বুধবার, 16 অক্টোবর ২০১৯ | বাংলার জন্য ক্লিক করুন
  
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

   উপসম্পাদকীয় -
                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                 
বিয়ে চুক্তিতে সমতার চারা

জোবাইদা নাসরীন

বিয়ে একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। যুগ যুগ ধরে টিকে আছে এই প্রতিষ্ঠান। বিয়ে প্রতিষ্ঠানটিরও নানা ধরনের বিবর্তন হয়েছে এবং এক বিয়ে পরিবারে এসে এর চল এখন ঠেকেছে। বিয়ে প্রতিষ্ঠানটির জিইয়ে থাকা ধরন এবং এটি সম্পাদনের বিভিন্ন ধরনের চুক্তি নিয়ে সব সময়ই তর্ক-বিতর্ক চলছে সমাজ এবং রাষ্ট্রে। তবে এখন পর্যন্ত বিয়ে বিষয়ে সবচেয়ে দাপুটে থাকা সংজ্ঞা যা সমাজবিজ্ঞানীরা দেন তা হলো, বিয়ে একটি সামাজিক চুক্তি, যেটি এককভাবে দুজন নর-নারীকে সন্তান উৎপাদনের বৈধতা দেয়।

এটি বলে রাখা প্রয়োজন যে, এটি যেসব সমাজে, সব মানুষের জন্য একই অর্থ এবং ধারণা নিয়ে হাজির হবে; তা নয়, তবে এ বিয়ে সম্পাদনের ঢং নানা সংস্কৃতি, রাষ্ট্র-সমাজে নানাভাবে আছে। ধর্মীয় কায়দার বাইরে আছে রাষ্ট্রীয় কায়দা-কানুন। কিংবা কোথাও কোথাও এক সঙ্গে দুটোরই বাধ্যবাধকতা আছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিম বিয়ের যে চুক্তি, যাকে সাধারণভাবে ‘নিকাহনামা’ বা কাবিননামা বলা হয়; সেখানে একটি কলামে পরিবর্তন আনতে হাইকোর্ট একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন। যদিও রিট আবেদনের প্রায় পাঁচ বছর পর আদালত এ বিষয়ে রায় দিয়েছেন। গত ২৫ আগস্ট বিয়ের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কাবিনের (নিকাহনামার) ফরমের পাঁচ নম্বর কলামে উল্লিখিত ‘কুমারী’ শব্দ বাদ দিয়ে সেখানে অবিবাহিত শব্দ যোগ করার নির্দেশনা দিয়ে রায় ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। শুধু তাই নয়, কাবিননামায় একই সঙ্গে নারী-পুরুষ উভয়ের তথ্য নিবন্ধনে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে।

কাবিননামার ফরমের (বাংলাদেশ ফরম নম্বর-১৬০০ ও ১৬০১) বৈষম্যমূলক এবং রাইট টু প্রাইভেসি উল্লেখ করে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট, নারীপক্ষ এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ২০১৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর রিট আবেদনটি করে। আবেদনকারীরা যুক্তি পেশ করেন যে, কাবিননামায় শুধু কনের বৈবাহিক অবস্থা ও তথ্য সন্নিবেশিত করার জন্য অনুচ্ছেদ রয়েছে। তবে বরের বৈবাহিক অবস্থা সম্পর্কিত কোনো অনুচ্ছেদ নেই। এটা নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক। সংবিধান অনুসারে কারো প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না। ওই অনুচ্ছেদটি সংবিধানের ২৭, ২৮, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ পরিপন্থি। এখানে এ তথ্যটি জানা জরুরি যে, কাবিননামার এই ফরমটি মুসলিম পারিবারিক বিবাহ আইন ১৯৬১ সালের অর্ডিন্যান্সের আলোকে করা হয়েছিল এবং এরপর এর কোনো ধরনের সংশোধনী আনা হয়নি। রিট আবেদনকারী যুক্তি পাড়েন যে, পাকিস্তান ও ব্রিটেনের ফরমে ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই জানাতে হয় বিবাহিত, না অবিবাহিত। কিন্তু কুমারী বা তালাকপ্রাপ্ত কি না তা জানাতে হয় না।

এ রিটের পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচ নম্বর কলাম কেন বৈষম্যমূলক ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না; তা জানতে চেয়ে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে কেন ‘কুমারী’ শব্দটি বিলোপ করে কাবিননামা সংশোধন করা এবং বরের বৈবাহিক অবস্থা সম্পর্কিত কোনো ক্রমিক কাবিননামায় উল্লেখ করা হবে না; তাও জানতে চাওয়া হয়েছিল। তবে এর আগেও বিয়ের কাবিনের (নিকাহনামার) ফরমে কনে কুমারী, বিধবা ও তালাকপ্রাপ্ত সংক্রান্ত পাঁচ নম্বর কলাম থাকার বৈধতা নিয়ে রিট করা হয়।

কেন ‘কুমারী’ শব্দটি নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে এবং কেন এই কুমারী শব্দটিকে বাদ দেওয়াকে যুগান্তকারী এবং গুরুত্বপূর্ণ রায় বলা হচ্ছে এতে নারীরা আসলে কী ধরনের স্বস্তিবোধ করছেন কিংবা কীভাবে এটি নারীকে বিয়ে প্রতিষ্ঠানের চুক্তির মধ্যে সমতার পরিসর দিল কতগুলো সুনির্দিষ্ট কারণ এর সঙ্গে জড়িত। প্রথমত. একজন মেয়ে কুমারী, বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত কি না; এটা একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। এ তথ্য কাবিননামায় লেখার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। কাবিননামায় ছেলেদের এ রকম কোনো কিছু লিখতে হয় না। শুধু নারীদের বেলাতেই এটি রাখা হয়েছে। তাই এটি একটি বৈষম্যমূলক কলাম।

কুমারী শব্দের মধ্য দিয়ে একজন নারীর বিয়ে-পূর্ব যৌন অভিজ্ঞতার ইতিহাস আছে কি না; সে বিষয়েও ইঙ্গিত করা হয়, কারণ কুমারী শব্দটি দিয়ে একভাবে ‘অবিবাহিত’ ইঙ্গিত করলেও আমরা জানি যে, এর নানা ধরনের সামাজিক অর্থ রয়েছে এবং একজন নারীকে বিচার করার জন্য সেটি নানা ধরনের সামাজিক অবস্থা তৈরি করতে পারে এবং যা নারীর জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। এর বাইরে বিয়ের মতো একটা চুক্তিতে ব্যক্তিগত তথ্যের নথিভুক্ত দলিলীকরণ মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে। এই রায়ের আগে গত ৬ জুলাই হাইকোর্টে এ রিটের শুনানি হয়। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিবের কাছে এ বিষয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মতামত জানতে চান।

হাইকোর্টের এ গুরুত্বপূর্ণ রায়ের আরেকটি বিশেষ দিক রয়েছে। চুক্তিপত্রে বিয়ে করতে সম্মত হওয়া দুজন সাবালক ব্যক্তির বৈবাহিক অবস্থা জানানোর ক্ষেত্রে সমতার জমিন রাখার জন্য রায় দেওয়া হয়েছে। সেজন্য কাবিননামার চার নম্বর কলামে আনা হয়েছে সংযোজন। পুরুষের জন্য ‘ক’ সংযুক্ত করে ছেলেদের ক্ষেত্রে বিবাহিত, বিপত্নীক ও তালাকপ্রাপ্ত কি না; তা সংযুক্ত করতে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আর এ সংযোজন কাবিননামায় বিয়ে-সংক্রান্ত ব্যক্তিগত নথি প্রকাশের ক্ষেত্রে বিয়ে চুক্তিবদ্ধ আগ্রহী দুজন ব্যক্তির। তবে মুসলিম বিয়ে চুক্তিতে আরেকটি কলাম রয়েছে; যেটিরও সংস্কার জরুরি। যেটি বিয়েবিচ্ছেদ সংক্রান্ত কলাম।

কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে রয়েছে তালাকের অধিকার প্রসঙ্গে। স্পষ্ট ভাষায় বলতে গেলে স্বামী স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেবেন কি না, সে প্রসঙ্গ। সেই কলাম অনুযায়ী স্বামী যদি স্ত্রীকে বিয়েবিচ্ছেদের ক্ষমতা অর্পণ করে থাকেন, তবেই সে ক্ষমতার বলে স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছেদ চাইতে পারেন এবং এ ক্ষেত্রে স্ত্রী আদালতের আশ্রয় ছাড়াই স্বামীকে তালাক দিতে পারেন। স্বামী যদি এ ঘরটি পূরণ না করেন অর্থাৎ কোনো কিছুই উল্লেখ না করেন অথবা কেবল সীমাবদ্ধ কিছু ক্ষেত্র উল্লেখ করে এই তালাক প্রদানের ক্ষমতা প্রদান করেন, তখন স্ত্রীর তালাক প্রদান করার ক্ষমতা সীমিত হয়ে যায়। তখন স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিতে চাইলে তাকে আদালতের আশ্রয় নিতে হয়। যেখানে দুই পক্ষেরই তালাক দেওয়ার সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে; সেখানে কাবিননামায় স্ত্রীর তালাকের অধিকার স্বামীর দেওয়া ক্ষমতার ওপর কেন নির্ভরশীল থাকছে এবং এটিও একটি বৈষম্যমূলক কলাম। অনেক সময়ই এই ঘরটি ফাঁকা রাখেন অনেক ছেলে, যার কারণে পরবর্তী সময় আদালতে গিয়ে বিয়েবিচ্ছেদের মামলা করতে হয় নারীকে।

এখন প্রশ্ন হলো, বিয়ে এবং বিচ্ছেদের অধিকার যদি সবার থাকে; তাহলে সেটি কেন পুরুষ কর্তৃক অর্পিত ক্ষমতাবলে হবে এটিও একটি অসম্মানজনক ধারা। অনেকেই হয়তো যুক্তি দেবেন যে, যেহেতু নারীর জন্য বিবাহবিচ্ছেদের অন্য সুযোগও রয়েছে; তাই কাবিননামায় থাকা এই কলাম হয়তো খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমি মনে করি, বিয়ে চুক্তিনামায় একসঙ্গে জীবন ভোগের প্রত্যাশী দুজন ব্যক্তির সমতা ধর্মীয় আইনের ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবেই ভিন্ন অর্থ বহন করে এবং এটি কাক্সিক্ষত। কারণ চুক্তিতে থাকা অসমতার জায়গাগুলো থেকে যদি আমরা নিজেদের সরাতে না পারি; তাহলে যাপিত জীবনে সেটি চর্চা করা অনেকের পক্ষেই কঠিন হয়ে পড়ে। চুক্তিতে থাকলেই সম্পর্কগুলো সমতার হবে হয়তো তাও নয়, তবুও চেষ্টা এবং চিন্তার জায়গাগুলো স্পষ্ট করে চেনা জরুরি।

বিয়ে চুক্তিতে সমতার চারা
                                  

জোবাইদা নাসরীন

বিয়ে একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। যুগ যুগ ধরে টিকে আছে এই প্রতিষ্ঠান। বিয়ে প্রতিষ্ঠানটিরও নানা ধরনের বিবর্তন হয়েছে এবং এক বিয়ে পরিবারে এসে এর চল এখন ঠেকেছে। বিয়ে প্রতিষ্ঠানটির জিইয়ে থাকা ধরন এবং এটি সম্পাদনের বিভিন্ন ধরনের চুক্তি নিয়ে সব সময়ই তর্ক-বিতর্ক চলছে সমাজ এবং রাষ্ট্রে। তবে এখন পর্যন্ত বিয়ে বিষয়ে সবচেয়ে দাপুটে থাকা সংজ্ঞা যা সমাজবিজ্ঞানীরা দেন তা হলো, বিয়ে একটি সামাজিক চুক্তি, যেটি এককভাবে দুজন নর-নারীকে সন্তান উৎপাদনের বৈধতা দেয়।

এটি বলে রাখা প্রয়োজন যে, এটি যেসব সমাজে, সব মানুষের জন্য একই অর্থ এবং ধারণা নিয়ে হাজির হবে; তা নয়, তবে এ বিয়ে সম্পাদনের ঢং নানা সংস্কৃতি, রাষ্ট্র-সমাজে নানাভাবে আছে। ধর্মীয় কায়দার বাইরে আছে রাষ্ট্রীয় কায়দা-কানুন। কিংবা কোথাও কোথাও এক সঙ্গে দুটোরই বাধ্যবাধকতা আছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিম বিয়ের যে চুক্তি, যাকে সাধারণভাবে ‘নিকাহনামা’ বা কাবিননামা বলা হয়; সেখানে একটি কলামে পরিবর্তন আনতে হাইকোর্ট একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন। যদিও রিট আবেদনের প্রায় পাঁচ বছর পর আদালত এ বিষয়ে রায় দিয়েছেন। গত ২৫ আগস্ট বিয়ের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কাবিনের (নিকাহনামার) ফরমের পাঁচ নম্বর কলামে উল্লিখিত ‘কুমারী’ শব্দ বাদ দিয়ে সেখানে অবিবাহিত শব্দ যোগ করার নির্দেশনা দিয়ে রায় ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। শুধু তাই নয়, কাবিননামায় একই সঙ্গে নারী-পুরুষ উভয়ের তথ্য নিবন্ধনে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে।

কাবিননামার ফরমের (বাংলাদেশ ফরম নম্বর-১৬০০ ও ১৬০১) বৈষম্যমূলক এবং রাইট টু প্রাইভেসি উল্লেখ করে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট, নারীপক্ষ এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ২০১৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর রিট আবেদনটি করে। আবেদনকারীরা যুক্তি পেশ করেন যে, কাবিননামায় শুধু কনের বৈবাহিক অবস্থা ও তথ্য সন্নিবেশিত করার জন্য অনুচ্ছেদ রয়েছে। তবে বরের বৈবাহিক অবস্থা সম্পর্কিত কোনো অনুচ্ছেদ নেই। এটা নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক। সংবিধান অনুসারে কারো প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না। ওই অনুচ্ছেদটি সংবিধানের ২৭, ২৮, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ পরিপন্থি। এখানে এ তথ্যটি জানা জরুরি যে, কাবিননামার এই ফরমটি মুসলিম পারিবারিক বিবাহ আইন ১৯৬১ সালের অর্ডিন্যান্সের আলোকে করা হয়েছিল এবং এরপর এর কোনো ধরনের সংশোধনী আনা হয়নি। রিট আবেদনকারী যুক্তি পাড়েন যে, পাকিস্তান ও ব্রিটেনের ফরমে ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই জানাতে হয় বিবাহিত, না অবিবাহিত। কিন্তু কুমারী বা তালাকপ্রাপ্ত কি না তা জানাতে হয় না।

এ রিটের পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচ নম্বর কলাম কেন বৈষম্যমূলক ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না; তা জানতে চেয়ে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে কেন ‘কুমারী’ শব্দটি বিলোপ করে কাবিননামা সংশোধন করা এবং বরের বৈবাহিক অবস্থা সম্পর্কিত কোনো ক্রমিক কাবিননামায় উল্লেখ করা হবে না; তাও জানতে চাওয়া হয়েছিল। তবে এর আগেও বিয়ের কাবিনের (নিকাহনামার) ফরমে কনে কুমারী, বিধবা ও তালাকপ্রাপ্ত সংক্রান্ত পাঁচ নম্বর কলাম থাকার বৈধতা নিয়ে রিট করা হয়।

কেন ‘কুমারী’ শব্দটি নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে এবং কেন এই কুমারী শব্দটিকে বাদ দেওয়াকে যুগান্তকারী এবং গুরুত্বপূর্ণ রায় বলা হচ্ছে এতে নারীরা আসলে কী ধরনের স্বস্তিবোধ করছেন কিংবা কীভাবে এটি নারীকে বিয়ে প্রতিষ্ঠানের চুক্তির মধ্যে সমতার পরিসর দিল কতগুলো সুনির্দিষ্ট কারণ এর সঙ্গে জড়িত। প্রথমত. একজন মেয়ে কুমারী, বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত কি না; এটা একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। এ তথ্য কাবিননামায় লেখার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। কাবিননামায় ছেলেদের এ রকম কোনো কিছু লিখতে হয় না। শুধু নারীদের বেলাতেই এটি রাখা হয়েছে। তাই এটি একটি বৈষম্যমূলক কলাম।

কুমারী শব্দের মধ্য দিয়ে একজন নারীর বিয়ে-পূর্ব যৌন অভিজ্ঞতার ইতিহাস আছে কি না; সে বিষয়েও ইঙ্গিত করা হয়, কারণ কুমারী শব্দটি দিয়ে একভাবে ‘অবিবাহিত’ ইঙ্গিত করলেও আমরা জানি যে, এর নানা ধরনের সামাজিক অর্থ রয়েছে এবং একজন নারীকে বিচার করার জন্য সেটি নানা ধরনের সামাজিক অবস্থা তৈরি করতে পারে এবং যা নারীর জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। এর বাইরে বিয়ের মতো একটা চুক্তিতে ব্যক্তিগত তথ্যের নথিভুক্ত দলিলীকরণ মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে। এই রায়ের আগে গত ৬ জুলাই হাইকোর্টে এ রিটের শুনানি হয়। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিবের কাছে এ বিষয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মতামত জানতে চান।

হাইকোর্টের এ গুরুত্বপূর্ণ রায়ের আরেকটি বিশেষ দিক রয়েছে। চুক্তিপত্রে বিয়ে করতে সম্মত হওয়া দুজন সাবালক ব্যক্তির বৈবাহিক অবস্থা জানানোর ক্ষেত্রে সমতার জমিন রাখার জন্য রায় দেওয়া হয়েছে। সেজন্য কাবিননামার চার নম্বর কলামে আনা হয়েছে সংযোজন। পুরুষের জন্য ‘ক’ সংযুক্ত করে ছেলেদের ক্ষেত্রে বিবাহিত, বিপত্নীক ও তালাকপ্রাপ্ত কি না; তা সংযুক্ত করতে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আর এ সংযোজন কাবিননামায় বিয়ে-সংক্রান্ত ব্যক্তিগত নথি প্রকাশের ক্ষেত্রে বিয়ে চুক্তিবদ্ধ আগ্রহী দুজন ব্যক্তির। তবে মুসলিম বিয়ে চুক্তিতে আরেকটি কলাম রয়েছে; যেটিরও সংস্কার জরুরি। যেটি বিয়েবিচ্ছেদ সংক্রান্ত কলাম।

কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে রয়েছে তালাকের অধিকার প্রসঙ্গে। স্পষ্ট ভাষায় বলতে গেলে স্বামী স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেবেন কি না, সে প্রসঙ্গ। সেই কলাম অনুযায়ী স্বামী যদি স্ত্রীকে বিয়েবিচ্ছেদের ক্ষমতা অর্পণ করে থাকেন, তবেই সে ক্ষমতার বলে স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছেদ চাইতে পারেন এবং এ ক্ষেত্রে স্ত্রী আদালতের আশ্রয় ছাড়াই স্বামীকে তালাক দিতে পারেন। স্বামী যদি এ ঘরটি পূরণ না করেন অর্থাৎ কোনো কিছুই উল্লেখ না করেন অথবা কেবল সীমাবদ্ধ কিছু ক্ষেত্র উল্লেখ করে এই তালাক প্রদানের ক্ষমতা প্রদান করেন, তখন স্ত্রীর তালাক প্রদান করার ক্ষমতা সীমিত হয়ে যায়। তখন স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিতে চাইলে তাকে আদালতের আশ্রয় নিতে হয়। যেখানে দুই পক্ষেরই তালাক দেওয়ার সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে; সেখানে কাবিননামায় স্ত্রীর তালাকের অধিকার স্বামীর দেওয়া ক্ষমতার ওপর কেন নির্ভরশীল থাকছে এবং এটিও একটি বৈষম্যমূলক কলাম। অনেক সময়ই এই ঘরটি ফাঁকা রাখেন অনেক ছেলে, যার কারণে পরবর্তী সময় আদালতে গিয়ে বিয়েবিচ্ছেদের মামলা করতে হয় নারীকে।

এখন প্রশ্ন হলো, বিয়ে এবং বিচ্ছেদের অধিকার যদি সবার থাকে; তাহলে সেটি কেন পুরুষ কর্তৃক অর্পিত ক্ষমতাবলে হবে এটিও একটি অসম্মানজনক ধারা। অনেকেই হয়তো যুক্তি দেবেন যে, যেহেতু নারীর জন্য বিবাহবিচ্ছেদের অন্য সুযোগও রয়েছে; তাই কাবিননামায় থাকা এই কলাম হয়তো খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমি মনে করি, বিয়ে চুক্তিনামায় একসঙ্গে জীবন ভোগের প্রত্যাশী দুজন ব্যক্তির সমতা ধর্মীয় আইনের ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবেই ভিন্ন অর্থ বহন করে এবং এটি কাক্সিক্ষত। কারণ চুক্তিতে থাকা অসমতার জায়গাগুলো থেকে যদি আমরা নিজেদের সরাতে না পারি; তাহলে যাপিত জীবনে সেটি চর্চা করা অনেকের পক্ষেই কঠিন হয়ে পড়ে। চুক্তিতে থাকলেই সম্পর্কগুলো সমতার হবে হয়তো তাও নয়, তবুও চেষ্টা এবং চিন্তার জায়গাগুলো স্পষ্ট করে চেনা জরুরি।

সভ্যতার সংকট : সামাজিক অবক্ষয়
                                  

আবুল কাসেম ফজলুল হক


মানবজাতি আজ এক গভীর সভ্যতার সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে। মানুষের জীবন বিপর্যস্ত-বিকারপ্রাপ্ত। বর্তমান অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন ও রাশিয়া বৃহৎ শক্তিরূপে স্বীকৃত। এসব রাষ্ট্রের কোনোটাই গোটা পৃথিবীতে সুস্থ, স্বাভাবিক, প্রগতিশীল ব্যবস্থা প্রবর্তনের আগ্রহ বা ইচ্ছা নিয়ে কাজ করছে না। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইতালি, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও জাপান  জি-সেভেন নাম নিয়ে যেভাবে কাজ করছে তাতে সভ্যতার সংকট গভীরতর হচ্ছে। এরাই বিশ্বায়নবাদী সাম্রাজ্যবাদী। ন্যাটো বাহিনী ব্যবহৃত হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো দ্বারা মধ্যপ্রাচ্যের গণহত্যা ও আগ্রাসী যুদ্ধের কাজে। চীনের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী মহল থেকে ক্রমাগত প্রচার চালানো হচ্ছে। চীন মানবজাতির জন্য ক্ষতিকর কিংবা কল্যাণকর কিছু করছে কি?

দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে উন্নত বিশ্বব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য কোনো চিন্তা বা চেষ্টা খুঁজে পাওয়া যায় না। সরকারের বাইরেও কোথাও সে রকম কোনো চিন্তা ও চেষ্টা দৃষ্টিগ্রাহ্য নেই। দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, চিন্তাবিদদের মধ্যেও সে রকম কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না। বেশির ভাগ রাষ্ট্রে মানবীয়, মহৎ সবকিছু ভেঙে পড়েছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার ব্যবস্থাকে অনেক অর্থনীতিবিদ ভালো বলছেন। তবে দুনিয়ার অবস্থাকে ভালো করে তোলার জন্য তার অনুসরণে কোথাও কোনো প্রচেষ্টা দেখা যায় না।

সভ্যতা কী? সভ্যতার সংকটের লক্ষণ কী? সংকট থেকে উত্তরণের উপায়ই বা কী? মর্ম সন্ধান করতে গেলে দেখা যায়, সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে আসলে কোনো পার্থক্য নেই। বলা যায় সভ্যতাই সংস্কৃতি আর সংস্কৃতিই সভ্যতা। অবশ্য বিষয়গুলো যেহেতু চিন্তাগত সে জন্য এ ক্ষেত্রে নানা মত আছে। আমি বাস্তবসম্মত যুক্তিসংগত মতের কথা বলছি।

বাংলাদেশে এখন সভ্যতা নিয়ে কোনো চিন্তাভাবনা নেই। ‘সংস্কৃতি’ কথাটা ‘অপসংস্কৃতি’ অর্থে খুব চালু আছে। সরকার সংস্কৃতি দিয়ে জঙ্গিবাদ, মৌলবাদের মোকাবেলা করার ঘোষণা দিয়েছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ‘ধর্ষণের সংস্কৃতি’, ‘প্রশ্ন ফাঁসের সংস্কৃতি’, ‘জুলুম-জবরদস্তির সংস্কৃতি’, ‘মিথ্যাচারের সংস্কৃতি’, ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’, ‘ঘুষ-দুর্নীতির সংস্কৃতি’, ‘নারী নির্যাতনের সংস্কৃতি’ ইত্যাদি কথার ব্যাপক ব্যবহার। এগুলো লক্ষ্য করে বলা যায়, বাংলাদেশে অপসংস্কৃতিকেই এখন সংস্কৃতি বলা হয়। বর্বরতাকেই কি এখন সভ্যতা বলা হবে? যুদ্ধবিগ্রহ, অন্যায়-অবিচার, জুলুম-জবরদস্তি কি সভ্যতার পরিচায়ক?

যে গুণে মানুষ মানুষ হয়ে উঠেছে তা হলো তার সংস্কৃতি। বিবর্তন সংস্কৃতির কারণেই ঘটেছে। বিবর্তন সভ্যতার কারণেই ঘটেছে-এ কথাও বলা যায়। মানুষের সংস্কৃতি আছে, সভ্যতা আছে। মানুষেরই বিবর্তন আছে। অন্য কোনো প্রাণীর সংস্কৃতি নেই, সভ্যতা নেই-বিবর্তনও নেই। ৫০ হাজার বছর আগে গরু, মহিষ, ছাগল, কুকুর, বিড়াল, বাঘ, সিংহ যেমন ছিল এখনো তেমনি আছে; কিন্তু এই সময়ের মধ্যে মানুষ ভেতরে-বাইরে বদলেছে, মানুষ তার সামাজিক পরিবেশ ও প্রাকৃতিক পরিবেশও পরিবর্তন করেছে-নিজের জীবনযাত্রার অনুকূল করেছে। মানুষ এত কিছু করেছে যে সংক্ষেপে তার বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। সংস্কৃতি, সভ্যতা, প্রগতি আদর্র্শ-এসব মানুষের জৈবিক সামর্থ্যরে ফল। মানুষ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণীরই এ রকম সামর্থ্য নেই। তাদের সভ্যতা নেই, সংস্কৃতি নেই, প্রগতি নেই, আদর্শ নেই।

মানুষের সভ্যতার পরিচয় তার এমন সব কাজের মধ্য দিয়েই, যেগুলো অন্য কোনো প্রাণীরই নেই। যেমন-আগুনের ব্যবহার, পানির ব্যবহার। মানুষ জলবায়ু ও প্রকৃতিকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগায়। মানুষ পরিবার, প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও রাষ্ট্র গঠন করে। মানুষ বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। প্রত্যেক রাষ্ট্রে আছে প্রশাসনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা ইত্যাদি। মানুষের আছে প্রগতিশীল জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য। মানুষের আছে রাজনীতি ও অর্থনীতি। এসবেরই মর্মে আছে নৈতিক চেতনা-ভালো-মন্দ, সুন্দর-কুৎসিত ও ন্যায়-অন্যায়ের বোধ। মানুষের আছে বিবেক। বিবেক আর সত্য, ন্যায় ও সুন্দর হলো সভ্যতার মর্মগত অবলম্বন। যেসব মানবীয় কাজের ও সৃষ্টির কথা এখানে উল্লেখ করলাম এসবই সভ্যতার অবলম্বন-এসবের মধ্য দিয়েই মানুষের সভ্যতার পরিচয়।

যখন বিবেক দুর্বল হতে থাকে যখন নৈতিক চেতনা-ন্যায়-অন্যায়বোধ, সৌন্দর্যবোধ, ভালো-মন্দবোধ দুর্বল হতে থাকে, সম্মিলিত জীবনের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষ মনোযোগ হারাতে থাকে, মানুষ ব্যক্তিতান্ত্রিক-individulistic, egocentric, egoistic হয়ে পড়ে, তখনই সভ্যতার সংকট দেখা দেয়। মানবীর সব কিছুতেই তখন দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। অবস্থা এমন হয় যাকে বলা হয় সভ্যতার সংকট।

বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই যুদ্ধবিগ্রহ বেড়ে গেছে এবং গণহত্যা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বিশ্বব্যবস্থা কল্যাণকররূপে থাকেনি। আগুন-পানির ব্যবহার, প্রকৃতির ব্যবহার, বৃহৎ শক্তিগুলো এমনভাবে করে চলছে যে প্রকৃতি মানুষের প্রতিকূল হয়ে পড়েছে। উষ্ণতা বাড়ছে। সমুদ্রে পানির উচ্চতা এমনভাবে বেড়ে চলছে যে অবস্থার উন্নতির ব্যবস্থা না করা হলে অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবীর স্থলভাগের এক-তৃতীংয়াশ পানির নিচে চলে যাবে। পরিবার, প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, রাষ্ট্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কায়েমি স্বার্থে প্রশাসনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থাকে নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ও শিল্প-সাহিত্যের অপব্যবহার বর্বরতার সহায়ক হচ্ছে। দুই বিশ্বযুদ্ধের কালে প্রশ্ন উঠেছিল-‘বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপও’, ‘মানুষের কি কোনো ভবিষ্যৎ আছে?’ রাজনীতি-অর্থনীতি ব্যবহৃত হচ্ছে কায়েমি স্বার্থে। সাধারণ মানুষ ঘুমন্ত। সাধারণ মানুষ সব রকম অন্যায়-অবিচার, জুলুম-জবরদস্তি ও মিথ্যাচারকে মেনে নিয়ে চলছে। সমাজ, সংগঠনে, প্রতিষ্ঠানে ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় যারা কর্তৃত্ব করছে তাদের বলা যায় অন্ধকারের শক্তি। এসবই সভ্যতার সংকটের  পরিচায়ক।

মানবজাতির জীবনে এ এক অন্ধকার যুগ। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির জীবনে অন্ধকার যুগের অবস্থা বিভিন্ন রকম। বিভিন্ন জাতির ইতিহাস বিভিন্ন; খুব স্বাভাবিকভাবেই বর্তমান অবস্থাও এক রকম নয়। সংকটের সমাধানের উপায়ও বিভিন্ন রকম হবে। তবে কিছু বিষয়ে সব জাতির মধ্যে মিলও আছে। সংকটের সমাধানের চেষ্টায় সর্বজাতিক ঐক্যের দরকার আছে। তবে সর্বজাতিক ঐক্যের জন্য কোনো জাতিরই নিজের সংকটের সমাধান স্থগিত রাখা কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকা উচিত নয়। নিজের সমস্যা নিয়ে প্রত্যেক জাতিকে সমাধানের ও উন্নতির প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বর্তমানে যে অবস্থা চলছে তাতে বিশ্বব্যাংক ও তার সহযোগী শক্তিগুলোকে দেখা যাচ্ছে বিশ্ব সরকারের ভূমিকা পালন করছে। জাতিসংঘ কী করছে জি-সেভেনের হয়ে। চীন ও রাশিয়া কখনো কখনো ভেটো পাওয়ার প্রয়োগ করে কোনো কোনো অন্যায় হতে দিচ্ছে না। তবে তারা সাধারণভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পতাকা নিয়ে-বিশ্ববাসীর সমর্থন নিয়ে চলছে না।

বাংলাদেশ তার নিজের কারণে এবং বৈশ্বিক কারণে সভ্যতার চরম সংকটে বিপতিত। বাংলাদেশের রাজনীতির ও রাজনৈতিক দলের গড়ে ওঠার যে সম্ভাবনা ছিল তা নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। ১৯৮০-র দশকের শুরু থেকে এখনো চালানো হচ্ছে নিঃরাজনীতিকরণের ও নিঃরাষ্ট্রকরণের কার্যক্রম। গত প্রায় ৪৮ বছর এখানে রাষ্ট্র গড়ে তোলা হয়নি। এখনো রাষ্ট্র গড়ে তোলার প্রচেষ্টা নেই। উচ্চ ও উচ্চ মধ্য শ্রেণির লোকেরা তাঁদের সন্তানদের বিদেশে নাগরিক করে চলছেন। প্রধান দুই রাজনৈতিক দল দেশের রাজনীতিকে করে ফেলেছে বৃহৎ শক্তিবর্গের স্থানীয় দূতাবাসগুলোর অভিমুখী, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ডেস্ক অভিমুখী। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা রাষ্ট্রগঠনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

বিচারব্যবস্থা দুর্গত। প্রশাসনব্যবস্থা গণবিরোধী ও ঘুষ-দুর্নীতিতে সম্পূর্ণ বিকারপ্রাপ্ত। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ইত্যাদি কথা সংবিধানে লেখা আছে, বাস্তবে কোনোটাই অবলম্বন করা হচ্ছে না। ১৯৮০-র দশকের শুরু থেকে ক্রমাগত বলা হচ্ছে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথা। এর মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন অরাজনৈতিক নির্দলীয় সরকার গেছে, জরুরি অবস্থা গেছে। অবস্থার অবনতি থেকে আরো অবনতি চলছে। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সব প্রতিষ্ঠান ভেতর থেকে নষ্ট হয়ে গেছে। যেকোনো ধরনের আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার উপযোগী কোনো রাজনৈতিক দল দেশে নেই। পরিবারব্যবস্থা দারুণভাবে বিপর্যস্ত। বিবাহবিচ্ছেদ, পরকীয়-পরকীয়া, স্বামী-স্ত্রীতে সন্দেহ ও অবিশ্বাস, স্বামী কর্তৃক স্ত্রী হত্যা, স্ত্রী কর্তৃক স্বামী হত্যা ক্রমবর্ধমান। ভগ্ন পরিবারের সন্তানদের চরম দুর্গতি বেড়ে গেছে এবং বেড়ে চলছে। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক অনেক শিথিল হয়েছে এবং আরো শিথিল হচ্ছে। ধর্ষণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

বিভিন্ন সমস্যার প্রতিকারের জন্য আলাদা আলাদাভাবে নিতান্ত গতানুগতিক চিন্তা ও মত প্রকাশ করা হচ্ছে। শুধু বিচার ও শাস্তি দ্বারা, আইন-কানুনের কঠোরতা দ্বারা সমস্যার সমাধানের কথা বলা হচ্ছে। এতে যেমন চলছিল, তেমনি চলছে, অবস্থার একটুও উন্নতি হচ্ছে না। রাষ্ট্রব্যবস্থার পুনর্গঠনের বৃহত্তর কর্মসূচি ও কার্যক্রম দরকার। যে সভ্যতার সংকট ও সামাজিক অবক্ষয় বাংলাদেশে চলছে তার প্রতিকারের জন্য নতুন চিন্তা, নতুন নেতৃত্ব ও নতুন কাজের ধারা দরকার। সে বিষয়ে অন্য কোনো দিন আলোচনা করব। 

প্রবৃদ্ধি অর্জনে আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্ব
                                  

রেজাউল করিম খোকন


টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে আঞ্চলিক বাণিজ্য বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ানো একান্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়ানো গেলে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বাড়ানো সম্ভব। বিশে^র বিভিন্ন অঞ্চলে আঞ্চলিক বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটলেও আমাদের এ অঞ্চলে তার পরিমাণ খুবই কম। শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করার সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে। আঞ্চলিক বাণিজ্য নিয়ে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের সমস্যার মোকাবিলা করছে।

বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ মোটামুটি ভালো করলেও আঞ্চলিক বাণিজ্যে মার খাচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের বাণিজ্য খুবই নাজুক অবস্থার মধ্যে রয়েছে। এর জন্য বাংলাদেশ যতটা না দায়ী, তারচেয়ে দায়ী প্রতিবেশী শক্তিশালী দেশ। তারাই এ অঞ্চলের বাণিজ্য নিজেদের দখলে রাখতে এ অঞ্চলের অন্য কোনো দেশকে কোনোভাবে উঠতে দিচ্ছে না। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাণিজ্য যেমন খুবই নিম্ন অবস্থানে রয়েছে; তেমনি বাংলাদেশের বাণিজ্যেও রয়েছে হতাশাব্যঞ্জক অবস্থা। বর্তমানে বিশ্বে বাংলাদেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ৮৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। অথচ দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের বাণিজ্যের পরিমাণ মাত্র ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের। বিশশ্ব যেখানে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হচ্ছে, সেখানে গত ২৫ বছরে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের বাণিজ্যের পরিমাণ ২৩ বিলিয়ন ডলারে আটকে আছে। অথচ কিছু বাণিজ্য বাধা দূর করতে পারলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বাণিজ্য তিন গুণ বাড়ানো সম্ভব। এটা বর্তমান আঞ্চলিক বাণিজ্য ২৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ৬৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা যায় অনায়াসেই। মূলত বেশ কিছু কারণে সৃষ্ট বাধার জন্য বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়ছে না। দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চার ধরনের বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।
এগুলো হচ্ছে- উচ্চ শুল্ক, আধা শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, কানেকটিভিটি খরচ এবং সীমান্তে আস্থার সংকট। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সাফটা চুক্তি রয়েছে। ফলে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কোনো শুল্ক থাকার কথা নয়। অথচ এ অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি শুল্ক রয়েছে। সরাসরি শুল্কের বাইরেও আছে আধা বা প্যারা ট্যারিফ। ২০০৪ সালে যখন সাফটা (সাউথ এশিয়ান ফ্রি ট্রেড এরিয়া) চুক্তি হয়, তখন বিশ^ বাণিজ্য দক্ষিণ এশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের অংশগ্রহণ ছিল ৫ শতাংশ। সাফটা করার উদ্দেশ্যই ছিল এ অঞ্চলের বাণিজ্য বাড়ানো। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, সাফটা চুক্তির পর দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য না বেড়ে বরং কমে গেছে। বর্তমানে তা কমে হয়েছে আড়াই শতাংশ।

বিশ্ব ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিশ্ব বাণিজ্যে এশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের অবদান ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে ইউরোপের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের অবদান ৬৩ শতাংশ। অথচ ১৯৪৭ সালের আগে এটি ছিল ৩০ শতাংশ। একটা বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, এ অঞ্চলের গড় শুল্কহার অন্যান্য অঞ্চলের দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য ব্যয়ও সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ পৃথিবীর অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে এ অঞ্চলে আমদানিতে সবচেয়ে বেশি বাধা দেওয়া হয়। দেশগুলো উচ্চহারে নিয়ন্ত্রণমূলক ও সম্পূরক শুল্কারোপ করে এ অঞ্চলে বাধা সৃষ্টি করে রাখছে। পাশাপাশি সংবেদনশীল পণ্যের তালিকায় ফেলা হয়েছে এক-তৃতীয়াংশ পণ্যকে। ফলে পণ্যের সংখ্যা কমে গিয়ে বাণিজ্যের পরিমাণও কমছে। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এটা সুস্পষ্ট যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বাধা দূর করতে পারলে এ অঞ্চলের বাণিজ্য তিন গুণ বাড়ানো সম্ভব। আসলে বিশ্বায়নের যুগে এককভাবে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব। বাণিজ্য বাধা দূর করে দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যের আকার তিন গুণ বাড়ানো সম্ভব। বাস্তবতার নিরিখে ক্রমেই আঞ্চলিক বাণিজ্যে পরিবর্তন আসছে। যেমন সীমান্তহাট চালুর ফলে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে স্বল্প আকারে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হলেও মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ছে। এতে সম্পর্কের উন্নতি ঘটছে। সীমান্ত এলাকার মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা তৈরি হচ্ছে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে বর্তমানে বিভিন্নমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। বাস্তবতার আলোকে গৃহীত পদক্ষেপগুলো কাজ দিতে শুরু করেছে। টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে অবশ্যই প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। আসলে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাণিজ্য এখনো বাজারের ওপর নির্ভর করছে না। এখানে মূলত কাজ করছে রাজনীতি। এ ছাড়াও নিরাপত্তা, আমলাতন্ত্র বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করছে। অঞ্চল বাড়াতে এশিয়ান হাইওয়ে ও ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে শক্তিশালী কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণে তা বন্ধ হয়ে গেছে। আঞ্চলিক যৌথ উদ্যোগের সাফল্য এবং ব্যর্থতা যা হয়েছে তা রাজনৈতিক কারণেই হয়েছে।

ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটানে নিরাপত্তা বড় বিষয়। এসব দেশে রাজনীতির ভূমিকাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ, এজন্য আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বাজারগুলোতে সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে বাণিজ্য অনেকটা সহজ হয়ে উঠবে। ভ্যালু চেইন সৃষ্টি করা গেলে এক দেশের পণ্যের প্রতি অন্য দেশের ব্যবসায়ীরা আগ্রহী হবেন। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্য রফতানির সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন হওয়ায় এসব রাজ্যে পণ্য পরিবহনেও বিদ্যমান ব্যবস্থা অনেকটা অনুকূল। যে কারণে এসব রাজ্যে বাংলাদেশি পণ্য রফতানির মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক ভারসাম্য অনেকটা বজায় রাখা সম্ভব।

প্রতিবেশী দেশ নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগ লেনদেন আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে। নেপালে বাংলাদেশের পণ্যসামগ্রী রফতানি আয় বেড়েই চলেছে। আর হ্রাস পাচ্ছে আমদানি উভয় দেশের সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতি বিশেষ করে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধিসহ দূরদর্শী কিন্তু পদক্ষেপের ফলে নেপালের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এখন বাংলাদেশের অনুকূলে চলে এসেছে। নেপালে বাংলাদেশের উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের ভোগ্যপণ্য, খাদ্যদ্রব্য, শৌখিন, গৃহস্থালি পণ্য ও নির্মাণসামগ্রীর বিরাট চাহিদা রয়েছে, নেপাল অনেক দিন ধরেই আমদানিতে একচেটিয়া ভারতনির্ভরতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে নেপালে বাংলাদেশের রফতানি বাজার বিস্তৃতির সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে দিনে দিনে। এখানে সুযোগ রয়েছে রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণের। বিপুল চাহিদার তুলনায় নেপালে বাংলাদেশের রফতানি বাজার এখনো অনেকটা সীমিত রয়ে গেছে।

প্রাকৃতিকভাবে বন্দর সুবিধাবঞ্চিত ভূমি পরিবেষ্টিত (ল্যান্ড লক্ড) দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ চট্টগ্রাম ও মোংলাবন্দর সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রসারিত করতে পারে। বাংলাদেশ তার নিজের বন্দর ব্যবহার করে নেপালে অনেক পণ্য পুনঃরফতানি করতে পারে। বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য সিরামিকস সামগ্রী, ওষুধ, আসবাবপত্র, পোশাকসামগ্রী প্রভৃতি নেপালে রফতানি হচ্ছে। নেপাল থেকে আমদানি করা হচ্ছে ডাল, মসলাসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য।

নেপাল, মিয়ানমার, ভুটান, ভারতের কয়েকটি সীমান্তবর্তী রাজ্য আমাদের নিকট-প্রতিবেশী। দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে হলে প্রথমেই দরকার এসব দেশ এবং রাজ্যের সঙ্গে কানেকটিভিটি বৃদ্ধি করা। বিশেষ করে চার দেশীয় (ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটান) প্রস্তাবিত সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হলে বাংলাদেশ থেকে এসব দেশে রফতানির পথ সুগম হবে এবং রফতানির পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়িয়ে বাংলাদেশ নেপালকে ট্রানজিট সুবিধা দিতে পারে। বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়লে দুই দেশের টেকসই উন্নয়নের পথ সুগম হবে।

প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল, মিয়ানমার ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য প্রসারের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের উৎপাদিত ও প্রক্রিয়াজাত বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য, পানীয়, রাসায়নিক দ্রব্য, সিরামিকস সামগ্রী, ওষুধ, আসবাবপত্র, স্টিল ও আয়রন সামগ্রী, সাবান, মেলামাইন, প্লাস্টিকজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, টেরিটাওয়েল ও পোশাক সামগ্রী, খেলনা, পাটজাত দ্রব্য, বৈদ্যুতিক সামগ্রী, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পপণ্য, বিভিন্ন শৌখিন দ্রব্য, মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিকস সামগ্রী, আইটি সামগ্রী ইত্যাদির বিরাট বাজার রয়েছে এসব দেশে। আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়ে বাংলাদেশ সমৃদ্ধির নতুন সোপানে উন্নীত হতে পারে দ্রুত।
লেখক : ব্যাংকার ও কলাম লেখক

আরো কমেছে ধানের দাম
                                  

আব্দুল হাই রঞ্জু

বোরো ধানের কাটা মাড়াই শেষ। এখন চলছে আগামী আমন মৌসুমের ধান চাষাবাদের প্রস্তুতি। এ বছর বোরো ধানের ন্যায্যমূল্য পাননি কৃষক। ফলে আসন্ন আমন মৌসুমের কৃষি চাষাবাদের খরচ মেটানো কৃষকের পক্ষে কষ্টসাধ্যই হবে। অথচ কৃষকদের নিরন্তন প্রচেষ্টায় দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা অনেকাংশেই নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও ভালো নেই তারা। মূলত ধান কাটা মাড়াইয়ের ভরা মৌসুমে বাড়তি সরবরাহের কারণে ধানের দাম একটু কমই থাকে। কৃষকের গোলায় ধান ওঠার পর ধানের দাম কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এ বছরের চিত্র সম্পূর্ণই ভিন্ন। ধান কাটা মাড়াইয়ের ভরা মৌসুমে কৃষক প্রতি মণ ধান ৫শ’ টাকার বেশি দরে বিক্রি করতে পারলেও এখন গোলার ধান বিক্রি হচ্ছে ৫শ’ টাকার নিচে। বাস্তবতা হচ্ছে কৃষিপণ্যের ফলন বেশি হলেই উপযুক্ত মূল্য সঙ্কটে পড়তে হয় চাষিদের। এ বছর বোরো মৌসুমেও বাড়তি ফলনের কারণে মূল্য সংকটে পড়তে হয়েছে।

এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭ লাখ টন ধান বেশি উৎপাদন হয়েছে। কৃষি অধিদফতর বোরো মৌসুমে ৪৮ লাখ ৪২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বাড়তি জমিতে চাষাবাদ হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ধান উৎপাদন হয়েছে। খোদ কৃষি বিভাগ ও খাদ্য বিভাগের হিসাবে প্রতি কেজি ধান উৎপাদনের খরচ ২৪ টাকা নির্ধারণ করে সরকারিভাবে প্রতি কেজি ধান ২৬ টাকায় কেনার ঘোষণা দিলেও প্রকৃত অর্থে বোরো ধান ১৭-১৮ টাকা কেজিতে চাষিদের বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে ধান চাষিদের প্রতি কেজি ধানে লোকসান গুনতে হচ্ছে ৬/৭ টাকা। প্রতি কেজিতে যদি ধান চাষিরা ৬/৭ টাকা লোকসান গোনে, যা মণ প্রতি ২৪০ থেকে ২৮০ টাকায় গিয়ে ঠেকে।

সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয় চলতি বোরো মৌসুমে ২৬ টাকা কেজি দরে মাত্র দেড় লাখ টন ধান ও চাল কল মালিকগণের নিকট থেকে প্রতি কিজে ৩৬ টাকা করে ১০ লাখ টন চাল কেনার ঘোষণা দেয়। খাদ্য অধিদফতর বিপুল পরিমাণ চাল কিনলেও প্রকৃত অর্থে ধান চাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয়নি। মূলত সরকার ধান চাষিদের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত ও আপৎকালীন খাদ্য মজুদ গড়ে তুলতে অভ্যন্তরীণভাবে ধান চাল সংগ্রহ করে থাকে। এ বছরও এর কোনো ব্যত্যয় হয়নি। দেড় লাখ টন ধান কেনার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা, তালিকা প্রণয়ন, আবার কোথাও কোথাও লটারির মাধ্যমে কৃষকের তালিকা চূড়ান্ত করতে মাত্রাতিরিক্ত সময় ক্ষেপণ করা হয়েছে। ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে মন্থর গতির কারণে এর প্রভাব বাজারে পড়েনি। সরকার চায় ধান চাষিদের উপযুক্ত মূল্য যেন নিশ্চিত হয়, যা সফল করতে খাদ্য মন্ত্রণালয় আরো অতিরিক্ত ২ লাখ পঞ্চাশ হাজার টন ধান কেনার ঘোষণা দিলেও কার্যত বাজারে তেমন কোনো প্রভাব পড়ছে না।

এর মূল কারণ হলো মন্থর গতিতে ধান সংগ্রহের কৌশল অবলম্বন। মন্থর গতির এই কৌশলে ধান সংগ্রহ করলে প্রকৃত অর্থে উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। প্রয়োজন ধান কাটা মাড়াই মৌসুমের শুরুতে সরকারকে হাট-বাজার, গ্রামেগঞ্জে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ধান কেনার উদ্যোগ নেয়া। সরকারকে একদিকে ধান কিনতে হবে এবং সে ধান চাল কল মালিকের মাধ্যমে ছাঁটাই করার উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য বর্তমান ছাঁটাই রেট পরিবর্তন করে যৌক্তিক দর নির্ধারণ করতে হবে। তাহলে কম বেশি সকল চাল কল মালিকগণই শতভাগ জামানত প্রদান করে ধান ছাঁটাইয়ে অংশগ্রহণ করবে। এতে বর্তমান স্থান সংকুলানের অভাবে যেমন সরকার ইচ্ছা থাকলেও অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহের ধান বেশি পরিমাণ কিনতে পারে না, তখন আর সে সংকট থাকবে না। ফলে কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য অনেকাংশেই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

অবশ্য কৃষমন্ত্রী ডা. আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, আমি কথা দিচ্ছি, আগামী মৌসুম থেকে ধান চাষিরা ধানের নায্যমূল্য পাবেন। আমরাও আশা করছি, কৃষিমন্ত্রীর এ ঘোষণার যেন বাস্তব প্রতিফলন হয়। তবে শংকা থেকেই যায়- কারণ আমাদের দেশে দায়িত্বশীলরা জনকল্যাণের কথা যেভাবে জোরের সঙ্গে উচ্চারণ করেন, বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার বাস্তব প্রতিফলন হয় না বা হতে দেয়া হয় না। যেহেতু কৃষিবিদ ডা. আব্দুর রাজ্জাক একজন সফল খাদ্যমন্ত্রী, সেহেতু আমরা মনে করি, প্রকৃত অর্থে ধান চাষিদের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের পাশাপাশি গোটা দেশে গড়ে ওঠা একমাত্র চাল কল শিল্প রক্ষায়ও কৃষিমন্ত্রী যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন। আমরা চাই, ধান চাষিদের ধানের ন্যায্যমূল্য যেমন নিশ্চিত করতে সরকারকে বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তেমনি কৃষিভিত্তিক চাল কল শিল্প রক্ষায় হাসকিং মিলগুলোকে আধুনিকায়নেরও উদ্যোগ নিতে হবে।

তাহলে চাল কলের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার নারী ও পুরুষের কর্মসংস্থানের পথ সুগম হবে। পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। ধান চাষি, চাল কল শিল্পের স্বার্থ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কারণ ধান চাষিরা উপযুক্ত মূল্যের অভাবে ধান চাষে আগ্রহ হারালে একদিকে যেমন খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ধানের অভাবে চাল কল শিল্প টিকে রাখাও কঠিন হবে। সঙ্গত কারণে ধান চাষিদের স্বার্থ রক্ষা করে চাল কল শিল্পকে বাঁচানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

অবশ্য সরকার কৃষি উন্নয়নে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে প্রণোদনা ও প্রতিবছর কৃষিতে ভর্তুকি দিয়ে থাকে। গত ২০১৮ সালে প্রান্তিক পর্যায়ের ৬ লাখ ৯০ হাজার ৯৭০ জন কৃষকের জন্য ৭৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকার প্রণোদনা প্রদান করে। এসব প্রণোদনার টাকা গম, ভুট্টা, সরিষা, চীনাবাদাম, বিটি বেগুন, বোরো, শীতকালীন মুগ ও গ্রীষ্মকালীন তেল চাষের জন্য চাষিদের দেয়া হচ্ছে। এ বছর বোরো চাষের জন্য ৭১ হাজার ৭০০ জন কৃষককে নগদ অর্থ, বীজ, সারের ওপর প্রণোদনা দেয়া হবে। মূলত সরকারি সহায়তার কারণে প্রতিনিয়তই খাদ্য শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শুধু ধানই নয়, এর পাশাপাশি সবজি চাষেও বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। দেশে উৎপাদিত শাক-সবজি দিয়ে দেশীয় চাহিদা পূরণের পর উদ্বৃত্ত সবজি এখন বিদেশে রফতানিও হচ্ছে। বিশেষ করে আলু চাষে বৈপ্লবিক এক পরিবর্তন এসেছে। এখন যে পরিমাণ আলু উত্তরাঞ্চলসহ গোটা দেশেই উৎপন্ন হচ্ছে, যা দিয়ে দেশীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রফতানি করার মতো যথেষ্ট সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু কিছু আলু রফতানির সুযোগ থাকলেও কাক্সিক্ষত পর্যায়ে রফতানি করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনেক সময়ই আলুর চাষ করে আলু চাষিদেরও লোকসান গুনতে হয়। সম্ভাবনাময় এই সবজির চাষাবাদ বৃদ্ধি করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কারণ আমাদের দেশে এখন জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে দেশের নদ-নদীগুলো শুকিয়ে বিশাল বিশাল চরাগুলোর সৃষ্টি হচ্ছে। এসব চরাঞ্চলে এখন আলুসহ নানা ধরনের সবজি উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। উৎপাদিত সবজির উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হলে বাড়তি সবজি চাষ করে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব।

উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশ থেকে যেহারে উৎপাদিত সবজি বিদেশে রফতানি হচ্ছে, চাষাবাদের এ ধারা অব্যাহত থাকলে সবজি রফতানির পরিমাণও বেড়ে যাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। অতি সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী ধান চাষিদের ধানের উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করতে চাল রফতানির ঘোষণা করেছেন। বাস্তবে যদি ভালো মানের চাল বিদেশে রফতানি করা যায়, তাহলে বর্তমানে ধান চাষিদের যে দুর্দশা তা অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

উপসংহারে শুধু এটুকুই বলতে চাই, সঠিক ও সময়োচিত সিদ্ধান্ত সরকারইে নিতে হবে। তা না হলে কৃষকের স্বার্থের কথা বলতে বলতে হয়তো মুখে ফেনা তোলা সম্ভব হবে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। আর কৃষকের উৎপাদিত ন্যায্যমূল্য নিশ্চত করতে না পারলে ধান চাষিরা ধান চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে। তাহলে আর যাই হোক, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা যতটুকু নিশ্চিত করা হয়েছে, তা অনেকাংশেই বিঘিœত হতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সরকারের ৬ মাস : একটি পর্যালোচনা
                                  

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী


গত ৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই মেয়াদের সরকার গঠন করে যাত্রা শুরু করেন। নতুন এই মন্ত্রিসভায় অনেক নতুন মুখ ছিলেন অনেক পুরাতন নেতা বাদ পড়েছেন। তা নিয়ে দেশে দুধরনের মত ছিল। এক. এত নতুনদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী পারবেন তো? দুই. পুরাতনদের অভিজ্ঞতা থেকে নতুন মন্ত্রিসভা বঞ্চিত হচ্ছে না তো? দুই প্রশ্নেরই উত্তর আমরা ধীরে ধীরে পেতে শুরু করেছি। এরই মধ্যে সরকারের ৬ মাস পূর্ণ হয়েছে। তবে এই নিয়ে খুব বেশি আলাপ-আলোচনা হয়নি। তেমন কিছু আলোচনা না হলেও এই ৬ মাসে সরকারের নতুন-পুরাতন মন্ত্রীদের পারফরমেন্সের অভিজ্ঞতা তো প্রতিদিনই কম-বেশি জানা যাচ্ছে। সেই হিসেবে বিগত ৬ মাসের সরকারের মন্ত্রিসভায় কার্যক্রমের একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা তুলে ধরা হলে আশা করি খুব বেশি প্রশ্নবোধক হবে না।

এই মেয়াদে সরকারের যারা দায়িত্ব পেয়েছেন তাদের কয়েকজন গত ৬ মাসের তাদের মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব সম্পর্কে এক ধরনের ধারণা দেশবাসীকে দিতে পেরেছেন। কয়েকজন মন্ত্রী এখন অনেকেরই আলোচনায় উঠে এসেছেন। মজার বিষয় হলো এদের কেউই আগে মন্ত্রী ছিলেন না, এমনকি দুয়েকজন সংসদ সদস্যও ছিলেন না। কিন্তু তারা দায়িত্ব লাভের পর এমন কিছু কাজে হাত দিয়েছেন যা অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা তো দূরে থাক আওয়ামী লীগ সরকার পূর্ববর্তী অন্য কোনো সরকারের কাছ থেকে পাওয়া কোনো নজির স্থাপিত হয়নি।

এ প্রসঙ্গে বলা যায় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এডভোকেট শ ম রেজাউল করিম ঢাকা শহরে অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে যেভাবে আইনসম্মতভাবে মাঠে নেমেছেন তা সবারই দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে। ঢাকা শহরের বেশকিছু ইমারতের অগ্নিসংযোগ ঘটেছে। তাতে নিরীহ প্রাণের হানি ঘটেছে। অতীতেও এ ধরনের অগ্নিদগ্ধ হয়ে মানুষ মারার ঘটনা ঘটেছে। সেগুলোতেও তদন্ত হয়েছে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এবার এসব অগ্নিসংযোগ সংক্রান্ত দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেছে পুরাতন ঢাকা এবং অভিজাত ঢাকা বলে পরিচিত এলাকাসমূহে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বিশাল ইমারতের ভিতরে অগ্নুৎপাতের মতো নানা দাহ্য বস্তু একাকার হয়ে আছে, ইমারতগুলো বেশিরভাগই বিল্ডিং কোড না মেনে নির্মিত হয়েছে। এর সঙ্গে রাজউক এবং ভবন মালিকদের দুর্নীতিতে একাত্ম হয়েই এমন ঢাকা শহর আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে যেখানে যে কোনো সময় যে কোনো স্থানে ইমারত ধ্বংস হওয়া, আগুনে পুড়ে মানুষ মরা ইত্যাদি ঘটনা ঘটতে পারে। এ বিষয়টি মন্ত্রী মহোদয় খুব দৃঢ়তার সঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছেন। ফলে অপরাধী চক্র তাদের অপরাধকর্মের জন্য বিশেষ কোনো ফন্দিফিকির এঁটেও খুব একটা পার পেয়ে যাবেন এমনটি মনে হচ্ছে না। গণপূর্তমন্ত্রী আরো কিছু দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার মন্ত্রণালয়ের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

এতে সব মহলের কাছেই তাকে একজন সাহসী এবং দৃঢ়চেতা মন্ত্রী হিসেবে মানুষের কাছে মনে হয়েছে। তিনি নিজে একজন আইনজীবী। এক সময় আইনজীবীদের বড় সংগঠনের বড় দায়িত্বও পালন করেছেন। ফলে তিনি আইনের প্রতি সচেতন থেকে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন, কোনো রকম ফাঁকফোকর থাকবে না, অপরাধীরা বের হয়ে আসবে না- এমনটি সমাজ সচেতন মানুষ তার কাছ থেকে আশা করছেন। আমরা আশা করব তিনি সেই আশা বাস্তবায়নে দৃঢ়ভাবে কাজ করে যাবেন। ঢাকা শহরের চারপাশে নদী দখলের বিষয়টি বহুল আলোচিত বিষয়। বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালুচর নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা গেড়ে দীর্ঘদিন থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য করে আসছে। নদীগুলো তাদের দখলে চলে গেছে। পরিবেশবাদীরা অনেক আন্দোলন করেছেন, কাজ হয়নি। কিন্তু নৌপ্রতিমন্ত্রী পদে খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি দায়িত্ব নেয়ায় অবস্থান পাল্টে যেতে থাকে। খালিদ চৌধুরী বয়সে বেশ তরুণ। তবে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় তিনি বেশ এগিয়ে ছিলেন- এটি গণমাধ্যমে তার রাজনৈতিক টকশোর আলোচনাতে অনেকেই বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি যখন দায়িত্ব পেয়েছিলেন তখন হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেননি যে, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, নারায়ণগঞ্জ ইত্যাদি নদী তীরবর্তী অঞ্চলে যেসব মহাশক্তিধর ব্যক্তি নদীর জায়গা দখল করে দিব্যি বসে আছেন তাদের কেশ স্পর্শ করতে পারবেন কিনা, স্পর্শ করলেও সে পর্যন্ত ধরে রাখতে পারবেন কিনা এমন আশঙ্কা প্রায় সবাই করেছেন। কিন্তু গত ৬ মাসে তিনি তো এই অভিযানে বলা চলে পুরোপুরি সফল হয়েছেন। আমরা আশা করব নৌপ্রতিমন্ত্রী সারাদেশের ভূমিদস্যুদের দ্বারা যেসব নদী, নদীবন্দর, জলাশয় দখল হয়ে আছে সেগুলোকেও উদ্ধার করার জন্য বাকি সাড়ে চার বছর নিরলসভাবে কাজ করে যাবেন।

সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আব্দুল্লাহ বিশেষ একটি জায়গা করে নিতে পেরেছেন। তিনি সংসদ সদস্য নন টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রী পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। এর আগে হেফাজতের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব ও ভুল বোঝাবুঝি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে তার একটি ভূমিকা ছিল বলে অনেকে জানতেন। কিন্তু তিনি ততটা সম্মুখে ছিলেন না। যদিও তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে অনেকদিন থেকেই জড়িত আছেন। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি যে কাজটি বিশেষভাবে করতে পেরেছেন বলে সবাই মনে করছেন তা হচ্ছে হজে যাওয়া-আসা নিয়ে হাজিদের বিড়ম্বনা, হাব সদস্যদের নানা ধরনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি নিয়ে প্রতি বছর একটি অনাকাক্সিক্ষত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে সবাইকে যেতে হতো- সেই দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূর করার উদ্দেশ্যে তিনি এবং তার মন্ত্রণালয় এবার সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটা চুক্তিতে উপনীত হতে পেরেছেন যার মাধ্যমে এবার হজের বিষয়টি অনেক বেশি সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হওয়ার নজির স্থাপিত হয়েছে। এমনটি অনেকেই আগে আশাও করতে পারেনি যে, এই জটিলতা থেকে আমরা এত দ্রুত বের হয়ে আসতে পারব। ই-ভিসা পদ্ধতি, ঢাকা বিমানবন্দরে উভয় দেশের ইমিগ্রেশন সমাপ্তকরণ, টিকেট নিশ্চিতকরণ, সৌদি আরবে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি বিষয়গুলোকে একটি প্যাকেজে এনে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী যেভাবে এবার হজের কাফেলা সুশৃঙ্খল করেছেন সেটি সব মহলেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, প্রশংসারও দাবি করছে। আমরা আশা করব ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী বাকি সাড়ে চার বছর ধর্ম মন্ত্রণালয়কে সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে পারবেন। আমরা এটাও আশা করব দেশের অন্য ধর্ম সম্প্রদায়রাও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ভালোভাবে সম্পন্ন করা এবং তাদের উপাসনালয়গুলো সুরক্ষিত থাকাসহ সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতভাবে পাবে।

সড়ক ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আগেও এই পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এবারো তিনি মন্ত্রী হিসেবে কাজ করছেন। মধ্যখানে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে দীর্ঘদিন বিদেশে চিকিৎসায় থেকেছেন। সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে তিনি সড়কেই অনেক বেশি সময় কাটিয়েছেন। এ খাতের উন্নয়নে নানা ধরনের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। সন্দেহ নেই বাংলাদেশে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করা মোটেও সহজ কাজ নয়। তবে ওবায়দুল কাদের অনেকদিন থেকেই এই দায়িত্বে থাকায় বড় বড় সড়ক, ব্রিজ ও মেগা প্রকল্প তিনি সম্পন্ন করার সুযোগ পেয়েছেন। এবার ঈদের আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-কুমিল্লা রুট পুরোপুরি কাক্সিক্ষত মানে যান চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-উত্তরবঙ্গ, পদ্মা সেতু এবং দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থায় শিগগিরই প্রকল্পসমূহ সমাপ্ত হবে। আশা করা যাচ্ছে এ সরকারের হাত দিয়েই দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আধুনিকায়নের উদ্যোগ দৃশ্যমান হবে। এ ছাড়া ঢাকার মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়েসহ যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি নগরবাসী লক্ষ করবে।

কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন কৃষিবিদ ও রাজনীতিবিদ। দেশে এবার বাম্পার ফলন হওয়ায় তার মন্ত্রণালয়ের কর্মচাঞ্চল্য নতুনভাবে বেড়ে গেছে। কৃষিকে এখন আর আগের শ্রমনির্ভর রাখা যাবে না। এটিকে প্রযুক্তিতে আরো বেশি সমৃদ্ধ করতে হবে। সবাই আশা করছেন ড. আব্দুর রাজ্জাক দেশে কৃষি ব্যবস্থাপনায় আওয়ামী লীগ সরকারের যে সাফল্যের ঐতিহ্য রয়েছে সেটিকে নতুন উচ্চতায় নিতে পারবেন। সে ধরনের কথাবার্তা তার কাছ থেকে শোনা গেছে। এখনই আগামী বছরের কৃষি উৎপাদন, বিপণন, রপ্তানিকরণ, প্রযুক্তি উদ্ভাবন, আমদানি ও প্রয়োগ, কৃষককে দক্ষ করা ইত্যাদি উদ্যোগ নিয়ে যদি তার মন্ত্রণালয় কাজ করতে থাকে তাহলে আগামী বছর অধিক ফসল হাতে নিয়ে কৃষকের কোনো ক্ষোভের কথা শুনতে হবে না।

আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই পদে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে বেশ ঠাণ্ডা মাথায় তার দায়িত্ব তিনি পালন করে যাচ্ছেন। সে কারণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়ে আগে যে ধরনের আলোচনা-সমালোচনা হতো সেটি আসাদুজ্জামান কামাল দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে শোনা যায় না। সন্ত্রাস দমনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বেশ দৃঢ় এবং কঠোর আছে। মন্ত্রীর কথাবার্তাও বেশ সংযত।

আরো কিছু মন্ত্রণালয় যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করেই কাজ করছে বলে মনে হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, রেল মন্ত্রণালয়, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ- জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় খাদ্যসহ আরো কিছু মন্ত্রণালয় নীরবেই কাজ করে যাচ্ছে। তাদের সম্পর্কে এখনো পর্যন্ত নেতিবাচক কোনো প্রচারণা নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কেও কোনো নেতিবাচক প্রচারণা নেই। তবে এ দুটো মন্ত্রণালয় দেশের বিশাল শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আগামী দিনগুলোতে কী ধরনের নতুন পরিকল্পনায় কাজ করতে যাচ্ছেন সেটি এখনো জনসম্মুখে খুব একটা আলোচনায় আসছে না। অথচ প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বস্তরে শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষানীতি ২০১০ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি এখনো পর্যন্ত থমকে আছে। কীভাবে সম্মুখে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত মান বৃদ্ধি করা যাবে, জনসম্পদ সৃষ্টি করা যাবে, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার কমানো যাবে, আবার উচ্চশিক্ষাকে গবেষণামুখী করার কোনো বিকল্প যে নেই সেটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে সেসব নিয়ে দুই শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখনো তাদের কার্যক্রম স্পষ্ট করছে না। আমাদের ধারণা আলোচিত মন্ত্রণালয়গুলোর মতো না হলেও শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক ধরনের পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে এখনই কার্যকর এবং দৃশ্যমান কিছু পদক্ষেপ নেয়া শুরু করতে হবে। তাহলেই আমরা একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য মেধাবী, দক্ষ এবং অভিজ্ঞ শিক্ষার্থী তৈরি করতে সক্ষম হবো।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি এই মেয়াদে দেশে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছেন এটি এই ৬ মাসে অনেকটাই বুঝা গেছে। মন্ত্রিপরিষদের ওপর তার যেমন নিয়ন্ত্রণ আছে অনেকেই সেভাবে কাজও করছেন। তারপরও তার এই মেয়াদের সরকার আরো বেশি সফল হওয়ার জন্য যদি মন্ত্রণালয়কে সম্প্রসারণ করতে হয় কিংবা কাউকে বাদ দিতে হয় সেটি তার এখতিয়ারের বিষয়। আমরা আশা করব বাকি সাড়ে চার বছর তিনি বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সফল হবেন।
লেখক : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।

নয়ন বন্ড বনাম সামাজিক নিরাপত্তা
                                  

শফিকুল ইসলাম খোকন


শব্দটি এখন শুধু বাংলাদেশেই নয়, পুরো বিশ্বে পরিচিত একটি শব্দ। যদিও এর আগে ০০৭-এর বিষয় অনেকেই অবগত ছিলেন। জেমস বন্ড বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ইযান ফ্লেমিং সৃষ্ট উপন্যাসের কাল্পনিক চরিত্র বিশেষ। ১৯৫৩ সালে রচিত এ উপন্যাসে জেমস বন্ড রয়েল নেভি কমান্ডার হিসেবে রয়েছেন। জেমস বন্ড নিয়ে সিরিজ আকারে নির্মিত অসংখ্য উপন্যাস, চলচ্চিত্র, কমিকস এবং ভিডিও গেমের প্রধান চরিত্রে রয়েছেন জেমস বন্ড। লন্ডনের সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস বা এসআইএসের প্রধান গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় তাকে। ১৯৯৫ সালের পর থেকে সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস বা এসআইএসের নাম পরিবর্তিত হয়ে এমআই-৬ নামকরণ করা হয়।

বাংলাদেশে জেমস বন্ড নেই, তবে একজন নয়ন বন্ড তৈরি হয়েছিল। যার সূর্য উদিত হলেও আলো ছড়াতে পারেনি। তিনি নিজেই এই উপাধি নিয়েছেন। তার শক্তির উৎস মাদক ও ক্ষমতার রাজনীতি। নয়ন বাহিনী তার নিজের নামের সঙ্গে কাল্পনিক চরিত্রের সঙ্গে ০০৭ আর নয়ন বন্ড লাগিয়েছেন। ০০৭ সাংকেতিক নম্বরটি জেমস বন্ড নয়ন বন্ড ধারণ করেছেন। জেমস বন্ডের মতোই ব্যতিক্রম হিসেবে নয়ন বন্ডও ডাবল-জিরো শব্দটির মাধ্যমে রিফাতকে হত্যা করার সব পরিকল্পনা করেন ০০৭ গ্রুপের সদস্যদের সঙ্গে। রিফাত হত্যা নিয়ে কয়েক দিন ধরে গোটা দেশে আলোচিত চাঞ্চল্যকর ঘটনা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে যখন পর্যায়ক্রমে রিফাত হত্যার সঙ্গে জড়িত ঘাতকরা ধরা পড়ছে, তখন সারা দেশের মানুষের মাঝে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল নয়ন বন্ড কি আদৌ আটক হবে? এরপরও জনগণের বিশ্বাসও ছিল এত বড় অপরাধ করে নয়ন বন্ড এড়িয়ে থাকতে পারবে না। বন্দুকযুদ্ধেই মারা যাবে। মানুষের ধারণা ঠিক তাই হলো। মঙ্গলবার ভোর হতে না হতেই শোনা গেল নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে।

যদি প্রশ্ন করি, আমরা এক দিন মানুষ ছিলাম, এখন আমরা মানুষ নেই। মানুষের মনুষ্যত্ব না থাকলে তাকে কি মানুষ বলা যায়! এখন আমরা অমানুষ হয়েছি? যেখানে প্রকাশ্য দিবালোকে রামদা দিয়ে জীবন্ত মানুষকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়, যে দেশে মা ও মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়, যেখানে ৯ বছরের কন্যাসন্তানকে মা গলাটিপে হত্যা করে, যেখানে চলন্ত বাসে নারীকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করে, সেখানে এমন প্রশ্ন জাগাটাই অস্বাভাবিক নয়। স্ত্রীর সামনে একটি জীবন্ত প্রাণকে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা সেই ঘাতকদের পশু ছাড়া আর কিইবা বলা যায়? পশুদের প্রাণ আছে, কিন্তু বোধ বুদ্ধি নেই, তাই তারা হিংগ্র জানোয়ার। আমাদের প্রাণ আছে, বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন, তাই আমরা মানুষ। মনুষ্যত্ব বোধ আছে বলেই আমরা মানুষ। কিন্তু আমাদের আচার-আচরণ, সামগ্রিক চিন্তাচেতনা ভাবনায় আমরা কি সত্যি মানুষ? এ প্রশ্ন আজ আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। মানবতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং সমাজ আজ কোথায় দাঁড়িয়েছে? এ জঘন্য কার্যটির ভিডিও ছবি ভাইরাল হয়েছে। এ জঘন্য বর্বরোচিত আক্রমণ যখন নিরপরাধ নিরস্ত্র রিফাতের ওপর চলছিল, তখন পাশেই অনেক পুরুষ দাঁড়িয়ে ছিল। তারা নপুংসক কি না জানি না। তবে নির্বোধ আবেগ অনুভূতিহীন সমাজের চরম স্বার্থপর বাসিন্দা তারা।

‘রিফাত হত্যার পরিকল্পনাকারীরা ‘০০৭’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ করেছে। ইতোমধ্যেই এ গ্রপে রিফাত হত্যার পরিকল্পনার কথোপকথনের বেশ কয়েকটি স্ক্রিনশট ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ‘০০৭’-এর কথোপকথনের বিষয়টি ঘেঁটে দেখা যায়, রিফাত শরীফ হত্যাকান্ডের দিন বুধবার সকাল ৮টা ৬ মিনিটের সময় রিফাত হত্যা মামলার দুই নম্বর আসামি রিফাত ফরাজী গ্রুপে লেখেন, ‘০০৭-এর সবাইরে কলেজে দেখতে চাই।’ এর উত্তরে মোহাম্মাদ নামে একজন লিখেন, ‘কয়টায়’। নয়ন ফরাজী লেখেন, ‘০০৭-এর সবাইরে কলেজে দেখতে চাই।’ এর উত্তরে বরগুনায় কনস্টেবল পদে পুলিশের চাকরি পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ সাগর সম্মতিজ্ঞাপনসূচক এবং বিজয়ের প্রতীক ভি সিম্বল দিয়ে উত্তর দেন। এরপর মাহমুদ আবার রিফাত ফরাজীকে লেখেন, ‘কয়টায় ভাই।’ এরপর রিফাত ফরাজী উত্তর দেন, ‘৯টার দিকে।’

তথ্যপ্রযুক্তির দেশে প্রতিনয়তই যে ঘটনা ঘটছে তার অধিকাংশ ঘটনাই ভিডিও হয় এবং সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। বরগুনার রিফাত হত্যার পর আবারও আলোচনায় একটি প্রশ্ন। প্রত্যক্ষদর্শীরা কেউ কেউ ঘটনার ভিডিও ধারণ করলেও আক্রান্তকে রক্ষায় এগিয়ে যায়নি কেউ। একইভাবে ২০১৬ সালে সিলেট এমসি কলেজের ছাত্রী খাদিজা আক্তার নার্গিসকে কোপানো হয় প্রকাশ্যে। একইভাবে বিশ্বজিৎকে পুরোনো ঢাকায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ব্লগার অভিজিৎ রায়কেও প্রকাশ্যে কোপানো হয়। প্রকাশ্যেই কুপিয়ে রক্তাক্ত করা হয় লেখক হুমায়ূন আজাদকে। এসব ঘটনাতে প্রত্যক্ষদর্শী অনেকে ছবি তুললেও কেউ রক্ষা করতে এগিয়ে যাননি। অনেকেই এই ভিডিও ধারণের বিরোধিতা করেছেন। এ ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করার সুযোগ রয়েছে। প্রথমত, প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাটি ঘটনার সময় ভিডিও করার আগে বিশ্বজিত এবং রিফাতকে রক্ষা করা উচিত ছিল; এটি যেমন সত্য একইভাবে যারা ভিডিও করেছেন তারা রামদা বা চাপাতির সামনে প্রতিরোধে যে দাঁড়াবেন না বা দাঁড়াতে পারেন না, ইহাও সমভাবে সত্য এবং ভিডিও করার কারণেই ঘাতক বা অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়। উদাহরণ হিসেবে বলতে সাংবাদিকরা একটি দুর্ঘটনা ঘটলে সেখানে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে ভিডিও করছেন, এ রকমের অসংখ্য ঘটনা বাংলাদেশে রয়েছে।

বরগুনার নয়ন বাহিনীর এই ০০৭ দলের সদস্যরা সকলেই কিশোর। কিংবা মাত্র তারুণ্যের চৌকাঠে পা রেখেছে। ০০৭ নামে একটি গোপন গ্রুপ তৈরি করে নয়ন ফেসবুক মেসেঞ্জারে রিফাত শরীফ হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা প্রকাশ করে। সুতরাং এ গ্রুপের ভয়াবহতা বিবেচনায় আনতে হবে। পাশাপাশি কেউ যেন ছাড় না পায়, সে ব্যাপারে কঠোর হতে হবে প্রশাসনকেই। আর আলোচিত রিফাত হত্যা মামলার ন্যায়বিচার নিশ্চিতে হত্যাকান্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়াও জরুরি। সাম্প্রতিক সময় একটি বিষয় চোখের পড়ার মতো। সেটি হলো, যেকোনো বিষয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দেখতে হয়। দেশের ছোটখাটো সব ঘটনা, দুর্ঘটনার জন্যই যদি দেশের প্রধানমন্ত্রীকে মাথা ঘামাতে হয়, তা হলে দেশজুড়ে এত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মন্ত্রী, এমপি, বিভিন্ন স্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তার পাশাপাশি সুশীল সমাজের লোকজনইবা আছেন কী জন্য? তাদের কাজটাইবা কী? খাদ্য অধিদফতরের এক কর্মকর্তাকে বদলি, বিদেশ থেকে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে বদলি বাতিল, শিশু ভ্যানচালক শাহিনের চিকিৎসার ভার প্রধানমন্ত্রীর নিতে হচ্ছে, নয়ন বন্ডের মতো জঘন্য অপরাধকে ধরতেও প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা দিতে হয়, সিলেটে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা, শিক্ষিত বেকার প্রতিবন্ধী নারী চাঁদের কনার চাকরিÑ সব কিছুই যদি প্রধানমন্ত্রীর দেখতে হয়; তা হলে এত দফতর, এত মন্ত্রী ও এমপিরা কী করছেন?

০০৭ নয়ন বন্ডের মতো কি বাকিদের বিচার হবে?, না আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসবে? এ রোমহর্ষক খুনের ঘটনায় অপরাধীরা কি আদৌ শাস্তি পাবে? নয়ন নিহত হওয়ার পর জনমনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। আমাদের দেশে একটি প্রচলিত প্রথা রয়েছে, সেটি হচ্ছে দোষীরা অন্তর্বর্তীকালীন জামিন নিয়ে আসেন। দেশের আইন অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট প্রমাণসাপেক্ষে আসামিরাও জামিন পাওয়ার হকদার; কিন্তু কিছু কিছু ঘটনা থাকে যা আদালতের প্রথা অনুযায়ী সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ প্রয়োজন হয় না। এ ছাড়া আমাদের দেশে হঠাৎ কোনো ঘটনা ঘটলে শুরুতে তা নিয়ে বেশ হইচই শুরু হয়ে যায়। সবকিছু দেখে মনে হয়, এই বুঝি সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে গেল। কিন্তু হইচই বেশি দিন থাকে না। নতুন কোনো ঘটনা ঘটলেই আগের ঘটনা আড়ালে পড়ে যায়। রিফাতের কথাই যদি ধরি, মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ঘটনাটি অনেকটাই আড়াল হতে চলেছে। অথচ এই ঘটনাকে মোটেই আড়াল হতে দেওয়া উচিত নয়। বরং এ ঘটনার সূত্র ধরে গোটা দেশে সন্ত্রাস ও অনাচারের বিরুদ্ধে একটা জাগরণ তৈরি করা জরুরি। সবচেয়ে বড় কথা, রিফাত হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না পেলে গোটা দেশে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান শুরু করলেও কাজের কাজ কিছুই হবে না। কারণ অপরাধের বিচার না হলে অপরাধী সাহসী হয়ে ওঠে। কাজেই অপরাধের বিচার হওয়া জরুরি।

নয়ন বন্ডের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পরপরই অনেকে মানবাধিকারের প্রশ্ন তুলে বলবেন, মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে, এটি ঠিক হয়নি, এটি আইনের ব্যত্যয় হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বলতে হয়, মানুষের জন্যই মানবাধিকার। নয়ন যখন প্রকাশ্য দিবালোকে একটি হত্যাকান্ড ঘটিয়েছিল; তখন মানবাধিকার ছিল কোথায়? নয়ন ও তার সহযোগীরা আর মানব নয়। ফলে তাদের জন্য মানবাধিকারও প্রযোজ্য নয়। এরা সমাজের আগাছা। যুগ যুগ ধরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নয়ন বন্ডের মতো তরুণ জন্ম হবে। নয়ন বন্ডের মতো তরুণরা দেশের আগাছা হবে, কারো দ্বারা ব্যবহৃত হবে? রাজনীতিকরাই এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন। তাদেরকেই বলতে হবে, তারা আর নয়ন বন্ডের মতো সন্ত্রাসীদের আশ্রয়দাতা হবেন না। নিজ স্বার্থে তাদেরকে ব্যবহার করবেন না। তা হলেই হয়তো দেশ থেকে নয়ন বন্ডের মতো সন্ত্রাসীদের বংশবৃদ্ধি কিছুটা হলেও রহিত হতে পারে।

প্রাথমিক শিক্ষায় সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য
                                  

মোনায়েম সরকার


প্রথমিক শিক্ষা যে কোনো দেশের প্রেক্ষাপটে একটি সংবেদনশীল স্তর। এই স্তরে যে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত গোটা জাতির জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে। সামান্য পদক্ষেপ, হোক ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক, কালক্রমে তার ছাপ বিরাট পরিসরে দৃশ্যমান হতে থাকে। বাংলাদেশও এই বাস্তবতার বাইরে নয়। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বৈশ্বিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) আশানুরূপ অর্জিত হওয়ার পর এখন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা তথা এসডিজি বাস্তবায়নের কাজ জোরেশোরে চলমান রয়েছে। রূপকল্প-২০২১কে সামনে রেখে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার ঘোষিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি সক্রিয় রয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের ব্যাপক প্রস্তুতি ও প্রত্যাশার আলোকে মাঠ পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে সামান্য আলোকপাত করার প্রয়োজনীয়তা থেকেই আমার এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।

প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি উপযোগী প্রায় সব শিশুই এখন বিদ্যালয়ে যায়। শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত করতে পারা পিছিয়ে পড়া দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এক অসামান্য অর্জন। প্রায় সব গ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর শিশুদের ঘরের দরজায় পৌঁছে গেছে প্রাথমিক শিক্ষা। উপবৃত্তি ও মিডডে মিল কার্যক্রম শতভাগ বাস্তবায়নের পর দেশের প্রাথমিক শিক্ষা একটি যুগান্তকারী মাইলফলক স্পর্শ করেছে। শিক্ষকদের চাকরি আগের তুলনায় মর্যাদা ও বেতনের দিক দিয়ে অধিক সম্মানের হওয়ায় শিক্ষাদানের পরিবেশ অনেক গতিশীল হয়েছে। এই মুহূর্তে প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীর হিসেবে ছাত্রের চেয়ে ছাত্রীর সংখ্যা বেশি। আনুপাতিক হারে ৫১:৪৯। ঝরে পড়ার হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার যে চেষ্টা চলমান রয়েছে সেটি অব্যাহত থাকলে অচিরেই দেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আলোকে প্রাথমিক শিক্ষায় তার চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করবে।

উপজেলা স্তরে শিক্ষকদের বদলি, পদোন্নতি, বিভিন্ন ছুটি প্রদান, সার্ভিস বই সংরক্ষণ এবং বেতন বৃদ্ধি সংক্রান্ত কিছু রুটিন কাজ নিয়মিত করতে হয়। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের উন্নয়নমূলক কাজ, ভবন তৈরি, মেরামত প্রভৃতিও শিক্ষা অফিসকে তদারক করতে হয়। ঘুষখোর আর অসৎ কর্মকর্তা এসব কাজে অসদুপায় অবলম্বন করে থাকে, সেটি আমরা পত্রপত্রিকার মাধ্যমে সচরাচর দেখেও থাকি। কিন্তু সৎ কর্মকর্তাদের এসব কাজ তদারক করতে গিয়ে যে পরিমাণ বেগ ও চাপ সামাল দিতে হয় সেটি বাস্তবিক পক্ষে খুবই নিষ্ঠুর এবং অমানবিক। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে একদিন সে সৎ লোকটা ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং হতোদ্যমী মানুষের মতো নিজেকে গুটিয়ে নেয়। নীরবে-নিভৃতে এই রকম কত মানুষ যে হতোদ্যম হয়ে পড়ে তার সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই। এই চাপটি তৈরি হতে পারে ভেতর-বাইরে উভয় দিক থেকেই। অসৎ কর্মকর্তাদের ষড়যন্ত্রে অথবা শিক্ষক নেতা পরিচয়ে যে দালাল চক্র রয়েছে তাদের ষড়যন্ত্রে। আমরা জেনে অবাক হব যে, তদারক করার প্রতিটি স্তরে কমবেশি অবৈধ অর্থের লেনদেন হওয়ার প্রথা চালু রয়েছে মাঠ পর্যায়ে। অসৎ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে উল্লিখিত দালাল চক্র একটি সুদৃঢ় সিন্ডিকেট তৈরি করে রাখে। এই সিন্ডিকেটের বাইরে গিয়ে কোনো শিক্ষকের পক্ষেই নিয়ম অনুযায়ী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। যেসব কর্মকর্তা এই সিন্ডিকেটের বাইরে থাকে, কোনো প্রকার অবৈধ আর্থিক সুবিধা নিতে প্রস্তুত থাকে না, তাকেই এই সিন্ডিকেট মূর্তিমান হুমকি হিসেবে প্রত্যক্ষ করে এবং বিভিন্ন রকম ষড়যন্ত্রের জাল বুনে তাকে ক্রমাগত নাস্তানাবুদ করে চলে। এই নাস্তানাবুদ হতে থাকার এক পর্যায়ে নিজে থেকে বদলি না হলে সিন্ডিকেট তখন তার বিরুদ্ধে স্পর্শকাতর কিছু অভিযোগ দাঁড় করায় এবং বদলি হওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে ফেলে। এই ক্ষেত্র প্রস্তুত করার কতগুলো নমুনা তুলে ধরতে চাই-একজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার দালাল চক্রের একটি অনিয়মের দায় নিতে না চাওয়ায় তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা যেমন- বঙ্গবন্ধুর ছবি ছেঁড়া, প্রধানমন্ত্রীর ছবি ছেঁড়া এবং স্থানীয় এমপিকে গালাগাল দেয়ার মতো অভিযোগ এনে ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে অফিস সময়ে চরম লাঞ্ছিত করা হয়। একজন উপজেলা শিক্ষা অফিসার এই সিন্ডিকেটের একটি সিদ্ধান্ত মানতে দৃঢ়তার সঙ্গে অপারগতা প্রদর্শন করলে তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় কটূক্তি করার অভিযোগ এনে চরম হেনস্থা করা হয়। সিন্ডিকেটের অন্তর্ভুক্ত একজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ফেক আইডির মাধ্যমে একটি বিতর্কিত বক্তব্য প্রিন্ট করে তারই এক কলিগের নামে বিলি করতে থাকে। ফলে ওই কলিগ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের রোষানলে পড়ে যায় এবং গণধোলাইয়ের মুখে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।

একজন দায়িত্বশীল সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে ছোটখাটো ষড়যন্ত্রে কুপোকাত করতে না পেরে সিন্ডিকেটের অন্তর্ভুক্ত এক নারী শিক্ষক দিয়ে মিথ্যা ধর্ষণ মামলা করিয়ে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করে ওই কর্মকর্তাকে বদলি করে অন্যত্র সরিয়ে নিতে। অফিসাররা বদলির কারণে কিছুদিন পরপর পাল্টায়। কিন্তু শিক্ষকদের যে অংশটা এই সিন্ডিকেটের সদস্য, তারা বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ একই উপজেলায় সক্রিয় থাকে এবং বহুল অভিজ্ঞতার কারণে ষড়যন্ত্র করার ব্যাপারে ক্রমাগত দক্ষ হয়ে ওঠে। এই সিন্ডিকেটের বাইরে কোনো শিক্ষক কিছু করে উঠতে পারে না, কোনো কর্মকর্তার পক্ষেও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা থাকে না। সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের সামান্য বাইরে গেলেই তার কপালে জোটে অপরিসীম ভোগান্তি আর যন্ত্রণা।

এ ধরনের সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে নানা কুকর্ম করতে করতে এতটাই দক্ষ যে, কোনো দুষ্কৃতি সাধন করতে এদের দুবার ভাবতে হয় না। একদিকে স্থানীয়, আরেকদিকে রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যোগসাজশ রক্ষা করে সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রাখে। একজন সৎ কর্মকর্তা এমনকি একজন আদর্শ শিক্ষককেও এরা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। মানুষের মান-সম্মান এবং জীবন নিয়ে এদের ছিনিমিনি খেলার ব্যাপারটি খুবই ঘৃণ্য।
প্রাথমিক শিক্ষার মাঠ পর্যায়ে এ ধরনের বাস্তবতা মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের পথে মারাত্মক বাধা হিসেবেই পরিগণিত হওয়ার কথা। এই বাস্তবতা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। উন্নয়নের বাতিঘর প্রাথমিক শিক্ষা স্তর দিন শেষে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে। সততার সঙ্গে কাজ করতে চাওয়া মানুষগুলো ক্রমাগত বিপদে পড়ার ভয়ে হতোদ্যম হয়ে পড়ছে। এটি এক অপূরণীয় ক্ষতি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আর স্বপ্নের সোনার বাংলার ভিত্তিভূমি বিনির্মাণের ক্ষেত্রে দুর্লঙ্ঘ্য এক বাধা হয়ে বিরাজ করছে মাঠ পর্যায়ের এ সিন্ডিকেট। আমাদের ভেবে দেখা দরকার, প্রাথমিক শিক্ষাকে এই সিন্ডিকেটের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে দেব নাকি প্রকৃত উন্নয়নের বাতিঘরের ভূমিকায় দেখতে চাইব? এই সিন্ডিকেটকে দুর্বল করতে না পারলে জনগণের করের টাকা আর বিদেশি দাতাগোষ্ঠীর সব দান-অনুদান অপচয়ের নামান্তর হতে বাধ্য। বিশ্বব্যাংক, জাইকা, এডিবিসহ দাতাগোষ্ঠীর বিভিন্ন পরামর্শও বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ ধরনের সিন্ডিকেট কমবেশি সব উপজেলাতেই সক্রিয়, তবে শক্তি প্রদর্শনে মাত্রাভেদ লক্ষণীয়।

প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে প্রায় ৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী সম্পৃক্ত। প্রজাতন্ত্রের মোট কর্মচারী প্রায় ১২ লাখ। সে হিসাবে গোটা জনশক্তির এক-তৃতীয়াংশই শুধু একটা বিভাগে কর্মরত। সৎ কর্মচারীর সংখ্যাটাও আনুপাতিক হারে এই বিভাগে বেশি হওয়ার কথা, যেমন বেশি হওয়ার কথা অসৎ কর্মচারীর সংখ্যা। প্রাথমিক শিক্ষা হোক সিন্ডিকেটমুক্ত এবং দেশপ্রেমের আদর্শে উদ্বুদ্ধ এক পরিশীলিত শিক্ষা স্তর। সরকারের সদিচ্ছার পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদেরও এগিয়ে আসা সময়ের দাবি। বনখেকো ওসমান গনি, ডিআইজি মিজান, দুদকের এনামুল বাসিরের মতো দুষ্ট শিক্ষক-কর্মকর্তা প্রাথমিকসহ সব স্তরেই আছে। দুর্নীতিবাজরা যেখানেই থাকুক সেখান থেকেই তাদের বিদায় করতে হবে। তাহলেই এগিয়ে যাবে দেশ, গড়ে উঠবে সোনার বাংলা।
লেখক : রাজনীতিক ও কলাম লেখক।

এত নিষ্ঠুরতা-অমানবিকতা আর সহ্য হয় না
                                  

মোস্তফা কামাল


বেশ কিছু দিন ধরে অসহ্য যন্ত্রণায় ভুগছি। অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে যাপিত জীবন। এত মানসিক চাপ আর নিতে পারছি না। এত নিষ্ঠুরতা-অমানবিকতা আর সহ্য করতে পারছি না। কেন মানুষ দিন দিন এমন অমানুষ হয়ে যাচ্ছে! নরপিশাচ হয়ে উঠছে!

এর আগে ২০১৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর কালের কণ্ঠে অমানবিকতা-নিষ্ঠুরতা নিয়েই আমি একটি উপসম্পাদকীয় লিখেছিলাম। শিরোনাম ছিল, ‘এই অমানবিকতা ও নিষ্ঠুরতার শেষ কোথায়’। লেখাটি প্রকাশের পর একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল ওই বিষয়ের ওপর টক শো করে। তাতে কয়েকজন অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। অতিথিরা বিষয়টি নিয়ে মর্মস্পর্শী আলোচনা করেন। পরে আমাকেও টেলিফোনে সংযুক্ত করা হয় সেই টক শোতে। আমি আমার লেখার বাইরে কিছু কথা তখন বলেছিলাম। সেগুলো ছিল এ রকমÑআমরা এখনো মা-বাবা, শিক্ষকসহ মুরব্বিদের পা ছুঁয়ে সালাম করি। কোনো অনুষ্ঠানে বয়োজ্যেষ্ঠ দেখলে দাঁড়িয়ে যাই, চেয়ার ছেড়ে দিই। এটা আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। আমরা বড়দের সম্মান করি। ছোটদের স্নেহ করি, তাদের ভালোবাসি। নারীসমাজকে মায়ের জাত বলে সম্মান করি। কিন্তু এখনকার সমাজ এর থেকে অনেক দূরে। মুরব্বির পা ছুঁয়ে সালাম করা তো দূরের কথা, সালাম দেওয়ার রীতি-রেওয়াজও যেন উঠে যাচ্ছে।

এখনকার জামানার সঙ্গে আমরা যেন অনেকটাই বেমানান। আমরা কিছুতেই আর খাপ খাওয়াতে পারছি না। নম্রতা, ভদ্রতা কিংবা ভালো ব্যবহারকে অনেকেই মনে করে দুর্বলতা। আগে ভালো ব্যবহারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। বলা হতো, ছেলেটা বা মেয়েটার আদব-কায়দা ভালো এবং ভালো পরিবারের সন্তান। এদের মা-বাবা ভালো। এখন এসবের কোনো বালাই নেই। আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগুলো সমাজ থেকে যেন উঠে গেছে। এখন হচ্ছে ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’-এর যুগ! গালাগাল আর বকাবাজির যুগ! এসব করলেই বলা হয়, বাপরে বাপ! মানুষটা যা তেজি! যা মেজাজ-মর্জি! তার ভয়ে সবাই তুরতুরিয়ে নাচে! অফিসের লোকেরা থরথর করে কাঁপে! এই না হলে বাপের বেটা!

আধুনিক প্রযুক্তি নাকি মানুষের জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আসে। কিন্তু আমাদের জীবনে আধুনিক প্রযুক্তি এক মহা-অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের নারী-পুরুষরা এখন ফেসবুকে আসক্ত। এই আসক্তি ইয়াবার চেয়েও ক্ষতিকর। তারা এখন আর বই পড়ে না। পত্রপত্রিকা পড়ে না। দেশ-দুনিয়ার খবর রাখে না। আড্ডা দেয় না। মা-বাবা সন্তানকে বা সন্তান মা-বাবাকে সময় দেয় না। সারাক্ষণ ফেসবুক নিয়ে পড়ে থাকে। দেখা যায়, সবাই এক রুমে আছে। কারো মুখে কোনো কথা নেই। সবাই ফেসবুকে ডুবে আছে। এক রুম থেকে আরেক রুমে বসে ফেসবুকের মাধ্যমে কথা বলছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণেও এ দেশে পারিবারিক কলহ ও বিবাদ অনেক গুণ বেড়েছে। ফেসবুকের নেতিবাচক শিকার হচ্ছে অনেক পরিবার। অনেকের সংসার ভাঙছে। অনেকে জড়িয়ে পড়ছে পরকীয়ায়। এতে পারিবারিক অশান্তি নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে।

কিছু দিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক কথা প্রসঙ্গে বললেন, তিনি এখন আর ফেসবুক ব্যবহার করেন না। কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, তাঁর ছোট্ট মেয়ে অভিযোগ করে বলেছে, বাবা, তুমি আমাদের কোনো সময় দাও না। অথচ ফেসবুকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করো। এটা ঠিক না।

মেয়ের কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে অধ্যাপক সাহেব ফেসবুক বন্ধ করে দিয়েছেন। আমি অধ্যাপক সাহেবকে অভিনন্দন জানালাম। এ রকম লাখ লাখ নারী-পুরুষ আছেন, যাঁরা সন্তানকে সময় দেন না। অথচ ফেসবুক নিয়ে পড়ে থাকেন। তাঁরা কি ভবিষ্যতের জন্য সাবধান হবেন?
একসময় একান্নবর্তী পরিবার ছিল। মা-বাবা, ভাই-বোন সবাই এক পরিবারে থাকত। একসঙ্গে গল্প করত। একে অপরের সুখ-দুঃখের ভাগীদার হতো। পারস্পরিক সহযোগিতা-সহমর্মিতা ছিল। সাহায্য-সহযোগিতার মানসিকতা ছিল। এখন দেখছি তার বিপরীত রূপ। এখন ভাইয়ে-ভাইয়ে, মা-বোনে, বাপ-ছেলের ঝগড়াঝাঁটি যেন নিত্যদিনের ঘটনা। সেই ঝগড়া খুনখারাবি পর্যন্ত গড়ায়।

আগে ছেলে চাকরির টাকা মা-বাবার হাতে তুলে দিত। এখন ছেলে বড় হয়ে চাকরিবাকরি করলে মা-বাবাকে ছেড়ে চলে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছেলেরা হয়তো মা-বাবার সঙ্গে থাকতে চায়; কিন্তু বিয়ের পর ছেলের বউ চায় না। সে চায় নিজের মতো করে আলাদা সংসার। সে শ্বশুর-শাশুড়িকে আপন করে নিতে পারে না। আবার শ্বশুর-শাশুড়িও ছেলের বউকে মেয়ের মতো করে দেখেন না। তাঁরা মনে করেন, ছেলের বউ মানে অন্যের মেয়ে। আপন কেউ না। ফলে দেখা দেয় পারিবারিক কলহ।

এখনো আমাদের দেশে যৌতুক একটা বড় সমস্যা। বিয়ের পর মেয়ের বাবা ছেলেকে কী দিল না-দিল, তা নিয়ে চলে হিসাব-নিকাশ। তাতে চাওয়া-পাওয়ার হিসাবে গরমিল হলেই শুরু হয় কলহ। সেই কলহ দিনে দিনে জটিল থেকে জটিলতর হয়। ছেলের পরিবারের সবাই তখন অসহায় মেয়েটির ওপর হামলে পড়ে। নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হয় মেয়েটি। অশান্তির আরেকটি বড় কারণ মাদক। মরণ নেশা ইয়াবা এখন শহর থেকে গ্রামের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। অসংখ্য পরিবার ধুঁকে ধুঁকে মরছে। ইয়াবা শুধু যুবসমাজকেই ধ্বংস করছে না, এর কারণে হানাহানি, রক্তপাতও বেড়েছে।

আমরা এখন যে সমাজ দেখছি সেটা এক অচেনা সমাজ। বদলে যাওয়া এক নতুন সমাজ। মেকি সমাজও বলা যেতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের মানুষগুলোকেও বড় মেকি মনে হয়। সবাই যেন অভিনয় করছে। ভেতরের রূপ এক রকম, বাইরের রূপ আরেক। চেহারাটাও মিথ্যার আবরণে ঢাকা। ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলায়। মানুষ হয়ে ওঠে মনুষ্যত্ববিহীন এক নরপিশাচ।

অথচ মানুষ মানেই মানবিক গুণাবলির অধিকারী। তার ভেতরে আবেগ থাকবে, ভালোবাসা থাকবে। সহনশীলতা ও সহমর্মিতা থাকবে। তা না হলে কেন মানুষ বলা হবে? এখন আর আবেগের কোনো মূল্য নেই। মানবিকতার কোনো মূল্য নেই। এসব নাকি এখন সেকেলে বিষয়। আমরা দেখছি, দিন দিন মানুষের নিষ্ঠুরতা ও অমানবিকতার মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এমন এমন ঘটনা ঘটছে, যা আগে কেউ চিন্তাও করত না।
ফেনীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাতের মৃত্যুর ঘটনাটি নিশ্চয়ই সবার মনে দাগ কেটে আছে। নুসরাতকে তাঁর সহপাঠীরা গায়ে কেরোসিন দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছে। তাঁকে মারার পর সেই কুলাঙ্গার ছেলে-মেয়েরা পরীক্ষাও দিয়েছে। ভাবতেও অবাক লাগছে! কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে এরা!
নুসরাতের অপরাধ কী?

নুসরাত মাদরাসা অধ্যক্ষের অপকর্ম ফাঁস করে দিয়েছিল। তাই অধ্যক্ষের কয়েকজন চেলা নুসরাতকে জীবনের তরে শেষ করে দিয়েছে। স্থানীয় থানা পুলিশ, প্রশাসন এবং ক্ষমতাসীন দলের লোকদের যোগসাজশে পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালানো হয়েছিল। কিন্তু কথায় বলে না, পাপ ছাড়ে বাপরেও! আসল সত্য অবশেষে বেরিয়ে এসেছে। অপরাধীরা ধরা পড়েছে।

বরগুনায় প্রকাশ্য দিবালোকে স্ত্রীর সামনে স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। স্বামী রিফাত বেচারা কলেজছাত্রী স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিল। স্ত্রীকে নিয়ে সে আর বাড়ি ফিরতে পারল না। রাস্তায় দাঁড়িয়ে শত শত সাধারণ মানুষ দুর্বৃত্তদের নারকীয় কা- দেখল। দুর্বৃত্তদের কেউ কিছু বলার সাহস পেল না! কারণ এরা সবাই স্থানীয় এমপি ও জেলা চেয়ারম্যানের লোক! কার ঘাড়ে কয়টা মাথা! কিন্তু তাদের বিবেক কি একবারও নাড়া দিল না?

কয়েক দিন আগে মা-বাবার মাঝখান থেকে তিন বছরের শিশুকে তুলে নিয়ে গিয়ে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। খবরে বলা হয়, পূর্ব শত্রুতার জেরে শিশুসন্তানকে হত্যার শিকার হতে হলো। এ কেমন শত্রুতা? নিষ্পাপ শিশুটি কী অন্যায় করল? সে কেন প্রতিহিংসার শিকার হবে?
এ ধরনের অমানবিক ও নিষ্ঠুর ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। মানুষ মানুষকে পিটিয়ে, পুড়িয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করছে। নারীদের ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করছে। শিশুর মলদার দিয়ে বায়ু ঢুকিয়ে নির্মম খেলায় মত্ত হয় নরপিশাচের দল। আর কত নিষ্ঠুরতা দেখতে হবে আমাদের? এর কোনো প্রতিকার নেই!

দুর্বৃত্তদের দ্রুত বিচার আইনে শাস্তি দিতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে, অপরাধ করলে তার শাস্তি পেতে হয়। এ জন্য পুলিশের দায়িত্বশীলতা খুব জরুরি। পুলিশ দায়িত্বশীল হলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। অন্যথায় আরো অনেক ধরনের নিষ্ঠুরতা আমাদের সহ্য করতে হবে, যা সহ্য করার সাধ্য আমাদের নেই।

আমাদের দেশে একটা ব্যাপার লক্ষ করলাম, সব কিছুতেই প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ করতে হয়। যাঁদের তিনি দায়িত্ব দিয়েছেন, তাঁরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করলেই তো হয়! তাঁরা কেন হাত গুটিয়ে বসে থাকেন? কেন প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকেন? এর জবাব কি সংশ্লিষ্টরা দেবেন?
লেখক : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

সামনে আলো ঝলমল দিন, দুর্নীতির অন্ধকারে যেন হারিয়ে না যায়
                                  

কাজী নুসরাত শরমীন

পুলিশ জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করবে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ রাষ্ট্রের বর্ম হবে, এটাই তাদের দায়িত্ব। অথচ বাস্তবতা হাঁটছে উল্টো পথে। ‘পুলিশ’ শব্দটিই যেন আতঙ্ক। ফেনীর সোনাগাজীর নুসরাত হত্যাকা-ে পুলিশের যে ভূমিকা আমরা দেখেছি, তা আতঙ্কগ্রস্ত করে। টিআইবির জরিপে দেশের সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দুর্নীতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার অবস্থান ৭২.৫ শতাংশ। যারা অপরাধ দমনে নিয়োজিত, সেখানে তারাই সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত। কে থামাবে তাদের? দুর্নীতি দমন কমিশন? সে চিত্র আরো হতাশাজনক।

বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের এক পরিচালক একজন পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ করেছেন! কতটা পাহাড়সম অপরাধ ঢাকতে এই টাকা লেনদেন হয়েছে, তা ভাববার বিষয়। এবার প্রশ্ন ওঠা খুব স্বাভাবিক, দুর্নীতি দমনের জন্য কতটা কাজ করছে এই কমিশন? প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দুর্নীতি দমন কমিশন কখনোই বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি।

দুদক পরিচালক এ কে এম ফজলুল হক আসামির কাছে তথ্যফাঁসের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হয়েও পার পেয়ে গেছেন। তাকে বরখাস্তের অফিস আদেশে অভিযোগ ছিল সুনির্দিষ্ট। তথ্য ফাঁসের পাশাপাশি অনুসন্ধানে গড়িমসি ও কালক্ষেপণের অভিযোগও ছিল তার বিরুদ্ধে।

পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত বিতর্কিত ডিআইজি মিজানুর রহমানের কাছে তথ্যফাঁসের অভিযোগে দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় গত ১০ জুন। তাহলে ফজলুল হকের মতো এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও কি মিথ্যা প্রমাণিত হবে? ডিআইজি মিজানুর রহমান তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত থেকে নিষ্কৃতি পেতে সরাসরি ও তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘুষ লেনদেন করেছেন। গোপনে ধারণ করা বেশ কিছু অডিও রেকর্ডে সে প্রমাণও উঠে এসেছে। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করেন আব্দুল দয়াছ নামে লন্ডন প্রবাসী এক ব্যক্তি। দয়াছ ও ডিআইজি মিজানের সঙ্গে এসব কথোপকথনে অংশ নেন অবসর প্রস্তুতিকালীন ছুটিতে (এলপিআর) থাকা দুদক পরিচালক আব্দুল আজিজ ভূঁইয়া। অডিও কথোপকথনে আলোচিত ব্যক্তিরা দুদক কর্মকর্তা। আর তাদের অনেকেই দয়াছের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কথা স্বীকার করেছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারো সমালোচনার মুখে কমিশন। তাহলে সর্ষের ভেতরেই ভূত! দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ? কমিশনের তদন্ত কর্মকর্তা চাইলেই কি তার ইচ্ছামতো ঘুষের বিনিময়ে কাউকে রেহাই দেয়া কিংবা কাউকে ফাঁসিয়ে দেয়ার সুযোগ আছে?

দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও বহুদিনের। কমিশন প্রতিষ্ঠার আগে যখন দুর্নীতি দমন ব্যুরো ছিল তখন থেকেই সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। গত ২৮ জানুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে “৩৩ মামলায় ‘ভুল’ আসামি জেলে : স্যার, আমি জাহালম, সালেক না” শিরোনাম একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির ৩৩টি মামলায় নিরপরাধ জাহালমের জেলখাটার প্রসঙ্গ তোলা হয়। ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আবু সালেকের (মূল অপরাধী) বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংকের সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির ৩৩টি মামলা হয়েছে। কিন্তু আবু সালেকের বদলে জেল খাটছেন এবং আদালতে হাজিরা দিয়ে আসছিলেন জাহালম। আদালত জাহালমের কারাভোগের ঘটনাকে আরেকটি ‘জজ মিয়া নাটক’ উল্লেখ করেছেন এবং একই সঙ্গে দুদককে অবশ্যই স্বচ্ছতার সঙ্গে তদন্ত করার পরামর্শ দেন। দুদকের কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে আদালত মন্তব্য করেন, এ রকম ভুলের দায় দুদক কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে। এরপর তিনি নিজেই ফাঁস করেছেন ৪০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের ঘটনা। গত ৮ জুন অনুসন্ধান থেকে রেহাই পেতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দেয়ার তথ্য প্রকাশ করেন মিজান। ওই তথ্য নিয়ে গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার পর দুদকের ওই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
দেশের ১৩ হাজার পুলিশ দুর্নীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলেও মন্তব্য করেন হাইকোর্ট। এর ফলে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ছে, মানুষ ন্যায়বিচারের আস্থা হারাচ্ছে। দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দুদক। নির্দিষ্ট বেতনে সরকারি চাকরি করেও শুধু দুর্নীতির কারণে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন, এমন অন্তত ২৫ পুলিশ কর্মকর্তার সন্ধান পেয়েছে দুদক।

চাঁদাবাজি, ঘুষ, ইয়াবা বহন, হয়রানি, প্রকৃত ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টাসহ কী অভিযোগ নেই পুলিশের বিরুদ্ধে? পুলিশ বাহিনী কি জানে, জনগণকে ঠিক কী ধরনের সেবা দেয়ার জন্য তাদের নিয়োগ দেয়া হয়? পুলিশের নানা স্তরে যোগ দিতে আসা ব্যক্তিরা কি এখানকার বেতন কাঠামো ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে না জেনেই এ পেশায় যোগ দেন? নাকি ‘উপরিসহ বেতন’ ভেবেই আসেন এ পেশায়? পুলিশ হেডকোয়ার্টারে একটি সিকিউরিটি সেল আছে, যাদের কাজ এই ধরনের নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধমূলক কাজের অনুসন্ধান করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া। প্রয়োজনে ফৌজদারি মামলা করার বিধানও রয়েছে। কিন্তু তা কার্যকর হচ্ছে কতটুকু?

এ ছাড়া পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন রয়েছে, তাদেরও দায়িত্ব আছে এসব দেখভাল করা। সুতরাং পুলিশের বিরুদ্ধে অপরাধ বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে সেগুলো খতিয়ে দেখা, তদন্ত করা এবং মামলা করার ব্যবস্থা যেহেতু রয়েছে, সেগুলো কেন অ্যাকটিভ হচ্ছে না?

অপরাধপ্রবণ এলাকায় পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা নিজেরাই অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছেন কিনা, পুলিশ হেড কোয়ার্টারের সিকিউরিটি সেল এবং পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকেই সার্বক্ষণিকভাবে নজরদারি করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়লেও দুর্নীতি কমার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। রাজনৈতিক ও অন্যান্য প্রভাবের কারণে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের চর্চাও ফলপ্রসূ হচ্ছে না। যা প্রশাসনের ওপর সার্বিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

২০১৮ সালে দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের ফলাফল ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৯তম অবস্থানে। অথচ ২০১৭ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৩তম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয় আফগানিস্তানে। এরপরই বাংলাদেশের অবস্থান। যে উন্নয়নের প্রশস্তিগীত আমরা গাইছি, রাষ্ট্রের স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানগুলোর লাগামহীন দুর্নীতি তাকে বেসুরো করে তুলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরলস প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের সামনে আলো ঝলমল দিন, তা যেন দুর্নীতির অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক।

করারোপ বাড়িয়ে তামাক রোধ কি সম্ভব?
                                  

স্বপ্না রেজা

প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক খরচের একটি মোটা অঙ্কের অর্থের জোগান হয় এই রাজস্ব আদায় থেকে। সরকার তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এই জোগান সচল রাখতে রাজস্ব আদায়ের মাত্রা প্রতি বছর বাড়িয়ে দেয়। অনেক কিছুর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে রাজস্ব আয়ের মাত্রা বাড়াতে হয়। উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত কিংবা উন্নয়নকে আরো সম্প্রসারিত করার বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট থাকে। এমনই অভিব্যক্তি প্রকাশ করে এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়। নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগের জন্য প্রবল অসন্তোষ, অক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জনগণ সেই-ই আরোপিত বাড়িয়ে দেয়া কর মেনে নিতে বাধ্য হন এবং পরিশোধ করেন নিয়মিত বাধ্যতামূলক। কারণ কর প্রদান না করলে প্রচলিত আইনে শাস্তির বিধানও আছে। হয়রানির আশঙ্কা আছে।
মানসম্মান খোয়া যাওয়ার ভয় থাকে। কর প্রদানের সনদপত্র না থাকলে রাষ্ট্রের যাবতীয় সুবিধা থেকে কঠোরভাবে বঞ্চনার ইঙ্গিত থাকে। যতদূর জানা যায় যে, সাধারণ জনগণ মানসম্মান রক্ষার তাগাদায়, ন্যূনতম রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগের জন্য কর পরিশোধে বেশি তৎপর থাকেন। কষ্টসাধ্য হলেও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ তার সীমিত আয়ের ওপর নির্ধারিত কর পরিশোধ করে থাকেন।

যদিও ধনসম্পত্তির আলোকে দেশের সর্বোচ্চ করদাতাকে পুরস্কৃত করা হয়, সেই তথ্য রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দেয়া হয়। কিন্তু সেই তুলনায় স্বল্প আয়ে যেই ব্যক্তি নিয়মিত কর পরিশোধ করছেন, তাকে পুরস্কৃত করার, তথ্য ছড়িয়ে দেয়ার মানসিকতা রাষ্ট্রের থাকে না। যাই হোক, জনগণই রাষ্ট্রের অর্থ তহবিলের অন্যতম দাতা। সেই জনগণই যদি স্বাস্থ্যের দিক দিয়ে ঝুঁকিতে থাকেন, নিরাপদ না থাকেন, তাহলে তার কর্মক্ষমতা, কর্মযোগ্যতা, উপযোগিতা থাকে কী করে? থাকার তো কথা নয়। আবার স্বাস্থ্যগত অসুস্থতা, অনিরাপত্তার কারণে কাজ করতে না পারায় আশানুরূপ রাজস্ব আদায় করার বিষয়টিও অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এই হিসেবে রাজস্ব আদায়ের জন্য সুস্বাস্থ্যের জনগণই আগে। অর্থাৎ সোজা হিসাব, আগে জনগণের সুস্থতা, তারপর রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি। আগে শেকড়, তারপর ফল। তাই নয় নাকি?

বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উদযাপিত হলো। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সরকারের তামাক খাত থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে ২২ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। আর তামাক ব্যবহারের কারণে জনগণের চিকিৎসা ব্যয় ও উৎপাদনশীলতা কমে সরকারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। অর্থাৎ জনগণের স্বাস্থ্যের ক্ষতি ও তার চিকিৎসা ব্যয়, রাজস্ব আয়ের চেয়ে বেশি। কী লাভ হলো তাহলে ক্ষতি দিয়ে রাজস্ব আয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার? আবার এই বাস্তবতায় তামাক ব্যবহারে জনগণকে নিরুৎসাহিত করার জন্য সচেতন অনেকেই মনে করেন যে, অর্থবছরের বাজেটে তামাকের ওপর কর আদায় ও তামাকের দাম বাড়িয়ে দেয়া প্রসঙ্গিক। এতে তামাক ব্যবহারে জনগণের আগ্রহ কমবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে গবেষণার ২০১৭ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ। যার মধ্যে অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৪৮ শতাংশ তামাক ব্যবহার করেন। যেখানে অতি উচ্চবিত্তের মধ্যে এ হার ২৪.৮ শতাংশ। মূলত গ্রামে তামাকের ব্যবহার বেশি। বেশি তামাক ব্যবহারের জায়গাটিতে কিন্তু জনগণের চিকিৎসার সুবন্দোবস্ত, আর্থিক সামর্থ্য যেমন নেই, তেমন নেই কর প্রদানের সক্ষমতা। এই জায়গাটিতে কিন্তু রাজস্ব আয়ের চিন্তা দিয়ে তামাক ব্যবহারে মানুষকে নিরুৎসাহিত করা যাবে না। কারণ অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠী মূল্যবান তামাক গ্রহণ করেন না। এরা শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দেশের যেসব অঞ্চলে তামাক চাষ হচ্ছে, সেই সব অঞ্চলের তামাক চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত জনগোষ্ঠী। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধরা তামাক ব্যবহার করে থাকেন। মারাত্মক রকম পরিবেশ দূষণ হয়। পরিবেশ দূষণ ও তামাক ব্যবহারের কারণে নানা ধরনের মরণমুখী শারীরিক অসুস্থতায় তারা আক্রান্ত হন। ওইসব এলাকায় শিশুদের স্কুলগামিতা নেই। শিশুরাও পরিবারের বড়দের সঙ্গে এই পেশায় যুক্ত হন।

১২ মে পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন কর্তৃক ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস ২০১৯’ উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান ছিল। পিকেএসএফের পর্ষদ চেয়ারম্যান বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. খলীকুজ্জমান আহমদের সভাপতিত্বে এই আয়োজিত অনুষ্ঠানে একটি তথ্য প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যে, তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণে বিকল্প আয়বর্ধনমূলক ফসল উৎপাদন সম্ভব। যা থেকে পেশার পরিবর্তন ঘটিয়ে ক্ষতির হাত থেকে একাধারে তামাক চাষে সংশ্লিষ্টদের, তামাক ব্যবহারীদের এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রকে রক্ষা করা সম্ভব।

ইতোমধ্যে পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন সেই কাজটি করছে তার সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে। তামাক চাষ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন এমন ক’জন কৃষকও তাদের অভিজ্ঞতার কথা বললেন। আগে তারা তামাক চাষ করতেন। তার পর শুরু করেছেন ভুট্টার চাষ। তাদের উপলব্ধি ও প্রচেষ্টা বলে দেয় যে, ক্ষতিকর পেশার পরিবর্তন করে নিজেকে রক্ষা করা যায়, পরিবেশ রক্ষা করা যায় এবং রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা যায়। কিন্তু অনুষ্ঠানের এসব আলোকপাতের মধ্যে প্রধান অতিথি হিসেবে আসন গ্রহণকারী কৃষিমন্ত্রীর তামাক পণ্যে সরকারের রাজস্ব আয়ের চেয়ে জনগণের ক্ষতির পরিমাণ বেশি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে, সরকারের ক্রমবর্ধমান বাজেট প্রসঙ্গ টেনে তামাক পণ্যে রাজস্ব আয়ের ওপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করলেন।

বর্তমানে তামাকপণ্য থেকে যে রাজস্ব আদায় হয় অতীতে সেই পরিমাণ অর্থই নাকি মূল বাজেটের সমপরিমাণ। কৃষিমন্ত্রীর কথাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, তিনি রাজস্ব আয়কে ছোট করে দেখতে চাইছেন না। বরং তিনি হয়তো মনে করছেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য, যাবতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ক্ষতিকর এই রাজস্ব আয় দরকার। অত্যন্ত হতাশ বলছি, মানতে পারছি না। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসম্মত ফসল আবাদ করে একটি দেশের স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করা সম্ভব, এটা বিশ্বাস করতে হবে। প্রয়োজন শুধু উন্নত চিন্তা-চেতনার।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সবাই মিলে চেষ্টা করলে ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই স্বপ্নকে পূরণ করতে হলে প্রথমেই তার সরকারের প্রতিটি সদস্যকে এই বিষয়টি আত্মস্থ করতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে যে, ২০৪০ সালের মধ্যেই বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করা সম্ভব। আর এই বিশ্বাসই তাদের প্রকৃত উন্নয়ন চেতনার দিকে ধাবিত করতে পারে। যাতে তারা বুঝতে সক্ষম হন যে, জাতির জন্য ক্ষতিটা আসলে কিসে হয়। কারণ বিবিএসের তথ্যমতে বাংলাদেশে ২০০৬ সালে ৭৮ হাজার একর জমিতে ৪৩ হাজার টন তামাক উৎপাদন হয়েছিল। যেই চিত্র ২০১৭ এসে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ২৯৭ একর জমিতে ৯১ হাজার ৫৭৩ টন তামাক উৎপাদন।

এই অবস্থা কি বলে দেয় যে, ২০৪০ সালের মধ্যে দেশটিকে তামাকমুক্ত করা সম্ভব? ব্যাপকভাবে বিকল্প আয়বর্ধনমূলক ফসল চাষে কৃষকদের সম্পৃক্ত করতে না পারলে, তা আদতেই সম্ভব নয়। তামাকের ওপর করারোপ বাড়িয়ে তামাক ব্যবহার রোধ করা কিঞ্চিত সম্ভব হলেও, তামাক চাষ রোধ করা যাবে না। আগে তামাক চাষ রোধ করতে হবে। উচ্চবিত্তরা বিদেশি ব্র্যান্ডের তামাক ব্যবহার করেন। সেখানে বেশি কর আরোপ করে রাজস্ব আয়ের চিন্তার চেয়ে তামাক আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা উত্তম। তাহলেই সম্ভবত বাংলাদেশ তামাকমুক্ত হবে।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক।

শিক্ষা পণ্যের বিশ্বায়ন
                                  


ড. মীজানুর রহমান

শিক্ষা অবশ্যই মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে এবং মানুষকে বুদ্ধিমান করে তোলে। বুদ্ধিমান হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি দ্রুত পরিবর্তিত কোনো পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেন। বর্তমানে শিক্ষাকে একটি পণ্য হিসেবে দেখা হয়। শিক্ষা যদি একটি পণ্য হয়, তাহলে শিক্ষা নামক পণ্যের একটি সংজ্ঞা দিতে হবে। পণ্য হচ্ছে তা-ই, যা মানুষের কাজে লাগে। মার্কেটিংয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে, পণ্য হচ্ছে ক্রেতার সমস্যা সমাধানের উপায়। পৃথিবীতে একসময় গুরুকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ছিল। অর্থাৎ একজন মানুষ প্রাকৃতিকভাবে বা কোনো না কোনোভাবে শিক্ষিত হলেন, পরে তিনি তাঁর আশপাশের মানুষদের শিক্ষা দিতেন। ওই শিক্ষিত ব্যক্তি আরো উচ্চপর্যায়ে উপনীত হলে দেশ-বিদেশ থেকে মানুষজন তাঁর কাছে শিক্ষা অর্জনের জন্য আসত। তিনি জ্ঞান বিতরণ করতেন। অ্যারিস্টটল কিংবা প্লেটোর আমলে এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা ছিল। বিষয়টি এমন যে কেউ একটা কিছু শিখলেন এবং সমাজের উপকারে সেই শিক্ষায় অন্যদের দীক্ষিত করলেন।

বর্তমানে শিক্ষার সঙ্গে অর্থের বিষয় মুখ্য হয়ে উঠছে। এখনো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষা অর্জন একেবারে ফ্রি। শিক্ষিত মানুষের মৌলিক অধিকার বিবেচনায় রাষ্ট্র শিক্ষার সব খরচ বহন করে। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। রাষ্ট্র যখন শিক্ষাখরচ পুরোটা বহন করতে পারছে না, তখন সমাজে ভিন্ন ব্যবস্থা গড়ে উঠছে। অর্থাৎ সমস্যার সমাধান করতে অনেকে এগিয়ে আসছে। ফলে বেসরকারিভাবে শিক্ষা কার্যক্রম-ব্যবস্থা গড়ে উঠছে। বেসরকারি ব্যবস্থা সুযোগ নিচ্ছে। কিন্তু বেসরকারি ব্যবস্থায় বিনা স্বার্থে কেউ কোনো কাজ করে না। তাদের প্রধান লক্ষ্য মুনাফা অর্জন করা। মুনাফা অর্জন না করে কেউ টিকে থাকতে পারবে না। আর মুনাফা আসে মূল্য থেকে। মূল্য নির্ধারণ করলেই শুধু মুনাফা আসবে। কাজেই এই দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষা অবশ্যই একটি পণ্য এবং ভালোমানের লাভজনক পণ্য। দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে আমরা যেমন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বা প্রযুক্তি ক্রয় করি, তেমনি শিক্ষাও একটি ক্রয়যোগ্য পণ্য। বর্তমানে এটাকে কেউ ফ্রি দেবে না, কিনতে হবে।

কিন্তু কথা হচ্ছে শিক্ষা ব্যবসায়কে শুধু মুনাফা অর্জনের হাতিয়ারে পরিণত করব কি না। অনেক শিক্ষা ব্যবসায়ী রয়েছেন, যাঁরা ক্রেতাদের নানাভাবে ফাঁকি দিচ্ছেন। সেখানে শিক্ষা পণ্যের গুণগত মান বজায় না রেখে ক্যাশ খামে দেওয়া হচ্ছে, যাকে সার্টিফিকেট বাণিজ্য বলা যেতে পারে। এমন কাজে লিপ্তরা অসাধু ব্যবসায়ী। বিশ্বের সবচেয়ে ভালো বিশ্ববিদ্যালয় এমআইটি, হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনা খরচে কিছু পড়ানো হয় না। পৃথিবীর ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্রি পড়ানো হয় কিংবা পুরো খরচ সরকার খরচ বহন করে, এমন নজির নেই। সেখানেও শিক্ষা কিনতে হয়। ব্রেন ড্রেইন আসলে খুব সনাতনি ধারণা। বলা হয়ে থাকে, দেশের মেধা পাচার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বায়নের যুগে মেধা পাচার হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আগে মনে করা হতো আমাদের দেশের একজন ভালো বিজ্ঞানী আমেরিকায় চলে গেলেন, এতে দেশ বঞ্চিত হলো, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। ওই বিজ্ঞানী আমেরিকায় গিয়ে কিছু আবিষ্কার করলেন, ঠিক তার পরদিন বাংলাদেশের লোকজন তা পেয়ে যাচ্ছে। ফলে মেধা আর চলে যায় না; আর যাওয়ার সুযোগও নেই। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালে এর চেয়ে বেশি কিছুই হতো না। অক্সফোর্ডে যা পড়ানো হয়, আমাদের এখানেও তা পড়াতে বাকি নেই। সেখানে শিক্ষকরা যেসব বই পড়ান, আমাদের শিক্ষকরাও তাই পড়াচ্ছেন। গবেষণাগারে ও গবেষকদের মান অর্জন করা গেলে ঢাকায় বসেই একই মানের গবেষণা করা এখন অসম্ভব নয়। একজন ব্যক্তি বিদেশ চলে গেলেন, আর এতে দেশের বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল, এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। কারণ আমাদের গবেষণার ক্ষেত্রে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ল্যাবরেটরিতে বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা খরচ করার মতো অর্থ আমাদের নেই, প্রয়োজনীয় উপকরণ নেই।

কাজেই গবেষণার জন্য বাইরে যেতেই হবে। আমাদের একজন গবেষক যখন নাসার মতো জায়গায় কাজ করেন তখন তাঁকে বাংলাদেশে নিয়ে এসে কী কাজ করানো যেতে পারে? তিনি এখানে এসে কী করবেন। এটাই আমাদের বাস্তবতা। তাঁকে ফেরত নিয়ে এসে কী অনার্সের ক্লাস করানো যায়। বরং তিনি সেখানে ভালো জায়গায় গবেষণা করছেন। সেটাই বরং ভালো। তাঁর গবেষণার ফলাফল আমরা বাংলাদেশ থেকেই ভোগ করতে পারব। আমরা এখন দৈনন্দিন জীবনে যা কিছু ব্যবহার করছি, তার কোনো কিছুই আমাদের উদ্ভাবন না। আমাদের দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন সীমিতসংখ্যক। আমরা দেশের মেধাবীদের জায়গা দিতে পারছি না। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আসনের জন্য ৭০ জন শিক্ষার্থী আবেদন করেন। সেখানে বিদেশিদের সুযোগ দেওয়া হবে কিভাবে? তবে বেসরকারি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কিছু বিদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। আমরা যদি সবাইকে ভালো সুযোগ, ল্যাবরেটরির সুবিধা দিতে পারতাম, তাহলে অনেকে গবেষণা এখানেই করতে পারতেন। তাহলে ঠিক ছিল। কিন্তু তা নেই। কাজেই আমাদের প্রচুর শিক্ষার্থীকে বিদেশ যেতে হবে এবং যাওয়ার দরকার রয়েছে। বিদেশ গিয়ে ফিরে না এলেও কিছু যায় আসে না। বরং সেখানেই কাজ করুন। কেননা আমরা জনশক্তি রপ্তানির ব্যবস্থা রেখেছি। কেউ যদি বিদেশে পড়াশোনা শেষে নিজের কর্মসংস্থান করতে পারেন, তাহলে ভালো। সৌদি আরবে ৫০ জন কর্মী পাঠানোর চেয়ে কিং ফয়সাল বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক পাঠাতে পারলে বরং তিনি অনেক বেশি রেমিট্যান্স পাঠাবেন। আমাদের এখানে শিক্ষকতা কম আকর্ষণীয় হওয়ার কারণে তাঁরা বাইরে থেকে যাচ্ছেন-এমন ভাবারও কারণ নেই।
আমাদের এখানে বর্তমানে সেই দিন আর নেই। বাংলাদেশে একজন প্রফেসর সবকিছু নিয়ে এক লাখ টাকার বেশি বেতন পান। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেতন আরো কয়েক গুণ বেশি। বাইরে যাঁরা শিক্ষকতা করছেন, তাঁদের জীবনযাত্রা বেশি উন্নত, বেতন বেশি, এমন মনে করারও কোনো কারণ নেই। আমাদের একজন শিক্ষার্থী যদি বাইরে যাওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে সে লেখাপড়া শিখে বিদেশে থেকে যাক, সমস্যা নেই। আমরা কেন বিদেশিদের ডেকে নিয়ে এসে এখানে পড়াব। এগুলো পুরনো ধারণা। যেখানে যে পণ্য ভালো পাওয়া যাবে, ক্রেতারা সেখান থেকে কিনবে। শিক্ষারও একই অবস্থা। অভিভাবকরা যখন সন্তানের পড়াশোনার পেছনে অর্থ ব্যয় করেন, তখন সেটাকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখেন। যার ফলে এমবিএ পড়ার জন্য সবাই ব্যস্ত থাকেন। তবে শিক্ষার তো মানবিক মূল্যবোধ থাকতেই হবে। আমরা যে যা-ই পড়ি না কেন, সেখানে যেন মানবিক মূল্যবোধকে বাদ দেওয়া না হয়। বিশ্বের কোথাও শুধু সায়েন্স কিংবা ডাক্তারি পড়ানো হয় না। সেখানে সবাইকে কলা ও সমাজবিজ্ঞানও পড়তে হয়। আমাদের দেশেও সামাজিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার জন্য অনেক বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। হেকেপ প্রজেক্টের আওতায় বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করা হচ্ছে। বর্তমানে বিজ্ঞান আরো প্রসারিত হচ্ছে। কম্পিউটার সায়েন্সের ভবিষ্যৎ কী হবে?  এরই মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিক সায়েন্স চলে এসেছে। কম্পিউটার ভবিষ্যতে কেউ হয়তো ছুঁয়েও দেখবে না। টাইপ করার দরকার হবে না। মুখের কথা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কম্পোজ হয়ে যাবে। কোনো প্রযুক্তিই সর্বশেষ প্রযুক্তি নয়। এটা আরো পরে আসবে। বর্তমানে শিক্ষা পণ্যের বাজারে প্রশ্নপত্র ফাঁস একটি বড় সমস্যা। আমি মনে করি, যাঁরা সন্তানের জন্য প্রশ্নপত্র ক্রয় করেন এমন অভিভাবকদের ধরে ফাঁসি দেওয়া দরকার। যাঁরা ছেলে-মেয়ের জন্য পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি না করে রাত জেগে ইন্টারনেটে প্রশ্নপত্র খোঁজেন, এমন অপরাধী অভিভাবকদের কঠোর শাস্তি দেওয়া দরকার। আর প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের বিরুদ্ধে তো ব্যবস্থা নিতেই হবে। চাহিদা ও সরবরাহ দুই দিক থেকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা যাবে না।
লেখক : উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

গণপরিবহন কবে নিরাপদ হবে
                                  

শান্তা ফারজানা
বাংলাদেশে মানুষের জীবনের মূল্য এখন কোন পর্যায়ে তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করার সময় এসেছে। দেশে এখন এমনই এক পরিস্থিতি বিরাজ করছে যে সামান্য ভাড়া নিয়ে তর্ক-বিতর্কের জের ধরে মানুষ হত্যা করছে মানুষকে। সেই স্কুল জীবন থেকে একজন সচেতন মানুষ হিসেবে বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের ছোট্ট ছোট্ট বিষয় থেকে শুরু করে অনেক গভীর বিষয় পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করেছি, লিখেছি, মানুষকে সচেতন করেছি। এখনও করছি। কেননা, নতুনপ্রজন্মের প্রতিনিধি আমি-আমরা। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, রুপসা থেকে পাথুরিয়া আমাদের রাজনীতি-অর্থনীতি-শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি-সমাজ-সভ্যতাসহ বহুমুখী চেষ্টা চলছে মানুষের কল্যাণের জন্য। আর তাই যখন দেখি-গাজীপুর সদর উপজেলার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বাঘের বাজারে বাসের ভাড়া নিয়ে বাকবিতন্ডার জেরে এক যাত্রীকে চাপা দিয়েছে বাসের চালক। তখন ব্যথিত হই, জর্জরিত হই বেদনায়। আমরা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম! না, তাহলে কেন- এ ঘটনায় বাসটি আটক করা হলেও চালক ও সহযোগীকে আটক করা যায়নি। যতদূর জেনেছি, নিহত যাত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ (৩৫) ঢাকার আলুবাজারের মৃত শাহাব উদ্দিনের ছেলে। তিনি গাজীপুর সদর উপজেলার বাঘের বাজার এলাকার আতাউর রহমান মেম্বারের বাড়িতে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করতেন। তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে গাজীপুর সদর উপজেলার বাঘের বাজারের বাড়িতে ফিরতে ময়মনসিংহ থেকে ‘আলম এশিয়া’ বাসে ওঠেন। পথে বাসের ভাড়া নিয়ে স্বামীর সঙ্গে হেলপারের বাগবিতন্ডা হয়। একপর্যায়ে বাসের ভেতরেই স্বামী সালাহ উদ্দিনকে মারধর করেন বাসের হেলপার। মারধরের ঘটনাটি মুঠোফোনে বাঘের বাজার এলাকার স্বজনদের অবহিত করেন সালাহ উদ্দিন। বাসটি বাঘের বাজারে পৌঁছালে সালাহ উদ্দিন নেমে বাসের গতিরোধের চেষ্টা করেন। এ সময় সালাহ উদ্দিনকে চাপা দিয়ে চালক দ্রুতগতিতে বাসটি নিয়ে ঢাকার দিতে চলতে থাকে। পরে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে হোতাপাড়া ফু-ওয়াং কারখানার সামনে নিয়ে বাসের গতি কমিয়ে নিহতের স্ত্রী পারুলকেও চলন্ত বাস থেকে ফেলে দেয় হেলপার। হায়রে বাংলাদেশ! শেষ হবে না এই দুর্ভোগ-মৃত্যু উপত্যকার রাজনীতি! যদি শেষ না হয়, আমরা হারাবো বেদনার অতল গহ্বরে এভাবেই যেভাবে হারিয়েছে নিহতের স্ত্রী পারুল। গণমাধ্যম বলছে- ঈদের সময় আগে ও পরে সড়ক, রেল, নৌ পথে অনাকাক্সিক্ষত হারে বেড়ে যায় ভাড়া। প্রতিবছর ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়া এবং ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার সময় যাত্রীসাধারণকে অতিরিক্ত বাসভাড়া গুনতে হয়। চাহিদা বেড়ে গেলে দামও বাড়েÑবাজারের এই সাধারণ নিয়মে ঈদের ছুটিতে বাসভাড়া বেড়ে থাকে। কিন্তু যে মাত্রায় ভাড়া বাড়ে তার কোনো যৌক্তিকতা বা ন্যায্যতা খুঁজে পাওয়া যায় না; বলা চলে, বাসভাড়া নিয়ন্ত্রণহীন ও খেয়ালখুশিমতো বাড়ানো হয়। সেভ দ্য রোড এর মহাসচিব হিসেবে বাংলাদেশের রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলা শহরের হাজার হাজার সাধারণ মানুষের সাথে কোন না কোন ভাবে কথা হয়, হয় আলোচনা। আর সেই আলোকে বলতে পারি- যাত্রীসাধারণ এই ভাড়া বাড়ানোকে বলে জুলুম। এই জুলুম চলে অবাধে। কারণ, সরকারি কোনো কর্তৃপক্ষ এ ক্ষেত্রে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার কার্যকর চেষ্টা করে না; বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ব্যর্থতার কারণে বাসভাড়া আদায়ের ক্ষেত্রে একধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় বলে আমি মনে করি। আমাদের সড়ক পরিবহনের সংস্কৃতি বলছেÑ ঈদের সপ্তাহ দুই আগে থেকেই দূরপাল্লার বাসের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়,স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে লোকজনকে টিকিট কিনতে হয় অতিরিক্ত টাকা খরচ করে।
অথচ, সারাদেশের জন্য সরকার কিলোমিটার প্রতি বাসভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছে, কিন্তু সেই নির্ধারিত হারের বেশি ভাড়া যেন কেউ আদায় করতে না পারে, এ রকম কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে বাসভাড়া বাড়ে পরিবহন মালিকদের ইচ্ছেমতো এবং প্রতিবছর ঈদের সময়ে এটা একটা অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়। কিন্তু এই অবস্থা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই ক্ষেত্রে সেভ দ্য রোড মনে করে, শৃঙ্খলা আনা বিআরটিএর জরুরি কর্তব্য। শুধু এখানেই শেষ নয়, আর যেন কোথাও কোনভাবে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়া এই ভাড়া কাউকে দিতে না হয়, সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে এভাবে ভাড়া যদি বাড়াতেই হয়, তবে বৃদ্ধির হার যেন যুক্তিসংগত হয় এবং বর্ধিত হার একবার নির্ধারিত হয়ে গেলে যেন সেই হারের চেয়ে একটি টাকাও বেশি দিয়ে কাউকে টিকিট কিনতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কাজটি বিআরটিএকে করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে বাসমালিক ও শ্রমিকদের সংগঠনগুলোর আন্তরিক সহযোগিতার প্রয়োজন।
আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, আরেকটি মহামারী হচ্ছে সড়ক পথ দুর্ঘটনা। বিশেষ করে ঈদের সময় সড়ক পথ দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। মহাসড়কে যেন শুরু হয় মৃত্যুর মিছিল। অনেক আনন্দের ঈদযাত্রা শেষ পর্যন্ত শোকযাত্রায় পরিণত হয়। আর এটা প্রতিবছর বাড়ছে। ২০১৮ সালে ২৭৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩৯ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৬৫ জন আহত হয়। কিন্তু চলতি বছরে ঈদুল ফিতরের দিনই সাত জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় ২০ জন নিহত হওয়ার খবর দিয়েছে সংবাদ মাধ্যম। এদের মধ্যে ফরিদপুরে ছয়জন, লালমনিরহাটে তিনজন, ঝিনাইদহে দুইজন, ঢাকার সাভারে এক পুলিশ সদস্য, নরসিংদীতে তিনজন, টাঙ্গাইলে দুইজন ও সিরাজগঞ্জে তিনজন নিহত হয়েছেন। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ফরিদপুর সদর উপজেলার ধুলদী রেলগেট এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। এতে আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২৩ জন। অন্যদিকে, লালমনিরহাটে পিকআপ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে তিনজন নিহত হয়েছেন। ঝিনাইদহের মহেশপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেলের দুই আরোহী নিহত হয়েছেন। এতে আরও একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। ঈদের সকালে সাভারের আশুলিয়ার বলিভদ্র এলাকায় পুলিশবাহী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে লিচুবোঝাই ট্রাকের সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন পুলিশের কনস্টেবল নাদিম হোসেন। এ ঘটনায় শিল্প পুলিশের আরও তিন সদস্যসহ মোট চারজন আহত হয়েছেন। নরসিংদীতে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১০ জন। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভগিরথপুর এলাকায় বাস সংঘর্ষে নিহত হন দুইজন, আহত হন কয়েকজন। ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কের কালিহাতী উপজেলার সল্লা এলাকায় পিকআপ ভ্যানে বাসের ধাক্কায় দুই যুবক নিহত হয়েছেন। এতে আহত হয়েছেন আরও সাতজন। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে পৃথক তিনটি সড়ক দুর্ঘটনায় ট্রাকচালক ও হেলপারসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। এ সব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৩ জন। শুধু এখনেই শেষ নয়; এই পথে হত্যার পাশাপাশি ধর্ষণের ঘটনাও ঘটছে অহরহ। মনে আছে আমাদের বোন মিতু, তানিয়া সহ আরো অনেককে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা। তবু বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়ায় না, দাঁড়ানো উচিৎ এখনই। কেননা, সেভ দ্য রোড এর রিসার্চ সেল এর তথ্য অনুযায়ী, বছরে সারাদেশে যত সড়ক দুঘর্টনা ও প্রাণহানি হয় তার ১৪-১৫ শতাংশ হয় দুই ঈদের আগে পরে ১৫ দিনে । এর প্রধান কারণ, এসময় অবৈধ যানবাহন এবং অদক্ষ ও বেআইনি চালক বেড়ে যায়। চাহিদা বাড়ায় ট্রিপ বাড়ে এবং বাড়ে বেপরোয়া গতি। ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ও যাত্রীদের তাড়াহুড়ো করার ফলে বিশৃঙ্খলা বাড়ে, দুর্ঘটনাও বৃদ্ধি পায়; এখন যুক্ত হয়েছে আবার হত্যা-ধর্ষণ।
মূলত, ঈদের সময় যানবাহন এবং সড়কের একটা আলাদা ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। হাইওয়ে পুলিশকে অনেক বেশি কার্যকর ও তৎপর হতে হবে। এটা করা গেলে ঈদের আগে পরে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা যাবে। আমরা মূলত, একটি সুন্দর দেশ চাই। যে দেশে সন্তান মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কাজ শেষে আবারো মায়ের কোলেই ফিরে আসবে। এই প্রত্যাশার পাশাপাশি সেভ দ্য রোড কর্মী হিসেবে, বাংলাদেশের রাজনীতিসহ বিভিন্ন স্তরের রাজপথ কর্মী হিসেবে, বরাবরের মতো সেভ দ্য রোড এর প্রাণের ৭ দফা ৪ পথ নিরাপদ করতে  সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশ্যে আবারো উপস্থাপন করছি- ১. মিরেরসরাই ট্রাজেডিতে নিহতদের স্মরণে ১১ জুলাইকে ‘নিরাপদ পথ দিবস’ঘোষণা করতে হবে। ২. ফুটপাত দখলমুক্ত করে যাত্রীদের চলাচলের সুবিধা দিতে হবে। ৩. সড়ক পথে ধর্ষণ-হয়রানি রোধে ফিটনেসবিহীন বাহন নিষিদ্ধ এবং কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ ও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যতিত চালক-সহযোগি নিয়োগ ও হেলপার দ্বারা পরিবহন চালানো বন্ধে সংশ্লিষ্ট সকলকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ৪. স্থল-নৌ-রেল ও আকাশ পথ দূর্ঘটনায় নিহতদের কমপক্ষে ১০ লাখ ওআহতদের ৩ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ সরকারীভাবে দিতে হবে। ৫. ‘ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স রুল’ বাস্তবায়নের পাশাপাশি সত্যিকারের সম্মৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে ‘ট্রান্সপোর্ট পুলিশ ব্যাটালিয়ন’ বাস্তবায়ন করতে হবে। ৬. পথ দূর্ঘটনার তদন্ত ও সাজা ত্বরান্বিত করণের মধ্য দিয়ে সতর্কতা তৈরি করতে হবে এবং ট্রান্সপোর্ট পুলিশ ব্যাটালিয়ন গঠনের পূর্ব পর্যন্ত হাইওয়ে পুলিশ, নৌ পুলিশ সহ সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা-সহমর্মিতা-সচেতনতার পাশাপাশি সকল পথের চালক-শ্রমিক ও যাত্রীদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সকলপরিবহন চালকের লাইসেন্স করতে হবে। ৭. ইউলুপ বৃদ্ধি, পথ-সেতু সহ সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়ে দূর্নীতি প্রতিরোধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যাতে ভাঙা পথ, ভাঙা সেতু আর ভাঙা কালভার্টের কারনে নতুন কোন প্রাণ দিতে না হয়।   
ভালোবাসি দেশ-মানুষ; সংসার-সন্তান বা বৈষয়িক কোন কিছু নিয়েই ভাবিনি কখনো। যে কারণে নিরাপদ দেশ-মানুষ সবসময় প্রত্যাশা ছিলো, আজো আছে, থাকবে আজীবন, থাকবে এই দাবী। বরাবরের মতো আবারো সবার প্রতি অনুরোধ দেশ বাঁচাতে, নিজেকে বাঁচাতে আসুন নিরাপদ ৪ পথের জন্য এগিয়ে যাই।

জামায়াতীদের নাগরিক মর্যাদা
                                  

বিগত কুড়ি-শতক কালপর্ব মানব সভ্যতার অভাবনীয় অগ্রগতিতে যেমন আলোকিত, তেমনি সভ্যতার চরম অধোগতির কালিমালিপ্ত ঘটনাতেও আকীর্ণ সে ইতিহাস। বিগত শতকে বিশ্ববাসী মানবতার চরম অবমাননা প্রত্যক্ষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে, যখন হিটলারের নাৎসী জার্মানী জাতিগত ইহুদী-নিধন অভিযান সুসংগঠিত-বিস্তৃত আকার দেয়। হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের গ্যাস চেম্বারে লাখ লাখ মানুষ হত্যার ঘটনা যুদ্ধ চলাকালে কেউ ধারণাও করতে পারেননি। একেবারে চুড়ান্ত লগ্নে সোভিয়েত লাল ফৌজ এবং মার্কিন বাহিনী জার্মান ভূখন্ডে প্রবেশ করলে আবিস্কৃত হয় গ্যাস চেম্বাররুপী রক্তহীম করা জল্লাদখানা।
যুদ্ধ-সংঘাতের অনুসঙ্গ যুদ্ধাপরাধ বিচারের জন্য যে আলদা দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন সে শিক্ষা মানবজাতি প্রথম উপলব্ধি করে দ্বিতীয় মহাসমরের নির্মমতা প্রত্যক্ষ করার পর। বিশ্বযুদ্ধের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অতঃপর বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠা করে জাতিসংঘ এবং ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার সনদের পাশাপাশি গণহত্যা প্রতিরোধে গৃহীত হয় জেনোসাইড কনভেনশন।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, জেনোসাইড কনভেনশন প্রণীত হলেও বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর অনৈতিক খেলায় নিপীড়িত মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোর কোন লক্ষ্যণীয় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ আর দেখা যায়নি। যুদ্ধাপরাধের প্রতিবিধান বা বিচার সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিরাজমান এ বন্ধ্যা সময়টিতে বাংলাদেশসহ আর্জেন্টিনা, চিলি, ইন্দোচীনের কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, আফ্রিকার রুয়ান্ডা, বলকান অঞ্চলের বসনিয়া-হার্জেগোভিনা এবং ক্রোয়েশিয়ায় সংঘটিত হয় লোমহর্ষক গণহত্যা এবং জাতিগত নিশ্চিহ্নকরণ অভিযান।
সে যাই হোক, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর যুদ্ধক্লান্ত দেশগুলোতে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তিদের বিচারের পাশাপাশি তাদের পরবর্তী বংশধারা সম্পর্কে নেয়া হয় বিশেষ উদ্যোগ। জার্মানীতে নাজিবাহিনীর নৃশংসতা অনুধাবনের সুযোগ দেয়া হয় অপরাধীচক্রের পরবর্তী বংশধরদের। তাদের দেখানো হয় যুদ্ধাপরাধের সাইটগুলো এবং মোটিভেশনের মাধ্যমে ঘৃণা করতে উদ্বুদ্ধ করা হয় পূর্বপুরুষের কৃতকর্ম। নাজীবাদের রাজনীতি চিরতরে নিষিদ্ধ, নাগরিক অধিকার সীমিতকরণসহ সামাজিক নানা বিধিনিষেধের আওতায় রাখা হয় তাদের। বিশ্বযুদ্ধের শিকার অপরাপর দেশগুলোতেও গৃহীত হয় অনুরূপ ব্যবস্থা।   
ইন্দোচীনে মার্কিন হামলার শিকার ভিয়েতনাম আগ্রাসন-মুক্তির পর দখলদার মার্কিন বাহিনীর সহযোগী দেশীয় অপরাধীদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করে আরও কঠোর ব্যবস্থা। সেখানে অপরাধী পরিবারগুলোর সদস্যদের নাগরিক মর্যাদা অবদমন, ভোটাধিকার হরণ এবং সরকারী কর্মক্ষেত্রে তাদের নিষিদ্ধ করা হয়। একজন ভিয়েতনামীর পাশে এদের অবস্থান হয় স্রেফ ভারবাহী পশুর মত। এরা ভিয়েতনামে নানা অবরোধের শিকার হয়েই আছে। জাতির মূলধারায় ফিরতে চাইলে অনেক বাধাবিপত্তি অতিক্রম করেও তা সম্ভব করা অত্যন্ত কঠিন।

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পর অস্ত্র হাতে মুক্তিযোদ্ধারা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্বাধীনতা বিরোধীদের ‘ফাইনাল স্যলিউশন’ টানতে বঙ্গবন্ধুর ফেরার অপেক্ষায় থাকেন। ১০ জানুয়ারী দেশে ফিরে পরিস্থিতি আঁচ করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নিরস্ত্র করার উদ্যোগ নেন এবং আরেকটি নিশ্চিত ‘ব্লাডশেড’ পরিহার করেন। বাহাত্তরের ২৪ জানুয়ারী সরকার ‘বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) অধ্যাদেশ-১৯৭২’ ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এদেশীয় সহযোগীদের বিচারের জন্য গঠন  করে ৭৩টি ট্রাইব্যুনাল। ‘৭৩ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত দালাল অধ্যাদেশে অভিযুক্ত হয় ৩৭,৪৭১ ব্যক্তি, অভিযোগ নিষ্পত্তি হয় ২,৮৪৮টি এবং মাত্র ৭৫২ অভিযুক্তকে দেয়া হয় দণ্ডাদেশ। একই বছরের ৩০ নভেম্বর দালালদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাঙালীরা জানে, কিভাবে ক্ষমা করতে হয়’।

পঁচাত্তরের পনের আগষ্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি জামায়াত-বান্ধব বললে অত্যুক্তি হবে না। এ সময়টিতে কুখ্যাত স্বাধীনতা-বিরোধীদের উত্থান ঘটে সর্বত্র। অনুকূল পরিস্থিতির পূর্ণসুযোগ নিয়ে জামায়াত সংগঠন গোছাতে লেগে পড়ে । শিক্ষাঙ্গণে আগমন ঘটে চরম প্রতিক্রিয়াশীল ছাত্রশিবিরের। একইসাথে আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়তে উদ্যোগী হয় জামায়াত। বলাবাহুল্য, এ সবকিছুতে তারা সফল হয় দারুণভাবে।
পঁচাত্তর পরবর্তী চৌত্রিশ বছর দেশের রাজনীতিতে জামায়াত সদম্ভেই ছড়ি ঘুরিয়েছে। ২০০৯ সালের পর তারা প্রথমবারের মত কঠিন বাধার সম্মুখিন হয়- মানবতাবিরোধী  অপরাধ বিচারের জন্য গড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কাজ শুরু করলে। এর আগে রাজনীতিতে জাপা, বিএনপি এমন কি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগকেও ঘোলা পানি খাইয়েছে এই জামায়াত। ফাঁদে ফেলে আওয়ামী লীগকে রাজাকার-আলবদর শব্দ উচ্চারণই করতে দেয়নি ‘৯৬ সালে বেশ কিছুদিন। বিএনপিকে বাধ্য করেছে নিজস্ব রাজনীতি ভূলে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর গাড়ীতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তুলে দিতে। সেই সাথে স্বাধীনতাপ্রিয় বাংলাদেশের মানুষের মনে সর্বদা ভীতিকর অস্তিত্ব নিয়ে বিরাজ করেছে জামায়াতে ইসলামী।
জামায়াতের এই বিধংসী রাজনীতি বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতিতে কি মাত্রায় ক্ষতিকর প্রভাব ছড়িয়েছে তা ভালভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। আরও দরকার, রাজনৈতিক সম্প্রীতি কলুষিত করার মধ্য দিয়ে একাত্তরে পরাজিত জামায়াতের শবাধারে বিজয় কেতন উড়ানো বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় বাধা সৃষ্টির সুদূরপ্রসারী জামায়াতী অশুভ প্রয়াস নিয়ে কার্যকর গবেষণা।  ভাল হয়, কাজটি যদি জামায়াতের হটকারী রাজনীতির খপ্পরে নাজেহাল ভূক্তভোগী রাজনীকিরা করেন।
বাস্তবতা হলো, শান্তির ধর্ম ইসলামকে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ প্র্যাকটিস করায় মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনের অসন্তুষ্টিতে পড়া স্বাধীনতা-বিরোধী  জামায়াতী তরিকায় আসক্তদের ‘মানুষ’ হওয়াটা করুণাময় আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তবে ‘মান এবং হুঁশ’ নিয়ে যে মানবসত্ত্বা, তাতে ঘাটতিজনিত কারণে আজন্ম হটকারী জামায়াত সমর্থনকারীরা বুঝতে অক্ষম যে, পবিত্র কুর’আন শরীফের বয়ান শুনিয়ে আসলে তাদের কোন্ গাড্ডায় টেনে নামানো হয়েছে। এ হলো মানবজাতির চিরশত্রু ইহুদী জায়নবাদের ‘আমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি’ তত্ত্বের ভয়ানক বর্ণবাদী নিজস্ব আবিষ্কার, যা কাজে লাগিয়ে জায়নবাদের মুরুব্বীরা শতশত বছর তাদের কর্মীদের মনে ভিন্ন জাতিগোষ্ঠির বিরুদ্ধে অবিরাম জিঘাংসা জিইয়ে  রাখতে সক্ষম হয়েছে।
সৌভাগ্যবশত, ন্যায় বিচারক সুমহান আল্লাহর ইচ্ছায় সুদীর্ঘ সাতচল্লিশ বছর পর হলেও জুলুমবাজ জামায়াতীরা স্বীয় হটকারীতার উপযুক্ত প্রতিবিধান ন্যায্যতার ভিত্তিতেই পেয়েছে, এখনও পাচ্ছে এবং আগামীতেও পাবে- ইনশাআল্লাহ।

সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামী গড়ে তোলার অভিপ্রায় সম্পর্কে বলা হয় যে, সময়ের পথ পরিক্রমায় ইসলাম ধর্মে পুঞ্জিভূত আনাচার বিদূরণে ‘সামাজিক আন্দোলন’ পরিচালনার মহৎ উদ্দেশ্যে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু চাক্ষুস সত্য যে, জামায়াতপন্থীরা অচিরেই লক্ষ্যচ্যুৎ হলে সংগঠনটি ক্রমাগত সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং চরম হটকারীতার ধারক হিসেবে পরিচিতি অর্জন করে। জামায়াতের জন্মস্থান পাকিস্তান ভূখন্ডেই রয়েছে এর নানা প্রমাণ।

জামায়াতের মানবতা বিরোধী বিজাতীয় তরিকা সরলপ্রাণ গণমানুষের প্রতি অতিশয় জিঘাংসা-প্রবণ। ‘৭১ সালে নিরপরাধ সাধারণ মানুষের সহায় সম্পদ ইসলামী পরিভাষায় ‘মালে গণিমত’ সাব্যস্ত করে তদনুযায়ী নিষ্ঠুরতার চুড়ান্ত কর্মব্যবস্থা কার্যকর করেছিল জামায়াতের নেতা-সমর্থকরা। বাংলাদেশে পাইকারী গণহত্যা, বাছবিচারহীন নারী ধর্ষণ, জোরপূর্বক দেশান্তর, হেট ক্যাম্পেইন, সম্পদ বিনাশের মত ঘৃণ্য অমানবিক পদক্ষেপে তারা কেবল সহায়তাই করেনি, পবিত্র ইসলাম ধর্মের অপব্যাখ্যা করে তাতে নিজেরাও অংশ নিয়েছিল সমান আন্তরিকতায়। এর মধ্য দিয়ে জামায়াত তাদের ধারাবাহিক হঠকারীতার চুড়ান্ত প্রমান রাখে। অর্থাৎ ইসলাম পরিশুদ্ধির এজেন্ডা ছেড়ে শুরুতেই জামায়াত যে বিধংসী রাজনীতি চর্চায় মনোযোগী হয়েছিল তা অব্যহত রেখেছে আগাগোড়া, কেবল ঢাল হিসেবে ধর্ম ইসলাম ঝুলিয়ে রেখেছে সামনে।

একই সাথে জামায়াত সমর্থকরা আল্লাহ‘র মেহেরবানীর পরোয়া না করে দুনিয়ায় সদম্ভে কায়েম করার চেষ্টা করেছে নিজেদের ‘হেকমত’। জামায়াতীদের এই হেকমতি তৎপরতা ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে মানুষ এবং ভূখন্ডের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির কারণ ঘটানো ছাড়া কখনো কল্যাণ সাধনে সক্ষম হয়নি। আর সে কারণে ন্যায়-পরায়ণ আল্লাহ তাদের মতলবী হেকমত পছন্দ করেননি এবং অপমান-লাঞ্ছনা-পরাজয় অবিরত তাড়া করে ফিরছে জামায়াতীদের। সুতরাং পরম করুণাময়ের ইচ্ছার প্রতি অনুগত থেকে জামাযাতীদের ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করাটাই হচ্ছে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসীদের কর্তব্য।

আমাদের অভিজ্ঞতায় স্বাধীনতা বিরোধী বিকৃত চিন্তা-চেতনার ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াতের বর্তমান অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে সময়োপযোগী করণীয় নির্ধারণ অত্যন্ত জরুরী। মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তি কড়া নাড়ছে আমাদের দুয়ারে। এখনও নিঃশেষিত হননি আমাদের জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা এবং মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষকারী সাহসী প্রজন্ম। সুতরাং পরাজয়ের গ্লানিজনিত কারণে স্বাধীনতা-বিদ্বেষী জামায়াতগোষ্ঠি সম্পর্কে অতীতে গৃহীত ঐতিহাসিক ভূল অথবা বিভ্রান্তি- যাই বলা হোক না কেন, দেশ-জাতির বৃহত্তর কল্যণে সংশোধন করাটা এখন সময়ের দাবী।
ইতোমধ্যে, নিজেদের দুষ্কর্মের কাফ্ফারা চুকাতে বাধ্য হয়েছে জামায়াতের শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীরা। দলীয় নিবন্ধন বাতিলের মধ্য দিয়ে বাধাগ্রস্ত হয়েছে জামায়াতের রাজনৈতিক সক্রিয়তার সুযোগ। এগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে। ফলে দাপট হারিয়ে জামায়াতে ইসলামী আপাতত রাজনৈতিক পরনির্ভরতা স্বীকারে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট নয়। একটি অনিষ্টকর আদর্শ হিসেবে জামায়াতের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি না ঘটলে কালক্রমে এ বিষবৃক্ষের ছায়াবিস্তারী ডালপালা নিষ্ক্রীয় বসে থাকবে না। যেমন হয়েছে অতীতে। কাজেই ভবিষ্যতে আর কেউ যেন জামায়াতের কাফেলায় আশ্রয় খোঁজার চিন্তাও না করে সেজন্য প্রথম দরকার এদের পরিপূর্ণ একটি তালিকা করা। দ্বিতীয়ত. এ তালিকা ধরে জামায়াতী আদর্শ অনুসরণকারীদের আইন করে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক ঘোষণা এবং তদনুযায়ী সরকারী গেজেট নোটিফিকেশন। এ মহতি কাজ সাফল্যের সাথে নিষ্পন্ন করতে গোটা জাতিকে হতে হবে এককণ্ঠ। বলাবাহুল্য, উদ্যোগ নিলে এর বাস্তবায়ন মোটেই অসম্ভব নয়।
এ ব্যবস্থায় দ্বিতীয় শ্রেণীর জামায়াতী নাগরিকদের ভোটাধিকার, সংগঠন করার অধিকার, সরকারী চাকুরী গ্রহনের অধিকার দেয়া যাবে না। সাধারণ কর্মক্ষেত্রে একজন বাংলাদেশী নাগরিকের বেতন যদি হয় এক শ’ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণীর এ নাগরিকের বেতন সেক্ষেত্রে হবে পঞ্চাশ টাকা। একইসাথে সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আরোপ করতে হবে প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ এবং গ্রহণ করতে হবে কার্যকর মোটিভেশন কর্মসূচী। জামায়াতী তরিকা ছেড়ে  মূল ধারায় ফিরতে আগ্রহীদের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে গুরুত্ব দিয়ে। এতে করে জামায়াতী তরিকার ধারে কাছে কেউ আর ঘেঁষতে চাইবে না এবং কালক্রমে স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াতী গজব থেকে নিষ্কৃতি পাবে দেশবাসী। ৩০ লাখ শহীদের আত্মাহুতির বিনিময়ে অর্জিত সার্বভৌম বাংলাদেশ এবং এর অদম্য সৃষ্ঠিশীল ১৬ কোটি মানুষ অনিষ্টকর জামায়াতী ফেতনা আর দেখতে চায় না।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা।

e-mail : chintagrasta@gmail.com



অার নয় যৌতুক
                                  

অারিকা মাইশা: যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি।বর্তমানে এই প্রথার ভয়াবহতা বেড়েই চলেছে। প্রতিনিয়ত অসংখ্য নারী অত্যাচারিত ও নিপীড়িত হচ্ছে যৌতুকের কারণে।নারী জাতিকে মর্যাদাহীন করার পাশাপাশি নারী উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে   এই অভিশপ্ত যৌতুক প্রথা।
যৌতুক কি?
যৌতুক হল কন্যার বিবাহে পিতামাতার সম্পত্তি হস্তান্তর প্রক্রিয়া। বিয়ের সময় মেয়েপক্ষের কাছ থেকে ছেলেপক্ষের আর্থিক বা অন্য কোনো সুবিধা নেওয়াকে বোঝায়। তবে আইনে বিয়ের শর্ত হিসেবে বর বা কনেপক্ষের দাবি-দাওয়াকে যৌতুক বলে।
১৯৮০ সালের যৌতুক নিরোধ আইন অনুযায়ী, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যদি কোনো পক্ষ অপর পক্ষকে বিয়ের আগে-পরে বা বিয়ে চলাকালে যেকোনো সময় যেকোনো সম্পদ বা মূল্যবান জামানত হস্তান্তর করে বা করতে সম্মত হয়, সেটাই যৌতুক বলে বিবেচ্য হবে। যৌতুক গ্রহণ ও যৌতুক প্রদান অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
উপহার কি যৌতুক?
বিয়েতে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা পর্যন্ত মূল্যমানের উপহার যৌতুক হিসেবে গণ্য হবে না। তবে এখানে শর্ত হচ্ছে যে এই উপহার অবশ্যই বিয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয় এমন কেউ প্রদান করতে হবে এবং বিয়ের পণ (যৌতুক) হিসেবে প্রদান করতে পারবেন না, উপহার হিসেবে দিতে হবে।
অর্থাৎ বিয়ের শর্ত হিসেবে ৫০০ টাকার সমমূল্যের কোনো কিছুও দেওয়া যাবে না। দিলে তা আইন অনুসারে যৌতুক হবে এবং অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ অনুযায়ী, বিবাহ স্থির থাকার শর্তে বা বিবাহের পণ হিসেবে প্রদত্ত বা প্রদানে সম্মত অর্থ, যেকোনো সামগ্রী বা অন্যবিধ সম্পদ হলো যৌতুক।
নারী নির্যাতনে যৌতুক প্রথা :
বর্তমানে যৌতুক প্রথার ফলে নিষ্ঠুরতা, নৃশংসতা ও নারী নির্যাতন স্বাভাবিক ব্যাপার। জন অস্টিন যৌতুক প্রথার দ্বারা নারী নির্যাতন সম্পর্কে বলেছেন, ``Dowry system paves the way to women oppression`` যৌতুকের অর্থ না দিতে পারলে সদ্য বিবাহিত নারীকে পদে পদে হেয়, নিচু ও বিদ্রƒপ করা হয়। এছাড়া শারীরিকভাবে অমানবিক নির্যাতনের দ্বারা হত্যা করে আত্মহত্যা বলে দাবি করে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকেরা। এছাড়াও শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, এসিড দগ্ধ করা কখনো পুড়িয়ে বা বিষ খাইয়ে মেরে ফেলা, শ্বাসরোধ করে বা গলায় দড়ি আটকিয়ে মেরে ফেলা প্রভৃতি নৃশংসতা হয়ে থাকে যৌতুকের কারণে।
যৌতুকের শাস্তি :
যৌতুক নেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ, যা প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর এবং সর্বনিম্ন এক বছর কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
যৌতুক পাবিারিক জীবনে চরম কলহের সৃষ্টি করে। দীর্ঘকাল থেকে এই প্রথার প্রচলন থাকায় এটি এখনো কোনো কোনো এলাকায় রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। এর থেকে বের হতে শুধু নারীরাই নন, পুরুষরাও উদ্যোগী হতে হবে। "আর নয় যৌতুক" যদি এমন একটি শ্লোগান সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে এর একটি প্রভাব সব মহলেরই দৃষ্টিতে আসবে। স্ব স্ব  ক্ষেত্রে যৌতুকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারলে ক্রমেই এর কুপ্রভাব কমে আসবে।

আমাদের গণতন্ত্রের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যত
                                  

॥ ফোরকান আহম্মেদ ॥
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা আমেরিকার জাতির পিতা বিশ্বে গণতন্ত্রের নন্দিত মহানায়ক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন গণতন্ত্রের মূল্যায়ন যেভাবে করেছিলেন তা আজও বিশ্ববাসীর কাছে অমর বাণী হিসাবে স্বীকৃত আমেরিকার স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী বীরদের স্মরণে এক স্মরণসভার মাত্র ৩ মিনিটের এক বক্তৃতায় বলেছিলেন অফ দ্যা পিপল, বাই দ্যা পিপল, ফর দ্যা পিপল। তাঁর এ বক্তব্য আজো বিশ্বের গণতন্ত্রের বাণী চিরন্তণী হিসেবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনায় বিশ্ব নেতাদের কাছে অনুপ্রেরণাহিসাবে কাজ করছে এবং যতদিন বিশ্বে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু থাকবে ততদিন তিনিও বিশ্ব সভ্যতার তাছে অমর হয়ে থাকবেন।
ভারত উপমহাদেশ ব্রিটিশ শাসনাধীন থাকাকালীন ও এ অঞ্চলের মানুষ তাদের নাগরিক সামাজিক ও নৈতিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষে সংগ্রাম করেছেন বহু স্বাধীনতাকামী নেতার নেতৃত্বে এর মধ্যে শহীদ তিতুমীর, সিপাহী বিদ্রোহ, সন্যাস বিদ্রোহ, ফকির বিদ্রোহ অন্যতম। এক পর্যায়ে ১৯৪৭ সালে পাক-ভারত বার্মাসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। বাংলাদেশ তখনও পাকিস্তানের আওতাধীন একটি প্রদেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে ব্রিটিশ শাসনাধীন থাকাকালীন ১৯০৫ সালে অবিভক্ত বাংলা ভাগ হয়ে পূর্ব বাংলা ঢাকাকে রাজধানী করে ভাগ হয়েছিল। ভারতীয় হিন্দু নেতৃবৃন্দের প্রবল বিরোধীতার ফলে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয় ব্রিটিশ সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান, ভারত ও বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাস্তিানের ভাগ্যহত মানুষের কোন মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ না করে বৈষম্যমূলক নীতিমালার আলোকে ৭ কোটি মানুষকে নিপীড়ন ও শোষনের বেড়াজালে আটকে রেখে তাদের আধিপত্য তথা শাসনতান্ত্রিক নেতৃত্ব তাদের কব্জায় রাখতে কূটকৌশল অব্যাহত রাখে। এরই প্রেক্ষাপটে ১৯৭০সালের সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংখ্যাগরিষ্ট আসন পেলেও শাসকগোষ্ঠী বাঙালী জাতির অবিসাংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর গড়িমসি শুরু করে। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু হয়। অসহযোগ আন্দোলন হরতাল ধর্মঘট। এক পর্যায়ে পাক-শাসকগোষ্ঠী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ মানুষের ওপর সশস্ত্র হামরা চালালে পরিস্থিতি মহান মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র যুদ্ধের পর ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে এবং ২ লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী পাকিস্তানের কারগার থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন বাঙালী অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে এবং নির্দেশনায় এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধান প্রণীত হয়। যা পাকিস্তন সরকার দীর্ঘ ২৩ বছরেও করতে পারেনি। সংবিধানে রাষ্ট্রীয় ৪টি মূল নীতি সংযোজিত হয়। এ ৪টি মূল নীতি হচ্ছে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালী জাতীয়তাবাদ। রাষ্ট্রীয় মূল ৪টির প্রথমটি গণতন্ত্র হলেও গণতন্ত্র এখনও শঙ্কামুক্ত নয় বলেও রাজনৈতিকঅভিজ্ঞনজরা মনে করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন যখন যে দল বা জোট ক্ষমতায় আসেন তখনই তারা নিজেদের মতো করে সংবিধান সংশোধন করে নেয়।
১৯৯০ ইং সনের ৬ ডিসেম্বর তৎকালীন ৮ ও ৭ দলীয় জোটের আন্দোলনের মুখে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পদত্যাগ করেন গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং সংবিধানকে সমুন্নত রাখতেই তিনি পদত্যাগ করেন। ১৯৯১ইং সনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। ৮ দলীয় জোটের দাবীর মুখে ঐ সময় পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে গ্রেফতার করে সরকার। শুরু হয় সদ্য পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি ও তার প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টির ওপর অত্যাচারের স্টীম রোলার। এরশাদের মুক্তির দাবীতে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা বা বিভাগীয় শহর অথবা রাজধানীতে জাতীয় পার্টি যেখানে জনসভা অথবা বিক্ষোভ মিছিলের প্রোগ্রাম ঘোষণা করে সেখানে বিএনপি অথবা তার অঙ্গ সংগঠন পাল্টা প্রোগ্রাম দেয়। নিরুপায় প্রশাসন বাধ্য হয়ে ১৪৪ ধারা জারি করে। সভা সমাবেশ হয়ে যায় প-। পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এক সময়ের তুখোর ছাত্রনেতা এবং এরশাদ মন্ত্রীসভার সফল শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম মাদারীপুরের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠে জাপা আয়োজিত এক কর্মী সমর্থক সমাবেশে দুঃখ করে বলেন দেশে এখন নষ্ট গণতন্ত্রের চর্চা শুরু হয়েছে।
জাতি এখনও সেই নষ্ট গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা প্রত্যক্ষ করছে কিনা ভেবে দেখা দরকার। এটা হলো পরিচ্ছন্ন গণতন্ত্রের জন্য কাম্য নয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর বিএনপি নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে তাঁর গুলশান কার্যালয়ে ৯৩দিন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ঘেরাওয়ের মধ্যে অবরুদ্ধ রাখা হয়। এ সময় তাঁর জন্য দেয়া খাবার পানি ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। এছাড়া বালুর ট্রাক দিয়ে ঘেরাওসহ যানবাহনে ব্যবহৃত ভেপু বাঁজিয়ে এক বিরক্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। যা দেশবাসী নিরব দর্শকের ভূমিকায় থেকে গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেছে।
একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় আমাদের দেশের মানুষ খুবই আবেগপ্রবণ। না হলে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের একটি ঐতিহাসিক ভাষণকে সামনে রেখে তারা পতঙ্গের ন্যায় মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লো কিভাবে? জাতির পিতার ষড়যন্ত্রমূলক মৃত্যুকে যেমন মেনে নিতে পারেনি এ জাতি, তেমনি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুকেও ভাল চোখে দেখেনি দেশবাসী।
২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাকে দেশবাসী যেমন সমর্থন দেয়নি তেমনি খালেদা জিয়াকে ঘেরাও করে রেখে খাবারসহ বিদ্যুৎ পানি সরবরাহ বন্ধকেও সমর্থন করেনি মানুষ। প্রত্যেক ক্রিয়ারই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। উল্লেখিত ঘটনার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও একদিন দৃশ্যমান হবে। মান্যবর শেখ শহীদুল ইসলামের নষ্ট গণতন্ত্রে নতুন ডিজিটাল সংস্কারণের গণতন্ত্রে এখন চলছে গণতান্ত্রিক জিঘাংসার বাস্তবায়ন।
শ্রদ্ধাভাজন প্রবীণ সাংবাদিক ও দৈনিক জনতার সম্মানিত প্রকাশক জনাব ছৈয়দ আন্ওয়ার এর নামকরণ করেছেন মনোতন্ত্র। তাঁর ব্যাখ্যায় বোঝা যায় গণতন্ত্রের লেবাসে মনের মতো করে দেশ পরিচালনার নাম মনোতন্ত্র। তিনি গত ৩০ জানুয়ারি দৈনিক জনতার ১ম পাতায় প্রকাশিত তাঁর মন্তব্য কলামে “মনের তন্ত্র গণতন্ত্র নয়” শিরোনামের কলামে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
অপরদিকে গত ৯ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইনকিলাবের ১১নং পৃষ্ঠার সম্পাদকীয় পাতায় শ্রদ্ধাভাজন সাংবাদিক কামরুল হাসান দর্পণ তার উপসম্পাদকীয় কলামে গণতন্ত্রের সংকট এবং ভারসাম্যাহীন রাজনীতি শিরোনামের লেখায় চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি অতীতের কিছু অপ্রিয় সত্য কথা তাঁর লেখায় তুলে ধরেছেন।
জনাব দর্পণ তাঁর লেখার শুরুতেই লিখেছেন আমাদের দেশে গণতন্ত্র আছে কি নেই, থাকলেও কতটা আছে তা সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের পক্ষে বোঝা মুশকিল।
আমাদের প্রচলিত রাজনীতিতে একটি প্রবাদ আছে তা হচ্ছে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় উচিত। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের সম্মানিত দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন না। আমাদের রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীগণ মান্যবর, জওহরলাল নেহেরু, ভারতের জাতির পিতা করমচাঁদ গান্ধী, পাকিস্তানের জাতির পিতা মহম্মদ আলী জিন্নাহ বাংলাদেশের স্থপতি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আইউব ইয়াহিয়া ও বহু স্বৈরশাসকের পতন দেখেও শিক্ষা গ্রহণ করেনি। যারাই যেভাবে যখন ক্ষমতায় এসেছে। তারাই ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজেদের পতন ত্বরান্বিত করেছেন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় এসেও কেউ গণতান্ত্রিক স্বৈরশাসকের ভূমিকায় অতীতে গিয়ে থাকলেও পরিচ্ছন্ন গণতন্ত্র যাঁরা লালন করেন তাঁরা স্বৈরাচারী আচরণ করবে না এটাই প্রকৃত গণতন্ত্রকে লালন করা বলেই তৃণমূলের সাধারণ মানুষেরা মনে করেন। গণতন্ত্রের পূজারী সাধারণ মানুষ আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের কাছে এমনটাই প্রত্যাশা করে। অন্যথায় আগামী প্রজন্মের কাছে আমাদের জাতীয় নেতাদেরকেই জবাব দিতে হবে।

১৭ নভেম্বর মওলানা ভাসানীর মাজার, জনতার মিলন মেলা
                                  

এ.কে.এম শামছুল হক রেনু
সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, আধিপত্যবাদ, নব্য ধনিক, বণিক, পুঁজিবাদ ও রক্ত চোষা দানব শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে খামোস কণ্ঠের অকতোভয় সংগ্রামী দিকপাল, গণমানুষের মহান নেতা, আধ্যাত্মিক সাম্রাজ্যের ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ, মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর রাত ৮টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। এবারের ১৭ নভেম্বর মহান নেতা মওলানা ভাসানীর ৪১তম মৃত্যু বার্ষিকী।

যেখানে যে অবস্থাতেই থাকিনা কেন, বন্ধু বান্ধব, স্বজন ও মওলানা ভাসানীর এক সময়ের রাজনৈতিক অনুসারী ও গুণগ্রাহীদের নিয়ে প্রতি বছরই ১৭ নভেম্বর প্রাণপ্রিয় মহান নেতার মাজার জেয়ারত করে থাকি। ওনার মৃত্যুর পর ৪০ বছর যাবত কোনদিনই টাঙ্গাঁইলের সন্তোষে মওলানা ভাসানীর মাজার জেয়ারত বাদ পড়েনি। এবারও দুটি মাইক্রোবাসে মওলানা ভাসানীর মুরিদ, শিষ্য, ভক্ত ও রাজনৈতিক অনুসারীরা আফ্রো এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার সর্বহারা মানুষের নয়নমনি মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর মাজার জেয়ারত করতে ভুল হয়নি। ১৭/১১/২০১৭ ইং শুক্রবার টাঙ্গাইল শহরের অনতিদূরে কাগমারি মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের কাছে আমাদের মাইক্রোবাস দুটি সকাল ৮টার মধ্যে পৌঁছে। সে সময় মাইক্রোবাস দুটি অগনিত ছাত্রজনতার মিছিল ডিঙিয়ে কোন ভাবেই সামনে এগুতে পারছিলনা। তাছাড়া সেই সময় দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মাজার জেয়ারতের উদ্দেশ্যে আসা অনেক বাস, মাইক্রো, জীপ, কার, অটো, সিএনজি সহ অন্যান্য যানবহনের যানঝট সৃষ্টি হয়। তখন রাস্তার দুইপাশের ছাত্র জনতার মিছিল থেকে গগণ বিদারী শে¬াগানে, শে¬াগানে মুখরিত হয়ে উঠে। সবার মুখেই ছিল যুগ যুগ জিও তুমি মওলানা ভাসানী, স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা মওলানা ভাসানী, সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ নিপাত যাক, মওলানা ভাসানী জিন্দাবাদ। এমনিভাবে কোন মতে রাস্তার দুই পাশের ছাত্র জনতা ও গণ মানুষের মিছিল ও  রাস্তার যানঝট অতিক্রম করে মওলানা ভাসানী কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইট দিয়ে মুকুটহীন সম্রাট মওলানা ভাসানীর মাজারের অনতিদূরে গাড়ী রাখার স্থানে গিয়ে পৌঁছা হল। ৫ মিনিটের রাস্তা অতিক্রম করতে ১ ঘন্টারও বেশী সময় অতিক্রান্ত হয়। ফুলের তোড়া নিয়ে মাজারে ঢুকার সময় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, লেখক, সাহিত্যিক, ডাক্তার, অধ্যাপক বিভিন্ন দলের অগনিত রাজনৈতিক নেতা, কর্মি, মুরিদ, ভক্ত এবং তার অনেক প্রবীণ রাজনৈতিক অনুসারীদের দৃষ্টিতে আসে। এ নিবন্ধে তাদের নাম লিপিবদ্ধ করলে, নিবন্ধের সংক্ষিপ্ত পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় সেদিকে আর অগ্রসর হলাম না। মাজার জেয়ারত করতে দেখা যায় মাজারে যেমনি মৌন অবস্থা বিদ্যমান, তেমনি সকলের চোখে অশ্রুধারা। কেহ মোনাজাত করছে, কেহ বা কোরআন তেলাওয়াতে মগ্ন এবং কেহ নফল নামাজে রত। মহান নেতার পাশেই তার সহধর্মিনী জয়পুর হাটের পাঁচ বিবির এক সময়ের জমিদারের কন্যা বেগম আলেমা ভাসানী বা দাদু ভাসানীর মাজার রয়েছে।    

মূল মাজার থেকে ২০০ থেকে ২৫০ গজ দূরে দক্ষিণে রাস্তা ও পুকুর পাড়ে পুত্র আবু নাসের খান ভাসানীর কবর এবং অনতিদুরে মওলানা ভাসানীর কনিষ্ট পুত্র কিবরিয়া ভাসানীর কবর। মাজার থেকে বেড়নোর পথে মওলানা ভাসানীর দীর্ঘ দিনের হিন্দু মুসলীম ভক্ত, অনুরক্ত, মুরিদ, শিষ্যসহ তাদের সাথে থাকা তাদেরই ছেলেমেয়ে ও স্বজনরা মাজার জেয়ারতকারীদের হাতে বিভিন্ন ফুল, তবারক, বিভিন্ন ধরণের লিফলেট বিতরণ করছে এবং অনুরোধ জানিয়ে বলছে, আপনারা সকলেই প্রতি বছরই হুজুর ভাসানীর মাজার জেয়ারত করতে আসবেন। আমরা আপনাদের কাছে কিছুই চাইনা, আমরা চাই হুজুরের জন্য আপনাদের ভালোবাসা এবং দোয়া। এই দৃশ্য স্বচক্ষে না দেখলে, বাস্তবিকই দু কথা লেখে বুঝানো খুবই কঠিন ও অসাধ্য। মাজারের পাশেই দূরদুরান্ত থেকে আসা সকল শ্রেণী পেশার লোকদের জন্য তবারক হিসেবে খিচুড়ির ব্যবস্থা ছিল। ছোট, বড়, ধনী, গরীব, কাঙ্গাঁল একসাথে মাঠির শানকিতে খিচুড়ি খাওয়ার দৃশ্যও যেন ভুলে যাওয়ার নয়। তবে এখানে বলে রাখা দরকার মাজার সম্পর্কে অনেকের বিভিন্ন ধরণের ধারণা রয়েছে। এ ধারণা থেকে নিবদ্ধক হিসেবে নিজেও বাহিরে নই। তবে মওলানা ভাসানীর মাজারে বেদাত বা কোরআন সুন্নাহর বাইরে বা ইসলাম ও শরীয়তের বিধানের বাইরে কোন কিছু করার সুযোগ নেই। এমনকি একশ্র্রেনীর ভন্ডদের মতো খাজা বাবার দরবার শরীফ বানিয়ে আয় রোজগার ব্যবস্থা করারও কোন সুযোগই এখানে অবশিষ্ট নেই। মাজারের প্রায় ১০০ গজ দক্ষিণে যেখানে মওলানা ভাসানী সভা সমাবেশ করতেন (দরবার হল বলে আখ্যায়িত) সেই বিশাল আয়তনের দরবার হলে মুরিদ ও ভক্তরা বাউলগান, পালাগান, জারি, মুর্শিদী, লালনগীতি, জালালগীতি, ভাওয়াইয়া ইত্যাদি গানের যেমন আসর জমায় তেমনি এ অনুষ্ঠানটির (১৭ নভেম্বর মওলানা ভাসানীর মৃত্যু বার্ষিকী) ১০/১৫ দিন আগ থেকেই দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে এখানে ওরা অবস্থান করে থাকে। এখানেই ওরা রান্না বান্না করে নিজেরাই খাওয়া দাওয়া করে থাকে। ১৭ নভেম্বর বেশ কয়েকদিন পর এখান থেকে ওরা যার যার গন্তব্যে চলে যায়। জানা যায় মওলানা ভাসানীর জীবদ্দশাতেও মহরম মাস, লাইলাতুল বরাত, লাইলাতুল কদর ও মেরাজের উপলক্ষ সহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক ইসলামিক দিনগুলোতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সুদুর আসাম থেকে মুরিদরা এখানে জমায়েত হতো এবং অনুষ্ঠানটি সমাপনান্তে চলে যেত। তাছাড়া জাতীয় সংকট মুহুর্তে দেশী, বিদেশী সাংবাদিকদের ডেকে মওলানা ভাসানী এই দরবার হলে প্রেসকনফারেন্স সহ রাজনৈতিক মিটিং করতেন।       

মাজারের পাশেই মওলানা ভাসানীর জীবন, দর্শন ও রাজনীতির ওপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সভা সমাবেশ সহ ভাসানী স্মৃতি সংসদ ও মৃত্যু বার্ষিকী উদযাপন কমিটির পক্ষ হতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়ে থাকে। তাছাড়া মাজারের পূর্ব পাশের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে ও রাস্তার দুই পাশে মেলা বসে। মেলায় বিভিন্ন স্টলে বিভিন্ন ধরনের খেলনা এবং অস্থায়ী বইয়ের দোকানগুলোতে মওলানা ভাসানীর জীবন দর্শন ও রাজনীতির উপর দেশী বিদেশী প্রথিতযশা লেখকদের অনেক ধরণের বইপুস্তক ও পান্ডুলিপি পাওয়া যায়। এমনিভাবে সেখানে রয়েছে বাহারী দেশীয় পিঠা, টাঙ্গাইল অঞ্চলের পিঠা, মওলানা ভাসানীর তালের টুপি সহ টাঙ্গাইলের সন্তোষ এলাকার বিভিন্ন ধরণের বাঁশ, বেত, মুক্তারা ও মাঠির তৈরী বিভিন্ন জিনিষপত্র ও তৈজষপত্র। মওলানা ভাসানীর মাজার জেয়ারত শেষে রাস্তার পাশে পুকুড় পাড়ে পুত্র আবু নাসের খান ভাসানীর কবর ও কনিষ্ট পুত্র কিবরিয়া ভাসানীর কবর জেয়ারত শেষে মওলানা ভাসানীর সেই চিরাচয়িত এক সময়ের ছনের ছাউনি ও চটের বেড়ার বাড়িটির দৃশ্য এখন কিছু বদলালেও তা দেখে বিকেল বেলার ওই দিন ফেরার আগে আবারো সহ যাত্রী সবাই মহান নেতা ও মুকুটহীন সম্রাট মওলানা ভাসানীর মাজার সংলগ্ন ঐতিহাসিক তালতলায় বেশ সময় গল্প গুজব, আলাপ আলোচনা করে গন্তব্যে রওয়ানা দেই। তখন মানুষের ভীড় কিছুটা কম হলেও নাকি ভাসানী মেলা শেষ হতে নাকি আরো ৭দিন সময় লাগবে। একটা কথা বলা দরকার, তা হলো সামগ্রিক শান্তি শৃংখলা রক্ষা কল্পে পুলিশের সংখ্যাও কম ছিল না। ১৭ নভেম্বর যারা সন্তোষ আসতে পারেনি তাদের মধ্যে দেশী বিদেশী মওলানা ভাসানীর অনুসারীদের ৭দিন পর্যন্ত নাকি আসা অব্যাহত থাকে।  


মওলানা ভাসানী মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ১৯৭৬ সালের ১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চ ও গণমানুসের দাবী নিয়ে ব্রিটিশদের কুইট ইন্ডিয়া (ভারত ছাড়) আন্দোলন, পাকিস্তানি একনায়কদের বিরুদ্ধে যেমন সংগ্রাম করেছেন, তেমনি তিনি ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলন থেকে পাকিস্তানীদের আসসালামু আলাইকুম সহ ৭০ এ চট্টগ্রামে প্রলয়ংকরী সামুদ্রীক জলোচ্ছাসে অসংখ্যা মানুষের প্রাণহানি, ঘরবাড়ী ধ্বংসস্তুপে পরিণত দূর্গতদের পাশে থেকে তিনি পুনরায় “পাকিস্তানিদের উদ্দেশ্য করে ওরা কেউ আসেনি বলে” আবার পাকিস্তানের একনায়ক সরকারকে আসসালামু আলাইকুম জানিয়ে ছিলেন। তাই মওলানা ভাসানী স্বাধীনতার স্বপ্ন দ্রষ্টা হিসেবে দেশ, দুনিয়া ও সমসাময়িক ইতিহাসের আলোকে সমধিক পরিচিত। ১৯৭৪ সালে সরকার এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশাল ও স্পেশাল পাওয়ার এ্যাক্ট বা বিশেষ ক্ষমতা আইন পাস করলে, তিনি এর বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করেছিলেন। অর্থাৎ যেখানেই মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ভুলন্ঠিত হয়েছে, সেখানেই তিনি ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন, সংগ্রাম করেছেন। প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করেছেন, জেল জুলুম, হুলিয়া, বুলেট, ফাঁসির দড়ি তাকে ধমাতে পারেনি। জীবনে তিনি কখনও যেমন অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি, তেমনি তিনি ছিলেন জনমানুষের আপোষহীন নেতা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকার, স্বপ্নদ্রষ্টা ও মুকুটহীন অজেয় সম্রাট। একজন প্রখ্যাত সমসাময়িক দার্শনিক বলেছেন, মওলানা ভাসানীর জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি জীবন ব্যবস্থাই একটি দর্শন। পরিশেষে বলব, যুগ যুগ জিও তুমি মওলানা ভাসানী, মওলানা ভাসানী জিন্দাবাদ।     


   Page 1 of 8
     উপসম্পাদকীয়
বিয়ে চুক্তিতে সমতার চারা
.............................................................................................
সভ্যতার সংকট : সামাজিক অবক্ষয়
.............................................................................................
প্রবৃদ্ধি অর্জনে আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্ব
.............................................................................................
আরো কমেছে ধানের দাম
.............................................................................................
সরকারের ৬ মাস : একটি পর্যালোচনা
.............................................................................................
নয়ন বন্ড বনাম সামাজিক নিরাপত্তা
.............................................................................................
প্রাথমিক শিক্ষায় সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য
.............................................................................................
এত নিষ্ঠুরতা-অমানবিকতা আর সহ্য হয় না
.............................................................................................
সামনে আলো ঝলমল দিন, দুর্নীতির অন্ধকারে যেন হারিয়ে না যায়
.............................................................................................
করারোপ বাড়িয়ে তামাক রোধ কি সম্ভব?
.............................................................................................
শিক্ষা পণ্যের বিশ্বায়ন
.............................................................................................
গণপরিবহন কবে নিরাপদ হবে
.............................................................................................
জামায়াতীদের নাগরিক মর্যাদা
.............................................................................................
অার নয় যৌতুক
.............................................................................................
আমাদের গণতন্ত্রের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যত
.............................................................................................
১৭ নভেম্বর মওলানা ভাসানীর মাজার, জনতার মিলন মেলা
.............................................................................................
পুলিশের ভালো-মন্দ এবং অতিবল
.............................................................................................
চালে চালবাজী: সংশ্লিষ্টদের চৈতন্যোদয় হোক
.............................................................................................
একাদশ সংসদ নির্বাচন, ভোটাধিকার এবং নির্বাচন কমিশন
.............................................................................................
নির্বাচনে সেনা মোতায়েন প্রত্যাশা এবং সিইসির দৃশ্যপট
.............................................................................................
৩ মাসের মধ্যে ধর্ষকের ফাঁসি এবং বিজয় বাংলাদেশ
.............................................................................................
শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বাংলাদেশ
.............................................................................................
মানবিক মূল্যবোধ বিনষ্ট হলে মানুষ পশু সমতুল্য হয়ে পড়ে
.............................................................................................
ফিরে ফিরে আসে ১৫ আগস্ট : কিন্তুু যা শেখার ছিল তা শেখা হলো না
.............................................................................................
ক্ষুদ্রঋণ সহায়তার নামে সুদখোরদের অত্যাচার কবে বন্ধ হবে
.............................................................................................
খেলাপি ঋণের অভিশাপ মুক্ত হোক ব্যাংক খাত
.............................................................................................
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও ১৫ আগষ্ট
.............................................................................................
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের সূচনাপর্বই ছিল ঘটনাবহুল
.............................................................................................
জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে আত্মসন্তুষ্টির অবকাশ নেই
.............................................................................................
সার্টিফিকেট নির্ভর নয়, মানসম্পন্ন শিক্ষা জরুরি
.............................................................................................
বাজেট তুমি কার
.............................................................................................
শিক্ষাক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা
.............................................................................................
জাতীয় সংসদ নির্বাচন: দেশী ও বিদেশীদের ভাবনা
.............................................................................................
দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধ হবে কি?
.............................................................................................
হুমকির মুখে গার্মেন্টস শিল্প, কমছে বৈদেশিক আয়
.............................................................................................
ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার গ্রামীণ জনগোষ্ঠির মাঝে আশার আলো
.............................................................................................
নিরপেক্ষ গণমাধ্যম জাতির প্রত্যাশা
.............................................................................................
নারীর উন্নয়নে দেশের উন্নয়ন
.............................................................................................
ভূমিকম্প মোকাবেলায় প্রয়োজন সচেতনতা
.............................................................................................
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো
.............................................................................................
ভূমিকম্পকে ভয় পেলে চলবে না
.............................................................................................
সিইসির বিদায় বেলায় জেলা পরিষদ ও নাসিক নির্বাচন
.............................................................................................
বিজয় দিবস বাঙালির শৌর্য-বীর্যের প্রতীক
.............................................................................................
পাকিস্তানের কূটনৈতিক পরাজয়
.............................................................................................
আইএস বিতর্কের অন্তরালে
.............................................................................................
তেলের মূল্য কমানোর সুফল কার পকেটে ?
.............................................................................................
চাই নিরক্ষরমুক্ত আত্মনিভর্রশীল ডিজিটাল বাংলাদেশ
.............................................................................................
পশ্চিমবঙ্গ: কালো তাড়াই কালো আসবে নতুন আলো...
.............................................................................................
মধ্যপ্রাচ্যে নারী নির্যাতন, আইয়্যামে জাহেলিয়ার দৃশ্যপট
.............................................................................................
বিশ্বমানের চিকিৎসা সেবা
.............................................................................................

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আখলাকুল আম্বিয়া
নির্বাহী সম্পাদক: মাে: মাহবুবুল আম্বিয়া

সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: স্বাধীনতা ভবন (৩য় তলা), ৮৮ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০। Editorial & Commercial Office: Swadhinota Bhaban (2nd Floor), 88 Motijheel, Dhaka-1000.
সম্পাদক কর্তৃক রঙতুলি প্রিন্টার্স ১৯৩/ডি, মমতাজ ম্যানশন, ফকিরাপুল কালভার্ট রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত ।
ফোন : ০২-৯৫৫২২৯১ মোবাইল: ০১৬৭০৬৬১৩৭৭

Phone: 02-9552291 Mobile: +8801670 661377
ই-মেইল : dailyswadhinbangla@gmail.com , editor@dailyswadhinbangla.com, news@dailyswadhinbangla.com

 

    2015 @ All Right Reserved By dailyswadhinbangla.com

Developed By: Nytasoft