শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০ বাংলার জন্য ক্লিক করুন
  
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

   শিল্প সাহিত্য -
                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                 
পড়ালেখার উদ্দেশ্য কি চাকুরী জোগাড় মাত্র?

পত্রিকার খবরে চোখ বুলুতেই দেখলাম বেশ বড় করে হেডলাইন ছাঁপা হয়েছে- রাবি শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা। পুরো ঘটনা শেষ করে বুঝতে পারলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞানের মনিরুল ইসলাম নামের এক শিক্ষার্থীর গত জানুয়ারিতে সরকারি চাকুরির বয়স শেষ হয়ে যায়। এরপর থেকেই প্রচন্ড হতাশায় ভুগতিছিলেন তিনি।  অতঃপর সেই দীর্ঘকায় হতাশা থেকেই আত্মহত্যা।

শিক্ষাকে বলা হয় মানবজীবনের এক অমূল্য সম্পদ। কেননা, সামগ্রিকভাবে একজন মানুষের বিকশিত হতে যেসব অপরিহার্য উপকরণ প্রয়োজন, তন্মধ্যে শিক্ষার স্থান সর্বাগ্রে। শিক্ষা মানুষের অন্তর্নিহিত সুপ্ত প্রতিভাকে উন্মোচিত করে আনার এক অনিবার্য উপায়। দার্শনিক কান্ট বলেছেন- আদর্শ মনুষ্যত্ব অজর্নই শিক্ষা। হাবার্ট রিড বলেছেন- মানুষকে মানুষ করাই হল শিক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া পঞ্চাশ জনেরও অধিক শিক্ষার্থীকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম- এই যে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আপনি বই এর পাতা চুকালেন তাতে আপনার ও আপনার জাতির মধ্যে আশা-আকাঙ্ক্ষার কতটুকু প্রতিফলন ঘটল, কি আপনার প্রাপ্তি , কেনই বা করছেন পড়ালেখা?  দুঃখজনক হলেও সত্য- কেউ ভবিষ্যৎ এ ভালো থাকতে চায়, কেউ বিসিএস ক্যাডার হতে চায়, কেউ নামিদামি একটি চাকুরী করে সমাজে লোকের কাছে সম্মান পেতে চায়। অথচ একজনও আমাকে বলল না, আমি মানুষের মতো মানুষ হতে চাই, সুনাগরিক হতে চাই। তাহলে আমরা দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নামিদামি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাপাঠ চুকিয়ে গ্রাজুয়েট হয়ে কি এমন শিক্ষা অর্জন করছি যা আমাদের ভালো রেজাল্ট কিংবা সরকারি চাকুরীর পিছনে ছুঁটতে বাধ্য করে?

আজ আমাদের শিক্ষা অর্জন শুধুমাত্র ভালো রেজাল্ট কিংবা চাকুরী ভিত্তিক হয়ে গেছে। হবেই বা না কেন? আমাদের সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের শিক্ষাকে ভালো রেজাল্ট ও চাকুরীভিত্তিক করে দিয়েছে। আমাদের সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ তাকেই মূল্যায়ন করে যে শিক্ষার্থী পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পায় কিংবা যে একটি ভাল চাকুরী করে। যে শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ কিংবা ভাল একটি চাকুরী পায় না তাকে আমরা কখনো মূল্যায়ন করতে চাই না। তার ভীতরের অন্তর্নিহিত সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ দিতে চাই না। তাই একজন শিক্ষার্থী মনেপ্রাণে ধারণ ও লালন করে আমি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ ও একটি ভাল চাকুরীর জন্যই পড়ালেখা করছি।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যে এখনো সৃজনশীলতার আঁড়ালে গৎবাধা মুখস্থভিত্তিক বা পুস্তকভিত্তিক তাত্ত্বিক শিক্ষাপদ্ধতি রয়ে গেছে তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো- মাধ্যমিক পর্যায়ে যখন একটি শিক্ষার্থীকে ‘তোমার জীবনের লক্ষ কি’? রচনা লিখতে বলা হয়; তখন যথারীতি পরীক্ষার খাতায় সবাই পুস্তকের পাতার সেই  বাণীগুলো লিখে যে- কেউ ডাক্তার হতে চায়, কেউ ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়, কেউ পুলিশ হতে চায়, কেউ শিক্ষক হতে চায় এবং কেউ পাইলট হতে চায়। কিন্তু বাস্তবে কতজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পুলিশ, শিক্ষক বা পাইলট হতে পারছে ? এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়, যেটি নিত্য নতুন জ্ঞান অর্জন ও গবেষণা দ্বারা নতুনত্ব উদ্ভাবনীর একটি প্লাটফর্ম সেখানেও যুগের পর যুগ ধরে ভাল সিজিপিএ’র টানে ও ভাল একটি চাকুরীর আশায় আমরা পুস্তকের পাতা মুখস্থ করে চলছি। এটা কি সৃজনশীলতার ধ্বংসস্তূপ নয় মাত্র?

ইউজিসির ওয়েবসাইট অনুযায়ী- বর্তমানে দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৪৬ টি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১০৬ এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ০৩ টি। সরকারি পর্যায়ে মেডিকেল কলেজ ৩০ টি, বেসরকারি পর্যায়ে আছে ৬৫ টি। এই পরিসংখ্যান থেকে খুব সহজেই শিক্ষাক্ষেত্রের দৃশ্যমান অগ্রগতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রের এই অগ্রগতি কি আদৌ সুনাগরিকতা এবং দক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তির আওতাভুক্ত হচ্ছে? শিক্ষাব্যবস্থার ভালো রেজাল্ট কি আদৌ তাদের কর্মসংস্থান দিতে পারছে? শিক্ষাব্যবস্থার এই দৃঢ়মান অগ্রগতি দিয়ে আজ কি হবে; যেখানে নৈতিক ও মূল্যবোধের শিক্ষা না পেয়ে বড় বড় নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একজন শিক্ষার্থী গ্রাজুয়েট চুকিয়ে কর্মজীবনে আকাশচুম্বী দুর্নীতিতে লিপ্ত থাকে। পৃথিবীতে যত সুশৃঙ্খল ও উন্নত জাতি রয়েছে তারা শিক্ষার মাধ্যমেই এতদূর এসেছে। কিন্তু যে শিক্ষা সুশিক্ষা, মনুষ্যত্ব, নিষ্ঠা,  মানুষের মতো মানুষ হওয়া ও সুনাগরিকতার শিক্ষা না দিয়ে জিপিএ-৫ ও চাকুরীভিত্তিক শিক্ষা দিচ্ছে, কাগজেকলমে সে শিক্ষার কি দরকার?

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ যদি হয় একজন সুনাগরিক তৈরি করা, একজন সুশিক্ষিত মানুষ গড়ে তোলা তবে এ সমাজ ও অভিভাবকবৃন্দ জানবে তাদের সন্তান জিপিএ-৫ কিংবা চাকুরীর জন্য নয় বরং মানুষের মতো মানুষ ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠার জন্য শিক্ষা গ্রহণ করছে। একজন শিক্ষক জানবে, সে ছাত্রদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার নৈতিক দায়িত্ব পালন করছে। আমাদের জাতীয় লক্ষ হতে হবে- তথাকথিত শিক্ষিত গড়ে না তুলে রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতাসম্পন্ন জনবল তৈরি করা। শিক্ষার মানদন্ড- জিপিএ-৫, ভালো সিজিপিএ কিংবা চাকুরী নয় বরং সততা, নিষ্ঠা, আদর্শ, ন্যায়পরায়ণ ও দেশপ্রেমের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর এবং সুনাগরিকতার শিক্ষায় তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে জাতীয় উন্নয়ন হোক এদেশের শিক্ষাব্যবস্থার  প্রধান লক্ষ-উদ্দেশ্য । দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে এই জাতীয় লক্ষ-উদ্দেশ্য হাসিলের প্রশিক্ষণকেন্দ্র রূপে গড়ে তুলতে হবে। তবেই এদেশ থেকে তথাকথিত শিক্ষিত’র বিলুপ্তি ঘটে দক্ষতা ও মনুষ্যত্ববোধ সম্পন্ন মানুষ তৈরিসহ দেশের টেকসই উন্নতি ও আত্মমর্যাদার সাথে  বিশ্বের দরবারে আমাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখাবে।

লেখক- মোহম্মদ শাহিন
শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পড়ালেখার উদ্দেশ্য কি চাকুরী জোগাড় মাত্র?
                                  

পত্রিকার খবরে চোখ বুলুতেই দেখলাম বেশ বড় করে হেডলাইন ছাঁপা হয়েছে- রাবি শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা। পুরো ঘটনা শেষ করে বুঝতে পারলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞানের মনিরুল ইসলাম নামের এক শিক্ষার্থীর গত জানুয়ারিতে সরকারি চাকুরির বয়স শেষ হয়ে যায়। এরপর থেকেই প্রচন্ড হতাশায় ভুগতিছিলেন তিনি।  অতঃপর সেই দীর্ঘকায় হতাশা থেকেই আত্মহত্যা।

শিক্ষাকে বলা হয় মানবজীবনের এক অমূল্য সম্পদ। কেননা, সামগ্রিকভাবে একজন মানুষের বিকশিত হতে যেসব অপরিহার্য উপকরণ প্রয়োজন, তন্মধ্যে শিক্ষার স্থান সর্বাগ্রে। শিক্ষা মানুষের অন্তর্নিহিত সুপ্ত প্রতিভাকে উন্মোচিত করে আনার এক অনিবার্য উপায়। দার্শনিক কান্ট বলেছেন- আদর্শ মনুষ্যত্ব অজর্নই শিক্ষা। হাবার্ট রিড বলেছেন- মানুষকে মানুষ করাই হল শিক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া পঞ্চাশ জনেরও অধিক শিক্ষার্থীকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম- এই যে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আপনি বই এর পাতা চুকালেন তাতে আপনার ও আপনার জাতির মধ্যে আশা-আকাঙ্ক্ষার কতটুকু প্রতিফলন ঘটল, কি আপনার প্রাপ্তি , কেনই বা করছেন পড়ালেখা?  দুঃখজনক হলেও সত্য- কেউ ভবিষ্যৎ এ ভালো থাকতে চায়, কেউ বিসিএস ক্যাডার হতে চায়, কেউ নামিদামি একটি চাকুরী করে সমাজে লোকের কাছে সম্মান পেতে চায়। অথচ একজনও আমাকে বলল না, আমি মানুষের মতো মানুষ হতে চাই, সুনাগরিক হতে চাই। তাহলে আমরা দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নামিদামি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাপাঠ চুকিয়ে গ্রাজুয়েট হয়ে কি এমন শিক্ষা অর্জন করছি যা আমাদের ভালো রেজাল্ট কিংবা সরকারি চাকুরীর পিছনে ছুঁটতে বাধ্য করে?

আজ আমাদের শিক্ষা অর্জন শুধুমাত্র ভালো রেজাল্ট কিংবা চাকুরী ভিত্তিক হয়ে গেছে। হবেই বা না কেন? আমাদের সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের শিক্ষাকে ভালো রেজাল্ট ও চাকুরীভিত্তিক করে দিয়েছে। আমাদের সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ তাকেই মূল্যায়ন করে যে শিক্ষার্থী পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পায় কিংবা যে একটি ভাল চাকুরী করে। যে শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ কিংবা ভাল একটি চাকুরী পায় না তাকে আমরা কখনো মূল্যায়ন করতে চাই না। তার ভীতরের অন্তর্নিহিত সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ দিতে চাই না। তাই একজন শিক্ষার্থী মনেপ্রাণে ধারণ ও লালন করে আমি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ ও একটি ভাল চাকুরীর জন্যই পড়ালেখা করছি।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যে এখনো সৃজনশীলতার আঁড়ালে গৎবাধা মুখস্থভিত্তিক বা পুস্তকভিত্তিক তাত্ত্বিক শিক্ষাপদ্ধতি রয়ে গেছে তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো- মাধ্যমিক পর্যায়ে যখন একটি শিক্ষার্থীকে ‘তোমার জীবনের লক্ষ কি’? রচনা লিখতে বলা হয়; তখন যথারীতি পরীক্ষার খাতায় সবাই পুস্তকের পাতার সেই  বাণীগুলো লিখে যে- কেউ ডাক্তার হতে চায়, কেউ ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়, কেউ পুলিশ হতে চায়, কেউ শিক্ষক হতে চায় এবং কেউ পাইলট হতে চায়। কিন্তু বাস্তবে কতজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পুলিশ, শিক্ষক বা পাইলট হতে পারছে ? এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়, যেটি নিত্য নতুন জ্ঞান অর্জন ও গবেষণা দ্বারা নতুনত্ব উদ্ভাবনীর একটি প্লাটফর্ম সেখানেও যুগের পর যুগ ধরে ভাল সিজিপিএ’র টানে ও ভাল একটি চাকুরীর আশায় আমরা পুস্তকের পাতা মুখস্থ করে চলছি। এটা কি সৃজনশীলতার ধ্বংসস্তূপ নয় মাত্র?

ইউজিসির ওয়েবসাইট অনুযায়ী- বর্তমানে দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৪৬ টি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১০৬ এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ০৩ টি। সরকারি পর্যায়ে মেডিকেল কলেজ ৩০ টি, বেসরকারি পর্যায়ে আছে ৬৫ টি। এই পরিসংখ্যান থেকে খুব সহজেই শিক্ষাক্ষেত্রের দৃশ্যমান অগ্রগতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রের এই অগ্রগতি কি আদৌ সুনাগরিকতা এবং দক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তির আওতাভুক্ত হচ্ছে? শিক্ষাব্যবস্থার ভালো রেজাল্ট কি আদৌ তাদের কর্মসংস্থান দিতে পারছে? শিক্ষাব্যবস্থার এই দৃঢ়মান অগ্রগতি দিয়ে আজ কি হবে; যেখানে নৈতিক ও মূল্যবোধের শিক্ষা না পেয়ে বড় বড় নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একজন শিক্ষার্থী গ্রাজুয়েট চুকিয়ে কর্মজীবনে আকাশচুম্বী দুর্নীতিতে লিপ্ত থাকে। পৃথিবীতে যত সুশৃঙ্খল ও উন্নত জাতি রয়েছে তারা শিক্ষার মাধ্যমেই এতদূর এসেছে। কিন্তু যে শিক্ষা সুশিক্ষা, মনুষ্যত্ব, নিষ্ঠা,  মানুষের মতো মানুষ হওয়া ও সুনাগরিকতার শিক্ষা না দিয়ে জিপিএ-৫ ও চাকুরীভিত্তিক শিক্ষা দিচ্ছে, কাগজেকলমে সে শিক্ষার কি দরকার?

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ যদি হয় একজন সুনাগরিক তৈরি করা, একজন সুশিক্ষিত মানুষ গড়ে তোলা তবে এ সমাজ ও অভিভাবকবৃন্দ জানবে তাদের সন্তান জিপিএ-৫ কিংবা চাকুরীর জন্য নয় বরং মানুষের মতো মানুষ ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠার জন্য শিক্ষা গ্রহণ করছে। একজন শিক্ষক জানবে, সে ছাত্রদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার নৈতিক দায়িত্ব পালন করছে। আমাদের জাতীয় লক্ষ হতে হবে- তথাকথিত শিক্ষিত গড়ে না তুলে রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতাসম্পন্ন জনবল তৈরি করা। শিক্ষার মানদন্ড- জিপিএ-৫, ভালো সিজিপিএ কিংবা চাকুরী নয় বরং সততা, নিষ্ঠা, আদর্শ, ন্যায়পরায়ণ ও দেশপ্রেমের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর এবং সুনাগরিকতার শিক্ষায় তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে জাতীয় উন্নয়ন হোক এদেশের শিক্ষাব্যবস্থার  প্রধান লক্ষ-উদ্দেশ্য । দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে এই জাতীয় লক্ষ-উদ্দেশ্য হাসিলের প্রশিক্ষণকেন্দ্র রূপে গড়ে তুলতে হবে। তবেই এদেশ থেকে তথাকথিত শিক্ষিত’র বিলুপ্তি ঘটে দক্ষতা ও মনুষ্যত্ববোধ সম্পন্ন মানুষ তৈরিসহ দেশের টেকসই উন্নতি ও আত্মমর্যাদার সাথে  বিশ্বের দরবারে আমাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখাবে।

লেখক- মোহম্মদ শাহিন
শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

গল্পের মধ্যে গল্প
                                  

মোমেনা আক্তার

পাশাপাশি বেঞ্চে আমরা, আমি আর সুভা। সুভা খুব ভালো বন্ধু হলেও আমার খুব হিংসে হতো, কারণ ক্লাসে নম্বর পাওয়াতে সে ছিল একমাত্র আমার প্রতিদ্বন্দ্বী। এক-দু নম্বর কম পেলেই কান্না শুরু করে দিতো। আমি অবশ্য কান্না করতাম না, মনে মনে জেদ চাপতাম পরেরবার আরও বেশি পেতে হবে। এমনি ছিলো আমাদের ছোটবেলার দিনগুলো। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কেজি স্কুলে পড়ে আমি ভর্তি হই হাই স্কুলে আর ও ভর্তি হয় গার্লস স্কুলে। স্কুলের মধ্যে দুরত্ববেশি না হলেও সেই আগের মতো আর দেখা হয় না। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রায় ৩ বছর পর হঠাৎ ওর সাথে দেখা, একই স্যারের কাছে গণিত প্রাইভেট পড়তাম। বললাম,‘ওমা! সুভা নাকি? তোমাকে তো চেনাই যাচ্ছে না, বড় হয়ে গেছো!’

মনে হয়, আমার কথাতে বেশ লজ্জা পেয়েছে। কোনো জবাব না দিয়ে একটা মুচকি হাসি দিয়ে চলে গেল। পরদিন আবার দেখা, এখন কিছু না বলে আড় চোখে স্যারকে ফাঁকি দিয়ে ওকে দেখতাম। সুভা বেশ মনোযোগ দিয়ে অংক বুঝে নিচ্ছে চোখ পড়তেই আমি স্যারের দিকে তাকাই আর ভাবি, যে মানুষ ক্লাসে কথায় খই ফুটাতো, আজ এত নিশ্চুপ। এই সুভাকে এতদিন ভুলে গিয়েছিলাম! প্রাইভেট শেষে ও ডাকলো, ‘শুনেন, কেমন আছেন?’ নিচু গলায় বলে।

-সুভা, তোমার সাথে তো গতকাল কথা বলতে চেয়েছিলাম, কথা বললে না।
-না, আমি এমনিতেই ছেলেদের সাথে কম কথা বলি, হঠাৎ করে দেখছি তো চমকে গিয়েছিলাম।

ওমা! এ কেমন কথা! ৫ বছর একসাথে থাকলাম, আরও কত কথা কাটাকাটি হয়েছে, হয়েছে রাগ অভিমান। তুমি ছেড়ে তুই বলেছি আমরা। আর এখন ও বলে আপনি! আমি এত অচেনা হয়ে গেলাম? নাহ্, আমি ঠিক আছি, সুভা একদম পরিবর্তন হয়ে গেছে। সেদিন বেশি কিছু বলা হয় নি, তাড়া দেখিয়ে চলে যায় ও। সে যাক গে, আমি এত ওকে নিয়ে ভাবছি কেন! ও থাকুক ওর মতো। প্রাইভেটে একটু একটু করে কথা হয় আমাদের। কয়েকদিন পর অনেকবার বলে আপনি থেকে তুমিতে নেমেছে। পড়াশোনার তেজ আগের মতোই আছে কিন্তু বান্ধবী আর ছেলের মধ্যে আমি ছাড়া আর কারও সাথে কথা বলতে দেখি না। যাক, এটাও ভালো।

আজকালের ছেলেমেয়েরা যে দুষ্টু, কোনো ফাঁদে না পড়ার জন্যে এমন থাকাই ভালো। আমিও দরকার না হলে কথা বলি না, কিন্তু ও আর পিছিয়ে গেলো না। আমাদের বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হতে লাগলো। অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষায় সুভা ট্যালেন্টপুল আর আমি সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পাই। ওর প্রতি হিংসাটা যেমন বাড়লো, ভালো লাগাটাও কম ছিলো না। নবম শ্রেণিতে ওকে আমাদের স্কুলে ভর্তি হতে বলি, কিন্তু ওর আর ওখানে থাকা হলো না। ওর বড় ভাই ঢাকায় থাকে, ওকে ঢাকায় ভর্তি করে দিবে। শুনে খুবই খারাপ লাগে, কি যেন হারিয়ে ফেললাম! কিছু করার নেই। ঠেকাতে পারবো না তো।

আবার ৭ বছর পর দেখা সুভার সাথে! এবার সুভাই আমাকে চিনে ফেলেছে, ‘মাহমুদ তুমি এখানে! কবে আসছো? অনেকদিন পর দেখা।’ এবার আবাক হই আরও বেশি। ওর মধ্যে অকল্পনীয় পরিবর্তন, কথা বলছিলাম না দেখে আবার বললো, ‘মাহমুদ, আমাকে চিনছো? আমি সুভা।’

-ওহ্, সুভা! আমি তো আনেক আগে এসেছি, এখানেই পড়ি। হিস্টোরি থার্ড ইয়ার। তোমার খবর কী, বলো? তুমি এখানে!
তুমি ঢাবিতে পড়! আমিও তো, বিবিএ ফিন্যান্স থার্ড ইয়ার। আমার ভাই থাকে মোহম্মদপুরে ওখানেই থাকি। বাহ্, আমরা একই ইউনিভার্সিটিতে পড়ি, তাও কতদিন পর দেখা!

টিএসসিতে বসে চা খেতে খেতে আরও কিছুক্ষণ গল্প করলাম। আমি যতই ওকে দেখি, ততই মুগ্ধ হই। এক সুভার এত বৈচিত্র্য! সময় আর পরিবেশ মানুষকে কী না করতে পারে? মাঝে মাঝে ক্যাম্পাসে দেখা হয়ে যায়। সময় মিললে কখনও বা ওকে নিয়ে ঘুরতে যাই শহীদ মিনার বা পুরান ঢাকার ওদিকে। পুরান ঢাকার বিরিয়ানি খাওয়াতো সে, আর গল্প করতো, নানান রং-বেরং এর গল্প, তার গল্পের চেয়ে গল্প বলার ধরণ ছিলো খুবই আকর্ষণীয়। যে কেউকে মুগ্ধ করতো। গান গাইতো, আবৃত্তি, অভিনয়, উপস্থাপনা; এতকিছু সে কবে শিখলো!

সাবেক রুমমেট বড় ভাই ফরেন ক্যাডার হলেন। উনার মতো ক্যাডার হতেই হবে। উনার অনেক কষ্টের গল্প শুনেছি। পড়া ছাড়া কিছু বুঝেন না। আজ থেকে উনার মতো করে এগোবো আর সুভাকে ভালোবাসার কথাটা বলে ফেলবো। আমি জানি, ও আমাকে পছন্দ করে, তা না হলে এত ছেলে বাদ দিয়ে আমাকে এত সময় দিবে কেন! তাছাড়া ও আমাকে ছোটবেলা থেকেই চিনে। নিশ্চয় আমাকে নিয়ে ভাবে। ওকে নিয়ে আমার অন্যরকম অনুভূতি হয়।

ফরেন ক্যাডার ভাই এর বিয়ে ঠিক হলো। হ্যাঁ, আমিও ওমন ক্যাডার হয়ে সুভাকে বিয়ে করে ফেলবো। ভাবতে ভাবতেই সুভার ফোন কল, ‘কী করো? একটা সুখবর আছে।’

-কী সুখবর? শুনো,আজ বিকেলে ক্যাম্পাসে আসো কথা আছে।
-না, আজ পারবো না। শুনো, পরশু দিন আমার বিয়ে কেনা-কাটা, ঝায়-ঝামেলা আছে অনেক, তোমাকে আসতে হবে কালকে। ছেলে ফরেন ক্যাডার, ঢাবির স্টুডেন্ট, বিবিএ, এমবিএ করেছে। ভাই সময় নিচ্ছে না। তুমি কাল সকাল ৯ টায় চলে আসো...।
মনের অজান্তে বলে ফেললাম, ‘আলহামদুলিল্লাহ। হ্যাঁ, যাবো।’

আমার রুমমেট ভাই এর বিয়ে যেতে তো হবেই। রুমের সবাইকে দাওয়াত দিয়ে গেলেন।
দেখি, এ জীবন আরও কতদূর যায়, চলুক জীবন জীবনের মতো।

লেখক : শিক্ষার্থী-শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

স্বাধীন বাংলা/এআর

গল্প : সুখ
                                  

পলি তালুকদার

মায়ের যখন ৩য় বিয়ে হয় তখন আমার বয়স ১৬ বছর। আমি আমার মাকে ছোট থেকেই খুব ভালবাসতাম, কিন্তু কেন জানি না মায়ের এই ৩য় বারের বিয়েটা আমি মেনে নিতে পারিনি। এই ৩য় বারের বিয়ের জন্য আমি মা কে খুব ঘৃণা করতাম। তবে সেটা মনে মনে, মুখে খুব কমই তার প্রতিফলন হতো। এই দুনিয়াতে মা আর রাসেদ ছাড়া আমার আর কোন আপন লোক নেই। যে লোকটার সাথে মা ৩য়,বার বিয়ে করেন তার নাম রাসেদ! কেন জানি না এই লোকটাকে আমার বাবা বলে ডাকতে ইচ্ছে করে না।

আমি যখন মায়ের পেটে তখন আমার ১ম বাবা নাকি মারা যান! যদিও আমি সবটা ঠিকঠাক জানি না, কি করে বাবা মারা গেলেন। তবে লোকমুখে শুনেছি বাবা আর মা নাকি ভালবেসে বিয়ে করেছিল। পুরো ৫ বছর সম্পর্কের পর তারা গোপনে বিয়ে করেছিল, কারণটা ছিল বাবা বেকার আর দরিদ্র পরিবারের ছেলে তাই আমার নানা-নানী কেউ মায়ের সম্পর্কটা মেনে নিতে পারেন নি। মা নানার একমাত্র মেয়ে খুব আদরের ,তাদের আর্থিক অবস্থাও খুব ভাল। তাই মা আর বাবা পালিয়ে বিয়ে করে।

বিয়ের ঠিক ১ বছর পর আমি মায়ের গর্ভে আসি। শুনেছি মা যখন ৩ মাসের অন্তঃস্বত্তা, বাবা তখন কোন একটা কাজে আমাদের একা ফেলে চলে যায়, তারপর আর কখনো ফিরে আসেন নি। এর ঠিক ৫ মাস পর নাকি মায়ের কাছে খবর আসে যে বাবা বেঁচে নেই, যদিও মা বাবার মুখটাও শেষ বারের মতো দেখতে পায় নি। লোকমুখে শুনেছি খবরটা নাকি মিথ্যা ছিল। আমি কিংবা মা কথাটার সত্য মিথ্যা কতোটুকু আজও খুঁজে পাই নি, আর না তো বাবা কখনো আমাদের খোঁজ নিয়েছে।

আমার যখন ৩ বছর বয়স তখন মা ২য় বারের মতো বিয়ে করেন। যদিও এই বিয়েটা মা আমার জন্যই করেছিল। আমার ২য় বাবার নাম জাহেদ। উনি আমাকে খুব ভালবাসত। ছোট থেকে আমি ওনাকেই বাবা ডেকেছি। মা তাই আমার সুখের জন্য তাকে বিয়ে করে। আমার এই বাবাটা খুব ভাল ছিল, আমার আর আমার মায়ের খুব খেয়াল রাখত। মায়ের মুখে শুনেছি তিনি নাকি আমি মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় মা কে অনেক সাহায্য করেছিল। মা খুব অল্প বয়সে বিয়ে করেছিল। মায়ের যখন ১ম বিয়ে হয়, তখন মায়ের বয়স ১৭ বছর। আমাকে নিয়ে মায়ের কাজ করতে খুব কষ্ট হতো! তবুও জীবন বাঁচাতে মা ছোট্ট একটা চাকরি নেয়, তাতে আমাদের সংসার কোনরকম এ চলে যেত!

আমি নাকি ছোট বেলায় আমার ২য় বাবা কে, বাবা বলে ডাকতাম। সবচেয়ে বেশি শান্ত আমি তার কোলেই থাকতাম। আমাদের ছোট্ট সংসারটা ভালই চলছিল। আমার যখন ৫ বছর বয়স তখন আমার ছোট্ট একটা ভাই আসে। আমি তার নাম রেখেছিলাম ইফতি। ইভার ভাই ইফতি। কিন্তু আমাদের এই ছোট্ট পরিবারে এত সুখ বিধাতার সহ্য হয়নি। ইফতির যখন ৩ মাস বয়স তখন সে টাইফয়েডে মারা যায়!

ইফতির মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম আমি। আমার সেসব স্মৃতি খুব ভাল মনে নেই তবে ইফতির মুখটা আমার স্পষ্ট মনে আছে ওর সেই হাসিটা এখনো আমার চোখে ভাসে। ইফতিকে হারিয়ে পুরো পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এলো। হাসিখুসি ভরা পরিবারটা যেন মুহূর্তে কালো মেঘে ঢেকে গেল! ইফতির মৃত্যুর ঠিক ২ মাস পরে আমার ২য় বাবা ও একটা রাস্তা দূর্ঘটনায় মারা যান। বাবার মৃত্যুতে আমি পুরো স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। বাবার লাশটার সামনে এসে শুধু বাবাকে বলেছিলাম, ‘আমার আর চকলেট লাগবে না, তুমি ওঠো’ কিন্তু বাবা আর উঠল না। বাবা ও আমাদের ছেড়ে ইফতির কাছে চলে গিয়েছিল। বাবার মৃত্যুর পর বকবক করে পাগল করা এই আমিটা হয়ে যাই নিস্তব্ধ। সেই থেকে আমি চুপচাপ স্বভাবের হয়ে যাই!

এরপর আমাদের সংসারটা মায়ের বাসা বাড়িতে কাজের টাকা দিয়ে কোনরকমে চলে যায়! কখনো ৩ বেলা বা কখনো ২ বেলা খেয়ে দিন কাটাতাম। বাবার রেখে যাওয়া শেষ সম্বলটুকোও হারিয়ে ফেললাম আমার পড়াশোনার খরচ বহন করতে গিয়ে। শেষ পর্যন্ত আমার পড়াশোনা বন্ধ হবার উপক্রম। মা কে একবার বলেছিলাম নানাকে জানাতে। মা না করে দিয়েছিল, ২য় বার আমি আর মা কে এ ব্যাপারে কিছু জিঙ্গেস করিনি। আমি যখন উচ্চ মাধ্যমিকে উঠব তখন ভর্তির টাকাটাও ছিল না। মা কে বললাম থাক আর পড়াশোনা করব না। মা বলেছিল তোকে আমার মতো হতভাগী হতে দেব না, দরকার হলে কিডনি বিক্রি করব। তবে মা কে তা করতে হয় নি, রাসেদ সাহেব মা কে আমার ভর্তির টাকাটা দেন। তা দিয়েই আমি ভর্তি হই।

অনেক টাকার মালিক রাসেদ সাহেব কেন জানি না মাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। রাসেদ সাহেবের কোন সন্তান নেই, স্ত্রী গত হয়েছেন ৩ বছর হলো। মা আমাকে এসে বলল, ‘রাসেদ সাহেব আমাকে বিয়ে করতে চায়, তোকেও মেয়ে বলে মেনে নেবে, কি করব?’ কথাটা বলতে গিয়ে মায়ের মুখটা লজ্জায় নিঁচু হয়ে গেল। আমি দেখলাম মায়ের, দু’গাল বেয়ে অঝরে পানি পড়ছে। আমি বললাম, ‘বিয়েটা করো’। মা আমার দিকে একবার তাকিয়ে দৌড়ে ঘরে গিয়ে দরজা দিয়ে দিল। আমি বাইরে থেকে মায়ের কান্নার আওয়াজ পেলাম। আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজের কাজে চলে গেলাম।

৩য় বার বিয়ের পর আমি মাকে কখনো আমার সামনে মাথা উঁচু করে কথা বলতে দেখিনি। যদিও রাসেদ সাহেব আমাকে যথেষ্ট ভালবাসেন তবুও লোকটাকে বাবা বলে মেনে নিতে পারি নি। আমি যখন ঘুমিয়ে থাকি তখন মা আমার পায়ের কাছে এসে রোজ রাতে কাঁদে! আমি টের পাই কিন্তু কিছু বলিনা। আমি জানি মা এই বিয়েটা করেছে আমাকে ভাল রাখতে তবুও, না আমি আর না তো মা সুখে আছি। আমরা হয়তো ভাল আছি তবে সুখে নেই। রোজ রাতে আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি আর ভাবি, ‘সুখটা কি জিনিস? কোথায় থাকে? সবার জন্য কি সুখটা নয়?’ উত্তর মেলে না। এক বুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আবার চলে আসি একটু সুখের আশায়!

স্বাধীন বাংলা/এআর

আজ আমার রাতের খাবার নেই
                                  

ধ্রুব খান 

আমি আসলে মাঝে মাঝে বুঝে উঠতে পারিনা। তারা কি আসলেই আমার কথা বোঝে নাকি যা হয় তা একটি ভ্রম অথবা আমার মনের সাথে মিলে যায়। আমি যখন মনে মনে ভাবি মা টা এখন সাবান এর উপর বসবে তখন কিভাবে যেনো আসলেই সাবানের উপর বসে। আবার যখন ভাবি বাচ্চাটা এখন আমার নখের কাছে আসবে। আসলেই এসে পরে। এর কারণ কি! টেলিপ্যাথি নাকি। ওদের তো নিজেস্ব কোনো ভাষা নেই। নিশ্চয়ই তারা নিজেরা টেলিপ্যাথির মাধ্যমে কথা বলে। আচ্ছা আমার মাথায় এখন যা ঘুরছে তা কি তারা বুঝতে পারছে! বাবাটা কেমন তাজ্জ্বব হয়ে তাকিয়ে আছে। তারা কি বুঝে ফেলেছে আমি একটা খুন করতে চাই। খুব সুন্দর একটা খুন। সেই খুনেও যেনো সৌন্দর্য ফুটে উঠে। তারা কি আমাকে পিশাচ মনে করছে!

বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখলাম আনিশা দাঁড়িয়ে আছে। হাতে প্লেট। প্লেটে দুটো পোড়া পরটা। সাথে একটু ভাজি যার দুটো আলু প্রায় সাদা হয়ে গেছে।
- মুগ্ধ ভাইয়া দয়া করে রুম টা একটু গুছিয়ে রাখবেন।
- কেনো রে, এই রুমে কি তোর বাসর হবে?
- বাজে কথা বলবেন না।
- রসিকতা করলাম। ছাদের চিলেকোঠায় কেনো কারো বাসর হবে।
- হলে হবে। আমার বাবার বাসা। আমি যদি খোলা ছাদে বাসর করতে চাই, কারো কোনো সমস্যা থাকার কথা না।

- খোলা ছাদে না হয় হাত ধরে হাটতে পারবি। বাসর চাইলে এই চিলেকোঠায় করতে পারিস।
- তার মানে, আপনি এই বাসা আগামী চার বছরেও ছাড়ছেন না। শুনেন মুগ্ধ ভাইয়া, আমারা একটি সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার। আমাদের নুন আনতে পান্তার পানি শুকিয়ে যায়। তার উপর একটা বেকার ছেলেকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানো আমার বাবার পক্ষে সম্ভব না। আমার বাবা চিলেকোঠা রেখেছে আমি যাতে মাঝে মাঝে এখানে এসে বই পড়তে পারি। জানালার কাছে বসে চা খেতে খেতে গান গাইতে পারি। সেখানে সেই চিলেকোঠায় এখন বাস করছে এক গবেট। বাবাকে হয়ত একটা সময়ে আপনারা অনেক সাহায্য করেছেন। তাই বলে এভাবে আপনাকে কেনো পালবে আমার বাবা!
- বুঝলাম।
- কি ?
- যে তুই নেক্সট চার বছরে বিয়ে করবি না।
- মুগ্ধ ভাই আপনার কি এই ছাঁদ থেকে কখনো লাফ দিয়ে মরতে ইচ্ছে করে না?
- করে কিন্তু সাহসে কুলায় না।
- আমাকে বলবেন, আমি ধাক্কা দিয়ে দিবো। শহীদি মৃত্যু হবে। আর ওভাবে আমার দিকে তাকাবেন না। আমার চোখ এমন কোনো ইন্দ্রানির চোখ না যে হা করে তাকিয়ে থাকতে হবে। গেলাম।

এই মেয়েটাকে কেনো যেনো রাগলে একদমই সুন্দর লাগেনা। আর মেয়েদের নাকি অদৃশ্য চোখ থাকে। আনিশার তো দৃশ্যমান দু’চোখেই সমস্যা। আমি তাকিয়ে ছিলাম তার ডান কাধের উপর দিয়ে ফেলে রাখা বেণির দিকে। ইশশ, আরো কিছুক্ষন সামনে থাকলে ভালো হতো। কেনো যে আমি বাক্যালাপ দীর্ঘস্থায়ী করতে পারিনা। অসহ্য। কালো মেয়েদের অনেক অদ্ভুদ সব ব্যাপারে সুন্দর লাগে। চুপচুপা তেল দিয়ে বেণী করা একটা মেয়েকে যে সুন্দর লাগতে পারে তা আমার জানা ছিলো না। সামনে যতক্ষন ছিলো ততক্ষন কল্পনার জগতে ভালোই ডুবে ছিলাম। সেই জগতে দেখলাম আনিশা রান্না করছে।

আমি পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে তার বেণীতে নাক দিয়ে ঘসা দিলাম। সে বললো, বেণী সরিয়ে ঘারে নাক ঘষতে। এরপরের ব্যাপার গুলো সেসময় ভাবতে ভালো লেগেছিলো এখন লজ্জা লাগছে। এখন বাজে দশ টা দশ। জাহিনের আসার কথা ছিলো দশটায়। হয়ত নিচে দাঁড়িয়ে আছে। চা যেহেতু দিলো না এখনো চা টা বাইরে থেকে খেয়ে নিতে হবে। আনিশা মনে হয় দেখেছে জানালার কাছে চায়ের কাপে কালকের চা রয়ে গেছে। কিন্তু সেই চা তো খাওয়া যাবেনা। সেই চা তো এক জোড়া চড়ুই পাখির যারা প্রতিদিন সকালে এসে চুক চুক করে খেয়ে যায়। তবে আজ এলোনা কেন?

জাহীন একটার পর একটা সিগারেট খেয়ে চলছে। গাড়ীতে নাকি তার বসলেই দম বন্ধ হয়ে আসে। শ্বাস নিতে পারলেও, ছাড়তে পারেনা। তখন এই সিগারেটের ধোয়ার মাধ্যমে শ্বাস ছাড়ে। আমার হাতে একটা পলিথিনে সেই পরোটা আর ভাজী। আমি দূরে সেই পরোটা ছুড়ে দিলাম। লুকিং গ্লাসে দেখলাম একটি কুকুর তার গন্ধ শুঁকছে। হঠাৎ জাহীন জিজ্ঞেস করলো।

- কিরে, আজো সেই স্বপ্ন দেখেছিস নাকি!
- দেখেছি।
-শুন, আমার একজন চেনা সাইক্রেটিক্স আছে। তার কাছে আজ তোকে নিয়ে যাবো। তুই তোর স্বপ্নের কথা কাউকে বলতে চাস না তাকেও বলার দরকার নেই। সাইক্রেটিক্সদের অনেক সময় কিছু না বললেও সমাধান দিতে পারে।
- আচ্ছা জাহীন, একটা মেয়ের বেণী নিয়ে কি সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসী তৈরী হওয়া সম্ভব?
- সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসী জিনিসটা অনেক বেশি জটিল। ধর, একটা দুই বেণী করা নর্তকী যার বেণিতে সবুজ রঙের ফিতা বাঁধা। সে তোর ঘরে তোর সামনে নগ্ন হয়ে নাচ দেখালো, তোর কাছে ব্যাপারটা খুব সাধারণ মনে হবে, বাজেও লাগতে পারে। কিন্তু সেই মেয়ে যদি পূর্ণিমায় চাঁদের আলোতে তোর সামনে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। তোর কাছ মনে হবে সেই সবুজ রঙ্গের ফিতাটা তোকে আরও বেশি টানছে।
- তোর দম আটকে যাচ্ছে।
- সিগারেট শেষ। কিনতে হবে। চল আগে বাসায় যাই। চা খেয়ে নিস।
- ঠিক আছে।
- বাসায় গাঁজা রোল করা আছে। গাঁজা খেয়ে কথা বলতে সুবিধা হবে।

- লোকটার নাম কি?
- রফিক জামান।
আমি জাহীনদের বাসার বারান্দায় বসে আছি। জাহীন এখনো ঘরের থেকে বের হচ্ছে না। চায়ের নামে এদিকে হুলুস্থুল কান্ড চলছে। যারিশা প্রথমে নিয়ে এসেছে পাউরুটি জেলী। এখন আবার নিয়ে এসেছে পনির। বেলের সরবত। আমি একে একে সব খাওয়া শেষ করলাম। সবশেষে চা নিয়ে এসে সামনে বসলো। যখন আসলাম তখন দেখেছিলাম যারিশা একটা সেলোয়ার কামিজ পরা। কখন জানি শাড়ি পরে এসেছে।
- মুগ্ধ ভাইয়া, আপনারা দু’জন কি আর জীবনেও চাকরি করবেন না?
- নারে, আমাদের ভাগ্যে ওসব নেই।
- বাবা প্যারালাইজড হওয়ার পর অনেকবার তাকে ব্যবসাটা দেখাশোনা করতে বলা হয়েছে, এখন তো বাবা ধরেই নিয়েছে আমার জামাইয়ের হাতেই ব্যবসা তুলে দিতে হবে।
- ভালো তো।

- যদি আপনার মতো স্বামী পাই, তাহলে তো ভালোই।
- কেনো?
- আপনি তো আর ব্যবসা নিজের নামে করে নিবেন না। দেখা যাবে ভাইয়াকেই বুঝিয়ে দুজন মিলে ব্যবসা দেখছেন। সুখী পরিবার।
- আমি যে নিজের নামে লিখবো না তা তোকে কে বললো?
- আপনার নাক। আপনি খাওয়ার আগে কখনো খাবার শুকে খান না। এধরণের মানুষ লোভী হয় না।
- ভালো খাবার অনেকদিন পর খেলে তা বাসি হলেও ভালো লাগে।
- যাই হোক। ভাইয়ার একটি ডাইরি আছে। সেখানে তার কিছু সিক্রেট লিখে রাখে। আপনি কি তা জানেন?
- না। তুই সেই ডাইরি পড়েছিস?
- জ¦ী। কান্না পাচ্ছে খুব। ভুল হয়েছে পড়াটা।
- আসলেই, এখন যদি ও তোর কোনো সিক্রেট জানে।
- মেরেই ফেলবে হয়তো। আমিও ওর মতো ডাইরি লিখছি একটা গতকাল থেকে। কোনোদিন পড়ে ফেললে মেরে ফেলবে আমাকে।
- সাবধান।

- আপনি কি ভাইয়ার পরিচিত নিতু নামে কোনো মেয়েকে চিনেন?
- চিনি, ভার্সিটিতে আমাদের সিনিয়র এক আপু।
- সেই মেয়ে নাকি ভাইয়াকে বলেছিলো, তার বুকে একটা তিল আছে সেই তিল নাকি ভাইয়াকে দেখাবে। কোনো এক জোছনায় বলে তাকে সেই তিল দেখাবে।
- মেয়েটা ভালো নাচ পারতো।
- ধুরু।
হঠাৎ জাহিন বের হয়ে আসলো। যারিশার কাছে যেয়ে গালে একটা থাপ্পড় দিলো।
- এখানে বসে বসে আমার বন্ধুকে শরীর দেখানো হচ্ছে?
যারিশা কাচুমাচু হয়ে বললো, “নাস্তা দিয়েছিলাম”
-ওড়না কোথায়?
- শাড়ির সাথে ওড়না কিভাবে পরবো?
- মানুষ শাড়ির সাথে চাদড় গায়ে দেয়। গরমকালে ওড়না গায়ে দিবি। শাড়ি পরার কারণটাই তো এখন ধরতে পারলাম। কি ভাবছিস, কমর দেখিয়ে শাড়ি পরলেই আমার বন্ধু তোর প্রেমে পরে যাবে! ভেতরে যা।

এরকম একটা পরিস্থিতির পর যারিশা হাসি মুখে আমাকে বললো, ভাইয়া, আবার আসবেন।
গাড়িতে বসে আমি আর জাহিন গাঁজা টানছি। মাথা টা হালকা ধরে এসেছে।
- বুঝলি মুগ্ধ, আমার না খুব ইচ্ছে খাগড়াছড়ির একটা পাহাড়ের মধ্যে কুঁড়ে ঘর বানিয়ে থাকি। সামনে থাকবে একটা ডাব গাছ সেটার নিচে থাকবে একটা মাচা। সামনের খালি জায়গায় জোছনার আলো পরবে সেই আলোতে নাচবে এক নর্তকী। কিন্তু ডাব গাছের ছায়ায় তো জোছনা ঢাকা পরে যাবে। কি করা যায় বলতো?

আমি অনেক চেষ্টা করেও জাহীনকে তার উত্তর দিতে পারলাম না। কারণ ততক্ষনে আমার মাথা পুরোপুরি আঁচল হয়ে গেছে যাকে বলে ব্ল্যাক আউট কিন্তু এর মাঝেও মাথায় একটা প্রশ্ন আসলো। পাহাড়ী অঞ্চলে ডাব গাছ হবে তো?
আমার সামনে যে লোকটা বসে আছে তার নাম সম্ভবত রফিক জামান। এতক্ষণ তার নাকটা অনেক বড় মনে হচ্ছিলো। পুরো মুখে শুধু নাকটাই দেখা যাচ্ছিল। এখন অবশ্য স্বাভাবিক লাগছে। কড়া এক কাপ চা খেতে দিয়েছেন। ধন্যবাদ জানানো উচিত কিন্তু স্যার বলবো নাকি বুঝতে পারছি না।
- তুমি কি এখন স্বাভাবিক?
- স্যার, আমি এতোদিন জানতাম দাঁড়ি হলে মানুষের বয়স বেড়ে যায়। আপনাকে তো খোঁচা দাঁড়িতে পয়ত্রিশ বছরের মনে হচ্ছে। আপনার বয়স নিশ্চয়ই এর থেকে বেশী।
- জ¦ী, পয়ঁতাল্লিশ।

- জ¦ী না, হ্যাঁ বলুন। তাহলে নিজেকে ছোট মনে হবে।
- তোমার বন্ধু বললো তোমার নাকি কিছু সমস্যা আছে।
- আমার বন্ধু! সেকি স্বাভাবিক ছিলো?
- হ্যাঁ, কারণ তুমি যা সেবন করেছো তা সে সেবন করেনি।
- হুম, বুঝলাম।
- তোমারা কি অনেক ভালো বন্ধু?
- জ¦ী, তবে আমার তাকে ভালো লাগে না।
- কেনো ?

- সে আমার অনেক ক্ষতি করেছে। আমি কেনো জানি তাকে কখনো কোনো কিছুতে না করতে পারিনি। মদ, গাঁজা। হঠাৎ একদিন এসে বলে,
“পড়াশুনা আর করবো না, শুধু হাটবো, ঘুরবো”। বিভিন্নভাবে আমাকে তাদের বাসায় নিয়ে যেতো।
- তাতে সমস্যা কোথায়?
- তার ছোট বোন। সে চায় তার ছোট বোনের সাথে আমি ঘনিষ্ঠ হই।
- এমনতো হতে পারে, ছেলে হিসেবে তার তোমাকে খুব পছন্দ তাই সে চায় তার বোনের সাথে তোমার বিয়ে হোক।
- তার বোনকে সে একদমই দেখতে পারে না।
- সে বলেছিলো, তুমি একটা স্বপ্ন দেখো যা তোমার স্বাভাবিক জীবনে প্রভাব ফেলছে।
-জ¦ী সাথে নিশ্চয়ই বলেছে আমি এই স্বপ্ন কখনো কাউকে বলতে পারবো না।
- বলেছে। শুনো, মাঝে মাঝে মানুষ তার নিজের সমস্যার সমধান নিজেই করে ফেলে। তুমিও কি কখনো নিজের সমস্যার সমাধান করতে পেরেছো?
- জ¦ী, একটি খুন করতে হবে।

- বুঝলাম, কবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছো?
- স্যার, আমি আমার বাথরুমে একটা তেলাপোকার পরিবার পালি। তিন সদস্য। বাবা তেলাপোকাটা আমাকে এই বুদ্ধি দিয়েছিলো। ভেবেছিল সিরিয়াসলি নিবো না, কিন্তু বুদ্ধিটা ভালো লেগেছে। খুশি হয়ে ওদের সন্তানের নাম দিয়েছি, “লালু”।
- লালু কে ?
- আমার মায়ের পালা গরু। এখন কোথায় আছে জানি না। মা মারা যাবার পর বিক্রি করে দিয়েছিলাম।
- তোমার মা কিভাবে মারা গেলেন?
- একদিন মা লালুকে খাবার দিতে যাচ্ছিলো। হঠাৎ কেনো জেনো লালু মাকে একটা লাথি দেয় পেটে। সেই সময় কিছু হয়নি। মা হেসে বলছিলেন, “আরে ওটুকু বাছুড়ের লাথিতে কি হয়!” সেদিন রাতে গা পুড়ে জ¦র আসলো। মায়ের সারা শরীরে কাঁথা ভিজিয়ে দেওয়া হলো, তাও জ¦র কমলো না। রাতে মারা গেলো।

- তোমার বাবা কি বেঁচে আছেন?
- না, তিনি মারা গেলেন মানষিক রোগে। কেনো জানি তার সবাইকে নিজের শত্রু মনে হতো। যে কাছে যেতো তাকেই মারতে আসতো। একা একাই থাকতেন। হঠাৎ একদিন আমাকে ডাক দিলেন। কাছে যেতেই বললেন,”মুগ্ধ, বলতো তোর মা কেন তার আদরের গরুর লাথিতে মারা গেলো! গরুটারে তো সে খুব আদর করতেন। তাও কেন সেই গরু তারে লাথি দিলো। কারণটা আজকে বলি, তোর মারে জ্বীন ধরছিলো। সে হয়ে গেছিলো একটা পিশাচ। গরুরা তো এসব বুঝে তাই তোর মারে লাথি দিছিলো। সেই জ্বীনটাই আমারে জ্বালায়। আমারে স্বপ্নে বলে, তোরা আমারে মাইরা ফেলবি। আজকে জ্বীনটা চলে গেছে। সবাইরে আপন মনে হইতেছে। আমারে এক গ্লাস ডাবের পানি খাওয়াতে পারবি?” আমি সেদিন রাতে বাবাকে ডাবের পানি খাওয়াই। সে খুব খুশি হয়। আমার জন্য দোয়া করে ঘুম দেয়। পরদিন সকালে মারা যায়।

- মানষিক রোগটার নাম Delusional disorder of persecutory.
- ধন্যবাদ।
- তুমি তো পড়াশুনা করোনা। থাকো কোথায়?
- মামার বাড়ির ছাদের চিলেকোঠায়।
- একটা বেকার ছেলেকে তিনি খাওয়াচ্ছে ?
- জ্বী স্যার, ছোটবেলায় যখন আমার বয়স পাঁচ বছর তখন হঠাৎ মামা কি রাজনৈতিক সমস্যায় পরে। পুলিশ তাকে খুজতে থাকে। তখন প্রায় সাত মাস তিনি আমাদের সাথে আমাদের বাড়িতে ছিলেন। রুম দুটো ছিলো। তিনি আমার সাথেই ঘুমিয়েছেন সাত মাস।
- তিনি এখন কি করেন?
- মামা এখন সাবেক কাউন্সিলর। ডেমরা এলাকার।
- সাবেক! এই অভাবের সংসারে একটা বেকার ছেলে পালছে। নিশ্চয়ই অনেক ভালো মানুষ।
- স্যার, আমি উঠি। আনিশা আমার জন্য অপেক্ষা করবে। দুপুরের খাবার দিতে আসবে।
- আনিশা কে? তোমার মামাতো বোন?
- জ¦ী, অসাধারণ রুপবতী একটি মেয়ে।

- তাকে তুমি পছন্দ করো?
- পছন্দ করি নাকি জানি না তবে দৈহিক আকর্ষণ অনুভব করি।
- সেটাও ভালোবাসার অংশ। দৈহিক আকর্ষণ একটা সম্পর্ক অনেকদিন টিকিয়ে রাখতে পারে যা ভালোবাসাও পারে না। ভালোবাসার চাহিদা কমে যায়, বিলীনও হয়। দৈহিক চাহিদা বিলীন হয় না।
- আসি স্যার। আবার আসবো।
- খুন সম্পন্ন করে?
আনিশা খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতের প্লেটে ভাত সাথে আছে ভেন্ডি ভাজি। ডালের পানিও হালকা দেখা যাচ্ছে।
- লেবু নেই রে?
- কাটা নেই।
- গাছে আছে তো। একটা ছুড়ি দিয়ে যা। আমি কেটে খাবো।
- আমাদের গাছে হাত দিলে আমি আপনার হাত কেটে ফেলবো।
- আচ্ছা।

আনিশার সাথে কথা কেনো যেনো বাড়ানো যায় না। স্নান করে এসেছিলো মনে হয়। ঘার বেয়ে ভেজা চুলের পানি গলায়ে বেয়ে গড়িয়ে বুকের দিকে যাচ্ছিলো। কি সুন্দর লাগছিলো। দুটো সমস্যা হয়ে গেলো। এক ছুড়িটা পাওয়া গেলো না। মন মতো খুন করতে পারবো না। আরেক সমস্যা হলো ভেন্ডি ভাজি নিশ্চয়ই তেলাপোকারা খাবেনা। দুপুরের খাবারটা তাদের বাদ পরে গেলো। চিলেকোঠার দরজা টা খোলা। ছাদে আনিশার কাপর শুকাতে দেওয়ার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। আজব তো! তাকে দেখতে মায়ের মত লাগছে কেন! শাড়ি পরার জন্য। আনিশা আজ শাড়িই বা পরেছে কেন? মায়ের গায়ের রং তো কালো ছিলো না তবে কেনো মায়ের মতো লাগছে।

মৃত মানুষের এই এক সুবিধা। যেমনটা জীবিত মানুষ নিরুদ্দেশ হয়। মৃত মানুষ কিন্তু কখনো জীবন থেকে নিরুদ্দেশ হয় না। তাদের আরেকজনের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখা যায়। অনুভব করা যায়। সৃষ্টিকর্তা আমাদের ইহকালেও পরকালের কিছু সুখ ধার দিয়েছেন। আজ রাতে কাজটা সারতে হবে। যদিও হাতে কোনো সরঞ্জাম নেই। গলা টিপে মারার একটা প্ল্যান আছে। হ্যান্ড গ্লাভস পরতে হবে তাহলে। কিন্তু সেটা কিনার টাকা তো নেই। এখন আমি বসে আছি যারিশার সামনে। হালকা সেজেছে। আসার সময় সেই সাজ দেখেনি। কখন সাজলো মনে করতে পারছিনা। এই মেয়ের মধ্যে কিছু একটা আছে। এত দ্রুত কিভাবে কেউ কিছু করতে পারে।

- মুগ্ধ ভাইয়া, আজ আপনার জন্মদিন।
- তুই কিভাবে জানলি?
- গত বছর ভাইয়া আপনাকে একটা পাঞ্জাবি কিনে দিয়েছিলো এই দিনে।
- সেই হিসেবে আজ আমার জন্মদিন হবে তা তোকে কে বললো?
- জানি না। ধরে নিয়েছি। এই নিন আপনার গিফট।
- এর মধ্যে কি আছে?
- আমার ফোন। নতুন ফোন কিনে দেওয়ার মত পরিস্থিতি আমার নেই সেটা জানেন।
- তোর আমাকে দিলে তুই কিভাবে চলবি?
- ল্যান্ড ফোন দিয়ে।

- তোর বন্ধুরা ফোন দিলে?
- সিম চেঞ্জ করে দিয়েছি।
- আমি ফোন দিয়ে কার সাথে কথা বলবো?
- কারও সাথে না। পকেটে কিছু না থাকলে অস্তিত্বহীন মনে হয়। ফোনটা অস্তিত্ব রক্ষার্থে সাহায্য করবে।
- তোর ভাইয়া বাসায় নেই।
- নাহ, জানিও না কোথায়।
-সমস্যা নেই। রাতে দেখা হবে। আজ আসি তাহলে।
- আরেকটু বসুন।
- তোকে সুন্দর লাগছে। হ্যান্ড গ্লাভস কিনবো। কিছু টাকা দিতে পারবি।
আমি হেটে গেটের কাছে যাচ্ছি। পিছনে যারিশা দাঁড়িয়ে আছে বারান্দা দিয়ে। মনে হচ্ছে সে কাঁদছে। সুন্দর বললে কি কেউ কাঁদে?

রাত নয়টা। এই সময় রফিক জামান সাহেবের বাসায় যাওয়াটাকি উচিৎ।কাজটা যেহেতু হয়ে গেছে সেহেতু যাওয়া তো উচিৎ। মাথায় একটা গানের লাইন ভাসছে। সন্ধ্যায় চিলেকোঠায় থাকা অবস্থায় ছাদে মামা এসেছিলো। ছাদের একটা অংশে শ্যাওলা। সেখান থেকে শহরটা সুন্দর করে দেখা যায়। মামা সেখানে দাঁড়িয়ে শহর দেখছিলেন আর গান গাচ্ছিলেন। গানটা কি ছিলো! কোনোভাবেই মনে আসছে না। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনটা এখনো প্যাকেটে মোড়া। কি আজব! একটা কাগজের প্যাকেটে করে কেউ ফোন গিফট করে।

- হ্যালো যারিশা, বল।
-ভাইয়া কিভাবে বুঝলেন আমি কল দিছি।
- নতুন সিম। নাম্বার তুই ছাড়া অন্য কারো জানার প্রশ্নও আসেনা।
- জাহিন ভাইয়াকে গত রাতে যে বেড়িয়েছে এখনো বাসায় ফেরেনি। আপনার সাথে দেখা হবার কথা ছিলো। আর যাইহোক ভাইয়া বাসায় না ফেরার মানুষ না।
- তোর জন্য তো ভালোই হলো।
- আপনি হয়তো জানেন না, আমার মা এই বাড়ির দ্বিতীয় বউ। এরপরও জাহিন ভাইয়া আমাকে অনেক আদর করে। একবার ক্লাস এইটে পড়ার সময় আমাদের ভূগল স্যার আমার বুকে হাত দেয়। সেটা আমি মাকে বলার সময় ভাইয়া দরজার কাছে দাঁড়িয়ে শুনে ফেলে। সেসময় ভাইয়া অনেক ছেলে-পেলে নিয়ে ঘুরতো কিন্তু সেদিন ভাইয়া একা যেয়ে স্যারকে মারে। মারার অপরাধে ভাইয়াকে আবার বাবা মারে। আমাদের বাড়ির সামনের লেবু গাছের শুকনো ডাল দিয়ে। ভাইয়ার রাতে জ¦র এসে পড়ে। রাত দুটায় হঠাৎ বাবা আমাকে ঘুম থেকে তুলে বসে লেবু দিয়ে চা বানা এক কাপ। সেই চা নিয়ে বাবা ভাইয়ার রুমে যায়। আমি দরজার কাছে দাঁড়ানো। ভাইয়াকে বাবা বললেন, “তুমি যা করেছ তা কি তুমি ঠিক মনে করো?” ভাইয়া কেঁদে কেঁদে উত্তর দিলো, “বোনের ইজ্জতটা ফিরে পেলে মনে করতাম যা করেছি ঠিক করেছি।”

- বুঝলাম, তুই কি কাঁদছিস?
- আপনি একটা কথা ঠিক বলেছিলেন, আমি যেহেতু ভাইয়ার ডাইরি পড়েছি। ভাইয়াও আমার ডাইরি পড়তে পারে।
- পড়েছে?
- হুম, আমার ডাইরিতে আমি শুধু একটা কথা লিখেছিলাম। ভাইয়া সেই লেখার নিচে লিখেছে, “এই স্বপ্ন কখনো অপূর্ণ রাখিস না।”
- তোরা দুই ভাইবোন দেখি প্রাইভেসির কিছুই জানিস না।
- ভাইয়া, আপনার কি জানতে ইচ্ছে করছে না? স্বপ্ন টা কি ছিল?
- না, মানুষের জিনিস কেন জানতে চাইব।
- কারণ স্বপ্নটা আপনাকে নিয়ে।
- তোর ফোনের ব্যালেন্স কি শেষ হচ্ছে না?
- ভাইয়া আমার স্বপ্নটা ছিলো, আমাদের ছাদে আমি আপনাকে বিশ মিনিট জড়িয়ে ধরে রাখবো। বাতাসে আমার চুল উড়বে। সেই চুল আপনার মুখে পরবে। আপনার শুরশুরি লাগবে। তাও কিছু করতে পারবেন না কারণ আপনিও আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখবেন। একজন স্ত্রী হিসেবে।
- বুঝলাম।

- আমি ভেবেছিলাম এই জিনিস পড়লে ভাইয়া আমাকে মেরে ফেলবে। আচ্ছা, জাহিন ভাইয়া তো ভালো আছে তাইনা! জানেন আগামীকাল জোছনা। ভাইয়া নিশ্চয়ই সেই নিতু নামের মেয়েটার সাথে জোছনা বিলাস করতে গিয়েছে। কিন্তু আমি জানি, ভাইইয়া আর কোনোদিন আসবে না। কারণ সে তার ডাইরিটা নিয়ে গেছে।
আমি ফোনটা খট করে কেটে দিলাম। হ্যান্ড গ্লাভস কেনা হয়নি। টাকা পকেটে আছে। এক কাপ চা খেলে ভালো হতো। যেই রাস্তাটায় দাঁড়িয়ে আছি সেই রাস্তায় শুধু একটা ল্যাম্পপোষ্ট। আমি সেই আলোতে নিজেকে দেখলাম। একটু আগে আমি একটি কাজ করেছি। অথচ আমার মধ্যে তার কোনো প্রমাণ নেই। ইসস, জামাটায় যদি একটু রক্ত লাগানো থাকতো। তাহলে মানুষদেরকে একটু ভয় দেখানো যেত। আচ্ছা ভয় তো এখনো দেখানো যায়। ঝটপট আমি আমার পরনের গেঞ্জিটা খুলে হাতে নিলাম। পুরো উদোম অবস্থায় হাতে গেঞ্জি পেঁচিয়ে সামনের একটা টং এর সামনে দাঁড়ালাম। কন্ঠটা একটু মোটা করে বললাম।
- এই লাউলা, এক কাপ চা দে।
মধ্যবয়স্ক দোকানদার বলে উঠলো, ‌‌‍‍‍‍‍‍‍‌‌‌যা পাগলা, আজাইরা জালাইস না।

- স্যার, আমি উদোম দেখে কি আপনার অস্বস্তি হচ্ছে?
- না, বরং ভালো লাগছে। যেই গরম। আমারো তোমার মত জামা খুলে ফেলতে ইচ্ছে করছে।
- স্যার, আমি কাজটা সেড়েছি।
- জানি, ডেমরার সাবেক কাউন্সিলরের লাশ তার বাড়ীর পুবপাশে পাওয়া গিয়েছে। ধরে নেওয়া হয়েছে তিনি ছাঁদ থেকে পিছলে পরে গেছেন। কারণ ছাদের একপাশে শ্যাওলা ছিলো। সেখানে তার চপলের পিছলে যাওয়া ছাপ রয়েছে। খবরে দেখাচ্ছে। তবে বলেছিলে তার মেয়ে রূপবতী। আমার কাছে কিন্তু সেরকম লাগেনি। মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে সাংবাদিকদের বলছিলো বাড়িতে তারা চারজন থাকে। সে, তার বাবা, তার মা এবং গৃহকর্মী। তোমার কথা বলেনি কেনো বলতে পারো?
- আনিশাকে এলাকায় সবাই অনেক ভালো জানে। যদি আমার কথা বলে তাহলে অনেক কথা রটবে।
- তোমাকে সে সন্দেহ করেনি। সন্দেহ করলে নিশ্চয়ই মিডিয়ার সামনে তোমার কথা বলতো।
- আমাকে মামা অনেক আদর করতো সুতরাং, এ কথা তারা চিন্তাও করবে না।
- প্লাটফর্মটা ভালোই তৈরী হইয়েছিলো নয়ত খুনটা হয়ত করতে পারতে না।

- স্যার, খুনটা কেনো করেছি তা কি জানতে চান না?
- না, কারণটা আমি জানি। তবে জানতাম না। খবর শুনে জানলাম। তুমি বলেছিলে তোমার মামা ছোটবেলায় তোমাদের সাথে থাকে। সাথে বলেছিলে সাত মাস তিনি তোমার সাথে ঘুমিয়েছে। একটা মানুষ তার অতীত বলার সময় এরকম সাধরণ একটা কথা কখনোই উল্লেখ্য করবেনা। যেহেতু তুমি উল্লেখ্য করেছো বুঝে নিতে হবে এটা সাধরণ কিছু না। তোমার মামা তোমার সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলো। সাত মাস ধরে তুমি তা সহ্য করেছো। সেটার থেকেই তোমাকে একটা দুঃস্বপ্ন প্রতিনিয়ত তোমাকে তাড়া করে। তাই তুমি খুনটা করেছ।

- স্যার, আপনার চেনা কোনো কাজী আছে? আমি কালকে বিয়ে করবো, দুপুরের আগে করতে হবে। কারণ যাকে বিয়ে করবো তার খুব ইচ্ছে আমাকে বিশ মিনিট ধরে জড়িয়ে ধরে রাখবে। দুপুরে রোদে তো এই কাজ সম্ভব না। সুতরাং, সন্ধ্যায় করতে হবে। পারবেন না স্যার?
- কালকে করার ই বা দরকার কি? পরেও তো করতে পারো।
- কাল তো জোছনা। সন্ধ্যায় সে যখন আমাকে জড়িয়ে ধরবে তখন জোছনার আলোতে তাকে দেখা যাবে। সেটা অন্য সময় নাও যেতে পারে। যে আমাকে জড়িয়ে ধরবে তাকে না দেখা গেলে ভালো লাগবে না ব্যাপারটা।

- তাহলে পরের জোছনার জন্য অপেক্ষা করো।
- সেই জোছনার জন্য প্ল্যান রেডি। খাগড়াছরিতে হানিমুনে যাবো। সেখানে আমার বন্ধু জাহিন, যে আমাকে আপনার কাছে দিয়ে গিয়েছিলো সে নিতু নামে একটা মেয়ের সাথে জোছনা বিলাস করবে। তাদের খুজে পেতে একটু কষ্ট হবে। কিন্তু ভালো সারপ্রাইজ দেওয়া যাবে। আচ্ছা, স্যার পাহাড়ী এলাকায় কি ডাব গাছ হয়?

- হতে পারে। তুমি কি আনিশাকে বিয়ে করবে?
- জ্বী না, জাহিনের বোন যারিশাকে।
- ওহ, তোমাকে সাহায্য করতে পারলাম না। আমার কোনো চেনা কাজী নেই।
- তাহলে বিয়েটা বিকেলে করতে হবে। খুজতে খুজতে দুপুর হয়ে যাবে। যাই স্যার।
রফিক জামান স্যার খুব স্বাভাবিক ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি কি বিশ্বাস করেছেন আমি মামাকে খুন করেছি। আচ্ছা আনিশাকি মামার চারিত্রিক সমস্যার কথা জানতো। হঠাৎ আমি হাঁটা থামালাম। আবার রফিক জামান স্যারের কাছে ফিরে এলাম।

- স্যার, আমি আসলে খুবই অসুস্থ একটি ছেলে। আমি কি সুস্থ হবো?
- তুমি চাইলে অবশ্যই সুস্থ হবে। যারিশা নামের মেয়েটি তোমাকে সুস্থ করতে পারবে।
- স্যার, এটা আপনার কেনো মনে হলো?
- তার স্বপ্ন পূরণের জন্য তোমার আকাঙ্ক্ষা দেখে।
- স্যার, আপনি কি আমাকে কিছু খাবার দিতে পারবেন। আমার পোষা তিনটি তেলাপোকা দুপুরে কিছু খায়নি। রাতে নিশ্চয়ই সেই বাসায় আজ রান্না হবে না। রাতে খাবার না পেলে বাবা এবং মা তেলাপোকা বেঁচে থাকলেও লালু মারা যাবে।

স্বাধীন বাংলা/এআর

পথশিশুর স্বপ্ন
                                  

দেখিনি মায়ের আদর মাখা মুখ
বুঝিনি বাবার ভালবাসায় স্বপ্নিল সুখ।
ঘুমাইনি মায়ের ওই আগলে রাখা বুকে
বুনিনি কোনো স্বপ্ন বাবারও চোখে।

কত মানুষ দিবানিশি হাঁটে পথের পাশে
প্রহর গুনি মা-বাবা এই বুঝি আসে।
সকালে বেরোয় দুমুঠো আহারের সন্ধানে
ঝড়বৃষ্টি, রোদ্দুরে মৃত্যুর কড়া ক্ষণে ক্ষণে।

নিশ্বাসের আশায় খাই অন্যের পঁচাবাসি
তবু্ও বেঁচে থাকার আনন্দে হাসি।
যায় অন্যের দ্বারে, নয়তো ময়লার স্তূপে
ক্ষুধার তাড়নায়, রোগ ব্যাধি অন্ত্রে সঁপে।

ঘুমায় রাতে সারি সারি পথের প্রান্তে
তীব্র শীতে জোটে না বস্ত্র তনুতে।
তবু্ও স্নিগ্ধ দু’চোখে স্বপ্ন আঁকি
বাবা-মা, আহার, নিভৃতে ঘুম থাকবে আপন বাড়ি।

- আসমা খাতুন
   শিক্ষার্থী: ইংরেজি বিভাগ,
   ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠায় মুসলমানদের অবদান
                                  

পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাই একমাত্র ভাষা, যার স্বীকৃতী লাভের জন্য সংগ্রাম করেছে পুরো একটি জাতি। প্রাণপণে সর্বোচ্চ দিয়ে লড়ে গেছে আপামর জনতা, অকালে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছে টকবগে যুবক থেকে থুরথুরে বৃদ্ধ পর্যন্ত, হাসিমুখে শাহাদাত বরণ করেছে অগণিত মানুষ। একমাত্র বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠা সংগ্রাম জন্ম দিয়েছে একটি স্বাধীন-স্বার্বভৌম দেশ। বাঙালি মুসলমানদের দুটি বড় অহংকারের জায়গা রয়েছে, একটি তার দেশ, অন্যটি ভাষা।

বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়েছে মোটামুটিভাবে দশম-একাদশ শতকে। সুনীতিকুমার, ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ ভাষাতাত্ত্বিক বাংলা ভাষার যে বংশাবলী নির্মাণ করেছেন তাতে দেখা গেছে, ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাই কালের বিবর্তনে বাংলা ভাষায় রূপ নিয়েছে। পন্ডিতদের মতে, বাংলা ভাষার প্রাচীন রূপ দেখতে পাওয়া যায় বৌদ্ধ মরমি সাধকদের রচিত বৌদ্ধ গান ও দোহার মধ্যে। সেসময় বাংলা ভাষা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতার আমলে ছিল কিন্তু সে আমল দীর্ঘদিন স্থায়িত্ব লাভ করতে পারেনি। একাদশ শতকে পালদের পরাজিত করে সেন রাজত্ব উঠে আসে এবং বাংলার পরিবর্তে সংস্কৃত ভাষা রাজভাষা হিসেবে কায়েম হয়। সাথে সাথে সমস্ত কাজকর্মে একদিকে যেমন সংস্কৃতের জয়গান উঠে আসে অপরদিকে বাংলা ব্যবহারে নিরুৎসাহিতার রূপ ফুটে ওঠে। রাজপুরুষদের চাপে পড়ে ব্রাক্ষণ পন্ডিতরা ফতোয়া জারি করলেন: “অষ্টাদশ পরাণাননি রাম্যস্যস চবিতনিচু/ভষায়ং মানং শ্রুত রৌরবং নরক ব্রজেং”। অর্থাৎ, অষ্টাদশ পুরাণ ও রামায়ণ যে মানব রচিত বাংলা ভাষায় শ্রবণ করবে, সে রৌরব নরকে নিক্ষিপ্ত হবে।
 
১২০৩ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গ বিজয়ের মাধ্যমে এ অঞ্চলে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠত হয়। এতে উপমহাদেশে নতুন আলোর মিনারের সূচনা ঘটে। যার প্রভাবে একদিকে যেমন জাতিভেদ-লাঞ্ছিত বাংলার সমাজদেহে নীরব বিপ্লব দেখা দেয় অপরদিকে বিলীন হওয়া বাংলা ভাষা চর্চাতে নয়াদিগন্তের বিপ্লব ঘটে। এ সম্বন্ধে বিখ্যাত গবেষক ড. দীনেশচন্দ্র সেন বলেন: “হীরা কয়লার খনির মধ্যে থাকিয়া যেমন জহুরীর অপেক্ষা করে, শুক্তির ভিতর মুক্তা খনির মধ্যে থাকিয়া যেরূপ ডুবরীর অপেক্ষা করিয়া থাকে, বাংলা ভাষা তেমনি কোন শুভদিন, শুভক্ষণের সুযোগ আনায়ন করিল”। মুসলিম শাসনামলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চার লালনে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের অনুরাগী সাহিত্যসেবকগণ রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্টপোষকতা লাভ করেন। মুসলিম শাসনের পতন যুগে উত্তর ভারতের মুসলিম শিক্ষিত সমাজের উদ্যোগে আরবি হরফ, আরবি-ফারসি শব্দভান্ডারে এবং হিন্দি উচ্চারণকে কেন্দ্র করে ‘উর্দু’ নামে একটি ভাষার জন্ম হয় এবং অল্পদিনের মধ্যেই তা উত্তর ভারতের সংস্কৃতিবহুল হিন্দুদের ব্যবহৃত হিন্দি ভাষার মুসলিম বিকল্প হিসেবে দাঁড়ায়।

১৭৫৭ সালে পলাশী বিপর্যয়ের পর বাংলাদেশে ইংরেজ শাসনের সূত্রপাত ঘটে যায়। উনিশ শতকের শুরুর দিকে ইংরেজ শাসকরা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা থেকে মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত আরবি-ফারসি শব্দ বাদ দিয়ে সংস্কৃত কণ্টকিত অভিনব বাংলা ভাষা গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালালে সেসময়কার মীর মোশারফ হোসেন, শেখ আব্দুর রহিম, মহাকবি কায়কোবাদসহ প্রমুখ মুসলিম কবি-সাহিত্যকগণ তা প্রতিহত করতে সক্ষম হন।
 
বিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ-ভারতে স্বাধীনতা-আন্দোলন ধীরে ধীরে সাফল্যমন্ডিত ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকলে নতুন করে বাংলা ভাষার ভাবিষৎ নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা শুরু হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে যখন কংগ্রেস নেতা এম.কে.গান্ধী রবী ঠাকুর কে ভারতবর্ষ স্বাধীনের পর সাধারণ ভাষা কী হতে পারে তা জানতে চাইলে তিনি হিন্দির পক্ষে অভিমত জ্ঞাপন করেন। ১৯৭১ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন এ বিষয়ে আবার আলাপ-আলোচনা শুরু করেন ঠিক সময় ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সুস্পষ্ট ভাষায় বলেন, ভারতবর্ষে বাংলা, উর্দু ও হিন্দি সাধারণ ভাষা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। এরই উপলক্ষ্যকে কেন্দ্র করে বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী সুস্পষ্টরূপে বলে দেন, “ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলে যে ভাষাই হোক না কেন, বাংলাদেশে বাংলা ভাষাই হবে সরকারি ভাষা’।

ইতিহাস পর্যালোচনার করে আমরা স্পষ্টাক্ষরভাবে জানতে ও বুঝতে পারি বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠায় মুসলিমদের অবদান কতখানি। বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠায় মুসলমান সমাজ যেভাবে অকাতরে পরিশ্রম ও যুদ্ধ করে গেছে তার তিনটি পয়েন্ট উল্লেখ করলেই জাজ্বল্যমান মুখপ্রান্ত সত্য সবার নিকটে উঠে আসবে। প্রথমত, ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গ থেকে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সেদিন বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবির সুউচ্চ দীপ্ত কন্ঠে উথাপিত হলেও হিন্দু অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাকে ভারতের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার কোন দাবি উত্থাপিত হয়নি। দ্বিতীয়ত, বাহান্নর ফ্রেবুয়ারিতে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিতে যে তরুণেরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে এ আন্দোলন বেগবান, গতিশীল এবং পাকাপোক্ত ভিত্তির উপরে দাঁড় করিয়েছিলেন তাদের সবাই ছিল মুসলিম। তৃতীয়ত, ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে আটচল্লিস ও বাহান্নের মধ্যে দিয়ে ছাপ্পান পর্যন্ত পদার্পণে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায় না হওয়া পর্যন্ত প্রধানত পূর্ববঙ্গের তরুণ মুসলিম সমাজ-ই এই নেতৃত্ব দান করেন।

বাংলা ভাষার শৈশব, কৈশোরে এই ভাষার স্নেহ, লালন এবং উন্নয়নে যেরূপ এই মুসলিম অধ্যুষিত তরুণ সমাজ চোখধাঁধানো অবদান রেখেছিল ঠিক একইভাবে ব্রিটিশ শাসনের অবসানে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা লাভের সংগ্রামেও একই ভূমিকা মুসলিম তরুণরাই পালন করে। বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বুকের তাঁজা রক্ত ঢাকার রাজপথে বিলিয়ে দিয়েছে তাঁরা সবাই ছিলেন মুসলিম তরুণ। সর্বোপরি বলা যায়, বাংলা ভাষার শিশু বয়স হতে আজ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্র বেগবান, গতিশীল, লালন এবং উন্নয়নে রয়েছে মুসলমানদের গৌরবজনক অবদান।

সূত্র- বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় মুসলমান(অধ্যাপক আবদুল গফুর), শুবাচ (ড.হায়াৎ মামুদ, ড.মোহাম্মদ আমীন), ইন্টারনেট।
মোহম্মদ শাহিন
শিক্ষার্থী, সুলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়।

কবি নয়, কবিতা হতে চাই
                                  

রাবেয়া সুলতানা

হে বরেণ্য কবি-
তোমার এতটুকু সময় হবে কি,
একটি মহাকাব্য লেখার?
যেখানে আমি থাকবো তোমার স্বপ্নচারিনীরূপে,
কাব্যরসে টইটুম্বুর একটি কবিতা হয়ে।
কবি নয়, আমি কবিতা হতে চাই,
হে কবি লিখে যাও অবিরাম,
তোমার ভালোবাসার কবিতা,
হতে চাই আমি সেই কবিতার শব্দগুচ্ছ,
যেন প্রতিমুহূর্তে কবিতার প্রেমেই পড়ি।
হে কবি, লিখে দাও একটি কবিতা,
যেখানে থাকবে উচ্ছ্বসিত সোনালী অতীত,
প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসেব আর দীর্ঘশ্বাসের কথা।
অকুণ্ঠ জ্যোৎস্নায় ভিজে ভিজে স্বপ্নবুননের কথা।
হে কবি, ভালোবেসে লিখে দাও,
তিমির সরায়ে সরায়ে
রৌদ্রজ্জ্বল প্রভাতে পৌঁছানোর কথা।
যাপিত জীবনের ইতি কথা,
আলো-আধারিতে ঢেকে থাকা
বিরহ বিদূর জীবনের কাব্যগাঁথা।
হে প্রেমের কবি,
আমার কল্পরঙের সবটুকু রঙ তোমায় দিলাম,
লিখে দাও আমার গোপন অভিসারের কথা,
প্রতিমুহূর্তে ঝরে পড়ার কথা।
কবিতার প্রেমে পূর্ণ করে দাও,
আমার এ হৃদয়, অঙ্গন।
হে মানবতার কবি,
শব্দও বর্ণের ভাঁজে ভাঁজে সাজিয়ে দাও,
আমার মায়ের ভেঙ্গে যাওয়া স্বপ্নের কথা,
এক আশাহত রমনীর অসময়ে ঝরে পড়ার কথা।
হে দ্রোহের কবি, তুমি লিখে দাও-
আমার নীরবতার কথা,
বিদ্রোহী হয়ে ওঠার কথা,
একটি মায়াবী নক্ষত্রের ফেরারী হবার কথা।
তোমার মহাকাব্যে,
আমি বেঁচে থাকতে চাই অনন্তকাল,
বর্ণিল প্রেমের কবিতা হয়ে,
হবে কি সময় তোমার, হে কবি?

হায়রে বাঙালি
                                  

শোভা রাণী বিশ্বাস


তোমরা আমায় দাও যে এনে নাইলোনের-ই দড়ি,
কচু গাছের সাথে ঝুলে একটু খানি মরি।
নয়ত আমায় বিষ এনে দাও বোতল ধরে খাই,
তাও গো যদি মনের কোণে শান্তিটুকু পাই।
মৃত্যু মিছিল চলছে সারা বিশ্ব জুড়ে আজ,
থমকে গেছে জীবন তাদের বন্ধ সকল কাজ!
স্বপ্নটাকে থামিয়ে দিলো করোনামহামারি,
কানপাতলে যায় গো শোনা বুকের আহাজারি।
খুব ছোঁয়াচে রোগ যে এটা সর্ব লোকে জানে,
বাংলাদেশের মানুষগুলোর যায়না কথা কানে।
শোনাতে গেলে শোনে তারা বাম কানটা দিয়ে,
ডান কানটায় বের করে দেয় একটু সরে গিয়ে।
বাঙ্গালি জাতি বীরের জাতি নেই মৃত্যুর ভয়,
জীবন দেবে তবু তারা ঘরে থাকার নয়।
জনে জনে আপন মনে বাইরে সারাদিন,
ঘাড়ের উপর নৃত্য করে মস্ত বড় জীন।
উদমোষাঁড়ের মত ঘোরা বন্ধ আজ,
নয়তো তোমার কপাল জুড়ে পড়বে দুখের।
হে বিধাতা বীর বাঙ্গালির জাগ্রত হোক বোধ,
সচেতনতা-ই করতে পারে করোনা প্রতিরোধ।

চিবুকের কালো তিল
                                  

সুমি ইসলাম

এই মেয়ে জানো কি তুমি?
তোমার ঐ চিবুকের
কালো তিলটার
প্রেমে পরেছি আমি
বারবার ওই কালো
তিলটাকে ছুঁয়ে দেখতে
মন চাইছে
একটিবার কালো
তিলটাকে ছুঁয়ে
দেখবো বলে চলে আসি
তোমার কাছে
ছুটে আসি মাইলের পর
মাইল পাড়ি দিয়ে
যোজন যোজন দূরত্ব
কে পিছে ফেলে।
আকাশের বুকে যেমন
তারারা জ্বল জ্বল করে
তেমনি তোমারে
চিবুকের তিলটা
জ্বল জ্বল করে আমার
চোখের উপর
তোমার কাছে হাত
জোড় করে
বিনয়ের সাথে অনুরোধ করি
একবার ছুঁয়ে দেখতে
দাও কালো তিলটাকে,
আমি বারবার তোমার
চিবুকের তিলটাকে ভালোবাসতে চাই
একটি বার ছুঁয়ে দেখতে চাই
চিবুকের তিলটাকে।

মা দিবসে কবি আলম হােসেনের অসাধারণ কবিতা
                                  

মা দিবস উপলক্ষে কবি ও সাংবাদিক আলম হোসেন মর্মস্পশী অসাধারণ কবিতা লিখেছে। পাঠকদের জন্য কবিতাটি নিম্নে তুলে ধরা হলাে-

মা

আলম হোসেন

মা যে আমার  বন্ধু  সুজন
ঘুম  পাড়ানির সই
মাকে ছাড়া একলা আমি
কেমন করে রই

কে আমাকে করবে আদর
কে বুলাবে হাত
ঠা ঠা গরম জ্বলছে শরীর
কেমনে কাটাই রাত

মাগো তুমি সেই যে গেলে
ফিরলে নাতো আর
তোমায় ছাড়া এই দুনিয়া
বড়ই অন্ধকার

চক্ষু বুজলে তোমায় দেখি
ছুঁইতে পারিনা
আয় না গো মা স্বপ্ন মাঝে
ছোঁয়া দিয়ে যা।

বল্টু
                                  

তানজিলা

আচ্ছা, হ্যান্ড ওয়াশ হবে? করোনার সংক্রমণ থেকে বাঁচতে বার বার হাত ধুতে হয়। তাই নাজিম উদ্দিন হ্যান্ডওয়াশের খোঁজে এলেন।
হবে। দোকানদার হারু বললো।
কতো টাকা?
৭০ টাকা।
গায়ের রেট ৩৫ টাকা। ৭০ টাকা চাচ্ছেন কেন ?
এখন দেশের যে অবস্থা হ্যান্ডওয়াশ বাজারে নাই। আমরা অনেক খুঁইজা কয়টা আনলাম। তাও বেশি দাম দিয়া আনতে হইলো।
অ। তাহলে একটা সাবান দিন। শুনে হারুর মুখ কালো হয়ে গেলো।
সাবান ক্যান? হ্যান্ডওয়াশ নেন। হ্যান্ডওয়াশে ভালো কইরা হাত পরিষ্কার করা যায়।
না থাক। নাজিম উদ্দিন সাহেব পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিয়ে টাকা দেখলেন।
টাকা নাই? ঠিক আছে তাইলে সাবানই নেন। হারু বললো।
বল্টু পাশে বসে দেখছিলো।  

নাজিমুদ্দিন একটা সাবান নিলেন। তাকে খুব রুক্ষ এবং চিন্তিত লাগছিলো। শীর্ণ দেহে মাথা নিচু কি ভাবতে ভাবতে যেন বাসার দিকে গেলো। প্রায় সময় তিনি দোকানে এসে চাল-ডাল দেখেন। যে চালের সবচয়ে কম দাম মুখ কালো করে তাই নেন। এক লিটার তেল না নিয়ে হাফ লিটার নেন। বেশিরভাগ সময় আলু কেনেন। তাও পরিমাণে খুব বেশি না। পেঁয়াজ-রসুনের মত বিলাসী জিনিস কেনা ছেড়ে দিয়েছেন।

বল্টু নাজিম উদ্দিনকে চিনে। এ পাড়ায় বাসা। আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। সংসারে অনেকগুলো মুখ। করোনা ভাইরাসের প্রকোপের পর থেকে তার অবস্থা আরো শোচনীয়। আগের চেয়ে সবকিছু কম করে নিচ্ছেন। বাকিতে চাইলেও হারু দেয় না

ঐসব বাকিটাকি হবে না। হারু মুখের উপর বলে দেয়।

চাছা, করোনা খুব ভয়ংকর অসুখ? বল্টু হারুকে বললো।
হরে বল্টু, তাইতো হুনতাসি।
কয়নাকি ঔষধ নাই। একবার অসুখটা অইলে মইরা যায়।
হ। আল্লাহ যদি বাঁচায় তো বাঁচার আশা আছে। নইলে আর কোনো আশা নাইরে।
তাইলে সব আল্লাহর উপর ছাইরা দাওনা ক্যান?
কি কইতে চাস?  হারু ব্রু কুঁচকালো।
কইতে ছাই আফনে দোকানে অনেক চাল, ডাল, হ্যান্ডওয়াশ আরো অনেক কিছু আইনা রাখসেন। কিন্তু নাই বইলা বেশি দামে বেচেন। অনেক মানুষ দাম বেশি শুইনা নিতে পারতেসেনা। এইডা কি ঠিক?
হারু চার পাশে তাকিয়ে দেখলেন কেউ আছে কিনা। এই তুই বেশি কতা কস।
বেশি না। ভাইবা দেহ ঠিক কইতাসি। এহন যা অবস্থা তোমারেও যদি অসুখটা দরে। কি করবা?
কি আজে-বাজে কস? হারুন একটু ভয় পেল।
ঠিক কইসি। আমারেও মনে অয় অসুখটা দরছে। দুদিন থেইকা দেহি গলা বেথা.. জ্বর জ্বর লাগতাসে। বল্টু খুক খুক করে কাশল।

আমিতো এতদিন তোমার লোগে ছিলাম। তোমারেও ধরবো কিন্তু।

হারুরও দুদিন থেকে জ্বর জ্বর লাগছে। এখন তার মনে হচ্ছে বল্টুর সাথে থেকে তার জ্বর আসলো। আগের ছেয়ে গলাটা বেশি ব্যাথা লাগছে। শুকনো কাশিও আছে। হারু খুক খুক করে কাশলো।

হারামজাদা তোরে আজকে ...হারুন বল্টুকে মারতে উঠলো।

আমারে মাইরা লাভ নাই। রোগটা আল্লাহ দিসে, তাই তার কাছে মাফ চাও। আর মরার আগে না খাইতে পাওয়া মানুষগোরে কম মূল্যে সব বেইচা দাও। আল্লাহ খুশি অইবো।

দুর্বল চিত্তের মানুষ মরণকে খুব বেশি ভয় পায়।। মরণকে ভয় পায়না দেবতুল্য মানুষ এবং মানুষ রুপি শয়তান। হারুন দুর্বল চিত্তের। তাই সত্যি সত্যি ভয় পেয়ে সে কম মূল্যে বিক্রি করছে।

বল্টু নিজ মনে হাসতে লাগলো। সে হারুনকে মিথ্যে ভয় দেখিয়েছে। তবে তার এখন হারুর দোকানে জায়গা হয়না। রাস্তার পাশেই থাকতে হয়। তবুও তার খুশির সীমা নেই। কারণ আজকে নাজিম উদ্দিনের মতো অনেকেই হারুর দোকান থেকে কম মূল্যেই সব বাজার করতে পারছে।

নাজিমুদ্দিনকে দেখলে বল্টুর নিজের বাবার কথা মনে পড়ে যায়। সে যখন বাবার সাথে দোকানে যেত, তার বাবাও জিনিসপত্রের দাম দেখে বার বার নিজের পকেটে হাত দিয়ে টাকা চেক করে দেখতো। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে না পারলে বাড়ি ফিরত মন খারাপ করে। অনেকদিন আগে রিক্সা চালানোর সময় তার বাবা রোডএকসিডেন্টে মারা যায়। নিজের পরিবারের দায়িত্ব নিতে সেই থেকে বল্টু এই দোকানে কাজ করে। কিন্তু হারুকে তার মোটেই পছন্দ না। লোকটার মধ্যে মানবিকতার লেশমাত্র নেই।
বল্টু পার্কের বেঞ্চে শুয়ে আকাশের দিকে তাকালো। তার মা বলে তার বাবা নাকি আসমানবাসী হয়ে গেসে।

বাবা তোমারে খুব মনে পরে। বল্টুর দু চোখ গড়িয়ে পানি পড়লো।

দানেই সুখ!
                                  

স্বাধীন বাংলা ডেস্ক: সম্পদই সুখের উৎস। সম্পদ বাড়ালেই মানুষ সুখী হবে। সম্পদের পেছনে পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটতে গিয়ে গজিয়ে উঠলো একের পর এক বস্তুবাদী সমাজ।

 সম্পদ আর সীমাহীন প্রাচুর্য থাকার পরও মানুষ সুখী হতে পারছে না। ২০১৫ সালের এক গ্লোবাল ওয়েল্থ রিপোর্ট অনুযায়ী, পৃথিবীতে ব্যক্তি মালিকানাধীন যে মোট ১৩২ ট্রিলিয়ন সম্পদ আছে, তার ৪২ শতাংশই (৬৩.৫ ট্রিলিয়ন) আছে আমেরিকানদের হাতে। কিন্তু ২০১২ সাল থেকে জাতিসংঘ বিশ্বে সুখী দেশগুলোর যে তালিকা করেছে, তার শীর্ষে এ পর্যন্ত একবারও যেতে পারেনি আমেরিকা।

মানুষ যখন শুধু নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে, নিজের জন্যেই সঞ্চয় করে, সে খুব দ্রুত ক্লান্ত আর নিরানন্দ হয়ে পড়ে।

ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের এক যৌথ গবেষণার ফল প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালে। ৬৩০ জনেরও বেশি স্বেচ্ছাসেবক এ গবেষণাটিতে অংশ নেন। প্রথমে তাদেরকে তাদের বার্ষিক আয়ের বিবরণ দিতে বলা হয়। এরপর মাসে তারা যে ব্যয়গুলো করেন, তার বিস্তারিত বিবরণ দিতে বলা হয়। নিজেদের জন্যে ব্যয় ছাড়াও দান, উপহারসহ সব ধরনের ব্যয়েরই বিবরণ দিলেন তারা। এরপর তারা সুখী কি না, তা যাচাইয়ের জন্যে কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে বলা হলো তাদের।

যারা দান করেছেন, অন্যদের উপহার দেবার জন্যে ব্যয় করেছেন, তারা অনেক বেশি সুখী মনে করছেন নিজেকে।

এদের মধ্যে ১৬ জন কর্মীকে বেছে নেয়া হলো, যারা একটি কোম্পানিতে কাজ করতেন। এদের প্রত্যেকেই বছর শেষে কোম্পানি বোনাস হিসেবে পেলেন ৩০০০ থেকে শুরু করে ৮০০০ ডলার। বোনাস পেয়ে তারা যত না খুশি হলেন, তার চেয়ে বেশি খুশি হলেন যখন আয়ের একটা অংশ তারা দিয়ে দিলেন সোশাল চ্যারিটি ফান্ডে।

গবেষণায় দেখা যায়, দানের এই তৃপ্তি আর আনন্দের জন্যে মাত্র পাঁচ ডলার ব্যয়ও যথেষ্ট হতে পারে।   

দান যে শুধু তৃপ্তি আর প্রশান্তিই এনে দেয়, তা নয়, সম্পদে বরকত এনে দেয়, দূর করে দুর্দশা। একবার বনী ইসরাইলের এক লোক স্বপ্নে দেখল, তার জীবনের দুই অংশ। এক অংশে তার খুব সম্পদ, প্রাচুর্য, বিলাসিতা থাকবে। আরেক অংশে থাকবে দারিদ্র, অভাব, দুঃখ, কষ্ট। স্বপ্নেই তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, এ দুই অংশের মধ্যে কোন অংশ সে প্রথমে পেতে চায়, তা বেছে নেয়ার স্বাধীনতা তার আছে।

এটুকু দেখেই ঘুম ভেঙে গেল তার। বিষয়টি তাকে খুব ভাবাচ্ছিল। স্ত্রীর সাথে আলাপ করল। স্ত্রী তাকে পরামর্শ দিল, ঠিক আছে, যেহেতু দুটো অংশই তোমার নিয়তি, কাজেই প্রথমে তুমি সম্পদ আর প্রাচুর্যই চাও। পরদিন সে আবারো স্বপ্নে দেখল। স্বপ্নেই বলল, সে প্রথম প্রাচুর্যময় জীবনই চায়।

জমি, ব্যবসা ইত্যাদি নানানভাবে বিপুল অর্থ সমাগম হতে লাগল তার বাড়িতে। এদিকে তার স্ত্রী একজন বুদ্ধিমতী মহিলা ছিল। স্বামীর এই বিপুল ধন সম্পত্তিকে শুধু নিজেদের জন্যে খরচ না করে সে স্বামীকে দিয়ে উদার হাতে সে বিলাতে লাগলো গরীব আত্মীয়, প্রতিবেশী, অভাবীদের মাঝে।

এদিকে বনী ইসরাইলীর জীবনের প্রথম অংশ শেষ হয়ে এল। এবার দ্বিতীয় অংশের পালা- দুঃখ, অভাব, বিপদ আর ঝামেলার জীবন!

দেখল, সে-তো দিব্যিই আছে। কোনো বিপদাপদ, ঝামেলা নেই। প্রাচুর্যেরও কমতি নেই।

স্বপ্ন দেখল, গায়েবি কণ্ঠ তাকে বলছে, যেহেতু তুমি তোমার সম্পদ গরীব দুঃখীদের জন্যে ব্যয় করেছ, আল্লাহ তাই তোমার ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তোমাকে তিনি আরো সম্পদ দান করবেন। যাতে তুমি আরো বেশি বেশি মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতে পার।

একবার নবীজী (স) তার সাহাবাদের নিয়ে বসে আছেন। এমন সময় তাদের পাশ দিয়ে এক ইহুদী হেঁটে গেল। কুঠার হাতে সে জঙ্গলে যাচ্ছিল কাঠ কাটতে। নবীজী (স) বললেন, এ লোকটি আজ সাপের কামড়ে মারা যাবে।

সন্ধ্যাবেলা জঙ্গল থেকে তাকে হেঁটে বেরুতে দেখে সাহাবারা অবাক হলেন। নবীজী (স) যেমনটি বলেছিলেন, তার তো এসময় এভাবে আসার কথা নয়! নবীজী (স) কে গিয়ে জানাতেই তিনি তাকে ডেকে আনতে বললেন।

সে এলে নবীজী (স) তাকে তার কাঠের বোঝাটা মেলে ধরতে বললেন। আর বোঝার বাধন খুলে দিতেই ঝপ করে ভেতর থেকে বেরুলো এক বিষধর সাপ।

নবীজী (স) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা বল তো আজ দিনে উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেছে কি না! লোকটি বলল, না, তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটে নি। তবে দুপুরবেলা আমি যখন খেতে বসেছি, তখন এক বৃদ্ধ ভিক্ষুক এসে আমার কাছে কিছু খাবার চাইল। তো খাওয়ার জন্যে আমার সাথে ছিল দুটো রুটি। তারই একটা আমি দিলাম ওকে।

নবীজী (স) বললেন, এই তাহলে কারণ। সাপের কামড়ে আজ মারা যাওয়াই ছিল এ লোকটির নিয়তি। কিন্তু দুপুরবেলা ভিক্ষুককে একটি রুটি দিয়ে সে যে পুন্য অর্জন করেছে, তার বদৌলতেই আল্লাহ তার হায়াত দারাজ করলেন। এরপর ইহুদি ইসলাম গ্রহণ করলেন।

নবীজী (স) বলেন, আল্লাহ বলেছেন, জান কবচ করতে আজরাইলকে নির্দেশ দিয়েছি, এমন কোনো ব্যক্তি যদি তারপরও দান করে, আমি তার জান কবচ থেকে বিরত থাকতে বলি আজরাইলকে।

লেখক- এস এম নুরুজ্জামান
সিইও
জেনিথ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড।

অতি চালাকের গলায় দড়ি
                                  

তানজিলা

মি . নেয়ার (প্রধানমন্ত্রী) নিজ দেশে করোনার সংক্রমণ বাড়তে দেখে গোপনে কিছু
মন্ত্রিদের নিয়ে অনলাইন বৈঠকে বসলেন। সবাই বিষয়টা নিয়ে খুব চিন্তিত।
একজন বললেন লকডাউন করতে।
কেউ কেউ সেবা খাতের জন্য প্রন্তুতি নিতে।
অন্যজন সব ফ্লাইট বন্ধের পরামর্শ দিলেন।
বর্ডারে কড়াকড়ি নজর বাড়ানোর দরকার বলে কেউ কেউ মনে করেন। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে একজন মন্ত্রী বললেন , এখনও সংক্রমণ খুব বেশি পর্যায়ে যায়নি। তাই যাদের ধরা পড়েছে তাদের মেরে ফেলাই উত্তম। নাহলে পরবর্তীতে লাশের মিছিল দেখতে হবে। তার কথা শুনে সবাই স্তম্ভিত।
আমি যদি করোনায় সংক্রমিত হই তাহলে কি আমাকেও আপনি মেরে ফেলবেন? মি. নেয়ার অবাক হয়ে মন্ত্রীর কাছে জানতে চাইলেন।
না, মানে আমি তা বলতে চাইনি। মন্ত্রী ঠিক বুঝতে পারেনি মি. নেয়ার এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন।
আফসোস সেই হতভাগাদের জন্য যারা আপনাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে! মি. নেয়ার ক্ষুব্ধ হলেন।
দুদিন আগে আপনি এক বিদেশি প্রতিনিধির সাথে সাক্ষাত করেছেন যিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। খবরটা আজকেই সবাই জানল । আপনি হয়তো জানেননা। তাই এখন থেকে আপনার উপর নজর রাখা হবে। আপনার মধ্যে করোনাভাইরাসের উপসর্গ দেখতে পেলে
আপনার কথামত আপনাকে...একজন মন্ত্রী বললেন।
বেচারা নিজের ফাঁদে নিজে পড়ে ঘামতে লাগলেন।
# বেফাঁস মন্তব্য
চলবে ...

কোভিড-১৯ ও একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ভাঙন
                                  
তানজিলা

আমি ভাত খাবোনা। জয় খুব জিদ ধরলো।
কেন খাবিনা ? খেতে হবে। নাবিলাও জিদ ধরলো।
প্রতিদিন আলুর ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে আমার ভালো লাগেনা। সকালেও আলু ভাজি দিয়ে রুটি খাওয়ালে। জানি রাতেও আলুর ভর্তা।
জয় সত্যি বলছে। কয়েকদিন থেকে নাবিলাদের খাবার রুটিনে ডাল আর আলু থাকে। কোনোদিন নাম মাত্র তেল দিয়ে আলু ভাজি , কোনোদিন ভর্তা। মাঝে মধ্যে একটু শাক ভাজি। পেঁয়াজ কেনা তাদের কাছে এক ধরণের বিলাসিতা। তাই পেঁয়াজ ছাড়াই সব রান্না হয় ।
জয়ের এমন কথা শুনে সবার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। নাবিলার চোখ জলে ছলছল করে উঠলো।

ওকে কেন একটা মাছ ভাজি করে দিলেনা ? রহমান সাহেব তার স্ত্রী সালেহাকে বললেন।রহমান সাহেব জানেন ঘরে কোনো মাছ নেই। তবুও নিজেকে সান্তনা দিতে মিথ্যা অভিনয় করলেন ।

আমার মনে ছিলোনা। রাতে দিবো। সালেহা বেগমও এই অভিনয়ের মানে বুঝতে পেরে জবাব দিলেন।
বাবলু চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু জয়ের এমন কথা আর নাবিলার কান্ড দেখে তার গলা দিয়ে ভাত নাম ছিলোনা। না খেয়েই হাত ধুয়ে উঠে পড়লো। নিজেকে সবসময় তার একটা অপদার্থ মনে হয়। কারণ এখনো সে বাবার টাকায় চলছে। অনেক চেষ্টা করেও কোনো জব মিলাতে পারছেনা।কেউ কেউ বললো কিছু টাকা ম্যানেজ করে দিতে পারলে হয়তো একটা জব জুটেও যেতে পারে। কিন্তু তাদের সেই সামর্থ্য নেই। পরিচিত অনেকের দ্বারে ঘুরেও কোনো লাভ হলোনা। জব দিবে বলেও আর দেয়নি।
টিউশনের টাকা বাঁচিয়ে মাঝে মধ্যে জয়ের জন্য চকোলেট আর চিপস নিয়ে আসতো। কিন্তু করোনা ভাইরাস দেশে ছড়িয়ে পড়ার কারণে সর্বত্র লকডাউন চলছে। সবাই হোম কোয়ারেন্টাইন মানছে। তাই তার টিউশনগুলো চলে যায়। টিউশনের বাসগুলো থেকে জানালো সবকিছু স্বাবাবিক হওয়ার আগে পর্যন্ত তারা বাচ্চাদের পড়াবেনা।
ইতিরও কান্নায় চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। রিফাত প্লেটে ভাত নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। তার খিদে যেন মরে গেছে। সে এবার এইচএস সি পরীক্ষার্থী। কিন্তু তার মোটেই পরীক্ষা দেয়ার ইচ্ছে নেই।
একদিনতো সাহেলা বেগমকে বলে বসলো ,
মা আমি পরীক্ষা দিবো না। আমাকে দিয়ে না পড়াশোনা হবেনা। তারচেয়ে বরং আমি পাড়ার মোড়ে একটা টেইলার্সের দোকান দিবো ।
এটা কি বলছিস তুই ? তোর বাবা শুনলে কিরকম রাগ করবে বুজতে পারছিস। হঠাৎ রিফাতের মুখে এমন কথা শুনে সত্যি খুব অবাক হলেন। কারণ রিফাত পড়াশুনায় খুবই ভালো। সবসময় ক্লাসে ফার্স্ট বয় ছিল। এসএসসিতেও তার গোল্ডেন এ প্লাস ।
ধুর বাবা বেশি বুঝে। এসব পড়াশুনা করে হবেটা কি ? ভাইয়া এখনো কিছু করতে পেরেছে ?
পারেনি বলে কি পারবেনা ? চাকরি-বাকরি কি অতো সহজ ? সময় হলে দেখিস ঠিকই পেয়ে যাবে।
মা , তুমিওনা বাবার মতো হয়ে গেসো। কিচ্ছু বুঝনা।
তুই পড়াশুনায় অনেক ভালো। তোর বাবার ইচ্ছে তোকে ডাক্তার বানাবে। এখন যদি তুই এমন কথা বলিস তোর বাবা তো মরেই যাবে।
বাবার এখনই যে অবস্থা। আমি কবে ডাক্তার হবো আর তোমাদের সবাইকে ভালো রাখবো। বলো ?
পারবি বাবা। একটু ধর্য্য ধর। তোর বাবার কষ্টটা সার্থক হবে।
বাবা যদি নাই থাকে আমার ডাক্তার হয়ে কি লাভ বলো। রিফাত কেঁদে দিলো। সালেহা বেগম ছেলেকে সান্তনা দিবেন কি নিজেই কেঁদে ফেললেন।
তবুও ভয়ে ভয়ে একদিন সালেহা বেগম রহমান সাহেবকে বললেন।
রিফাত বলছে সে নাকি পরীক্ষা দিবেনা।
পরীক্ষা দিবেনা! তো করবেটা কি ? রহমান সাহেব খুব রেগে গেলেন।
এতো রাগছো কেন ? ঠান্ডা মাথায় কথাটা শুনো।
মাথা ঠান্ডা হওয়ার মতো কোনো কথা বলেছো ?
আচ্ছা এখন বুজিয়ে বলছি। সে পাড়ার মোড়ে একটা টেইলার্সের দোকান দিতে চায়। সংসারে অবস্থা তো ভালো নয়।
তাই ?
সালেহা বেগম মাথা নেড়ে হা জানালেন।
বাহ্ বেশ ভালোতো। আমার ছেলের মাথায় এতো বুদ্ধি ! আগেতো জানতামনা।
আপনি রাজি ! সালেহা বেগম বিশ্বাস করতে পারছেননা রহমান সাহেব এতো সহজে রাজি হয়ে যাবেন।
রহমান সাহেব খেতে খেতে সালেহা বেগমের দিকে আড়ো চোখে তাকালেন। তারপর বললেন ,
শুনো। টেইলার্স হতে হলে তো দোকান ভাড়া নিতে হবে। মেশিন লাগবে। টাকা পয়সার ব্যাপার আছে। তারচেয়ে ওকে বলো মেথড় হতে। তাহলে শুধু বালতি আর ঝাড়ু হলেই চলবে। আমারও সমাজে শুনাব বাড়বে। কারণ তখন লোকে আমাকে দেখিয়ে বলবে ,
ওই দেখ , মেথড়ের বাপ্ যায়।
ছেলেটা সংসারের হাল ধরতে চাইলো। এতে দোষের কি ?
কেন ? আমি কি মরে গেছি নাকি ?
কি যাতা বলছেন ! সংসারের টানাটানির কথা আপনি জানেনা? সালেহা বেগম খুব রেগে গেলেন ।
কিন্তু রহমান সাহেব হেসে দিলেন।
বাহ্ এখনো দেখছি আমার প্রতি তোমার টান আছে। মরে যাবার কথা বলতেই কেমন ফোঁস করে উঠলে।
আপনার কি কোনো লাজ লজ্জা নেই ? ঘরে ছেলে মেয়েরা আছে সেদিকে কোনো খেয়াল আছে ? সালেহা বেগম খুব লজ্জা পেলেন।
থাকবেনা কেন ? ওরাতো আমাদের দেখেই শিখবে কিভাবে একটা ফ্যমিলি ভালো রাখতে হয় । কয়দিনপর ওদের সংসার হবে। আমি যদি তোমার সাথে দুর্ব্যাবহার করি , আমার ছেলেরাও ঠিক তেমনি তাদের বৌয়ের সাথে দুর্ব্যাবহার করবে। বুঝতে পেরেছো?
ঠিক বলছেন, এমন করেতো কখনো ভাবিনাই। সালেহা বেগম রহমান সাহেবের কোথায় মুগ্ধ হলেন।
দেইখো, নতুন করে আবার আমার প্রেমে পরে যেওনা যেন। প্রেমে পড়লে তো তোমার মধ্যে এক ধরণের পাগলামি দেখা দেয়।
রহমান সাহেব সালেহা বেগমকে নিয়ে মজা করতে লাগলেন।
আজকে কি আপনার মাথায় ভূত ভর করসে ? এমন রং তামাশা শুরু করেছেন ?
মাঝে মাঝে একটু করলে দোষ কি। সালেহা বেগমের কপট রাগে রহমান সাহেব মজা পেয়ে হাসতে লাগলেন।
 
বাবা মায়ের এমন খুনসুটি দেখে, নাবিলা ,বাবলু, ইতি এবং রিফাত দরজায় উঁকি দিয়ে দেখলো। তাদের এমন বদমেজাজি বাবা মনে মনে এতো বড়ো প্রেমিক ! অথচ কখনো তারা বুজতেই পারেনি। সংসারের টানাপোড়নে বাবার প্রেমিক হৃদয় তাদের কাছে অজানায় থেকে গেলো। তাই আজ তাকে এমন প্রেমিকের মতো কথা বলতে দেখে তারা সবাই বিস্মিত।
শোনো, তোমাকে একটা কথা বলি। রহমান সাহেব সালেহা বেগমকে বললেন।
ওরে বলো পৃথিবীতে যত মানুষ বড়ো হয়েছে , সবাই অনেক কষ্ট করে বড়ো হয়েছে। এইযে স্টিভ জবস , আইনস্টানই আরো কত আছে। তাদের কথা বাদ দিলাম আমাদের জাতীয় কবি নুজরুল ইসলাম কত কষ্ট করে বড়ো হয়েছেন। ছোট বেলায় সবাই তাকে দুঃখু মিয়া বলে ডাকতো। অথচ আজ মৃত্যুর পরও মানুষ তাকে ভালোবসে।
সালেহা বেগম একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন।
বড়ো হতে হলে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। সোনা যেমন পুড়ে পুড়ে খাঁটি হয় , তেমন করে মানুষকেও দুঃখ-কষ্ট সয়ে খাঁটি হতে হয়। বুঝেছো?
আমি বুঝে কাজ নেই। আপনার ছেলেকে আপনি বুঝান।
কেন? তুমি বুঝতে পারোনা ।
না। আপনার ছেলেও আপনার মতোই। তারে যদি আমি এইগুলা বলি, সে আমারে শুনাবে,
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় ...
অ। রহমান সাহেবের মুখ শুকিয়ে গেলো।
রহমান সাহেব একটা বেসরকারি কোম্পানিতে তিনি সামান্য বেতনের চাকুরী করেন। যা পান তাতে তার পোষায় না।তবুও তিনি জীবন যুদ্ধে হার না মানা যোদ্ধা। কষ্টে করে ছেলে মেয়েকে তিনি পড়াশুনা করাচ্ছেন ।জীবনে তার একটাই চাওয়া। তার ছেলে মেয়েরা যেন মানুষের মতো মানুষ হয়।
 
এবার আসি নাবিলার গল্পে ।
নাবিলা অনার্স শেষ করারপর হাবিবের সাথে বিয়ে হয় তার আগে। তাদের ছয়মাসের প্রেম ছিল। হাবিব একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জব করে । ছয় বছর তাদের ভালোই কাটছিলো। কিন্তু হঠাৎ হাবিব অন্য একটা মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পরে। তাই নাবিলা জয়কে নিয়ে বাবার বাসায় চলে আসে।
 
হাবিবের সাথে বিচ্ছেদ হওয়ার পর এক পরিচিতের মাধ্যমে একটা বেসরকারি হাই স্কুলে শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ পায়। যা টাকা পায় তাতে তার নিজেরই ঠিকমতো চলেনা। তারউপর করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার দরুন স্কুল বন্ধ হয়ে গেলো। স্কুল থেকে জানালো স্কুল বন্ধ থাকাকালীন তাদের কোনো বেতন দেয়া হবেনা।
 
এদিকে হাবিবও আর তাদের কোনো খোঁজ নেয়নি নাবিলা শুনেছে হাবিব আবার বিয়ে করেছে। অথচ রাগ করে চলে আসার সময় নাবিলা ভেবেছে হাবিব তাকে আটকাবে নয়তো পরে এসে তাদের নিয়ে যাবে। কিন্তু ভাঙা কাঁচ কি আর জোড়া লাগে !
 
ইতি মার্স্টাসে পড়ছে। নিজের হাত খরচ এবং ফ্যামিলিকে সাহায্য করার উদ্দেশে অনলাইন নিজে একটা বিজনেস করছিলো। কিন্তু সেটাও করোনা ভাইরাসের জন্য আপাতত বন্ধ করে দিতে হলো। অন্যদেরমতো সেও কর্মহীন হয়ে পড়ে। নীরব দর্শকের মতো সংসারের দুরাবস্থা দেখা ছাড়া কিছুই করার নেই। খুব বেশি হলে কেঁদে মন একটু হালকা করার যায়। কিন্তু জয়কে নিয়ে মুশকিল। এতটুকু বাচ্চাকে কি করে বোঝাবে তারা !
সেদিন বললো ,
খামণি তুমি কেন এখন আর আমার জন্য কেক নিয়ে আসোনা। নাবিলার চেয়ে জয় ইতিকে বেশি পছন্দ করে। কারণ ডিপ্রেশনে থাকায় নাবিলা কারণে অকারণে জয়কে মারে।
আব্বু , তুমি তো জানোনা শহরে বিশাল একটা দৈত্ত আসছে। সে কেক খেতে পছন্দ করছে। আমি যদি তোমার জন্য কেক নিয়ে আসি। তাহলে তো সে তোমাকে নিয়ে যাবে। আমি কি আমার সোনাবাবুকে হারিয়ে যেতে দিতে পারি ?
জয় মাথা নেড়ে না দেখায়।
এইতো আমার আব্বুটা কত্ত লক্ষী। দৈত্যটা চলে গেলেই আমি তোমাকে এত্ত এত্ত কেক আর চকোলেট কিনে দিবো। ঠিক আছে বাবা?
মামা চিপস আনবেতো ?
হ্যা , নিশ্চয় আনবে । আমার এত্ত সুইট, লক্ষী বাবার জন্য কেউ কি চিপস না এনে পারবে ?
তাহলে নাঈম কেন চিপস , চকোলেট সবকিছু খায়। ইতির মুখ খানিকটা ম্লান হয়ে যায়।
নাঈমতো জানেনা দৈত্য এগুলা পছন্দ করে। এগুলা খেতে দেখলে দৈত্যটা তাকে নিয়ে যাবে ।
তাহলে আমি তাকে নিষেধ করে দিবো।
না বাবা। তুমি কিছু বলোনা। ওর আম্মু খুব রাগ করবে। খালামণি বুঝিয়ে বলবো ।
আচ্ছা ঠিক আছে। জয় খুব মন খারাপ করে বললো।
তাহলে দৈত্যটা কবে যাবে ?
এইতো বাবা আর কিছুদিন পরেই চলে যাবে। তখন তোমার যা ইচ্ছে খেতে পারবে।
নাঈমদের বাসায় যেতে পারবো ?
পারবেতো।
আমি আর নাঈম ছাদে গিয়ে খেলা করতে পারবো?
অবশ্যই পারবে।
স্কুলেও যেতে পারবো ?
হ্যাঁ বাবা। স্কুলে যাবে। সব বন্ধুদের সাথে খেলা করবে।
কত্ত মজা হবে। জয় হাত তালি দেয়।
ইতির " Life is Beautiful " মুভির কথা মনে পড়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় অসহায় গুইডো নিজের ছেলেকে বাঁচানোর জন্য ছেলের কাছ থেকে সত্য ঘটনা আড়াল করে। ছেলেকে বুঝায় পুরো ঘটনা একটা খেলা। এমনকি মৃত্যুর আগেও ছেলেকে কিছুই বুঝতে দেয়নি।
ইতির নিজেকেও এখন তেমন অসহায় মনে হচ্ছে । প্রতিদিন এই গল্প , সেইগল্প বলে জয়কে বুঝতে হয় !
 
 
ঘরের চাল-ডাল পুরিয়ে আসছে দেখে সালেহা বেগম তার গহনাগুলো বেচতে চাইলেন।
আমার কাছে এই কয়টা গহনা আছে। দেখেনতো এইগুলা বেচা যায় কিনা।
বলছো কি ? তোমারতো এই কয়টা গহনা। এগুলা বেচলে কি করে হবে। তাছাড়া এখনতো সোনার দামও কমে গেছে ।
যাই হোক। আমার আর এখন এসব পরতে ভালো লাগেনা। আপনার মা আমাকে এইগুলা দিসিলো। তাই ভাবলাম আমিও ছেলেদের বৌদের দিয়ে যাবো।
কিন্তু এখন যা অবস্থা। আগে আমরা ছেলে-মেয়েরা বেঁচে থাকুক। তাছাড়া আপনার ঔষধগুলো শেষ হয়ে গেসে।
তোমার ঔষধ আছেতো ?
আমি এখন ঠিক আছি। আমার না হলেও চলবে।
সংসারের টানাটানি পড়েই থাকে। তারউপর ঔষধ কেনার বাড়তি খরচ তাদের জীবন আরো দুর্বিষহ করে তোলে।
কেন শুধু শুধু মিথ্যা বলছো ? তুমি না থাকলে ছেলে-মেয়েগুলার কি হবে?
সালেহা বেগমের মুখ কালো হয়ে গেলো।
ছেলে-মেদের জন্য তোমাকে সুস্থ থাকতে হবে। ভালো থাকতে হবে। বুঝেছো?
সালেহা বেগম অন্যান্য সময়ের মতো এখনো একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়লেন। এছাড়া যেন তার আর কিছু বলার নেই , করার নেই ।
ঠিক আছে। তাহলে কিছু দাও। সবটা বেচার দরকার নেই। দেখো আর কয়দিনের মধ্যে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। রহমান সাহেব বললেন।
গহনা বিক্রি করে আসার সময় একজন রহমান সাহেব রোগ-পটকা রিকশাওয়ালাকে নিলেন। তার রিকশার কোনো দরকার ছিলোনা। তবুও নিলেন। কারণ রিক্সাওয়ালাকে পানসে মুখে বসে থাকতে দেখে তার মায়া হলো। তাই রিকশায় উঠলেন। কিন্তু সে যেভাবে রিকশা চালাচ্ছে রহমান সাহেবের মনে হচ্ছে তিনি ভ্যান গাড়িতে করে যাচ্ছেন। বরং তারচেয়ে আরো স্লোওলী চালাচ্ছে।
ভাড়া কেমন পাচ্ছেন ? রহমান সাহেব কখনো রিক্সাওয়ালাদের তুমি বা তুই করে বলেননা। সে ছোট হলেও ।
ভারা এখন আর পামু ক্যামনে। সব তো বন্ধ হইয়া গেসে। মানুষজনও নাই।
সংসার চলে কিভাবে?
ভারা পাইলে চলে। নইলে উপোস থাকে অয়।
ওহ , রহমান সাহেবের মন খারাপ হয়ে গেলো ! বাসায় কে কে আছে ?
পোলা-মাইয়া চারটা। আমার মা আছে , বো আছে। তারা সব গেরামে থাহে।
বাহ্। আমরাও চারজন ছেলে মেয়ে । ছোট ছেলেটা খুব ব্রিলিয়ান্ট । ইচ্ছে আছে তাকে ডাক্তারি পড়াব। বাকিরাও খুব ভাল। বলা চলে সোনার টুকরো। বুঝলেন ?
রিকশাওয়ালা হ্যাঁ না কিছু বললো না । তার ভাব এমন যে সে ভাড়া নিলো টাকা পাওয়ার জন্য।ভাড়া পেলেই হলো। রহমান সাহেবের ছেলে-মেয়ে সোনার টুকরো, না রুপার টুকরো তা বুঝে তার কোনো কাজ নেই ।
আপনার ছেলেমেয়রা পড়াশুনা করতো ?
হ । করে । রহমান সাহেবের বকবকানিতে রিকশাওয়ালা খানিকটা বিরক্ত।
দুপুরে খাবার খেয়েছেন ?
না , এহনো খাইনাই। রহমান সাহেব খেয়াল করলেন রিক্সাওয়ালার কণ্ঠে যেন জোর নেই। কথা বলতেও তার কষ্ট হচ্ছে।
বাসার সামনে আসার পর রহমান সাহেব রিকশাওয়ালাকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে বললেন,
এর চেয়ে আমার আর এখন বেশি সামর্থ্য নেই। এই টাকাগুলা রাখেন। বাড়িতে পাঠিয়ে বলেন চাল-ডাল কিনে নিতে।
রিকশাওয়ালা এমনটা ভাবতেই পারেনি। তার মনে হচ্ছে সে স্বপ্ন দেখছে। টাকাগুলো নেয়ার সময় তার হাত কাঁপছিলো। তাই দেখে রহমান সাহেব বললেন,
আরে ঠিক আছে। আপনি এখনো কিছু খাননি। তাড়াতাড়ি কিছু খেয়ে নিন।
 
বাসায় আসারপর সালেহা বেগম ঔষধের প্যাকেট চেক করে দেখলেন। রহমান সাহেব নিজের জন্য ঔষধ নিয়ে আসেননি।
আপনার ঔষধ কই ?
আমি ঠিক আছি আমার এখন ঔষধ লাগবেনা। রহমান সাহেবের এমন কথা শুনে সালেহা বেগমের সন্দেহ হলো ।
সত্যি করে বলেনতো কাকে টাকা দিয়ে আসলেন ? সালেহা বেগম জানেন রহমান সাহেব কারো কষ্টের কথা শুনলে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননা। পকেটে টাকা থাকলে দিয়ে দেন।
না মানে , আসার সময় একটা রিক্সাওয়ালার সাথে .. রহমান সাহেব আমতা আমতা করে বললেন।
থেমে গেলেন কেন সালেহা। বেগম চোখ রাঙিয়ে রহমান সাহেবের দিকে তাকিয়ে আছেন ।
তুমি রাগ করো কেন? কয়দিন থেকে তো সব বন্ধ! বেচারা কোনোও ভাড়া পায়না তাই কিছু টাকা দিয়ে দিলাম ।
কত টাকা দিলেন ?
এই হাজার পাঁচেক। শুনে সালেহা বেগমের খুব রাগ হলো।
যাহোক। আজকেতো সত্যিটা বললেন। সালেহা বেগমের ভয়ে রহমান সাহেব কাউকে টাকা দিলেও বলতেন না। বাসায় এসে এমনভাব করতেন যেন তার পকেট থেকে টাকা হারিয়ে গেছে । নয়তো চুরি হয়ে গেছে। পরে অবশ্য মনের ভুলে পরে সব বলে ফেলতেন।
এই দেখ , কবে তোমাকে বলিনা? পরে হলেওতো বলি।
তা সব টাকা দিয়ে দিলেই পারতেন।
আহা এমনভাবে বলছো কেন। বেচারা রিকশা যেন টেনে চালাতে পারেনা। দেখে খুব মায়া হলো ।
তাতো হবেই। সংসারতো আপনি চালাচ্ছেন না।
রাগ করো না। কয়দিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে।
তা নাহয় বুজলাম। আপনার ঔষধ ? কতদিন থেকে আপনার হার্টের সমস্যা বেড়ে গেছে। সেদিকে খেয়াল আছে ?
আমি ঠিক আছি।আমার এখন না হলেও চলবে। যেখানে মানুষ খাবার পায়না সেখানে ঔষধ খাওয়া আমার কাছে এক ধরনের বিলাসিতা !
 
সালেহা বেগম রাগ করতে গিয়েও রাগ করতে পারলেননা। কারণ রহমান সাহেব এমনই অদ্ভুত। সমাজের মানুষ তাকে বোকা আর বেকুব বলবে।এই সমাজের কাছে তার মনুষ্যত্বের কোনো মূল্য হয়তো নেই। কিন্তু সালেহা বেগমের কাছে তার মূল্য অনেক। তাইতো বাবার পছন্দ করা বড়োলোক ছেলেকে বিয়ে না করে তিনি রহমান সাহেবের কাছে চলে আসলেন। কারণ সমাজের চোখে এই অদ্ভুত, বোকা আর বেকুপ মানুষটাকে তিনি ভীষণ ভালোবাসেন !
করোনা ভাইরাসের প্রকোপ থামছেনা। লকডাউনও শেষ হচ্ছেনা। এর মধ্যে রহমান সাহেব হঠাৎ একদিন বাসা থেকে উধাও। সারাদিন গেলো তার কোনো খোঁজ নেই। বাবলু থানায় গেলো। সব আত্মীয় স্বজনের বাসায় খোঁজ নিলো। কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারছেনা।
সন্ধ্যার পর অথাৎ বাবলুর ফোন একটা অচেনা নম্বর থেকে কল আসে। রহমান সাহেব ফোন করেছেন ।
হ্যালো , বাবলু । আমি তোর বাবা বলছি। শুনে বাবলু যেন নিশ্বাস ফিরে পেল। চিৎকার দিয়ে সালেহা বেগমকে ডাকলো ,
মা মা , বাবা ফোন করেছে । তার চিৎকার শুনে তারা সবাই এসে জড়ো হলো বাবলুর রুমে। সবাই যেন শুনতে পায় তাই বাবলু লাউড স্পিকার দিলো।
ও পাশ থেকে রহমান সাহেবকে খুক খুক করে কাশছেন।
হ্যালো , তুমি কই আছো ? সারাদিন তোমার কোনো খোঁজ নেই। আমরা সবাই চিন্তায় অস্থির হয়ে গেছি। সালেহা বেগম বাব্লুর হাত থেকে ফোন প্রায় কেড়ে নিয়ে বললেন।
এতো চিন্তা করোনা। আমি ঠিক। এক বন্ধুর বাসায় দরকারে আসলাম। আটকা পড়ে গেছি। বাসায় আর যেতে পারিনি।
কোন বন্ধুর বাসায় গেসো ? আমরাতো সব জায়গায় খোঁজ নিলাম।
আরে তুমি চিনবেনা। আমার ছোট বেলার বন্ধু ।
আগেতো কখনো বলোনি। নাকি কিছু লুকাচ্ছ ? সালেহা বেগমের মনে খটকা লাগলো।
তোমাদের কাছে কখনো কিছু লুকাতে পারি ? এতো চিন্তা করছো কেন। আমি কয়েকদিনের মধ্যে চলে আসবো। রহমান সাহেব আবার খুক খুক করে কাশতে লাগলেন।
তোমার কি হয়েছে ? এমন কাশছ কেন ?
আরে কিছু হয়নি ।একটু ঠান্ডা লাগেছে আর কি।
সাবধানে থাকতে পারোনা ?
সালেহা বেগমকে একটু উদ্বিগ্ন হতে দেখে রহমান সাহেব একটু হাসলেন।
আচ্ছা থাকবো। তারপর আবারও কাশতে লাগলেন। কণ্ঠ শুনে মনে হচ্ছে তার গলাটা বসে গেছে । ঠান্ডা লেগেছে ।
শুনো, আমার জিনিজপত্র কিছু ধরোনা । আর বাসার সবকিছু জীবাণুমুক্ত করে নিও।
কেন ? এমন কথা শুনে এক অজানা আশংকায় সালেহা বেগমের বুকের ভেতর ধক করে উঠলো ।
আরে এমনি। এখনতো পরিস্থিতি ভালোনা। তাই একটু সাবধানে থাকবে আর কি। ওদের সবার দিকে নজর রাইখো। লাইনটা কেটে গেলো। শত চেষ্টা করেও আর সেই নাম্বারে সংযোগ পাওয়া গেলোনা। একদিন দুদিন করে পেরিয়ে যাচ্ছে। কোনো অচেনা নম্বর থেকে রহমান সাহেবের আর ফোন আসেনা।
 
জয় সবাইকে কাঁদতে দেখতে নাবিলাকে জিজ্ঞেস করল। মামনি তোমরা সবাই কাঁদছো কেন ? নানুভাই কোথায় গেছে ?
তোমার জন্য বড়ো একটা মাছ আনতে গেছে। তুমিনা মাছ ভাজি দিয়ে ভাত খেতে পছন্দ করো নাবিলা চোখের পানি মুছে বলল।
তাহলে তোমরা সবাই কাঁদছো কেন ? এমনি বাবা ।
রহমান সাহেব করোনা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। বুজতে পেরে তিনি পরিবারের সবার কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করে নেন। সবাইকে কিছু না বলে এক বন্ধুর সাহায্যে একটা হসপিটালে চলে আসেন। তার সেই বন্ধুকে বাসায় কিছু জানাতে নিষেধ করেন। এটাও বলেন তিনি যদি মারা যান তাহলে যেন বাসায় না জানায়। তার কারণে ফ্যামিলির সবাই করোনায় আক্রান্ত হোক তিনি তা চাননা । তিনি ভাবেন সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে যাবেন। কিন্তু তার আর বাসায় ফিরে যাওয়া হলোনা।
 
বেশ কয়েকদিন পর রহমান সাহেবের বন্ধু বাবলুকে জানায় তার বাবা করোনা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় এবং তার ইচ্ছে অনুযায়ী তাকে দাফন করা হয়। বাবলুর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। বদ মেজাজি বাবার জন্য তার মনটা হুহু করে কেঁদে উঠল। চোখের সামনে ভেসে উঠে শুকনো ছিপছিপে দেহের একজন মানুষ তাদেরকে ভালো রাখার জন্য দিনরাত ছুটে চলতেন। ঠোঁটে তার হাসি থাকলেও মুখে রাজ্যের বিষাদ এসে ভর করতো। মাঝে মাঝে পাঞ্জাবির নিচটায় কুঁচকে থাকতো সবসময়। আয়রন করার টাকাও তার কাছে থাকতোনা। এই লোকডাউনের মধ্যেও তাদের মুখে অন্য জুটাতে জীবনের মায়া ত্যাগ করে নিজে বের হতেন। অথচ তাদের কাউকে বাসা হতে বের হতে দিতেননা।
এককান দুকান করে রহমান সাহেবের কথা পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে । তাই মানুষজন, আত্মীয়-স্বজন সবাই আতঙ্কে বাব্লুদের কাছ থেকে সরে যেতে থাকে। যেন তাদের দেখা মাত্রই তারা সবাই করোনায় আক্রান্ত হবে । এমনকি বাড়িওয়ালা তাদের বাড়ি ছেড়ে দিতে বলল।
সাহেলা বেগম রহমান সাহেবের ছবির সামনে বসে কাঁদতে লাগলেন।
সবসময় বলেছে বিপদে মানুষকে সাহায্য করলে তারাও তোমাকে বিপদে সাহায্য করবে। মানুষ না করলে আল্লাহ করবে। এখন সবাই কই ? এসে দেখে যাও আমরা কি পরিস্থিতিতে আছি।
বাবলু জব না পেলে খুব মন খারাপ করতো। তখন রহমান সাহেব সাহস দিয়ে বলতেন , মনোবল কখনো হারাবেনা ।নিশ্চয় ভালো কিছু হবে।
নাবিলার মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন , জীবনে অনেক ঝড় আসবে। তাই বলে কি এভাবে ভেঙে পড়লে হবে ? জীবন মানেই যুদ্ধ। সামনে থেকে লড়াই করে যেতে হবে। জিততে হবে। বাবার এমন অনুপ্রেণায় সে ঘুরে দাঁড়ানোর মতো শক্তি পায়।
ঘরে চাল- ডাল পুরিয়ে আসতে দেখলে সালেহা বেগমের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়তো।তখন রহমান সাহেব বলতেন,
চিন্তা করোনা। আর কিছুদিনের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
হয়তো তাই। আর কিছু দিনের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে। থমকে যাওয়া পৃথিবী আবার কর্মচঞ্চল হয়ে পড়বে । নতুন সূর্য উঠবে কিন্তু বাবলু-নাবিলাদের মতো মধ্যবিত্ত ভাঙা পরিবারগুলো হয়তো আর উঠে দাঁড়াতে পারবেননা ।
 
প্রিতিটি মধ্যবিত্ত পরিবারে বটবৃক্ষের মতো একজন থাকেন। যিনি তার ছায়ায় সবাইকে অনেক যত্নে আগলে রাখেন। শত ঝড়ে নিজে ভেঙে পড়লেও তাদের বিন্দু মাত্র ক্ষতি হতে দেননা । সূর্যের প্রচন্ড তাপে নিজে জলে-পুড়ে মরলেও কাউকে এর আঁচ লাগতে দেননা। সেই বটবৃক্ষ হঠাৎ হারিয়ে গেলে তার ছায়াতলের মানুষেরা ভীষণ অসহায় হয়ে পড়ে। ভীষণ !
জসিম উদ্দিনের ‘কবর’ কবিতাটি করোনা ভার্সনে রূপান্তর!
                                  

পল্লীকবি জসিম উদ্দিনের বিখ্যাত ‘কবর’ কবিতাটিকে কেউ একজন খুব সুন্দর করে বর্তমান করোনা সংকটের সাথে মিলিয়ে সংস্কার করেছেন। কবিতাটি এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অনেকের টাইলাইনে শোভা পাচ্ছে।  জাহিদা খানম নামে এক ফেসবুক ব্যবহারকারীর ওয়াল থেকে রূপান্তরিত কবিতাটি নিম্নে তুলে ধরা হলো-

এইখানে তোর দাদির কবর ডালিম- গাছের তলে,
তিরিশটা দিন হাত ধোঁয়নি সাবান মেশানো জলে।
এতোটুকু তারে ঘরে এনেছিনু গোবর ভর্তি মাথা,
ভোর রাতে উঠে চুপচাপ খেতো তিন থানকুনি পাতা।
এখানে ওখানে ঘুরিয়া ফিরিয়া ভেবে হইতাম সারা;
সারা বাড়ি ভরি এতো ভাইরাস ছড়াইয়া দিল কারা!
এমনি করিয়া জানি না কখন হাত থেকে মুখে মিশে
করোনা তাহার বাসা বেধেছিলো সরাসরি ফুসফুসে।
আইসোলেশনে যাইবার কালে কহিল ধরিয়া পা
এই ভাইরাসে দেখে নিও মোর কিচ্ছুই হবে না।
হেসো না হেসো না, শোনো দাদু সেই থানকুনি পাতা খেয়ে,
ভরসা তাহার কতো হয়েছিলো দেখতিস যদি চেয়ে।
নথ নেড়ে নেড়ে কহিল হাসিয়া, এতো ভয় পেলে চলে
মুসলমানের করোনা হয় না, অমুক হুজুর বলে।
গুজবে যাহার এতো বিশ্বাস কেমন করিয়া হায়,
কবর দেশেতে ঘুমায়ে রয়েছে নিঝঝুম নিরালায়।
হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু, আয় খোদা দয়াময়
থানকুনি পাতা না খেয়ে লোকে, হাতখানা যেন ধোয়!
.
তারপর এই শূন্য জীবনে যতো দেখিয়াছি পাশে,
সচেতন হওয়া বাদ দিয়ে লোকে রোগব্যাধি নিয়ে হাসে।
শতো করোনায় শত মৃত্যুর অঙ্ক হৃদয়ে আঁকি,
লোক সমাগম বাদ দিয়ে তাই সারাদিন ঘরে থাকি।
সাবানরে আমি বড় ভালোবাসি, সাবানের সাথে বাস
আয় আয় দাদু হাত দুটো ধুই, যদি মরে ভাইরাস!
.
এইখানে তোর বন্ধু ঘুমায়, এইখানে তার ভাই,
কি করবি দাদু, আইইসিডিআরের নিয়ম যে মানে নাই।
সেই ফাল্গুনে ফ্রেন্ড তোর আসি কহিল ডাকিয়া মোরে,
দাদু, আমাদের স্কুল ছুটি যাচ্ছি সাজেক ট্যুরে।
হতাশ হইয়া কি আর বলিব, কহিলাম বাছা যাও,
সেই ট্যুর তার শেষ ট্যুর হবে, তাহা কি জানিত কেউ।
সাজেক থেকে ফিরিয়া তাহার সেই যে ধরিল জ্বরে,
সাথে হাচি কাশি, পুরো পরিবার একসাথে গেল মরে।
তোর বন্ধুর জামা জুতো ব্যাগ দুহাতে জড়ায়ে ধরি,
তার প্রেমিকা যে কতই কাঁদিত সারা দিনমান ভরি।
কান্নার পরে জামা-ধরা সেই হাত দিয়েছিলো মুখে,
দুইদিন বাদে শ্বাসকষ্ট দেখা দিলো তারও বুকে।
গলাটি তাহার জড়ায়ে ধরিয়া কাঁদিলো তাহার মা,
পরদিন রাতে করোনা অসুখ, তারেও ছাড়িলো না।
হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু, রহমান খোদা আয়,
আইসোলেশনে সুস্থ হউক, মেয়েটা ও তার মায়!
.
এইখানে তোর বুজির কবর, পরীর মতন মেয়ে,
বিয়ে দিয়েছিনু কাজীদের বাড়ি ইতালির ছেলে পেয়ে
করোনা ছড়ালে ইতালি হইতে ফিরিল বুজির বর,
সেই ছেলে মোটে নয় সচেতন, থাকেনাই একা ঘর।
খবরের পর খবর পাঠাতো, দাদু যেন কাল এসে,
আমরা সবাই ঘুরতে যাচ্ছি, রায় আমাদের সাথে!
শ্বশুর তাহার বেশি বোঝা লোক, ধারে কি এসব ধার?
করোনার ভয়ে ঘরে থাকা ভুল, বলছিলো বারবার।
যাইনি আমি তাই বেঁচে গেছি, বাঁচেনাই ওরা কেহো,
ইতালির থেকে আসা ভাইরাস ছুয়েছে সবার দেহো।
তোর বুজিও জ্বরেতে পড়িলো আর উঠিলো না ফিরে
এইখানে তারে কবর দিয়েছি দেখে যাও দাদু ধীরে!
আয় আয় দাদু মোনাজাত ধরি, মহান খোদাকে ডেকে
বিদেশ ফেরত সকলেই যেন কোয়ারেন্টাইনে থাকে।
.
হেথায় ঘুমায় তোর বড় খালা, ষাট বছরের বুড়ি,
হার্টের অসুখে চিনি খেতনা, গুড় দিয়ে খেত মুড়ি।
সারাবছরই ডায়াবেটিস আর হাই প্রেশারে ভোগে,
ঘরে থেকেও কী করে শেষে ধরলো করোনা রোগে!
তার ছোটছেলে একদিন গেল ঘুরতে শপিং মলে,
ফেরার সময় বন্ধুরা মিলে আড্ডাও দিলো দলে।
বাসায় ফিরে মায়ের সাথে একসাথে খেলো ভাত,
অসুস্থ তোর বড় খালার সেইদিনই শেষ রাত।
জ্বর কাশি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি নিলো না তারে কেউ,
সবার ঘরেই মৃত্যুর ছায়া, চোখে কান্নার ঢেউ।
সেই চোখমুখ গোলগাল হাত, সকলি তেমনি আছে,
কি জানি মরন ভাইরাসে ধরে খালা তোর চলে গেছে।
.
ঐ রাজপথে সন্ধ্যা নামিছে ঘন আবিরের রাগে,
মৃত্যু মিছিলে বেঁচে থাকিবার স্বাদ নাহি আজ জাগে।
খবর পাঠিকা খবর পড়িছে বড় সুকরুণ সুর,
সোনার বাংলা করোনাতে আজ ভয়াল মৃত্যুপুর!
জোড়হাত তুলে দোয়া মাঙ দাদু আয় খোদা রহমান,
করোনা হইতে রক্ষা করিও দেশের সকল প্রাণ!

ঘুমহীন হৃদয়
                                  

হাসিবুর রহমান

করোনা মোরে করেছে ঘুমহীন
কাটে না সময় কাটে না রাতদিন।
পৃথিবী গুনছে মৃত্যুর সংখ্যা
বাড়ছে স্বজন হারানোর আশংকা।

জানি সবারই হবে একদিন মৃত্যু
তবে কঠিন পীড়াদায়ক এই অপমৃত্যু
শেষ হবে কবে আপদকালীন সময়
পৃথিবী আবার ফিরে পাবে কর্মময়।
মানুষের তরে মানুষ বাঁচি
শান্ত হয়ে ঘরেই থাকি
সাধ্যমত করব সবাই সাহায্য
মানবসেবাই হোক অপরিহার্য।

পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ
করবো না কেউ ওযু ভঙ্গ
আল্লাহকে স্মরণ করি
প্রাণবন্ত হোক মৃত্যুপুরী।


   Page 1 of 3
     শিল্প সাহিত্য
পড়ালেখার উদ্দেশ্য কি চাকুরী জোগাড় মাত্র?
.............................................................................................
গল্পের মধ্যে গল্প
.............................................................................................
গল্প : সুখ
.............................................................................................
আজ আমার রাতের খাবার নেই
.............................................................................................
পথশিশুর স্বপ্ন
.............................................................................................
বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠায় মুসলমানদের অবদান
.............................................................................................
কবি নয়, কবিতা হতে চাই
.............................................................................................
হায়রে বাঙালি
.............................................................................................
চিবুকের কালো তিল
.............................................................................................
মা দিবসে কবি আলম হােসেনের অসাধারণ কবিতা
.............................................................................................
বল্টু
.............................................................................................
দানেই সুখ!
.............................................................................................
অতি চালাকের গলায় দড়ি
.............................................................................................
কোভিড-১৯ ও একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ভাঙন
.............................................................................................
জসিম উদ্দিনের ‘কবর’ কবিতাটি করোনা ভার্সনে রূপান্তর!
.............................................................................................
ঘুমহীন হৃদয়
.............................................................................................
অনুশোচনা
.............................................................................................
জাতীয় কবি নজরুলের প্রয়াণ দিবস আজ
.............................................................................................
একাকিত্বে বহুত্ব
.............................................................................................
কাপালিকের দেশে
.............................................................................................
চলতি বছরের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার স্থগিত
.............................................................................................
ময়মনসিংহে সাহিত্য উৎসব অনুষ্ঠিত, পুরস্কৃত হলেন ৪ গুণীজন
.............................................................................................
প্রথম মৃত্যু
.............................................................................................
শুভংকরের ফাঁকি
.............................................................................................
বউ যেভাবে ঘরে আসে
.............................................................................................
মধ্যরাতের কথা
.............................................................................................
বাঙালির রক্তের বন্ধন ও জাতি-পরিচয়
.............................................................................................
মোহময়ী পিরামিড
.............................................................................................
৮২তম জন্মদিনে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত কবি আল মাহমুদ
.............................................................................................
পাবনা বইমেলা সাহিত্যকে সম্মৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে
.............................................................................................
প্রসঙ্গ: ঐতিহাসিক জ্বীনের মসজিদ
.............................................................................................
তেহরানে প্রথম বিশ্বের স্বাধীনতাকামী আন্দোলন
.............................................................................................
একলা মানুষ
.............................................................................................
নৈশভোজে আসছিস্ তো
.............................................................................................
স্বপ্ন ছিলো
.............................................................................................
ফেরা
.............................................................................................
ডি.লিট ডিগ্রি পাচ্ছেন হাসান আজিজুল হক ও সেলিনা হোসেন
.............................................................................................
বিশ্ববিখ্যাত ১০ নারীর জীবনীগ্রন্থ
.............................................................................................
কবি রফিক আজাদ আর নেই
.............................................................................................
পরপারে চলে গেলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি রফিক আজাদ
.............................................................................................
অমর একুশে গ্রন্থমেলায় শামস সাইদ এর দুটি কিশোর উপন্যাস
.............................................................................................
ঘুম আছে স্বপ্ন নেই
.............................................................................................
নীলফামারীতে পাল আমলের নিদর্শন পাওয়া গেছে
.............................................................................................
কবি শামসুর রাহমানের ৮৭তম জন্মদিন
.............................................................................................
ম্যান বুকার পেলেন জ্যামাইকার মারলন জেমস
.............................................................................................
১৪ অক্টোবর সরদার ফজলুল করিম দর্শন পদক
.............................................................................................
স্মরণ : ছোটোলোকের বাবা ॥ মোঃ আতিকুর রহমান ॥
.............................................................................................
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: জীবন, সাহিত্য ও দর্শন
.............................................................................................

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আখলাকুল আম্বিয়া
নির্বাহী সম্পাদক: মাে: মাহবুবুল আম্বিয়া
যুগ্ম সম্পাদক: প্রদ্যুৎ কুমার তালুকদার

সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: স্বাধীনতা ভবন (৩য় তলা), ৮৮ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০। Editorial & Commercial Office: Swadhinota Bhaban (2nd Floor), 88 Motijheel, Dhaka-1000.
সম্পাদক কর্তৃক রঙতুলি প্রিন্টার্স ১৯৩/ডি, মমতাজ ম্যানশন, ফকিরাপুল কালভার্ট রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত ।
ফোন : ০২-৯৫৫২২৯১ মোবাইল: ০১৬৭০৬৬১৩৭৭

Phone: 02-9552291 Mobile: +8801670 661377
ই-মেইল : dailyswadhinbangla@gmail.com , editor@dailyswadhinbangla.com, news@dailyswadhinbangla.com

 

    2015 @ All Right Reserved By dailyswadhinbangla.com

Developed By: Dynamic Solution IT