মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮ | বাংলার জন্য ক্লিক করুন
  
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

   উপসম্পাদকীয় -
                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                 
জামায়াতীদের নাগরিক মর্যাদা

বিগত কুড়ি-শতক কালপর্ব মানব সভ্যতার অভাবনীয় অগ্রগতিতে যেমন আলোকিত, তেমনি সভ্যতার চরম অধোগতির কালিমালিপ্ত ঘটনাতেও আকীর্ণ সে ইতিহাস। বিগত শতকে বিশ্ববাসী মানবতার চরম অবমাননা প্রত্যক্ষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে, যখন হিটলারের নাৎসী জার্মানী জাতিগত ইহুদী-নিধন অভিযান সুসংগঠিত-বিস্তৃত আকার দেয়। হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের গ্যাস চেম্বারে লাখ লাখ মানুষ হত্যার ঘটনা যুদ্ধ চলাকালে কেউ ধারণাও করতে পারেননি। একেবারে চুড়ান্ত লগ্নে সোভিয়েত লাল ফৌজ এবং মার্কিন বাহিনী জার্মান ভূখন্ডে প্রবেশ করলে আবিস্কৃত হয় গ্যাস চেম্বাররুপী রক্তহীম করা জল্লাদখানা।
যুদ্ধ-সংঘাতের অনুসঙ্গ যুদ্ধাপরাধ বিচারের জন্য যে আলদা দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন সে শিক্ষা মানবজাতি প্রথম উপলব্ধি করে দ্বিতীয় মহাসমরের নির্মমতা প্রত্যক্ষ করার পর। বিশ্বযুদ্ধের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অতঃপর বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠা করে জাতিসংঘ এবং ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার সনদের পাশাপাশি গণহত্যা প্রতিরোধে গৃহীত হয় জেনোসাইড কনভেনশন।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, জেনোসাইড কনভেনশন প্রণীত হলেও বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর অনৈতিক খেলায় নিপীড়িত মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোর কোন লক্ষ্যণীয় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ আর দেখা যায়নি। যুদ্ধাপরাধের প্রতিবিধান বা বিচার সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিরাজমান এ বন্ধ্যা সময়টিতে বাংলাদেশসহ আর্জেন্টিনা, চিলি, ইন্দোচীনের কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, আফ্রিকার রুয়ান্ডা, বলকান অঞ্চলের বসনিয়া-হার্জেগোভিনা এবং ক্রোয়েশিয়ায় সংঘটিত হয় লোমহর্ষক গণহত্যা এবং জাতিগত নিশ্চিহ্নকরণ অভিযান।
সে যাই হোক, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর যুদ্ধক্লান্ত দেশগুলোতে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তিদের বিচারের পাশাপাশি তাদের পরবর্তী বংশধারা সম্পর্কে নেয়া হয় বিশেষ উদ্যোগ। জার্মানীতে নাজিবাহিনীর নৃশংসতা অনুধাবনের সুযোগ দেয়া হয় অপরাধীচক্রের পরবর্তী বংশধরদের। তাদের দেখানো হয় যুদ্ধাপরাধের সাইটগুলো এবং মোটিভেশনের মাধ্যমে ঘৃণা করতে উদ্বুদ্ধ করা হয় পূর্বপুরুষের কৃতকর্ম। নাজীবাদের রাজনীতি চিরতরে নিষিদ্ধ, নাগরিক অধিকার সীমিতকরণসহ সামাজিক নানা বিধিনিষেধের আওতায় রাখা হয় তাদের। বিশ্বযুদ্ধের শিকার অপরাপর দেশগুলোতেও গৃহীত হয় অনুরূপ ব্যবস্থা।   
ইন্দোচীনে মার্কিন হামলার শিকার ভিয়েতনাম আগ্রাসন-মুক্তির পর দখলদার মার্কিন বাহিনীর সহযোগী দেশীয় অপরাধীদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করে আরও কঠোর ব্যবস্থা। সেখানে অপরাধী পরিবারগুলোর সদস্যদের নাগরিক মর্যাদা অবদমন, ভোটাধিকার হরণ এবং সরকারী কর্মক্ষেত্রে তাদের নিষিদ্ধ করা হয়। একজন ভিয়েতনামীর পাশে এদের অবস্থান হয় স্রেফ ভারবাহী পশুর মত। এরা ভিয়েতনামে নানা অবরোধের শিকার হয়েই আছে। জাতির মূলধারায় ফিরতে চাইলে অনেক বাধাবিপত্তি অতিক্রম করেও তা সম্ভব করা অত্যন্ত কঠিন।

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পর অস্ত্র হাতে মুক্তিযোদ্ধারা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্বাধীনতা বিরোধীদের ‘ফাইনাল স্যলিউশন’ টানতে বঙ্গবন্ধুর ফেরার অপেক্ষায় থাকেন। ১০ জানুয়ারী দেশে ফিরে পরিস্থিতি আঁচ করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নিরস্ত্র করার উদ্যোগ নেন এবং আরেকটি নিশ্চিত ‘ব্লাডশেড’ পরিহার করেন। বাহাত্তরের ২৪ জানুয়ারী সরকার ‘বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) অধ্যাদেশ-১৯৭২’ ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এদেশীয় সহযোগীদের বিচারের জন্য গঠন  করে ৭৩টি ট্রাইব্যুনাল। ‘৭৩ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত দালাল অধ্যাদেশে অভিযুক্ত হয় ৩৭,৪৭১ ব্যক্তি, অভিযোগ নিষ্পত্তি হয় ২,৮৪৮টি এবং মাত্র ৭৫২ অভিযুক্তকে দেয়া হয় দণ্ডাদেশ। একই বছরের ৩০ নভেম্বর দালালদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাঙালীরা জানে, কিভাবে ক্ষমা করতে হয়’।

পঁচাত্তরের পনের আগষ্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি জামায়াত-বান্ধব বললে অত্যুক্তি হবে না। এ সময়টিতে কুখ্যাত স্বাধীনতা-বিরোধীদের উত্থান ঘটে সর্বত্র। অনুকূল পরিস্থিতির পূর্ণসুযোগ নিয়ে জামায়াত সংগঠন গোছাতে লেগে পড়ে । শিক্ষাঙ্গণে আগমন ঘটে চরম প্রতিক্রিয়াশীল ছাত্রশিবিরের। একইসাথে আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়তে উদ্যোগী হয় জামায়াত। বলাবাহুল্য, এ সবকিছুতে তারা সফল হয় দারুণভাবে।
পঁচাত্তর পরবর্তী চৌত্রিশ বছর দেশের রাজনীতিতে জামায়াত সদম্ভেই ছড়ি ঘুরিয়েছে। ২০০৯ সালের পর তারা প্রথমবারের মত কঠিন বাধার সম্মুখিন হয়- মানবতাবিরোধী  অপরাধ বিচারের জন্য গড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কাজ শুরু করলে। এর আগে রাজনীতিতে জাপা, বিএনপি এমন কি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগকেও ঘোলা পানি খাইয়েছে এই জামায়াত। ফাঁদে ফেলে আওয়ামী লীগকে রাজাকার-আলবদর শব্দ উচ্চারণই করতে দেয়নি ‘৯৬ সালে বেশ কিছুদিন। বিএনপিকে বাধ্য করেছে নিজস্ব রাজনীতি ভূলে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর গাড়ীতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তুলে দিতে। সেই সাথে স্বাধীনতাপ্রিয় বাংলাদেশের মানুষের মনে সর্বদা ভীতিকর অস্তিত্ব নিয়ে বিরাজ করেছে জামায়াতে ইসলামী।
জামায়াতের এই বিধংসী রাজনীতি বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতিতে কি মাত্রায় ক্ষতিকর প্রভাব ছড়িয়েছে তা ভালভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। আরও দরকার, রাজনৈতিক সম্প্রীতি কলুষিত করার মধ্য দিয়ে একাত্তরে পরাজিত জামায়াতের শবাধারে বিজয় কেতন উড়ানো বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় বাধা সৃষ্টির সুদূরপ্রসারী জামায়াতী অশুভ প্রয়াস নিয়ে কার্যকর গবেষণা।  ভাল হয়, কাজটি যদি জামায়াতের হটকারী রাজনীতির খপ্পরে নাজেহাল ভূক্তভোগী রাজনীকিরা করেন।
বাস্তবতা হলো, শান্তির ধর্ম ইসলামকে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ প্র্যাকটিস করায় মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনের অসন্তুষ্টিতে পড়া স্বাধীনতা-বিরোধী  জামায়াতী তরিকায় আসক্তদের ‘মানুষ’ হওয়াটা করুণাময় আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তবে ‘মান এবং হুঁশ’ নিয়ে যে মানবসত্ত্বা, তাতে ঘাটতিজনিত কারণে আজন্ম হটকারী জামায়াত সমর্থনকারীরা বুঝতে অক্ষম যে, পবিত্র কুর’আন শরীফের বয়ান শুনিয়ে আসলে তাদের কোন্ গাড্ডায় টেনে নামানো হয়েছে। এ হলো মানবজাতির চিরশত্রু ইহুদী জায়নবাদের ‘আমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি’ তত্ত্বের ভয়ানক বর্ণবাদী নিজস্ব আবিষ্কার, যা কাজে লাগিয়ে জায়নবাদের মুরুব্বীরা শতশত বছর তাদের কর্মীদের মনে ভিন্ন জাতিগোষ্ঠির বিরুদ্ধে অবিরাম জিঘাংসা জিইয়ে  রাখতে সক্ষম হয়েছে।
সৌভাগ্যবশত, ন্যায় বিচারক সুমহান আল্লাহর ইচ্ছায় সুদীর্ঘ সাতচল্লিশ বছর পর হলেও জুলুমবাজ জামায়াতীরা স্বীয় হটকারীতার উপযুক্ত প্রতিবিধান ন্যায্যতার ভিত্তিতেই পেয়েছে, এখনও পাচ্ছে এবং আগামীতেও পাবে- ইনশাআল্লাহ।

সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামী গড়ে তোলার অভিপ্রায় সম্পর্কে বলা হয় যে, সময়ের পথ পরিক্রমায় ইসলাম ধর্মে পুঞ্জিভূত আনাচার বিদূরণে ‘সামাজিক আন্দোলন’ পরিচালনার মহৎ উদ্দেশ্যে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু চাক্ষুস সত্য যে, জামায়াতপন্থীরা অচিরেই লক্ষ্যচ্যুৎ হলে সংগঠনটি ক্রমাগত সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং চরম হটকারীতার ধারক হিসেবে পরিচিতি অর্জন করে। জামায়াতের জন্মস্থান পাকিস্তান ভূখন্ডেই রয়েছে এর নানা প্রমাণ।

জামায়াতের মানবতা বিরোধী বিজাতীয় তরিকা সরলপ্রাণ গণমানুষের প্রতি অতিশয় জিঘাংসা-প্রবণ। ‘৭১ সালে নিরপরাধ সাধারণ মানুষের সহায় সম্পদ ইসলামী পরিভাষায় ‘মালে গণিমত’ সাব্যস্ত করে তদনুযায়ী নিষ্ঠুরতার চুড়ান্ত কর্মব্যবস্থা কার্যকর করেছিল জামায়াতের নেতা-সমর্থকরা। বাংলাদেশে পাইকারী গণহত্যা, বাছবিচারহীন নারী ধর্ষণ, জোরপূর্বক দেশান্তর, হেট ক্যাম্পেইন, সম্পদ বিনাশের মত ঘৃণ্য অমানবিক পদক্ষেপে তারা কেবল সহায়তাই করেনি, পবিত্র ইসলাম ধর্মের অপব্যাখ্যা করে তাতে নিজেরাও অংশ নিয়েছিল সমান আন্তরিকতায়। এর মধ্য দিয়ে জামায়াত তাদের ধারাবাহিক হঠকারীতার চুড়ান্ত প্রমান রাখে। অর্থাৎ ইসলাম পরিশুদ্ধির এজেন্ডা ছেড়ে শুরুতেই জামায়াত যে বিধংসী রাজনীতি চর্চায় মনোযোগী হয়েছিল তা অব্যহত রেখেছে আগাগোড়া, কেবল ঢাল হিসেবে ধর্ম ইসলাম ঝুলিয়ে রেখেছে সামনে।

একই সাথে জামায়াত সমর্থকরা আল্লাহ‘র মেহেরবানীর পরোয়া না করে দুনিয়ায় সদম্ভে কায়েম করার চেষ্টা করেছে নিজেদের ‘হেকমত’। জামায়াতীদের এই হেকমতি তৎপরতা ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে মানুষ এবং ভূখন্ডের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির কারণ ঘটানো ছাড়া কখনো কল্যাণ সাধনে সক্ষম হয়নি। আর সে কারণে ন্যায়-পরায়ণ আল্লাহ তাদের মতলবী হেকমত পছন্দ করেননি এবং অপমান-লাঞ্ছনা-পরাজয় অবিরত তাড়া করে ফিরছে জামায়াতীদের। সুতরাং পরম করুণাময়ের ইচ্ছার প্রতি অনুগত থেকে জামাযাতীদের ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করাটাই হচ্ছে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসীদের কর্তব্য।

আমাদের অভিজ্ঞতায় স্বাধীনতা বিরোধী বিকৃত চিন্তা-চেতনার ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াতের বর্তমান অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে সময়োপযোগী করণীয় নির্ধারণ অত্যন্ত জরুরী। মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তি কড়া নাড়ছে আমাদের দুয়ারে। এখনও নিঃশেষিত হননি আমাদের জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা এবং মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষকারী সাহসী প্রজন্ম। সুতরাং পরাজয়ের গ্লানিজনিত কারণে স্বাধীনতা-বিদ্বেষী জামায়াতগোষ্ঠি সম্পর্কে অতীতে গৃহীত ঐতিহাসিক ভূল অথবা বিভ্রান্তি- যাই বলা হোক না কেন, দেশ-জাতির বৃহত্তর কল্যণে সংশোধন করাটা এখন সময়ের দাবী।
ইতোমধ্যে, নিজেদের দুষ্কর্মের কাফ্ফারা চুকাতে বাধ্য হয়েছে জামায়াতের শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীরা। দলীয় নিবন্ধন বাতিলের মধ্য দিয়ে বাধাগ্রস্ত হয়েছে জামায়াতের রাজনৈতিক সক্রিয়তার সুযোগ। এগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে। ফলে দাপট হারিয়ে জামায়াতে ইসলামী আপাতত রাজনৈতিক পরনির্ভরতা স্বীকারে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট নয়। একটি অনিষ্টকর আদর্শ হিসেবে জামায়াতের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি না ঘটলে কালক্রমে এ বিষবৃক্ষের ছায়াবিস্তারী ডালপালা নিষ্ক্রীয় বসে থাকবে না। যেমন হয়েছে অতীতে। কাজেই ভবিষ্যতে আর কেউ যেন জামায়াতের কাফেলায় আশ্রয় খোঁজার চিন্তাও না করে সেজন্য প্রথম দরকার এদের পরিপূর্ণ একটি তালিকা করা। দ্বিতীয়ত. এ তালিকা ধরে জামায়াতী আদর্শ অনুসরণকারীদের আইন করে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক ঘোষণা এবং তদনুযায়ী সরকারী গেজেট নোটিফিকেশন। এ মহতি কাজ সাফল্যের সাথে নিষ্পন্ন করতে গোটা জাতিকে হতে হবে এককণ্ঠ। বলাবাহুল্য, উদ্যোগ নিলে এর বাস্তবায়ন মোটেই অসম্ভব নয়।
এ ব্যবস্থায় দ্বিতীয় শ্রেণীর জামায়াতী নাগরিকদের ভোটাধিকার, সংগঠন করার অধিকার, সরকারী চাকুরী গ্রহনের অধিকার দেয়া যাবে না। সাধারণ কর্মক্ষেত্রে একজন বাংলাদেশী নাগরিকের বেতন যদি হয় এক শ’ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণীর এ নাগরিকের বেতন সেক্ষেত্রে হবে পঞ্চাশ টাকা। একইসাথে সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আরোপ করতে হবে প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ এবং গ্রহণ করতে হবে কার্যকর মোটিভেশন কর্মসূচী। জামায়াতী তরিকা ছেড়ে  মূল ধারায় ফিরতে আগ্রহীদের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে গুরুত্ব দিয়ে। এতে করে জামায়াতী তরিকার ধারে কাছে কেউ আর ঘেঁষতে চাইবে না এবং কালক্রমে স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াতী গজব থেকে নিষ্কৃতি পাবে দেশবাসী। ৩০ লাখ শহীদের আত্মাহুতির বিনিময়ে অর্জিত সার্বভৌম বাংলাদেশ এবং এর অদম্য সৃষ্ঠিশীল ১৬ কোটি মানুষ অনিষ্টকর জামায়াতী ফেতনা আর দেখতে চায় না।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা।

e-mail : chintagrasta@gmail.com



জামায়াতীদের নাগরিক মর্যাদা
                                  

বিগত কুড়ি-শতক কালপর্ব মানব সভ্যতার অভাবনীয় অগ্রগতিতে যেমন আলোকিত, তেমনি সভ্যতার চরম অধোগতির কালিমালিপ্ত ঘটনাতেও আকীর্ণ সে ইতিহাস। বিগত শতকে বিশ্ববাসী মানবতার চরম অবমাননা প্রত্যক্ষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে, যখন হিটলারের নাৎসী জার্মানী জাতিগত ইহুদী-নিধন অভিযান সুসংগঠিত-বিস্তৃত আকার দেয়। হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের গ্যাস চেম্বারে লাখ লাখ মানুষ হত্যার ঘটনা যুদ্ধ চলাকালে কেউ ধারণাও করতে পারেননি। একেবারে চুড়ান্ত লগ্নে সোভিয়েত লাল ফৌজ এবং মার্কিন বাহিনী জার্মান ভূখন্ডে প্রবেশ করলে আবিস্কৃত হয় গ্যাস চেম্বাররুপী রক্তহীম করা জল্লাদখানা।
যুদ্ধ-সংঘাতের অনুসঙ্গ যুদ্ধাপরাধ বিচারের জন্য যে আলদা দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন সে শিক্ষা মানবজাতি প্রথম উপলব্ধি করে দ্বিতীয় মহাসমরের নির্মমতা প্রত্যক্ষ করার পর। বিশ্বযুদ্ধের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অতঃপর বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠা করে জাতিসংঘ এবং ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার সনদের পাশাপাশি গণহত্যা প্রতিরোধে গৃহীত হয় জেনোসাইড কনভেনশন।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, জেনোসাইড কনভেনশন প্রণীত হলেও বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর অনৈতিক খেলায় নিপীড়িত মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোর কোন লক্ষ্যণীয় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ আর দেখা যায়নি। যুদ্ধাপরাধের প্রতিবিধান বা বিচার সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিরাজমান এ বন্ধ্যা সময়টিতে বাংলাদেশসহ আর্জেন্টিনা, চিলি, ইন্দোচীনের কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, আফ্রিকার রুয়ান্ডা, বলকান অঞ্চলের বসনিয়া-হার্জেগোভিনা এবং ক্রোয়েশিয়ায় সংঘটিত হয় লোমহর্ষক গণহত্যা এবং জাতিগত নিশ্চিহ্নকরণ অভিযান।
সে যাই হোক, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর যুদ্ধক্লান্ত দেশগুলোতে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তিদের বিচারের পাশাপাশি তাদের পরবর্তী বংশধারা সম্পর্কে নেয়া হয় বিশেষ উদ্যোগ। জার্মানীতে নাজিবাহিনীর নৃশংসতা অনুধাবনের সুযোগ দেয়া হয় অপরাধীচক্রের পরবর্তী বংশধরদের। তাদের দেখানো হয় যুদ্ধাপরাধের সাইটগুলো এবং মোটিভেশনের মাধ্যমে ঘৃণা করতে উদ্বুদ্ধ করা হয় পূর্বপুরুষের কৃতকর্ম। নাজীবাদের রাজনীতি চিরতরে নিষিদ্ধ, নাগরিক অধিকার সীমিতকরণসহ সামাজিক নানা বিধিনিষেধের আওতায় রাখা হয় তাদের। বিশ্বযুদ্ধের শিকার অপরাপর দেশগুলোতেও গৃহীত হয় অনুরূপ ব্যবস্থা।   
ইন্দোচীনে মার্কিন হামলার শিকার ভিয়েতনাম আগ্রাসন-মুক্তির পর দখলদার মার্কিন বাহিনীর সহযোগী দেশীয় অপরাধীদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করে আরও কঠোর ব্যবস্থা। সেখানে অপরাধী পরিবারগুলোর সদস্যদের নাগরিক মর্যাদা অবদমন, ভোটাধিকার হরণ এবং সরকারী কর্মক্ষেত্রে তাদের নিষিদ্ধ করা হয়। একজন ভিয়েতনামীর পাশে এদের অবস্থান হয় স্রেফ ভারবাহী পশুর মত। এরা ভিয়েতনামে নানা অবরোধের শিকার হয়েই আছে। জাতির মূলধারায় ফিরতে চাইলে অনেক বাধাবিপত্তি অতিক্রম করেও তা সম্ভব করা অত্যন্ত কঠিন।

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পর অস্ত্র হাতে মুক্তিযোদ্ধারা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্বাধীনতা বিরোধীদের ‘ফাইনাল স্যলিউশন’ টানতে বঙ্গবন্ধুর ফেরার অপেক্ষায় থাকেন। ১০ জানুয়ারী দেশে ফিরে পরিস্থিতি আঁচ করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নিরস্ত্র করার উদ্যোগ নেন এবং আরেকটি নিশ্চিত ‘ব্লাডশেড’ পরিহার করেন। বাহাত্তরের ২৪ জানুয়ারী সরকার ‘বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) অধ্যাদেশ-১৯৭২’ ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এদেশীয় সহযোগীদের বিচারের জন্য গঠন  করে ৭৩টি ট্রাইব্যুনাল। ‘৭৩ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত দালাল অধ্যাদেশে অভিযুক্ত হয় ৩৭,৪৭১ ব্যক্তি, অভিযোগ নিষ্পত্তি হয় ২,৮৪৮টি এবং মাত্র ৭৫২ অভিযুক্তকে দেয়া হয় দণ্ডাদেশ। একই বছরের ৩০ নভেম্বর দালালদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাঙালীরা জানে, কিভাবে ক্ষমা করতে হয়’।

পঁচাত্তরের পনের আগষ্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি জামায়াত-বান্ধব বললে অত্যুক্তি হবে না। এ সময়টিতে কুখ্যাত স্বাধীনতা-বিরোধীদের উত্থান ঘটে সর্বত্র। অনুকূল পরিস্থিতির পূর্ণসুযোগ নিয়ে জামায়াত সংগঠন গোছাতে লেগে পড়ে । শিক্ষাঙ্গণে আগমন ঘটে চরম প্রতিক্রিয়াশীল ছাত্রশিবিরের। একইসাথে আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়তে উদ্যোগী হয় জামায়াত। বলাবাহুল্য, এ সবকিছুতে তারা সফল হয় দারুণভাবে।
পঁচাত্তর পরবর্তী চৌত্রিশ বছর দেশের রাজনীতিতে জামায়াত সদম্ভেই ছড়ি ঘুরিয়েছে। ২০০৯ সালের পর তারা প্রথমবারের মত কঠিন বাধার সম্মুখিন হয়- মানবতাবিরোধী  অপরাধ বিচারের জন্য গড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কাজ শুরু করলে। এর আগে রাজনীতিতে জাপা, বিএনপি এমন কি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগকেও ঘোলা পানি খাইয়েছে এই জামায়াত। ফাঁদে ফেলে আওয়ামী লীগকে রাজাকার-আলবদর শব্দ উচ্চারণই করতে দেয়নি ‘৯৬ সালে বেশ কিছুদিন। বিএনপিকে বাধ্য করেছে নিজস্ব রাজনীতি ভূলে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর গাড়ীতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তুলে দিতে। সেই সাথে স্বাধীনতাপ্রিয় বাংলাদেশের মানুষের মনে সর্বদা ভীতিকর অস্তিত্ব নিয়ে বিরাজ করেছে জামায়াতে ইসলামী।
জামায়াতের এই বিধংসী রাজনীতি বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতিতে কি মাত্রায় ক্ষতিকর প্রভাব ছড়িয়েছে তা ভালভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। আরও দরকার, রাজনৈতিক সম্প্রীতি কলুষিত করার মধ্য দিয়ে একাত্তরে পরাজিত জামায়াতের শবাধারে বিজয় কেতন উড়ানো বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় বাধা সৃষ্টির সুদূরপ্রসারী জামায়াতী অশুভ প্রয়াস নিয়ে কার্যকর গবেষণা।  ভাল হয়, কাজটি যদি জামায়াতের হটকারী রাজনীতির খপ্পরে নাজেহাল ভূক্তভোগী রাজনীকিরা করেন।
বাস্তবতা হলো, শান্তির ধর্ম ইসলামকে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ প্র্যাকটিস করায় মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনের অসন্তুষ্টিতে পড়া স্বাধীনতা-বিরোধী  জামায়াতী তরিকায় আসক্তদের ‘মানুষ’ হওয়াটা করুণাময় আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তবে ‘মান এবং হুঁশ’ নিয়ে যে মানবসত্ত্বা, তাতে ঘাটতিজনিত কারণে আজন্ম হটকারী জামায়াত সমর্থনকারীরা বুঝতে অক্ষম যে, পবিত্র কুর’আন শরীফের বয়ান শুনিয়ে আসলে তাদের কোন্ গাড্ডায় টেনে নামানো হয়েছে। এ হলো মানবজাতির চিরশত্রু ইহুদী জায়নবাদের ‘আমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি’ তত্ত্বের ভয়ানক বর্ণবাদী নিজস্ব আবিষ্কার, যা কাজে লাগিয়ে জায়নবাদের মুরুব্বীরা শতশত বছর তাদের কর্মীদের মনে ভিন্ন জাতিগোষ্ঠির বিরুদ্ধে অবিরাম জিঘাংসা জিইয়ে  রাখতে সক্ষম হয়েছে।
সৌভাগ্যবশত, ন্যায় বিচারক সুমহান আল্লাহর ইচ্ছায় সুদীর্ঘ সাতচল্লিশ বছর পর হলেও জুলুমবাজ জামায়াতীরা স্বীয় হটকারীতার উপযুক্ত প্রতিবিধান ন্যায্যতার ভিত্তিতেই পেয়েছে, এখনও পাচ্ছে এবং আগামীতেও পাবে- ইনশাআল্লাহ।

সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামী গড়ে তোলার অভিপ্রায় সম্পর্কে বলা হয় যে, সময়ের পথ পরিক্রমায় ইসলাম ধর্মে পুঞ্জিভূত আনাচার বিদূরণে ‘সামাজিক আন্দোলন’ পরিচালনার মহৎ উদ্দেশ্যে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু চাক্ষুস সত্য যে, জামায়াতপন্থীরা অচিরেই লক্ষ্যচ্যুৎ হলে সংগঠনটি ক্রমাগত সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং চরম হটকারীতার ধারক হিসেবে পরিচিতি অর্জন করে। জামায়াতের জন্মস্থান পাকিস্তান ভূখন্ডেই রয়েছে এর নানা প্রমাণ।

জামায়াতের মানবতা বিরোধী বিজাতীয় তরিকা সরলপ্রাণ গণমানুষের প্রতি অতিশয় জিঘাংসা-প্রবণ। ‘৭১ সালে নিরপরাধ সাধারণ মানুষের সহায় সম্পদ ইসলামী পরিভাষায় ‘মালে গণিমত’ সাব্যস্ত করে তদনুযায়ী নিষ্ঠুরতার চুড়ান্ত কর্মব্যবস্থা কার্যকর করেছিল জামায়াতের নেতা-সমর্থকরা। বাংলাদেশে পাইকারী গণহত্যা, বাছবিচারহীন নারী ধর্ষণ, জোরপূর্বক দেশান্তর, হেট ক্যাম্পেইন, সম্পদ বিনাশের মত ঘৃণ্য অমানবিক পদক্ষেপে তারা কেবল সহায়তাই করেনি, পবিত্র ইসলাম ধর্মের অপব্যাখ্যা করে তাতে নিজেরাও অংশ নিয়েছিল সমান আন্তরিকতায়। এর মধ্য দিয়ে জামায়াত তাদের ধারাবাহিক হঠকারীতার চুড়ান্ত প্রমান রাখে। অর্থাৎ ইসলাম পরিশুদ্ধির এজেন্ডা ছেড়ে শুরুতেই জামায়াত যে বিধংসী রাজনীতি চর্চায় মনোযোগী হয়েছিল তা অব্যহত রেখেছে আগাগোড়া, কেবল ঢাল হিসেবে ধর্ম ইসলাম ঝুলিয়ে রেখেছে সামনে।

একই সাথে জামায়াত সমর্থকরা আল্লাহ‘র মেহেরবানীর পরোয়া না করে দুনিয়ায় সদম্ভে কায়েম করার চেষ্টা করেছে নিজেদের ‘হেকমত’। জামায়াতীদের এই হেকমতি তৎপরতা ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে মানুষ এবং ভূখন্ডের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির কারণ ঘটানো ছাড়া কখনো কল্যাণ সাধনে সক্ষম হয়নি। আর সে কারণে ন্যায়-পরায়ণ আল্লাহ তাদের মতলবী হেকমত পছন্দ করেননি এবং অপমান-লাঞ্ছনা-পরাজয় অবিরত তাড়া করে ফিরছে জামায়াতীদের। সুতরাং পরম করুণাময়ের ইচ্ছার প্রতি অনুগত থেকে জামাযাতীদের ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করাটাই হচ্ছে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসীদের কর্তব্য।

আমাদের অভিজ্ঞতায় স্বাধীনতা বিরোধী বিকৃত চিন্তা-চেতনার ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াতের বর্তমান অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে সময়োপযোগী করণীয় নির্ধারণ অত্যন্ত জরুরী। মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তি কড়া নাড়ছে আমাদের দুয়ারে। এখনও নিঃশেষিত হননি আমাদের জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা এবং মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষকারী সাহসী প্রজন্ম। সুতরাং পরাজয়ের গ্লানিজনিত কারণে স্বাধীনতা-বিদ্বেষী জামায়াতগোষ্ঠি সম্পর্কে অতীতে গৃহীত ঐতিহাসিক ভূল অথবা বিভ্রান্তি- যাই বলা হোক না কেন, দেশ-জাতির বৃহত্তর কল্যণে সংশোধন করাটা এখন সময়ের দাবী।
ইতোমধ্যে, নিজেদের দুষ্কর্মের কাফ্ফারা চুকাতে বাধ্য হয়েছে জামায়াতের শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীরা। দলীয় নিবন্ধন বাতিলের মধ্য দিয়ে বাধাগ্রস্ত হয়েছে জামায়াতের রাজনৈতিক সক্রিয়তার সুযোগ। এগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে। ফলে দাপট হারিয়ে জামায়াতে ইসলামী আপাতত রাজনৈতিক পরনির্ভরতা স্বীকারে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট নয়। একটি অনিষ্টকর আদর্শ হিসেবে জামায়াতের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি না ঘটলে কালক্রমে এ বিষবৃক্ষের ছায়াবিস্তারী ডালপালা নিষ্ক্রীয় বসে থাকবে না। যেমন হয়েছে অতীতে। কাজেই ভবিষ্যতে আর কেউ যেন জামায়াতের কাফেলায় আশ্রয় খোঁজার চিন্তাও না করে সেজন্য প্রথম দরকার এদের পরিপূর্ণ একটি তালিকা করা। দ্বিতীয়ত. এ তালিকা ধরে জামায়াতী আদর্শ অনুসরণকারীদের আইন করে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক ঘোষণা এবং তদনুযায়ী সরকারী গেজেট নোটিফিকেশন। এ মহতি কাজ সাফল্যের সাথে নিষ্পন্ন করতে গোটা জাতিকে হতে হবে এককণ্ঠ। বলাবাহুল্য, উদ্যোগ নিলে এর বাস্তবায়ন মোটেই অসম্ভব নয়।
এ ব্যবস্থায় দ্বিতীয় শ্রেণীর জামায়াতী নাগরিকদের ভোটাধিকার, সংগঠন করার অধিকার, সরকারী চাকুরী গ্রহনের অধিকার দেয়া যাবে না। সাধারণ কর্মক্ষেত্রে একজন বাংলাদেশী নাগরিকের বেতন যদি হয় এক শ’ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণীর এ নাগরিকের বেতন সেক্ষেত্রে হবে পঞ্চাশ টাকা। একইসাথে সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আরোপ করতে হবে প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ এবং গ্রহণ করতে হবে কার্যকর মোটিভেশন কর্মসূচী। জামায়াতী তরিকা ছেড়ে  মূল ধারায় ফিরতে আগ্রহীদের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে গুরুত্ব দিয়ে। এতে করে জামায়াতী তরিকার ধারে কাছে কেউ আর ঘেঁষতে চাইবে না এবং কালক্রমে স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াতী গজব থেকে নিষ্কৃতি পাবে দেশবাসী। ৩০ লাখ শহীদের আত্মাহুতির বিনিময়ে অর্জিত সার্বভৌম বাংলাদেশ এবং এর অদম্য সৃষ্ঠিশীল ১৬ কোটি মানুষ অনিষ্টকর জামায়াতী ফেতনা আর দেখতে চায় না।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা।

e-mail : chintagrasta@gmail.com



অার নয় যৌতুক
                                  

অারিকা মাইশা: যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি।বর্তমানে এই প্রথার ভয়াবহতা বেড়েই চলেছে। প্রতিনিয়ত অসংখ্য নারী অত্যাচারিত ও নিপীড়িত হচ্ছে যৌতুকের কারণে।নারী জাতিকে মর্যাদাহীন করার পাশাপাশি নারী উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে   এই অভিশপ্ত যৌতুক প্রথা।
যৌতুক কি?
যৌতুক হল কন্যার বিবাহে পিতামাতার সম্পত্তি হস্তান্তর প্রক্রিয়া। বিয়ের সময় মেয়েপক্ষের কাছ থেকে ছেলেপক্ষের আর্থিক বা অন্য কোনো সুবিধা নেওয়াকে বোঝায়। তবে আইনে বিয়ের শর্ত হিসেবে বর বা কনেপক্ষের দাবি-দাওয়াকে যৌতুক বলে।
১৯৮০ সালের যৌতুক নিরোধ আইন অনুযায়ী, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যদি কোনো পক্ষ অপর পক্ষকে বিয়ের আগে-পরে বা বিয়ে চলাকালে যেকোনো সময় যেকোনো সম্পদ বা মূল্যবান জামানত হস্তান্তর করে বা করতে সম্মত হয়, সেটাই যৌতুক বলে বিবেচ্য হবে। যৌতুক গ্রহণ ও যৌতুক প্রদান অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
উপহার কি যৌতুক?
বিয়েতে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা পর্যন্ত মূল্যমানের উপহার যৌতুক হিসেবে গণ্য হবে না। তবে এখানে শর্ত হচ্ছে যে এই উপহার অবশ্যই বিয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয় এমন কেউ প্রদান করতে হবে এবং বিয়ের পণ (যৌতুক) হিসেবে প্রদান করতে পারবেন না, উপহার হিসেবে দিতে হবে।
অর্থাৎ বিয়ের শর্ত হিসেবে ৫০০ টাকার সমমূল্যের কোনো কিছুও দেওয়া যাবে না। দিলে তা আইন অনুসারে যৌতুক হবে এবং অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ অনুযায়ী, বিবাহ স্থির থাকার শর্তে বা বিবাহের পণ হিসেবে প্রদত্ত বা প্রদানে সম্মত অর্থ, যেকোনো সামগ্রী বা অন্যবিধ সম্পদ হলো যৌতুক।
নারী নির্যাতনে যৌতুক প্রথা :
বর্তমানে যৌতুক প্রথার ফলে নিষ্ঠুরতা, নৃশংসতা ও নারী নির্যাতন স্বাভাবিক ব্যাপার। জন অস্টিন যৌতুক প্রথার দ্বারা নারী নির্যাতন সম্পর্কে বলেছেন, ``Dowry system paves the way to women oppression`` যৌতুকের অর্থ না দিতে পারলে সদ্য বিবাহিত নারীকে পদে পদে হেয়, নিচু ও বিদ্রƒপ করা হয়। এছাড়া শারীরিকভাবে অমানবিক নির্যাতনের দ্বারা হত্যা করে আত্মহত্যা বলে দাবি করে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকেরা। এছাড়াও শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, এসিড দগ্ধ করা কখনো পুড়িয়ে বা বিষ খাইয়ে মেরে ফেলা, শ্বাসরোধ করে বা গলায় দড়ি আটকিয়ে মেরে ফেলা প্রভৃতি নৃশংসতা হয়ে থাকে যৌতুকের কারণে।
যৌতুকের শাস্তি :
যৌতুক নেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ, যা প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর এবং সর্বনিম্ন এক বছর কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
যৌতুক পাবিারিক জীবনে চরম কলহের সৃষ্টি করে। দীর্ঘকাল থেকে এই প্রথার প্রচলন থাকায় এটি এখনো কোনো কোনো এলাকায় রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। এর থেকে বের হতে শুধু নারীরাই নন, পুরুষরাও উদ্যোগী হতে হবে। "আর নয় যৌতুক" যদি এমন একটি শ্লোগান সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে এর একটি প্রভাব সব মহলেরই দৃষ্টিতে আসবে। স্ব স্ব  ক্ষেত্রে যৌতুকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারলে ক্রমেই এর কুপ্রভাব কমে আসবে।

আমাদের গণতন্ত্রের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যত
                                  

॥ ফোরকান আহম্মেদ ॥
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা আমেরিকার জাতির পিতা বিশ্বে গণতন্ত্রের নন্দিত মহানায়ক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন গণতন্ত্রের মূল্যায়ন যেভাবে করেছিলেন তা আজও বিশ্ববাসীর কাছে অমর বাণী হিসাবে স্বীকৃত আমেরিকার স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী বীরদের স্মরণে এক স্মরণসভার মাত্র ৩ মিনিটের এক বক্তৃতায় বলেছিলেন অফ দ্যা পিপল, বাই দ্যা পিপল, ফর দ্যা পিপল। তাঁর এ বক্তব্য আজো বিশ্বের গণতন্ত্রের বাণী চিরন্তণী হিসেবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনায় বিশ্ব নেতাদের কাছে অনুপ্রেরণাহিসাবে কাজ করছে এবং যতদিন বিশ্বে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু থাকবে ততদিন তিনিও বিশ্ব সভ্যতার তাছে অমর হয়ে থাকবেন।
ভারত উপমহাদেশ ব্রিটিশ শাসনাধীন থাকাকালীন ও এ অঞ্চলের মানুষ তাদের নাগরিক সামাজিক ও নৈতিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষে সংগ্রাম করেছেন বহু স্বাধীনতাকামী নেতার নেতৃত্বে এর মধ্যে শহীদ তিতুমীর, সিপাহী বিদ্রোহ, সন্যাস বিদ্রোহ, ফকির বিদ্রোহ অন্যতম। এক পর্যায়ে ১৯৪৭ সালে পাক-ভারত বার্মাসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। বাংলাদেশ তখনও পাকিস্তানের আওতাধীন একটি প্রদেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে ব্রিটিশ শাসনাধীন থাকাকালীন ১৯০৫ সালে অবিভক্ত বাংলা ভাগ হয়ে পূর্ব বাংলা ঢাকাকে রাজধানী করে ভাগ হয়েছিল। ভারতীয় হিন্দু নেতৃবৃন্দের প্রবল বিরোধীতার ফলে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয় ব্রিটিশ সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান, ভারত ও বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাস্তিানের ভাগ্যহত মানুষের কোন মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ না করে বৈষম্যমূলক নীতিমালার আলোকে ৭ কোটি মানুষকে নিপীড়ন ও শোষনের বেড়াজালে আটকে রেখে তাদের আধিপত্য তথা শাসনতান্ত্রিক নেতৃত্ব তাদের কব্জায় রাখতে কূটকৌশল অব্যাহত রাখে। এরই প্রেক্ষাপটে ১৯৭০সালের সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংখ্যাগরিষ্ট আসন পেলেও শাসকগোষ্ঠী বাঙালী জাতির অবিসাংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর গড়িমসি শুরু করে। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু হয়। অসহযোগ আন্দোলন হরতাল ধর্মঘট। এক পর্যায়ে পাক-শাসকগোষ্ঠী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ মানুষের ওপর সশস্ত্র হামরা চালালে পরিস্থিতি মহান মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র যুদ্ধের পর ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে এবং ২ লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী পাকিস্তানের কারগার থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন বাঙালী অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে এবং নির্দেশনায় এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধান প্রণীত হয়। যা পাকিস্তন সরকার দীর্ঘ ২৩ বছরেও করতে পারেনি। সংবিধানে রাষ্ট্রীয় ৪টি মূল নীতি সংযোজিত হয়। এ ৪টি মূল নীতি হচ্ছে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালী জাতীয়তাবাদ। রাষ্ট্রীয় মূল ৪টির প্রথমটি গণতন্ত্র হলেও গণতন্ত্র এখনও শঙ্কামুক্ত নয় বলেও রাজনৈতিকঅভিজ্ঞনজরা মনে করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন যখন যে দল বা জোট ক্ষমতায় আসেন তখনই তারা নিজেদের মতো করে সংবিধান সংশোধন করে নেয়।
১৯৯০ ইং সনের ৬ ডিসেম্বর তৎকালীন ৮ ও ৭ দলীয় জোটের আন্দোলনের মুখে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পদত্যাগ করেন গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং সংবিধানকে সমুন্নত রাখতেই তিনি পদত্যাগ করেন। ১৯৯১ইং সনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। ৮ দলীয় জোটের দাবীর মুখে ঐ সময় পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে গ্রেফতার করে সরকার। শুরু হয় সদ্য পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি ও তার প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টির ওপর অত্যাচারের স্টীম রোলার। এরশাদের মুক্তির দাবীতে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা বা বিভাগীয় শহর অথবা রাজধানীতে জাতীয় পার্টি যেখানে জনসভা অথবা বিক্ষোভ মিছিলের প্রোগ্রাম ঘোষণা করে সেখানে বিএনপি অথবা তার অঙ্গ সংগঠন পাল্টা প্রোগ্রাম দেয়। নিরুপায় প্রশাসন বাধ্য হয়ে ১৪৪ ধারা জারি করে। সভা সমাবেশ হয়ে যায় প-। পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এক সময়ের তুখোর ছাত্রনেতা এবং এরশাদ মন্ত্রীসভার সফল শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম মাদারীপুরের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠে জাপা আয়োজিত এক কর্মী সমর্থক সমাবেশে দুঃখ করে বলেন দেশে এখন নষ্ট গণতন্ত্রের চর্চা শুরু হয়েছে।
জাতি এখনও সেই নষ্ট গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা প্রত্যক্ষ করছে কিনা ভেবে দেখা দরকার। এটা হলো পরিচ্ছন্ন গণতন্ত্রের জন্য কাম্য নয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর বিএনপি নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে তাঁর গুলশান কার্যালয়ে ৯৩দিন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ঘেরাওয়ের মধ্যে অবরুদ্ধ রাখা হয়। এ সময় তাঁর জন্য দেয়া খাবার পানি ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। এছাড়া বালুর ট্রাক দিয়ে ঘেরাওসহ যানবাহনে ব্যবহৃত ভেপু বাঁজিয়ে এক বিরক্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। যা দেশবাসী নিরব দর্শকের ভূমিকায় থেকে গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেছে।
একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় আমাদের দেশের মানুষ খুবই আবেগপ্রবণ। না হলে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের একটি ঐতিহাসিক ভাষণকে সামনে রেখে তারা পতঙ্গের ন্যায় মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লো কিভাবে? জাতির পিতার ষড়যন্ত্রমূলক মৃত্যুকে যেমন মেনে নিতে পারেনি এ জাতি, তেমনি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুকেও ভাল চোখে দেখেনি দেশবাসী।
২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাকে দেশবাসী যেমন সমর্থন দেয়নি তেমনি খালেদা জিয়াকে ঘেরাও করে রেখে খাবারসহ বিদ্যুৎ পানি সরবরাহ বন্ধকেও সমর্থন করেনি মানুষ। প্রত্যেক ক্রিয়ারই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। উল্লেখিত ঘটনার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও একদিন দৃশ্যমান হবে। মান্যবর শেখ শহীদুল ইসলামের নষ্ট গণতন্ত্রে নতুন ডিজিটাল সংস্কারণের গণতন্ত্রে এখন চলছে গণতান্ত্রিক জিঘাংসার বাস্তবায়ন।
শ্রদ্ধাভাজন প্রবীণ সাংবাদিক ও দৈনিক জনতার সম্মানিত প্রকাশক জনাব ছৈয়দ আন্ওয়ার এর নামকরণ করেছেন মনোতন্ত্র। তাঁর ব্যাখ্যায় বোঝা যায় গণতন্ত্রের লেবাসে মনের মতো করে দেশ পরিচালনার নাম মনোতন্ত্র। তিনি গত ৩০ জানুয়ারি দৈনিক জনতার ১ম পাতায় প্রকাশিত তাঁর মন্তব্য কলামে “মনের তন্ত্র গণতন্ত্র নয়” শিরোনামের কলামে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
অপরদিকে গত ৯ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইনকিলাবের ১১নং পৃষ্ঠার সম্পাদকীয় পাতায় শ্রদ্ধাভাজন সাংবাদিক কামরুল হাসান দর্পণ তার উপসম্পাদকীয় কলামে গণতন্ত্রের সংকট এবং ভারসাম্যাহীন রাজনীতি শিরোনামের লেখায় চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি অতীতের কিছু অপ্রিয় সত্য কথা তাঁর লেখায় তুলে ধরেছেন।
জনাব দর্পণ তাঁর লেখার শুরুতেই লিখেছেন আমাদের দেশে গণতন্ত্র আছে কি নেই, থাকলেও কতটা আছে তা সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের পক্ষে বোঝা মুশকিল।
আমাদের প্রচলিত রাজনীতিতে একটি প্রবাদ আছে তা হচ্ছে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় উচিত। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের সম্মানিত দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন না। আমাদের রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীগণ মান্যবর, জওহরলাল নেহেরু, ভারতের জাতির পিতা করমচাঁদ গান্ধী, পাকিস্তানের জাতির পিতা মহম্মদ আলী জিন্নাহ বাংলাদেশের স্থপতি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আইউব ইয়াহিয়া ও বহু স্বৈরশাসকের পতন দেখেও শিক্ষা গ্রহণ করেনি। যারাই যেভাবে যখন ক্ষমতায় এসেছে। তারাই ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজেদের পতন ত্বরান্বিত করেছেন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় এসেও কেউ গণতান্ত্রিক স্বৈরশাসকের ভূমিকায় অতীতে গিয়ে থাকলেও পরিচ্ছন্ন গণতন্ত্র যাঁরা লালন করেন তাঁরা স্বৈরাচারী আচরণ করবে না এটাই প্রকৃত গণতন্ত্রকে লালন করা বলেই তৃণমূলের সাধারণ মানুষেরা মনে করেন। গণতন্ত্রের পূজারী সাধারণ মানুষ আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের কাছে এমনটাই প্রত্যাশা করে। অন্যথায় আগামী প্রজন্মের কাছে আমাদের জাতীয় নেতাদেরকেই জবাব দিতে হবে।

১৭ নভেম্বর মওলানা ভাসানীর মাজার, জনতার মিলন মেলা
                                  

এ.কে.এম শামছুল হক রেনু
সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, আধিপত্যবাদ, নব্য ধনিক, বণিক, পুঁজিবাদ ও রক্ত চোষা দানব শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে খামোস কণ্ঠের অকতোভয় সংগ্রামী দিকপাল, গণমানুষের মহান নেতা, আধ্যাত্মিক সাম্রাজ্যের ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ, মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর রাত ৮টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। এবারের ১৭ নভেম্বর মহান নেতা মওলানা ভাসানীর ৪১তম মৃত্যু বার্ষিকী।

যেখানে যে অবস্থাতেই থাকিনা কেন, বন্ধু বান্ধব, স্বজন ও মওলানা ভাসানীর এক সময়ের রাজনৈতিক অনুসারী ও গুণগ্রাহীদের নিয়ে প্রতি বছরই ১৭ নভেম্বর প্রাণপ্রিয় মহান নেতার মাজার জেয়ারত করে থাকি। ওনার মৃত্যুর পর ৪০ বছর যাবত কোনদিনই টাঙ্গাঁইলের সন্তোষে মওলানা ভাসানীর মাজার জেয়ারত বাদ পড়েনি। এবারও দুটি মাইক্রোবাসে মওলানা ভাসানীর মুরিদ, শিষ্য, ভক্ত ও রাজনৈতিক অনুসারীরা আফ্রো এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার সর্বহারা মানুষের নয়নমনি মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর মাজার জেয়ারত করতে ভুল হয়নি। ১৭/১১/২০১৭ ইং শুক্রবার টাঙ্গাইল শহরের অনতিদূরে কাগমারি মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের কাছে আমাদের মাইক্রোবাস দুটি সকাল ৮টার মধ্যে পৌঁছে। সে সময় মাইক্রোবাস দুটি অগনিত ছাত্রজনতার মিছিল ডিঙিয়ে কোন ভাবেই সামনে এগুতে পারছিলনা। তাছাড়া সেই সময় দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মাজার জেয়ারতের উদ্দেশ্যে আসা অনেক বাস, মাইক্রো, জীপ, কার, অটো, সিএনজি সহ অন্যান্য যানবহনের যানঝট সৃষ্টি হয়। তখন রাস্তার দুইপাশের ছাত্র জনতার মিছিল থেকে গগণ বিদারী শে¬াগানে, শে¬াগানে মুখরিত হয়ে উঠে। সবার মুখেই ছিল যুগ যুগ জিও তুমি মওলানা ভাসানী, স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা মওলানা ভাসানী, সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ নিপাত যাক, মওলানা ভাসানী জিন্দাবাদ। এমনিভাবে কোন মতে রাস্তার দুই পাশের ছাত্র জনতা ও গণ মানুষের মিছিল ও  রাস্তার যানঝট অতিক্রম করে মওলানা ভাসানী কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইট দিয়ে মুকুটহীন সম্রাট মওলানা ভাসানীর মাজারের অনতিদূরে গাড়ী রাখার স্থানে গিয়ে পৌঁছা হল। ৫ মিনিটের রাস্তা অতিক্রম করতে ১ ঘন্টারও বেশী সময় অতিক্রান্ত হয়। ফুলের তোড়া নিয়ে মাজারে ঢুকার সময় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, লেখক, সাহিত্যিক, ডাক্তার, অধ্যাপক বিভিন্ন দলের অগনিত রাজনৈতিক নেতা, কর্মি, মুরিদ, ভক্ত এবং তার অনেক প্রবীণ রাজনৈতিক অনুসারীদের দৃষ্টিতে আসে। এ নিবন্ধে তাদের নাম লিপিবদ্ধ করলে, নিবন্ধের সংক্ষিপ্ত পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় সেদিকে আর অগ্রসর হলাম না। মাজার জেয়ারত করতে দেখা যায় মাজারে যেমনি মৌন অবস্থা বিদ্যমান, তেমনি সকলের চোখে অশ্রুধারা। কেহ মোনাজাত করছে, কেহ বা কোরআন তেলাওয়াতে মগ্ন এবং কেহ নফল নামাজে রত। মহান নেতার পাশেই তার সহধর্মিনী জয়পুর হাটের পাঁচ বিবির এক সময়ের জমিদারের কন্যা বেগম আলেমা ভাসানী বা দাদু ভাসানীর মাজার রয়েছে।    

মূল মাজার থেকে ২০০ থেকে ২৫০ গজ দূরে দক্ষিণে রাস্তা ও পুকুর পাড়ে পুত্র আবু নাসের খান ভাসানীর কবর এবং অনতিদুরে মওলানা ভাসানীর কনিষ্ট পুত্র কিবরিয়া ভাসানীর কবর। মাজার থেকে বেড়নোর পথে মওলানা ভাসানীর দীর্ঘ দিনের হিন্দু মুসলীম ভক্ত, অনুরক্ত, মুরিদ, শিষ্যসহ তাদের সাথে থাকা তাদেরই ছেলেমেয়ে ও স্বজনরা মাজার জেয়ারতকারীদের হাতে বিভিন্ন ফুল, তবারক, বিভিন্ন ধরণের লিফলেট বিতরণ করছে এবং অনুরোধ জানিয়ে বলছে, আপনারা সকলেই প্রতি বছরই হুজুর ভাসানীর মাজার জেয়ারত করতে আসবেন। আমরা আপনাদের কাছে কিছুই চাইনা, আমরা চাই হুজুরের জন্য আপনাদের ভালোবাসা এবং দোয়া। এই দৃশ্য স্বচক্ষে না দেখলে, বাস্তবিকই দু কথা লেখে বুঝানো খুবই কঠিন ও অসাধ্য। মাজারের পাশেই দূরদুরান্ত থেকে আসা সকল শ্রেণী পেশার লোকদের জন্য তবারক হিসেবে খিচুড়ির ব্যবস্থা ছিল। ছোট, বড়, ধনী, গরীব, কাঙ্গাঁল একসাথে মাঠির শানকিতে খিচুড়ি খাওয়ার দৃশ্যও যেন ভুলে যাওয়ার নয়। তবে এখানে বলে রাখা দরকার মাজার সম্পর্কে অনেকের বিভিন্ন ধরণের ধারণা রয়েছে। এ ধারণা থেকে নিবদ্ধক হিসেবে নিজেও বাহিরে নই। তবে মওলানা ভাসানীর মাজারে বেদাত বা কোরআন সুন্নাহর বাইরে বা ইসলাম ও শরীয়তের বিধানের বাইরে কোন কিছু করার সুযোগ নেই। এমনকি একশ্র্রেনীর ভন্ডদের মতো খাজা বাবার দরবার শরীফ বানিয়ে আয় রোজগার ব্যবস্থা করারও কোন সুযোগই এখানে অবশিষ্ট নেই। মাজারের প্রায় ১০০ গজ দক্ষিণে যেখানে মওলানা ভাসানী সভা সমাবেশ করতেন (দরবার হল বলে আখ্যায়িত) সেই বিশাল আয়তনের দরবার হলে মুরিদ ও ভক্তরা বাউলগান, পালাগান, জারি, মুর্শিদী, লালনগীতি, জালালগীতি, ভাওয়াইয়া ইত্যাদি গানের যেমন আসর জমায় তেমনি এ অনুষ্ঠানটির (১৭ নভেম্বর মওলানা ভাসানীর মৃত্যু বার্ষিকী) ১০/১৫ দিন আগ থেকেই দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে এখানে ওরা অবস্থান করে থাকে। এখানেই ওরা রান্না বান্না করে নিজেরাই খাওয়া দাওয়া করে থাকে। ১৭ নভেম্বর বেশ কয়েকদিন পর এখান থেকে ওরা যার যার গন্তব্যে চলে যায়। জানা যায় মওলানা ভাসানীর জীবদ্দশাতেও মহরম মাস, লাইলাতুল বরাত, লাইলাতুল কদর ও মেরাজের উপলক্ষ সহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক ইসলামিক দিনগুলোতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সুদুর আসাম থেকে মুরিদরা এখানে জমায়েত হতো এবং অনুষ্ঠানটি সমাপনান্তে চলে যেত। তাছাড়া জাতীয় সংকট মুহুর্তে দেশী, বিদেশী সাংবাদিকদের ডেকে মওলানা ভাসানী এই দরবার হলে প্রেসকনফারেন্স সহ রাজনৈতিক মিটিং করতেন।       

মাজারের পাশেই মওলানা ভাসানীর জীবন, দর্শন ও রাজনীতির ওপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সভা সমাবেশ সহ ভাসানী স্মৃতি সংসদ ও মৃত্যু বার্ষিকী উদযাপন কমিটির পক্ষ হতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়ে থাকে। তাছাড়া মাজারের পূর্ব পাশের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে ও রাস্তার দুই পাশে মেলা বসে। মেলায় বিভিন্ন স্টলে বিভিন্ন ধরনের খেলনা এবং অস্থায়ী বইয়ের দোকানগুলোতে মওলানা ভাসানীর জীবন দর্শন ও রাজনীতির উপর দেশী বিদেশী প্রথিতযশা লেখকদের অনেক ধরণের বইপুস্তক ও পান্ডুলিপি পাওয়া যায়। এমনিভাবে সেখানে রয়েছে বাহারী দেশীয় পিঠা, টাঙ্গাইল অঞ্চলের পিঠা, মওলানা ভাসানীর তালের টুপি সহ টাঙ্গাইলের সন্তোষ এলাকার বিভিন্ন ধরণের বাঁশ, বেত, মুক্তারা ও মাঠির তৈরী বিভিন্ন জিনিষপত্র ও তৈজষপত্র। মওলানা ভাসানীর মাজার জেয়ারত শেষে রাস্তার পাশে পুকুড় পাড়ে পুত্র আবু নাসের খান ভাসানীর কবর ও কনিষ্ট পুত্র কিবরিয়া ভাসানীর কবর জেয়ারত শেষে মওলানা ভাসানীর সেই চিরাচয়িত এক সময়ের ছনের ছাউনি ও চটের বেড়ার বাড়িটির দৃশ্য এখন কিছু বদলালেও তা দেখে বিকেল বেলার ওই দিন ফেরার আগে আবারো সহ যাত্রী সবাই মহান নেতা ও মুকুটহীন সম্রাট মওলানা ভাসানীর মাজার সংলগ্ন ঐতিহাসিক তালতলায় বেশ সময় গল্প গুজব, আলাপ আলোচনা করে গন্তব্যে রওয়ানা দেই। তখন মানুষের ভীড় কিছুটা কম হলেও নাকি ভাসানী মেলা শেষ হতে নাকি আরো ৭দিন সময় লাগবে। একটা কথা বলা দরকার, তা হলো সামগ্রিক শান্তি শৃংখলা রক্ষা কল্পে পুলিশের সংখ্যাও কম ছিল না। ১৭ নভেম্বর যারা সন্তোষ আসতে পারেনি তাদের মধ্যে দেশী বিদেশী মওলানা ভাসানীর অনুসারীদের ৭দিন পর্যন্ত নাকি আসা অব্যাহত থাকে।  


মওলানা ভাসানী মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ১৯৭৬ সালের ১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চ ও গণমানুসের দাবী নিয়ে ব্রিটিশদের কুইট ইন্ডিয়া (ভারত ছাড়) আন্দোলন, পাকিস্তানি একনায়কদের বিরুদ্ধে যেমন সংগ্রাম করেছেন, তেমনি তিনি ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলন থেকে পাকিস্তানীদের আসসালামু আলাইকুম সহ ৭০ এ চট্টগ্রামে প্রলয়ংকরী সামুদ্রীক জলোচ্ছাসে অসংখ্যা মানুষের প্রাণহানি, ঘরবাড়ী ধ্বংসস্তুপে পরিণত দূর্গতদের পাশে থেকে তিনি পুনরায় “পাকিস্তানিদের উদ্দেশ্য করে ওরা কেউ আসেনি বলে” আবার পাকিস্তানের একনায়ক সরকারকে আসসালামু আলাইকুম জানিয়ে ছিলেন। তাই মওলানা ভাসানী স্বাধীনতার স্বপ্ন দ্রষ্টা হিসেবে দেশ, দুনিয়া ও সমসাময়িক ইতিহাসের আলোকে সমধিক পরিচিত। ১৯৭৪ সালে সরকার এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশাল ও স্পেশাল পাওয়ার এ্যাক্ট বা বিশেষ ক্ষমতা আইন পাস করলে, তিনি এর বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করেছিলেন। অর্থাৎ যেখানেই মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ভুলন্ঠিত হয়েছে, সেখানেই তিনি ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন, সংগ্রাম করেছেন। প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করেছেন, জেল জুলুম, হুলিয়া, বুলেট, ফাঁসির দড়ি তাকে ধমাতে পারেনি। জীবনে তিনি কখনও যেমন অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি, তেমনি তিনি ছিলেন জনমানুষের আপোষহীন নেতা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকার, স্বপ্নদ্রষ্টা ও মুকুটহীন অজেয় সম্রাট। একজন প্রখ্যাত সমসাময়িক দার্শনিক বলেছেন, মওলানা ভাসানীর জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি জীবন ব্যবস্থাই একটি দর্শন। পরিশেষে বলব, যুগ যুগ জিও তুমি মওলানা ভাসানী, মওলানা ভাসানী জিন্দাবাদ।     

পুলিশের ভালো-মন্দ এবং অতিবল
                                  

১ লাখ ১২ হাজার পুলিশ নিয়োগের মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলছে বর্তমান সরকার। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পুলিশবাহিনীর সদস্য সংখ্যা দাঁড়াবে দুই লাখ ৬৭,৮৫৯ জন। পুলিশ বাহিনীতে সচিব পদমর্যাদার (গ্রেড-১) অতিরিক্ত আইজিপির পদ হবে ২০টি ও অতিরিক্ত আইজিপির (গ্রেড-২) পদ হবে ৪০টি। অর্থাৎ অতিরিক্ত আইজিপির মোট পদ হবে ৬০টি। ডিআইজির পদ ১০০টি ও এসপির পদ হবে ৩৮০টি।
কিছুদিন পরপর পুলিশের তরফ থেকে বিভিন্ন পদ সৃষ্টির বিষয়ে প্রস্তাব যায় অর্থ মন্ত্রণালয়ে। এ পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এক বছর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে পুলিশ কত পদ চায় তা জানতে চাওয়া হয়।
পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সেই চিঠি পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে গত মাসের শেষের দিকে তাদের মহাপরিকল্পনার কথা জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেটি পাঠায় অর্থ মন্ত্রণালয়ে।
বাংলাদেশের আইনি বর্তমানে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে বরাবরের মত অবিরত চেষ্টা করে জানতে পেরেছি যে, ডিআইজি রয়েছেন ৫২ জন; এ পদের সংখ্যা বাড়িয়ে ১০০ এবং অতিরিক্ত ডিআইজির পদের সংখ্যা ৭৭ থেকে বাড়িয়ে ১৫০ জন করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। বর্তমানে এসপি পদ রয়েছে ২৭০টি। সেটি বাড়িয়ে ৩৮০ জন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অবশ্য সেই সাথে আরো জানা গেছে যে, পুলিশবাহিনীতে ১২১টি ক্যাডার পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে তিনটি ডিআইজি, ১৩টি এসপি, ৩৭টি অতিরিক্ত এসপি ও ৬৮টি এএসপির পদ। এসব পদ পুলিশ সদর দপ্তরে সংরক্ষিত থাকবে। বিভিন্ন সময় পুলিশ কর্মকর্তারা মিশনে চলে যাওয়ায় সমস্যায় পড়তে হয়। এ সমস্যা সমাধানের জন্য গত বছর সংরক্ষিত পদ সৃষ্টির প্রস্তাব পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। মানুষের জীবনমান উন্নত না হলেও আমাদের নিরাপত্তার নামে পুলিশ সদস্য ক্রমশ বাড়ছে। বর্তমানে পুলিশ বাহিনীতে আইজিপি পদ মর্যাদার (গ্রেড-১) রয়েছেন তিনজন, অতিরিক্ত আইজিপি (গ্রেড-২) রয়েছেন ৯ জন; ডিআইজি ৫২, অতিরিক্ত ডিআইজি ৭৭, সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ (এসপি) ২৭০, অতিরিক্ত এসপি ৫৬৭, সিনিয়র এএসপি ২৭১, এএসপি ১,০৮৪, ইনস্পেক্টর ৪,০১৫, সাব-ইনস্পেক্টর ১৫,২৯৭, সার্জেন্ট ১,৭৬৪, সহকারী সাব-ইনস্পেক্টর (এএসআই) ১৭,৫০৪, নায়েক ৬,৫৬৪ ও কনস্টেবল রয়েছেন ১,০৮,৩২০ জন। সব মিলিয়ে পুলিশবাহিনীতে রয়েছেন এক লাখ ৫৫,৭৯৭ জন কর্মকর্তা ও সদস্য। পুলিশ সদর দপ্তর গ্রেড-১ থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত এক লাখ ১২,০৬২টি পদ সৃষ্টির নতুন পরিকল্পনার পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আমলা-মন্ত্রী-এমপিদের আখের গোছানোর জন্য মূলত তৈরি হচ্ছে নিয়োগ পক্রিয়াটি। নিয়োগের এই পক্রিয়ার রাস্তা ধরে এগিয়ে যেতে যেতে জানা প্রয়োজন যে, জাপানে ২৫০ জন সাধারণ মানুষের বিপরীতে একজন পুলিশ রয়েছে। থাইল্যান্ডে ২৬০ জনে একজন ও মালয়েশিয়ায় ২৭০ জনে একজন পুলিশ রয়েছে। ভারতে প্রতি ৭৩০ জনে একজন পুলিশ রয়েছে। এই বর্তমানে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে দুই কোটি মানুষ অধ্যুষিত এই মেগাসিটিতে ৬০০ মানুষের জন্য রয়েছে মাত্র ১ জন পুলিশ। যে পুলিশের লক্ষ্যই থাকে কোন না কোনভাবে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার সাধারণ মানুষকে কষ্ট দিয়ে, ফাঁদে ফেলে টাকা আদায় করার চেষ্টা। এই চেষ্টায় আমাদের রাজধানী পরিণত হয়েছে অভিশপ্ত নগরীতে। বাংলাদেশে স্বাধীনতার ৪৭ বছরে বারবার মানুষ শান্তির নামে অশান্তির শিকার হয়েছে বারবার। অথচ আমাদের বন্ধুদেশ চিনের ৩৮ কিলোমিটারের শহর লানবা।
ক্ষয়ে যাওয়া আমাদের বাংলাদেশের মাটিতে স্বাধীনতার ৪৭ বছর পার হয়ে গেলেও পুলিশ-প্রশাসনের জালে বন্দী জনগন আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, এ শহরটিতে গত ১২ বছরে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়নি। বিষয়টি অবাক হওয়ার মতোই। বিস্ময়ের আরও বাকি আছে। দক্ষিণ পশ্চিম চীনের ওই শহরে একজন মাত্র পুলিশ আছেন। তিনি একাই সারা শহর টহল দিয়ে বেড়ান। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল ওই পুলিশকর্মী চোখে দেখেন না। গ্লুকোমায় দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন ২০০২ সালে। তারপরও তার চাকরি আছে। কারও করুণায় নয়, চাকরিটি আছে তার দক্ষতায়। কারণ তিনি একাই একটা শহরকে যেভাবে শান্ত রাখতে পারেন, তাতে তাকে সরানোর প্রশ্নই ওঠে না। আর তাই দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও পুলিশের কাজটি রয়েছে তার। তিনি প্রতিদিন নিয়ম করে পুলিশের পোশাক পরে বেরিয়ে পড়েন কাজে। অবশ্য তার স্ত্রী থাকেন সঙ্গে। এ পুলিশ অফিসারের নাম প্যান ইয়ং। বয়স ৪৫ বছর। প্যান ইয়ংয়ের দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও নিজের শহরটাকে চেনেন হাতের তালুর মতো। চেনেন সেখানকার মানুষজনকে। তাই সিয়া চং পুলিশ স্টেশনের ওই একমাত্র পুলিশ কর্মকর্তাকে কর্তৃপক্ষ কখনই সরানোর চিন্তা করেনি। সিয়া চং রেলওয়ে স্টেশনকে ঘিরে লানবা শহরের চারপাশের এলাকা ৩৮ কিলোমিটার। এ এলাকার ভেতরে আছে ৩টি প্রশাসনিক গ্রাম, ১৩টি ছোট গ্রাম। আর এ গ্রামগুলোর দায়িত্বে আছেন প্যান ইয়ং। তার দক্ষতার কারণে সেখানে গত ১২ বছরে কোনো খুন-খারাবি হয়নি। চুরি-ছিনতাই হয়নি। ঘটেনি কোনো দুর্ঘটনাও। অবশ্য এর পেছনে আরও একজনের নীরব ভূমিকা রয়েছে। তিনি প্যানের স্ত্রী তাও হংগিং। তিনি লোকাল রেলওয়ে স্টেশনের রক্ষী। প্রতিদিন তিনিও সারা শহর চক্কর মারেন পুলিশ স্বামীর সঙ্গে। ভাগ্যে বিশ্বাস করেন প্যানের স্ত্রী। তিনি মনে করেন, ভাগ্যে ছিল বলেই তারা দু’জন একসঙ্গে। প্যান ইয়ং অবশ্য ছোট থেকেই অপরাধের বিরুদ্ধে সরব। তিনি বেড়ে উঠেছেন পুলিশ থানা চৌহদ্দিতেই। সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্যান বলেন, আমার পদটা বড় নয়। তবু আমি আমার পুলিশের এই পেশাটাকে ভালোবাসি। অপরাধকে কখনো প্রশ্রয় দিইনি।’ এমন করে ভাবনার রাস্তায় আমাদের পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের ৯০ ভাগও হাটেন না। বরং তারা রাজনীতিকদের ফুটফরমাশ খাটার মত অবিরত তৈরি হয়ে এগিয়ে চলছে।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসনিক কালো ফাঁদে দূর্নীতি ও বাংলাদেশ পুলিশ কাহিনি নিয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন নিরন্তর সময়। এই সময়ে অগ্রসর হতে হতে ৭০% লোক মনে করে পুলিশ এবং দূর্নীতি একটি আরেকটির উল্টো পিঠ। এটা একটা জটিল এবং বিতর্কিত বিষয়। প্রতিদিন বাংলাদেশে যে যে ক্ষেত্রে দুর্নীতি সংঘটিত হয় তার ৯৫% বা তার বেশি ক্ষেত্রে এসব থাকে সাধারণ জনগনের আড়ালে। আর পুলিশের দুর্নীতির বিষয়টা ৯৫% জানে মানুষ। এই জানা এবং অজানার কারণেই পুলিশ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাঝে এক আতঙ্কের নাম। কিন্তু এমটা হওয়া উচিত ছিল না। সাধারণত আমাদের ট্রাফিক পুলিশ রাস্তার গাড়ী আটকে রেখে ১০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ খায়। হ্যাঁ খায়, তাতে কী? শুধু পুলিশের এই ১০ টাকার ঘুষটাই আমাদের চিন্তার বিষয়। কিন্তু এর মূলে কী রয়েছে? যখন রাস্তার একজন সম্মানিত ব্যক্তি গাড়ী নিয়ে বের হন তখন তার উপর অনেকগুলি কর্তব্য অর্পিত হয়। গাড়ী চালাতে হলে অবশ্যই আপনার কাছে বৈধ্য ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকা লাগবে। সম্ভবত আমাদের দেশের ৯০% বা তার বেশি ড্রাইভারদের গাড়ীর বৈধ্য লাইসেন্স থাকে না। আর যাদের কাছে রয়েছে অবৈধ্য লাইসেন্স রয়েছে তারা দুর্নীতির কয়টা স্তর পাড়ি দিয়ে তা সংগ্রহ করেছেন তার ভেবে মাথা নষ্ট করার দরকার নাই। ঘুষ, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, উদ্ধত আচরণ ইত্যাকার নানাবিধ অনাকাঙ্খিত আচরণের জন্য পুলিশ সৃষ্টির আদিকাল থেকেই সমালোচিত, আলোচিত এবং অনেক ক্ষেত্রে অপমানিত। যেহেতু খারাপ খবরই হল পত্রিকার জন্য ‘ভাল খবর’, তাই এই জাতীয় অসদাচরণ যে পত্রিকার শিরোনাম হবে তা সহজেই অনুমেয়। নিকট অতীতে অপরাধ দমনে পুলিশের চ্যালেঞ্জ বহুলাংশে বেড়ে গেছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুলিশ অপরাধীর পেছনে ছোটে- পুলিশের পেশার এই বৈশিষ্ট্যের দিকে সমাজের সহানুভূতির দৃষ্টি তেমন নেই। জনবল, সরঞ্জাম, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের ঘাটতি কাটানোর পাশাপাশি পুলিশের সদাচরণ ও সেবার মান বৃদ্ধি এবং মানসিক গঠন পরিবর্তনের মাধ্যমে সুনাম বাড়ুক; পুলিশ হয়ে উঠুক প্রকৃত সমাজবান্ধব- এমন প্রত্যাশা দেশের নাগরিকদেরও।
মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের সর্বপ্রকার উন্নয়ন ও অগ্রগতির পূর্বশর্ত হলো শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা। শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে পুলিশের ওপর সমাজ নির্ভরশীল। বিশেষ করে জনগণের জানমালের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। পুলিশের ওপর সাধারণ নাগরিকরা যেমন ভরসা করেন, তেমনি পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগেরও অন্ত নেই। পুলিশের দায়িত্বহীনতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা প্রশ্ন তোলা হয়ে থাকে। পুলিশের ভাল কাজ ছাপিয়ে তার দুর্নীতি ও কিছু গর্হিত অপরাধের কথা ফলাও করে প্রচারিত হওয়ার সংস্কৃতি থেকে সমাজ বেরিয়ে আসতে পারেনি। ফলে এটাও সত্য সমাজে পুলিশের যে ভাবমূর্তি গড়ে তোলা হয়েছে তা মোটেই সম্মানজনক নয়। এর জন্য দায়ি পুলিশ-প্রশাসনের সর্বনিন্ম থেকে সর্বোচ্চ স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-সংসদিয় কমিটি এবং আমলাগণ। রাজধানীতে এত অল্পসংখ্যক পুলিশ দিয়ে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিধান কিভাবে সম্ভব। তবে বাড়ছে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগও।
উদাহরণ স্বরুপ বলি- আমি এবং আমার সহধর্মিনী শান্তা ফারজানা বিভিন্ন টিভি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে প্রতিদিন-ই বাসায় ফিরি রাত ১২ টা থেকে ১ টার সময়। একদিন নেওয়াজবাগের বাসায় যাচ্ছিলাম রাত ১ টা। রিক্সা না পাওয়ায় দেড়ি হচ্ছিলো পথে। এমন সময় পাশে এসে সবুজবাগ থানার এস আই দাড়ান এবং বলেন, আপনি এত রাতে কোথায় যাচ্ছেন? উত্তরে বললাম, বাসায় যাচ্ছি। এবার তিনি রাগত স্বরে বললেন, এত রাতে বাসায় যাচ্ছেন কেন? উত্তরে আমি বললাম এত রাতে বাসায় যাবো না তো কোথায় যাবো, থানায়? তিনি এবার চড়াও হলেন- কি করেন আপনি? বললাম-সাংবাদিক। এবার তিনি স্বর নিচু করলেন এবং ততক্ষণে চারপাশে ঘিরে দাড়ানো কনস্টেবলদেরকে সরে যেতে ইঙ্গিত করতে করতে বললেস, একটু তাড়াতাড়ি বাসায় যাওয়া যায় না। বললাম-না। কেননা, আমাকে কাজ শেষ করেই বাসায় ফিরতে হয়। কাজ শেষ না করে বাসায় ফেরার মত ধনি আমি নই।
রিক্সা একটা পাওয়ার পর বাসায় ফেরার পথে সেই রিক্সাওয়ালা জানালেন, গতকাল রাতে তার ছেলেকে ইয়াবা পকেটে দিয়ে পুলিশ থানায় নিয়ে গেছে। এখন দাবী করছে ৫০ হাজার টাকা। এমন পুলিশ আমরা চাই না। চাই না লক্ষ লক্ষ পুলিশ। চাই অল্প সংখ্যক পুলিশ, চাই সচেতনতা তৈরি অন্যায়ের বিরুদ্ধে...

মোমিন মেহেদী : চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ-এনডিবি

চালে চালবাজী: সংশ্লিষ্টদের চৈতন্যোদয় হোক
                                  

মীর আব্দুল আলীম


চালের চালবাজী নিয়ে লিখবো তাই আমার ফেসবুক ওয়ালে ঘোষণা দিয়ে সকলের মন্তব্য চায়েছিলাম। সাংবাদিক, ব্যবসায়ি, শিল্পপতি, শিক্ষক, উকিল, ডাক্তার অনেক অনেক মন্তব্য করেছেন। একটি মন্তব্য ভালো লাগলো আমার। বেশ মনে ধরেছে। মাসুম খান নামে এক ব্যক্তি লিখেছেন- “এক দল খায় (গরীব), আর এক দল খাওয়ায় (বড় লোক)। চালবাজি! সেটাতো বড় লোকদের ব্যবসা। করতে দেন ভাই, করতে দেন! বড় লোকের পেটে লাথি মাইরেন না।” বিষয়টা হয়তো এমনই। চালবাজী বন্ধ হলে বড়লোকের পেটেই লাথি পরবে। প্রশ্ন হলো চালবাজীতো হচ্ছে অনেক দিন ধরে, বন্ধ হচ্ছে না কেন? চালবাজী করতে করতে চালে দুর্ভিক্ষ লাগিয়ে দিবে নাকি চালবাজরা? হঠাৎ করেই চালের সংকট এটা একেবারেই অবিশ্বাস্য । সঠিক ভাবে চালের গুদাম গুলো পর্যবেক্ষণ, চালের বড় ব্যাবসায়ীদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেই থলের বিড়াল বের হয়ে যাবে। এমন মন্তব্য করেছেন আরেক ফেসবুক বন্ধু।
বাস্তবতই চালের বাজার সীমাহীন অস্থিরতা চলছে। কোনোভাবেই যেন চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। কয়েক দফা শুল্ক কমিয়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কয়েক লাখ টন চাল আমদানি করা হলেও বাজারে তার বিন্দুমাত্র প্রভাব নেই। এতে প্রভাবশালী চাল ব্যাবসায়ীরাই লাভবান হয়েছেন। বিশ্ববাজারে কিন্তু চালের দাম বাড়েনি।  সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চালের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। বিপুল পরিমাণ চাল সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে আমদানি করা হয়েছে। আরও আমদানি করা হচ্ছে। দেশে চালের কোনো রকম সংকট নেই। তাহলে চালের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি কোনোভাবেই রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না কেন?
অনেকটা রহস্যজনকভাবে চালের দাম বেড়েছে। ২৫ টাকার চাল লাফাতে লাফাতে কোথায় উঠেছে? সরকার তাতে বিব্রত তা আমরা বুঝি। চালের দাম কমানোর জন্য সরকার মরিয়া হয়ে ওঠে। এর অংশ হিসাবে চালের আমদানি শুল্ক ১৮ শতাংশ কমানো হয়। ফলে প্রতি কেজি চালের আমদানি খরচ ছয় টাকা কমেছে। কিন্তু তাতেও চালের দাম না কমে উল্টো অনেক বেড়েছে। এভাবে চালের দাম বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিকতা নেই। প্রশ্ন হলো ‘এখানো কারা চাল নিয়ে খেলছে? যারা খেলাটা খেলেছে তাদের চিহিৃত করে নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন?  আমাদেও দেশের মানুষের দুর্ভাগ্য যে, সব সময় কিছু অসাধু মানুষ, গরিব মানুষকে নিয়ে খেলে। এ খেলা আগে বন্ধ করতে হবে। বলা বাহুল্য, বর্তমানে দেশের কোথাও এত বেশি চালের সংকট নেই। তবু এক ধরনের সংকট তৈরির অপচেষ্টা শুরু হয়েছে। চাল নিয়ে এই অনৈতিক কারসাজিকে ক্ষুদ্রভাবে নেওয়ার অবকাশ নেই। তা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হবে।
চালের দাম আরো বাড়তে পারে, এমন গুজবও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সাধারণ মানুষের মনে আশংকা তৈরি হচ্ছে যে অচিরেই চালের বাজার সাধারণের আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে কি না। চালের বাজারের এমন অস্থিরতায় সাংবাদিকদের দুষছেন মন্ত্রীরা। আর ‘চালের কেজি ৭০-৮০ টাকায় ওঠানোর চেষ্টা হচ্ছে’-খাদ্য মন্ত্রী তাইতো বললেন সেদিন। চালের চলের দাম বাড়ার সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশ হলেই যত দোষ। এই সত্য সংবাদ প্রকাশ করলে আপনারা বলেন, সংবাদ প্রকাশ করে আতঙ্ক ছড়িয়ে দাম বৃদ্ধি করা হচ্ছে। সঠিক সংবাদ প্রকাশ যদি ‘আতঙ্ক ছড়ানো’ হয়, তবে কেজি ৭০-৮০ টাকা ওঠানোর চেষ্টা এমন জাতীয় মন্ত্রীর বক্তব্য কত বড় আতঙ্ক ছড়ায়? মাননীয় মন্ত্রী একথা বলা কি আপনার কাজ? প্লিজ মন্ত্রী যারা ‘৭০-৮০ টাকা ওঠানোর চেষ্টা করছে’ আপনি নিশ্চয়ই আপনি তাদেও আঁচ করতে পারছেন। হতো তাদের চেনেন, জানেন। প্লিজ প্লিজ তাদের নিয়ন্ত্রণ কর”ন। ওদের অপচেষ্টা প্রতিহত কর”ন। এ দেও বির”দ্ধে ব্যবস্থা নিন। এ কাজটি কি আপনার করা উচিৎ নয়?  
এভাবে চালের দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি ভালো লক্ষণ নয়। পত্রিকার খবরে জানা যায়, আমাদের দেশেই নাকি চালের দাম সবচেয়ে বেশি। এ নিয়ে বিরোধীদলও রিতিমত রাজনীতি শুরু করে দিয়েছে। চালের মূল্য বেশির দেশ গুলোর মধ্যে আমাদের পরের স্থানই নাকি দখল করে আছে পাকিস্তান, যা বাংলাদেশের চেয়ে ১০ টাকা কম। বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে সস্তায় চাল বিক্রি করছে ভিয়েতনাম। প্রশ্ন হচ্ছে, চালোর দাম এভাবে বাড়ছে কেন? এই দাম বৃদ্ধি কি স্বাভাবিক নাকি অস্বাভাবিক? সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে, হাওরে বোরো ধানের আবাদ নষ্ট হয়েছে। এ কারণে চালের দাম বেড়েছে। সরকারের তরফ থেকে চালের দাম বৃদ্ধির খবরকে অস্বীকার করা হয়নি। তবে আমরা মনে করি, যথেষ্ট পরিমাণ চাল মজুত থাকলে হাওরের দুর্যোগের প্রভাব মোকাবিলা করা সরকারের পক্ষে কঠিন হতো না। চালের পর্যাপ্ত মজুত না থাকার জন্য বিশেষজ্ঞরা দায়ী করছেন খাদ্য মন্ত্রণালয়কে। অনেকে মনে করছেন, খাদ্যমন্ত্রী তার দায়িত্ব পালনে যে ব্যর্থতা দেখিয়েছেন তাতে তার পদত্যাগ করা উচিত।
দেশে ভোক্তাস্বার্থ বলে কিছু নেই। যদি থাকতো তাহলে চালের বাজারে এমন অরাজক তৈরি হতো না। মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের এমনিতেই কোনো ছলের অভাব হয় না। চালের ক্ষেত্রেও নানা কারণ তারা সামনে এনেছে। এবার চালের দাম অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বাজারে মোটা চালই এখন বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা কেজিতে। সরু চালের কেজি ৬০ টাকা ছাড়িয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছে সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে মোটা চালের দাম রেকর্ড ভাঙায় নিম্ন আয়ের মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যমতে, স্বাধীনতার পর ২০০৭ এবং ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মোটা চালের কেজি ৪০ টাকা এবং সরু চাল ৫৬ টাকায় উঠেছিল।
এদেশ চালের দম বাড়ে, ডালের দম বাড়ে, বেগুন, তেল লবন চিনির দাম বাড়ে। কারনে বাড়ে, আকারণে বাড়ে। চালের দাম বেড়েতো আকাশ ছুঁয়েছে। টিসিবির তথ্যমতে, গত এক বছরে দেশের বাজারে মোটা চালের দাম বেড়েছে ৪২.১৯ শতাংশ। মোটা চালের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সরু চালের দামও। চালের বাজার বলতে গেলে বেসামাল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মোটা চালের দাম বেশি রেড়েছে। সরু চালের দাম বাড়লে উচ্চবিত্তের তেমন সমস্যা হয় না, যত আপদ বিত্তহীনদের ওপর। এভাবে কেন বাড়লো চালের দাম? এর অনেক ব্যখ্যা আছে। যে যার মতো কওে ব্যখ্যা দিচ্ছেন।  চাহিদা অনুপাতে চালের জোগান যে কম সে কথা বলা যাচ্ছে না। বাজারে চাল আছে। কেউ কেউ মনে করছেন, চালের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির পেছনে কারসাজি রয়েছে। চাল সিন্ডেকেট চক্রের হাতেই চালের মজুত রয়েছে। এরাই অব্যহত ভাবে চালের দাম বাড়িয়ে চলেছে। এদিকে দেশে চালের দাম অব্যাহত বৃদ্ধির কারণ স্পষ্ট করতে পারেননি খাদ্যমন্ত্রী। তবে চাল মিল মালিক সমিতির দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, মিলারদের চালের মজুদ শেষ হয়ে যাওয়া এবং চাল বিতরণ দফায় দফায় বাড়ছে চালের মূল্য। চালের দাম সাধারণ মানুষের মধ্যে রাখার জন্য খোলাবাজার সরকারি উদ্যোগে চাল নিযে কর্মসূচি বন্ধ থাকার কারণে চালের বাজারে বিরাজ করছে অস্থিতিশীলতা। হাওর অঞ্চলের দুর্যোগকেও চালের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। অথচ চলের বাজারে এর প্রভাব পড়ার কোনোই কারণ নেই বলেই মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বাজারে নতুন ধানও এসেছে। এ সময় চালের দাম নেমে আসে। এরপরও দাম কেন বাড়ছে?
আসলে, চালের দাম বাড়ার কোনো সুস্পষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে চালের দাম বৃদ্ধির কোনো সুফল কিন্তু কৃষকরা পাচ্ছেন না। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চালের দাম বাড়িয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষক মেরে লাভবান হচ্ছেন। দেশের বেশ কিছু বড় চালকলের মালিক এই দাম বাড়ানোর সিন্ডিকেটের সাথে যুক্ত। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, আড়তে চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় তারাও দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্য দিকে অনেক মিলের মালিক আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি সরকারি গুদামে চাল সংগ্রহ অভিযানকে এ অবস্থার জন্য দায়ী করেছেন। এ জন্য আরেকটি কারনও চালকল মালিকরা দেখিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে মিল মালিকদের কাছ থেকে চাল পাইকারি বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে নানা জায়গায় চাঁদা আদায়ের অভিযোগ করেছেন তাঁরা। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, চাঁদাবাজি এখন অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর বিরুদ্ধে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো তৎপর হতে হবে। এই চাঁদাবাজির টাকা এখন চালের দাম বাড়িয়েও সাধারণ মানুষের ভোগান্তির সৃষ্টি করেছে। সরকারিভাবে বলা হয়েছে, দেশে ধান-চালের যথেষ্ট মজুদ রয়েছে। এ ছাড়া কয়েক বছর ধরে ধানের বাম্পার ফলন হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই এখন চালের দাম স্থিতিশীল থাকার কথা।
প্রশ্ন হচ্ছে, চালোর দাম বাড়ছে কেন? এই দাম বৃদ্ধি কি স্বাভাবিক নাকি অস্বাভাবিক? সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে, হাওরে বোরো ধানের আবাদ নষ্ট হয়েছে। এ কারণে চালের দাম বেড়েছে। সরকারের তরফ থেকে চালের দাম বৃদ্ধির খবরকে অস্বীকার করা হয়নি। তবে আমরা মনে করি, যথেষ্ট পরিমাণ চাল মজুত থাকলে হাওরের দুর্যোগের প্রভাব মোকাবিলা করা সরকারের পক্ষে কঠিন হতো না। চালের পর্যাপ্ত মজুত না থাকার জন্য বিশেষজ্ঞরা দায়ী করছেন খাদ্য মন্ত্রণালয়কে। অনেকে মনে করছেন, খাদ্যমন্ত্রী তার দায়িত্ব পালনে যে ব্যর্থতা দেখিয়েছেন তাতে তার পদত্যাগ করা উচিত। সরকার আশা করেছিল, বাজারে বোরো ধান এলে চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। কিন্তু নতুন চালেও সরকারের আশা পূরণ হয়নি। এখন সরকার আশা করছে চাল আমদানি করা হলে এর দাম কমবে। এক্ষেত্রেও হতাশার খবর মিলেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বাড়ছে। সরকার চাল আমদানি করতে করতে এর দাম আরও বাড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। আমরা মনে করি, সর্ব্ব প্রথম সিন্ডিকেটওয়ালাদের চালবাজী বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য চালের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের কঠোর নজরদারি থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্টদের নজরদারি কম বলেই মনে হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক ২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানুষের গড়ে খাদ্যশক্তির (ক্যালরি) ৬৫ শতাংশ আসে চাল বা ভাত থেকে। আর প্রতিদিন তারা খাবারের পেছনে যে অর্থ ব্যয় করে, তার ২৭ শতাংশ যায় চাল কিনতে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দাম বাড়লে গরিব মানুষ ভাত খাওয়া কমিয়ে দিতে হয়। ইফপ্রির জরিপে এর আগে ২০১৬ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশে প্রতি কেজি চালের দাম ৩৮ টাকায় উঠেছিল। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রতি কেজি চাল ছিল ৩৬ টাকা। এরপর ২০০৯ সালে ধানের বাম্পার ফলনের পর দেশে চালের দাম কমতে থাকে। ২০১২ সালে প্রতি কেজি চাল ২৬ টাকায় নেমে আসে। ২০১৪ সালের পর চালের দাম আবারো বাড়তে থাকে। ২০১৪ সালে ৩০ এবং ২০১৫ সালে ৩৩ টাকায় ওঠে চালের দাম। ২০১৬ সালে মোটা চাল ৩৪ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এভাবে চালের দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি ভালো লক্ষণ নয়। পত্রিকার খবওে জানা যায়, আমাদেও দেশেই নাকি চালের দাম সবচেয়ে বেশি। এ নিয়ে বিরোধীদলও রিতিমত রাজনীতি শুর” করে দিয়েছে। চালের মূল্য বেশির দেশ গুলোর মধ্যে আমাদের পরের স্থানই নাকি দখল করে আছে পাকিস্তান, যা বাংলাদেশের চেয়ে ১০ টাকা কম। বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে সস্তায় চাল বিক্রি করছে ভিয়েতনাম। সেখানে চালের দাম গড়ে প্রতি কেজি ৩৩ টাকা ৬২ পয়সা। প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রতি কেজি চালের দাম ৩৪ টাকা ৪৩ পয়সা, থাইল্যান্ডে ৩৭ টাকা ৮১ পয়সা ও পাকিস্তানে ৩৮ টাকা ৫৪ পয়সা। সরকারি হিসাবেই দেশে প্রতি কেজি চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৮ টাকায়। চালের এই দরও দেশের মধ্যে নতুন রেকর্ড। বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চালের দামটা বেশি বেড়েছে গত ৫ মাসে। প্রতি মাসেই সব ধরনের চালে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে। দাম বাড়তে বাড়তে তা এখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজার এবং টিসিবির পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত জানুয়ারিতে মোটা চালের (স্বর্ণা এবং পারিজা) কেজি ছিল ৪০ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে হয় ৪২ টাকা। এরপর মার্চে ৪৪ টাকা, এপ্র্রিলে ৪৬ টাকা এবং মে মাসে এসে হয় ৪৭ থেকে ৪৮ টাকা। আর জুন মাসে সেটি ৫০ টাকা ছাড়িয়েছে। অথচ গত বছরের জুনেও এক কেজি মোটা চাল ৩০ থেকে ৩২ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। এভাবে চালের দাম বেড়ে যাওয়ায়, সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। যারা সচ্ছল ও সম্পদশালী, চালের দাম বৃদ্ধিতে হয়তো তাদের গায়ে খুব একটা লাগে না। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষও লোকলজ্জার ভয়ে কিছু বলতে পারে না বা কোনো না কোনোভাবে সংসার চালিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু রাজধানীসহ সারা দেশের খেটে খাওয়া মানুষ পড়েছে চরম বিপাকে। তাদের সংসারের খরচ বেড়েছে, তাই এখন তারা ভাত খাওয়া কমিয়েছে আগের চেয়ে।
আমরা মনে করি, বিত্তহীনদের ব্যাপারে সরকারকে আরও মনোযোগী হতে হবে। বাজারে কীভাবে চালের দাম কমিয়ে আনা যায় সেদিকেই সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নজর দিতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন অতি মুনাফাখোর লোভী ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। মনে রাখতে হবে এ দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। ভাতনির্ভর দেশের মানুষ যদি চাহিদামতো চাল কিনতে না পারে তবে এর চেয়ে দুঃখজনক ঘটনা আর কী হতে পারে? তাই সরকারের উচিত চালের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা। আমরা এ পরিস্থিতির দ্রুত অবসান চাই।

- লেখক- মীর আব্দুল আলীম, সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিস্ট

একাদশ সংসদ নির্বাচন, ভোটাধিকার এবং নির্বাচন কমিশন
                                  

দুনিয়ার যে কোন গণতান্ত্রিক দেশের সংসদ সহ যে কোন আঙ্গিকের নির্বাচন, ভোটাধিকার এবং নির্বাচন কমিশন একসূত্রে গাথা। অন্যদিকে সুষ্টু নির্বাচন ও ভোটাধিকার গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র ও চাবিকাঠি। তাই গণতন্ত্রের মহান প্রবক্তা  আব্রাহাম লিংকন বলেছেন, জনগণ কর্তৃক জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য নির্বাচিত সরকারই গণতন্ত্রের মূর্ত প্রতীক দুনিয়ার অনেক দেশের জনগণ সংগ্রাম, আন্দোলন ও রক্তের বিনিময়ে স্বৈরাচার, স্বৈরতন্ত্র, জনগণের ভোটাধিকার অর্জন ও একনায়কের রাহু গ্রাস থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। যার অসংখ্যা উদাহরণের শেষ নেই। ১৯৭০ সালের নির্বাচনও ছিল স্বাধীনতা অর্জনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।              

পাকিস্তানের একনায়ক আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের কবল থেকে বা প্রতিনিধিত্বমূলক ভোটাধিকার ও শোষণ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে জনগণের ভোটাধিকার অর্জনে রাজপথে কম রক্ত যায়নি। যদিও দেশে জেলা পরিষদ নির্বাচনটি এখনও মৌলিক গণতন্ত্রের আদলেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যখনই এদেশের জনগণ, ভোটাধিকার এবং গণতান্ত্রিক নির্বাচনের দাবী করেছে। তখনই নেমে এসেছে রাজনৈতিক দল ও জনগণের ওপর পাকিস্তানের শোষক গোষ্ঠির অত্যাচারের নির্মম তান্ডব, নির্যাতন, কাঁদুনে গ্যাস, বেয়নেট, বুলেট এবং কারাগারের নির্মম প্রকোষ্ঠ। তা সত্ত্বেও এ দেশের মুক্তিকামী মানুষ মৌলিক গণতন্ত্র থেকে মুক্তি ও উত্তরণের লক্ষ্যে রাজপথে ট্যাংক ও ত্রি-নট-ত্রি রাইফেলের বুলেটে কাছে যেমনি নতি স্বীকার করেনি, তেমনি থমকে দাঁড়ায়নি। ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬২ ইর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯ এর অভূতপূর্ব গণজাগরণ এবং সর্বোপরি  ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইহারই বহিঃ প্রকাশ।                 

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ পর্যন্ত দেশে যতগুলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) স্বচ্ছতা ও সুষ্টু নির্বাচন নিয়ে রয়েছে অনেক কথা ও উদাহরণ। অতীতে আলোচনা, সমালোচনার পর আগামী ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারীর ৯০ দিনের মধ্যে যে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এ নিয়েই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ও দেশের জনগণ নতুন করে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন, ভোটাধিকার এবং নির্বাচন কমিশন নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। একবার দই ভেবে চুন খেয়ে পুড়া মুখ যেমনি দই দেখলে ভয় পায় এবং আতংকগ্রস্থ হয়ে পড়ে তেমনি নির্বাচন কমিশন, ভোটাধিকার ও আগামী নির্বাচন নিয়ে এখন থেকেই এ ভাবনাকে খাটো করে দেখছেনা দেশের জনগণ। বর্তমান নির্বাচন কমিশন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে.এম নূরুল হুদা যেমনিভাবে পর্যায়ক্রমে সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম প্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে মত বিনিময় সভা করছেন, তেমনিভাবে অতীতে আলোচিত ও সমালোচিত আজিজ কমিশন ও সদ্য বিদায়ী কাজী রকিব কমিশন ও রাজনৈতিক দলের নেতা, সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী, নির্বাচন বিশ্লেষক ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের নিয়ে সভা ও মত বিনিময় আলোচনা করেছিলেন। তাতে যে ফলাফল (জবংঁষঃ) হয়েছে, তা চর্বিত চর্বণ ও নতুন করে তুলে না ধরে ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে না গিয়ে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের আগামী দিনের কর্মপন্থা নিয়ে এগুনই এখন ভাবনার বিষয়।                 

এ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের উপস্থিতি ও সভাপতিত্বে অবাধ ও সুষ্ঠ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে প্রথমে সুশীল সমাজ পরে গণমাধ্যম প্রতিনিধি এবং সর্বোপরি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সাথে পর্যায়ক্রমে মত বিনিময় ও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশের বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতিনিধিদের সাথেও আলোচনা করবেন বলে জানা যায়। তবে এ পর্যন্ত যে সমস্ত প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে তাতে আগামী নির্বাচনের বিভিন্ন বিষয়ে সিইসির নিকট প্রতিনিধিরা জোরালোভাবে মুখ খোলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করলেও এখন পর্যন্ত সিইসি তাদের প্রত্যাশার সুস্পষ্ট জবাব না দিয়ে দায়সারাভাবে এবং অনানুষ্ঠানিক কিছু জবাব দিয়েছেন। যা গণমাধ্যমে ও মিডিয়াতে আংশিক প্রচারিত ও প্রকাশিত হতে দেখা যায়। তম্মধ্যে নির্বাচনে সেনা মোতায়েন সেনাবাহিনীর ওপর অর্পিত ক্ষমতা প্রসঙ্গে সিইসি স্পষ্ট কিছু না বললেও ২২ আগষ্ট গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে ভোটার তালিকা হাল নাগাদ করা উপলক্ষ্যে রেজিষ্ট্রেশান কার্যক্রম পরিদর্শন ও মত বিনিময় সভার সিইসি বলেছেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু না বললেও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, যদি দেখি সেনাবাহিনী মোতায়েন ছাড়া সুষ্টু নির্বাচন সম্ভব নয় তা হলে সেনাবাহিনী মোতায়েনের ব্যাপারে ভেবে দেখা যাবে। যা ২৩ আগষ্টের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। অপরদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মাঠে ময়দানে এবং বিভিন্ন ঘরোয়া অনুষ্ঠানে সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবী করলেও সিইসি আনুষ্ঠানিকভাবে এ ব্যাপারে কিছু না বললেও ১৪/০৯/২০১৭ ইং বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখা গেছে ১৩/০৯/২০১৭ ইং বুধবার টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসকের সভাকক্ষে এক মত বিনিময় সভায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে.এম. নূরুল হুদা বলেছেন আগামী সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে দেখা করে বলেছে। তিনি আরো বলেন, আমি আশাবাদী আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিসহ প্রধান প্রধান সব দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে।                         

এ নিয়ে পরের দিন বিএনপির শীর্ষস্থানীয় এক দুইজন বলেছেন, এ বক্তব্য বিএনপির হতে পারে না। সহায়ক সরকারের অধীন ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাবে না, এ ব্যাপারে বিএনপি এখনও অটল। অনেকের মতে সিইসির এ ধরণের আশংকা ও মন্তব্যকে নিছকই সিইসির ব্যক্তিগত মন্তব্য ও অভিব্যক্তি বলে উৎকন্ঠা প্রকাশ করেছেন। এ ব্যাপারে সুশীল সমাজের একজন বলেছেন, অতীতে অনেক নির্বাচন কমিশন ও সিইসি দেশের বিভিন্ন ধরণের নির্বাচনসহ সংসদ নির্বাচন নিয়ে পানি ঘোলা করে ক্ষমতাসীন সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে অবস্থার সৃষ্টি করেছিলেন। বর্তমান অতীতের পুনরাবৃত্তি হোক তা আর কারো কাম্য হতে পারে না। তাছাড়া আজিজ কমিশন ও রকিব কমিশনের মতো একদল নির্বাচনের আগে ভাগেই বর্তমান হুদা কমিশন আলোচিত ও সমালোচিত হোক তাও কেহ আর দেখতে চায়না। ইতোমধ্যে বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়ে বিএনপি অনেক উপযুগ ও অনুযুগ টেনে এনে একেবারে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন সিইসি হিসেবে মেনে নিতে পারছে না। তাছাড়া বিএনপি বর্তমান সিইসি কে.এম. নূরুল হুদাকে ডাইরেক্ট জনতার মঞ্চের লোক হিসেবেও মন্তব্য করে আসছে। তাই তাকে যথেষ্ট চিন্তা করেই সামনে এগুতে হবে বলে দেশের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ ও বিজ্ঞজনরা মনে করে থাকে। তাই নিবন্ধের শুরুতেই বলা হয়েছে নির্বাচন, ভোটাধিকার এবং নির্বাচন কমিশন গণতন্ত্রের মূর্ত প্রতীক। এ প্রবিধানকে লালন পালন করেই বর্তমান সিইসি কে.এম. নূরুল হুদা ও নির্বাচন কমিশনকে সামনে এগুনো ছাড়া বিকল্প কোন পন্থা খোলা না থাকারই কথা।        

১৯৭০ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের তদানীন্তন একনায়ক সরকার পাকিস্তানের তল্পী বাহক নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে পল্টনের জনসভায় বলেছিলেন, জনগণের ভোটাধিকার নিয়ে আগুন নিয়ে খেলবেননা। অপরদিকে ন্যাপ সভাপতি মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী চট্টগ্রামের লাল দিঘির ময়দানের এক সভায় তখন পাকিস্তানের শোষক গোষ্ঠি ও তল্পী বাহক নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, দেশবাসী পিন্ডির এহেন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার ও তল্পী বাহক পাকিস্তান নির্বাচন কমিশন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার শত চেষ্টা করেও পূর্ব পাকিস্তানের জনগনের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে পারেনি। ৭০ এর সেই নির্বাচনে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের দুটি সিট ব্যতিত আওয়ামী লীগ নিরংকুশ সংখ্যা গরিষ্টতা অর্জন করে থাকে। পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পিপিপি বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জনসহ মুসলীম লীগ (কাইয়ুম), পিডিপি (নসরুল্লাহ) ও ন্যাপ (ওয়ালী খান) পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েকটা আসনে জয় লাভ করে থাকে।       

সেই সময় পাকিস্তানের একনায়ক সরকার ও পাকিস্তান নির্বাচন কমিশনের ব্লূ প্রিন্ট, চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র ও স্বপ্ন, গণতন্ত্রকামী এদেশের জনরোষের কাছে তাসের ঘরের মতো ভেঙে খান খান হয়ে যায়। বাংলাদেশের জনগণ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর সংসদ নির্বাচন দেখেছে। এ নির্বাচনে ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্ধন্ধিতায় এবং বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছে। সেখানে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) ভূমিকা ও দৃশ্যপট জনগণ নীরবে দেখেছে। এ অবস্থার দৃশ্যপট এ দেশের মানুষ আর অবলোকন করতে চায়না। বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে বিএনপির অনুযোগ থাকলেও দেশের মানুষ বিশ্বাস করে আগামী নির্বাচন চর দখলের মতো ভোটার বিহীন নির্বাচন হয়তো হবে না। যার কারণে জাতীয় আন্তর্জাতিক পর্ষদে যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ ও সমালোচিত হতে হচ্ছে। আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্টু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার যথেষ্ট দৃঢ়তা নিয়ে সামনে এগুবেন এবং গণতান্ত্রিকভাবে একটি সুষ্টু নির্বাচন ও ভোটাধিকার সুসংহত করে দেশবাসী ও জনগণের নিকট একটি সুন্দর, গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক নির্বাচিত সংসদ (ঢ়ধৎষরধসবহঃ) উপহার দিতে সচেষ্ট হবেন। যা দেশ বিদেশে গ্রহনযোগ্য হবে।   

এদেশ কোন ব্যক্তি, গোষ্টি ও দলের নয়। এদেশ জনগণের এবং সাংবিধানিক দৃষ্টিতে দেশের জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস। তাই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে জনগণ ও গণতন্ত্রের কথা ভেবে সব কিছুর পর জনগণের অর্পিত ভোটের অধিকার ভোটের পবিত্রতা রক্ষা করা, সার্বভৌম নির্বাচন কমিশন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ওপর অর্পিত দায়িত্ব বলে দেশের মানুষ মনে করে থাকে। তদোপরি সবকিছুর পর শপথের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার দায়িত্ব নিয়েছেন। দেশের জনগণ নির্বাচন কমিশন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কোন পক্ষপাতিত্ব শপথ ভঙ্গের নামান্তর বলেই মনে করে থাকে।     

একাদশ সংসদ নির্বাচনসহ দেশের অন্যান্য নির্বাচন ও উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ইসি এবং সিইসিকে বুদ্ধি, পরামর্শ, উপদেশ ও জ্ঞান দান করার মতো যোগ্যতা অনেকেরই নেই। তারপরও শেখ মুজিবুর রহমানের উক্তি আগুন নিয়ে খেলবেন না এবং মওলানা ভাসানীর এহেন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মতো উক্তি টেনে বলা যায়, এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সামনে চলা উচিত। এদেশ আমার, আপনার সকলের। দেশের জন্য দয়া মায়া কারো চেয়ে ইসি এবং সিইসির কোন অংশে কম না থাকারই কথা। আগামী একাদশ নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও ভোটাধিকারের গণতান্ত্রিক প্রতিফলন হোক ইহাই দেশ, জাতি, জনগণ ও দেশবাসীর প্রত্যাশা। তাছাড়া নির্বাচন কমিশনের শ্লোগান আমার ভোট আমি দিব যাকে খুশি তাকে দিব। নির্বাচন কমিশনের এই শ্লোগান, পংক্তি, কথামালা ও প্রচার মাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর বাস্তবায়ন দেশের মানুষ সুনিপুণভাবে দেখতে আশাবাদী। অতীতে মনোমুগ্ধকর ও আকর্ষণীয় নির্বাচন কমিশনের এই শ্লোগান ও পংক্তিকে সামনে রেখে ভোট কেন্দ্রে জনগণের ভোট নিয়ে যে তকমা, তামাশা, ভানুমতির খেলা, জালিয়াতি ও রসিকতা হয়েছে তা কারো বিবেক ও ভোটারের মন থেকে আজো ধুয়ে মুছে যায়নি। নির্বাচনে ভোটারদের নিয়ে সেই পুরনো ক্যারিশমেটিক অভিনব নাটক আর যাতে নতুন করে গণমাধ্যম, অনলাইন, ফেইসবুক, টকশো ও মিডিয়াতে দৃশ্যমান না হয় এটা স্মরণ করে একাদশ নির্বাচন নিয়ে সামনে চলার পথ হোক সুন্দর, অনাবিল, গণতান্ত্রিক ও পক্ষপাতহীন। নির্বাচন, ভোটাধিকার, নির্বাচন কমিশন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকা হোক সমালোচনামুক্ত ও পক্ষপাত বিহীন।    

কথায় নয়, বক্তৃতায় নয়, কাজের মাধ্যমে প্রতিফলিত ও প্রমাণিত হোক “আমার ভোট আমি দিব যাকে খুশি তাকে দিব”। গড্ডালিকা মার্কা অস্বচ্ছ নির্বাচন নিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের চমক ও আওয়াজ দেশের জনগণ আর দেখতে চায়না। বিনা ভোটের সংসদ সদস্য ও পার্লামেন্টও মানুষ আর দেখতে চায়না। দেশের মানুষের প্রত্যাশা নির্বাচন কমিশনের কথা, কাজ ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ও সমন্বয়। এর ব্যর্থতা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও অসমন্বয় শুধু নির্বাচনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে না বরং সবকিছু বুমেরাং হয়েও যেতে পারে। তদোপরি আশাতীত গণতন্ত্রের সম্মুখ পথযাত্রা থেমে গেলে কারো বলার হয়তো কিছু নাও থাকতে পারে। তাই সুষ্ঠু নির্বাচন, জনগণের সুসংহত ভোটাধিকার ও পক্ষপাতহীন নির্বাচন কমিশনই হোক জনগণের আশা আকাংখার প্রতিফলন ও গণতন্ত্রের দিশারী। মানুষের মন থেকে আজো ২০০২ এর অপারেশন ক্লিনহার্ট, ২০০৭ এর ওয়ান ইলেভেন ও শেরে বাংলা নগরের ক্যাঙ্গারো কোর্টের বিষাদের স্মৃতি এখনো তিরোহিত হয়নি। সকল প্রকার কারচুপি  ব্যতিরেখে আগামী দিনের একাদশ নির্বাচন, ভোটাধিকার এবং নির্বাচন কমিশন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকা হোক স্বচ্ছ, সুন্দর, সাবলীল, দৃঢ়, গণতান্ত্রিক, পক্ষপাতহীন, জনসমর্থিত ও প্রশংসিত।  
     
 
(এ.কে.এম শামছুল হক রেনু)
লেখক কলামিষ্ট

নির্বাচনে সেনা মোতায়েন প্রত্যাশা এবং সিইসির দৃশ্যপট
                                  

নির্বাচনে পূর্বাপর উদাহরণ ও দৃষ্টান্তের আলোকে দেশের বিভিন্ন পর্ষদের আইনশৃংখলা বাহিনীর যথেষ্ট দক্ষতা, মনোবল, লজিস্টিক সার্পোট ও অবদান থাকা স্বত্ত্বেও শুধু তাদের মাধ্যমে নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্টুভাবে না হওয়ার আশংকা থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ দেশের যে কোন নির্বাচনে প্রার্থী, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক মহল থেকে বারংবারই নির্বাচন আসলেই সেনাবাহিনী মোতায়েনের যেমনি প্রত্যাশা করা হয়ে থাকে তেমনি ইসি ও সিইসির নিকট দাবীও জানানো হয়ে থাকে। যার ফলে ৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ৭৩, ৭৯, ৮৬, ৮৮, ৯১, ৯৬ - ১৫ ফেব্র“য়ারী, ৯৬ - ১২ জুন, ২০০১, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে স্ট্রাইকিং ফোর্স এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে নিজ অবস্থান অর্থাৎ ক্যান্টনমেন্টে রিজার্ভ (জবংবৎাব) ফোর্স হিসেবে মোতায়েন রাখা হয়।             

তদোপরি বেশীর ভাগ নির্বাচনেই আনসার, পুলিশ, বিজিবি (সাবেক বিডিআর) আমর্ড পুলিশ, কোস্টগার্ড এবং সেনাবাহিনী আইনশৃংখলা বাহিনীর আলোকেই ইন্সট্রাকশান রিগার্ডিং এইড টু সিভিল পাওয়ার (ওহংঃৎঁপঃরড়হ জবমধৎফরহম ধরফ ঃড় পরারষ ঢ়ড়বিৎ) অনুসারে দায়িত্ব পালন করে থাকে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের ৯ম জাতীয় সংসদের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে, ২০১৩ সালে আরপিওতে (জচঙ) সংশোধনী এনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞা থেকে সশস্ত্র বাহিনীকে বাদ দেয়া হয়ে থাকে। যদিও ৭২ সালের সংবিধান আরপিওর (জচঙ) ৫ (১) প্রদত্ত অনুচ্ছেদের ক্ষমতা বলে নির্বাচন কমিশন (ইসি) একাদশ সংসদ নির্বাচনে আইনশৃংখলা রক্ষায় পূর্ণ ক্ষমতা দিয়ে নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে দেশের প্রথিতযশা আইন বিশ্লেষক ও নির্বাচন বিশ্লেষকদের জোরালো অভিমত রয়েছে।

যা ইসি ও সিইসির সাথে ৩১ জুলাই সুশীল সমাজ ১৬ ও ১৭ আগস্ট বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিনিধি, অনলাইন, টেলিভিশন, রেডিওর প্রতিনিধি এবং পরবর্তী সময় দুটি রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনাকালে বেশীর ভাগ উপস্থিতির কাছ থেকেই এই পরামর্শই প্রতিফলিত হয়। যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে সুবিন্যস্থভাবে প্রকাশিত হয়ে থাকে।                

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আমাদের গর্ব আমাদের অহংকার। সেনাবাহিনী আমাদেরই ভাই, আমাদেরই স্বজন, বন্ধু এবং আমাদেরই সন্তান। সেনাবাহিনী অন্য কোন ভিন্ন জগতের প্রাণী নহে। তাছাড়া সেনাবাহিনী জাতির সুখ, দুঃখ ও উন্নয়নের সাথীসহ বহিশত্র“র হাত থেকে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী। ৭১ সালের ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের উষালগ্ন থেকে ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনীকে জলে, স্থলে, আকাশে সমূলে পরাজিত করে দেশ মাতৃকার সূর্যসন্তান  মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে এনে বিশ্বের মানচিত্রে লাল সবুজের পতাকা উড্ডীন করতে অপরিসীম বীরত্বগাথা সৃষ্টি করেছে। তদোপরি ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিবর রহমান, মাওলানা ভাসানী, জিয়াউর রহমান, জেনারেল এম.এ.জি ওসমানীর অবদানসহ অন্যান্যদের বীরত্বগাথা ও ত্যাগের অবদানকে কোন মতেই অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই।                   

জাতিসংঘের শান্তি মিশনে এ দেশের সেনাবাহিনী দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে যে পারফরম্যান্স (ঢ়বৎভড়ৎসধহপব) কৃতিত্ব ও সম্মান খুঁড়িয়েছে তা গোঠা দুনিয়ার মানুষের কাছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশের অকৃত্রিম সম্মান ও প্রশংসার দাবী রাখে।       

আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে কে হারল কে জয় লাভ করল এটা বড় কথা নয়। অবাধ, সুষ্টু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনই দেশের সকল শ্রেণী পেশার মানুষের কাম্য। এর জন্য নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রক্ষার স্বার্থেই সেনাবাহিনীকে স্ট্রাইকিং ফোর্স বা রিজার্ভ (জবংবৎাব) ফোর্স নয় যথাযথ ক্ষমতা অর্পন করে অন্যান্য বাহিনীর সাথে নির্বাচনের দায়িত্বে সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রত্যাশা করে আসছে দেশের সুশীল সমাজ ও অনেকেই।      

এদিকে দেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এর জাতীয় সংসদের বাইরে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের ব্যাপারে পরষ্পর বিরোধী অবস্থান রয়েছে। সরকারী দল আওয়ামী লীগ মূলত নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের পক্ষে নয়। তবে দলটির নেতাদের বক্তব্য থেকে মনে হয় নির্বাচনের সময় স্ট্রাইকিং ফোর্স বা রিজার্ভ (জবংবৎাব) ফোর্স হিসেবে সেনা মোতায়েনে তাদের আপত্তি নেই। অন্যদিকে বিএনপি চাচ্ছে নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনী নিয়মিত আইনশৃংখলা বাহিনীর ভূমিকা পালন করুক।  

একাদশ সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের ব্যাপারে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে.এম. নুরুল হুদা ১৭ আগস্ট অনলাইন ও গণমাধ্যমে প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা কালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেবে ইসি। কেও চাইল বা না চাইল তার ওপর নির্ভর করে কিছু হবে না। পরিবেশ পরিস্থিতিতে যদি প্রয়োজন মনে করি সবই করব। দরকার মনে না করলে সেনাবাহিনী আসবে না। এটা সম্পূর্ণভাবে ইসির ওপর ছেড়ে দিতে হবে। তারপর ২২ আগস্ট গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে ভোটার তালিকা হাল নাগাদ করা উপলক্ষে রেজিষ্ট্রেশন কার্যক্রম পরিদর্শন ও মত বিনিমিয় সভায় নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন সংক্রান্ত ব্যাপারে সিইসি বলেছেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের ব্যাপারে আমরা সুস্পষ্টভাবে এখনও কিছু বলতে পারছি না। যদি দেখি সেনাবাহিনী মোতায়েন ছাড়া সুষ্টু নির্বাচন সম্ভব নয় তাহলে সেনাবাহিনী মোতায়েনের ব্যাপারে ভেবে দেখা যাবে। এর আগে ২ জুলাই নির্বাচন কমিশনের সচিব বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্য হলে আগামী সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে। তিনি আরো বলেছেন, তার জানা মতে নাকি অতীতে কোন সাধারণ নির্বাচনে (সংসদ নির্বাচন) সেনা উপস্থিতি ছাড়া হয়নি।  

দেশের মানুষের প্রত্যাশা ও দাবীর মুখে একাদশ সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে কি হবে না তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে অনেকেই অভিমত রেখে বলেছেন কোন অবস্থাতেই সেনাবাহিনীকে তাদের অবস্থান অর্থাৎ ক্যান্টনমেন্টে বা অন্য কোথায়ও রিজার্ভ রেখে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করার পদ্ধতি যেন আবিষ্কার না করা হয়। দেশের মানুষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনাবাহিনীকে নিজ অবস্থান (ক্যান্টনমেন্টে) রিজার্ভ রাখার কথা গণমাধ্যমেও মিডিয়াতে সেই সময় লক্ষ্য করেছে।  

রিজার্ভ ফোর্স (জবংবৎাব) সম্পর্কে এ নিবন্ধে তথ্য, তত্ত্ব ও বইপুস্তুকের সূত্রের আলোকে ও প্রবীনদের কাছ থেকে শুনে ব্রিটিশ আমলের একটি ঘটনা উপস্থাপন করা হলো। ভারতবর্ষে ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট পাকিস্তান ও হিন্দুস্থান রাষ্ট্র দুটি স্বাধীন হওয়ার আগে এ দেশে জমিদারদের দাপট, নিষ্পেশন ও বিষাদের কাহিনী কারো না জানার কথা নয়। সেই সময় দেশের অন্যান্য এলাকার মতো তদানীন্তন বৃহৎ ময়মনসিংহ জেলায় (বর্তমানে বিভাগ) অনেকগুলো জমিদার ছিল। যা ইতিহাসের পাতায় আজো সাক্ষ্য হয়ে রয়েছে। তাদের মধ্যে মুক্তাগাছা, গৌরিপুর, আঠারবাড়ী, শেরপুর ও কিশোরগঞ্জের পরামানিক অত্যাচারী জমিদারের নাম উল্লেখযোগ্য। তম্মধ্যে শেরপুরের জমিদারের সানে বান্দাইল ঘাট নিয়ে জমিলা সুন্দরীর কিচ্ছা আজো এ অঞ্চলে বহুল প্রচলিত। সেই সময় পাকুন্দিয়া এলাকার জাঙ্গালিয়ায় দগদঘায় জমিদারের তস্য জমিদার কৃষ্টমোহন সাহার প্রজাদের ওপর অকথ্য অত্যাচার, অবিচার, শোষণ নির্যাতনের ঘটনায় প্রজা বিদ্রোহ এবং রিজার্ভ ফোর্সের ব্যর্থতার কথা জানা যায়। উক্ত এলাকায় কৃষ্ট মোহন সাহার বিরুদ্ধে প্রজা অসন্তোষ ও প্রজা বিদ্রোহ দেখা দিলে পাকুন্দিয়া এবং হোসেনপুর থানায় ব্রিটিশের লালটুপী ও হাফপ্যান্ট পরিহিত প্রচুর ফোর্স অবস্থান করে থাকে। জানা যায় সেই

সময় কিশোরগঞ্জ মহকুমার এসডিও বা মহকুমা প্রশাসক ছিলেন ইংরেজ ওয়ারেন থমাস এবং মহকুমার এসডিপিও বা মহকুমা পুলিশ অফিসার ছিলেন রাম সিং এবং ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার দুজনেই ছিলেন ইংরেজ। যা এলাকায় জানাজানি হয়ে গেলে এলাকার সকল প্রজারা সতর্কপন্থা অবলম্বন করে থাকে। একদিন রাতে কৃষ্ট মোহন সাহার বাড়ীতে আসা রাস্তার সমস্ত সংযোগ প্রজারা বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে বড় বড় গাছের ডোম ফেলে রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করে কৃষ্ট মোহন সাহার বাড়ীতে প্রজারা আগুন দিলে কৃষ্ট মোহন সাহা প্রজাদের ওপর নির্বিচারে গুলি বর্ষন করে। এতে অনেক প্রজা আহত ও নিহত হয়। তারপর প্রজাদের দিকবিদিগ আক্রমণ ও আগুনে সপরিবারে তস্য জমিদার কৃষ্ট মোহন সাহা মারা যাওয়ার পর ব্রিটিশের হাফপ্যান্ট ও লাল টুপি পরিহিত রিজার্ভ ফোর্স এসে ঘটনার ভয়াবহতা দেখে বিকল্প কোন পন্থা না পেয়ে এলাকার নীরিহ, নিরপরাধ ও সাধারণ প্রজাদিগকে রাগে ক্ষোভে অমানুষিক অত্যাচার সহ যা ইচ্ছা তা করে থাকে। এলাকাময় আতংক ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে থাকে। যদি আগ থেকেই রিজার্ভ ফোর্স এলাকায় সক্রীয়ভাবে অন্যান্য ফোর্স মোতায়েন থাকতো তবে যেমনিভাবে জমিদারসহ তার পরিবার বর্গ প্রজাদের আগুনে মৃত্যুবরণ করতে হত না, তেমনিভাবে তস্য জমিদারের গুলিতে প্রজারা আহত, নিহত ও ব্রিটিশের লাল টুপি মার্কা রিজার্ভ ফোর্সদের মাধ্যমে নিগৃহীত অত্যাচারিত ও শত শত নিরীহ প্রজাকে জেলে যেতে হত না।

আগামী সংসদ নির্বাচন এখনো প্রায় ১৬/১৭ মাস সামনে রয়েছে। কোন অবস্থাতেই সেনাবাহিনীকে রিজার্ভ (জবংবৎাব) বা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে না রেখে নির্বাচনের ১০/১৫ দিন আগ থেকেই পরিপূর্ণ ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনীকে নির্বাচনী এলাকায় মোতায়েন রাখার ব্যাপারে দেশের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ প্রত্যাশা ও অভিমত ব্যাক্ত করে আসছে।

নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) পরামর্শ দেয়া অনেকের মতো একজন নগন্য নিবন্ধক হিসেবে সুযোগ খুবই পরিমিত। তারপরও বলতে হয়, একাদশ সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে বাস্তবসম্মত বিভিন্ন কর্মপন্থা নেয়ার ব্যাপারে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, গণমাধ্যম প্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক পরিসর থেকে ইসি, সিইসিকে বারবার বলা হচ্ছে এবং যথোপযুক্ত পরামর্শও দেয়া হচ্ছে। তারপরও যদি বোধদয় না হয় এবং দেশে আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে বড় ধরণের কোন জটিলতা হয়, অতীতের মতো আবার নতুন করে একতরফা নির্বাচন হয় এবং পরষ্পর রাজনৈতিক সংঘাতে কোন মায়ের বুক খালি হয়, তাতে ইসি সিইসি দায়ী থাকার কথা বলে বিজ্ঞজনরা মনে করে থাকে।

এখনো ইসি, সিইসির হাতে অনেক সময়। এই সময়ের মধ্যে নির্বাচনে পরিপূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকবে কি থাকবেনা এ ধরণের বক্তব্য থেকে সরে এসে দেশের মানুষের আশা, আকাংখা ও প্রত্যাশার আলোকে নির্বাচনে দেশ প্রেমিক সেনাবাহিনী মাঠে থাকবে, এটাকে সাধুবাদ জানিয়ে ঐক্যমত পোষণ দোষের কিছু নহে। বরং ইহাই ইসি সিইসির গর্ব করার মতো উপাখ্যান। তাছাড়া সেনাবাহিনী এদেশেরই সন্তান ও ভোটারও বটে। দেশের জন্য সেনাবাহিনীর দয়া মায়া কারো চেয়ে কোন অংশেই কম নহে।

এখনো সভাসমাবেশে আজিজ মার্কা নির্বাচন কমিশন ও সদ্য বিদায়ী কাজী রকিব কমিশনের কথা আলোচনা, সমালোচনা করতে অনেকেই ভুল করেনি। বর্তমান ইসি এবং সিইসির বিরুদ্ধে এমন অবস্থান পুনরাবৃত্তি হোক, তা কেহ প্রত্যাশা করেনা। নির্বাচন কমিশন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার দৃঢ় থেকে এবং দৃঢ়তার সাথে সুষ্টু ও শান্তিপূর্ণভাবে যাতে আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে, পূর্বের সমালোচিত ইসি ও সিইসির ভুলন্ঠিত রেকর্ড ভঙ্গ করে দেশ, জাতি, জনগণ ও বহির্বিশ্বের নতুন দিক দর্শন, অবাধ, স্বচ্ছ, সুষ্টু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ন নির্বাচনের ইতিহাস সৃষ্টি করুক ইহাই সকলের প্রত্যাশা। মনে রাখা উচিত, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ও ২ লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ আমার, আপনার সকলের। বাংলাদেশ আমাদের অহংকার, বাংলাদেশ আমাদের গর্ব। তদোপরি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যেমনি নবদিগন্তের দিশারী তেমনি আশার আলো।        
 
এ.কে.এম শামছুল হক রেনু
(লেখক কলামিষ্ট)

৩ মাসের মধ্যে ধর্ষকের ফাঁসি এবং বিজয় বাংলাদেশ
                                  

রুপার বাড়িতে এখন শোকের মাতম চলছে। রুপার মা হাসনা হেনা বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন আর বলছেন, ‘আমার মেয়ে বলেছিল, কোরবানির ঈদে আসবে। আর ওর আশা হল না। আমি এখন কি নিয়ে বাঁচব। ওর স্বপ্ন ছিল পড়ালেখা করে বড় কিছু হবে।’ কয়েকদিন আগে রুপা মোবাইলে তার মাকে বলেছিলেন, ‘মা আর অল্পদিনের মধ্যে ফিরে আসব। সামনে কোরবানির ঈদ, তাইতো একবারে এলেই ভালো হয়। নিজের দিকে খেয়াল রাইখো। বড়ভাই আর উজ্জ্বলের প্রতি বিশেষভাবে নজর দিও। তুমি ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করিও। শরীরের প্রতি যতœ নিও।’ মোবাইল ফোনে মায়ের সঙ্গে এটাই রুপার শেষ কথা। রুপার মা হাসনা হেনা আরও বলেন, ‘আমাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম মেয়েকে আল্লাহ নিয়ে গেলেন। এখন আমি কিভাবে বাঁচব। কেউ তো আমার সোনা মানিকের মতো আমার খবর নেবে না। রুপা তো আর আমাকে মা মা বলে ডাকবে না। আমার সোনার পাখিকে যারা হত্যা করেছে আমি তার কঠিন বিচার চাই।’ ঢাকার আইডিয়াল ল’ কলেজে এলএলবি বিষয়ে অধ্যায়নরত ছিল রুপা। লেখাপড়ার পাশাপাশি সে শেরপুর জেলায় অবস্থিত ইউনিলিভার বাংলাদেশের প্রমোশনাল ডিভিশনে চাকরি নেয়। পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করে সংসার চালানোই ছিল ওর ইচ্ছা। রোজার ঈদে পরিবারের সঙ্গে হাসি-খুশিতে ঈদ করেছিল। কিন্তু শুক্রবার শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে আর ফিরল না।
বগুড়ার চারমাথা থেকে বাসটি সন্ধ্যা ৭টার পরপর ময়মনসিংহের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। বনানী এলাকা থেকে রুপাসহ আরও পাঁচ-ছয়জন যাত্রী বাসে উঠেন। সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত সব যাত্রী নেমে যান। শুধু রুপা বাসে ছিলেন। বাস এলেঙ্গা পার হওয়ার পর সহকারী শামীম রুপাকে জোর করে বাসের পেছনের আসনে নিয়ে যায়। তখন রুপা মুঠোফোন এবং সঙ্গে থাকা পাঁচ হাজার টাকা শামীমকে দিয়ে অনুরোধ করেন তার কোনো ক্ষতি না করার জন্য। টাকা ও মুঠোফোন নেয়ার পরে শামীম তরুণীকে হত্যা করার ভয় দেখিয়ে প্রথমে ধর্ষণ করে। পরে বাসের অপর দুই সহকারী আকরাম এবং জাহাঙ্গীর পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করে। বাস মধুপুর উপজেলা সদরের কাছাকাছি পৌঁছলে রুপা চিৎকার করার চেষ্টা করেন। এ সময় শামীম, আকরাম ও জাহাঙ্গীর তার ঘাড় মটকে হত্যা করে। পরে মধুপুর শহর পার হয়ে বনাঞ্চলের প্রবেশের পরেই পঁচিশ মাইল এলাকার সুমি নার্সারির কাছে রুপার মরদেহ ফেলে রেখে যায়।
অথচ এই রুপা বগুড়া সরকারি আযিযুল হক কলেজ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেন। এর আগে তাড়াশ জেআই টেকনিক্যাল কলেজ থেকে ব্যবসায় শিক্ষা শাখা থেকে সাফল্যের সঙ্গে এইচএসসি পাস করেন। বাবা জেলহক প্রামাণিক এক বছর আগে মারা যান। ৫ ভাই-বোনের মধ্যে রুপা চতুর্থ। বড় বোন জেসমিনের বিয়ে হয়েছে প্রায় ৭ বছর আগে। আরেক বোন পপি অনার্স পাস করেছেন। ছোট ভাই উজ্জ্বল বেকার। বড়ভাই হাফিজুর রহমান আর রুপা মিলেই সংসার চালাতেন। এ অল্প বয়সেই পড়াশোনার পাশাপাশি হাতে নিয়েছিল সংসারের ঘানি। রুপা বহুবার মাকে বলেছেন, ‘আর কয়েকটা বছর অপেক্ষা কর, আমাদের সংসারে আর কোনো অভাব থাকবে না।’
অভাবকে তাড়াতে গিয়ে আমাদের সামাজিক ব্যাধিতে আক্রান্ত রুপা সুন্দর ১টি জীবনের জন্য কষ্ট করেছে; তাকেই প্রাণ দিতে হলো নৃশংসতার শিকার হয়ে। তার মায়ের কথা ‘তাদের ফাঁসি না দিলে মাইনবো না।’ আমরাও মানবো না রুপার হত্যাকারীদের ফাঁসির রায় না হলে, কার্যকর না হলে। কেননা, একজন রুপাই শুধু নয়; আমরা ইয়াসমিন থেকে শরু করে বুশরা, হেনা, নাজমা, সুমাইয়া সহ ১৭ হাজার ৮ শতরও বেশি মা- বোন-প্রিয়জনকে হারিয়েছি স্বাধীনতা অর্জনের পর ৪৬ বছরে। তনুর কথা ভুলতে না ভুলতেই চলে এসেছে খাদিজার কথা, খাদিজার কথা ভুলতে না ভুলতেই চলে এসেছে চন্দ্রিমার কথা; এভাবে বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ১০৪ জন নারী এখন নির্যাতিত-ধর্ষিত হচ্ছে বলে চিল্ড্রেন এ্যান্ড উইমেন ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন ঈ২ডঋ  জানিয়েছে। এর মধ্যে হত্যা ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে প্রতিদিন ৭ থেকে ১৫ পর্যন্ত। যার অধিকাংশের তথ্যই পুশিশ-প্রশাসন ও গণমাধ্যম পর্যন্ত পৌছেই না। পৌছতো না এই ঘটনাটিও। যে ঘটনাটি টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে ঘটেছিলো।
হয়তো অনেকেরই মনে আছে যে, এর আগেও টাংগাইলের ধনবাড়িতে চলন্ত বাসে ধর্ষণ হয়েছে। একই কায়দায় পেছনের সিটে নিয়ে। এবং তাকে ময়মনসিংহে একখানে ফেলে দেওয়া হয়। ১৬ মাসেও সেই মামলার অভিযোগ গঠন হয়নি । তিনজন আসামীর মধ্যে একজন জামিন পেয়েছে । অথচ তারা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দিয়ে দোষ স্বীকার করেছিল। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে এদেশের রাস্তা-ঘাটে, হাটে -বাজারে, বাসে- ট্রাকে রেপ হবে না তো কি হবে ব্রুনাইয়ে? যে নারীর ধর্ষণ হয়েছিল তাঁর স্বামী নিজে অন্য বাসকর্মিদের সহায়তায় আসামী খুঁজে বের করেছিল। স্বীকার করে নেবার পরও এসব ধর্ষকের বিচার হচ্ছে না। রাস্ট্র যন্ত্র যদি তাদের বিচার করতে না পারে পাব্লিকের হাতে ছেড়ে দেওয়া হোক। আধুনিক প্রযুক্তিতে বিচার হবার পেছনে বছরের পর বছর লাগার কারণ কি? রুপাকে ধর্ষণ হত্যার পেছনে যে পাঁচজন জড়িত তারা স্বীকার করেছে । এরপর তাদের ফাঁসিতে লটকাতে স্বাক্ষী সাবুদ আইন ফাঁক এসব কেন? পাঁচ দিনেই ঝুলিয়ে দেওয়া হোক। ধর্ষকদের সেসব ঝুলন্ত লাশের ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হোক দেশ ব্যাপী । এসব ছবি দেখে প্রতিটা ধর্ষণকামী পুরুষের পুরুষদন্ড যাতে আজীবনের জন্য নিস্তেজ হয়ে থাকে। প্রতিটা নারীকে এসব কামাশক্ত পুরুষ যাতে মা নজরে দেখে...
একই সাথে রুপার ছবি শেয়ার করতে চাই, শেয়ার করে বলতে চাই যে, আপনারা দেখুন এবং বিবেককে জাগ্রত করুন । চশমা পরা মিষ্টি মেয়েটি যে কিনা নিজের কাঁধে একটি সংসারের বোঝা তুলে নিয়েছিল তাঁর পরিনতি দ্বিতীয় ছবি হবার কথা ছিল? আর তৃতীয় ছবির জন্তুগুলোর ফাঁসি দিতে কোন সাক্ষীর প্রয়োজন আছে? ঘটনা কিন্তু এটাই প্রথম নয়; অতএব, কালকের জন্য নূন্যতম সতর্কতারসরুপ ফাঁসি চাই ৩ মাসের মধ্যে ধর্ষকের ফাঁসি। এর আগেও অনেক লিখেছি আমি; রাজপথেও অনেকবার আন্দোলন সংগ্রাম করেছি ৩ মাসের মধ্যে ফাঁসি চেয়ে; আজো চাইছি। আশা করি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনককন্যা শেখ হাসিনা বিষয়টি ভাববেন এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যাবেন নতুন প্রজন্মের জন্য নিরাপদ দেশ উপহার দেয়ার লক্ষ্যে...
একই সাথে তাদেরকে তৈরি হওয়ার আহবান জানাবো; বাংলাদেশকে ভালোবেসে হেসে হেসে যারা বায়ান্নর মত, একাত্তরের মত অবিরত তৈরি আছেন থাকবেন জীবন দিতে। তারা আরো একবার ঐক্যবদ্ধ হলেই বাংলা ভাষা যেমন আমাদের হয়েঝে; এই মানচিত্র যেমন আমাদের হয়েছে; ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের প্রতিটি ইঞ্চি মািিট আমাদের জন্য নিরাপদ হবে বলে দৃঢ়তর আশায় অগ্রসর হতে পারি।
বায়ান্ন মানে যেমন বাংলা ভাষা; একাত্তর মানে যেমন স্বাধীনতা; নব্বই মানে যেমন সাহস মিছিল; ২০০৮ মানে যেমন এক এগারোর বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা; ঠিক তেমনি ২০১৭ মানে নিরাপদ দেশ গড়া। যে দেশে সাহসের সাথে সবাই দুর্নীতি-খুন-গুম-সন্ত্রাস-চাঁদাবাজী-অন্যায় আর অপরাধের রাজনীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবে। বাংলাদেশকে কালোহীন আলোকিত করতে হাতে হাত রেখে এগিয়ে যাওয়ার সময় এখন। নতুন প্রজন্মকে সেই সাহসী সময়ে অগ্রসর হওয়ার জন্য উৎসাহিত করবেন নাগরিকগণ। যারা রাজনীতির নামে মৃত্যুশহর চান না; যারা রাজনীতি মানে রাতের আঁধারে যুবতীর লাশ চান না; যারা রাজনীতি মানে নির্মমতার অন্ধকারে আগামীকে হারাতে চান না; তারা অন্তত জাগুন; জেগে উঠুন নিদেন পক্ষে একবারের জন্য; উচ্চারণ করুন- বিজয় বাংলাদেশ; বিজয় নতুনধারা; সময়ের সাথে সাথে হাত রেখে প্রতি হাতে গড়বে স্বদেশ যারা; ডাক দিয়েছে আজ চারিদিকে সাহসরাজ; যুদ্ধ নয় আলোর সাথে ভালোর সাথেই এগুবে তারা; বিজয় বাংলাদেশ বিজয় নতুনধারা...

মোমিন মেহেদী : চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ-এনডিবি

শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বাংলাদেশ
                                  

৮ সেপ্টেম্বর, উপমহাদেশের বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর জন্মদিন। উনিশ শতকের শেষ দিকে, ১৮৯২ সালের এই দিনে তিনি পশ্চিম বঙ্গে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মদিনে ভাবছি, বামপন্থীরা তাঁর ওপর এত রুষ্ট কেন? পাকিস্তানি রাজনীতির গোলোক ধাঁধাঁর মধ্যে আমাদের কোনো নেতাই ভুলের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন নি। শেরেবাংলা ও মওলানা ভাসানীর স্ববিরোধী ভূমিকা এবং ভুল শহীদ সোহরাওয়ার্দীর চেয়ে বেশি ছাড়া কম নয়। আর বামপন্থীরা অন্যের ভুলের চর্চা এত নিখুঁতভাবে করে থাকেন যে, নিজেদের ভুলের ক্ষুদ্র পাহাড়টি লক্ষ্য করেন না।
পাকিস্তানি শাসকরা তাঁকে বলেছিলেন, ‘ভারতের লেলিয়ে দেয়া কুকুর।’ এমন সম্ভাষণ মধুর সম্ভাষণ নয় নিশ্চয়ই। তিনি যে যুক্তবাংলা স্বাধীন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তা বাঙালির ইতিহাসে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। বাংলাকে যুক্ত রেখে স্বাধীন করার পক্ষে তিনি যে যুক্তিগুলো দিয়েছিলেন তা  অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিস্তারে বীজের ভূমিকা পালন করেছে। তাঁর মতো একজন প্রতিভাবান, উদার, মার্জিত, রুচিবান এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পন্ন নেতাকে এভাবে ভুল বোঝার কারণ কী? তিনিই সবচেয়ে বেশি জিন্নাহ, খাজা নাজিমুদ্দিন, মওলানা আকরম খাঁদের দ্বারা ষড়যন্ত্র ও অবিচারের শিকার হয়েছেন। পরপর দুইবার তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্ব কেড়ে নেয়া হয়েছে। ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেই তিনি ১৯৪৬ সালে যুক্তবাংলার প্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। আবার ষড়যন্ত্র করেই খাজা নাজিমুদ্দিনরা তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্ব কেড়ে নিয়েছেন। পূর্ববাংলায় সহজে তাঁকে পা রাখতে দেয়া হয়নি। ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে দেয়ার পেছনে জিন্নাহর ‘ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডে’ ঘোষণা কাজ করেছিলো, ঘোষণাটি ছিলো উস্কানিমূলক, এরপর খাজা নাজিমুদ্দিন বললেন, ‘আমাদের যুদ্ধ ইংরেজদের বিরুদ্ধে নয় হিন্দুদের বিরুদ্ধে।’ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা না বাধালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবি হালে পানি পায় না। এর জন্য সোহরাওয়ার্দীকে দায়ী করা অযৌক্তিক। জিন্নাহ এবং খাজা নাজিমুদ্দিনের ঘোষণা সোহরাওয়ার্দীকে বিপাকে ফেলেছিলো। জিন্নাহ এবং খাজা নাজিমুদ্দিনের ঘোষণা ও চক্রান্তের মাসুল সোহরাওয়ার্দীকে দিতে হয়েছে। আর যা-ই হোক সোহরাওয়ার্দী খাজা নাজিমুদ্দিনদের মতো চক্রান্তবাজ নেতা ছিলেন নাÑভুল তাঁর যতই থাক। তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্ব কেড়ে নেবার পরও তিনি মানসিক স্থৈর্য হারান নি, তিনি ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পরও ভারতে থেকে গেলেন অসহায় সংখ্যালঘু মুসলমানদের পাশে দাঁড়াবার জন্য। বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’-তে বলেছেন, ‘নাজিমুদ্দিন সাহেব নেতা নির্বাচিত হয়েই ঘোষণা করলেন, ঢাকা হবে রাজধানী এবং দলবলসহ ঢাকায় চলে গেলেন। একবার চিন্তাও করলেন না, পশ্চিম বাংলার হতভাগা মুসলমানদের কথা। এমন কি আমরা যে সমস্ত জিনিসপত্র কলকাতা থেকে ভাগ করে আনবো তার দিকেও ভ্রুক্ষেপ করলেন না।’ (পৃঃ ৭৮)।
মানবতার প্রতি এতটুকু দায়বদ্ধতা না থাকলে তিনি এতবড় নেতা হতে পারতেন না। সমগ্র ভারতে হিন্দু –মুসলমান যে দাঙ্গা লেগেছিলো তা থামানোর প্রাণপণ ভূমিকা নিয়েছিলেন মহাত্মাগান্ধী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। উগ্র হিন্দুরা মহাত্মার সঙ্গে তাঁকেও হত্যার উদ্যোগ নিয়েছিলো। ভাগ্যগৃুণে তিনি বেঁচে যান। শান্তি স্থাপনে ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা রক্ষার কাজে ফরিদপুর হয়ে বরিশালে এসে এক বক্তৃতায় বলেন, ‘যা হবার তা হয়ে গেছে। ভারত বিভাগ মেনে নিয়ে যে যেখানেই আছে, তাকে সেই দেশকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে হবে। দু’দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদের তাদের দেশের সরকার ও সমাজকে মেনে নিতে হবে। যার যা ধর্ম তা সে পালন করবে। ধর্ম সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার। ধর্মের কারণে রেষারেষি ও মানব নিধন ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের জন্যই ক্ষতিকর।’ (মাহমুদ নূরুল হুদাÑহোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী,কাছ থেকে দেখা,পৃৃঃ১০৮)।
উগ্র হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামা প্রসাদ মুখার্জীর বঙ্গভাগের পক্ষে প্রচারণার বিপক্ষে শহীদ সোহরাওয়ার্দী বলেছিলেন, ‘বাংলা যদি অবিভক্ত থাকে তাহা হইলে ইহা ভবিষ্যতে কতখানি উন্নত হইতে পারিবে, সে কথা আমাদের একবার াভাবিয়া দেখা উচিত। ইহা এক বিশাল দেশে পরিণত হইবে এবং ভারতের মধ্যে ইহাই হইবে সর্বাপেক্ষা সমৃদ্ধিশালী দেশ। প্রাচুর্যভরা ভবিষ্যতের বঙ্গদেশের অধিবাসীরা উন্নতধরনের জীবন যাপন করিতে সক্ষম হইবে এবং উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করিতে পারিবে। কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য সম্পর্কে ইহা সমৃদ্ধিশালী হইয়া উঠিবে এবং কালে জগতের অন্যতম শক্তিশালী ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত হইবে।’ (হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, কাছ থেকে দেখা, পৃঃ ৫৩)।
সোহরাওয়ার্দীর এই স্বপ্ন মিথ্যা ছিলো না। বাংলাকে অবিভক্ত রাখার পক্ষে তিন জন বিখ্যাত বাঙালির চেষ্টা ইতিহাস হয়ে আছে, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শরৎচন্দ্র বসু ও আবুল হাশিম।
১৯৫৪ সালে পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট গঠনে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা ছিলো অনন্য সাধারণ। এটা প্রমাণিত সত্য যে, শেরে বাংলা এবং মওলানা ভাসানীর চেয়ে সোহরাওয়ার্দীর সাংগঠনিক প্রতিভা অনেক বেশি ছিলো। তিনি নিয়মের পূজারি ছিলেন। পাকিস্তানে বিরোধী দল গঠন করার কৃতিত্ব শহীদ সোহরাওয়ার্দীর। ১৯৫৪ সালের মধ্যে তিনি আওয়ামীলীগকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। যুক্তফ্রন্টের শরীক দলের মধ্যে আওয়ামীলীগই বড় দল ছিলো। যুক্তফ্রন্ট গঠনের ক্ষেত্রে এবং নির্বাচনে বিজয় লাভের ক্ষেত্রে সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা ছিলো মুখ্য। দৈনিক ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর অবদান ছিলো। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দীর সাক্ষাৎ শিষ্য ছিলেন। বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে দৈনিক ইত্তেফাকের ভূমিকা অত্যন্ত উজ্জ্বল।
বলতে গেলে ঘটনাচক্রে মাত্র ২১ জন সংসদ নিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৫৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের প্র্র্র্র্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। এর ফলে তিনি পার্লামেন্টে যুক্তনির্বাচন প্রথার বিল পাস করাতে সক্ষম হন।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় ভারত তো শত্রু ছিলোই চীন-রাশিয়াও পাকিস্তানের প্রতি শত্রু ভাবাপন্ন ছিলো। প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেন। তাঁর মন্ত্রী সভার সদস্য আবুল মনসুর আহমদ ভারত সফর করেন, সঙ্গে ছিলেন বঙ্গবন্ধু।
‘ক্ষমতা গ্রহণের র্পপরই বিশ্বের অন্যতম মহাশক্তি চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৫৬ সালের ২২ অক্টোবর সরকারি সফরে চীন গমন করেন। ফলে পাকিস্তান ও  চীনের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ-এন- লাই ১৯৫৬ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তান সফরে আসেন। সোহরাওয়ার্দী চীনের নেতাকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, চীন ও পাকিস্তান আলাদা রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকলেও তারা পরস্পর সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির সাথে বাস করতে পারে। পাকিস্তান চীনে একটি উচ্চ পর্যায়ের বাণিজ্যপ্রতিনিধি দল পাঠায়। চীনও তাদের বাণিজ্য প্রতিনিধি দল পাঠায়। ফলে দুদেশের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।’ (হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, কাছ থেকে দেখা, পৃঃ ৭৯)।
‘১৯৫৭ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকায় অনুষ্ঠিত পরিষদ অধিবেশনে সোহরাওয়ার্দী যুক্ত নির্বাচনের পক্ষে যে বক্তৃতা করেন, এর পক্ষে পরিষদের সমর্থন আদায় করেন তা ছিলো ঐতিহাসিক। (আবুল কাসেম ফজলুল হকাÑমুক্তিসংগ্রামক)।
পাকিস্তানে স্বৈরাচারী আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের গোড়াপত্তন করেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে যে নয় নেতা যুক্ত বিবৃতি দিয়ে আইয়ুবের পতনের বীজ রোপন করেছিলেন তাকে সমর্থন করেছিলেন সোহরাওয়ার্দী। তিনি এনডিএফ গঠন করেছিলেন পূর্ববাংলাকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে, আইয়ুবের পতন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। তাঁকে কারারুদ্ধ করার পর পূর্ব বাংলায় গণঅভ্যুত্থান ঘটেছিলো। আইয়ুবের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনাকালে অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলে তিনি ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর বৈরুতে মৃতুবরণ করেন।

-মাহমুদুল বাসার
কলাম লেখক ও গবেষক


মানবিক মূল্যবোধ বিনষ্ট হলে মানুষ পশু সমতুল্য হয়ে পড়ে
                                  

আবু মহি মুসা


‘প্রেমিকের সঙ্গে মা গো। তালাবদ্ধ শিশুর মৃত্যু।’ সম্প্রতিকালে প্রকাশিত বাংলাদেশের  একটি দৈনিক  পত্রিকার শিরোনাম। প্রতিবেদনের বলা হয়, ভলাদিসলাভা পোডচাকো নামের ২০ বছর বয়সী মা তার দুই সন্তানকে ফ্লাটে তালাবদ্ধ রেখে চলে গেছে প্রেমিকের সঙ্গে। এদিকে টানা কয়েকদিন না খেয়ে মারা যায় অ্যানাকে কিয়েভে ২৩ মাস বয়সী তার ছোট্ট শিশুটি। প্রেমিকের সঙ্গে অভিসারে গিয়ে নিজের দুই শিশুসন্তানকে টানা ৯দিন ফ্লাটে তালাবন্দি করে রেখে যায় এই মা। কিন্তু ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় ড্যনিল। এ ঘটনাটা ঘটেছে ইউক্রেনে। ইউক্রেনের দিকে আমাদের  তাকানোর কোনো প্রয়োজন নেই। এমন ঘটনা বাংলাদেশে অহরহ ঘটছে। কয়েক বছর আগে একটি দৈনিক পত্রিকার শিরোনাম ছিল, ‘ডাষ্টবিনে ঠাঁই হলো জন্মদাতা পিতার।’ এই হতভাগ্য পিতার নাম গিয়াসউদ্দিন। তার দুই ছেলে। বয়সের ভারে ন্যুজ্ব হয়ে পড়ায় তিনি পরিবারের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়ান। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে না নিয়ে তার বড় ছেলে শাহজাহান ঢাকা মহানগরের জুরাইন খাদ্য অধিদপ্তরের সামনে একটি ডাস্টবিনের ময়লার ওপর তাকে রেখে চলে যায়। অর্থ সম্পদশালী সন্তানরা তাদের স্ত্রীর কথা মতো বাবাকে ঘর থেকে বের করে দেয়, যখন সরকারী কর্মকর্ত পিতা ছেলেদের নামে বাড়ি লিখে দেয়। পিতা একটি মসজিদে আশ্রয় নেয়। হাসপাতালেরর একজন স্বত্তাধীকারী তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় চিকিৎসার জন্য। কিন্তু সেখানে চিকিৎসারত অবস্থায় পিতা মারা যায়ন। বড় ছেলেকে ফোনের জানালে সে উত্তর দেয়, আমি একটা মিটিংয়ে ব্যস্ত আমি। লাশটা আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের কাছে দিয়ে দেন। শুধু পিতার ক্ষেত্রেই নয়।  আমার এক বড় লোক আত্মীয়ের কথা জানি, তারা  এক বোন, এক ভাই। বোন ডাক্তার, বোনো স্বামীও ডাক্তার।  ভাই ইঞ্জিনিয়ার। বাবার গাড়ী, বাড়ী আত্মস্মাৎ করা লোভে  বোন তার ছোট ভাইকে পাগল বানানোর ইনজেক দিয়ে প্রায় অর্ধ  পাগল বানিয়ে ফেলেছে। সে এখন অসুস্থ। এমন ঘটনা সমাজে অহরহ ঘটছে।  পুত্র  পিতাকে, পিতা পুত্রকে, ভাই ভাইকে,  স্বামী স্ত্রীকে, স্ত্রী স্বামীকে  হত্যা করছে। এমন ঘটনার কথা আমাদের ছোট বেলা শোনা যায়নি।  এখন কেন ঘটছে?  যে পিতা সন্তানকে কোলে পিঠে করে  মানুষ করেছেন, নিজে না খেয়ে সন্তানকে খেতে দিয়েছেন। রোদে, অনাবৃষ্টিতে  জমির ফসল  পুড়ে খাক হয়ে গেছে, ঘরে চাল নেই, তেল নেই, সন্তানদের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দেয়ার জন্য হন্য হয়ে ফিরছেন। সেই পিতা অসুস্থ হলে  অসুস্থ পিতার স্থান আজ যদি ডাস্টবিনে হয়, বৃদ্ধ পিতার স্থান যদি কোনো বৃদ্ধাশ্রমে হয়,  সেক্ষেত্রে জ্ঞানী মাত্রই আতংকিত  হওয়ার কথা। এরকম ঘটনা একট্ িবা দুটো নয়। শ্বেতী রোগের মত এমন ঘটনা  পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে ।  এ নিয়ে কি আমাদে উদ্বেগ উৎকন্ঠা আছে? মনোবিজ্ঞানীরা কি দিতে পেরেছেন  এর সঠিক উত্তর? এ বিষয়ে দর্শনের কি ব্যাখ্যা এটা আমরা জানতে চেষ্টা করেছি।     
    পৃথিবীতে মানুষের জীবনে সবচেয়ে  যে জিনিসটি  মূল্যবান সেটি হচ্ছে মানবিক মূল্যবোধ। এর সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা হচ্ছে, অপরের কল্যান কামনা এবং তা নিশ্চিত করা।  এই মানবিক মূল্যবোধ মানুষকে পশু থেকে পৃথক করেছে। নতুবা মানুষ এবং পশুর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। মানুষের মধ্যে যখন ভিটামিনের অভাব হয় মানুষ তখন পুষ্টিহীনতায়  ভোগে, অসুখ বিসুখে আক্রান্ত হয়। মান    বিক মূল্যবোধেরও তেমনি ভিটামিন আছে, আর সে ভিটামিন হচ্ছে জ্ঞান। জ্ঞান যখন লোপ পেতে থাকে তখন এই মানবিক মূল্যবোধ অবক্ষয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। অর্থাৎ মানবিক মূল্যবোধ কমতে থাকে।   বর্তমান সময়ে মানুষের মানবিক মূল্যবোধ এই অবক্ষয়ের ক্যান্সার  আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। যেমন মাছে ফরমালিন দেয়া, ফলে স্প্রে দেয়া,  হোটেলে পোড়া মবিল দিয়ে মাছ ভাজি করে খাওয়ানো। এটাই হচ্ছে মানবিক মূল্যবোধ অবক্ষয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ। জ্ঞানীরা কখনো অনৈতিক কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারেন না। মানুষের মূল্যবোধ যখন অবক্ষয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় তখন প্রেমের উপাদানগুলো দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানবিক মূল্যবোধের পর মানুষের কাছে যে জিািনসটি  সবচেয়ে মূল্যবান ধরা হয়, তা হচ্ছে প্রেম ভালোবাসা।  প্রেম এবং ভালোবাসার মধ্যে বেশ কিছুটা  পার্থক্য আছে। ভালোবাসা শব্দটি ইউন্যুভার্সাল। সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায়। যেমন, আমি আমার মাকে ভালোবাসি, বোনকে ভালোবাসি, প্রেমিকাকে ভালোবাসি কিন্তু প্রেম শব্দটি সর্বক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায় না। যে কারণে অন্যান্য মনীষীরা প্রেমের সংজ্ঞা দিতে পারেননি। যাহোক, ভালোবাসার ৬টি ভাবগত উপাদান। যেমন, মানসিক আকর্ষণ, কল্যাণ কামনা, স্বার্থ (ভাবগত এবং বস্তুগত),  জ্ঞান, আবেগ, ইচ্ছা এবং প্রেমিকার ক্ষেত্রে একটি অতিরিক্ত উপাদান হচ্ছে দৈহিক কামনা। এর একটিকেও বাদ দেয়া হলে এটাকে  ভালোবাসা বা প্রেম বলা যাবে না।  প্রেমের মধ্যে জ্ঞানটা কেন আসছে? যেমন, প্রতিদিন ১০টি মেয়ে একই রাস্তা দিয়ে কলেজে যায়। এর মধ্যে একটি মেয়েকে আমার ভালো লাগছে, যে মেয়েটি দেখতে কুৎসিত। কিন্তু এই মেয়েটির এমন একটি গুন আছে যা হাজারটির মধ্যে নেই। এখানে জ্ঞান এনালাইসিস করবে, মেয়ের রূপ সৌন্দর্য ভালো লাগবে, না তার গুন ভালো লাগবে।  ভালোবাসার ক্ষেত্রে ৬টি, প্রেমের ক্ষেত্রে ৭টি এবং দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে ৬টির সাথে অরিক্ত ৩টি উপাদান থাকছে । অর্থাৎ দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে ৯টি উপাদান। সে তিনটি উপাদান হচ্ছে  সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং ত্যাগ। জ্ঞান, সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং ত্যাগ না থাকলে সে  দেশপ্রেমিক হতে পারে না। ‘ দেশপ্রেমিক’ বলে কেউ নিজেকে দাবি করলেই কিন্তু তাকে দেশপ্রেমিক বলা যাবে না। দেশপ্রেমের সংজ্ঞা বলবে সে দেশপ্রেমিক কিনা।
    যাহোক, বলা হয়েছে, মানবিক মূল্যবোধ যখন অবক্ষয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় তখন প্রেমের উপাদানগুলো  ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রেমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বা উপাদান হচ্ছে আবেগ। আবেগ বেগ সৃষ্টি করে।  আবেগ কাঁদাতে পারে, হাসাতে পারে।   মধ্য রাতে প্রেমিকের  ঘুম ভঙ্গিয়ে দিতে পারে প্রেমিকার সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য। এই আবেগের জন্য প্রবাসী সন্তানের জন্য মা ব্যাকুল হয়ে থাকেন। আবেগ ট্রেনের ইঞ্জিনের মত। ট্রেনের ইঞ্জিন যেমন সামনে যেতে পারে, ঠিক একই গতিতে পিছনে যেতে পারে।  আবেগ উপকারে যেমন উদ্বুদ্ধ করতে পারে, ঠিক তেমনি আবেগ  ক্ষতিও করতে পারে। জ্ঞান কমে গেলে আবেগ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে।  জ্ঞানের অভাবে আবেগ যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় তখন একের প্রতি অপরের কল্যাণ কামনা থাকে না। তখনই  স্বামী স্ত্রীকে, স্ত্রীর স্বামীকে, পিতা পুত্রকে, পুত্র পিতাকে, ভাই ভাইকে কুল ব্রেইনে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য কালে  হত্যা করতে পারে। এরপর সে মোটেই অনুতপ্ত হবে না। বাস্তবে কি আমরা এর ব্যতিক্রম কিছু দেখছি?
যাহোক,  প্রেম মানুষের জীবনে কতটা মূল্যবান তার ব্যাখ্যা এখানে। প্রেম  হচ্ছে সুপার গ্লুর মত। সিমেন্ট যেমন দালানের ইটগুলো আকড়ে ধরে থাকে, ঠিক তেমনি  প্রেম ভালোবাসা  সুপার গ্লুর মতই পরিবারকে আকড়ে ধরে রাখে। শুধু পরিবারেই নয়, মানুষে মানুষে ভ্রাতিৃতে¦র বন্ধন  এই ভালোবাসার কারণে। মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে  এই প্রেমের  সুপার গ্লুর  কর্যক্ষমতা    যখন  হ্রাস পাবে তখন কারো প্রতি কারো ভালোবাসা থাকবে না। এবং শেষ পর্যন্ত পরিবার প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যাবে কোনো একদিন। এ ধরনের প্রক্রিয়া শুরু হবে বৈজ্ঞানিক বিপর্যয়ের  আগেই।  
এটা পারিবারিক, সমাজিক, রাষ্ট্রীয়, সর্বক্ষেত্রে ভালোবাসার সুপার গ্লুর কার্যক্ষমতা হ্রাসের ঘটনা ঘটবে। তার জলন্ত প্রমাণ রয়েছে আমাদের রাজনীতির ক্ষেত্রে। তত্ত্ববধায়ক সরকারের অধিনে নির্বাচন ইস্যুতে আনন্দোলনের সময়ে যে ঘটনা ঘটেছে, তাতে প্রায় শতাধিক লোক মারা গেছে। আর্থিকভাবে ক্ষতি হয়েছে প্রায় লক্ষ হাজার কোটি টাকার। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বুশ যদি জ্ঞানী হত, মিথ্যা অজুহাতে আবগানিস্তানে, ইরাকে, লিবিয়াতে হামলা চালাতে পারতো না। ঠিক তেমনি আমাদের দেশের অতীত এবং বর্তমান সরকার প্রধানরা যদি জ্ঞানী হতেন, তবে কোনো অবস্থায় হত্যা, জ্বালাও পোড়াও, আহত নিহত হওয়া ঘটনা ঘটাতে পারতেন  না। যে সন্তান পিতাকে হাসপাতালের পরিবর্তে  ডাস্টবিনে ফেলে গেছে, যে সন্তান সম্পদের কারণে পিতাকে হত্যা করছে, এ জন্য  কাকে দায়ী করবো? সিডরের মত ঝড় যখন একটি জনপদ তছনছ করে তখন আমরা কাকে দায়ী করি? সামাজিক, রাজনৈতি ক্ষেত্রে কাউকে না কউকে  দায়ী করতেই হবে। আর তার জন্য একমাত্র দায়ী আমাদের জ্ঞানের অভাব। সেই অভাব পূরণ না করতে পারার ব্যর্থতা একমাত্র রাজনীতিবিদদের। বিষয়টি নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। সামনে খুবই ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। এর পরিত্রানের জন্য কি করা উচিত এ নিয়ে এখনই জরুরী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের যেমন ভূমিকার রয়েছে, তেমনি ভূমিকা রয়েছে মিডিয়ার। এ সব বিষয়গুলো ব্যাপকভাবে প্রচার করা প্রয়োজন। জ্ঞান চর্চার বিষয় নিয়ে একটা বিপ্লব ঘটাতে হবে। যেমন বৃক্ষ রোপনের ব্যাপারে একট বিপ্লব ঘটানো হয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে এখনি যদি পদক্ষেপ নেয়া না হয়, ভবিষ্যতে আর সময় থাকবে না।  
 লেখক ঃ দর্শনিক।

ফিরে ফিরে আসে ১৫ আগস্ট : কিন্তুু যা শেখার ছিল তা শেখা হলো না
                                  

শামছুজ্জামান সেলিম


আজ ১৯৭৫ সালের সেই নিষ্ঠুরতম হত্যাকা-ের দিন ১৫ আগস্ট। এ দিনটি বাঙালি জাতির জন্য ‘টার্নিং পয়েন্ট’। সাগরসম অশ্রু, সীমাহীন ত্যাগ, ৩০ লাখ শহীদের রক্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত সফল মুক্তিযুদ্ধ বিশ্বাস ঘাতকদের পেছন থেকে আক্রমণে পরাজিত হয় এই দিনে।
৪০ বছর পূর্বে ঘটে যাওয়া এ ‘ট্র্যাজেডি’ নিয়ে কোন বোঁধগম্য আলোচনার সূত্রপাত আজও হলো না, দুঃখটা এখানেই বড় করে বাজে। অথচ ‘১৫ আগস্টে’র দগদগে ঘায়ের অভিঘাত আজও আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে প্রতিদিন পীড়া দেয়-বিড়ম্বনার মুখোমুখি করে। মুক্তিযুদ্ধের টর্নেডোসম আঘাতে ল-ভ- পাকিস্তানপন্থিরা স্বাধীন বাংলাদেশের সাড়ে তিন বছরের মাথায় এসে কেমন করে মুক্তিযুদ্ধকে পেছন থেকে মরণ আঘাত হানল? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা নিচের আলোচনায় যেতে পারি।
আমরা তিন পর্বে বাংলাদেশকে দেখতে পারি। ১. মুক্তিযুদ্ধের প্রবাসী সরকার- যারা মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছেন, ২. ১৬ ডিসেম্বর ‘৭১ সাল থেকে ১০ জানুয়ারি ‘৭২ পর্যন্তথ যখন স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু এবং ৩. ১০ জানুয়ারি ‘৭২ সাল থেকে ‘৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্তথ যখন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্র সাংবিধানিক উপায়ে পরিচালিত হচ্ছিল। প-িতজনেরা হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, বর্তমান বাংলাদেশ কী তাহলে অবয়ব শূন্য কোন বস্তু? বর্তমান বাংলাদেশ অবশ্যই অবয়বশূন্য নয়। কিন্তুু সেই ‘অবয়বের’ হালদশা যে কী সে আলোচনার প্রবেশদ্বারটা উন্মুক্ত করার প্রয়াস থেকেই এ অবতারণা।
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন প্রবাসী সরকারের সময়ের ঘটনাবলি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে অনেক মূল্যবান দলিল প্রকাশিত হয়েছে- এখন যা সহজলভ্য। এসবই ওপরতলার ঘটনাবলি। এসব দলিলে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাবলির বিশ্লেষণ থাকলেও একটি প্রশ্নে সবাই একমত, যে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারীদের ভেতর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের চেষ্টা করা হয়েছিল। আর এ অপচেস্টার প্রধান হোতা ছিল সেই বহুল আলোচিত ‘মুজিব বাহিনী’ বা ‘বিএলএফ’ এবং মোশতাক গং।
এসব ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষীর মতো তো কোন কিছুই বলতে পারব না। কারণ আমরা ছিলাম প্রশিক্ষণে। ওপর তলার নয়, তবে তৃণমূলের কিছু ঘটনাবলির কথা নির্ধিদ্বায় বলতে পারি। ট্রেনিংয়ের দীর্ঘ ঝক্কিঝামেলা শেষ করে যেদিন আমাদের বাহিনী নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে যাচ্ছি সেদিন সকালে বহরমপুর বাসস্ট্যান্ডে এক ছাত্রলীগ নেতার সঙ্গে ঘটনাক্রমে দেখা হয়ে গেল। তিনি নিজেও মুক্তিযোদ্ধা। খুব উৎফুল হয়ে বললেন, ‘দোস্ত তোমরা এসে গেছ! এদিকে... ভাই আগরতলা থেকে টেলিগ্রাম পাঠাঁইছে তোমরা বাংলাদেশে ঢুকতে যাচ্ছ। আমরা যেন তোমাদের মেরে দিয়ে প্রচার করি রাজাকারদের এ্যামবুশে তোমরা মারা পড়েছ! আমরা, এফএফরা মুজিববাহিনীকে বলে দিয়েছি, আমরা একাজ কখনই করব না। আর তোমরাও করতে চেষ্টা কর না। করলে তোমাদের পরিণতিও ভালো হবে না।’ এ সংবাদটি শুনলাম মহাবিস্ময় নিয়ে এবং প্রথম শুনলাম, যে মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযোদ্ধাদের খুন করবে? বাস্তব কারণেই ‘টেলিগ্রাম পাঠানো ভাইয়ের’ নাম উল্লেখ করলাম না। তিনি এখনো জীবিত এবং একটি রাজনৈতিক দলের নেতা।
সাম্প্রতিক সময়ের আরেকটি ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। অসুস্থতার খবর শুনে এফএফের একজন প্লাটুন কমান্ডার আমাকে দেখতে এসেছিলেন হাসপাতালে। প্রাথমিক খোঁজখবর নেয়ার পর চলে এল মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ঘটনাবলির নানা স্মৃতিকথা। এই কমান্ডার একজন দুর্ধষ মুক্তিযোদ্ধা। নিজের জীবনকে হাতের মুঠোয় রেখে যে কোন ঝুঁকি নিতে পিছপা হতেন না তিনি। তিনি যখন একটি ঘটনার বিবরণ দিচ্ছিলেন তখন আরেকবার বিস্ময় নিয়ে শুনলাম। তিনি বলে গেলেন কোন বিরতি না দিয়েই।
কমান্ডার বলছিলেন, একদিন এফএফদের কোম্পানি কমান্ডার, প্লাটুন কমান্ডার এবং তাদের টুআইসিদের নিয়ে মিটিং ডাকলেন দুই মুজিববাহিনী কমান্ডার। এদের একজন জেলা সদর থেকে এসেছিলেন, আরেকজন স্থানীয়। উদ্দেশ্য, মুক্তিযুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা এবং করণীয় নির্ধারণ করা। পরিস্থিতি ব্যাখ্যায় তারা বলেছিলেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং বঙ্গবন্ধু জীবিত ফিরতে নাও পারেন। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে কমিউনিস্ট এবং বামপন্থিরা নেতৃত্বে চলে আসতে পারে এবং তাজউদ্দীন সরকার স্থায়ী হয়ে যাবে। তাজউদ্দীন ভারত-রাশিয়ার দালাল। এ অবস্থা হলে আমাদের তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। এরপরই তারা বলেছিলেন, কমিউনিস্ট গেরিলারা অল্পদিনের মধ্যেই আমাদের এলাকায় ঢুকবে। আগরতলা থেকে খবর পাঠিয়েছে... ভাই। ওরা ঢুকলে এ্যামবুশ দিয়ে মেরে ফেলতে হবে এবং প্রচার করতে হবে রাজাকাররা মেরেছে। এবার সভায় হট্টোগোল শুরু হয়ে যায়। উপস্থিত এফএফ কমান্ডাররা ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, এ নির্দেশ মানা হবে না। ‘মুক্তিরা’ ‘মুক্তিদের’ খুন করতে পারে না। আর তাজউদ্দীন সরকারের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ করতে যাব কেন? উনি তো আমাদের প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী। এ হট্টোগোলের মধ্যে জেলা সদরের মুজিববাহিনী কমান্ডার সভাস্থল ত্যাগ করেন এবং স্থানীয় কমান্ডার নিশ্চুপ হয়ে যান।
হাসপাতাল ত্যাগ করার আগে তিনি আমাকে আর একটি তথ্য জানিয়ে গেলেন। তারা যখন সদ্য ট্রেনিং শেষ করে ফিরেছেন তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জাঁদরেল ছাত্রলীগ নেতা (এখন বিএনপি করেন) তাদের নিয়ে সভা করেন। ওই সভায় সেদিন বর্তমান আওয়ামী লীগের একজন বিখ্যাত নেতাও উপস্থিত ছিলেন। ওই ছাত্রলীগ নেতা প্রথমেই জানতে চাইলেন, ‘আপনারা কি মুজিব ভাই জীবিত ফিরে আসুক তাই চান? সবাই একবাক্যে বললেন, হ্যাঁ, চাই। তখন তিনি আসল কথাটি পাড়লেন। মুজিবভাইকে জীবিত ফেরত চাইলে মুশতাক ভাইয়ের প্রস্তাব সমর্থন করতে হবে। পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন না করলে মুজিব ভাইকে জীবিত পাওয়া যাবে না। উপস্থিত ‘মুক্তিরা’ না না ধ্বনি তুলে বলেন, আমরা স্বাধীনতা ছাড়া অন্যকিছু বুঝি না। ‘স্বাধীনতা চাই’। অবস্থাবেগতিক দেখে ওই নেতারা তাড়াতাড়ি কেটে পড়েন (ওরা মুজিববাহিনীর নেতা ছিলেন)।
মক্তিযুদ্ধের প্রবাসী সরকারের সময়ের বা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের ইতিহাসের অন্ধকার দিকগুলোর সবটুকু আজও উন্মোচিত হয়নি। বাঙালি জাতির ট্র্যাজেডি এখানেই।
আমি তৃণমূলের প্রত্যক্ষ ঘটনার বিবরণ দিয়ে নিবন্ধটা শুরু করেছি। আরেকটি ঘটনার উল্লেখ না করলে বিবেকের কাছে সৎ থাকতে পারব না। ঘটনার উৎস শহীদ কর্নেল রশিদথ যিনি জিয়া হত্যার তথাকথিত অভিযোগে ফাঁসিতে মৃত্যুবরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মেজর ছিলেন। তার সঙ্গে একসঙ্গে আমরা বাংলাদেশে প্রবেশ করি।
অস্ত্র জমা দেয়া শেষ করে আমাদের বাহিনীর সর্বশেষ ভাতা নেয়ার জন্য পাবনা সার্কিট হাউজে তার সঙ্গে দেখা করতে যাই। সার্কিট হাউজের বারান্দায় এমপি বগা ভাইয়ের সঙ্গে বসেছিলেন তিনি। ভাতা বুঝে নেয়ার পর আমি একটি দরখাস্ত তার সম্মুখে রাখলাম। দরখাস্তে ছিল অস্ত্র জমা দিয়েছি, এখন চাকরিতে যোগ দেয়ার অনুমোদন দরকার। আমার দরখাস্তটি পড়ার পর জানতে চাইলেন, কোথায় এবং কি চাকরি করি। বললাম, পাকশি পেপার মিলে শ্রমিকের চাকরি করি। এবার কত বেতন পাই তাও জানতে চাইলেন! বলতে হলো একশ আশি টাকা পাই। ড্রয়ার টেনে এক তা সাদা কাগজ বের করে আমাকে তার নিচে স্বাক্ষর করতে বললেন। কিছুটা বিব্রত হয়ে জানতে চাইলাম, কেন স্বাক্ষর করব! বলেছিলেন, আর্মিতে সে. লেফেটন্যান্টের চাকরি পাবেন। বেতন পাবেন আটশ টাকা। তারপরও রেশন আছে। এবার আমার পালা। উত্তরে বলেছিলাম, রশিদ ভাই, আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী। কমিউনিস্ট পার্টি করি, ইউনিয়ের নেতা। আমাকে কারখানায় ফিরতেই হবে। এবার মেজর রশিদ তার চেয়ারে সোজা হয়ে বসে খানিকটা উত্তেজিত স্বরে বললেন, ‘আপনারা, রাজনীতিবিদরা একাই দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারবেন? মুক্তিযুদ্ধে পরীক্ষিত দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ছাড়া স্বাধীনতা রক্ষা পাবে না, একথা মনে রাখবেন। আপনাদের মতো মুক্তিযোদ্ধারা সামরিক বাহিনীতে না আসলে স্বাধীন দেশের সামরিক বাহিনী প্রাণ পাবে কি করে? পশ্চিমের দিকে আঙ্গুল হেলিয়ে একটু ইঙ্গিত করে বললেন, অল্পদিনের মধ্যে ওরা ফিরবে হাজারে হাজার। হয়তো তখন বুঝতে পারবেন আমার কথা!’ শহীদ কর্নেল রশিদ কি সেদিন ভুল বলেছিলেন? নিজের জীবন দিয়ে তার কথার সত্যতা প্রমাণ করে গেছেন তিনি।
বঙ্গবন্ধু সরকার কি প্রবাসী সরকারের অভিজ্ঞতা এবং শহীদ কর্নেল রশিদের মতো দেশপ্রেমিক সামরিক কর্মকর্তাদের মতামতকে মূল্য দিয়েছিলেন? ঠিক তার উল্টো, তাজউদ্দীনকে বরখাস্ত করে বিশ্বাসঘাতক মোশতাককে রেখে দিলেন তার মন্ত্রিসভায় বঙ্গবন্ধু! এক দিনের জন্যও তাজউদ্দীনের কাছে শুনতে চাননি প্রবাসী সরকারের কার্যক্রম। আর আওয়ামী লীগ? নতুন করে বাঙালি জাতিকে পুনর্গঠনের কর্তব্যকে অনুধাবন করতে সক্ষম ছিল? যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে সক্ষম ছিল আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু সরকার? তৃণমূল থেকে ওপর তলা পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ব্যস্তছিল লুটপাটে। আওয়ামী লীগের এবং বঙ্গবন্ধু সরকারের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাবিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে হয়েছে ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টি। বিরোধীদলের ভূমিকায় নেমে জাসদ পালন করেছে ধ্বংসাÍক ভূমিকাথ যা কিনা সাহায্য করেছে ১৫ আগস্ট পন্থীদের। কর্নেল তাহের জিয়াকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে সমগ্র বাঙালি জাতিকে বন্দী করে ফেললেন। আমরা বন্দী হয়ে গেলাম পাকিস্তানপন্থিদের দ্বিজাতিতত্ত্বের কাছে দ্বিতীয় বারের জন্য।
প্রবাসী সরকারের সময়ে ১৫ আগস্টের ট্র্যাজিডির বিষবৃক্ষের বীজ রোপণ করা হয়েছিল। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার, শাসকদল আওয়ামী লীগ, মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশ নেয়া বিরোধীদল কেউই সেদিনের আসন্ন বিপদ সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন না। যার পরিণতি জাতি এখনো ভোগ করেই চলেছে। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজিডি, ১৫ আগস্ট থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারক শক্তি আজ পর্যন্তও কোন শিক্ষাগ্রহণ করল না। বিকলাঙ্গ বাংলাদেশকে ঘাড়ে বহন করে চলেছি, আমরা বাঙালিরা!
(সংকলিত)

ক্ষুদ্রঋণ সহায়তার নামে সুদখোরদের অত্যাচার কবে বন্ধ হবে
                                  

‘বেসরকারি সাহায্য সংস্থা’ এত বড় শব্দটির বদলে ‘এনজিও’। এই ছোট্ট, সংক্ষিপ্ত শব্দটিই বরাবর ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সহজ উচ্চারণের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক টান। যেমনÑএকই রকম আরেকটি উদাহরণ ‘বিএনপি’। এসব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা এককালের রাজভাষা ইংরেজির কাছে পরাজিত। আজকে আলোচনার বিষয় ভাষাগত বৈষম্যের বিচারব্যাখ্যা নয়, তবু এনজিও শব্দটির এমনই মাহাত্ম্য যে হঠাৎ করেই শব্দটি নিয়ে কিছু কথা আপেস-আপ এসে গেল।

এনজিও মাহাত্ম্যের কথা বলছি এ কারণে যে এ ব্যবস্থাটি দীর্ঘ সময় থেকে বাংলাদেশের সর্বত্র বিশাল বেড়াজাল বিস্তার করে রেখেছে। এর প্রভাব সমাজজীবনে, শাসনব্যবস্থায় এত গভীর যে বিষয়টির রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে একসময় অনেক লেখালেখি হয়েছে, সমালোচনাও কম ছিল না। কারণ আর কিছুই নয়, যতটা এর ইতিবাচক ভূমিকা, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কারো কারো মতে, সমাজে এর নেতিবাচক প্রভাব অনেক বেশি।

গ্রামের দরিদ্র পরিবারে, বিশেষ করে গরিব বিধবাদের সাহায্যের জন্য (সাহায্য শব্দটি সঠিক নয়, ছোটখাটো ঋণ দেওয়াই এদের মূল প্রকল্প) ক্ষুদ্রঋণ সহায়তার যে তত্ত্বটি সা¤্রাজ্যবাদী পরাশক্তিগুলো তৈরি করে, তারই মাছধরা বেড়াজাল বাংলাদেশে রাষ্ট্রযন্ত্রের আনুকূল্যে বিরাট সা¤্রাজ্য তৈরি করে ফেলেছে। এ বেড়াজাল যতটা গ্রামীণ দুস্থদের ঋণ সহায়তা দেওয়ার, তার চেয়ে অনেক বেশি সুদে-আসলে লাভের অঙ্ক বাড়িয়ে তোলার।
কেন যে এ ব্যবস্থাকে দেশের অর্থনীতিবিদ বা সমাজবিজ্ঞানীরা ‘সহায়তা’ নামে চিহ্নিত করেন, পূর্বাপর পরিণাম বিবেচনায় তা ধোপে টেকে না। কারণ কিছু ব্যতিক্রম বাদে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতাদের জন্য এ সহায়তা তাদের গলায় অর্থের ফাঁস হয়ে দেখা দেয়। কখনো সুদের টাকা, কখনো মূল ঋণের টাকা পরিশোধ সম্ভব হয়ে ওঠে না। তখন ঘরবাড়ি বা কিছু অস্থাবর সম্পদ বেহাত।

এ ঋণজাল কুখ্যাত মহাজনী ব্যবসার চেয়ে কম কুটিল, কম জটিল নয়। নয় কম সর্বনাশা। অবশ্য এ ঋণ প্রকল্প তাদেরই পরিভাষায় ‘সামাজিক ব্যবসা’ নামে পরিচিত লাভ করেছে। তারা হয়তো ভেবে দেখেনি যে দুই শব্দের কথাটি তাদের শোষণ চরিত্রেরই প্রকাশ ঘটিয়েছে। সবাই জানি ব্যবসা মানেই মুনাফা। সে মুনাফা ক্বচিৎ সহজ, সরল, সাদামাটা; অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যাপক লাভের কারবার।

লাভের কারবার বা মুনাফাবাজি যদি না-ই হবে, তাহলে কি এত মাছশিকারি এতে জড়িয়ে পড়ে? সংগত কারণে দিনে দিনে এর সংখ্যা বৃদ্ধি। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের আর্থিক সমৃদ্ধি বিত্তবৈভব তৈরি, জ্যামিতিক হারে সেসবের বৃদ্ধিই উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে তোলে। বাংলাদেশে এদের অবিশ্বাস্য সংখ্যা এই সামাজিক ব্যবসার মহিমা প্রকাশ করে চলেছে। একের উদাহরণ দেখে অন্য ভাগ্যান্বেষী সেখানে নাম লেখায়। সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিহাস, একদা সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট নেতা বা কর্মী এই লাভের কারবারে নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে দ্বিধা করেনি। মুনাফা, বিত্ত বলে কথা। আদর্শ সেখানে চুলোয় যাক।

একসময়কার সমাজতন্ত্রী রাজনীতিকদের কাউকে কাউকে এনজিও ব্যবসার তীব্র সমালোচনা করতে শুনেছি, তাদের এ বিষয়ে লিখতেও দেখেছি। কারণ তাদের রাজনৈতিক বিচার-বিশ্লেষণের মর্মার্থ ছিল, এসব সামান্য ঋণ সহায়তা বিত্তহীনদের শ্রেণিচেতনা, শ্রেণিসংগ্রামের ইচ্ছে নষ্ট করে দিচ্ছে। ফলে সমাজে শ্রেণিসংগ্রামের সম্ভাবনা পিছিয়ে পড়ছে। এসব অভিযোগ একেবারে ভুল ছিল না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সংগ্রামী চেতনার নির্বাসন তেমন ইঙ্গিতই দেয়। এখন অবশ্য ওই গোত্রের রাজনীতিকদের এ সম্পর্কে বড় একটা সমালোচনায় মুখর হতে দেখা যায় না।

দুই.
এনজিওদের ঋণদান, সুদ আদায়ের নির্মমতা, সুদের উচ্চহার এবং এর জটিলতা নিয়ে একসময় অনেক অভিযোগ উঠেছিল। সংবাদপত্রে সেসব ঘটনা প্রকাশও পেয়েছিল। অসহায় কিছু ঋণগ্রহীতা নারী-পুরুষের সুদ বা ঋণ শোধে অক্ষমতার কারণে আত্মহত্যার ঘটনাও সংবাদপত্রে ছাপা হয়। সেসব এখন বিকৃত ঘটনা, যদিও সে সময় অনেক সমালোচিত। এনজিওর প্রতাপ ও ক্ষমতা তাতে কমেনি। ঋণ গ্রহণের হারও কমেনি। এমনই দুস্থ অবস্থা গ্রামের প্রান্তিকসীমার মানুষের। বেলতলায় তাদের বারবারই যেতে হয় জীবনযাত্রার তাড়নায়।

একালের এনজিওদের ব্যাপক তৎপরতা, উচ্চ সুদের হার এবং সুদ বা ঋণ আদায়ের নির্মমতাÑএই তিন বিষয় নিয়ে লিখতে গিয়ে আজ বাইশে শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ দিবসে কবি ও কর্মীর কৃষি ব্যাংক স্থাপন এবং সহজ-সরল সুদে ঋণদান ও অনাদায়ের ইতিহাস তুলনায় এসে গেল। বিষয়টি খুবই প্রাসঙ্গিক। সেই কবে জমিদারি দেখাশোনা উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ-পতিসরে এসে প্রজাদের দুঃখ-দুর্দশা দেখে তাদের মহাজনদের কবল থেকে রক্ষা করতে ১৯০৫ সালে পতিসরে ‘কালিগ্রাম কৃষি ব্যাংক’ স্থাপন করেছিলেন।

ব্যাংক ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে দ্রুতই। কারণ সুদের হার ছিল মাত্র ১২ শতাংশ। সুদ আদায়ে কোনো জবরদস্তি ছিল না। আর ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো কিছু বন্ধক রাখতে হতো না। শেষোক্ত সুবিধাটির জন্য একালে পশ্চিমা দেশে গ্রামীণ ব্যাংকের এত প্রশংসা। অন্যান্যের ক্ষেত্রেও তাই। কিন্তু এদের ক্ষেত্রে সুদের হার যেমন উচ্চ, সুদ আদায়ে কঠোরতা অমানবিক পর্যায়ের। সংবাদপত্রে প্রকাশিত বহু ঘটনায় তেমন প্রমাণ মেলে।

এত সব সত্ত্বেও আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্র উল্লিখিত পরিস্থিতি মেনে নিয়েছে। তাদের কোনো অভিযোগ নেই এসব ব্যাপারে। বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোও এ ক্ষেত্রে নীরব ভূমিকা পালন করে চলেছে। কিছুকাল আগে কোনো কোনো বাম দলের ‘এনজিও’-বৃত্তিতে বরং সংশ্লিষ্টতাও দেখা গেছে। পাঠক ভেবে দেখতে পারেন, এনজিও নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেন এত উদাসীনতা। কেন বাংলাদেশে এদের এত ব্যাপক তৎপরতা? সেটা কি সমাজবদলের রাজনীতিকে পেছনে হঠানোর জন্য? এবং তা দুস্থ মুখে কয়েক ফোঁটা উপকরণ তুলে দিয়ে?

তিন.
এত দিন পর আবার এনজিওর ‘সামাজিক ব্যবসা’ নিয়ে কিছু লেখার কারণ আর কিছু নয়, দুই কলামে এ ব্যাপারে প্রকাশিত ছোট্ট একটি লেখা : শিরোনাম ‘এনজিওর ঋণ আদায়ে নির্মমতা’। ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, এনজিওর ঋণগ্রহীতা, গাজীপুরের এক পরিবারের সদস্যরা সংশ্লিষ্ট এনজিওকর্মীদের হাতে নির্যাতনের শিকার। সংবাদপত্রের ভাষ্যে বলা হয়েছে : ‘কিস্তির টাকা না পেয়ে এনজিওকর্মীরা (ঋণগ্রহীতা) বাড়িতে গিয়ে বেধড়ক মারধর করেছে তাঁকে। তাঁর স্বামী ও ছেলেকেও পেটানো হয়েছে। ওই ঘটনায় থানায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করা হয়েছে’ (কালের কণ্ঠ, ২-৮-২০১৭০)।
এ সম্পর্কে বিশদ বিবরণে আরো জানা যাচ্ছে যে ‘বসতঘর মেরামতের জন্য ওই গ্রহীতা ২০১৬ সালে ৪৮ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। (ঋণ) পরিশোধের সাপ্তাহিক কিস্তি ধার্য করা হয় এক হাজার ২০০ টাকা। তিনি ১৯টি কিস্তি পরিশোধ করেছেন। গত ঈদুল ফিতরের কয়েক দিন আগে এনজিওটির মাঠকর্মী বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন। বিষয়টি তিনি (ঋণগ্রহীতা) শাখা ব্যবস্থাপককে জানিয়ে বিচার চান।

‘কিন্তু মাঠকর্মীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা স্থগিত রাখেন। এ পরিস্থিতিতে এনজিওকর্মীরা (ঋণগ্রহীতার) বাড়িতে হানা দেন। বসতঘর থেকে আসবাব নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। বাধা দিলে তাঁরা তাঁকে মারধর করেন, স্বামী ও ছেলেদের মারধর করেন। ’ এর নাম ক্ষুদ্রঋণ সহায়তা! বিত্তহীন মানুষের দারিদ্র্য মোচনের মহৎ কর্মে নিয়োজিত এনজিও তৎপরতা! যা নিয়ে পশ্চিমা দেশে নিয়ত ঢাকঢোল পেটানো হচ্ছে। এমনকি ক্ষুদ্রঋণ সহায়তাকে গরিবি হটানোর আদর্শ মডেল বিবেচনা করে সংস্থাবিশেষকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে বাংলাদেশের গর্ব।

শুধু গর্বেই শেষ নয়, এই মডেলকে পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদ তৃতীয় বিশ্বের সর্বত্র গ্রহণযোগ্যতা দেওয়ার জন্য প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ঘটনা তো উল্লিখিত এই একটি ক্ষেত্রে নয় বা একটি এনজিও সংগঠনের ক্ষেত্রে নয়। গত কয়েক বছরের সংবাদপত্রের পাতা উল্টে দেখলে এমন বহু ঘটনার নজির মিলবে, যে কথা এর আগে বলা হয়েছে।
সুদের কিস্তি দিতে না পারার কারণে গরিব গ্রামীণ বেওয়া বা কোনো গফুর মিয়ার টিনের ঘরের চাল খুলে নেওয়া কিংবা গোয়াল থেকে গরু বা ছাগল জবরদস্তি করে নিয়ে চলে যাওয়া এদের দস্তুর। এই যে অমানবিক এনজিও অনাচার, এর প্রমাণ মেলে সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে। একজন খুশী কবির হয়তো ব্যতিক্রম।
অবাক হওয়ার মতো ঘটনা ঋণ সহায়তার নামে অনাচারী এনজিও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লেখা কম দেখা যায়, ইদানীং প্রায় দেখা যায় না বলা চলে। তেমনি এজন্য গরিব ঋণগ্রহীতার পক্ষে রাষ্ট্রযন্ত্রকেও বড় একটা তৎপর দেখা যায় না। পায় না তারা আইনি সহায়তা।

উচ্চ আদালত প্রায়ই স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেন অশিষ্টের বিরুদ্ধে দুর্বলকে রক্ষা করতে বা সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে। তাঁরা এসব ঘটনায় অত্যাচারিতের পক্ষে এগিয়ে আসতে পারেন। অন্যায়ের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারেন। তাহলে অন্তত এনজিওদের বাড়াবাড়ি ও দরিদ্রপীড়ন কিছুটা কমতে পারে।

চার.
কিন্তু তাতে মূল সমস্যার সমাধান হবে না। এনজিও সহায়তার নামে বঞ্চিত ও শোষিত দুস্থ শ্রেণিকে সামান্য কিছু খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখার ভুল সামাজিক তৎপরতার অবসান ঘটবে না। শ্রমজীবীদের সামান্য কিছু খাইয়ে, ক্ষুধার আপাত নিবৃত্তি ঘটিয়ে ক্ষুধা সৃষ্টির অমানবিক ব্যবস্থা উচ্ছেদ বন্ধ রাখার যে পুঁজিবাদী সামাজিক কৌশল, এর বিরুদ্ধে দু-চার কথা কবি রবীন্দ্রনাথও একদা বলেছেন। প্রগতিবাদী লেখকরা তো বলেই থাকেন। কিন্তু তাতে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে না।

একসময় এ দেশে মহাজনী ব্যবস্থার ছিল প্রবল দাপট। সমাজে এরা শোষক অত্যাচারী শ্রেণি হিসেবে জমিদার-জোতদারদের পাশাপাশি এমনকি ধনী গৃহস্থবাড়ির মালিকদের কাউকে কাউকে দেখা যেত গোপনে সুদের ব্যবসা করতে, দরিদ্র গ্রামীণ সদস্য-সদস্যাদের রক্ত শোষণ করতে। সে ব্যবস্থা একালে অনেকটাই কমে গেছে কিন্তু সমাজ থেকে পুরোপুরি লোপ পায়নি।
সে মহাজনী অত্যাচার ও শোষণ ব্যবস্থারই আরেক রূপ বলা যায়, আধুনিক নাম এনজিও ব্যবস্থা। এদের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ নামকাওয়াস্তে। বিশ্বের সা¤্রাজ্যবাদী উৎস থেকে আসে এদের অর্থসাহায্য। আর গ্রামীণ ব্যাংককে তো এ দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ঋণ সহায়তা দিয়েছে সমাজের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি অর্থাৎ দারিদ্র্য মোচনের নামে।
এদের কোনো কোনো সংগঠনের কর্মকা-ে হয়তো ক্ষেত্র বিশেষে দুস্থ মানুষের বিশেষ করে সমাজের অসহায় দুস্থ নারীর আর্থিক সহায়তা হয়েছে, জীবনে পুনর্বাসনও ঘটেছে, সেসব বিরল ঘটনা। কিংবা এদের সংখ্যা কিছুটা লক্ষণীয় হলেও নীতিগত বিচারে, আর্থ-সামাজিক বিচারে সমাজের দারিদ্র্য বিমোচন বা অর্থনৈতিক দিক থেকে সমাজ বদলের পথ এনজিও ব্যবস্থা নয়। এ ক্ষেত্রে দরকার সমাজের আমূল পরিবর্তন। এবং তা উচ্চবর্গীয় থেকে নিম্নবর্গীয় পর্যন্ত।
তাই আমরা চাই ঘুমপাড়ানিয়া এনজিও ব্যবস্থার উচ্ছেদ। সেই সঙ্গে অনাচারী-অত্যাচারী এনজিওদের শাস্তি বিধান। সরকার কবে এদিক থেকে সচেতন হবে, ব্যবস্থা নেবে, সে অপেক্ষায় আছি।

লেখক: আহমদ রফিক- কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

খেলাপি ঋণের অভিশাপ মুক্ত হোক ব্যাংক খাত
                                  

উন্নয়নের জোয়ার চলছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। সমৃদ্ধির নানা সোপান অতিক্রম করে বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। নানা অর্জন বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে সম্মানজনক অবস্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু খেলাপি ঋণের অভিশাপ বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আমাদের ব্যাংকিং খাত শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারছে না খেলাপি ঋণের কারণে। রেজাউল করিম খোকন  খেলাপিদের কাছেই জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশের ব্যাংকিং খাত। শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপির কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের পাওনা ১ লাখ ১১ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা আটকে রয়েছে। কিছুদিন আগে জাতীয় সংসদে এই তালিকা প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তালিকার মধ্যে রয়েছেন দুই ব্যক্তি। বাকি সব প্রতিষ্ঠান। বিশ্লেষকদের অভিমত হলো, খেলাপি ঋণের এই টাকা আর আদায় হবে না। যে কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হবে। ব্যাংকের অন্যতম কাজ হলো দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসার চাকা সচল রাখতে ঋণ দেয়া এবং সময়মতো সে ঋণ আদায় করা। ব্যাংকের প্রধান সম্পদই হলো এ ঋণ। যে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা অপরিহার্য। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে অনিয়ম রেখে সুষম উন্নয়ন ও উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। কাজেই এ খাতে আমূল সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

আগেই বলেছি, খেলাপি ঋণের বিশাল অঙ্কের এই টাকা আদৌ আদায় হবে কিনা তা নিয়ে দারুণ সংশয় রয়েছে, ঋণখেলাপিদের কেউ কেউ দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন ব্যাংক ও সরকারের চোখ ফাঁকি দিয়ে। জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে বিশাল অঙ্কের ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করায় ঋণখেলাপিদের কেউ কেউ গ্রেপ্তার হলেও তাদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের পথও অনেকাংশে রুদ্ধ। কারণ ঋণ নেয়া অর্থের সিংহভাগ তারা হয় বিদেশে পাচার করে দিয়েছেন নতুবা স্বজনদের কারও নামে হস্তান্তর করে দিয়েছেন। ব্যাংক থেকে একজন কৃষক কিংবা সাধারণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে ২০-৫০ হাজার টাকা ঋণ নিতে হলেও জামানত রাখতে হয়। অথচ শত শত কোটি টাকা ব্যাংক ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর কাছে যে সব সম্পত্তি রাখা হয়েছে তার দলিলপত্রের বেশির ভাগই ভুয়া। ব্যাংক ঋণপ্রাপ্তির পেছনে মোটা অঙ্কের উৎকোচ নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজ করেছে রাজনৈতিক প্রভাব। ঋণখেলাপিরা ঋণ লোপাটের ক্ষেত্র হিসেবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বেছে নিয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন ব্যাংকগুলোকে। ২০-২৫ হাজার টাকার ব্যাংক ঋণ শোধ না হওয়ায় কৃষকের কোমরে দড়ি বেঁধে গ্রেপ্তার করার ঘটনা ঘটলেও শত শত কোটি টাকার ঋণখেলাপিদের ব্যাপারে ব্যাংকগুলো খুবই উদার। জালিয়াতির অভিযোগে ঋণখেলাপিদের কেউ কেউ গ্রেপ্তার হলেও তাদের রাখা হয় জামাই আদরে।

শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপির তালিকাটি নিয়ে নানা প্রশ্নের অবকাশ থাকলেও এ ধরনের তালিকা প্রকাশ ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণ আদায়ে এবং ঋণগ্রহীতাদের খেলাপি না হতে উৎসাহিত করতে পারে। অস্বীকার করার উপায় নেই, শীর্ষ ঋণখেলাপিরা রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও উচ্চ মহলের আশীর্বাদ পেয়ে এসেছেন সব সময়। খেলাপি ঋণ আদায়ে এবং ভবিষ্যতে খেলাপি হওয়ার লাগাম টেনে ধরতে হলে সব খেলাপির বিরুদ্ধেই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও উচ্চ মহলের আস্থাভাজনরা ছাড় পেলে তালিকা প্রকাশসহ যে কোনো উদ্যোগ যে ফলপ্রসূ হবে না, তা বলাই বাহুল্য। শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপির যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে তার বেশির ভাগই সরকারি ব্যাংকের গ্রাহক। বছরের পর বছর চলতে থাকা অনিয়ম ও দুর্নীতি ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব, সুশাসনের অভাব, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ কম থাকাসহ নানা কারণে এসব ব্যাংক ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। ঋণখেলাপিদের মধ্যে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা একাধিক সরকারি ব্যাংকে খেলাপি। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকেও খেলাপি। অর্থমন্ত্রী যে তালিকা দিয়েছেন তারা বর্তমানে কাগজে-কলমে খেলাপি। কিন্তু আরও অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন এবং আদালতে রিট করে খেলাপির তালিকার বাইরে রয়েছেন। এ ছাড়া ব্যাংকগুলো অনেক প্রতিষ্ঠানের ঋণ অবলোপন করে হিসাবের খাতার বাইরে রেখেছে। এগুলোকে যদি হিসাবে ধরা হয় তাহলে খেলাপি ঋণের চিত্র আরও ভয়াবহ হবে।

সরকারি ব্যাংকগুলো হাজার হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায়ে অসমর্থ হওয়ায় ক্ষোভ-অসন্তোষ বাড়ছে ক্রমেই। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মহল ব্যাংক ঋণ অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়ে পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান মূল্যায়ন করার পরামর্শ দিয়েছেন। ব্যাংক খাতে আদায় হবে না এমন মন্দ ঋণের হার বাড়ছেই। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজনৈতিক সুবিধায় ঋণ পুনর্গঠন ও বিশেষ সুবিধায় পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেয়ার পরও খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমছে না। প্রতিনিয়ত খেলাপির পরিমাণ বাড়ছে। রাজনৈতিক প্রভাব এবং যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ বিতরণের কারণে এটি হচ্ছে। এর সঙ্গে ব্যাংক কর্মকর্তাদের অদক্ষতা ও দুর্নীতিও রয়েছে। ব্যাংকাররা যেমন দুর্নীতির মাধ্যমে ঋণ দিয়েছেন, তেমনি প্রকল্প প্রস্তাব নিয়ম মাফিক পরীক্ষা না করেও ঋণ দিয়েছেন। ফলে আদায় অযোগ্য ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ সংস্কৃতি দুরারোগ্য ক্যান্সারের মতো বাসা বেঁধেছে দীর্ঘদিন ধরে। কোনোভাবেই এ অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারছে না আমাদের ব্যাংক ব্যবস্থা। অর্থনৈতিক উন্নয়নের নানা সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতির এবং সমৃদ্ধির উজ্জ্বল চিত্র আমাদের উল্লসিত করলেও আমাদের সব উচ্ছ্বাস থেমে যায় ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির অঙ্ক দেখলে। এ বিষয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে সবাই সচেতন এবং ওয়াকিবহাল। বিষয়টি সবাইকে বিব্রত করে, এ নিয়ে সরকারি বিভিন্ন মহলে এবং ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দারুণ অস্বস্তি রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, সংসদীয় কমিটি নানা দিক-নির্দেশনা প্রদান করেছেন খেলাপি ঋণের অভিশাপ ঘোচাতে। রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা, পরামর্শ অনুযায়ী তাদের ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি, পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। নিয়মিত সভা আয়োজন করে মাঠপর্যায়ে গৃহীত কার্যপদক্ষেপের ফলাফল মনিটর করছেন। শাখাগুলো খেলাপি ঋণ আদায়ে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর অর্জিত সাফল্য আশাব্যঞ্জক নয় বলে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

আমাদের দেশের বড় বড় ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধ না করা এক ধরনের কালচার রয়ে গেছে। আইনের বাস্তবায়ন না থাকায় তাদের মধ্যে এ প্রবণতা দেখা দেয়। আবার একশ্রেণির পরিচালক রয়েছেন, যারা নিজের ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সদস্যদের অনৈতিকভাবে ঋণ দেন এবং নিজে অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেন। এ ছাড়া রাজনৈতিক প্রভাবেও কিছু ঋণ দেয়া হয়। এসব কারণে অযোগ্য ঋণ বাড়ছে। এ কারণে আমানতকারী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ব্যাংক খাতে এ কারণে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। বাছবিচারহীন ঋণ বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও আইনের বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। পাশাপাশি ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার রোধ করতে হবে।
খেলাপি ঋণ আদায় না হওয়াটা ব্যাংক খাতের জন্য অশনি সংকেত। যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ দেয়ার কারণে এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে। সুদের হার ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ঋণ আদায় অযোগ্য হয়ে পড়ার পেছনে বড় কারণ রাজনৈতিক বিবেচনায় এবং ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালক ও এমডির যোগসাজশে ঋণ দেয়া। যোগসাজশে যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ দেয়ার পথ বন্ধ করতে হবে। তা না হলে মন্দ ঋণের পরিমাণ আরও বেড়ে যেতে পারে।

বিগত কয়েক বছর ধরে ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলসহ নানামুখী সুবিধা পেয়েছেন বড় ব্যবসায়ীরা। কিন্তু সুবিধা নেয়া ব্যবসায়ীরা ঋণের টাকা সময়মতো ফেরত দিচ্ছেন না। অথচ যেসব ছোট ব্যবসায়ী পুনর্গঠন ও ঋণ পুনঃতফসিল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তারাই ঋণের টাকা পরিশোধে এগিয়ে রয়েছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণায় এমন তথ্য জানা গেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, পুনঃতফসিল করা বড় অঙ্কের ঋণের মধ্যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে টাকা আদায় করতে পারেনি ব্যাংক। কিন্তু ছোট অঙ্কের ঋণের আদায় সন্তোষজনক। তবুও ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও ছোট গ্রাহকের চেয়ে বড় গ্রাহকের দিকে ঝুঁকছে।
ছোট উদ্যোক্তাদের বঞ্চিত করে বড় উদ্যোক্তাদের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কারণেই প্রতি মাসে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। ব্যাংকের টাকা ফেরত না দেয়ার সংস্কৃতি বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যেই বেশি, যদিও বড় ব্যবসায়ীরাও অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। ক্ষুদ্র ও ছোট ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের টাকা ফেরত দেয়ার জন্য উদগ্রীব থাকেন। ব্যাংকও ছোট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে স্বস্তি পায়। কিন্তু প্রভাবশালীরা টাকা ফেরত না দেয়ার জন্য টালবাহানা করে। এ কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ে।
খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি গোটা অর্থনীতির জন্য মোটেও সুখকর নয়। এর ফলে বরং চরম অস্বস্তির সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকিং খাত নাজুক অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছে- একথা স্বীকার না করে উপায় নেই। সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক ধরনের শংকাভাব সৃষ্টি হয়েছে এর ফলে। খেলাপি ঋণের প্রকোপে ব্যাংক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে ক্রমেই।
 
উন্নয়নের জোয়ার চলছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। সমৃদ্ধির নানা সোপান অতিক্রম করে বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। নানা অর্জন বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে সম্মানজনক অবস্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু খেলাপি ঋণের অভিশাপ বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আমাদের ব্যাংকিং খাত শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারছে না খেলাপি ঋণের কারণে।

হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বোঝা আমাদের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাঁধে চেপে থাকায় অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকার পরও তাদের সেই সাফল্য ম্লান হয়ে যাচ্ছে। কিছু অসৎ কর্মকর্তার দায়িত্বহীনতা, অসৎ মনোবৃত্তি, দুর্নীতি এ ক্ষেত্রে দায়ী থাকলেও বেশির ভাগ ব্যাংকার আন্তরিকভাবে সততার প্রকাশ ঘটিয়ে কাজ করছেন। তারা রাতদিন নিরলসভাবে পরিশ্রম করছেন, খেলাপি ঋণের জঞ্জালমুক্ত করতে বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সত্যিকারভাবে নিঃস্বার্থ মন নিয়ে কাজ করছেন। ছুটির দিনগুলোয়ও তারা এজন্য অফিস করছেন নিরলসভাবে। তারা খেলাপি ঋণ আদায়ের নতুন নতুন কর্মকৌশল উদ্ভাবন করছেন, পরিকল্পনা গ্রহণ করে তার বাস্তবায়নে মেধা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতার যথার্থ ব্যবহার করছেন। তাদের দিক-নির্দেশনা ব্যাংকের সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্দীপনার সঞ্চার করছে। আমাদের দৃঢ় প্রত্যাশা, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদের ব্যাংক ব্যবস্থা খেলাপি ঋণের অভিশাপ থেকে মুক্ত হবেই। আমরা সেই সময়ের প্রতীক্ষায় রয়েছি।
 
জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী ঋণখেলাপিদের যে একটি তালিকা প্রকাশ করেছেন সেটাকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখতে চাই। এখন আমরা চাই তালিকা অনুযায়ী এবং তালিকার বাইরে থাকা সব ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আর এ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাটি অবশ্যই হতে হবে খেলাপি ঋণ আদায়ের লক্ষ্যে। রাজনৈতিক বিবেচনায় বা অনিয়ম দুর্নীতি করে ঋণ অবলোপন করার প্রক্রিয়া আমরা আর দেখতে চাই না। ঋণ পুনর্গঠনের বিতর্কিত সুযোগ-সুবিধা দিয়ে রাখব বোয়ালদের পিঠ বাঁচানোর অপচেষ্টা থেকে সংশ্লিষ্টদের বিরত থাকতে হবে। ঋণ আদায়ে সরকার কেন কঠোর হচ্ছে না। সেটা মানুষ জানতে চায়। খেলাপি ঋণ আদায়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করার দাবি উঠেছে অনেকদিন ধরেই। ব্যাংকিং কমিশন গঠন, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্তিশালীকরণ ব্যাংকগুলোয় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা প্রভৃতি প্রশ্নে সরকারকে তার স্পষ্ট জোরালো অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। সামাজিকভাবে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলারও সময় এসেছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক সংগঠনকে দলমত নির্বিশেষে সাহসী, পক্ষপাতহীন, আন্তরিক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক- রেজাউল করিম খোকন: ব্যাংকার

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও ১৫ আগষ্ট
                                  

মো: হায়দার আলী

মানব জাঁতি মানব সভ্যতার ধারাবাহিক ইতিহাসের ধারায় এমন কিছু দুঃখজনক, বেদনাদায়ক, হৃদয় গ্রাহী ঘটনা সংযোজিত হয়েছে যা অধ্যয়ন করলে মন শুধু ব্যথিত ও মর্মহত হয়। আর এসব ঘটনা সংঘটনের নায়কদের উদ্দোশ্যে মন থেকে বেরিয়ে আসে নানা ধিক্কারজনক উক্তি। ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায় এমন কিছু মহাস্থানের জীবন এই পূথিবীতে অকালে ঝরে গেছে, যাদের এই অপমৃত্য বিবেকই কোন অবস্থাতেই মেনে নিতে পারে না। মানব জাঁতি ও মানব সভ্যতার চিরকল্যানকামী এ রকম এক মহাপুরুষের নাম সর্বকালের শ্রেষ্ট বাঙ্গালী, জাতির জনক বর্তমান প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান।

১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। ১৯৭৫ সালের এ দিনে মানব ইতিহাসের বর্বরতম হত্যা কান্ডের স্বীকার হয় সর্বকালের শ্রেষ্ট বাঙ্গালী জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান। ঘাতকেরা শুধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে খ্যান্ত হননি তার সাথে প্রাণ দিতে হয়ে ছিল বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, পুত্র ক্যাপ্টেন শেখ কামাল, লে. শেখ জামাল, স্কুল ছাত্র ছোট শিশু শেখ রাশেল, পুত্রবধু সুলতানা কামাল ও রোজি কামাল, বঙ্গবন্ধুর সহোদর শেখ নাসের, কৃষকনেতা অব্দুর রব সেরনিয়াবাত, যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনি, তার অন্ত:সত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, বেবী সেরনিয়াবাত,  সুকান্ত বাবু, আরিফ, আবদুল নঈম খান রিন্টুসহ পরিবারের ১৮জন সদস্যকে হত্য করা হয়। হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব কর্নেল জামিলকে। ঘাতকদের নিক্ষিপ্ত কামানের গোলার আঘাতে মোহম্মদপুরে  একটি পরিবারের বেশ কয়েকজন প্রাণ হারান। শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহেনা দেশে বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। সকল হত্যাই দু:খজনক ও নিন্দনীয়। ১৫ আগস্ট এ দেশের এ জাতীর জন্য একটি দু:খজনক অধ্যয়। ১৯৪০ দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ পর্যন্ত তিনি বাঙ্গালী জাতির কা-ারী ছিলেন, যিনি পর্যায়ক্রমিক আন্দোলন স্বাধীন স্বার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছিলেন সেই বঙ্গবন্ধু শেখ   শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী, গতিশীল এবং ঐন্দ্রজালিক সাহসী নেতৃত্বে এই ভূ-খন্ডের মানুষ  হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে ছিনিয়ে এনেছিলেন স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য্য। বাঙালি পেয়েছে লাল সবুজের পতাকার নিজস্ব জাতিরাষ্ট্র। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে বঙ্গবন্ধু যখন সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সোনার বাংলা গড়ার সংগ্রামে নিয়োজিত তখনই তাকে হত্যা করা হয়। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে জন্য গণতান্ত্রিক উত্তরণের কেবল তৈরী হচ্ছিল, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু সেটা মুছে দিল। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও অগ্রযাত্রাকে স্তদ্ধ করা অপপ্রয়াস চালায়। অসাম্প্রদায়িক গনতান্ত্রিক বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোকে ভেঙে ফেলাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি শুরু করে হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। জনগনের ভোটেনির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে সংবিধান স্থগিত করে মার্শাল ল জারি করা হয়। সেনা শাসক জিয়উর রহমাকে দিয়ে গণতন্ত্রকে হত্যা করে দেশে কায়েম করে সামরিক শাসন।

একটি সুচিন্তিত গনতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা যে সম্ভাব শেখ মুজিবুর রহমান তার প্রমান সমগ্র পৃথিবীর সামনে তুলে ধরেছিলেন। তার সব চাইতে বড় কৃতিত্ব হলো তিনি আমাদের বাঙ্গালী জাতিসত্ত্বাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এ প্রক্রিয়া আপনা আপনি  শুরু হয়নি বাঙালীর দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও সংগ্রামের অমোঘ পরিণত হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, বঙ্গবন্ধু শুধু বাঙালীর বন্ধু ও অধিনায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন পথপ্রদর্শক ও মহান নেতা। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর আগ্রহ শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না তিনি চেয়েছিলেন বহুদলীয় গণতান্ত্রিক সভ্যতা, সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা, সব মানুষের মানবাধিকারের স্বীকৃতি। তার চিন্তা ধারার সঠিক মূল্য শুধু বাংলাদেশে নয় সমগ্র পৃথিবীও স্বীকার করে। বঙ্গবন্ধু একদিনে অভিভূত হয়নি।

যৌবনে রাজনৈতিক কর্মী থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্থপতি ছিলেন। যে মানুষটি দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কার্যক্রম, ত্যাগ, আন্দোলন এবং চূড়ান্ত পর্বে মুক্তি সংগ্রমে সফল নেতৃত্ব দিয়ে একটা বিশাল জনগোষ্ঠির জন্য একটা মুক্ত স্বাধীন স্বদেশ এনে দিতে পারেন তিনি তিনি কোনভাবেই শুধু মাত্র একটা দলের সম্পদ বা নেতা হতে পারেন না। তিনি ছিলেন জাতির সম্পদ। এ মহান নেতাকে যারা হত্যা করেছেন তারা দেশ, জাঁতি ও বিশ্বের অনেক ক্ষতি করেছেন যা আজও পূরণ হবার নয়।

স্বাধীনতা বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে আপোষহীন সকল রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে, দেশের মানুষের জন্য নিজের জাগতিক সব সুখ বিসর্জন, পরিবার পরিজনের চেয়ে মানুষের জন্য বেশী আকুলতা-সব বৈশিষ্ট্য ছিল দীর্ঘদেহী এই ক্ষণজন্মা পুরুষের। পলিমাটি বিধোত এ অঞ্চলের মানুষের মনও এমনধারা সহজেই আমরা ভুলে যাই শত্রুতা। আর তাই যারা এ দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, মানুষের বিরুদ্ধে,ষড়যন্ত্র করেছে তাদের সেই অপরাধও নিজের মানবিক গুনের ফলে তেমন করে আমলে নেননি বৃহৎ হৃদয়ের এ সিংঘপুরুষ। বিভিন্নমূখী চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে পারেননি এ কোমল হৃদয়ের মানুষটি। আর তারই মাসুল গুনেছেন নিজের এবং পরিজনদের রক্ত দিয়ে। শোকের মাস আগস্ট এ মাসে শ্রোদ্ধা জানাই এই মহাপুরুষকে। বঙ্গবন্ধু এবং সামর্থক। রাজনীতির খাতিরে যে যাই বলুক না কেন চরমবিরোধীরাও প্রকাশ্যে না হলেও নিজ বিবেকের কাছে নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধু না হলে বাংলাদেশ নামের এই ভূখন্ডের জন্ম হতো না এটা স্বীকার করবেনই। জাতির দুর্ভোগ্য, পিতৃ হত্যার বিচার তো দূরের কথা, পিতৃ হত্যার বিচার যেন না করা যায়, না হয় সে লক্ষ্যে ইনডেমিনিটি পর্যন্ত দেয়া হয়ে ছিল। পুরস্কৃত করা হয়েছল আত্মস্বীকৃত খুনিদের। সব প্রকার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দেয়া হয়েছিল নারী ও শিশু হত্যাকারীদের। পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে এদেশের সাধারণ মানুষ এ বেদনা বুকে চেপে অপেক্ষা করেছে কলঙ্কতিলক মোচনের। আমাদের সৌভাগ্য জাতির ললাট থেকে এ কলঙ্কতিলক মোচনের কাজটি শুরু হয়েছে। আত্মস্বীকৃত খুনিদের কয়েক জনের দন্ড কার্যকর হওয়ায় আংশিক বিচার কাজ শুরু হয়েছে। খুনিদের মধ্যে যারা এখনও বিদেশে পালাতক তাদের দেশে নিয়ে এসে দন্ড কার্যকর করতে পারলে আমরা স্বস্তির পুরো নিশ্বাস নিবো। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বঙ্গবন্ধুর কোন বিশেষ আদালতে নয় সাধারণ আদালতেই বিচার হয়েছে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার সরকার এখন ক্ষমতায়। যারা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছিল, হাতের নাগালে বঙ্গবন্ধুর স্বজন-পরিজন, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠজন, সমরিক সচিব, নারী, শিশু নির্বিশেষে সবাইকে যারা হত্যা করেছিল তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই- বঙ্গবন্ধুকে মুছে দেয়া। কিন্তু ওই মূর্খরা বুঝেনি এক মজিবের রক্ত থেকে এদেশে লক্ষ মজিব জন্ম নেবে সেটাও কল্পলা করতে পারেনি। আজকে জননন্দিত প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা পিতার অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করতে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন সেদিনে থেকে চক্রান্তকারীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন শেখ হাসিনা। একাধিকবার তার প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়েছে। তার সুযোগ্য পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয়কেও হত্যার চক্রান্ত করা হয়েছে কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে কুচক্রী মহল। শেখ হাসিনা পিতার মতই অকুতোভয় কন্যা কাজ করে যাচ্ছেন নিজের লক্ষ্য পূরণে। দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তজাতিক অঙ্গনে শেখ হাসিনা এখন উদাহরণযোগ্য নেতৃত্ব। পাশাপাশি একথাও মনে রাখতে হবে ষড়যন্ত্রকারিরাও এখনও থেমে নেই।

বর্তমান প্রধান মন্ত্রী, বঙ্গবন্ধুর কন্যা, জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে সবার প্রত্যশা বাংলার মানুষকে যেন আর কোন বেদনাভার বইতে না হয়। ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতি নমনীয় না হয়। জঙ্গী হামলা, গুপ্ত হত্যায় আর একটিও প্রাণ যেন না যায়। পাশাপাশি জনদুর্ভোগ লাগবে শেখ হাসিনার সরকার যেন আরও উদ্যোগী হয়। প্রয়োজনে অদক্ষদের বদলে দক্ষদের যেন সম্পৃক্ত করা হয়, জনদুর্ভোগ লাঘবকারী যাবতীয় কর্মে, বিতর্কিত মন্ত্রীদের বাদ দিয়ে যোগ্য কর্মঠ এমপিদের যেন মন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়।

বহু প্রত্যাশার, বহু আকাংখার এ সরকার যার নেতৃত্বে আছেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা- সেই সরকার যেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে সক্ষম হয়। একটি দারিদ্রÑক্ষুধা মুক্ত সুন্দর বাংলাদেশের যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন। শেখ হাসিনার সরকার সে স্বপ্ন পূরণে সফল হবেন ইনসাল্লাহ শোকের মাসে এটাই এ দেশবাসীর প্রত্যাশা।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের সূচনাপর্বই ছিল ঘটনাবহুল
                                  

আনিসুজ্জামান
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের সূচনাপর্বই ছিল ঘটনাবহুল। প্রথমে বিপ্লবী দলের প্রতি ছিল তাঁর সম্মোহন এবং পরবর্তীতে সুভাষ বসুর রাজনৈতিক পন্থার প্রতি আগ্রহ ক্রমান্বয়ে মোড় নিয়েছে বাংলা ও বাঙালীকে ঘিরে স্বতন্ত্র-স্বাধীন কর্মপন্থায়। ১৯৪৮ সালে ভাষা সংগ্রামের প্রথম পর্যায় থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ গঠন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, পাকিস্তানের শাসনতন্ত্রে বাঙালীর মুক্তির দাবি সংযোজনের সংগ্রাম, সামরিক শাসন প্রত্যাহারের আন্দোলন, ঐতিহাসিক ছয় দফা উত্থাপন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, বঙ্গবন্ধু উপাধি লাভ, সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়, একাত্তরের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৬ শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা ইত্যাদি সকল কর্মপ্রবাহে আমরা দেখব নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে সব সময় বাঙালীর জাতির সার্বিক মুক্তির পথকে প্রশস্ত করতে চেয়েছেন বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিবুর রহমান। জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে শনিবার বাংলা একাডেমি আয়োজিত একক বক্তৃতায় এসব কথা বলেছেন বরেণ্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। ওই বক্তৃতায় তিনি আরও বলেন, বস্তুত ৭ই মার্চের ভাষণেই ব্যক্ত ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা। ২৬ মার্চে তিনি যে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন তার ঐতিহাসিক প্রমাণাদি উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও যারা তা মানতে চায় না তারা ইতিহাসের সত্যকেই অস্বীকার করে। স্বাধীনতার পর স্বল্প সময়ের ক্ষমতাকালে একটি আদর্শ সংবিধান প্রণয়ন এবং শিক্ষা-শিল্পবাণিজ্য-পররাষ্ট্র ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচী গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু। ঘাতকের গুলিতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেমন আঘাতপ্রাপ্ত হয় তেমনি পরিত্যক্ত হয় ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মূলনীতিসমূহ। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই বঙ্গবন্ধুর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন সম্ভব হবে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪০তম শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোকদিবস উপলক্ষে বাংলা একাডেমির পক্ষকালব্যাপী অনুষ্ঠানমালার অংশ হিসেবে এই বক্তৃতা অনুষ্ঠিত হয়। শনিবার বিকেলে একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় বঙ্গবন্ধু স্মরণে একক বক্তৃতা। বঙ্গবন্ধু এবং পনেরোই আগস্টের সকল শহীদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং শিল্পী পাপিয়া সারোয়ারের কণ্ঠে ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু’ সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি এবং ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলা একাডেমির উপপরিচালক ড. শাহাদাৎ হোসেন নিপু।

সভাপতির বক্তৃতায় অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তাঁর চেতনাপথেই আমরা সামনের দিকে এগিয়ে চলেছি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের উন্মোচনে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠন করা সময়ের দাবি।

স্বাগত বক্তৃতায় শামসুজ্জামান খান বলেন, বঙ্গবন্ধু বাঙালী জাতির রাষ্ট্রস্বপ্নের সার্থক রূপকার। বাঙালী জাতির হাজার বছরের স্বাধীনতার বাসনাকে তিনি ধারাবাহিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাস্তব রূপ দান করেছেন। দেশ-বিদেশের তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞগণ সঙ্গত কারণেই তাঁকে রাজনীতির কবি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী এবং বাঙালী জাতিরাষ্ট্রের জনক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।


   Page 1 of 7
     উপসম্পাদকীয়
জামায়াতীদের নাগরিক মর্যাদা
.............................................................................................
অার নয় যৌতুক
.............................................................................................
আমাদের গণতন্ত্রের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যত
.............................................................................................
১৭ নভেম্বর মওলানা ভাসানীর মাজার, জনতার মিলন মেলা
.............................................................................................
পুলিশের ভালো-মন্দ এবং অতিবল
.............................................................................................
চালে চালবাজী: সংশ্লিষ্টদের চৈতন্যোদয় হোক
.............................................................................................
একাদশ সংসদ নির্বাচন, ভোটাধিকার এবং নির্বাচন কমিশন
.............................................................................................
নির্বাচনে সেনা মোতায়েন প্রত্যাশা এবং সিইসির দৃশ্যপট
.............................................................................................
৩ মাসের মধ্যে ধর্ষকের ফাঁসি এবং বিজয় বাংলাদেশ
.............................................................................................
শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বাংলাদেশ
.............................................................................................
মানবিক মূল্যবোধ বিনষ্ট হলে মানুষ পশু সমতুল্য হয়ে পড়ে
.............................................................................................
ফিরে ফিরে আসে ১৫ আগস্ট : কিন্তুু যা শেখার ছিল তা শেখা হলো না
.............................................................................................
ক্ষুদ্রঋণ সহায়তার নামে সুদখোরদের অত্যাচার কবে বন্ধ হবে
.............................................................................................
খেলাপি ঋণের অভিশাপ মুক্ত হোক ব্যাংক খাত
.............................................................................................
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও ১৫ আগষ্ট
.............................................................................................
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের সূচনাপর্বই ছিল ঘটনাবহুল
.............................................................................................
জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে আত্মসন্তুষ্টির অবকাশ নেই
.............................................................................................
সার্টিফিকেট নির্ভর নয়, মানসম্পন্ন শিক্ষা জরুরি
.............................................................................................
বাজেট তুমি কার
.............................................................................................
শিক্ষাক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা
.............................................................................................
জাতীয় সংসদ নির্বাচন: দেশী ও বিদেশীদের ভাবনা
.............................................................................................
দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধ হবে কি?
.............................................................................................
হুমকির মুখে গার্মেন্টস শিল্প, কমছে বৈদেশিক আয়
.............................................................................................
ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার গ্রামীণ জনগোষ্ঠির মাঝে আশার আলো
.............................................................................................
নিরপেক্ষ গণমাধ্যম জাতির প্রত্যাশা
.............................................................................................
নারীর উন্নয়নে দেশের উন্নয়ন
.............................................................................................
ভূমিকম্প মোকাবেলায় প্রয়োজন সচেতনতা
.............................................................................................
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো
.............................................................................................
ভূমিকম্পকে ভয় পেলে চলবে না
.............................................................................................
সিইসির বিদায় বেলায় জেলা পরিষদ ও নাসিক নির্বাচন
.............................................................................................
বিজয় দিবস বাঙালির শৌর্য-বীর্যের প্রতীক
.............................................................................................
পাকিস্তানের কূটনৈতিক পরাজয়
.............................................................................................
আইএস বিতর্কের অন্তরালে
.............................................................................................
তেলের মূল্য কমানোর সুফল কার পকেটে ?
.............................................................................................
চাই নিরক্ষরমুক্ত আত্মনিভর্রশীল ডিজিটাল বাংলাদেশ
.............................................................................................
পশ্চিমবঙ্গ: কালো তাড়াই কালো আসবে নতুন আলো...
.............................................................................................
মধ্যপ্রাচ্যে নারী নির্যাতন, আইয়্যামে জাহেলিয়ার দৃশ্যপট
.............................................................................................
বিশ্বমানের চিকিৎসা সেবা
.............................................................................................
গ্রাম নিয়ে যত কথা
.............................................................................................
পদ্মা সেতু থেকে বড়
.............................................................................................
ইউপি নির্বাচনের প্রতিচিত্র
.............................................................................................
ইউপি নির্বাচনের প্রতিচিত্র
.............................................................................................
মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্লিজ!
.............................................................................................
তনু হত্যার প্রসঙ্গ অপ্রসঙ্গ
.............................................................................................
সাগর কুলের নাইয়ারে - মাঝি কোথায় যাচ্ছ বাইয়া
.............................................................................................
বিশ্বময় এই অব্যাহত সন্ত্রাস কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না?
.............................................................................................
বিশ্ব পানি দিবস
.............................................................................................
রেলের ভাড়া বাড়ে সেবা বাড়ে না
.............................................................................................
স্বাধীনতার মাস: স্বাধীনতার মূল্যবোধ
.............................................................................................
সংসদে প্রশ্নত্তোর পর্ব; চাকরির বয়স এবং আমাদের প্রত্যাশা
.............................................................................................

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আখলাকুল আম্বিয়া
নির্বাহী সম্পাদক: মাে: মাহবুবুল আম্বিয়া

সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: স্বাধীনতা ভবন (৩য় তলা), ৮৮ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০। Editorial & Commercial Office: Swadhinota Bhaban (2nd Floor), 88 Motijheel, Dhaka-1000.
সম্পাদক কর্তৃক রঙতুলি প্রিন্টার্স ১৯৩/ডি, মমতাজ ম্যানশন, ফকিরাপুল কালভার্ট রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত ।
ফোন : ০২-৯৫৫২২৯১ মোবাইল: ০১৬৭০৬৬১৩৭৭

Phone: 02-9552291 Mobile: +8801670 661377
ই-মেইল : dailyswadhinbangla@gmail.com , editor@dailyswadhinbangla.com, news@dailyswadhinbangla.com

 

    2015 @ All Right Reserved By dailyswadhinbangla.com

Developed By: Nytasoft