সোমবার, ১৯ এপ্রিল 2021 বাংলার জন্য ক্লিক করুন
  
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

   উপসম্পাদকীয় -
                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                 
নির্ভীক পদচারণার ৫০ বছর

বছর ঘুরে মার্চ মাস এলেই বাঙালির মনে এক মিশ্র অনুভূতি সৃষ্টি হয়। একদিকে স্বাধীনতা অর্জনের সুখকর অনুভূতি, অন্যদিকে এই অর্জনের পেছনে আত্মত্যাগের ইতিহাস। তবে স্বাধীনতা অর্জনের গৌরবময় অনুভূতি যেন সবকিছু ছাপিয়ে যায়, মনের অজান্তেই তৈরি করে গৌরবের বিশাল সোপান। ১৯৭১ থেকে ২০২১, পেরিয়ে গেছে বাঙালি জাতির নির্ভীক পদচারণার ৫০ টি বছর। এই পঞ্চাশ বছরে প্রতিটি ক্ষেত্রে বাঙালিকে দিতে হয়েছে নিজেদের প্রমাণ করার পরীক্ষা। এভাবেই নির্ভীক পদচারণায় বাঙালি সুপরিচিতি লাভ করেছে বিশ্বের দরবারে।

স্বভাবগতভাবেই মানুষ স্বাধীনচেতা। তাই কেউ যদি সেই স্বাধীনতায়  হস্তক্ষেপ করে তাহলে চেতনা রক্ষা এবং আত্মপরিচয় তুলে ধরার তাগিদে হলেও মানুষ ঝাপিয়ে পড়ে,  ছিনিয়ে আনে নিজের অধিকার। ঠিক তেমনি আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে বাঙালি জাতি ঝাপিয়ে পড়েছিল স্ব অধিকার ছিনিয়ে আনার সংগ্রামে, মেতে উঠেছিল স্বাধীকার চেতনায়। আর এই চেতনার উজ্জীবন ই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতার লাল সূর্য অর্জনে শক্তির যোগান দিয়েছিল। লাখ লাখ মানুষের জীবন এবং মা বোনের সম্ভ্রম বিসর্জনের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। লক্ষ লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাঙালী পায় নতুন এক পরিচয়।

স্বাধীনতা অর্জনের সুবর্ণজয়ন্তীতে মার্চ মাস আমাদের কাছে এক বিশেষ অর্থ বহন করছে। এই বছরকে ঘিরে পরিকল্পনার শেষ ছিলনা কিন্তুু করোনা ভাইরাসের আক্রমণে সব পরিকল্পনার অবসান ঘটিয়েছে, জয়ের উল্লাসে মেতে উঠার বদলে অদৃশ্য শত্রুর কবলে আতঙ্কিত দিনযাপন করছে সকলে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী কে ঘিরে বাঙালির মনের ক্যানভাসে যেই চিত্র আকাঁ ছিল তা কিছুটা হলেও ব্যাহত হয়েছে করোনা সংক্রমণের জন্য। জয় স্বভাবতই আনন্দের বিষয় আর সেই জয় যদি হয় নিজের জাতির স্বাধীনতা অর্জনের তাহলে সেটি আরো বেশি অর্থবহ হয়ে উঠে।   এবছর স্বাস্থ্যবিধী মেনে চলে হয়তো স্বল্প পরিসরে দিবসটি উদযাপন করা হবে কিন্তু মনের কোঠায় আজন্ম সর্বকালের সব বাঙালি শ্রেষ্ঠ দিনটি উদযাপন করবে নিজেদের হৃদয়ে।

স্বাধীনতা সবসময় জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে অবস্থান করে আর সেই স্বাধীনতা যদি হয় নিজের জাতির স্ব অধিকার রক্ষার তাহলে সেটি আরোও গৌরবের তবে বরাবরের মতোই স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে তা রক্ষা কঠিন কারন প্রতিনিয়ত সেই অর্জিত স্বাধীনচেতা মানুষদের প্রমাণ করতে হয় যে শুধুমাত্র বছরের একটি দিন না বাকি দিনগুলোও সমুন্নত থাকবে এদেশের মানচিত্র  এবং গৌরবগাঁথা। তখন একই সাথে জাতির সামনে থাকে বিভিন্ন সংকট সহ নাম না জানা হাজারো শত্রু তাই সেসব কিছুকে দূর করে স্বাধীনতা রক্ষা করা আরো বেশি সাহসিকতার কাজ। সকল ধরনের সংকট অতিক্রম করে বাঙালি জাতি বিশ্বের দরবারে সুপরিচিতি লাভ করবে স্বাধীনতার মাসে এটিই কাম্য।

নির্ভীক পদচারণার ৫০ বছর
                                  

বছর ঘুরে মার্চ মাস এলেই বাঙালির মনে এক মিশ্র অনুভূতি সৃষ্টি হয়। একদিকে স্বাধীনতা অর্জনের সুখকর অনুভূতি, অন্যদিকে এই অর্জনের পেছনে আত্মত্যাগের ইতিহাস। তবে স্বাধীনতা অর্জনের গৌরবময় অনুভূতি যেন সবকিছু ছাপিয়ে যায়, মনের অজান্তেই তৈরি করে গৌরবের বিশাল সোপান। ১৯৭১ থেকে ২০২১, পেরিয়ে গেছে বাঙালি জাতির নির্ভীক পদচারণার ৫০ টি বছর। এই পঞ্চাশ বছরে প্রতিটি ক্ষেত্রে বাঙালিকে দিতে হয়েছে নিজেদের প্রমাণ করার পরীক্ষা। এভাবেই নির্ভীক পদচারণায় বাঙালি সুপরিচিতি লাভ করেছে বিশ্বের দরবারে।

স্বভাবগতভাবেই মানুষ স্বাধীনচেতা। তাই কেউ যদি সেই স্বাধীনতায়  হস্তক্ষেপ করে তাহলে চেতনা রক্ষা এবং আত্মপরিচয় তুলে ধরার তাগিদে হলেও মানুষ ঝাপিয়ে পড়ে,  ছিনিয়ে আনে নিজের অধিকার। ঠিক তেমনি আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে বাঙালি জাতি ঝাপিয়ে পড়েছিল স্ব অধিকার ছিনিয়ে আনার সংগ্রামে, মেতে উঠেছিল স্বাধীকার চেতনায়। আর এই চেতনার উজ্জীবন ই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতার লাল সূর্য অর্জনে শক্তির যোগান দিয়েছিল। লাখ লাখ মানুষের জীবন এবং মা বোনের সম্ভ্রম বিসর্জনের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। লক্ষ লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাঙালী পায় নতুন এক পরিচয়।

স্বাধীনতা অর্জনের সুবর্ণজয়ন্তীতে মার্চ মাস আমাদের কাছে এক বিশেষ অর্থ বহন করছে। এই বছরকে ঘিরে পরিকল্পনার শেষ ছিলনা কিন্তুু করোনা ভাইরাসের আক্রমণে সব পরিকল্পনার অবসান ঘটিয়েছে, জয়ের উল্লাসে মেতে উঠার বদলে অদৃশ্য শত্রুর কবলে আতঙ্কিত দিনযাপন করছে সকলে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী কে ঘিরে বাঙালির মনের ক্যানভাসে যেই চিত্র আকাঁ ছিল তা কিছুটা হলেও ব্যাহত হয়েছে করোনা সংক্রমণের জন্য। জয় স্বভাবতই আনন্দের বিষয় আর সেই জয় যদি হয় নিজের জাতির স্বাধীনতা অর্জনের তাহলে সেটি আরো বেশি অর্থবহ হয়ে উঠে।   এবছর স্বাস্থ্যবিধী মেনে চলে হয়তো স্বল্প পরিসরে দিবসটি উদযাপন করা হবে কিন্তু মনের কোঠায় আজন্ম সর্বকালের সব বাঙালি শ্রেষ্ঠ দিনটি উদযাপন করবে নিজেদের হৃদয়ে।

স্বাধীনতা সবসময় জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে অবস্থান করে আর সেই স্বাধীনতা যদি হয় নিজের জাতির স্ব অধিকার রক্ষার তাহলে সেটি আরোও গৌরবের তবে বরাবরের মতোই স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে তা রক্ষা কঠিন কারন প্রতিনিয়ত সেই অর্জিত স্বাধীনচেতা মানুষদের প্রমাণ করতে হয় যে শুধুমাত্র বছরের একটি দিন না বাকি দিনগুলোও সমুন্নত থাকবে এদেশের মানচিত্র  এবং গৌরবগাঁথা। তখন একই সাথে জাতির সামনে থাকে বিভিন্ন সংকট সহ নাম না জানা হাজারো শত্রু তাই সেসব কিছুকে দূর করে স্বাধীনতা রক্ষা করা আরো বেশি সাহসিকতার কাজ। সকল ধরনের সংকট অতিক্রম করে বাঙালি জাতি বিশ্বের দরবারে সুপরিচিতি লাভ করবে স্বাধীনতার মাসে এটিই কাম্য।

সর্বত্র জয় হোক বাংলা ভাষার
                                  

বাঙালী জাতি বীরের জাতি। বাঙালি জাতির জীবনের এক অবিস্মরণীয় দিন ৮ ফাল্গুন। শোকে বিহ্বল, গৌরবে দীপ্ত এক অনন্য দিন। ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতিধন্য মহান শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি। বাঙালি জাতির ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ভাষা আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল নিজের মাতৃভাষার পাশাপাশি নিজস্ব সত্তা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করা। পাকিস্তাানি শাসকদের হুমকি-ধমকি, রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৪৪ ধারা ভেঙে মাতৃভাষার মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে পথে নেমে এসেছে ছাত্র, শিক্ষক, শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী অসংখ্য মানুষ। বসন্তের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে তারা বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠে আওয়াজ তুলেছে, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। পলাশে-শিমুলে রক্তিম হয়ে আছে বাংলার দিগন্ত। গুলি চালানো হলো মিছিলে। তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে জীবন দেয় ভাষা শহিদ রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার ও শফিউরসহ নাম না জানা অনেকে। বাংলা মায়ের বীর সন্তানেরা মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার্থে আজ থেকে ৬৯ বছর আগে ১৯৫২ সালের এই দিনে বুকের রক্তে রঞ্জিত করেছিলেন ঢাকার রাজপথ। পৃথিবীর ইতিহাসে সৃষ্টি হয়েছিল মাতৃভাষার জন্য আত্মদানের অভূতপূর্ব নজির।
ভাষাকে নিয়ে ভাবার ইতিহাসটা আরও আগের। ১৯৪০ সালে পাকিস্তানের লাহোরে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা নিয়ে পৃথক রাষ্ট্রগঠনসহ বিভিন্ন দাবি আদায়ে একটি প্রস্তাব করা হয়। যা ইতিহাসে ‘লাহোর প্রস্তাব’ নামে খ্যাত। ১৯৪৭ সালে শুধুমাত্র ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ স্বাধীন হয়। সৃষ্টি হয় ভারত ও পাকিস্তান নামে দুইটি রাষ্ট্র। পাকিস্তানের আবার দুইটি ভাগ ছিল পূর্বে পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) আর পশ্চিমে পশ্চিম পাকিস্তান । পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকেই দুই পাকিস্তানের মধ্যে শুরু হয় দুরত্ব। পশ্চিম পাকিস্তানে সকল উন্নতি সাধিত হয়। আর পূর্ব পাকিস্তান হতে থাকে অবহেলিত। পূর্ব পাকিস্তানে সকল দাবি-দাওয়া ভুলুন্ঠিত করতে প্রথমেই তারা আঘাত হাতে ভাষার উপর। ১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  কার্জন হলে বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের প্রথম গর্ভনর জেনারেল কায়েদে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বলে ঘোষণা করেন। সেই সময়ে উপস্থিত ছাত্ররা না, না, বলে প্রতিবাদ করে। এভাবেই চলতে সাথে মনের সাথে মাতৃভাষার যুদ্ধ। ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৫২ সালে। ১৯৫২ সালের জানুয়ারী মাসে খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় আসেন। ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে এক জনসভায় বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা কি হবে সেটা পূর্ব বাংলার জনগনই নির্ধারণ করবে। কিন্তু উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এর প্রতিবাদে ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। ৩১ জানুয়ারি গঠিত হয় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদ’। ২১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপি ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই দিবসের কর্মসূচিকে সফল করতে ৪ ফেব্রুয়ারি ‘হরতাল এবং ১১ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি পতাকা দিবস পালিত হয়। ৫২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ ও বন্দী মুক্তি’ দাবিতে শেখ মুজিবুর রহমান ও  আওয়ামীলীগ নেতা মহিউদ্দিন আহম্মদ অমরণ অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। সকল ন্যায্য অধিকারের দাবিতে বাঙালীরা যখন ঐক্যবদ্ধ তখন ২০ ফেব্রয়ারি নুরুল আমিনের ক্ষমতাসীন মুসলীম লীগ সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা শহরে ১ মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলায় ৮ই ফাল্গুন মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্রনেতা গাজীউল হকের সভাপতিত্বে ছাত্র-জনতা মিছিল বের করে। সেদিন হাতে ছিল প্লাকার্ড । মুখে ছিল শ্লোগান। “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”। পুলিশ বেষ্টনী ভেদ করে অসংখ্য দলে বিভক্ত হয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা শান্তিপূর্ণভাবে এগিয়ে চলতে থাকে পরিষদ ভবনের দিকে। শান্তিপূর্ণ মিছিলটি মেডিক্যাল কলেজের সামনে এলে  পুলিশ সেদিনের সেই মিছিলে গুলিবর্ষণ করে। রাজপথে শহীদ হন জব্বার, শফিউর, রফিক, বরকতসহ নাম না জানা আরও অনেকে।

পাকিস্তানি দুঃশাসন ও শোষণের শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালি জাতিসত্তা বিনির্মাণের প্রথম সোপান ছিল ভাষা আন্দোলন। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সেদিনের সেই ভাবনা, সেদিনের সেই চেতনা পরবর্তী সকল আন্দোলনে যুগিয়েছে প্রেরণা। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট, ১৯৬৬ ছয়দফা, ১৯৬৯-গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয় সবই ভাষা আন্দোলনের ফসল। সেদিন যে বাঙালী জাতীয়তাবোধের সৃষ্টি হয়েছিল তা বাঙালীর সকল আন্দোলনে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল। আন্দোলন ছাড়া যে বিজয় হয় না তা ভাষা আন্দোলন থেকে শিখতে পেরেছিল। পাকিস্তানীরা যে পূর্ব বাংলার উন্নতি বা সমৃদ্ধি চায় না তা বোঝা গিয়েছিল ভাষা আন্দোলন থেকে। তাই বলা হয় ভাষা আন্দোলনের মাঝে স্বাধীনতার বীজ লুকায়িত ছিল। বাঙালীর অদম্য মনোবল দেখে, বাঙালীর ভাষার জন্য আন্দোলন দেখে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। আজ আমরা যে শহীদ মিনারে একত্রিত হয়, ফুল দেই সেটি উদ্বোধন হয়েছিল ভাষার মাস ২৪ ফেব্রুয়ারি মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গনে। ভাবতেই কষ্ট হয় আজ আমরা যে মা, মা বলে প্রাণ জুড়াই, শিশুর মুখে হাসি ফোটে, সে ভাষাকে পেতে কতই না কষ্ট করতে হয়েছে রফিক-জব্বারকে। তাঁরা না জাগলে আজ কোন ভাষায় মাকে ডাকতে হতো? আসলে কি এতো মিষ্টি হতো? আসলে কি মা উর্দুতে বলে শান্তি পেতাম? আমার মনে হয় না। ১৯৫২ সালের এই দিনে ভাষার জন্য রাজপথ রঞ্জিত করেছিল। তবে একটি দুঃখের বিষয় দুঃখের ইতিহাসের সাথে বলতে হয় যে বাংলার জন্য জীবন দিল রফিক-শফিকসহ অনেকে অথচ আমরা কিন্তু সেই বাংলাকে কমই মনে রাখছি। আজ ১০০ জনকে বাংলা তারিখ ধরেন ৯৫ জন পারবে বলে মনে হয় না। আজ একুশে ফেব্রুয়ারি বলছি সেটা কোন ভাষা? ধরে নিলাম আর্ন্তজাতিকতায় একুশে ফেব্রুয়ারি বলা হচ্ছে তবে জাতীয় দিবসগুলোতো আমাদের নিজস্ব। কেন সেগুলোকে ইংরেজিতে প্রচলন করা হলো? আমরা কি বাংলাতে জনপ্রিয় করতে পারতাম না? বাংলাতে করলে কি মুখস্থ হতো না? ভেবে দেখা দরকার। ভেবে দেখা দরকার এই বাংলাকে যারা বিকৃত করছে। কারণ বাংলাকে বিকৃত করলে কষ্ট হবে ভাষা শহীদদের। সেই সাথে বাংলা ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার চাই। চাই বাংলার ব্যাপক প্রচলন। আজকে দেশে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল বেড়ে যাচ্ছে। তারা কি বাংলার ইতিহাস তারা কি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জানবে? প্রশ্ন রাখতে চাই??

বাংলা একটি ভাষার নাম। একটি চেতনার নাম। বাংলা সারা বিশ্বের অহংকার। কেননা পৃথিবীর ইতিহাসে বাঙালীরাই প্রথম ভাষার জন্য জীবন দিয়েছিল। তাই ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস ও আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভাষা আন্দোলন দাবি আদায়ের শিক্ষা দেয়, ভাষা আন্দোলন অন্যায়ের কাছে মাথা নত নয় এই শিক্ষা দেয়। যা ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে দরকার সর্বসময়, সর্বকালে। ভাষা আন্দোলনের গল্প বদলে দিতে পারে জীবনকে। বাড়িয়ে দিতে পারে দেশপ্রেম। তাই নতুন প্রজন্মকে এই ইতিহাস জানাতে হবে। জানতে হবে সকলের। সর্বত্র জয় হোক বাংলা ভাষার। শুদ্ধচর্চা ও বাংলার সর্বত্র ব্যবহারই পারে শহীদদের চেতনা অক্ষুন্ন রাখতে। শহীদদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের সকল সাফল্যে প্রেরণার যোগান দিয়ে যাক। বাংলার ব্যবহারে সতর্ক দৃষ্টি থাকুক দায়িত্বশীল মানুষের। আসুন বাংলাকে বেশি বেশি ভালবাসি। বাংলার ভান্ডার সমৃদ্ধ করি।

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

বাঙালির চেতনা ও প্রেরণার প্রতীক একুশে ফেব্রুয়ারি
                                  

‘মা’ শব্দটি যতটা মধুর, আবেগময়। মাতৃভাষা ও ঠিক তেমনি আমাদের আবেগ অনুভূতির আশ্রয়কেন্দ্র। শিশু জন্মের পর তার নিজের অজান্তেই আয়ত্ত করে নেয় এই মধুর বুলি, তাই  এর সংযোগ আমাদের আত্মার সাথে, অস্তিত্বের সাথে। নিজের অজান্তেই রপ্ত করে ফেলা অনুভূতির আশ্রয়কেন্দ্রে আঘাত মেনে নেয়া কখনোই সম্ভব নয়। তাইতো বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে ছিনিয়ে এনেছিল অস্তিত্বের অধিকার বাংলা ভাষার সম্মান।

ভাষা শব্দটি আক্ষরিক বিবেচনায় ছোট একটি শব্দ হলেও এর তাৎপর্য অমূল্য আর একুশের আত্মত্যাগের মহানুভবতায় বাঙালির ক্ষেত্রে সেটি আরও ইতিহাস সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। বাংলা শুধু একটি ভাষা নয়, এর সাথে জড়িত আছে আবেগ, অনুভূতি, সংগ্রাম। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালির বাংলা ভাষাকে উপেক্ষিত করা হলে ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঝাপিয়ে পড়ে রফিক, শফিক সহ আরো নাম না জানা ভাইয়েরা। প্রথমবারের মতো প্রানের বিনিময়ে অর্জিত হয় ভাষার সম্মান। তাই একুশ আামাদের বাঙালির চেতনা ও প্রেরণার প্রতীক।

ভাষা মানুষের মনের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম, একটি সমাজের ঐতিহ্যের বাহক। আর সেই ভাষাই যদি অবহেলিত হয়, সেই ভাষাকেই যদি ছিনিয়ে আনতে হয় তাহলে এরচেয়ে বড় আত্মত্যাগ দ্বিতীয়টি হতে পারেনা। সে কথা বিবেচনা করে ১৯৯৯ সালে বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, ২০১০ সালে জাতিসঙ্গের সাধারণ পরিষদ ‘এখন’ থেকে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা দিবস হিসাবে পালিত হবে’ প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।বাংলা পায় বিশ্বব্যাপী পরিচিতি, অম্লান হয়ে ওঠে বাঙালির আত্মত্যাগ।

বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য জীবন বলি দেওয়া হলেও বাংলা ভাষা আজও পায়নি তার প্রাপ্য সম্মান কারন বাংলা ভাষা এখনও সমাদৃত হতে পারেনি প্রতিটি ক্ষেত্রে। অর্জনের চেয়ে যেমন রক্ষা করা কঠিন তেমনি ভাষাকে ছিনিয়ে আনতে পারলেও আমরা যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে পারিনি। এর পেছনে বহু কারন বিদ্যমান থাকলেও অন্যতম একটি হল তরুণ সমাজের অনীহা। সেদিনের তরুণেরা চেতনার টানে উজ্জীবিত হলেও আজকের তরুণ সমাজ পশ্চিমা সংস্কৃতিতে আকৃষ্ট হয়ে বাংলার থেকে অন্য ভাষার ব্যবহারকে আধুনিকতার অংশ হিসেবে নিচ্ছে। যার কারনে প্রতিনিয়ত বিকৃত হচ্ছে বাংলা। অস্তিত্বের কাছে প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছি আমরা।

প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই সকলের প্রানে স্পন্দন আসে শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য। কিন্তু এই সম্মান শুধু বাহ্যিকভাবে প্রদর্শন না করে আত্মিক অনুভবের জাগরন ঘটাতে হবে। এই চেতনা শুধু ভাষার মাসেই ধারন করলে চলবেনা। মনে-প্রাণে লালন পালন করতে হবে। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার্থে সচেষ্ট থাকতে হবে, বাংলা ভাষাকে বিকৃত হওয়া থেকে বাচাঁতে হবে। তাহলেই পরিতৃপ্ত হবে শহীদেরা, ব্যর্থ হবেনা তাঁদের আত্মত্যাগ। বাংলা ভাষা পাবে প্রাপ্য সম্মান।

 

- নাজিয়া আফরিন

   শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ

  জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
সড়ক দুর্ঘটনামুক্ত বাংলাদেশ চাই
                                  

সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমান সময়ের আলোচিত ও মর্মস্পর্শী ঘটনা। এ দুর্ঘটনায় প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে হাজারো মানুষ, ধূলিস্যাৎ হয়ে যাচ্ছে হাজারো স্বপ্ন। পত্রিকার পাতা খুললেই এ সভ্যতার প্রমাণ মেলে। সড়ক দুর্ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে আজ আমাদের নিরাপত্তার প্রধান হুমকি। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। ফলে অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করে পরিবার ও সমাজের বোঝা হয়ে দূর্বিষহ জীবন যাপন করাছে। দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটছে কিন্তু দূর্ঘটনা কমছে না।  
সড়কপথ হয়ে উঠেছে বিপদজনক। সড়ক দুর্ঘটনা কিছুতেই কমছে না, বরং দিন দিন তা বেড়েই চলেছে। সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা মহামারী রূপ নিয়েছে। বলা চলে এটি একটি জাতীয় দুর্যোগ। একটি ঘটনার রেশ না কাটতেই আরেকটি ঘটনা ঘটছে।
 
প্রতিটি জীব বা প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ ভোগ করতে হবে। কিন্তু নিশ্চয়ই পথের বলি হয়ে কেউ মরে চায় না। এদেশে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে, সড়ক-মহাসড়কের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া নিরাপদ নয়। কেননা, কখন চাকার নিচে চাপা পড়ে সে শঙ্কায় থাকতে হয়। নিজের সচেতনতা নিজেরই হওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। বাস, ট্রাক দুর্ঘটনার পাশাপাশি বাইক দুর্ঘটনাও ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে তরুণ, যুবকদের অনেকে শখের বশে বেপরোয়া হয়ে বাইক চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পতিত হতে হয়। আর প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষকে নানা কাজে বাইরে যেতে হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে হয় শিক্ষার্থীদের। পথে দুর্ঘটনার ভয় থাকলেও একপ্রকার জানবাজি রেখেই চলতে হয়। কোন উপায় নেই। গাড়িচালকদের কথা আর কী বলব? যেভাবেই হোক অপর গাড়িকে ওভারটেক করে এগুতে হবে’-এমন মানসিকতা নিয়েই তারা গাড়ি চালান অনেক চালক।

অপ্রশস্ত পথ ব্যবস্থাও বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। দেশে মানুষের প্রয়োজনে বাড়ছে যানবাহনের সংখ্যা। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন গাড়ি রাস্তায় নামছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনাও। এসব দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পাশাপাশি অসংখ্য মানুষ সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করছে। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু শুধু একটি পরিবারে গভীর শোক, ক্ষত সৃষ্টি করে না, আর্থিকভাবেও পঙ্গু করে ফেলে ওই পরিবারকে। কোন কোন দুর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি প্রাণ হারান। তখন ওই পরিবারের যে কী অবস্থা হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর যারা পঙ্গুত্ববরণ করে তাদের পরিবারের অবস্থা আরও করুণ, আরও শোচনীয়। বিষয়গুলো আমাদের ভাবা উচিত বলে আমি মনে করি। সরকারি, বেসরকারি সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট যানবাহন কর্তৃপক্ষকে নিহত ও আহত হওয়া পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। করতে হবে সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা। আমরা সড়ক দুর্ঘটনামুক্ত একটি বাংলাদেশ প্রত্যাশা করি। সড়কে এই মৃত্যুর মিছিল কবে থামবে? আর কত প্রাণ ঝরবে? মৃত্যুফাঁদে পরিণত হওয়া সড়কগুলোকে যেভাবেই হোক নিরাপদ করতে হবে সকলের জন্য।

বিশেষ করে গাড়ি চালকদের মাঝে সচেতনতা তৈরির পদক্ষেপ নিতে হবে। নিষিদ্ধ করতে হবে গাড়ি চালানোর সময় চালকদের মোবাইলে কথা বলা। আইনে পরিবর্তন এনে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড বিধান কার্যকর করতে হবে। রাস্তায় যেন কোন ধরনের ফিটনেসবিহীন যান চলাচল করতে না পারে সে ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। রাস্তার মাঝে গাড়ি ঘোরানোর মতো অন্যায়কে কোনভাবেই প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যানবাহনের বেপরোয়া গতি। নেশা করে যেন কোন চালক গাড়ি চালাতে না পারে সেদিকেও দৃষ্টি রাখতে হবে। পাল্লা দিয়ে ‘ওভারটেকিং’ করা বন্ধ করতে হবে। চোখে ঘুম নিয়ে গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকতে ড্রাইভারদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। কোন অযোগ্য ও অদক্ষ চালক যেন লাইসেন্স না পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গাড়ি চালকদের জন্য নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা গেলে ভালো হয়।  সবচেয়ে জরুরি হলো কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি বৃদ্ধি।

সড়ক দুর্ঘটনা হয় না এমন দেশ নেই। কিন্তু দুর্ঘটনার সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতি যত কমিয়ে আনা যায় সেটিই লক্ষ্য হওয়া উচিত। আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, সময়ের সমষ্টি হলো জীবন। সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না। আসুন সড়ক আইন মেনে চলি, নিরাপদে গন্তব্যে ফিরি। দুর্ঘটনামুক্ত নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

 
লেখকঃ সিনথিয়া সুমি
শিক্ষার্থী
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরাতে পর্যটন শিল্প হতে পারে অন্যতম হাতিয়ার
                                  

যেদিন থেকে বুঝতে শিখি আমার জন্মভূমি বাংলাদেশ। সেদিন থেকে সবচেয়ে বেশি যে বাক্যের সাথে পরিচয় ঘটে তা হলো -সুজলা, সুফলা,চিরসবুজ  আমাদের এই বাংলাদেশ।  প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই দেশ যেখানে নদ, নদী, ফুল,ফল, পাখি,  পাহাড়, খাল বিলে পরিপূর্ণ। সেদিন থেকেই বুঝতে পারি এই দেশই পারে ভ্রমণ পিপাসুদের তৃষ্ণা মেটাতে।

তখন থেকে কেন জানি হাইস্কুল না মাড়াতেই মাথায় চেপে বসে কিভাবে এই দেশের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় এবং সবার সামনে মেলে ধরা যায় এদেশের সকল রূপ বৈচিত্র্য। তাই তো বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনের সুযোগটা পরিপূর্ণ কাজে লাগাতে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিষয়টায় হয়ে ওঠে প্রথম পছন্দ।

তবে আশেপাশ থেকে শুরু হয় প্রশ্ন ছুড়াছুড়ি- এটা আবার কি বিষয়। কেন পড়বে এই বিষয়ে? এই বিষয়ের ভবিষ্যত কোথায়?

সেদিন আমি জোর দিয়ে বলতে পারিনি কেন পর্যটনের উপর আমার এত আগ্রহ। সবাইকে বলতে পারাটা যদিও সহজ ছিলো তবে এর অবস্থান বোঝাতে পারাটা মোটেও সহজ ছিলো না। আমাদের পর্যটন শিল্পের উপর অপার সম্ভাবনা থাকলেও স্বাধীনতার ৪৯ বছর পেরিয়েও ব্যার্থ হয়েছি কাঙ্খিত সফলতা অর্জনে।  

বর্তমানে  মানুষের পর্যটনের প্রতি বিশেষ চাহিদা লক্ষণীয়। বেশ কয়েক বছর ধরে হালাল পর্যটন, বিনোদন পর্যটন, রিলিজিয়াস পর্যটন, ব্যাবসায় পর্যটন, চিকিৎসা পর্যটনসহ বিভিন্ন কারণে দেশ বিদেশে ভ্রমণের উদ্দেশ্য নিয়ে ছুটে চলেছে উচ্চবিত্ত পাশাপাশি মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা। উক্ত বছরে কোভিড ১৯ এর জন্য যখন সব পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায় তখন রীতিমতো পর্যটন কেন্দ্র ঝুঁকিতে পড়ে যায়। আশ্চর্য বিষয় হলো লকডাউন ছেড়ে দেওয়ার পরপরই কোভিড ১৯ এর তোয়াক্কা না করেই ভ্রমণপিপাসুরা ছুটে যায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে।
 
দেশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র গুলোতে যেমন সাজেক ভ্যালী, কক্সবাজার, কুয়াকাটা সহ বিভিন্ন ভ্রমণ স্পটে মানুষের ভীড় জমলেও তা অন্যান্য বছরের ন্যায় যথেষ্ট কম। কোভিড ১৯ এর ফলে যখন সব মানুষ গৃহবন্দি ঠিক ঐ মুহুর্তে প্রকৃত যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আগের চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে করোনার এর সময়ে  প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার যে বিশাল ক্ষতি হয় ট্যুরিজম খাতে। এই বিশাল ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শুধু সরকার নয় বরং গোটা দেশের মানুষকে নজর দিতে হবে, এগিয়ে আসতে হবে।   

পর্যটন এর মত সম্ভবনাময় এই খাতের দিকে আমরা বরাবরই সঠিক পরিচর্যার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছি। অনেকাংশেই এই খাতে পিছিয়ে আছি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তুলনায়।

পর্যটন খাতে পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ এই খাতে নেই পর্যাপ্ত দক্ষ মানবসম্পদ ব্যাবস্থাপনা, নেই উক্ত বিষয়ের প্রতি সঠিক গবেষণা, পরিকল্পনা প্রণয়ণে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এই খাতের উন্নয়নে ব্যাংক লোন পাওয়া দুষ্কর।
 
এছাড়াও পর্যটন খাতের উন্নতির জন্য সর্বপ্রথম যেদিকে নজর দেওয়া প্রয়েজন তা হলো উন্নতমানের নিরাপত্তা ব্যাবস্থা নিশ্চিত করা। এত বেশি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে যাতে ভ্রমণের কথা মাথায় আসলে কেউ মেয়ে হিসাবে ঝুঁকি আছে বলে বাঁধা  দেবে না।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে তবে প্রাকৃতিক সম্পদের উপর যতদূর সম্ভব খারাপ প্রভাব না পড়ে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় অস্থিতিশীল রাজনীতি, হরতাল, বন্যা, খরা এসকল প্রচারণা  করে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট না করে বরং দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং হাজার বছরের পুরানো ঐতিহ্য এর রূপ তুলে ধরতে হবে। বাঙালির আতিথেয়তার ঘাটতি ছিলো না কখনো। আর এই অতিথিপরায়ণতার জন্য এদেশের মানুষেরা বরাবরই ছিলো জনপ্রিয়।

বাংলাদেশের এখন যে ১৭ টা এসডিজি (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল) অর্জন করতে হবে তার ৮,১২,ও ১৪ সরাসরি পর্যটনের সাথে সম্পৃক্ত। তাই যতদ্রুত সম্ভব এই বিষয় মাথায় রেখে পর্যটন খাতের ঘাটতি গুলো খতিয়ে দেখতে হবে এবং দেশের সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে পর্যটন খাতকে টেকসই উন্নয়নে অন্তভুর্ক্ত করতে।

এই খাতে প্রণোদনাসহ বিভিন্ন আর্থিক সহায়তা প্রদান করে মজবুত অর্থনীতির খুঁটি স্বরুপ দাড় করাতে হবে। জেলা ভিত্তিক পুরস্কার এর ঘোষণা দিতে হবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পরিচর্চা ও পরিবর্ধন এর জন্য। সরকারি ও বেসরকারি ভাবে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে তুলতে হবে পর্যটন শিল্পের ভাবমূর্তি।

এই বিষয়ে শিক্ষারত সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের থেকে বিভিন্ন আইডিয়া,বা  মতামত  সংগ্রহ করতে হবে যা আধুনিকতার সাথে এই শিল্পকে এগিয়ে নিতে সহায়ক ভুমিকা পালন করবে। দেশের সামগ্রিক পরিকল্পনা বা মেগা প্রজেক্ট এর পরিকল্পনা যাতে এই শিল্প খাতের উপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে সেদিকে সবাইকে সচেতন হতে হবে।  

পর্যটন খাতের উপর যারা শিক্ষা ও গবেষণা নিয়ে জ্ঞান অর্জন করছে এমন দক্ষ জনশক্তির নিয়োগ ঘটাতে হবে। হাতে কলমে প্রতিক্ষণের মাধ্যমে পর্যটন এর  জনশক্তিকে আরো মজবুত করে তুলতে হবে। পর্যটনের সাথে সম্পৃক্ত সকল জনশক্তির মধ্যে সু -সম্পর্ক গড়ে তুলে সবাইকে চেইন অব কমান্ড এর মধ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে৷

দেশের সকল পর্যটন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক গোষ্ঠীকে প্রতিযোগী নয় বরং সহযোগী মনোভাব পোষণ করতে হবে। সর্বোপরি পর্যটন এর মহাপরিকল্পনা সমূহ বাস্তবায়নে দেশের সকল নাগরিককে সততার পরিচয় দিতে হবে। সব স্তর থেকে এই শিল্পের উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে।

লক্ষ্য রাখতে হবে বাড়ির পাশের প্রকৃতিক সৌন্দর্যের উপর। আজ যা অবহেলিত কাল তা হতে পারে পর্যটনের অনেক বড় কেন্দ্র। তাই দেশের সমস্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পরিচর্চা করতে হবে। প্রকৃতি দুই হাত ভরে দিয়েছে আমাদের সৌন্দর্যের ছোঁয়া যার যত্ন নেওয়া আমাদের কর্তব্য। পদ্মবিলের পদ্মফুল হোক বা কাঁশবনের কাঁশফুল সবকিছুকে মূল্যায়ন করতে হবে। স্থির চিত্র ধারণের আনন্দে দুই হাতে এসব সৌন্দর্য নষ্ট করা হতে বিরত থাকতে হবে। সবাই সচেতন হলে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরাতে পর্যটন কেন্দ্র হয়ে ওঠবে প্রধান হাতিয়ার।

 

আঁখি খানম
ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি  ম্যানেজমেন্ট।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যাল, বাংলাদেশ।
প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চা
                                  

অদৃশ্য এক অণুজীব নভেল করোনাভাইরাসের ভয়াল থাবায় সারাবিশ্ব আজ আতঙ্কিত, জনজীবন বিপর্যস্ত, স্কুল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব ধরণের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম স্থগিত, অফিস-আদালতের কাজে গতিহীনতা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ পুরো অর্থনীতির চাকো যেন থমকে দাড়িয়েছে। এমন সময় “মরার ওপর খাঁড়ার ঘা”এর মত আমাদের দেশে ক্রমেই বেড়ে চলেছে আরেক ভয়াবহ ও জঘন্যতম ব্যাধি -ধর্ষণ।

পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশনের খবর, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সবকিছুতেই দেখতে পাই ধর্ষণ, গণধর্ষণ, শিশুধর্ষণসহ নারীর প্রতি সহিংসতামূলক নানাবিধ আচরণ। ইদানীং দেশে ধর্ষণ যেন এক নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। সংবাদপত্র খুললেই চোখে পরে প্রতিদিন  ৪-৫টা ধর্ষণের খবর। সারাদেশে প্রায় অবাধে ঘটে চলছে এ নৃশংস অপরাধ। শেষ কোথায় এ জঘন্যতম অপরাধের? এর কি কোনো শেষ নেই?

ঘরে-বাইরে, পথে-ঘাটে, স্কুল কলেজ মাদ্রাসাসহ সব ধরণের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র- কোনো জায়গাতেই আজ নারীরা নিরাপদ নয়। পশুর চেয়ে হিংস্র ও বর্বর একদল হায়েনা তাদের যৌনক্ষুধা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে নারীদের চারপাশে। নারী মাত্রই যেন তাদের যৌান ক্ষুধা মেটানোর মাধ্যম। ভোগের লালসায় উন্মাদ এসব পশুদের বর্বরতার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না কোনো বয়সী নারী ও কন্যাশিশু। সিলেটের এমসি কলেজে স্বামীর সাথে বেড়াতে গেলে স্বামীকে বেঁধে রেখে গৃহবধুকে বখাটে শিক্ষার্থীদের দলবেঁধে ধর্ষণ, ডাকাতি করতে এসে ঘরে ঢুকে প্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণ করা হয় খাগড়াছড়িতে, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের কদমতলীতে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রীকে ধর্ষণ, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে ৩৭ বছর বয়সী গৃহবধুকে বিবস্ত্র করে বর্বরযুগীয় উপায়ে নির্যাতন, ২০১৬ সালে কুমিল্লার ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় সোহাগী জাহান তনু নামের এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যা, এসব ঘটনা আমাদের আতঙ্কের মাত্রাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে, মনসিকভাবে অসুস্থ করে তুলছে দিন দিন। নারীর নিরাপত্তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। নারীরা কি আদৌ নিরাপদ? কোথায় আসলে নারীদের নিরাপত্তা?

আফসোসের বিষয় ধর্ষণের জন্য ধর্ষককে দায়ী না করে বরং দায়ী করা হচ্ছে ধর্ষণের শিকার নারীকে, তাদের স্বাভাবিক চলাফেরা, মেলামেশাকে। একশ্রেণীর মানুষ নারীর পোষাককে দায়ী করছে ধর্ষণের জন্য। আদতে ধর্ষণের সত্যতা যাচাইয়ে পাওয়া যায় না যে ধর্ষণের জন্য পোষাক ই দায়ী। পোষাক ই যদি ধর্ষণের জন্য দায়ী হয়, তবে কেন ২ বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করতে হয়? কেন ওযু করতে বেরিয়ে ৭২ বছরের বৃদ্ধাকে ধর্ষণের শিকার হতে হয়? মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে কেন ধর্ষণ করা হয়? মানসিক ভারসাম্যহীন রাস্তার ধারে থাকা অসুস্থ মেয়েটিকেও কেন ধর্ষণের শিকার হতে হচ্ছে? এসব ঘটনার ক্ষেত্রে কোনোভাবেই পোষাক দায়ী নয়। বরং যারা ধর্ষণের জন্য পোষাকরে দোহাই দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছেন, তারা ধর্ষণের জন্য প্রকৃত দোষী ধর্ষককে দায়ী না করে, ধর্ষণের প্রতিবাদ না করে, ধর্ষিতার প্রতি সহযোগী মনোভাব পোষণ না করে ধর্ষণের মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দিতে ভুমিকা পালন করছেন, পরোক্ষভাবে ধর্ষকদের উৎসাহিত করছেন। নারীর পোষাকের দোহাই দিয়ে তাকে ধর্ষণ করার অধিকার কারো নাই।

ভয়াল এ কালো মিছিলের ইতি টানতে প্রয়োজন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে, বদলে যেতে পারে ক্রমবর্ধমান এ ধর্ষণের চিত্রও। মেয়েরা একা কোথায় যেতে পারবে না, সন্ধ্যার পর বাইরে থাকতে পারবে না, ছেলে বন্ধুদের সাথে মেশা যাবে না, যাচ্ছে তাই পোষাক পরিধান করা যাবে না, সর্বোপরি মেয়েরা ছেলেদের মত স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারবে না বলে যেসব বিশ্বাস আমাদের সমাজে বদ্ধমূল হয়ে আছে, সেসব বিশ্বাস ঝেড়ে ফেলে নারী-পুরুষ উভয়ের সম-অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পরস্পরের প্রতি সহর্মমিতা, পারস্পারিক সৌাহার্দ্য, সহযোগী মনোভাব বাড়াতে হবে।

পরিবার থেকে ছেলে মেয়ে উভয়কে নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে। পরিবার ও সমাজে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে। কোনো ধর্মেই অপরাধকে ছোট করে দেখা হয় না। ধর্ষক যে ই হোক না, হোক কোনো ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বা বিত্তবান কেউ বা দলীয় পরিচয়ধারী কেউ, ধর্ষক মাত্রই দ্রুত আইনের আওতায় এনে সুষ্ঠ বিচারব্যবস্থার অধীনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত ও কার্যকর করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে পরিবর্তন করে সকল মানুষের জন্য আইন সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে। আইনী সহায়তা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ধর্ষিতা নারী যেন কোনো ধরণের হয়রানির শিকার না হয়ে সুবিচার পায় সে ব্যবস্থা করতে হবে।

তাছাড়া মেয়েদের আত্মরক্ষার মৌলিক কৌশলগুলো শিখে রাখা উচিত যেন কোনো পরিস্থিতে নিজের নিরাপত্তা নিজেই নিশ্চিত করতে পারে।

পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের চর্চাও ধর্ষণের মত সামাজিক ব্যাধিকে রুখতে সহায়তা করবে। নারীকে ভোগ ও লালসা পূরণের সামগ্রী হিসেবে না ভেবে একজন মানুষ হিসেবে সম্মান করতে শিখতে হবে। পরিবার থেকেই যৌনতা বিষয়ক শিক্ষা দিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌনতা নিয়ে প্রচলিত ট্যাবু দূরীকরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে যৌনতা বিষয়ক শিক্ষা প্রদান করতে হবে। যৌনতা বিষয়ক শিক্ষার অভাবও পরোক্ষভাবে ধর্ষণকে প্রভাবিত করে। যৌনতা এক ধরণের সহজাত প্রবৃত্তি। সব ধরনের প্রাণীর ই এ প্রবৃত্তি বিরাজমান এবং যৌন চাহিদা পূরনের বৈধ উপায়ও রয়েছে। আর বিশেষজ্ঞরা মনে করেন- ধর্ষণ কখনো যৌনতা পূরণ করতে পারে না। এটি শুধু ক্ষমতাসীনতা, অসুস্থ মানসিকতার পরিচায়ক ও বিকৃত কামপ্রবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ।

সর্বোপরি কঠোর আইনের যথাযথ প্রয়োগ, ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত ও দ্রুত কার্যকর করা, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, নৈতিক শিক্ষা, মূল্যবোধ চর্চা দ্বারা ধর্ষণ নামক ব্যাধির একেবারে নির্মূল সম্ভব না হলেও তা অনেকাংশেই কমে যাবে এবং সুস্থ সমাজ গঠিত হবে।

তানভীন সুইটি
অর্থনীতি বিভাগ
৩য় বর্ষ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল: লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশ ও গৃহীত পদক্ষেপ
                                  

সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের কারণে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা বাতিল করে জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের গড় মূল্যায়ন করে আগামী ডিসেম্বরে ফলাফল প্রদানের ঘোষণা প্রদান করে শিক্ষামন্ত্রণালয়। শিক্ষার্থীদের জীবনের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিকল্প ছিল না বলে উল্লেখ করেন শিক্ষামন্ত্রী।

আমাদের জীবনে যতগুলো পাবলিক পরীক্ষা রয়েছে, তার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ও উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ ও ভিত এখানেই গড়ে ওঠে। এইচএসসি ও সমমানের এই পরীক্ষা গ্রহণ করা হয় মূলত শিক্ষার্থীর অর্জনটা কোন অবস্থায় আছে সেটি যাচাইয়ের জন্য। দেশ-বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কিংবা ভবিষ্যৎ চাকরি বাজারে এইচএসসির রেজাল্ট কতটা প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে তা সহজেই অনুমেয়। করোনা ভাইরাসের কারণে ইতোমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনি ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা বাতিল করা হয় এবং এখনো এটি নিয়ন্ত্রণে না আসার দরুন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষাও বাতিল ঘোষণা করল সরকার। পরীক্ষা বাতিলের এই সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। কেউ এটিকে দেখছে ইতিবাচক দিক হিসেবে আবার কেউ দেখছে নেতিবাচক হিসেবে।

প্রত্যকে জিনিসের-ই ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক রয়েছে।  উচ্চমাধ্যমিকের  পরীক্ষা বাতিলের  ইতিবাচকতা হলো-
প্রথমত- এই সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের একটা উদ্বেগ, উৎকন্ঠা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটেছে। কেননা, তারা একটা  দোদুল্যমান অবস্থায় ছিল যে পরীক্ষা আদৌ হবে?  কি হবে না?  দেশে এখনও করোনা সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের বেশি। এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের কথা ছিল প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থী। এই ১৪ লাখ শিক্ষার্থীর সঙ্গে তাদের অভিভাবক, শিক্ষক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও শিক্ষাখাতের কর্মকর্তাসহ প্রায় অর্ধকোটি মানুষ দৈনিক পরীক্ষা গ্রহণের কাজে বের হতে হতো। এখানে যদি ১ শতাংশও আক্রান্ত হয়,  তাহলে সংখ্যাটি দাঁড়াবে  প্রায় ৫০ হাজার। সুতারাং সরকার এত বিপুল সংখ্যক মানুষের স্বাস্থ্যবিধি কতটা নিশ্চিত করতে পারতো তা প্রশ্নবিদ্ধ। তাই পরীক্ষার চেয়ে জীবনের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের কাছে বেশি জরুরি। দ্বিতীয়ত- ১৪ লাখ শিক্ষার্থীকেই এবার শতভাগ পাশ করানো হবে। পরীক্ষা হলে নিশ্চয়ই কখনো শতভাগ পাশ হতো না, এদিক দিয়ে যাদের প্রস্তুতি খারাপ ছিল তারা সুবিধা পেয়েছে অর্থাৎ মন্দের ভাল হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের নেতিবাচক দিক বিচার করতে গেলে বলতে হবে, এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের উপর দীর্ঘমেয়াদী একটা প্রভাব ফেলবে। এক্ষেত্রে রাইজিং শিক্ষার্থীরা তাদের ন্যায্য ফলাফল থেকে বঞ্চিত হবে। অনেক শিক্ষার্থীর জেএসসি ও এসএসসির তুলনায় প্রস্তুতি বেশ ভাল ছিল। যার ফলাফল হয়ত অনেক ভাল করার কথা ছিল কিন্তু সে সেই সুযোগটি হারালো। এমনও অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক রয়েছে যারা জেএসসি পরীক্ষাকে খুব একটা গুরুত্ব দেন না। কেননা, এটি বাচ্চাদের জন্য খুবই আরলি এক্সাম। সেক্ষেত্রে এই ফলাফল দিয়ে কিভাবে মূল্যায়ন হবে? তাছাড়া বিভাগ পরিবর্তনের অনেক শিক্ষার্থী রয়েছে। সবমিলিয়ে এদের মূল্যায়ন কতটা ন্যায্য হবে? বলা চলে তা প্রশ্নবিদ্ধ!

লাভ-ক্ষতির হিসাব যতটুকুই হোক না কেন এ সিদ্ধান্তের ফলে আগামীতে যে বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি হবে এবং সেগুলো মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় ও তারিত্ব সিদ্ধান্তও নিতে হবে।  প্রথমত- বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে নানা ধরণের সমস্যা তৈরি হবে। উচ্চমাধ্যমিক ফলাফলের উপর ভিত্তি করেই বুয়েটে কে কে পরীক্ষা দিতে পারবে তা নির্ধারিত হয়। সেক্ষেত্রে এবার পরীক্ষার্থীর সংখ্যা হারহামেশাই বাড়বে। আর বেশি সংখ্যক পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষার সুযোগ ও মূল্যায়ন- দুটি ক্ষেত্রেই বুয়েট কর্তৃপক্ষকে পড়তে হবে নতুন জটিলতায়। তাছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি পরীক্ষায় এইচএসসি ফলাফলের ওপর নির্ধারিত নম্বর থাকে । এবার তাহলে নম্বর বন্টন নিয়ে বিভিন্ন শিক্ষার্থী যেমন বিপাকে পড়বে তেমনি বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্নও উঠতে পারে ।  দ্বিতীয়ত- বিভাগ পরিবর্তন করে যারা ভাল ফলাফলের আশায় অন্য বিভাগে ভর্তি হয়েছে সেক্ষেত্রে তাদের জন্য স্বচ্ছ নীতিমালার মাধ্যমে মূল্যায়ন কতটা সাফল্যমন্ডিত করা যায় তা সুস্পষ্ট করতে হবে। তৃতীয়ত- যেহেতু ইতিহাসে এই প্রথম শতভাগ পাশ করানো হবে সেহেতু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বাড়বে ব্যাপক হারে । সেক্ষেত্রে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মান ধরে রাখতে সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।  চতুর্থত- চাকরি বাজারে ২০২০ ব্যাচের সঠিক মূল্যায়ন হবে তার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। পঞ্চমত- বিদেশে উচ্চশিক্ষায় গমনেচ্ছু শিক্ষার্থীরা যেন হয়নানির স্বীকার না হয় সেদিকেও সুদৃষ্টি দিতে হবে।

শিক্ষার্থীদের যথাযথ মূল্যায়নে জেএসসি ও এসএসসির সাথে কলেজ পর্যায়ের বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল পর্যবেক্ষণে এইচএসসির ফলাফল মূল্যায়ন করা যায় কি না সে বিষয়ে সরকার কে ভেবে দেখতে হবে।  অন্ত্যত এবারের জন্য   বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের উচিত হবে স্নাতক পর্যায়ের ভর্তি পরীক্ষায় এসএসসি ও এইচএসসির জিপিএ সমন্বয়ের নম্বর তুলে দেয়া এবং একইসাথে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় বিষয়ভিত্তিক যে দুচারটি প্রশ্ন থাকে তার পরিমাণ বাড়িয়ে  দেওয়া। এতে করে পরিশ্রমী ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে আসবে বলে আশা করা যায়। সুতারাং পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, সেগুলো অতিক্রম করতে পারলে তা হবে যুগান্তকারী।
মোহম্মদ শাহিন
শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সুনীল অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের নতুন দিগন্ত উন্মোচন
                                  

পৃথিবীর ফুসফুস বলা হয় সমুদ্রকে। সমুদ্রের তলদেশের ভূপ্রকৃতি বৈচিত্র্যময় এবং প্রাণ প্রাচুর্যের অমিত সম্ভাবনাময় ভরপুর এক জগৎ। বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় বিষয়টির প্রথম ধারণা দেন অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক, অধ্যাপক গুন্টার পাউলি। ২০১০ সালে জাতিসংঘের আমন্ত্রণে পরিবেশ-বান্ধব টেকসই অর্থনৈতিক রুপরেখা প্রণয়নের ধারণাটি প্রকাশ পায় তার বক্তব্যে।

সমুদ্রের জলরাশি, সমুদ্র সম্পদ ও সমুদ্রকে ঘিরে গড়ে উঠা অর্থনীতিকে বলে ব্লু-ইকোনমি। ব্লু-ইকোনমি বলতে বোঝায়, সমুদ্রের রং নীল। আর সেকারণেই সমুদ্রকেন্দ্রিক যে অর্থনীতি তাকে সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু-ইকোনমি বলে। সুনীল অর্থনীতির মূল উপাদানগুলো হচ্ছে খনিজ সম্পদ, পানি সম্পদ, পরিবহন সেবা, জ্বালানি সম্পদ, পর্যটন শিল্প ইত্যাদি। এগুলোর পরিকল্পিত ব্যবহার এবং টেকসই উন্নয়নে সমুদ্রের অর্থনীতির সুবিশাল সম্ভাবনা বয়ে আনবে। বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোর মতো বাংলাদেশও তার সমুদ্র সম্পদকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে পারবে।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ঐতিহাসিক সমুদ্র বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ-মিয়ানমার ও ভারতের সাথে বঙ্গোপসাগরের সীমানা বিরোধ নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালত থেকে ২০১২ সালের ১৪মার্চ তারিখে ১,১৮,১৮৩ বর্গকিলোমিটার এলাকার জলসীমায় নিরস্কুশ কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে এবং সমুদ্রের তলদেশের ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সব ধরণের সম্পদের পূর্ণ অধিকার পেয়েছে। আমাদের দেশের দক্ষিণে অবস্থিত বঙ্গোপসাগরে যে খনিজ সম্পদ রয়েছে তা পৃথিবীর অন্যকোনো সাগর বা উপসাগরে নেই এবং বলা হয়ে থাকে যে, বঙ্গোপসাগর যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার নিয়ন্ত্রণ তার হাতে থাকবে। এইজন্য পরাশক্তিগুলো বঙ্গোপসাগরকে দখল করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

বিশ্বে বর্তমানে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতি। ২০৫০ সালের পৃথিবীর জনসংখ্যা হবে প্রায় ৯৫০ কোটি। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্যের যোগান দিতে বাধ্য হয়েই সমুদ্র সম্পদের দিকে ঝুঁকতে হবে। বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলো সমুদ্র সম্পদকে ইতিমধ্যে কাজে লাগাচ্ছে এবং তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি করছে। ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় অর্থনীতির ৯০ ভাগ সমুদ্রনির্ভর এবং সে দেশের সরকার এমন কিছু পদক্ষেপ ইতিমধ্যে নিয়েছে যে, তারা যদি সফল বাস্তবায়ন হয় সমুদ্র থেকে আহরিত সম্পদের মূল্য বাজেটের ১০গুণ হবে। অস্ট্রেলিয়া তাদের সমুদ্র সম্পদ থেকে বর্তমানে ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে থাকে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদের আঁধার বঙ্গোপসাগরে সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু-ইকোনমির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কেমন, বাংলাদেশ কীভাবে ব্লু-ইকোনমির মাধ্যমে কর্মসংস্থান করতে পারবে এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি কেমন হবে??

বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরে গিরিখাতের মতো একটি অঞ্চল রয়েছে, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৭ কিলোমিটার এবং এটি মাছের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। বঙ্গোপসাগরে ৪৫০ প্রজাতির মাছ, ৩৩৬ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ৭ প্রজাতির কচ্ছপ, ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি, ১০ প্রজাতির ডলফিন, ৫ প্রজাতির লবস্টার রয়েছে। এদের মধ্যে শামুক, ঝিমুক, শ্যালফিস, কাঁকড়া, অক্টোপাস, হাঙ্গরের অর্থনৈতিক চাহিদা রয়েছে এবং বিভিন্ন দেশে এগুলো খাদ্য হিসেবে ব্যাপক বিবেচিত হয়। এছাড়াও রয়েছে সামুদ্রিক আগাছা, লতা, গুল্ম। বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক আগাছা প্রক্রিয়াজাতকরণ করে বিভিন্ন রোগের ওষুধ তৈরি করা হয় এবং এসব আগাছার  মধ্যে  ইসপিরুলিনা সবচেয়ে মূল্যবান যেটি চীন, জাপান, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে খাদ্য হিসেবে খেয়ে থাকে। সামুদ্রিক মাছ থেকে খাবার, মাছের তেল দিয়ে বিভিন্ন প্রকার সস, বিটোসন ইত্যাদি তৈরি করা সম্ভব, এর ফলে কর্মসংস্থান হবে এবং বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে। এছাড়াও বঙ্গোপসাগরের টুনা মাছেরও বিদেশে অনেক চাহিদা আছে।

বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের মতে, সমুদ্র সৈকতের বালিতে মোট খনিজের মজুত ৪৪ লাখ টন। এর মধ্যে প্রকৃত মজুত ১৭লাখ ৪৪ হাজার টন। বঙ্গোপসাগরের ১৭ প্রকার খনিজের মধ্যে ১৩ টি স্থানে প্রায় ১০ লাখ টন খনিজবালি উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে। গভীর সমুদ্রের তলদেশে মলিবডেনাম, ম্যাঙানিজ, ক্রাস্ট, তামা, সিসা, জিংক, সালফাইডের অস্তিত্ত্ব রয়েছে এবং সাগরের তলদেশে ৩০ থেকে ৮০ কিলোমিটার গভীরে সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল ক্লের সন্ধান পাওয়া গেছে। খনিজ বালির মধ্যে মোনাজাইট অতিমূল্যবান পদার্থ এবং এ পদার্থ পারমাণবিক বোমা ও পারমাণবিক চুল্লিতে ব্যবহ্রত হয়। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে ম্যাঙ্গানিজ এডিউল, ফসফরাস ডেপোজিট, পলিমেটালিক সালফাইড নামক আকরিক রয়েছে। এইসব আকরিক পরিশোধনের মাধ্যমে কোবাল্ট, লেডসহ দুর্লভ ধাতু পাওয়া যায় এবং এইসব ধাতু জাহাজ নির্মান ও রাসায়নিক কারখানায় ব্যবহার করা যাবে। এছাড়াও মণি, মুক্তো, সোনা, রুপা, প্রবালসহ বিভিন্ন ধরণের মহামূল্যবান ধনরত্ন রয়েছে।

বঙ্গোপসাগরের গভীর ও অগভীর সমুদ্রে মহামূল্যবান ধাতু ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের সন্ধান মিলেছে। সমুদ্রের উপকূলে উত্তম ব্যবসা লবণ উৎপাদনে যদি উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয় তাহলে ১-৫মেট্রিক টন লবণ রপ্তানি হবে বলে আশা করা যায়। কক্সবাজারের মহেশখালী, টেকনাফ, নিঝুম দ্বীপ, কুয়াকাটায় কালো সোনা পাওয়া যায় যা আমাদের অর্থনীতিতে  প্রভাব বিস্তার করছে।

বঙ্গোপসাগরে রয়েছে গ্যাসক্ষেত্রের আঁধার। বঙ্গোপসাগরের ২৩টি ব্লকে ২০০ট্রিলিয়ন কিউবিক ঘনফুট গ্যাসের আধার রয়েছে যা থেকে কোটি কোটি টাকা অর্জন সম্ভব।

বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে রয়েছে সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্প। এই শিল্পকে কেন্দ্র করে নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে এবং বিপুল কর্মসংস্থান হবে। বঙ্গোপসাগরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য লক্ষ লক্ষ পর্যটক ছুটে আসবে।

বঙ্গোপসাগরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানের জাহাজ তৈরি করে বিদেশে তা রপ্তানি করছে এবং বর্তমানে বাংলাদেশ জাহাজ রপ্তানিতে ৩য় অবস্থানে রয়েছে। এছাড়াও জাহাজ ভাঙা শিল্প বিশ্বে জনপ্রিয়তা লাভ করছে।

সাগর থেকে আহরিত সম্পদের মাধ্যমে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবসা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। কক্সবাজার ও কুয়াকাটার মার্কেটগুলোতে স্থানীয় পণ্যের চাহিদা বেশী পর্যটকদের কাছে। পণ্যের গুণগত মান আরও উন্নত করলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চাহিদা আরও বেড়ে যাবে।

ব্লুইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতি কেবল সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনীতির প্রসার ঘটায় তা নয়, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি হ্রাসকরণের মধ্য দিয়ে পরিবেশবান্ধব নবদিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। এছাড়াও দারিদ্র্য বিমোচন, পুঁজির প্রবাহ বৃদ্ধি, বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ সহায়ক অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বেকারত্ব হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আঞ্চলিক ও লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ তথা টেকসই উন্নয়নে সাগরের ভূমিকা অপরিসীম। মানুষের খাবার ও জীবনযাত্রা এবং বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৮০শতাংশ সমুদ্র পরিবহনের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়।

বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরের সম্পদকে যথাযথ কাজে লাগিয়ে সুনীল অর্থনীতির বাস্তবায়ন সম্ভব। বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের ‘রত্নাগার’ হিসেবে ধরা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রাণকেন্দ্র বঙ্গোপসাগর তাই বিভিন্ন দেশে যোগাযোগ সহজ হওয়ায় বাণিজ্যিক গুরুত্ব অনেক বেশী। সুনীল অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে কক্সবাজার জেলায় ‌‘ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা করেছে। আবার বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা -২১০০ এর মহাপরিকল্পনায় সমুদ্র অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ২০১৪সালে ব্লুইকোনমি সেল গঠন করা হয়েছে। তাই বঙ্গোপসাগরের তলদেশের সম্পদের যথাযথযোগ্য ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরে দাঁড়াবে এবং ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল সম্ভাবনাময়।


তামান্না ইসলাম
১ম বর্ষ,আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

নারীবাদ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
                                  

‘নারীরাও মানুষ’ নয় বরং ‘নারী-পুরুষ উভয়ে মানুষ’ এই ধারণার প্রসার ঘটাতেই উনবিংশ শতাব্দীতে নারীবাদের উৎপত্তি হয়। তখন সমাজে নারীরা মৌলিক মানবাধিকার থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন ছিল। মূলত নিজেদের অধিকারের অপূর্ণতা পূরণেই তৈরি হয় নারীর অধিকার আন্দোলন। নারীবাদ বা ফেমিনিজমের সূত্রপাত পশ্চিমা দেশগুলোতে, যে স্রোত অভিজাত থেকে আমজনতা সকলের মধ্যে প্রবাহিত হয়েছিল। প্রথমদিকে নারী অধিকার সম্পর্কে আন্দোলনকারীদের আন্দোলনের বিষয় ছিল ভোটাধিকার কেন্দ্রিক।

নারীবাদের উৎপত্তিস্থল যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে নারীরা কোন প্রকার সম্পত্তির অধিকার, উইল বা আইনি কাগজপত্রে স্বাক্ষরের উপযুক্ত ছিল না। কেননা, তাদের নিজস্ব সম্পত্তি বলতে কোন কিছু ছিল না। এছাড়া ছিলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া, নির্বাচনে ভোটদান, বিচারক বা জুরি বোর্ডের সদস্য হওয়ার অধিকার। সেকালে সন্তানের আইনি কাস্টাডি, বিবাহ বিচ্ছেদ চাওয়ার অধিকার ছিল না। এমনকি ছিল না স্বামীর সাথে যৌন সম্পর্কে অসম্মতি জানানোর অধিকার। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তারা ছিল বাবা, ভাই অথবা স্বামীর সম্পত্তি।

নারী আন্দোলনের প্রথম জোয়ারের আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত হয় ১৮৪৮ সালে, ‘সেনেকা কনভেনশন ফলস’ এ। ৩০০ জন নারী-পুরুষ এ সম্মেলনে নারী অধিকারের পক্ষাবস্থানের সিদ্ধান্ত হয়। প্রথম পর্যায়ের দাবিগুলো ছিল, ভোটাধিকার, রাজনৈতিক সমতা এবং আইনি অধিকার। এছাড়া কিছু কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে সন্তান ধারণে নারীর সম্মতি সম্পর্কে জনমত গঠন করা হয়। এ আন্দোলনের প্রথম ধাপের পরিসমাপ্তি ঘটে সংবিধানের উনবিংশ সংশোধনীর মাধ্যমে, যেখানে সাংবিধানিক ভাবে ১৮ বছর বয়স্কা নারীরা ভোটাধিকার প্রাপ্ত হয়।

১৯৬০ সালে নারীবাদী আন্দোলনের ২য় ধাপে নারীরা সমাধিকারের বিষয়টি সামনে আনে। এ স্রোতের দাবিগুলো ছিল, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে সমানাধিকার, সাংস্কৃতিক বৈষম্য লোপ, ক্ষমতার লৈঙ্গিক প্রয়োগ রোধ ইত্যাদি। কিন্তু এ দাবিগুলো বাস্তবায়নের ফলে নারীরাই সমস্যায় পড়ে। ঘর-বাহির দুই দিক সামলানো তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে। ফলে অনেক নারী এ স্রোতের বিরুদ্ধাচরণ না করলেও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিরপেক্ষ অবস্থান নেয়।

২য় ধাপের ভুলগুলোকে শোধরাতেই ৩য় ধাপের সূচনা হয়। শিক্ষা, কর্মক্ষেত্রে পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা নারীদের সীমাবদ্ধতা দূর করাই ছিল এ ধাপের মূল উদ্দেশ্য। যেমন, নারীর পাশাপাশি পুরুষও সাংসারিক কাজে অংশগ্রহণ করবে।

আমাদের উপমহাদেশেও বেগম রোকেয়া নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ ছিলেন। বিংশ শতাব্দীর নারী আন্দোলনের কাণ্ডারী বেগম রোকেয়া নারী শিক্ষা, অধিকার সচেতনতা নিয়ে কথা বলে গেছেন। সামাজিক ভারসাম্যের সমতায় নারীর অবদান দেখিয়েছেন। দেশের উন্নয়নে নারীও যে কত বড় মানবসম্পদ তার প্রেক্ষাপট সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে নানা গঞ্জনার শিকল ভেঙে নারী শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। বলা যায়, উপমহাদেশে বেগম রোকেয়া থেকেই নারী আন্দোলনের পদযাত্রা।

কিন্তু তৎকালীন নারীবাদ এবং বর্তমানের কথিত নারী আন্দোলনে যেন আকাশ পাতাল পার্থক্য বিরাজ করছে। বর্তমানে নারীদের মৌলিক অধিকারের পাশাপাশি ভোটাধিকার, উচ্চশিক্ষার অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, বিবাহ বিচ্ছেদ চাওয়ার অধিকার, কর্মক্ষেত্রে প্রাধান্যসহ সকল অধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে। তবে কি এখন নারীবাদী আন্দোলনের প্রয়োজন নেই? উত্তরটা হল, অবশ্যই আছে। কেননা, নারীরা এখনও সামাজিকভাবে নিগৃহীত হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে ধর্ষণের সংখ্যা পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। পারিবারিকভাবে নারীদের নির্যাতিত হওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে। বছরে সারাদেশে হাজার হাজার নারী নির্যাতনের মামলা হয়। এছাড়া আরও একটু গভীরে গেলে দেখা যাবে নারীরা পারিবারিক মতামতের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পায় না। ব্যক্তিগত জীবনে এখনো অনেক মেয়েদের মতামতের গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

কিন্তু, দেশে কথিত নারীবাদীদের দিকে তাকালে যেন ভিন্ন কিছুই চোখে পড়ে। নারীবাদী বা ফেমিনিস্ট বলে পরিচিতরা সর্বপ্রথম যে বিষয়টির সমালোচনা করে তা হল নারীর পর্দা। ফেমিনিস্টরা নারীর পর্দা করা দেখলে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে। বোরকা, হিজাব, ঘোমটা ইত্যাদি পোশাক তাদের প্রধান সমস্যা। নারী আন্দোলনের মূলমন্ত্র ছিলো, একজন নারী তার ইচ্ছে স্বাধীন কাজ করতে পারবে। একজন নারীবাদী যদি তার পছন্দমত আদর্শের ভিত্তিতে খাপছাড়া বাঙালি সংস্কৃতি বহির্ভূত পোশাক পরতে পারে, তবে একজন নিরপেক্ষ মেয়ে স্বেচ্ছায় বোরকা হিজাব পরতে পারবে না কেন? নারীবাদীদের জন্য ‘‘It’s her choice’’ প্রযোজ্য হলে অন্যদের জন্য তা হবে না কেন? পাশাপাশি অপসংস্কৃতির প্রসারে বর্তমান ফেমিনিস্টদের জুড়ি মেলা ভার। নবীন ফেমিনিস্টরা স্বাধীনতা বলতে বোঝে ফ্রি মিক্সিং, ওয়েস্টার্ন পোশাক, সন্ধ্যার পর বা রাত বিরাতে বাইরে থাকা, ধূমপান করা ইত্যাদি। তারা কিছু কিছু ক্ষেত্রে যৌন বিদ্বেষী আবার কিছু ক্ষেত্রে অতিপ্রত্যাশী। ‘‘ছেলেরা পারলে মেয়েরা কেন পারবে না’’ এমন ধারণা পোষণ করে যাচ্ছেতাই করার নাম স্বাধীনতা নয়। সামাজিক শৃঙ্খলাকে টেক্কা দিয়ে তথাকথিত স্বাধীনতায় মত্ত হলে ছেলে মেয়ে উভয়ই সমাজের চোখে দোষী বলে গণ্য হবে। কোন নারীই নারীবাদের বিরোধী নয়। তবে সেটা হওয়া চাই যুক্তিসঙ্গত এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ। বর্তমান ফেমিনিস্টরা উগ্রতার মধ্যে দিয়ে নারীবাদকে যে পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে তাকে আদৌ নারীবাদ বলে কি না সন্দেহ!

ধর্মহীনতা কিংবা ধর্মকে কুলষিত করা আদৌও নারীবাদের পর্যায়ে ছিলো না। উপমহাদেশের নারীবাদীর অগ্রদূত বেগম রোকেয়াও প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি কুরআন শিক্ষার কথা বলেছিলেন। পাশাপাশি এটাও বলেছিলেন যে, কুরআন শিক্ষার কথা বলায় অনেকে তাকে গোঁড়া বলবে কিন্তু কুরআন শিক্ষাও প্রাথমিক শিক্ষারই অংশ। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ নয়, এই কথার শিক্ষা হল, যেখানেই ভালোটা আছে তা গ্রহণ করা।

আমরা ফেমিনিস্টরা স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে নিজেরাই নাস্তিকতার কাছে পরাধীন হচ্ছি না তো? স্বাধীনতা মানে অন্যের স্বাধীনতা হরণ নয় । ‘নারীবাদ’ একটি আন্দোলনের নাম, যার ছায়াতলে অসংখ্য নারী অধিকারের, স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে। সমাজসম্বন্ধীয় প্রত্যেকটি মতবাদ সমাজ সংস্কারের জন্য। তবে সমাজের সংস্কার করতে গিয়ে সামাজিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধাচরণ করা কখনোই কাম্য নয়। প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক নারী একটি সুস্থ, সামাজিক নারী আন্দোলনের প্রত্যাশী।


লেখক- মিথিলা আফসানা সিনথিয়া।
শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।‘

সামাজিক অবক্ষয়ের ব্যাপকতায় কলুষিত সমাজ ব্যবস্থা
                                  

মানুষকে বলা হয় আশরাফুল মাকলুকাত অর্থাৎ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। আসলেই কি মানুষ সমাজে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীবের মত ভুমিকা পালন করছে?

বর্তমান প্রেক্ষাপট দেখে তো তা মনে হচ্ছে না। আজ আমাদের খারাপ কর্মকাণ্ডের প্রভাবে কলুষিত হচ্ছে সমাজ ব্যবস্থা। দিনে দিনে সুস্থ সমাজটা অসুস্থ সমাজে পরিণত হচ্ছে। চারদিকে শুধু খুন-খারাবি, চুরি-ডাকাতি, দুর্নীতি, মাদকের অবাধ ব্যবহার, পর্নোগ্রাফির প্রভাব আর ধর্ষণ।

একশ্রেণির তরুণ সমাজ মাদকের নেশায় ডুবে ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। পর্নোগ্রাফির প্রভাবে ধর্ষণের সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিশু থেকে বৃদ্ধা এসবের শিকার হচ্ছে। এছাড়াও প্রেমের নামে নোংরামি করে তার ভিডিও নেটে ছাড়ছে। এসব না হয় বাদই দিলাম।

বর্তমান প্রেক্ষাপটের কথাই তুলে ধরি, কভিড ১৯ এর প্রভাবে কিভাবে সামাজিক অবক্ষয় দ্রুত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজ হাজারো মানুষ কর্মহীন হয়ে হতাশায় মাদকের নেশায় ডুবে সব ধরনের অপরাধ করে যাচ্ছে। এছাড়াও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও মাস্ক, স্যানিটাইজারের দাম বাড়িয়ে ফায়দা লুটছে অসাধু ব্যাবসায়ীরা। রিজেন্ট ও জেকেজি হাসপাতালের করোনা টেস্ট প্রতারণার ঘটনা তো সবারই জানা।

করোনা ভাইরাসের অযুহাতে আত্মীয়তার সম্পর্ক বিসর্জন দিচ্ছে কিছু মানুষ। এর উদাহরণ বৃদ্ধ মাকে রাতের অন্ধকারে জঙ্গলে ফেলে যাচ্ছে তারই সন্তানেরা, স্ত্রী স্বামীকে এবং স্বামী স্ত্রীকে রেখে পালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও করোনা আক্রান্ত পরিবারকে সহযোগিতার পরিবর্তে একঘরে করে দিচ্ছে সমাজের মানুষজনরা। এরকম ঘটনা চোখের সামনে অহরহ ঘটছে।

আগেকার দিনে তো এসব ছিল না কারণ তখন ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহার ছিল না, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় ছিল এবং মানুষ ধর্মীয় অনুশাসনে ছিল। কিন্তু এখন তা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহারের ফলে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি।

আমরা হয়ত ভাবি, আদৌ কি সচেতন হয়ে সমাজ থেকে সামাজিক অবক্ষয় নির্মুল করা সম্ভব?
 
অবশ্যই সম্ভব তবে হয়তো পুরোপুরি নির্মুল সম্ভব নয়। তবে অনেকাংশে নির্মুল সম্ভব। এতেই আমরা সুস্থ সমাজ ফিরে পাব।

সামাজিক অস্থিরতা ও অবক্ষয় থেকে মুক্তি পেতে পারিবারিক বন্ধন জোরদারের বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে প্রতিটি পরিবারের অভিভাবককে সন্তানের বিষয়ে আরো অনেক বেশি সচেতন হতে হবে।

হালিমা সাদিয়া নোহা
তথ্য বিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আসুন মাদকমুক্ত সমাজ গড়ি
                                  

মোমেনা আক্তার

মাদকাসক্তি বাংলাদেশে এখন অন্যতম সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলা হয়ে থাকে, এটি জাতির পঙ্গুত্বের খুব বড় একটা কারণ। সাধারণত ১৫ থেকে ৩৫ বছরের বয়সের উপস্থিতি ৭০ ভাগ। আর মাদক গ্রহণের গড় বয়স ২২। এক পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকার মতো মাদকের পেছনে ব্যয় হয়। এই টাকার বেশিরভাগ অংশ চলে যায় ভারতে। কারণ ফেনসিডিল কিংবা ইয়াবা এ দেশে উৎপাদিত হয় না। ফেনসিডিল ভারত থেকে এবং ইয়াবা মিয়ানমার থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে আসে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী দেশ ভারত ও মিায়ানমার হওয়ায় মাদক ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট চক্র বড় জায়গা করে নিয়েছে। সরকারের মাদকবিরোধী লড়াই সত্ত্বেও থেমে নেই মাদক ব্যবসা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া অবস্থানে পাচারকারীরা পাচারের কৌশল পাল্টে চালাচ্ছে মাদক ব্যবসা। আফসোসের বিষয যে, নেশার কবলে লাখ লাখ তরুণ তাদের সম্ভবনাময় ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিয়ে ধ্বংসের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। তারা কর্মশক্তি, মেধা ও সৃজনশীলতাকে হারিয়ে ফেলে ভয়ঙ্কর ফাঁদে পা ফেলছে। পুরুষদের মাঝে মাদক গ্রহণের প্রবণতা বেশি দেখা গেলেও এখন নারীরাও পিছিয়ে নেই।

মাদক কেনার টাকা না পেয়ে মাদকাসক্ত ছেলের হাতে খুন হচ্ছেন বাবা-মা। ভাইয়ের হাতে খুন হচ্ছেন ভাই বা বোন। টাকা না পেয়ে মায়ের অলংকার চুরি করে তা বিক্রি করে দিচ্ছে মাদকাসক্ত ছেলে। কেউ কেউ চাঁদাবাজি বা ছিনতাই করছে। আবার কেউ করছে শিশু অপহরণ। মুক্তিপণের টাকা দিয়ে মাদক কিনবে। এভাবে মাদকের কারণে তরুণেরা বিপথগামী হচ্ছে। মাদক ব্যবসা ও সেবনকে কেন্দ্র করে ডাকাতি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির ঘটনাও ঘটছে। প্রতিদিনের পত্রিকা খুললেই এসব চোখে পড়ে।

বাংলাদেশে প্রকাশ্যে ধূমপান চলে, বড় বড় রেস্টুরেন্টে পার্টিতে প্রকাশ্যে মাদক সেবন ছাড়াও অন্যান্য অনৈতিক কাজ চলে, সেগুলোর বিরুদ্ধে তেমন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালাবেন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিবেন বলে জানিয়েছেন। সেইসাথে রয়েছে পুলিশের তৎপরতা। এত কিছুর পরও মাদকের আগ্রাসন কমছে না। মাদকদ্রব্যের বেচাকেনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে অনেক অঘটন এড়ানো যেত।

মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেই রাষ্ট্রের। তবে শুধু রাষ্ট্রকে দোষারোপ করলে চলবে না। এর পেছনে পরিবার ও সমাজ অনেকখানি দায়ী। বাবা-মা সন্তানদের প্রতি প্রকৃত অর্থে দায়িত্বশীল হলে তারা মাদকে আসক্ত হতে পারে না। সন্তানদের প্রতি বাবা-মায়ের উদাসীনতা তাদের মাদকের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

এছাড়া সামাজিক বৈষম্যের কারণে অনেক তরুণ, যুবক হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং মাদক থেকে এর মুক্তি খোঁজে। গডফাদাররা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গা ঢাকা দেওয়ার ফুরসত পায়। তাই আইনি সমস্যায় পড়তে হয় কর্তৃপক্ষকে, তাদের পেছনে লাগলেও প্রমাণ পাওয়া যায় না। গডফাদারদের কথা সরকার জানে। তাদের হয় শাস্তি দিতে হবে অথবা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

কাজেই রাষ্ট্রের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকেও সচেতন হতে হবে। সন্তানের গতিবিধি এবং বন্ধুবান্ধবের খোঁজ খবর রাখতে হবে। সন্তান যে জায়গাগুলোতে সব সময় যাওয়া আসা করে সেই জায়গাতে খোঁজ খবর নিতে হবে। তার সাথে আচরণ করতে হবে বন্ধুর মতো যেন বাহিরে কোনো সমস্যা হলে সে নিজের থেকেই পরিবারের সাথে শেয়ার করে। সন্তানদের সামাজিক, মানসিক, লেখাপড়া সংক্রান্ত অর্থনৈতিক চাহিদাগুলো যথাসম্ভব মেটাতে হবে, তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত দিয়ে তাদের প্রত্যাশা বাড়তে দেয়া যাবে না। মাদকমুক্ত সমাজ জাতিকে এক সুন্দর ভবিষ্যৎ দিবে। তাই আসুন সবখানে সব অবস্থায় মাদককে না বলি। মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে সমাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করি।

লেখক : শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

স্বাধীন বাংলা/এআর

শোক সন্তপ্ত ১৫ই আগস্টঃ একটি কালো অধ্যায়
                                  

যে আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে লক্ষ লক্ষ বাঙালি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সে আদর্শের নাম জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। তিনি ছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। নানা চড়াই উতরাই পার করে তিনি গড়ে তুলেছিলেন সোনার বাংলা। তিনিই বাঙ্গালিকে একটি অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখান। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এই স্বপ্নদ্রষ্টাকে সপরিবারে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলে বাঙালি জাতি। এই দিনটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে অত্যšত ঘৃণিত ও জঘন্য একটি দিন। তাঁর  মৃত্যুতে শুধু বাঙালি জাতি নই সারা বিশ্ব হারিয়েছে একজন অবিসংবাদিত মহান নেতাকে। তাঁর দূরদর্শী নেতৃতের দ্বারা এই পরাধীন জাতি পেয়েছে স্বাধীনতার স্বাদ।

দেশটাকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তাঁকে বিভিন্ন অত্যাচার, জুলুমের সম্মুখিন হতে হয়েছে। এমনকি যৌবনের সিংহভাগ সময়ই তিনি জেলে কাটিয়েছেন। তবুও তিনি লক্ষ্যচ্যুত হননি, সর্বদা লাঞ্ছিত-বঞ্চিত পরাধীন বাঙ্গালির অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। বঙ্গবন্ধু শোষিত  মানুষের অধিকার আদায়ে  ছিলেন পর্বতের মত অটল। তাঁর স¤পর্কে কিউবার প্রখ্যাত নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন, আমি হিমালয় দেখিনি আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব, সাহসিকতায় ও নির্ভীকতায় বঙ্গবন্ধু ছিলেন হিমালয়ের মত উচ্চতায়। যে বাঙালি জাতিকে তিনি একটি পরিবারের মত দেখতেন সেই বাঙালি জাতির মধ্যকার কয়েকটি স্বার্থপর ঘাতক তাঁকেই সপরিবারে হত্যা করে।

প্রতিনিয়ত ভোরের আবির রাঙা সূর্য উদয়ের মাধ্যমে একটি নতুন দিনের সূচনা হয়। কিন্তু সেই ভোরের সূর্য উদয় হয়েছিল রক্তে রাঙা হয়ে। বাংলার আকাশে বাতাশে ছিল বিষাদের ছায়া। পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট সুবহে সাদিকের সময় মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত একদল ঘাতক চক্র এই বর্বরোচিত হত্যাকা›ড চালায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানম›িডর ৩২ নং বাড়িতে। বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় সেদিন। আরও হত্যা করা হয় তাঁর প্রিয়তমা সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ও প্রাণপ্রিয় সšতান শেখ জামাল, শেখ কামাল, শেখ রাসেল সহ ঘনিষ্টজনদের। এমনকি শিশু শেখ রাসেলের নি®পাপ মুখের শেষ বাঁচার আকুতিটুকু ও হত্যাকারীদের মনে মায়া জাগাতে পারেনি। বিদেশে থাকায় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহেনা এই পৈশাচিক হত্যাকা›ড থেকে প্রাণে বেঁচে যান। এই হত্যাকা›েডর পর সমগ্র বাংলাদেশ থমকে গিয়েছিলো। বাঙালি জাতির মাঝে শোকের কালো অন্ধকার নেমে আসে।

প্রকৃতপক্ষে শুধু বঙ্গবন্ধুকে নয়, তারা হত্যা করতে চেয়েছিল একটি স্বাধীন জাতিকে। তাদের পরিকল্পনা ছিল সুদূরপ্রসারী। কুক্ষিগত করতে চেয়েছিল এই স্বাধীন দেশের ক্ষমতা। ভেঙ্গে দিতে চেয়েছিল গণতান্ত্রিক মনোভাবকে। কিন্তু তাদের এই স্বাধীনতাকে হত্যার অপচেষ্টা ও পরিকল্পনা সফল হয়নি। বঙ্গবন্ধুকে  দৈহিকভাবে হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু তিনি চিরঞ্জীব, বেঁচে আছেন আমাদের সবার মাঝে। এখন বঙ্গবন্ধুর এই আদর্শকে সামনে নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্ব প্রদান করছেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা তাঁর দৃঢ়  নেতৃত্ব এর মাধ্যমে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে একটি উদীয়মান শক্তি হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছেন। দেশরতœ  জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বাবার স্বপ্ন পূরণে সর্বদা সচেষ্ট। তাই বঙ্গবন্ধুর অনুসারী হয়ে আমাদের সকলের উচিৎ রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে পিছনে ফেলে একটা সুন্দর, অহিংস রাষ্ট্র গড়ার প্রচেষ্টা করা। তবেই আমাদের স্বপ্নদ্রষ্টার স্বপ্ন পূরণে আমরা সফল হতে পারব।


-তামান্না ই জান্নাত লিমা
বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

হৃদয়ের নিভৃত কন্দরে বঙ্গবন্ধু অমলিন
                                  

নূরে আলম সিদ্দিকী:
আগস্ট মাসটি বাঙালি জাতির তথা বাংলাদেশের জন্য শোকের মাস। কিন্তু আমার জন্য এটি হৃদয়ে রক্তক্ষরণের মাস; অনুভূতি, উপলদ্ধি ও মননশীলতার পরতে পরতে অসহ্য ও তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা বহন করার মাস। আজকে ৪৫ বছর হল, মুজিব ভাই আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু আমার অনুভূতিতে, বিশ্বাসে এটা আজও পুরোপুরি সত্যরূপে প্রতিভাত হয় না। আমার মননশীলতা, অনুভূতি, হৃদয়ের অনুরণন, কোনো জায়গায় বঙ্গবন্ধু নেই বা তিনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন- এটা মানতে পারে না। আমার স্বপ্নের মধ্যে তো বটেই, জাগরণেও তাঁর উপস্থিতি স্পষ্টভাবে উপলদ্ধি করি। এ অনুভূতি কাউকে বোঝানো যাবে না, বোঝানো যায় না। আমার হৃদয়ের নিভৃত কন্দরে তিনি অমলিন। তাঁর সাথে সমস্ত স্মৃতি আমার হৃদয়ে নিত্য জাগ্রত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এ বছরটিকে মুজিববর্ষ ঘোষণা করা হয়েছে। শোকাবহ আগস্টে আমার প্রাণের মুজিব ভাই’র প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। ১৫ আগস্টের সেই নৃশংস ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে নিহত বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সকল সদস্যের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

বাঙালি জাতীয় চেতনার উন্মেষ, তার বিকাশ, ব্যাপ্তি ও সফলতায় যাদের অথবা যাদের পূর্বসূরিদের অবদান আছে, পরাধীনতার বক্ষ বিদীর্ণ করে স্বাধীনতার প্রদীপ্ত সূর্যকে ছিনিয়ে আনতে এই রক্তাক্ত বাংলার যেসব দামাল ছেলেরা অভিষিক্ত, যারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে; ৪৭ থেকে ৭১- এই দীর্ঘ পথপরিক্রমণে একেকটি আন্দোলনের সোপান উত্তরণের মাঝে একেকগুচ্ছ তরুণ তাজা তপ্ত প্রাণ অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন। কিন্তু এই সবকিছুরই পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষ প্রতীক ছিলেন জাতির জনক, আমার প্রাণের মুজিব ভাই।

নতুন প্রজন্মকে জানিয়ে রাখি, দীর্ঘ কারারুদ্ধ জীবনের মধ্যে ১৭টি মাস প্রত্যহ এত দীর্ঘ সময় ধরে আমি যে তাঁর নিবিড় সান্নিধ্য পেয়েছি, বাস্তবে কারাগারের বাইরে অথবা ভিতরে অনুজ তার অগ্রজের, সন্তান তার পিতার এত নিবিড় সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য হয় না। যেটি আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার হয়েছে। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী উদ্ধত-উদ্গত-পূর্ণায়ত পদ্মটির মতো উদ্ভাসিত যৌবনের অধিকারী। আজকের যুবকেরা সেটি অনুধাবন করতে অক্ষম, এটি আমি শতভাগ নিশ্চিত। তখন আমাদের পুরো জীবনটা, চেতনার সমস্ত অংশটুকু রাজনীতির সমুদ্রের অতলান্তে নিমজ্জিত। এমনকি ব্যক্তিগত জীবনের প্রেম-ভালোবাসা, চাওয়া-পাওয়া সবকিছুই ছিল রাজনৈতিক চেতনার গভীরে নিমগ্ন ।

বাংলার স্বাধীনতা ছাড়া আমাদের কল্পনার আবর্তে আর কোনকিছুই তখন দোলা দিত না। এই যে স্বায়ত্বশাসন থেকে স্বাধিকার, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তরণ- এর অগ্রভাগে ছিলেন মুজিব ভাই। তিনি ছিলেন আন্দোলনের স্থপতি। তাঁর কালজয়ী নেতৃত্বকে ঘিরেই আবর্তিত হয় প্রতিটি আন্দোলনের স্রোতধারা। এই সে্রাতধারার স্রষ্টা ছিল ছাত্রলীগ। বঙ্গবন্ধুকে বহুজনের মধ্য থেকে একক নেতৃত্বে প্রতিস্থাপিত করার পূর্ণ কৃতিত্ব ছাত্রলীগের। রাজনৈতিক চেতনা হিসেবে আমাদের চিন্তায়, মননশীলতায় সুরের মূর্ছনা তুলতে- “এ মাটি আমার সোনা, আমি করি তার জন্মবৃত্তান্ত ঘোষণা”, ‘‘সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি যে আছে মাটির কাছাকাছি”, “বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর”।

লাহোরে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে যখন আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে আইয়ুবকে উৎখাত করার জন্য পাকিস্তানের সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সর্বদলীয় কর্মসূচি গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, সেই সম্মেলনের প্রারম্ভে বঙ্গবন্ধু তখনকার পূর্ব-পাকিস্তান আজকের বাংলাদেশের তরফ থেকে ৬ দফা কর্মসূচিকে আন্দোলনের প্রধান কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করার দাবী তোলেন। মুজিব ভাই তখন এতটাই প্রদীপ্ত ও অকুতোভয় মানসিকতায় উজ্জীবিত ছিলেন যে, ৬ দফা স্বাধীনতার উপক্রমণিকা- এটি তাঁর প্রতীতি ও প্রত্যয়ে পরিণত হয়।

৬ দফা প্রদানের প্রাক্কালে তখনকার শেখ মুজিবুর রহমান এমনকি পূর্ব পাকিস্তানেও অনেক নেতার মধ্যে অন্যতম ছিলেন। কিন্তু ৬ দফার দাবি উপস্থাপনের পর ছাত্রলীগের নিরলস ও নিরবিচ্ছিন্ন আন্দোলনের বিস্তীর্ণ পথপরিক্রমণের মধ্য দিয়ে ছাত্রলীগ তাঁকে বাংলার মানুষের হৃদয়ের সিংহাসনে মুকুটহীন সম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা, স্থপতি, মূর্তপ্রতীক। আর একে বাস্তবায়িত করার সুদক্ষ রাজনৈতিক সৈনিক ও প্রতিস্থাপনের মূল কারিগর সন্দেহাতীতভাবে ছাত্রলীগ ও তাঁর নেতৃত্ব।

খুব সম্ভবত ১৯৫৭ সালে, ঝিনাইদহে সাংগঠনিক সফরে গেলে তাঁর মধ্যাহ্নভোজনের ব্যবস্থা ছিল আমাদের বাসায়। তাঁর খাওয়ার থালায় স্থান সংকুলান হবে না বলে একটি খাঞ্চায় করে একটি ১০/১২ কেজি ওজনের রুইমাছের সম্পূর্ণ মাথা তাঁকে পরিবেশন করা হয়েছিল। তিনি সেখান থেকে ভেঙে ভেঙে তাঁর সতীর্থদের দিয়েছিলেন। মাছের মাথাটি তিনি অত্যন্ত পরিতৃপ্তির সাথে খেয়েছিলেন, এটি আমি বুঝতে পেরেছি। তিনি যখন আমাকে কাছে ডাকলেন, তখন আদৌ বোধগম্য হয়নি যে, ওই মাছের মাথা থেকে তিনি আমাকেও খাওয়াবেন। আমি বিমুগ্ধ হলাম, বিমোহিত হলাম, বিস্মিত হলাম। সেদিন থেকেই এই মহান ব্যক্তিত্বটির প্রতি আমার বিমুগ্ধ, বিমোহিত ও বিস্মিত চিত্তের অনবদ্য আকর্ষণ তৈরি হয়।

তারপর ৬১ সালে আমি ঢাকায় চলে আসি। পারিবারিক সূত্রে আওয়ামীলীগের সাথে আমার যে আশৈশব বন্ধন, সেটি ঢাকায় আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন জানত। আমার সঙ্গীসাথীরা, সহপাঠি অথবা ব্যক্তিগত পর্যায়ের বন্ধুরা সবাই সুস্পষ্টভাবে জানত, আমি আওয়ামীলীগ ঘরানার লোক। আমি ঢাকা কলেজে ভর্তি হলে ওখানকার ছাত্রলীগ সংগঠিত করার দায়িত্ব দেন স্বয়ং মোয়াজ্জেম ভাই। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভালো, মোয়াজ্জেম ভাই কোনো হলে আবাসিকভাবে থাকতেন না। যেখানে থাকতেন, সেই বাড়িটির নাম ছিল ‘নিম ভিলা’।ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগের তদানীন্তন নেতৃবৃন্দ নাসির ভাই, আনিস ভাই, কেন্দ্রীয় নেতা শহীদুল হক মুন্সী, আজমত আলী শিকদার ভাই আন্তরিকতা ও সহযোগিতায় আমাকে নিম ভিলায় নিয়ে যেতেন।

এরপর থেকে ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের সাথে আওয়ামীলীগ কার্যালয়ে (পুরানা পল্টন) মাঝে মাঝেই যেতাম এবং মুজিব ভাই’র সাথে সাক্ষাৎ হতো। জনান্তিকে জানিয়ে রাখা ভালো, যখন মুজিব ভাই আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতি হলেন মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ, তাঁদের দুজনের মধ্যে গভীর আন্তরিকতার কারণে এবং মুজিব ভাই’র অনন্যসাধারণ সাংগঠনিক শক্তির বদৌলতে আওয়ামীলীগ এককভাবে বঙ্গবন্ধুর হাতে থাকার কারণে ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ সাংগঠনিকভাবে মুজিব ভাইয়ের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখতেন ও তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করতেন।
আমি অনেকবার কারাগারে যাওয়া-আসার কারণে আমাকে অনেকেই বি ক্লাস বলতেন। মামলায় বারবার জেলখানায় যাওয়া-আসা করলে, সে শাস্তি নিয়েই হোক অথবা বিভিন্ন মামলার জামিনযোগ্য আসামী হিসেবেই হোক, জেলখানার পরিভাষায় তাকে বি ক্লাস আসামী বলা হতো। বি ক্লাস হওয়া সত্ত্বেও আমি আগে কখনো নিরাপত্তা বন্দী বা রাজবন্দী ছিলাম না। ৬৬ সালের ৯ জুন আমি ডিপিআরে রাজবন্দী হিসেবে কারাগারে ঢুকি এবং আমাকে কারাগারের পুরনো ২০ সেলে স্থান দেওয়া হয়। এর সন্নিকটেই ছিল দেওয়ানী, যেখানে কারাগারে মুজিব ভাইয়ের অবস্থান ছিল। দেওয়ানীর পাশেই ছোট্ট একটি রান্নাঘর, যেটি একান্তভাবেই মুজিব ভাই’র জন্য ব্যবহৃত হতো।

সেবার যখন আমাকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন তিনি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বললেন, ‘বারবার ঘু-ঘু তুমি খেয়ে যাও ধান, এইবার ঘু-ঘু তব বধিবে পরাণ’। তিনি দ্রুত এসে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন এবং নিচু স্বরে বললেন, প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হবে, পরে সয়ে যাবে। তাঁর সেই সান্ত¦নার বাণীতে আমার কোন প্রতিক্রিয়া হয়নি। কারণ বি ক্লাস থেকে নিরাপত্তা বন্দী হয়ে জাতে উঠেছি। আর মুজিব ভাই-ই নন, নিরাপত্তা বন্দীরাই কুলীন ছিলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁকে কারাগার থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার আগ-পর্যন্ত ১৭টি মাস তাঁর নিবিড় সাহচর্য ও সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।
তারপর ১৯৬৯ এর শেষার্ধে ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হই এবং তাঁরই নির্দেশে একাত্তরে ছাত্রলীগের একক নেতৃত্বে আমরা স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করি, যার প্রতিটি সভায় সভাপতিত্ব করার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। এ সমস্ত দায়িত্ব পালনের সুবাদে স্বাভাবিকভাবেই মুজিব ভাই’র সাথে আমার অসংখ্য স্মৃতি রয়েছে। তাঁর অপার স্নেহে আমি সিক্ত হয়েছি। এছাড়া পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য তিনি আমাকে চাপ সৃষ্টি করেন এবং আমি আমার এলাকা ঝিনাইদহ ২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হই।

মুজিব ভাই’র সাথে আমার অজস্রস্মৃতি থেকে সংক্ষিপ্ত পরিসরে দুয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করছি। যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিষয়টি আইয়ুব খান চূড়ান্ত করে ফেললেন এবং মুজিব ভাইকে (তখনও তিনি বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত হননি) আসামি করে তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলানোরও তাদের দুরভিসন্ধি তখন পাকাপোক্ত হয়ে উঠল। তখন মুজিব ভাইকে সম্পূর্ণ বিছিন্ন করার তাদের সিদ্ধান্তটি সুস্পষ্টভাবে জানাজানি হয়ে গেল। তখনকার এক বিকেলে আমরা জেলখানার অভ্যন্তরে দেওয়ানী এবং ২০ সেল মিলে যে চত্ত্বর ছিল তা হাঁটার জন্য তো বটেই এমনিতেও বিস্তীর্ণ। মুজিব ভাই ও আমি পাশাপাশি হাঁটছিলাম। হঠাৎ মুজিব ভাই আমার হাত ধরে দাঁড় করিয়ে দিলেন। আমি বিস্ময়াভিভূত নয়নে তাঁর মুখের দিকে তাকালাম। তখন তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, আলম, কালকে তোর ভাবী দেখা করতে আসলেআমি তাকে আর খাওয়া আনতে নিষেধ করে দেব। আমার খানেওয়ালাই যদি আমার কাছে না থাকে(জেলখানায় আমি এত খেতাম যে আমার সহযোদ্ধা রাজবন্দীরা আমাকে খাদক বলে অভিহিত করত) তাহলে বাহির থেকে এত খাওয়া এনে লাভ কী? শুধু শুধু রেনুর উপরে বাড়তি ঝামেলা চাপানোর তো কোন মানে হয় না। আমরা তো আগেভাগেই জানতাম, বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিই শুধু নয়, তাকেও নিঃশেষ করে দেওয়ার একটা জঘন্য পায়তারা চলছে। আমিও অবরুদ্ধ। বুকফাঁটা আর্তনাদ করারও সুযোগ নেই। কিন্তু অনুভূতির রক্তক্ষরণ অনেকটাই বৃদ্ধি পেল। আমার দুটি চোখ কেবল অশ্রুসিক্তই হয় নাই, আমি তাঁর হাতটা চেপে ধরা অবস্থাতেই সশব্দে কেঁদে দিয়ে বলেছিলাম, মুজিব ভাই, ওরা সত্যিই কি আপনাকে মেরে ফেলবে? ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে তো আপনি বিশ্বাস করেন না। আপনি বিচ্ছিন্নতাবাদীও নন, তবে আপনার প্রতি কেন তাদের এত আক্রোশ? আইয়ুব জান্তার কেন এত জেদ? আপনি আপোসহীন পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায্য হিস্যার দাবীতে।
পরে যখন মুজিব ভাইকে দেওয়ানী থেকে সরিয়ে সমস্ত বন্দীদের লকআপের পরে তাঁকে অজানা গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন আমি দেওয়ানীর পাশের সেল নতুন ২০-এ ছিলাম। তখন আমাদের তত্ত্বাবধানে থাকা ডেপুটি জেলারগণ, বিশেষ করে শামসুর রহমান ও তোফাজ্জল হোসেন আমাদের সমবয়সী ও বন্ধুপ্রতিম ছিলেন, তাদেরকে অনুরোধ করায় তারা নিজেদের চাকরির ঝুঁকি নিয়ে আমাকে সুযোগ করে দিতে সেদিন নতুন ২০-এ লকআপ করেননি। ফলে যে রাস্তা দিয়ে মুজিব ভাইকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, সেই রাস্তার সন্নিকটে একটি কলাপসিবল গেট ধরে আমি অঝোরধারায় কাঁদছিলাম। মুজিব ভাই তার স্বভাবসুলভ পাজামা-পাঞ্জাবি, মুজিব কোট পরা অবস্থায় হাতে পাইপ, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা পরে খুবই গম্ভীর মননশীলতা ও মননে ধীর পদক্ষেপে জেল পুলিশদের সাথে হেঁটে যাচ্ছিলেন। যদিও অবলীলাক্রমে তিনি পাইপ টানছিলেন, তবুও তাঁর মুখম-লে একটা চরম দুশ্চিন্তার ছাপ পরিস্ফূট হয়েছিল, যা আমার দৃষ্টি এড়ায়নি। আমি চরম আবেগাপ্লুত হৃদয়ে চিৎকার করে বললাম- মুজিব ভাই, তোমাকে কি ওরা মেরে ফেলবে? আর কখনো কি তোমার দেখা পাব না? আমরা পূর্ব বাংলাকে জীবনের বিনিময়ে মুক্ত করব, ইনশাল্লাহ। তবুও তোমার শেষ নির্দেশনা দিয়ে যাও। মুজিব ভাই ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। ডান হাতে পাইপ ছিল। বা হাত উঁচিয়ে বললেন- ওরা যদি আমাকে মেরেও ফেলে, তবুও চলমান আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেও। পাকিস্তানীদের অপশাসন হতে পূর্ব বাংলাকে মুক্ত করতেই হবে। এ দায়িত্ব আমি তোমাদের হাতে রেখে গেলাম। পথবিচ্যুত হয়ো না। ভয়ভীতি নির্যাতন নিগ্রহকে তোমাদের উপেক্ষা করতে হবে। এর বেশি কথা বলার সুযোগ তখন আর ছিল না।

বাকশালের বিরোধিতা করে সংসদ ছেড়ে আসার পর ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসায় আমার যাতায়াত প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর বাবা শেখ লুৎফুর রহমান মারা যাবার পর মনি ভাই তাঁর সঙ্গে করে আমাকে ৩২ নম্বরে নিয়ে যান। আত্মীয়স্বজন ও শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ ছাড়া বাসার ভেতরে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল না। আমি ৩২ নম্বরের বাড়ির ছাদে গিয়ে পৌঁছালাম। সেখানে বঙ্গবন্ধু অবস্থান করছিলেন। একটি ইজিচেয়ারে বসা অবস্থায় তিনি আমাকে দেখলেন। তাঁর ঠোঁট দুটি কেঁপে উঠল, চোখ অশ্রুসজল হলো। তিনি ইশারায় আমাকে কাছে ডেকে নিলেন। আমি ভীষণভাবে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম। তখন হেলিকপ্টারে টুঙ্গিপাড়ায় যাওয়ার জন্য আত্মীয়দের ও শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছিল। মরহুম জিল্লুর রহমান তাঁর কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে তালিকা প্রস্তুত করতে ব্যস্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুই কি টুঙ্গিপাড়ায় যাবি? প্রচ- ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও হেলিকপ্টারে স্থান সংকুলানের অভাবের কথা চিন্তা করে আমি মুজিব ভাইকে না করেছিলাম।

১৫ আগস্টের দুয়েকদিন আগে বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার শেষ সাক্ষাৎ হয়। আমি বাকশালে যোগ দিইনি বিধায় আমার সংসদ সদস্য পদ তো এমনিতেই বাতিল হয়ে যাবার কথা। বঙ্গবন্ধু আমাকে পরামর্শ দিলেন, গোপালগঞ্জে তাঁর বাবার নামে  স্থাপিত কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেয়ার জন্য। জবাবে আমি বলেছিলাম, আমার মনটা এখন খুব খারাপ। আপনাকে পরে জানাব। এই ছিল তাঁর সাথে আমার শেষ কথা।

স্বাধীনতার পূর্বকাল হতেই ভ্রান্তবামেরা বঙ্গবন্ধুকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে আসছিল। বাকশাল গঠনের মধ্য দিয়ে তাদের সেই চেষ্টা সফল হয় এবং যত কষ্টদায়কই হোক এটা নির্মম বাস্তব, বাকশাল গঠন ১৫ আগস্টের পটভূমিকা রচনায় অনেকটাই প্রণোদনা প্রদান করে। নেতা অবশ্য আমাকে ডেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, আমি আমার মানুষকে বলেছিলাম, সাড়ে তিন বছর কিছুই দিতে পারবো না। তারা তা বিনা প্রতিবাদে মেনে নিয়েছে। এখন আমি কী করে তাদের শান্ত রাখবো? তাই এখন একটা রেজিমেন্টেশনের মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান একটা উন্নয়ন আনতে চাই। তারপর আবার বহুদলীয় ব্যবস্থায় ফিরে আসবো, ইনশাল্লাহ। কিন্তু ১৫ আগস্ট তাঁর সেই ওয়াদা পুরণ করার সুযোগ দেয়নি।  

মুজিব ভাইয়ের নেতৃত্বের যে আসন, সেটি মানুষের হৃদয়ে তিলতিল করে প্রতিস্থাপিত হয়েছিল। সে আসনটি ছিল মোঘলদের হীরকখচিত ময়ুর সিংহাসনের চাইতেও মূল্যবান, অতুলনীয়। তাইতো প্রশ্ন এসে যায়, ১৫ আগস্টের পর সারা বাংলাদেশ আগ্নেয়গিরির গলিত লাভার মতো বিস্ফোরিত তো হলই না, বরং নীরব, নিথর, নিস্পৃহ, নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে রইল কেন? এই নিস্পৃহতার কী কারণ- তার পূর্ণ বিশ্লেষণের ভার আমি ইতিহাসের কাছেই অর্পন করতে চাই। তবুও আমার নিজের ধারণা, ঘটনার আকষ্মিকতা এবং নৃশংস নির্মমতায় সমগ্র জাতি হতচকিত হয়ে গিয়েছিল, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়েছিল।

দ্বিতীয়ত- বাকশাল গঠন প্রক্রিয়ার প্রকোপে আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক শক্তি বিধ্বস্থ হয়ে গিয়েছিল। অনেক দল, বিশেষ করে ভ্রান্ত বামের সংমিশ্রনে আওয়ামীলীগ তার নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি হারিয়ে ফেলে। ভাগের মা গঙ্গা পায় না- এমনই এক রাজনৈতিক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল সে সময়। অন্যদিকে, যাদের উপর সংগঠনসমূহের দায়িত্ব অর্পিত ছিল তারা সকলেই দায়িত্ব পালনে কেবল ব্যর্থই হননি, অনেকটা অস্বীকৃতি জানানোর মতোই ছিল তাদের নিস্পৃহতা। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, রক্ষীবাহিনী রাজনৈতিক নির্দেশের অভাবে সেনাবাহিনী হতে পরিত্যক্ত ২৬ জন ধিকৃত মানুষকে প্রতিরোধ করার জন্য এগিয়ে আসেনি।

বঙ্গবন্ধুকে অকালে হারানোর ক্ষতবিক্ষত আমার হৃদয়কে দীপ্তিহীন আগুনের শিখায় দগ্ধীভূত করে যখন একান্তে ভাবি, বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের গৃহটি আক্রান্ত হওয়ার পর দুই ঘন্টার কাছাকাছি সময় তিনি হাতে পেয়েছিলেন। এই সময়ের মধ্যে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে এবং রক্ষীবাহিনীর যিনি রাজনৈতিক দায়িত্বে ছিলেন- তাদের সবার সঙ্গে টেলিফোনে বারবার পরিস্থিতি জানিয়ে সাহায্যের জন্য, অর্থাৎ ওদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন। কিন্তু বারবার টেলিফোন করার পরও কারো কাছ থেকে তিনি কোন সহযোগিতা পাননি শুধুমাত্র কর্ণেল জামিল ব্যতিরেকে। আমি প্রত্যয়দৃঢ় চিত্তে মনে করি, সশস্ত্রবাহিনী ও রক্ষীবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তো বটেই, ন্যূনতমভাবে তাদের দেহরক্ষীদের নিয়ে বের হলেও দুস্কৃতিকারীরা পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করার পথ খুঁজে পেত না। কিন্তু দুর্ভাগ্য বঙ্গবন্ধুর, মর্মান্তিক শাহাদাতের পূর্বে তিনি বুকভরা বেদনা নিয়ে উপলদ্ধি করে গেলেন, তিনি কতটা একা, নিঃস্ব ও রিক্ত !

১৫ আগস্ট কোন সেনা-অভ্যুত্থান বা কোন বিদ্রোহ হয়নি। কোন জনতার বিপ্লবও সংঘটিত হয়নি। অন্যদিকে হত্যাকারীরা সংখ্যায় যে কেবল ২৬ জন ছিল তাই নয়, তাদের প্রায় সকলেই সামরিক বাহিনী হতে হয় বহিস্কৃত, নয় চাকরিচ্যুত। এখানে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য নয়, পরিস্থিতি ব্যাখ্যার প্রয়োজনে আমি উল্লেখ করতে চাই, ১৫ আগস্টে আমার হৃদয়ের যে রক্তক্ষরণ, তা আজও বন্ধ হয়নি। এর প্রধানতম কারণ, তখন আমার হাতে কোন সংগঠনই ছিল না। ৭১-এর ২৫ মার্চ সারা বাংলাদেশ যখন পৈশাচিক শক্তি সশস্ত্র পাকিস্তানী সেনাবাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হল এবং কারফিউ জারি করে নির্বিচারে গুলি ছুঁড়ে নিরীহ নিরস্ত্র নিতান্ত সহজ সরল মাটির মানুষগুলোকে হত্যা করা হল, তখন হৃদয়ের সমস্ত যন্ত্রণাকে প্রশমিত করে প্রতিরোধ ও প্রতিহত করার সংকল্প ও পূর্ব পরিকল্পনাকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার প্রজ্জ্বলিত আকাক্সক্ষাকে নির্দিষ্ট কর্মসূচিতে রূপান্তরিত করি। কারণ, ২৫ মার্চে আমার একহাতে ছিল বাঁশের বাশরি আর হাতে রণতূর্য। কিন্তু ১৫ আগস্টে হৃদয়ে শুধু রক্তক্ষরণ হয়েছে, কিছুই করতে পারিনি।
 
বাকশালের বিরোধিতা করা সত্ত্বেও ১৫ আগস্টের পর আমাকে গ্রেফতার করে দীর্ঘদিন ক্যান্টনমেন্টে তারপর কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৯ মাস বন্দী করে রাখা হয়েছিল (রিট করে বেরিয়ে আসি)। আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া, আমার একটাই সান্ত¦না এই যে, ১৫ আগস্টে প্রতিরোধ গড়তে না পারলেও নেতার একান্ত বিশ্বস্ত সহকর্মী হিসেবে কারাভোগের মাধ্যমে নেতার প্রতি কিছুটা ঋণশোধ করতে পেরেছি।

লেখক : স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনার শেষ কোথায়
                                  

করোনা মহামারীর সময় সারা বিশ্বের একত্রিত হওয়া খুবই প্রয়োজন ছিল। যুদ্ধ, অস্ত্র প্রতিযোগীতা, আধিপত্য বিস্তারের কৌশল, জোট পরিকল্পনা প্রভৃতি সবকিছুই সমানতালে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন দোরগোড়ায়। রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাট দুই দল থেকে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রাম্প ও বাইডেন জোরেশোরে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। বিভিন্ন জরিপে বাইডেন এগিয়ে রয়েছেন। এতকিছু ছাপিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সাম্প্রতিক দ্বন্দ্ব যাকে নতুন স্নায়ুযুদ্ধ হিসেবে দেখা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগের কেন্দ্রে রয়েছে। কেন এত দ্বন্দ্ব? এই দ্বন্দ্বের শেষই বা কোথায় বা কতদিনে?

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সম্পর্কের অবনতির মাত্রা আরো বেড়ে যায় ২০১৮ সাল থেকে। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা থেকেই চীনের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে আসলেছন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ক্ষমতায় এসেই বাণিজ্য যুদ্ধ দিয়ে টানাপোড়েনের শুরু হয়। তার প্রশাসন চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে। এরই জবাবে চীনও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে। আর এতেই শুরু হয়ে যায় দু’দেশের বাণিজ্য যুদ্ধ। তৈরি হয় উত্তেজনা। সেই উত্তেজনা আজও চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে সেই উত্তেজনা আরও তীব্র হচ্ছে। এই চলমান দ্বন্দ্বকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। জর্জ ফ্লয়েড হত্যা এবং ফলশ্রুতিতে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন এবং মৃত্যু, করোনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল মানুষের প্রাণ হারানো এবং এ নিয়ে বিভিন্ন সময় মন্তব্য করে সমালোচনার শিকার হওয়া এবং রাজনীতি এসব কিছুই ঘুরে ফিরে আসছে। সম্প্রতি চীন সীমান্তের কাছাকাছি দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাবমেরিন বিধ্বংসী যুদ্ধবিমানের। সাংহাই থেকে ১০০ কিলোমিটারর মধ্যে ওই বিমান চলে এসেছিল। এমনটাই জানিয়েছে দক্ষিণ চীন সাগরের ওপরে নজর রাখা চীনের একটি থিঙ্কট্যাঙ্ক।
    
একে অপরের কনস্যুলেট বন্ধ করার নির্দেশে এই উত্তেজনা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি সম্পর্ক এতটাই তিক্ততায় পৌছায় যে যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে চীনা কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়ার আদেশের পাল্টাপাল্টি ব্যবস্থা হিসেবে চেংডুর মার্কিন কনস্যুলেট বন্ধ করার নির্দেশ দেয় বেইজিং। হিউষ্টনের কনস্যুলেট থেকে চীন বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরি করার তৎপরতা চালাচ্ছিল বলে অভিযোগ আনে মার্কিন প্রশাসন। এর আগে দুই দেশ আরও পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে ভিসা বিধিনিষেধ আরোপ, কূটনৈতিক ভ্রমণের নতুন নিয়মকানুন আর বিদেশি সংবাদদাতাদের বহিষ্কারের মতো সিন্ধান্তও ছিল। অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন দ্ইু পরাশক্তি। যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে সবসময় একটি উত্তেজিত অবস্থা বিরাজ করে। কারণ দুই দেশই পরাশক্তি এবং কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। এই সমস্যার সমাধান এরকম শক্ত অবস্থানে থেকে সম্ভব হবে না। দু পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে এবং সহনশীল হতে হবে। কিন্তু ক্ষমতার প্রশ্নে বা প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নে আপোস করা প্রায় সময়ই কঠিন হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যেকার এই টানাপোড়েন শীতলযুদ্ধের দিকে এগুচ্ছে। শীতল যুদ্ধ বা স্নায়ুযুদ্ধ সম্পর্কে পৃথিবী জ্ঞাত। কারণ দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট এবং তার মিত্রদের সাথে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যেকার স্নায়ুযুদ্ধের কথা আজও স্মরণে আছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন দুই দেশই ছিল সেসময় বিশে^ দুই পরাশক্তি। গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র মতবাদে বিভক্ত দুই পরাশক্তির এই স্নায়ুযুদ্ধের ব্যপ্তিকাল ছিল ১৯৪০ এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ৮০’র দশক পর্যন্ত। আজ যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে যে বিভেদ সেখানেও দুই পরাশক্তির মধ্যে এক ধরনের শীতল লড়াই লক্ষ্যণীয়। বাণিজ্য বিরোধ ছিল বিরোধের শুরু। এরপর মতভেদ বাড়তে থাকে। করোনা ভাইরাস মহামারি নিয়েও এ দুরত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

যে ভাইরাসকে একসময় ট্রাম্প চায়না প্লেগ বলেছিলেন। নানা অভিযোগ রয়েছে চীনের বিরুদ্ধে এই করোনা ভাইরাস নিয়ে।  এসবের পাশাপাশি উইঘুর মুসলিমদের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং হংকংয়ের বিতর্কিত নতুন নিরাপত্তা আইনও রয়েছে। যদিও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেছেন, মস্কো বা বেইজিংয়ের সাথে অস্ত্র সম্ভার বাড়ানোর ব্যয়বহুল প্রতিযোগীতা চায় না ওয়াশিংটন। করোনা পরবর্তী সময়ে বিশ্বের অর্থনীতি একটি নতুন জায়গায় গিয়ে দাড়াবে। সেখান থেকে অর্থনীতিকে চাঙা করতে হলে বিশ্বকে একত্রিত হতে হবে। বাণিজ্য সুবিধা বিস্তার লাভ করাতে হবে। বাণিজ্য যুদ্ধ কেবল অর্থনীতির ক্ষতিকে বৃদ্ধি করতে পারে। ২০১৯ এর শুরু  থেকে বাণিজ্য যুদ্ধে এ পর্যন্ত চীনের ক্ষতি প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার। ক্ষতির পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রেরও কম নয়। উভয়পক্ষের উত্তেজনা দক্ষিণ চীন সাগরেও বিরাজ করছে।

বিশ্ব নেতৃত্বে কে থাকবে বা আগামী শতাব্দির নেতৃত্বকে দেবে তার জন্য যেন প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশ্ব! যদিও বিশ্ব এখন একক কতৃত্ব করার সুযোগ হারিয়েছে। এখন বিশ্ব জোটের অন্তর্গত থাকতে পছন্দ করে। সম মতবাদে বিশ্বাসী দেশগুলো জোট গড়ে তোলে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও লন্ডন সফরে গিয়ে চীনের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলে চীনকে মোকাবেলায় জোট গঠনের কথা বলেন। জিনজিয়ায় প্রদেশে সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলমান নিপীড়ন ও তাদের অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তৃতীয় দফায় ১১ টি চীনা কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। এর আগের দুই দফায় ৩৭টি চীনা প্রতিষ্ঠান কালো তালিকাভুক্ত হয়েছে। এখন করোনাকাল চলছে। বিশ্বের প্রায় সব দেশই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্থ। এ থেকে উত্তরনের পথ খুঁজতে হবে। ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সফলতার খুব কাছাকাছি দাড়িয়ে মানবজাতি। ইতিমধ্যেই চীন কভিড পরিস্থিতি মোকাবেলা এবং করোনা সংকটের জেরে ক্ষতিগ্রস্থ আর্থিক বৃদ্ধির গতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে দক্সিণ এশিয়ায় তিন দেশ (পাকিস্তান, নেপাল ও আফগানিস্থান) নিয়ে একটি নতুন জোট গড়তে চলেছে। এসময় অবশ্যই সবাইকে নিয়েই পথ চলতে হবে। ভারতের সাথে ঝামেলা শুরুর পর থেকে চীন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সাথে আরও বেশি ঘনিষ্টতা বাড়াতে শুরু করেছে। এভাবেই ক্ষমতা বা আধিপত্যের প্রতিযোগতা চলে আসছে। কিভাবে এর সমাধান হয়ে বিশ্ব শান্তির পথে অগ্রসর হবে তা ভবিষ্যত নির্ধারণ করবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের এই দ্বৈরথ থামলে বা সমতা প্রতিষ্ঠিত হলে পুরো বিশ্বই স্বস্তি লাভ করবে।



অলোক আচার্য
সাংবাদিক ও কলাম লেখক

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় কতটুক প্রস্তুত বাংলাদেশ?
                                  

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মূলত স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মের মধ্যে ব্যতিক্রম ঘটনা বা ঘটনাবলী। প্রাকৃতিক সাধারণ নিয়ম ব্যতীত যেকোনো ঘটনাই প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। যুগ যুগ ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছে। স্বাভাবিক জীবন-যাপন ব্যাহত হচ্ছে।যেসকল প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের কাছে এ পর্যন্ত চিহ্নিত হয়েছে; সেসকল দুর্যোগ মোকাবেলা করতে কতটুকু প্রস্তুতি লাভ করেছি?

প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে নিত্যকার ঘটনাতে রুপান্তর হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। দুর্ভোগ আর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হিসেব ছাড়িয়েছে অধিক। আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণের পাশাপাশি মৃত্যুর হার যেন ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবহাওয়া অধিদফতর কর্তৃক পূর্বাভাস পেলেও ক্ষয় ক্ষতির পরিমাণ এড়ানো সম্ভব হচ্ছেনা। ইতিহাসের পাতা ঘাটলে আমরা দেখতে পাই, ৮৮’র ভয়াবহ বন্যা। বাংলাদেশে সংঘটিত প্রলংকারী বন্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম। আগস্ট-সেপটেম্বর মাস জুড়ে সংঘটিত এই বন্যায় দেশের প্রায় ৬০% এলাকা ডুবে যায় এবং স্থানভেদে এই বন্যাটি ১৫ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী ছিলো। এটি ছিলো এদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক ও ক্ষয়-ক্ষতিময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এই প্রলংকারী বন্যাটি সংগঠিত হওয়ার মূল কারণ ছিলো সারা দেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত এবং একই সময়ে দেশের তিনটি প্রধান নদীর পানি প্রবাহ একই সময় ঘটায় নদীর বহন ক্ষমতার অতিরিক্ত পানি প্রবাহিত হয়। এই বন্যায় বাংলাদেশের প্রায় ৮২,০০০ বর্গ কি.মি. এলাকা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


পরবর্তীতে, ১৯৯৮ সালের বন্যা  ছিল  বাংলাদেশে সংঘটিত ভয়ংকর বন্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম। দুই মাসের অধিককাল জুড়ে সংঘটিত এই বন্যায় দেশের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ এলাকা ডুবে যায়।

২০০৭ সালে বঙ্গোপসাগর এলাকায় সৃষ্ট একটি ঘূর্ণিঝড় সিডর। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সকাল বেলা পর্যন্ত বাতাসের বেগ ছিল ঘণ্টায় ২৬০ কিমি/ঘণ্টা এবং ৩০৫ কি.মি/ঘণ্টা বেগে দমকা হাওয়া বইছিলো। সরকারি ভাবে ২,২১৭ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছিল। বাংলাদেশ সরকার এ ঘটনাকে জাতীয় দুর্যোগ বলে ঘোষণা করেছে। ঘূর্ণিঝড় সিডরের ফলে প্রায় ৩,৫০০ লোক মারা গিয়েছিল।

২০০৯ সালে সংগঠিত হওয়া আরেক দুর্যোগ আইলা। খুলনা ও সাতক্ষীরায় ৭১১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিধ্বস্থ হয়েছে। প্রায় ২,০০,০০০ একর কৃষিজমি লোনা পানিতে তলিয়ে যায়।কাজ হারায় ৭৩,০০০ কৃষক ও কৃষি-মজুর।
জলোচ্ছাস ও লোনা পানির প্রভাবে, গবাদি পশুর মধ্যে কমপক্ষে ৫০০ গরু ও ১,৫০০ ছাগল মারা যায়।কমপক্ষে ৩,০০,০০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। পর পর দুই মৌসুম কৃষিকাজ না হওয়ায় প্রায় ৮,০০,০০০ টন খাদ্যঘাটতি সৃষ্টি হয়। খুলনা ও সাতক্ষীরায় প্রাণ হারান ১৯৩ জন মানুষ।

সাম্প্রতিক ঘূর্নিঝড় আম্ফান ১৬ মে ২০২০ আঘান আনে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে  আঘাত আনা ঝড়গুলির মধ্যে এই ঝড়টি সবচেয়ে বেশী শক্তিশালী ছিল। আনুমানিক ৫ মিটার (১৬ ফুট) উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়ে উপকূলীয় সম্প্রদায়ের বিস্তৃত অংশ ডুবে গেছে এবং সেখানকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ১০টি গ্রাম ডুবে গেছে।নোয়াখালী জেলার একটি দ্বীপে ঝড়ের বর্ষণে কমপক্ষে ৫০০টি ঘর নষ্ট হয়েছে। দেশজুড়ে প্রাথমিক ক্ষতি  ১১০০ কোটি পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ১০ কোটিরও বেশি লোক বিদ্যুৎবিহীন হয়েছিল। কোভিড-১৯ এর কারণে মানুষকে সরিয়ে আনা হলেও প্রশ্ন জেগেছিল সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার।

বর্তমানে বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা হওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছে জাতিসংঘের কো-অর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্স। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য মতে ১৮ জেলায় ২৪ লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাসস্থান হারিয়ে ৫৬ হাজার মানুষ, আশ্রয় নিয়েছেন আশ্রয়স্থলে। এ পর্যন্ত অন্তত ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রায় সাড়ে পাচ লাখ বাড়িঘর বন্যায় কবলিত হয়েছে।বাঁধ ও নদী ভাঙনের ফলে প্রতিনিয়ত পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বর্ষা মৌসুম এলেই দেখা যাচ্ছে নদী ভাঙন, রাস্তা-ঘাট অল্প বৃষ্টিতেই পানিতে ডুবে যাচ্ছে। সঠিক সময়ে টানেল মেরামত হয়নি। নদী ভাঙন রোধে বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি। নির্মাণ হলেও অল্পতে ভেঙে গিয়েছে। টানেল নির্মাণ হলেও জনসাধারণের কান্ড জ্ঞানহীনতার কারণে যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলানোর জন্য ড্রেনের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। আবার, টানেল মেরামত সুষ্ঠু হয়নি তা ভেঙে পড়ছে অচিরেই। দুর্নীতি যেন প্রতিটি স্তর গ্রাস করে নিয়েছে। যার ফলে একটি কাজ শেষ হওয়ার কিছুদিন পরে তা ভেঙে পড়ছে। দুর্ভোগের সীমা ছাড়িয়ে যায় অল্পতেই। আশ্রয় স্থলে মানুষের বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দেয়, খাবারের ঘাটতি দেখা দেয়। এ চিত্র যেন প্রতিবছর প্রতিফলিত হচ্ছে। বন্যায় কবলিত এলাকায় মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, নিরাপদ আশ্রয়স্থল, গবাদিপশু পাখির জন্য নিরাপদ আবাসস্থল গড়ে তুলতে হবে। দুর্যোগ শেষ হওয়ার সাথে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন এবং নদী ভাঙন রোধে বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। শুধু সরকার নয় বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে আমাদের সকলের সহযোগি মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এড়ানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের দুর্ভোগের পরিমাণ অনেকটা লাঘব হবে।



-খায়রুজ্জামান খান
বিভাগ:ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
সেশন :২০১৯-২০২০

লাশের দেশ বাংলাদেশ
                                  

আব্দুর রউফ

যার জীবন আছে তাকে মৃত্যুবরণ করতেই হবে। এই বিশ্বাস সকলের আছে। মৃতু থেকে বাঁচার কোন ঔষধ এখনও চিকিৎসা বিজ্ঞান আবিষ্কার করতে পারেনি। আর কোনদিন তা পারবেও না। একটি জীবন জন্মগ্রহণ করলে তাকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে এটা প্রকৃতির নিয়ম। পৃথিবীতে সকলের প্রত্যাশা থাকে তার যেন স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। অস্বাভাবিক মৃত্যু কেউ আশা করে না। কিন্তু বাংলাদেশে অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যু এত বেড়ে গেছে যে, পরিসংখ্যান দেখলে যে কেউ চমকে উঠবে। প্রতিদিন অকালে ঝরে যাচ্ছে শতশত তাজা প্রাণ। খবরের কাগজ বা টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে উঠছে বীভৎস সব লাশের চেহারা। এই সমস্ত মৃত্যুর খবর যেন আমাদের সয়ে গেছে। ফলে প্রতিদিন শতশত প্রাণ ঝরলেও তা আমাদের মনকে আবেগতাড়িত করে না। প্রতিদিন বাংলাদেশে বিভিন্ন যাত্রা পথে হাজারো প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। আকাশ স্থল বা জল, কোন পথ আজ নিরাপদ নয়। সীমান্ত হত্যা, বিচার বহিরর্ভূত হত্যাকান্ড লাশের মিছিলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য দায় কার? কেনই বা এই মৃত্যুকে হ্রাস করা সম্ভব হচ্ছে না। যাত্রী ও পথচারীদের জন্য দেশের রাস্তাঘাট এখনও রয়ে গেছে ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ। গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দেশে ৭৫৫ সড়ক দুর্ঘটনায় ১৪১ নারী ও ১৬৬ শিশুসহ মারা গেছেন ১,০২৭ জন। সেই সাথে আহত হয়েছেন ১,৩০১ জন।

করোনাভাইরাসের কারণে জনসাধারণের চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ থাকলেও গত জুন মাসে ২৯৭ টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৩৬১ জন মারা গেছেন। এমন পরিসংখ্যান দিচ্ছে জাতীয় দৈনিকসমূহ।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সংগঠনের করা ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪ হাজার ৭০২টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৫ হাজার ২২৭ জন। আহত ৬ হাজার ৯৫৩ জন ২০১৯ সালে দেশের সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা বিগত দুই বছরের তুলনায় অনেক বেড়েছে উল্লেখ করে নিসচার প্রতিবেদনে বলা হয়। প্রতিবেদনে এসেছে, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ১ হাজার ৫৯৯টি বেশি হয়েছে। ২০১৮ সালে ৩ হাজার ১০৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ৩৯ জন নিহত ও ৭ হাজার ৪২৫ জন আহত হয়েছিল। আর ২০১৭ সালে ৩ হাজার ৩৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৬৪৫ জন নিহত ও ৭ হাজার ৯০৮ জন আহত হয়েছিল। অথচ এই বিপুল সংখ্যক তাজা প্রাণ আর হাজারো স্বপ্নের ইতি সড়ক পথে নিঃশেষ হলেও আমাদের রাষ্ট্র কোন এর দায়ভার নিতে রাজি নয়।

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলেছে সবকিছু। বেড়েছে প্রযুক্তিগত উন্নত সুবিধা। তবুও সবচেয়ে নিরাপদ যাত্রা হিসেবে পরিচিত রেলপথেও দুর্ঘটনা থামছে না। ৩০ বছর আগেও রেল দুর্ঘটনা যেসব কারণে ঘটেছে এতদিন পরও এর পরিবর্তন হয়নি।

সড়ক পথে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি হওয়ার কারণে মানুষ রেলপথকে পছন্দের তালিকায় রাখে। কিন্তু সেই রেলপথে যাত্রা নানা কারণে অনিরাপদ হয়ে উঠছে। শুধু ২০১৯ সালে রেলপথে ১৬২টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ১৯৮ জন, আহত ৩৪৭ জন। ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল এই নয় বছরে রেল দুর্ঘটনায় মারা গেছে দুই হাজার ২২২ জন। ছোট বড় মিলিয়ে মোট দুর্ঘটনার সংখ্যা ২৯৭টি। চলতি বছরেও কিছু ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে দেশবাসী।

জলপথে যাতায়াত সাশ্রয়ী এবং নিরাপদ মনে হলেও গত কয়েক বছরের নৌ-দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান দেখলে শিউরে উঠতে হয়। নদী নিরাপত্তা বিষয়ক সামাজিক সংগঠন ‘নোঙর’-এর হিসাব অনুযায়ী ১৪ বছরে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ৫৩৫টি বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। আর এতে ছয় হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এই দিকে শুধু ২০১৯ সালে নৌপথে ৩০টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৬৪ জন এবং আহত হয়েছে ১৫৭ জন আর নিখোঁজ ১১০ জন।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সারাদেশে বিভিন্ন নৌপথে এই ছয় মাসেই যাত্রী ও পণ্যবাহী মিলিয়ে মোট ১০৬টি ছোট-বড় নৌ-দুর্ঘটনায় ১৫৩ জন নিহত ও ৮৪ জন আহত হয়েছেন। এই সময়ে নিখোঁজ হয়েছেন আরো অন্তত ২২ জন। এ বছর ইতোমধ্যে বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবিতে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। এই ঘটনায় ৩৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এমন হতাহত ঘটনা দৃশ্যমান হলেও নৌপথের যানবাহনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তেমন কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আকাশপথে গত বছর দেশে কোন বড় দুর্ঘটনা না ঘটলেও বিগত বছর গুলোর পরিসংখ্যান আকাশপথেরও নিরাপত্তাও আশাহত করে। তবে বিশ্বব্যাপী ২০১৯ সালে বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে ৮৬টি। এর মধ্যে ৮টি ছিল মারাত্মক দুর্ঘটনা। সব মিলিয়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে ২৫৭ টি।

শুধু যাত্রাপথ নয়, দেশে অকারণে প্রতিদিন  ঝরে যাচ্ছে শতশত প্রাণ। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা প্রবাসী শ্রমিকরাও মৃত্যুর পরিসংখ্যানে পিছিয়ে নেই। প্রবাসী শ্রমিকের লাশ দেশে ফেরার সংখ্যা বাড়ছে বাংলাদেশে। সরকারি হিসেবে গত এক দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করতে যাওয়া ২৭ হাজার ৬৬২ জন শ্রমিকের লাশ দেশে ফেরত এসেছে।
তার সাথে বাংলাদেশে রাজনৈতিক কারণে উদ্বেগজনক হারে বিচার বহিরর্ভূত হত্যাকান্ড বেড়েই চলছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০০৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চারদলীয় জোট সরকার আমলে ক্রসফায়ারে ৭৩৬ জনের মৃত্যু হয়। এদের মধ্যে ৫৪৪ জনই ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার আগে গ্রেফতার হয়েছিলেন। ২০০৭ সালে এক-এগারোর পটপরিবর্তন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার পর ঘটনা কমলেও ক্রসফায়ার বন্ধ হয়নি। আসকের হিসাবে, ২০০৭-০৮ সালে, দুই বছরে ক্রসফায়ারে নিহত হন ২৫৬ জন। সেই গল্প এখনো চলছে গ্রেফতার ব্যক্তিকে নিয়ে রাতের বেলায় অস্ত্র উদ্ধারে বের হলে বা তার সহযোগীদের গ্রেফতার করতে বের হলে ওঁৎ পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা হামলা, গুলিবর্ষণ করে। তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আত্মরক্ষায় পাল্টা গুলি ছোঁড়ে। দুই পক্ষে বন্দুকযুদ্ধের সময় ক্রসফায়ারে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় বন্দী ব্যক্তি। ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের সব গল্প প্রায় এ রকম। ঘটনাস্থল থেকে কিছু অস্ত্র উদ্ধারও দেখানো হয়। ২০০৪ সালে শুরু হওয়া এই গল্প এখনো জারি আছে। কেবল ক্রসফায়ার-এর স্থলে কখনো কখনো ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘এনকাউন্টার’ শব্দ প্রতিস্থাপিত হয়েছে।

মহাজোট সরকার নির্বাচনের ইস্তেহারে বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার তা বিন্দুমাত্র রক্ষা করতে পারেনি। আসকের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত পাঁচ বছরে ক্রসফায়ারে মোট নিহতের সংখ্যা ৩৮০ জন। এরপর ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনের আগে দেওয়া আওয়ামী লীগের ইশতেহার থেকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’র প্রসঙ্গটি বাদ পড়ে যায়। সর্বশেষ একাদশ সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারেও এ বিষয়টির উল্লেখ নেই। যার ফলে বিগত এবং চলতি বছর অনেক হত্যার ঘটনা ঘটছে।

সীমান্ত হত্যা যেন কোনভাবেই থামানো যাচ্ছে না। আমাদের কথিত বন্ধু রাষ্ট্রের সাথে যে কয়টি দেশের সীমান্ত রয়েছে তারমধ্যে একমাত্র বাংলাদেশের সাথে ভারতে কোন বিরোধপূর্ণ সীমান্ত নেই। তারপরেও শুধুমাত্র বাংলাদেশ ভারত সীমান্তে প্রতিবছর  অকালে অনেক বাংলাদেশির প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত যথাক্রমে ৬৬, ২৪, ১৮, ৩৮, ১৭, ৪৩, ৫৫, ২৪, ২৪, ২৫, ১৪ এবং চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৩০ জন বাংলাদেশির হত্যাকান্ড ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশ  ভারত সীমান্তে। এমন চিত্র তুলে ধরেছে বিবিসি বাংলা। অসংখ্য বাংলাদেশী ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে নির্যাতন ও হত্যার শিকার হলেও বাংলাদেশ সরকার অজানা কারণে কোন প্রতিবাদ করেনা। যার ফলে সীমান্তে  প্রতিদিন  অসংখ্যা প্রাণ ঝরে যাচ্ছে।

প্রতিদিন পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে অসংখ্য হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটছে। যেকারণে দেশে বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যাও দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন অনেক ঘটনা আছে যেগুলো খবরের কাগজ বা টেলিভিশনের পর্দায়  আসেনা। কিন্তু এই পরিসংখ্যান এর বাহিরে বাস্তবিক চিত্র আরো মারাত্মক ভয়াবহ।

এমনাবস্থায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমি, আপনি বা আমরা যেকোন সময় লাশ হয়ে যেতে পারি। রাষ্ট্র চাইলে অকারণে মৃত্যুবরণ অনেকটাই হ্রাস করতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সেই স্বদিচ্ছা একদম অনুপস্থিত। সেজন্য ঘুণে ধরা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা পরিবর্তন করে একটি সমতাভিত্তিক সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে; যেন প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা যায়। যেখানে সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে আর অকারণে ঝরবে না একটিও প্রাণ। দেশের নাগরিকেরা সুখে-শান্তিতে বসবাস করবে আর অনুভব করবে স্বর্গীয় সুখের সুবাস।


লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী,
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।


   Page 1 of 10
     উপসম্পাদকীয়
নির্ভীক পদচারণার ৫০ বছর
.............................................................................................
সর্বত্র জয় হোক বাংলা ভাষার
.............................................................................................
বাঙালির চেতনা ও প্রেরণার প্রতীক একুশে ফেব্রুয়ারি
.............................................................................................
সড়ক দুর্ঘটনামুক্ত বাংলাদেশ চাই
.............................................................................................
দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরাতে পর্যটন শিল্প হতে পারে অন্যতম হাতিয়ার
.............................................................................................
প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চা
.............................................................................................
এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল: লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশ ও গৃহীত পদক্ষেপ
.............................................................................................
সুনীল অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের নতুন দিগন্ত উন্মোচন
.............................................................................................
নারীবাদ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
.............................................................................................
সামাজিক অবক্ষয়ের ব্যাপকতায় কলুষিত সমাজ ব্যবস্থা
.............................................................................................
আসুন মাদকমুক্ত সমাজ গড়ি
.............................................................................................
শোক সন্তপ্ত ১৫ই আগস্টঃ একটি কালো অধ্যায়
.............................................................................................
হৃদয়ের নিভৃত কন্দরে বঙ্গবন্ধু অমলিন
.............................................................................................
যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনার শেষ কোথায়
.............................................................................................
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় কতটুক প্রস্তুত বাংলাদেশ?
.............................................................................................
লাশের দেশ বাংলাদেশ
.............................................................................................
কোরবানীর আনন্দ উদযাপন হোক প্রতিবেশীদের নিয়ে
.............................................................................................
স্বাস্থ্যখাতের সকল অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে
.............................................................................................
কৃষক বাঁচলে, বাঁচবো আমরা
.............................................................................................
বাংলা একাডেমির আধুনিকায়ন প্রয়োজন
.............................................................................................
মুখোশের আড়ালে আমরা সবাই হাওয়াই মিঠাই
.............................................................................................
করোনাভাইরাস ও আমরা
.............................................................................................
করোনা বাস্তবতায় ভার্চুয়াল কোর্ট বনাম অ্যাকচুয়াল কোর্ট
.............................................................................................
ইসরায়েলি দখলদারিত্বে অস্তিত্ব সংকটে ফিলিস্তিন
.............................................................................................
চীন সীমান্তে নাস্তানাবুদ অথচ বাংলাদেশ সীমান্তে গুলি, ভারত কি চায়?
.............................................................................................
পূর্বাভাসহীন শত্রুর তান্ডবে বিধ্বস্ত বিশ্ব
.............................................................................................
করোনা মোকাবেলায় অতন্দ্র প্রহরী “গণমাধ্যম”
.............................................................................................
জিপিএ ফাইভ ও উচ্চ শিক্ষাই মেধাবী নির্ণয়ের মাপকাঠি নয়
.............................................................................................
আসুন, অসহায়দের মুখে হাসি ফোটাই
.............................................................................................
কি হবে বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও তাদের শিক্ষকদের!
.............................................................................................
৭ই জুন স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে উত্তরণের দিবস
.............................................................................................
নিউ নর্মাল, বদলে যাওয়া পৃথিবী
.............................................................................................
পরিবেশ রক্ষায় আমরা কতটা সচেতন?
.............................................................................................
বাড়ছে জনসংখ্যা, কমছে মানুষ
.............................................................................................
অস্তিত্ব রক্ষায় বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা
.............................................................................................
গণতন্ত্র বনাম ‘বুট-থেরাপী’
.............................................................................................
গণতন্ত্র বনাম ‘বুট-থেরাপী’
.............................................................................................
করোনা রোগীদের প্রতি অমানবিক আচরণ কেন ?
.............................................................................................
কম্বাইন্ড হার্ভেস্টারের চাকায় পিষ্ট বঙ্গবন্ধুর ‘দাওয়াল’
.............................................................................................
বিধি নিষেধ কতটা যৌক্তিক
.............................................................................................
কৃষিই বাঁচাতে পারে বাংলাদেশকে
.............................................................................................
বীমার অর্থনীতি পুনর্গঠন হবে বড় চ্যালেঞ্জ
.............................................................................................
সবার জন্য নিশ্চিত হোক নিরাপদ পানি
.............................................................................................
বিয়ে চুক্তিতে সমতার চারা
.............................................................................................
সভ্যতার সংকট : সামাজিক অবক্ষয়
.............................................................................................
প্রবৃদ্ধি অর্জনে আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্ব
.............................................................................................
আরো কমেছে ধানের দাম
.............................................................................................
সরকারের ৬ মাস : একটি পর্যালোচনা
.............................................................................................
নয়ন বন্ড বনাম সামাজিক নিরাপত্তা
.............................................................................................
প্রাথমিক শিক্ষায় সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য
.............................................................................................

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আখলাকুল আম্বিয়া
নির্বাহী সম্পাদক: মাে: মাহবুবুল আম্বিয়া
যুগ্ম সম্পাদক: প্রদ্যুৎ কুমার তালুকদার

সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: স্বাধীনতা ভবন (৩য় তলা), ৮৮ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০। Editorial & Commercial Office: Swadhinota Bhaban (2nd Floor), 88 Motijheel, Dhaka-1000.
সম্পাদক কর্তৃক রঙতুলি প্রিন্টার্স ১৯৩/ডি, মমতাজ ম্যানশন, ফকিরাপুল কালভার্ট রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত ।
ফোন : ০২-৯৫৫২২৯১ মোবাইল: ০১৬৭০৬৬১৩৭৭

Phone: 02-9552291 Mobile: +8801670 661377
ই-মেইল : dailyswadhinbangla@gmail.com , editor@dailyswadhinbangla.com, news@dailyswadhinbangla.com

 

    2015 @ All Right Reserved By dailyswadhinbangla.com

Developed By: Dynamic Solution IT