবাদী নিজস্ব আবিষ্কার, যা কাজে লাগিয়ে জায়নবাদের মুরুব্বীরা হাজার বছর তাদের কর্মীদের মনে ভিন্ন জাতিগোষ্ঠির বিরুদ্ধে অবিরাম জিঘাংসা জিইয়ে  রাখতে সক্ষম হয়েছে।

সৌভাগ্যবশত, ন্যায় বিচারক সুমহান আল্লাহর ইচ্ছায় সুদীর্ঘ সাতচল্লিশ বছর পর হলেও জুলুমবাজ জামায়াতীরা স্বীয় হটকারীতার উপযুক্ত প্রতিবিধান ন্যায্যতার ভিত্তিতেই পেয়েছে, এখনও পাচ্ছে এবং আগামীতেও পাবে- ইনশাআল্লাহ।

সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামী গড়ে তোলার অভিপ্রায় সম্পর্কে বলা হয় যে, সময়ের পথ পরিক্রমায় ইসলাম ধর্মে পুঞ্জিভূত আনাচার পরিশুদ্ধির ‘সামাজিক আন্দোলন’ পরিচালনার মহৎ উদ্দেশ্যে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু সত্য যে, জামায়াতপন্থীরা অচিরেই লক্ষ্যচ্যুৎ হলে সংগঠনটি ক্রমাগত সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং চরম হটকারীতার ধারক হিসেবে পরিচিতি অর্জন করে। জামায়াতের জন্মস্থান পাকিস্তান ভূখন্ডেই রয়েছে এর নানা প্রমাণ।

জামায়াতের মানবতা বিরোধী বিজাতীয় তরিকা সরলপ্রাণ গণমানুষের প্রতি অতিশয় জিঘাংসা-প্রবণ। ‘৭১ সালে নিরপরাধ সাধারণ মানুষের সহায় সম্পদ ইসলামী পরিভাষায় ‘মালে গণিমত’ সাব্যস্ত করে তদনুযায়ী নিষ্ঠুরতার চুড়ান্ত কর্মব্যবস্থা কার্যকর করেছিল জামায়াতের নেতা-সমর্থকরা। বাংলাদেশে পাইকারী গণহত্যা, বাছবিচারহীন নারী ধর্ষণ, জোরপূর্বক দেশান্তর, হেট ক্যাম্পেইন, সম্পদ বিনাশের মত ঘৃণ্য অমানবিক পদক্ষেপে তারা কেবল সহায়তাই করেনি, পবিত্র ইসলাম ধর্মের অপব্যাখ্যা করে তাতে নিজেরাও অংশ নিয়েছিল সমান আন্তরিকতায়। এর মধ্য দিয়ে জামায়াত তাদের ধারাবাহিক হঠকারীতার চুড়ান্ত প্রমান রাখে। অর্থাৎ ইসলাম পরিশুদ্ধির এজেন্ডা ছেড়ে শুরুতেই জামায়াত যে বিধংসী রাজনীতি চর্চায় মনোযোগী হয়েছিল তা অব্যহত রেখেছে আগাগোড়া, কেবল ঢাল হিসেবে ধর্ম ইসলাম ঝুলিয়ে রেখেছে সামনে।

একই সাথে জামায়াত সমর্থকরা আল্লাহ‘র মেহেরবানীর পরোয়া না করে দুনিয়ায় সদম্ভে কায়েম করার চেষ্টা করেছে নিজেদের ‘হেকমত’। জামায়াতীদের এই হেকমতি তৎপরতা ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে মানুষ এবং ভূখন্ডের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির কারণ ঘটানো ছাড়া কখনো কল্যাণ সাধনে সক্ষম হয়নি। আর সে কারণে ন্যায়-পরায়ণ আল্লাহ তাদের মতলবী হেকমত পছন্দ করেননি এবং অপমান-লাঞ্ছনা-পরাজয় অবিরত তাড়া করে ফিরছে জামায়াতীদের। সুতরাং পরম করুণাময়ের ইচ্ছার প্রতি অনুগত থেকে জামায়াতীদের ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করাটাই হচ্ছে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসীদের কর্তব্য।

আমাদের অভিজ্ঞতায় স্বাধীনতা বিরোধী বিকৃত চিন্তা-চেতনার ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াতের বর্তমান অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে সময়োপযোগী করণীয় নির্ধারণ অত্যন্ত জরুরী। মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তি কড়া নাড়ছে আমাদের দুয়ারে। এখনও নিঃশেষিত হননি আমাদের জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা এবং মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষকারী সাহসী প্রজন্ম। সুতরাং পরাজয়ের গ্লানিজনিত স্বাধীনতা-বিদ্বেষ পুষে রাখা জামায়াতগোষ্ঠি সম্পর্কে অতীতে গৃহীত ঐতিহাসিক ভূল অথবা বিভ্রান্তি- যাই বলা হোক না কেন, দেশ-জাতির বৃহত্তর কল্যণে সংশোধন করাটা এখন সময়ের দাবী।

ইতোমধ্যে, নিজেদের দুষ্কর্মের কাফ্ফারা চুকাতে বাধ্য হয়েছে জামায়াতের শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীরা। দলীয় নিবন্ধন বাতিলের মধ্য দিয়ে বাধাগ্রস্ত হয়েছে জামায়াতের রাজনৈতিক সক্রিয়তার সুযোগ। এগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে। ফলে দাপট হারিয়ে জামায়াতে ইসলামী আপাতত রাজনৈতিক পরনির্ভরতা স্বীকারে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট নয়। একটি অনিষ্টকর আদর্শ হিসেবে জামায়াতের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি না ঘটলে কালক্রমে এ বিষবৃক্ষের ছায়াবিস্তারী ডালপালা নিষ্ক্রিয় বসে থাকবে না। যেমন হয়েছে অতীতে। কাজেই ভবিষ্যতে আর কেউ যেন জামায়াতের কাফেলায় আশ্রয় খোঁজার চিন্তাও না করে সেজন্য প্রথম দরকার এদের পরিপূর্ণ একটি তালিকা করা। দ্বিতীয়ত. এ তালিকা ধরে জামায়াতী আদর্শ অনুসরণকারীদের আইন করে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক ঘোষণা এবং সে অনুযায়ী সরকারী গেজেট নোটিফিকেশন। এ মহতি কাজ সাফল্যের সাথে নিষ্পন্ন করতে গোটা জাতিকে হতে হবে এককণ্ঠ। বলাবাহুল্য, উদ্যোগ নিলে এর বাস্তবায়ন মোটেই অসম্ভব নয়।

এ ব্যবস্থায় দ্বিতীয় শ্রেণীর জামায়াতী নাগরিকদের ভোটাধিকার, সংগঠন করার অধিকার, সরকারী চাকুরী গ্রহনের অধিকার দেয়া যাবে না। সাধারণ কর্মক্ষেত্রে একজন বাংলাদেশী নাগরিকের বেতন যদি হয় এক শ’ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণীর এ নাগরিকের বেতন সেক্ষেত্রে হবে পঞ্চাশ টাকা। একইসাথে সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আরোপ করতে হবে প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ এবং গ্রহণ করতে হবে কার্যকর মোটিভেশন কর্মসূচী। জামায়াতী তরিকা ছেড়ে মূল ধারায় ফিরতে আগ্রহীদের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে গুরুত্ব দিয়ে। এতে করে জামায়াতী তরিকার ধারে কাছে কেউ আর ঘেঁষতে চাইবে না এবং কালক্রমে স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াতী গজব থেকে নিষ্কৃতি পাবে দেশবাসী। ৩০ লাখ শহীদের আত্মাহুতির বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ এবং এর অদম্য সৃষ্ঠিশীল ১৬ কোটি মানুষ অনিষ্টকর জামায়াতী ফেতনা আর দেখতে চায় না।

ফেলানী হত্যার আট বছর
                                  

স্বাধীন বাংলা ডেস্ক: ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রাম সীমান্তে বাংলাদেশে ফেরত আসার সময় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে নিহত হয় কিশোরী ফেলানী। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে এ ঘটনা ঘটে। আজ সে ঘটনার আট বছর হলো। তবে সে ঘটনার বিচার এখনো শেষ হয়নি।

জানা যায়, ভারতের ১৮১ ব্যাটালিয়নের চৌধুরীহাট ক্যাম্পের বিএসএফ জওয়ান অমিয় ঘোষের গুলিতে নিহত হয় ফেলানী।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অহরহ ঘটলেও তা খুব একটা আলোচনায় আসেনিৃ

২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারের বিএসএফের বিশেষ আদালতে ফেলানী হত্যার বিচারকাজ শুরু হয়। তবে ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেয় আদালত। এরপর ২০১৫ সালে ভারতের উচ্চ আদালতে রিট করেন বাবা নুরুল ইসলাম।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের বিকাশে করণীয়
                                  

মোঃ মস্তাক আহমদ: পর্যটন শিল্পকে আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ ও দ্রুত বর্ধনশীল শিল্প হিসাবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পর্যটন শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একটি পর্যটন শিল্পের দেশ হিসাবে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নতুন ভাবে তার অবস্থান জানান দিতে যাচ্ছে। এই শিল্পের পরিকল্পিত উন্নয়ন সাধন করা গেলে দেশের জিডিপি বর্ধনে এই শিল্প অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের অর্থাৎ রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পর্যটন শিল্পের বিকাশ সাধনে সমস্যা, সম্ভাবনা ও করণীয় সম্পর্কে এই নিবন্ধে আলোকপাত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
পর্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রকৃতিক সৌন্দর্য স্থানীয় এবং বিদেশী পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম। এই অঞ্চলের পাহাড় এবং উপত্যকাগুলো অত্যন্ত মনমুগ্ধকর। বৈশিষ্টগত দিক থেকে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে ভারতের দার্জিলিং এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনেকটা মিল পরিলক্ষিত হয়। এই অঞ্চলের পাহাড়, উপত্যকা, মেঘের আনাগোনা অথবা সকালের সূূর্যোদয় কিংবা সন্ধ্যার সূর্যাস্ত সবকিছুর সাথেই দার্জিলিং এর সৌন্দর্যের এক মিলবন্ধন দৃষ্টিগোচর হয়। দার্জিলিং এর অর্থনীতি পুরোপুরি পর্যটন শিল্প নির্ভর।
দার্জিলিং এর মত একই ধরণের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং আকর্ষণ থাকা সত্বেও আমরা এই শিল্প হতে কাঙ্খিত পরিমাণ রাজস্ব আহরণ করতে পারছি না। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে আমাদের পর্যটন শিল্পের বিকাশে সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব। আমরা আমাদের পাহাড়ী জমির অপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করছি। যেখানে সেখানে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মান করছি এমনকি পাহাড়ের চূড়ায় আমরা অপরিকল্পিত বাজার স্থাপন করছি। এই সব নির্মাণ ও স্থাপনা আমাদের পর্যটন শিল্পের বিকাশে অন্তরায় হয়ে দাড়িয়েছে। আমাদের পর্যটকরা এই সব অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত স্থাপনা দেখে বিরক্তিবোধ করছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের বিকাশের অন্তরায় সমূহ হচ্ছে একটি সমান্বিত পর্যটন পরিকল্পনার অভাব; পর্যটন সহায়ক অবকাঠামো যথা- রাস্তা, হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, নর্দমা নিষ্কাষণ ব্যবস্থা ইত্যাদির অভাব; মানসম্মত পর্যটন সেবার অভাব; প্রশিক্ষিত জনশক্তির অভাব; পর্যটন সম্পর্কিত প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব; প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাব এবং নিরাপত্তার অভাব।
সুতরাং, একটি পর্যটন শিল্প নির্ভর অর্থনীতির উন্নয়ন এবং পর্যটক আকৃষ্ট করার পূর্বশর্ত হচ্ছে সকল অংশীদারদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরী। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনা তৈরী এখন সময়ের দাবী। সরকার এ বিষয়ে একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানারস (বিআইপি) এর নবীন ও প্রবীন পরিকল্পনাবিদগণ এ বিষয়ে সরকার ও সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর বা সংস্থাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করতে পারেন।
একটি সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনা প্রণয়ণের পর উক্ত পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পর্যটন শিল্প উন্নয়নে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর বা সংস্থাকে এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর নজরদারী রাখতে হবে যাতে পরিকল্পনার বাইরে কোন ধরণের স্থাপনা নির্মান বা উন্নয়ন না হয়। পরিকল্পনা মোতাবেক পর্যটন সহায়ক অবকাঠামো যথা রাস্তা, হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, নর্দমা নিষ্কাষণ ব্যবস্থা ইত্যাদির উন্নয়ন করতে হবে। এছাড়াও পরিকল্পনা মোতাবেক পর্যটন বিকাশে কিছু বিশেষ অবকাঠামো যেমন-পার্ক, জাদুঘর, রিভার রাফটিং সুবিধাদি, প্যারা গ্লাইডিং গ্রাউন্ড ইত্যাদির নির্মাণ বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিভিন্ন ধরনের সেবা সমূহ অত্যন্ত দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সাথে প্রদান করতে হবে। স্থানীয় জনগণ এবং বিভিন্ন সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্টানকে পর্যটন সেবা প্রদান বিষয়ে আরও সচেতন এবং পেশাদার হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। সেবা সমূহের মধ্যে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ব্যববস্থানা, যাতায়াত ব্যবস্থাপনা, বিনোদন ব্যবস্থাপনা, পর্যটন গাইড ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয় অন্তভূক্ত থাকবে। সকল সেবা সমূহের সমন্বয়ে বিভিন্ন প্যাকেজ ব্যবস্থার প্রচলন করা যেতে পারে।
পর্যটন শিল্পের বিকাশে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে হবে। প্রয়োজনে পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন উন্নয়নে বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন ধরণের প্রনোদনা প্রদান করতে হবে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমেও এ অঞ্চলে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যেতে পারে। ব্যাংক ও বিভিন্ন অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান সমূহকে এ অঞ্চলের পর্যটন শিল্পের বিকাশে বিশেষ করে অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন তফসিলী ব্যাংক সমূহকে নির্দিষ্ট হারে এ অঞ্চলের পর্যটন বিকাশে বিনিয়োগের নির্দেশনা প্রদান করতে পারে।
পর্যটন শিল্পের বিকাশে নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পূর্বের যে কোন সময়ের চেয়ে বর্তমানে অনেক ভাল তারপরও এই শিল্প বিকাশে এই নিরাপত্তার ধারা অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ সেনাবহিনী, বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ ও অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারীবহিনীর সদস্যদের সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমে এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে যেন কোন পর্যটকের মনে নিরাপত্তা নিয়ে ন্যূনতম সংশয় না থাকে।
সর্বোপরি, পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য এই অঞ্চলের পর্যটনের প্রচার ও বাজারজাতকরণ একান্ত আবশ্যক। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন অন্যান্য সকল অংশীদারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এই অঞ্চলের পর্যটন শিল্পের বিকাশে পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, প্রচার ও বাাজারজাত করণে প্রয়োজনীয় সকল কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
উপর্যুক্ত সকল প্রস্তাবনা সমূহের বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে বিশ্ব দরবারে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে উপস্থাপন করা সম্ভবপর হবে। পাশাপাশি এ অঞ্চল সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে আশা করা যায়। শুধুমাত্র একটি বাস্তবমুখী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে পর্যাপ্ত পরিমাণ রাজস্ব আহরণ সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। একটি বাস্তবমুখী পরিকরল্পনা প্রণয়ন ও এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশী এবং বিদেশী প্রচুর পর্যটক আকর্ষণ করা সমম্ভবপর হবে। শুধুমাত্র দেশী পর্যটকদের দার্জিলিং থেকে যদি পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমুখী করা যায় তাহলেও প্রচুর পরিমাণ রাজস্ব আহরণ সম্ভব হবে। আরও শুধুমাত্র একুট সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে পর্যটকদের পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমুখী করা যেতে পারে কেননা প্রকৃতি এই অঞ্চলের শুভা বর্ধনে কোন প্রকার কার্পণ্য করেন নি। তাছাড়া যদি পার্বর্ত্য চট্টগ্রামে কম খরচে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন সেবা সরবরাহ করা যায় তাহলে দেশী পর্যটকের বিচরণ আপনাআপনি অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়।
*লেখক- ব্যাংকার এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানারস (বিআইপি) এর একজন সদস্য।

সেলুলয়েডে ‘অপারেশন জ্যাকপট’: সংরক্ষণ হচ্ছে যুদ্ধ স্মারক এমভি ইকরাম
                                  

বশীর আহমেদ:
মুক্তিবাহিনীর অকুতোভয় নৌ-কমান্ডোদের বিধ্বংসী অপারেশন অবলম্বনে নির্মিতব্য চলচ্চিত্র ‘অপারেশন জ্যাকপট’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত রাখার প্রয়াসে বড় ধরণের উদ্যোগ- বলেছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্ম মুক্তিযোদ্ধাদের নজিরবিহীন দেশপ্রেম ও আতœত্যাগের অজানা ইতিহাস সঠিকভাবে জানতে পারছে না। অথচ এগুলো জানবার প্রবল আগ্রহ রয়েছে তাদের। আমাদের নবীন প্রজন্মের সে আগ্রহ নিরসন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রজন্মের দুয়ারে অবারিত রাখবার দায়বোধ থেকে মুক্তিবাহিনীর ব্যাপক-বিধ্বংসী কমান্ডো অপারেশন জ্যাকপট অবলম্বনে ডকুমেন্টারী তৈরীর ভাবনাটি মাথায় আসে- বলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী।

অপারেশন জ্যাকপট চলচ্চিত্র নির্মানের প্রেক্ষাপট নিয়ে দৈনিক স্বাধীন বাংলা’র সাথে একান্ত আলাপচারিতায় এভাবেই নিজের অনভূতি প্রকাশ করেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, এম.পি। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, অপারেশন জ্যাকপট সিনেমার শুভ-মহরত আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে। ‘মনপুরা’ সিনেমাখ্যাত সফল পরিচালক গিয়াস উদ্দিন সেলিমকে দেয়া হয়েছে ছবিটি পরিচালনার দায়িত্ব।

নৌপরিবহনমন্ত্রী জানান, কেবলমাত্র অপারেশন জ্যাকপট ডকুমেন্টারীই নয়, মুক্তিযুদ্ধে স্বেচ্ছায় জীবন উৎসর্গকারী নৌ-কমান্ডোদের লিম্পেট মাইন হামলায় বিধ্বস্ত জাহাজ এম ভি ইকরাম সংরক্ষণেও তিনি উদ্যোগ নিয়েছেন। একাত্তরের ৩০ অক্টোবর চাঁদপুর নদীবন্দরের কাছে ডাকাতিয়া নদী মোহনায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সমরাস্ত্র বোঝাই জাহাজ এম ভি ইকরাম সুইসাইডাল নৌ-কমান্ডোরা ধ্বংস করেছিলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান খান বলেন, সৌভাগ্যবশত মুক্তিযুদ্ধের ৩৭ বছর পর নিমজ্জিত সে জাহাজটি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত জাহাজটি নৌ-কমান্ডো অপারেশনের খুঁজে পাওয়া একমাত্র নিদর্শন। বিষয়টি নিয়ে অন্য এক মন্ত্রণালয় বিগত প্রায় ৯ বছর কাজ করলেও তা কঙ্খিত পরিণতি লাভ করেনি। এক পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের অতি মূল্যবান এই স্মারকটির বিষয় তার নজরে আসে এবং ঐতিহাসিক নিদর্শনটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণে তিনি উদ্যোগী হন। নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবান যুদ্ধস্মারকটি চট্টগ্রাম মেরিন যাদুঘরে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের কাজ এখন চুড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুক্তিবাহিনীর নৌ-কমান্ডো অপারেশন জ্যাকপট ছিল মুক্তিযুদ্ধের সবচাইতে বিধ্বংসী কমান্ডো অপারেশন যা বাংলাদেশে চলমান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার নজর কাড়তে এবং বিশ্বব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচার ও জনমত গঠনে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল। এ অপারেশন মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী হওয়ার সমুহ আশঙ্কা ও বিজয়ের অনিশ্চিতি পেছনে ঠেলে তৈরী করেছিল নতুন সম্ভাবনা। মুক্তিযুদ্ধের দুঃসহ দিনগুলোতে অপারেশন জ্যাকপটের অভূতপূর্ব সাফল্য কার্যকর ভাবে ভেঙ্গে দিতে সক্ষম হয়েছিল দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেরুদন্ড।

একাত্তরে মুক্তিবাহিনীর নৌ-কমান্ডোদের সমন্বিত আক্রমন পরিকল্পনার সাঙ্কেতিক নাম ছিল অপারেশন জ্যাকপট, যা সংঘটিত  হয়েছিল আজ থেকে সাতচল্লিশ বছর আগে ১৫ আগষ্ট গভীর রাতে। তবে মূল পরিকল্পনায় আক্রমনের নির্দ্ধারিত সময় ছিল ১৪ আগষ্ট মধ্যরাতের পর, যে রাতের আগের দিনটি ছিল পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত বাধার মুখে কমান্ডোদল সময়মত টার্গেট এলাকায় পৌছাতে ব্যর্থ হলে আক্রমন পরিকল্পনা পূর্ব-নির্দ্ধারিত ভাবেই পরিবর্তন হয় এবং একদিন পর পরিচালিত হয় কমান্ডো অপারেশনটি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিñিদ্র নিরাপত্তা ভেঙ্গে অকুতোভয় নৌ-কমান্ডোরা এক রাতে চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, মংলা এবং নারায়ণগঞ্জ নৌবন্দরে অত্যন্ত সফলতার সাথে পাকিস্তানীদের দখলে থাকা প্রায় ১ লাখ টনের অধিক জাহাজ এবং নৌ-স্থাপনা ধংস করে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে বলে পাকিস্তান সরকার যে দাবী করে আসছিল অপারেশন জ্যাকপটের সাফলতা প্রথমবারের মত তা নস্যাৎ করে দেয়।


মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী স্মারক এম ভি ইকরাম। জাহাজটি সংরক্ষণের কাজ চুড়ান্ত পর্যায়ে।-স্বাধীন বাংলা

একাত্তর সালের ৩০ অক্টোবর রাতে এম ভি ইকরাম অপারেশনে অংশগ্রহণকারী চাঁদপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা, নৌ-কমান্ডো মোঃ শাহজাহান কবির, বীরপ্রতীক জানান, নৌ-কমান্ডো হামলায় বিধ্বস্ত ও নিমজ্জিত এম ভি ইকরাম জাহাজকে কেন্দ্র করে ডাকাতিয়া নদী চ্যানেলে ধীরে ধীরে বিশাল এক বালুচরের গোড়াপত্তন ঘটে। এক পর্যায়ে ‘কাইশা বনে’ আচ্ছাদিত হলে চরটি মেইনল্যান্ডের কৃষকদের পশুচারণ ভূমিতে পরিণত হয়। এভাবে বালুচরের গভীরে লুকিয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী স্মারক এম ভি ইকরামের কথা কালক্রমে হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অতলে।

১৯৮০ সালে চাঁদপুরের এক ব্যবসায়ী সর্বপ্রথম জাহাজটি বালি খুঁড়ে উদ্ধারের চেষ্টা শুরু করলে সাড়া পড়ে যায় চাঁদপুরে। উৎসুক মানুষের আলোচনায় ফিরে আসে একাত্তরের ভূলে যাওয়া ইতিহাস। প্রায় ২ বছরের সে উদ্ধার প্রচেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হলে জাহাজটি উদ্ধার অসম্ভব বলে ধরে নেন চাঁদপুরবাসী। এভাবে সুদীর্ঘ ২৭ বছর এম ভি ইকরাম উদ্ধারের চেষ্টা চলেছে- কখনো জোরেশোরে আবার কখনো বা ধীর গতিতে। কিন্তু জাহাজটি আর উঠে আসেনি বালি-মাটির গভীর তলা থেকে।

এম ভি ইকরাম উদ্ধারকারীদের সূত্র জানায়, ২০০৭ সালে এর সর্বশেষ মালিকপক্ষ উদ্ধার কাজে হাত দিলে ৩৭ বছর বালি-মাটিতে ঢেকে থাকা এম ভি ইকরাম প্রথমবারের মত খোলা পানির দেখা পায়। পরে ক্রেন দিয়ে টেনে তোলা হয় পানির সমান্তরালে এবং শক্তিশালী পাম্প দিয়ে জাহাজের ভেতরকার পানি-বালি অপসারণ করা হয়। এক পর্যায়ে নজরে আসে জাহাজের তলদেশ। মাইন বিষ্ফোরণে ৩টি বড় আকারের ছিদ্র হয়েছিল জাহাজের তলায়। সেখানে লোহার প্লেট ওয়েল্ডিং করে বসিয়ে পানি ওঠা বন্ধ করা হয়। পরে ট্রলারে বেঁধে ভাসমান এম ভি ইকরাম টেনে নেওয়া হয় চাঁদপুর লন্ডন ঘাটে। এ ঘটনা ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসের।  

মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় নৌ-কমান্ডো হামলার নিদর্শন এম ভি ইকরাম চাঁদপুরে সংরক্ষণের দাবীতে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন মিছিল-মিটিং, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচী আরম্ভ করলে নিরাপত্তার স্বার্থে ২০০৮ সালের ১৪ অক্টোবর জাহাজটি টাগবোটে বেঁধে নারায়ণগঞ্জের সোনাকান্দায় সরিয়ে আনা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের দুর্লভ এ স্মারকটি সংরক্ষণে সরকারী সিদ্ধান্তের পর বিআইডব্লিউটিএ ২০০৮ সালের ১৫ অক্টোবর জাহাজটির মালিকপক্ষকে ‘যেখানে যে অবস্থায় আছে-সে অবস্থায়’ সংরক্ষণের নির্দেশ জারি করে। পরে সংরক্ষণের কাজ স্থানান্তরিত হয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু ২০১৭ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এ ব্যাপারে আর কোন বাস্তব কোন অগ্রগতি হয়নি। ২০১৭ সালের ২ জুলাই নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান জাহাজটি স্থায়ী সংরক্ষণে ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগী হন। এক বছরের প্রানান্তকর চেষ্টায় অবশেষে এম ভি ইকরাম চট্টগ্রাম মেরিন যাদুঘরে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের কাজ এখন প্রায় চুড়ান্ত পর্যায়ে অগ্রসর হয়েছে বলে জানা গেছে।   

অগ্নিঝরা মার্চ
                                  

১৯৭১-এর সালের ১১ মার্চ ছিল বৃহস্পতিবার। ১৯৭১ সালের রক্তঝরা মার্চের উত্তাল অসহযোগ আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ের আজ চতুর্থ দিবস। সারাদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুর ডাকে শান্তিপূর্ণভাবে সর্বাÍক অসহযোগ পালন করে। গত কয়েক দিন ধরেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সর্বত্র ‘সংগ্রাম পরিষদ’ গড়ে তোলার কাজ চলতে থাকে। আমরা নিজেদের উজাড় করে দিয়ে উদয়াস্ত এ কাজেই নিয়োজিত থাকি। কোন গণশত্রু বা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি যেন কোথাও বিশৃ´খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে না পারে সে জন্য আমাদের দলের স্বেচ্ছাসেবকগণ বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে রাজধানীতে নৈশকালীন টহল কার্যক্রম শুরু করে। এতে শান্তি শৃ´খলার অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটে। সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে দেয়া বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মোতাবেক যে সব যানবাহন চলার কথা সেগুলো চলাচল শুরু করে; যে সব বেসরকারী অফিস খোলা থাকার কথা সে সব খোলা থাকে। যথারীতি সরকারী দফতরগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মেনে চলে এবং সর্বত্র যা দৃশ্যমান হয় সেটি হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সমগ্র বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছে। স্বাধিকারের দাবিতে অটল-অবিচল সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে যাচ্ছে। ১৯৭১-এর মার্চের এদিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। হাইকোর্টের বিচারপতিসহ সরকারী ও আধা সরকারী প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরের কর্মচারীগণ তাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অফিস বর্জন করেছেন। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো, অসহযোগ সমর্থনকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংস্থা, পেশাজীবীগণ, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বঙ্গবন্ধুর কর্মসূচীর সমর্থনে সোচ্চার হয়ে ওঠে। দেশজুড়ে মানুষের মনে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের অবিচল সংগ্রামী মনোভাব বিরাজ করতে থাকে। এদিন বর্ষীয়ান মজলুম নেতা মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলে এক জনসভায় সকল রাজনৈতিক পক্ষকে উদ্দেশ করে বলেন, “সাত কোটি বাঙালীর নেতা শেখ মুজিবের নির্দেশ পালন করুন।” অপরদিকে জাতীয় লীগ প্রধান আতাউর রহমান খান সামরিক সরকারের উদ্দেশে এক বিবৃতিতে বলেন, “এক রাষ্ট্রের জোয়ালে আবদ্ধ না থাকলেও দুটি স্বাধীন ভ্রাতৃরাষ্ট্র হিসেবে আমরা পরস্পরের এবং বিশ্বের এই অংশের সমৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারব।” ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে তাঁর সঙ্গে একান্ত বৈঠকে মিলিত হন। পাঞ্জাব প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব খুরশীদ হক বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর বাসভবনে এক বৈঠক করেন। বৈঠকে জনাব খুরশীদ আগের দিন রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে তার বৈঠকের বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুকে অবহিত করেন। এদিন পশ্চিম পাকিস্তানের কাম্বেলপুর হতে নির্বাচিত কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতা পীর সাইফুদ্দীন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রায় ১ ঘণ্টা বৈঠক করেন। বৈঠকে রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্কট উত্তরণের উপায় এবং কাউন্সিল মুসলিম লীগ সভাপতি মিয়া মমতাজ দৌলতানার একটি পত্র বঙ্গবন্ধুর কাছে হস্তান্তর করেন। এদিন ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের উপ-আবাসিক প্রতিনিধি মি. কে. উলফ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর বাসভবনে সাক্ষাত করেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে যতদিন খুশি বাংলাদেশে থাকার অনুরোধ করে বলেন, “পাকিস্তান সেনাবাহিনী দেশে গণহত্যা চালানোর পাঁয়তারা করছে।” এ অবস্থায় মানবতা রক্ষায় তাদের দেশ না ছাড়তে অনুরোধ করেন। এদিকে সদ্য ঢাকা ত্যাগকারী এয়ার মার্শাল আসগর খান করাচী প্রত্যাবর্তন করে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, “কুর্মিটোলার ক্যান্টনমেন্ট ব্যতীত অন্য কোথাও পাকিস্তানের পতাকা আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। কার্যত পূর্ব পাকিস্তানে প্রশাসনের সচিব ও কর্মকর্তাগণ শেখ মুজিবের নির্দেশ পালন করে চলছে। সরকারের এখন উচিত শেখ সাহেব প্রদত্ত শর্তসমূহ মেনে অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।” সমগ্র পাকিস্তানের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল রাজনৈতিক বাস্তবতা উপলব্ধি করে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সমর্থনসূচক ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলেও জনাব ভুট্টো এবং ইয়াহিয়ার কিছু বশংবদ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বঙ্গবন্ধুকে ৬ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন না করে আপোস-সমঝোতার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ দিতে থাকে। এমতাবস্থায় আজ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার জন্য ন্যাপ প্রধান ওয়ালী খান ঢাকায় আগমন করেন।
এদিন হাইকোর্টের বিচারপতিসহ সরকারী-আধাসরকারী প্রতিষ্ঠানের সকল বিভাগের কর্মচারীরা তাদের সংশ্লিষ্ট অফিস-আদালত বর্জন অব্যাহত রাখে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত সময়সূচী অনুযায়ী স্টেট ব্যাংক, বিভিন্ন তফসিলী ব্যাংক, ট্রেজারি অফিসে লেনদেন চলে। স্বাভাবিকভাবেই রেল ও বিমান চলাচল করে। অভ্যন্তরীণ ডাক, টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। রাজধানীর বিপণি কেন্দ্র ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। স্বাধিকার আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে এদিনও প্রধান বিচারপতির বাসভবনসহ সকল অফিস এবং বাড়িতে-গাড়িতে কালো পতাকা উত্তোলিত থাকে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশানুযায়ী সিনেমা হলগুলোর মালিকগণ প্রমোদকর ব্যতীত চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে। বরিশালে এদিন কারাগার ভেঙ্গে ২৪ কয়েদী পালিয়ে যায় এবং পুলিশের গুলিতে ২ জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়। কুমিল্লাতেও অনুরূপ ঘটনায় পুলিশের গুলিতে ৫ জন নিহত ও শতাধিক লোক আহত হয়।
বিগত কয়েক দিনের ন্যায় আজও বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ব্যক্তিবর্গ নিহত ও আহতদের সাহায্যার্থে গঠিত সাহায্য তহবিলে উদারহস্তে অর্থ সাহায্য প্রদান করেন। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃ চতুষ্টয় এক বিবৃতিতে সামরিক সরকার প্রদত্ত যাবতীয় খেতাব, উপাধি বর্জনের আহ্বান জানান। সামরিক বাহিনীর চলাচলের ব্যাপারে জনসাধারণকে সহযোগিতা না করার অনুরোধ করেন এবং প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনার পূর্বে ছাত্রনেতৃবৃন্দ শর্তারোপ করে বলেন, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার পূর্বে ইয়াহিয়া প্রদত্ত ৬ মার্চের বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে।
বঙ্গবন্ধু নীতির প্রশ্নে অবিচল থেকে বাংলাদেশের জনগণের নামে প্রতিদিন একের পর এক নির্দেশ জারি অব্যাহত রাখেন। জনসাধারণের নামে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদের স্বাক্ষরিত নয়া নির্দেশ জারি করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, “জনগণের আন্দোলন নজিরবিহীন তীব্রতা লাভ করেছে। বাংলাদেশে জনগণের নামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে সব নির্দেশ প্রদান করেছেন প্রতিটি লোক আপন স্থানে থেকে পবিত্র দায়িত্ব জ্ঞানে তার সবগুলো কার্যকর করেছে বলেই অসহযোগ আন্দোলন এরূপ সর্বাÍক হয়ে উঠেছে। জীবনের প্রতিটি স্তরের লোকজনের এই উচ্চ দায়িত্ববোধ সকলের জন্যই অনুপ্রেরণার উৎস। এই সংগ্রাম অব্যাহত রাখার সঙ্গে সঙ্গে সর্বোচ্চ হারে উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং আমাদের অর্থনীতিকে পরিপূর্ণভাবে চালু রাখার জন্যও আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। আমাদের অর্থনীতি ধ্বংস করার এবং আমাদের বুভুক্ষু জনসাধারণকে দুঃখ-দুর্দশায় নিপতিত করার কায়েমী স্বার্থবাদী এবং গণবিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্র নস্যাত করে দিতে আমরা বদ্ধপরিকর। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য জনসাধারণ উৎপাদনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের সকল শক্তি নিয়োগ করতে প্রস্তুত রয়েছে। একই সঙ্গে তারা কঠোর কৃচ্ছ্র পালনেও প্রস্তুত। জনগণের বিজয় সুনিশ্চিত করার জন্য অর্থনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত সকল লোক প্রতিটি ক্ষেত্রে অবশ্যই সুকঠোর শৃ´খলা পালন করবে।” এ সব উদ্দেশ্য সামনে রেখে এদিন থেকে কিছু বিষয় হরতালের আওতামুক্ত রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। যেমনÑব্যাংকিং কার্যক্রমে ব্যাংক, স্টেট ব্যাংক যে সব ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক লেনদেন অনুমোদিত হয়েছে সেগুলো সাপেক্ষে ছুটির দিনসহ নির্দেশিত সময়সূচী অনুযায়ী চলবে। মজুরি ও বেতন পরিশোধের ক্ষেত্রে শ্রমিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সার্টিফায়েড পে-বিলের মাধ্যমে তা করতে হবে। এ ছাড়াও কৃষি তৎপরতা, বন্দর পরিচালনা, ইপিআইডিসি ফ্যাক্টরি পরিচালনা, সাহায্য, পুনর্বাসন ও পল্লী উন্নয়ন কাজ, প্রাইমারী স্কুল শিক্ষকদের বেতন পরিশোধ, সরকারী কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে এজি অফিস আংশিক সময় খোলা রাখা, কারাগারের ওয়ার্ড অফিস খোলা রাখা, আনসারদের দায়িত্ব পালন, বিদ্যুত ও পানি সরবরাহ চালু রাখতে সংশ্লিষ্ট দফতর খোলা রাখাসহ সকল ইন্স্যুরেন্স অফিস খোলার রাখার নির্দেশ প্রদান করা হয়। এ ছাড়াও তাজউদ্দীন আহমেদ চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কঠোর শৃ´খলা রক্ষার আহ্বান জানান। অর্থনৈতিক বিষয়াবলির জন্য নির্ধারিত টিম সদস্যদের পরামর্শক্রমেই এ ব্যবস্থাদি অবলম্বিত হয়।
বঙ্গবন্ধুর একান্ত সান্নিধ্যে থেকে এ সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অবলোকনের সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। অতুলনীয় দক্ষ সংগঠক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। প্রতিটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ গ্রহণের জন্য পৃথক পৃথক টিম ছিল বঙ্গবন্ধুর। তাদের সকলের সঙ্গে আলোচনা করে তারপর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ জাতীয় চার নেতার সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হতেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। আমার মনে আছে, কখনও কখনও আলোচনার প্রয়োজনে যেতে হতো সহকর্মী বা টিম সদস্যদের বাড়িতে। সঙ্গে থাকতেন জাতীয় চার নেতার কখনও তিনজন বা দু’জন আর আমি। সে সময় ঢাকা শহরে খুব কম মানুষের গাড়ি ছিল। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের মধ্যে কেবল বঙ্গবন্ধুরই গাড়ি ছিল। যখন কোথাও যেতে হতো তখন গাড়ির সামনের আসনে চালক এবং বঙ্গবন্ধুর মাঝের স্থানে বসতাম আমি, পেছনে জাতীয় নেতৃবৃন্দ। সবাইকে তাদের স্ব-স্ব বাসভবন থেকে তুলে নিতেন বঙ্গবন্ধু। আবার কাজ শেষে প্রত্যেককে তাদের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে তবে বাড়ি ফিরতেন। একবার বঙ্গবন্ধু সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন মগবাজারের চাঁপাইনবাবগঞ্জের ধনাঢ্য এক ব্যক্তির বাড়িতে। বাড়ির নাম মালদা হাউস। সে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন আমাদের প্রিয় মজু ভাই, সৈয়দ মুজতবা আহসান খান। বঙ্গবন্ধুর খুব কাছের প্রিয় একজন মানুষ, দুর্দিনের সহযোগী, পরম শুভানুধ্যায়ী, বিশ্বস্ত বন্ধু। আমাদের অনেকেই তাঁর কাছে ঋণী। তিনি ব্যবসায়ী ছিলেন। তাঁর বাসায় বঙ্গবন্ধু গিয়েছিলেন পাকিস্তানের কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করতে। সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন জেনারেল পীরজাদা, জেনারেল হামিদ, জেনারেল মিঠ্ঠা। আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গিয়েছি, পাশের একটি কক্ষে অপেক্ষা করছি। আলোচনার এক পর্যায়ে হঠাৎ চিৎকার দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলছেন, ডযধঃ ফড় ুড়ঁ ঃযরহশ ড়ভ সব? উড় ুড়ঁ ঃযরহশ ঃযধঃ ঝযবরশয গঁলরন রিষষ ংঁৎৎবহফবৎ? ঘড়, ঝযবরশয গঁলরন রিষষ মরাব যরং ষরভব নঁঃ যব রিষষ হড়ঃ ংঁৎৎবহফবৎ ধহুনড়ফু বষংব. অর্থাৎ পাকিস্তান সামরিক কর্তৃপক্ষ তাঁকে কোন আপোস প্রস্তাব দিয়েছিল, যাতে উত্তেজিত হয়ে তিনি এ কথাগুলো উচ্চারণ করেছিলেন।
অসহযোগ আন্দোলনের এই দিনগুলোতে কেবলই মনে পড়ত ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের কথা। ১৯৬৬ থেকে ’৬৯ এ সময়টা ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের ড্রেস রিহার্সেল পর্ব। আমরা চারজন শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও আমি, আমরা আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর ভওয়াগন গাড়িতে চেপে রাতের বেলায় পোস্টার, দেয়াল লিখন লিখতে বের হতাম। গাড়ির সামনের সিটে আমি, পেছনে অপর তিনজন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু নিজেই গাড়ি চালাতেন। চালকের আসনে বসা মঞ্জু সব সময় গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রাখতেন। আমরা নিজ হাতে দেয়ালে পোস্টার সাঁটতাম।
সেদিন আমাদের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে নেতাকে আমরা কারামুক্ত করেছিলাম, ফাঁসির মঞ্চ থেকে মুক্তমানব হিসেবে বের করে এনেছিলাম। আজ সেই নেতার নেতৃত্বে ও নির্দেশে স্বাধিকার আন্দোলনে গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করছে। নেতার নৈকট্যে থেকে দেখেছি, শিখেছি কী করে কোন্ প্রক্রিয়ায় জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হয়। কিভাবে একটি সর্বাÍক অসহযোগ সফলভাবে এগিয়ে নিতে হয়। ধানম-ির বঙ্গবন্ধুর বাসভবনটি এ সময় সমাজের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ ও লোকজনে সরগরম থাকত। বঙ্গবন্ধু সকলের সঙ্গে কথা বলতেন, প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করতেন। প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংবিধানিক সকল বিষয়ে টিম সদস্যদের নিকট থেকে বাস্তবসম্মত পরামর্শ গ্রহণ করে শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে তবেই তিনি পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। আজ যখন স্মৃতির পাতা থেকে সে সব ঘটনা স্মরণ করি কেবলই মনে হয়, সবাইকে ঘিরে সূর্যের মতো দেদীপ্যমান এই মহান মানুষটি গভীর সঙ্কটকালেও হাস্যোজ্জ্বল মুখে সবাইকে সময় দিয়েছেন। আন্তরিকভাবে সবার কথা শুনেছেন এবং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে, সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেই তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে অগ্রসর হয়েছেন।

কেন্দ্রীয় সম্মেলন নিয়ে ছাত্রলীগের মধ্যে ক্ষোভ-হতাশা
                                  

মাহবুবুল আম্বিয়া: বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ২৯তম কেন্দ্রীয় সম্মেলন সহসা হওয়া না হওয়া নিয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে হতাশা ও ক্ষোভ। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা মার্চের মধ্যেই কেন্দ্রীয় সম্মেলন সম্পন্ন করার জন্য ছাত্রলীগকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত ৬ জানুয়ারি রাজধানীতে ছাত্রলীগের একটি অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগকে মার্চের মধ্যেই জাতীয় সম্মেলন করার নির্দেশ দেন। এটি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ইচ্ছা-সেটিও জানিয়ে দেন তিনি।

কিন্তু সম্মেলন করে নতুনদের হাতে নেতৃত্ব ছেড়ে দিতে একাংশের আপত্তি আছে। এ ক্ষেত্রে তারা আগামী জাতীয় নির্বাচনকে অযুহাত হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছেন। সম্মেলন করতে না চাওয়ার জায়গা থেকে ছাত্রলীগে সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ এবং সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বও মিটে গেছে বলে নিশ্চিত করেছেন জাকিরের ঘনিষ্ঠ একজন নেতা।

সম্মেলন না করতে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের মধ্যে যারা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আছেন, তাদের কাছে ধর্ণা দিচ্ছেন ছাত্রলীগ নেতারা। তাদের মাধ্যমে শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছার চেষ্টা চলছে। তবে আওয়ামী লীগের প্রধান অগ্রাধিকার ৭ মার্চের জনসভা। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের স্মরণে এই জনসভা সফল করতেই ব্যস্ত আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগসহ সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন। এই সমাবেশের পরই আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে সম্মেলন পিছিয়ে দেয়ার পরামর্শ নিয়ে বসতে চান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা।

২০১৫ সালের ২৬ ও ২৭ জুলাই ২৮তম জাতীয় সম্মেলনে কাউন্সিলরদের ভোটের মাধ্যমে সভাপতি হিসেবে  সাইফুর রহমান সোহাগ দুই হাজার ৬৯০ ভোট পেয়ে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে জাকির হোসেন পেয়েছেন দুই হাজার ৬৭৬ ভোট। কাউন্সিল অধিবেশনে ভোট গণনার ফল ঘোষণার পর সাবেক ও বর্তমান নেতাদের উপস্থিতিতে নতুন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে পরিচয় করিয়ে দেন তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম।

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বর্তমান কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। কিন্তু ছাত্রলীগের এ দু’শীর্ষ নেতার কারো মুখেই সম্মেলন নিয়ে কোন কথা নেই। দু’ নেতার ভাবখানা এমন, ক্ষমতার চেয়ারে বসে থাকতেই যেন স্বাচ্ছন্দ্য তাদের। ছাত্রলীগের বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে রীতিমতো আ’লীগের ভ্রাতৃপ্রতীম এ সংগঠনে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। আর এ অস্থিরতা ও কোন্দল প্রকাশ্যে আসে গত বছরের ১২ জুলাই। সংগঠনের ওই সাধারণ সভায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস.এম.জাকির হোসাইন নেতা-কর্মীদের তোপের মুখে পড়েন।

দলীয় নেতা-কর্মীরা জানান, নানান কারণে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ওপর বেশিরভাগ নেতা-কর্মী ক্ষুব্ধ। এর মধ্যে খোদ দলীয় গঠনতন্ত্র না মানার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতি দু’মাস পরপর নির্বাহী সংসদের সভা হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান কমিটি মাত্র একটি সাধারণ সভা করেছে।

এছাড়া কাউন্সিলর, কেন্দ্রীয় কমিটি, সম্পাদকমণ্ডলীর সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। গঠনতন্ত্রে কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ ৩০১ সদস্য নিয়ে গঠিত হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে এই সংখ্যা সাড়ে ৪’শ ছাড়িয়েছে। দলীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক শুধু নিজেদের এবং অনুগত অনুসারীদের নিয়ে ব্যস্ত থাকায় দলটির গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতাই দলীয় রাজনীতিতে নিজেদের নিষ্ক্রিয় করে রেখেছেন। এর পেছনে রয়েছে তাদের অবমূল্যায়নের বিষয়টি।

ছাত্রলীগের ৭০ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতেও নতুন করে সম্মেলনের দাবি জোরালো হয়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগেই এ কমিটিকে মেয়াদোত্তীর্ণ ঘোষণা দিয়ে মাঠ গরম করেন কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েক নেতা।

সূত্র মতে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও বেশ কয়েকবার দ্রুত সময়ের মধ্যে ছাত্রলীগের সম্মেলন হবে জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আলোর মুখে দেখেনি দলের অন্যতম নীতি নির্ধারক এ নেতার বক্তব্য। বরং প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি করার যে নির্দেশ ওবায়দুল কাদের দিয়েছিলেন সে সময়ই ছাত্রলীগের একাধিক নেতা সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে নজিরবিহীন ভাবে ওবায়দুল কাদেরকে আক্রমণ করে কথা বলেছেন।

সূত্র জানায়, সোহাগ ও জাকির মেয়াদোত্তীর্ণ এ কমিটিকে আরো প্রলম্বিত করতে চান। তাদের টার্গেট একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তারা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্তর্ভূক্ত অনেক ইউনিটে সম্মেলন বাকী রয়েছে। এসব কমিটি করে তবেই সম্মেলনের দিনক্ষণ নির্ধারিত হবে।

কিন্তু তাদের এ টার্গেটে রীতিমতো বাঁধ সেধেছে নিজ কমিটিরই অনেক নেতা। দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা না আসলে তারা আবারো নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে নামতে পারেন। ছাত্রলীগের রাজনীতিকে আরো গতিশীল ও চাঙ্গা করতে মেয়াদোত্তীর্ণ এ কমিটির শীর্ষ দু’ নেতার হাত থেকে নতুন নেতৃত্বের হাতে ছাত্রলীগকে তুলে দিতে চান তাঁরা।

দলীয় পরিমন্ডলে শোনা যাচ্ছে, ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস.এম.জাকির হোসাইন তাদের ‘মেন্টর’ হিসেবে পরিচিত কয়েক নেতার সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করছেন। যে কোন মূল্যে আরো কিছু সময় চান তাঁরা। কথিত ‘মেন্টর’ এসব নেতারা যাতে করে বিষয়টি আ’লীগের শীর্ষ নেতাদের বুঝাতে পারেন এজন্যও শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি বড় অংশ  সম্মেলন দাবিতে নাছোড়বান্দা ভূমিকায় থাকায় এ নেতারা গভীর চিন্তায় পড়ে গেছেন।

ওবায়দুল কাদেরর ৬ জানুয়ারির নির্দেশের পর বিষয়টি নিয়ে জানতে দুই দিন পর গণভবনে যান ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ এবং সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন। সেদিন শেখ হাসিনা এই দুই নেতাকে ৩১ মার্চের মধ্যে সম্মেলন করার নির্দেশ দেন বলে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। এই হিসাবে ছাত্রলীগের হাতে সময় বেশি নেই। এই সময়ে সম্মেলনের জন্য নানা প্রস্তুতি চোখে পড়ার কথা ছিল। কিন্তু তার কিছুই হয়নি।

প্রতিবারই সম্মেলনের অন্তত এক মাস বাকি থাকতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে সম্মেলন পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলন ও সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু এর কিছুই করা হয়নি এখনও। আবার সম্মেলনের তারিখ ও স্থানও নির্ধারণ করা হয়নি। এসব কারণে সম্মেলন হবে কি না এ নিয়ে শঙ্কা কাটছেনা মাঠ পযায়ে থাকা নেতাকর্মী ও পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে।

তবে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন, ‘সম্মেলন যথাসময়েই হবে, আমরা সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদপ্রত্যাশী বেশ কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বলেন, ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সম্মেলন চাইছেন না। তারা চান সম্মেলন হোক সংসদ নির্বাচনের পর। আবার জাতীয় সম্মেলনের আগে সংগঠনের সারাদেশের মেয়াদউত্তীর্ণ শাখার সম্মেলন করা হয়। কিন্তু ১১০টি ইউনিটের মধ্যে এখন পর্যন্ত সম্মেলন করা হয়েছে ৬৪টির।

যেসব কমিটির সম্মেলন এখনও হয়নি তার মধ্যে আছে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, তীতুমীর কলেজ, তেজগাঁও কলেজ, চট্টগ্রাম মহানগর, বগুড়া, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, নাটোর প্রভৃতি।

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এক বছর, কোনোটি তিন বছর, কোনোটি আড়াই বছর, কোনোটি তিন বছর পার করেছে।

তবে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ‘ছাত্রলীগের কিছু নেতিবাচক কর্মকান্ডে সাধারণ মানুষ ও দলের (আওয়ামী লীগ) নেতৃবৃন্দ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন। আর ছাত্রলীগের এই দৃশ্যমান নীতিবাচক বিষয়গুলো নিয়ে যাতে সাধারণ মানুষ কোন কথা বলতে না পারে, তাই এই সম্মেলনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যাতে দল (আওয়ামী লীগ) তার ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের (ছাত্রলীগ) জন্য নতুন দুই দায়িত্ববান ও যোগ্য প্রার্থীকে খুঁজে বের করতে পারেন, যারা সত্যিকার অর্থেই দলকে গতিশীল করবে।’

এই জন্যই দুই মাস আগেই সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছিল বলে জানান দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘সম্মেলন পূর্বঘোষিত সময় অনুযায়ী হবে,এতে কোন সন্দেহ নেই।’

সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকার বিষয়ে আওয়ামী লীগের অন্য একজন কেন্দ্রীয় এক নেতা বলেন, ‘এটা তো স্বাভাবিক বিষয় যে, সহজে কেউ ক্ষমতা ছাড়তে চায় না । তবে এখন থেকে পুরোপুরি এক মাস সময় আছে আর ছাত্রলীগের সম্মেলনের প্রস্তুতির জন্য ১০ দিনের বেশি সময় লাগবে না।’

অগ্নিঝরা মার্চ: ৬ মার্চ সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়
                                  

১৯৭১ সালের ৬ মার্চ সারাদেশে হরতাল পালিত হয়। গত কয়েকদিনে সেনাবাহিনীর নির্বিচার হত্যাকা-ের প্রতিবাদে সর্বস্তরের মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পী, সাংবাদিকসহ সকলেই স্ব-স্ব অবস্থান থেকে প্রতিবাদ মিছিলে শামিল হতে থাকে। এ কয়দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনার জন্য বঙ্গবন্ধু ও বাংলার জনগণকে দায়ী করে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এদিন বেতারে ভাষণ দেন। ৫ মার্চ ইয়াহিয়া এবং জনাব ভুট্টো ৫ ঘণ্টা গোপনে বৈঠক করে যে খসড়া তৈরি করেছিলেন বক্তৃতায় সেটিই প্রতিফলিত হয়। এদিন ঢাকাসহ সারাদেশে সর্বাÍক হরতাল পালিত হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ভেঙ্গে ৩৪১ জন কারাবন্দী পলায়নকালে পুলিশের গুলিতে ৭ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হয়। এদিন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক শাসক লে. জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খানকে সরিয়ে তদস্থলে ‘বেলুচিস্তানের কসাই’ খ্যাত লে. জেনারেল টিক্কা খানকে উভয় পদে নিযুক্ত করার ঘোষণা দেয়া হয়। এয়ার মার্শাল আসগর খান বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দ্বিতীয় দফা বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, “পরিস্থিতি রক্ষা করার জন্য আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। বাকি বিষয় আগামীকাল শেখ মুজিবের বক্তৃতায় জানতে পারবেন।” কার্যত, সারা দেশের মানুষ এদিন থেকে অধীর আগ্রহে প্রহর গুনতে থাকে ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে পরবর্তী দিকনির্দেশনা জানার। এদিন আমি এক বিবৃতিতে ৭ মার্চের ভাষণ রেসকোর্স থেকে সরাসরি প্রচারের জন্য ঢাকা বেতার কেন্দ্রের প্রতি আহ্বান জানাই।
একাত্তরে ৭ মার্চেই সমান্তরাল সরকার গঠিত হয়
পাকিস্তানী মিডিয়া
বাংলাদেশ কাল বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ভাষণ স্মরণ করার অপেক্ষা করছে। পাকিস্তানী গণমাধ্যম ও তাদের সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে ৪১ বছর আগে ওই ভাষণই পাকিস্তানী শাসনের অবসান ঘটায়।
পাকিস্তানের অন্যতম জনপ্রিয় পত্রিকা ডন তার অনলাইন ভার্সনে সম্প্রতি এক মন্তব্য প্রতিবেদনে বলেছে, ‘(১৯৭১ সালের ৭ মার্চ) এক সমান্তরাল সরকার কার্যকর হয়। ১৯৪২ সালে সিন্ধুতে সামরিক শাসন জারির পর (বিভাগ-পূর্ব) উপমহাদেশে এটা ছিল দ্বিতীয় সমান্তরাল সরকার।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ‘জুলফিকার আলী ভুট্টো যখন করাচীতে সংবাদ সম্মেলন করছিলেন, তখন ঢাকায় মুজিব এক জনসমাবেশে ভাষণ দিচ্ছিলেন। সব সরকারী, আধাসরকারী ও বেসরকারী ভবনে জাতীয় পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো হয়।’
‘এ লিফ ফ্রম হিস্ট্রি : এ প্যারালাল গবর্নমেন্ট টেকিং ওভার’ শিরোনামে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মুজিবের বাড়িতে একই পতাকা উত্তোলন করা হয়।’
এতে বলা হয়, ১৯ মার্চ ‘ইয়াহিয়া ও মুজিবের বৈঠক কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়। পরের দিন আলোচনা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর আরও গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিবাহিত হতে থাকে।’ এর আগে কয়েকজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ওই ভাষণকে ‘ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান’ অবসানের রূপরেখা বলে অভিহিত করার পর গত সপ্তাহে ডন এই পর্যালোচনামূলক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। লে. জেনারেল কামাল মতিন উদ্দিন তার ‘ট্র্যাজেডি অব এরর : ইস্ট পাকিস্তান ক্রাইসিস ১৯৬৮-১৯৭১’ বইতে লেখেন, ‘১৯৭১ সালের ৭ মার্চ মূলত বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়।
পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান বাহিনীর কমান্ডার লে. জেনারেল এএকে নিয়াজী তার ‘বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান’ বইতে লেখেন, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ‘মুজিব মূলত শাসক হিসেবে পরিগণিত হন।’ তিনি লেখেন, ‘তাঁর বাড়ি প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে পরিণত হয়, কেন্দ্রীয় সরকারের কমান্ড অস্বীকার করা শুরু হয়।’
তবে ভাষণ ও ওইদিনের দৃশ্য সম্পর্কে অপেক্ষাকৃত আরেকজন জুনিয়র কর্মকর্তার লেখায় তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানী সামরিক জান্তার উদ্বেগের কথা উলেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, রমনা রেসকোর্স ময়দানে কয়েক লাখ লোকের বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণে কি থাকতে পারে এবং এর কি প্রতিক্রিয়া হতে পারে সে ব্যাপারে সামরিক জান্তা দারুণভাবে উদ্বিগ্ন ছিল।
তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক অবশ্যই বিষয়টি পাকিস্তানী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছেন। তবে তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রশংসা থেকে বিরত থাকতে পারেননি। তিনি তাঁর ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ বইতে এর বিশদ বর্ণনা করেছেন। সালিক লেখেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ ৭ মার্চ যতই ঘনিয়ে আসছিল ঢাকা ততই গুজব ও আতঙ্কে উত্তাল হয়ে উঠছিল।’ তিনি লেখেন, পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের সদর দফতর ঢাকা রেডিও স্টেশনে এই ‘ননসেন্স’ সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। তিনি নিজে এই নির্দেশ রেডিও স্টেশনকে জানান। তিনি বলেন, এই নির্দেশে বঙ্গবন্ধু তীব্রভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, আমরা যদি সাড়ে ৭ কোটি মানুষের কণ্ঠ সম্প্রচার করতে না পারি তাহলে আমরা কাজ করতে অস্বীকৃতি জানাব’ একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে রেডিওর সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়।
বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে মুজিব মঞ্চে উঠে তাঁর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ঘোষণা শোনার অপেক্ষায় সমবেত বিশাল জনতাকে স্বাগত জানান। মুজিব তাঁর স্বভাবসুলভ বজ্রকণ্ঠে বক্তৃতা শুরু করেন। তবে তাঁর বক্তৃতার বিষয়বস্তুকে পরিবেশ উপযোগী করে তুলতে তিনি ধীরে ধীরে তাঁর কণ্ঠস্বর নিচের দিকে নিয়ে আসেন।
তিনি একতরফাভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা (ইউডিআই) দেননি। তবে ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের জন্য তিনি ৪টি পূর্বশর্ত আরোপ করেন।
এগুলো হলো সামরিক আইন প্রত্যাহার, জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর, সেনাবাহিনীর ব্যারাকে ফিরে যাওয়া এবং বাঙালী হত্যাকা-ের একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন। ‘জলোচ্ছ্বাসের স্রোত নেমে যাওয়ার মতো করে জনগণ রেসকোর্স ময়দান থেকে চলে যেতে থাকে। মনে হচ্ছিল সন্তোষজনক বাণী শোনার পর মসজিদ বা চার্চের মতো কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে তারা ফিরে যাচ্ছে।’ পাকিস্তানী ওই মেজর তার বইতে লেখেন ‘তাদের মধ্যে ক্রোধ ছিল না। তারা ক্রোধানি¦ত হলে হয়ত ক্যান্টনমেন্টের ওপর চড়াও হতো। আর আমাদের অনেকেই এজন্য আতঙ্কিত ছিল।’


   Page 1 of 4
     এক্সক্লুসিভ
সৌন্দর্যের লীলাভূমি ‘আশুরার বিল’
.............................................................................................
আতঙ্ক বাড়াচ্ছে করোনা
.............................................................................................
বাংলাদেশে কী ধরণের সমরাস্ত্র বিক্রি করতে চায় তুরস্ক
.............................................................................................
কুষ্টিয়ার যতীন্দ্রনাথ যেভাবে হলেন ‘বাঘা যতীন’
.............................................................................................
চালের দাম বাড়িয়ে টাকা লুটছে অটোমিল সিন্ডিকেট
.............................................................................................
ইয়াবার চালান থামছে না
.............................................................................................
বিশেষ অভিযানে মাঠে পুলিশ
.............................................................................................
পুলিশে শুদ্ধি অভিযানের উদ্যোগ
.............................................................................................
আয়ু থাকে না বিআরটিসি বাসের
.............................................................................................
জামায়াতীদের নাগরিক মর্যাদা বদলানো দরকার
.............................................................................................
ফেলানী হত্যার আট বছর
.............................................................................................
পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের বিকাশে করণীয়
.............................................................................................
সেলুলয়েডে ‘অপারেশন জ্যাকপট’: সংরক্ষণ হচ্ছে যুদ্ধ স্মারক এমভি ইকরাম
.............................................................................................
অগ্নিঝরা মার্চ
.............................................................................................
কেন্দ্রীয় সম্মেলন নিয়ে ছাত্রলীগের মধ্যে ক্ষোভ-হতাশা
.............................................................................................
অগ্নিঝরা মার্চ: ৬ মার্চ সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়
.............................................................................................
পুশব্যাকের শঙ্কায় আসামের দেড় কোটি বাংলাভাষী
.............................................................................................
ব্যাংক খাতে কোনঠাসা ‘বাংলা’
.............................................................................................
বাংলাদেশে গণহত্যা: পর্ব- ২ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং ইতিহাসের দায়মোচন
.............................................................................................
বাংলাদেশে গণহত্যা: পর্ব-১ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং ইতিহাসের দায়মোচন
.............................................................................................
কে হচ্ছেন ১৯ হেয়ার রোডের বাসিন্দা
.............................................................................................
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণের অজানা ইতিহাস
.............................................................................................
বিশ্বে শক্তিশালী পাসপোর্টের শীর্ষে সিঙ্গাপুর, বাংলাদেশ ৯০তম
.............................................................................................
ফারাক্কা বাঁধ ‘ডি-কমিশন’ সময়ের দাবী
.............................................................................................
নৌ-কমান্ডোরা পূর্ব পাকিস্তানকে নৌ-যানবিহীন অবরুদ্ধ দেশে পরিণত করে
.............................................................................................
রোহিঙ্গা ইস্যুতে ট্রাম্পের সাহায্য আশা করা যায় না: প্রধানমন্ত্রী
.............................................................................................
মুক্তিযুদ্ধে ‘অপারেশন জ্যাকপট’ ও কিছু কথা: পর্ব-২
.............................................................................................
একটি সংবাদের পোস্টমর্টেম
.............................................................................................
স্রোতের বেগে আসছে ভারতীয় গরু, আতঙ্কে দেশীয় খামারিরা
.............................................................................................
মুক্তিযুদ্ধে ‘অপারেশন জ্যাকপট’ ও কিছু কথা: পর্ব- ১
.............................................................................................
কুরুচির থাবা ছিনিয়ে নিল ঊর্মির প্রাণ
.............................................................................................
বাঙালির স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিব
.............................................................................................
মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব
.............................................................................................
শোকের মাস
.............................................................................................
২০ জুন রাতে সৌদি রাজপ্রাসাদে যা ঘটেছিল!
.............................................................................................
লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত ছাতকের আনিক বাঁচতে চায়
.............................................................................................
নাম সর্বস্ব রাজনৈতিক দল! লাভ কার?
.............................................................................................
লালমনিরহাটে গরুর গাড়ি এখন শুধুই স্মৃতি
.............................................................................................
শিশুবিবাহ: বর্তমান প্রেক্ষাপট
.............................................................................................
কমিটি নিয়ে বিএনপি নেতাদের মধ্যে বাড়ছে সন্দেহ-অবিশ্বাস
.............................................................................................
রাজনীতিতে টিকে থাকার কৌশল খুঁজছে জামায়াত
.............................................................................................
কাউন্সিলে নতুন কিছু আশা করছে বিএনপি
.............................................................................................
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নে সাংসদদের কাছেই ধরনা
.............................................................................................
মহাসচিব কে হচ্ছেন? -গুঞ্জন বিএনপি’তে
.............................................................................................
ঘোষিত রায় পরে লেখা অবৈধ মনে করছেন না বিচারপতি আমির
.............................................................................................
জঙ্গি নির্মূলে মাদ্রাসার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকেও নজর দিতে হবে
.............................................................................................
এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৮৬৪২
.............................................................................................
বিজয়ের মাস ডিসেম্বর
.............................................................................................
বিজয়ের মাস ডিসেম্বর
.............................................................................................
বেকার যুবকদের ভাগ্য বদলে বিশেষ ঋণ
.............................................................................................

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আখলাকুল আম্বিয়া
নির্বাহী সম্পাদক: মাে: মাহবুবুল আম্বিয়া
যুগ্ম সম্পাদক: প্রদ্যুৎ কুমার তালুকদার

সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: স্বাধীনতা ভবন (৩য় তলা), ৮৮ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০। Editorial & Commercial Office: Swadhinota Bhaban (2nd Floor), 88 Motijheel, Dhaka-1000.
সম্পাদক কর্তৃক রঙতুলি প্রিন্টার্স ১৯৩/ডি, মমতাজ ম্যানশন, ফকিরাপুল কালভার্ট রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত ।
ফোন : ০২-৯৫৫২২৯১ মোবাইল: ০১৬৭০৬৬১৩৭৭

Phone: 02-9552291 Mobile: +8801670 661377
ই-মেইল : dailyswadhinbangla@gmail.com , editor@dailyswadhinbangla.com, news@dailyswadhinbangla.com

 

    2015 @ All Right Reserved By dailyswadhinbangla.com

Developed By: Dynamic Solution IT