মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই 2020 | বাংলার জন্য ক্লিক করুন
  
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

   উপসম্পাদকীয় -
                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                 
মুখোশের আড়ালে আমরা সবাই হাওয়াই মিঠাই

জুবায়ের আহমেদ

শিরোনামটি বাংলাদেশের জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী ও বাংলা সঙ্গীতের যুবরাজখ্যাত  আসিফ আকবরের গান থেকে নেয়া। এটি গানের কথা হলেও এই বাক্যটির তাৎপর্য অনেক বেশি। বাংলাদেশে আমরা নিজ নিজ জায়গা থেকে কমবেশ সকলেই যে হাওয়াই মিঠাই। যারা মুখোশের আড়ালে সব অপকর্ম করে, স্বার্থ হাসিলের জন্য হেন কোন কাজ নেই যা করে না, তারা স্বার্থ উদ্ধারের জন্য মানুষ খুনও করতে পারে, প্রতারণা, জালিয়াতি, মিথ্যার আশ্রয়, দূর্নীতি, অনিয়ম, গুম সহ সকল অপরাধজনক কর্মকান্ড করে বেড়ায়। লোক ঠকানোর অভ্যাস তাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। কিন্তু সমাজের চোখে তারা সাধু, বুদ্ধিজীবি, দানবীর, নীতিবান, সম্মানিত ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তাদেরকে মাকাল ফলের সাথেও তুলনা করা যায়, তাদের বাহিরটা দেখতে সুন্দর, ভেতরটা কুৎসিত। শুধু সম্পদ বা ক্ষমতার জন্যই নয়, আমরা ছোট বড় সকল স্বার্থ উদ্ধারের জন্যই আমরা মুখোশের আড়ালে কূটকৌশলের আশ্রয় নেই।

বাংলাদেশে প্রতারণার মাধ্যমে লোক ঠকিয়ে হাজার কোটি টাকার মালিক হওয়া এতো সহজ কিভাবে? এই প্রশ্ন উঠলে উত্তর আসে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ভালো নয় এবং বিচার ব্যবস্থা পক্ষপাত দুষ্ট। পাশাপাশি তোষামোদ শিল্পের পর্যায়ে চলে আসায় ক্ষমতায় থাকা রাজনীতিবিদ ও দলের ছত্রছায়ায় থেকে তোষামোদি করে চললেই স্বার্থ উদ্ধার করা সহজ হয়ে যায়। এসএসসি ও এইচএসসি পাশ ব্যক্তি হয়ে যায় দেশ বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী শিক্ষিত, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, অর্থাৎ রাজনীতিবিদদের সুনজরে থাকতে পারলেই ঘুরে যায় ভাগ্যের চাকা, ধরাকে সরাজ্ঞান করা যায় সহজে, যা মন চায় তা করা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

এই সকল মুখোশধারী প্রতারকেরা এতোই  দূরন্ধর ও অমানবিক যে, করোনা মহামারির মতো মানবিক বিপর্যয়ের সময়েও তাদের প্রতারনা বন্ধ রাখতে পারেনি, অর্থ লিপ্সায় উম্মাদ হয়ে ভূয়া সার্টিফিকেট প্রদানের মাধ্যমে দেশের মান সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। করোনা ভাইরাসের মতো একটি ছোঁয়াচে রোগের নমূনা সংগ্রহ করলেও পরীক্ষা না করে পজেটিভ-নেগেটিভ রিপোর্ট দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে স্বাস্থ্যজনিত হুমকিতে ফেলেছে গোটা দেশকে। সেই সাথে অনেকেই লাইসেন্স ছাড়াই পরিচালনা করছে হাসপাতাল। রাজনৈতিক পরিচয় ও বড় বড় নেতাদের সাথে তোলা ছবিকে পুঁজি করে অবৈধ ব্যবসা খোলে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। নিঃশ্ব হচ্ছে বহু পরিবার। ভুক্তভোগীরা মামলা করলেও এসব মামলা আলোর মুখ দেখে না, ফাইলবন্দী হয়ে পড়ে থাকে।

বিগত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি ঘটনা প্রকাশ হয়েছে বাংলাদেশে, সেসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে ভালো মানুষের মুখোশ পরে থাকলেও তাদের ভেতরটা মাকাল ফলের মতো। মুখোশের আড়ালে এরা মাদক ব্যবসা, সুন্দরী নারীদের দিয়ে দেহ ব্যবসা, ক্যাসিনো/জুয়ার ব্যবসা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, শিক্ষা বানিজ্য, লবিংয়ের মাধ্যমে অসাধু কাজ করা সহ এমন কোন প্রতারনা ও অপরাধজনক কাজ নেই যে তারা করে না, যার মাধ্যমে দেশ ও জাতির অপূরনীয় ক্ষতিসাধিত হচ্ছে। বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

প্রতারকেরা তাদের স্বার্থসিদ্ধি করতে রাজনীতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, ক্ষমতাসীন দলের কোন নেতা কিংবা সরকারের উচ্চ পদস্থ কোন কর্মকর্তার আস্থা অর্জন করতে পারলেই এরা অবৈধ সব কাজে জড়িয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে। এদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও  বিচার হয় না, মামলার কথা প্রকাশ্যে আসে না, বাদীকে খুন গুমের ভয় দেখিয়ে ধমিয়ে রাখে, ফলে বিচার না হওয়ার কারনে এদের অপকর্ম আড়ালে থাকে। এই ধরনের অপরাধীদের মধ্যে অনেকেই রাজনীতির মাঠে সরব থাকার পাশাপাশি মিডিয়াতেও বুদ্ধিজীবির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, নিজেদের অপকর্মের বিপরীতে দেশপ্রেমিক সাজে। তাদের দেখে বুঝা যায় না, তাদের আসল চরিত্র।

দুঃখজনক বিষয় এই যে, ভদ্রলোকের বেশ ধরে থাকা অপরাধীদের বড় কেলেঙ্কারি প্রকাশের আগে বিভিন্ন অপরাধের বিষয়ে দেশের বিভিন্ন থানায় তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকলেও সেসব মামলায় বিচার না হওয়ায় তারা প্রতারনার মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়, নিজেদেরকে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অংশ মনে করে। তাদের কাজে কেউ বাঁধা হয়ে দাড়াতে চাইলে গুম করা সহ নিজেদের অবৈধ টর্চার সেলের মাধ্যমে অমানবিক নির্যাতন করে। মিডিয়ার মাধ্যমে এমন খবরও প্রকাশিত হচ্ছে অহরহ। আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকাই এর বড় কারণ হিসেবে মনে করছে  সচেতন নাগরিক সমাজ।

বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ, বর্তমান সরকারের অধীনে দেশ এগিয়ে গেলেও দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কর্মচারী এবং রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা পেশাদার অপরাধীদের অপকর্মের কারনে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে দেশ বিদেশে, ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দেশের মানুষ, নষ্ট হচ্ছে যুব সমাজ, অপরাধ বাড়ছে দিনদিন। দেশের সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। চাকুরী ক্ষেত্রে যোগ্যরা মূল্য পাচ্ছে না, অযোগ্যরা সব দলখ করে বসে আছে। গ্রাম থেকে শহর, তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় রাজনীতি, সর্বত্রই অপরাধী ও প্রতারকেরা সুবিধা হাসিলের জন্য উৎপেতে থাকে। এ ধরনের মুখোশধারী প্রতারকদের চিরুনি অভিযান চালিয়ে ধৃত করে আইনের আওতায় এনে কঠিন শাস্তি প্রদানের কোন বিকল্প নেই। একটি দেশকে এগিয়ে নিতে দুর্নীতি মুক্ত করতেই হয়, দুর্নীতিতে নিমজ্জিত দেশ ও জাতি কখনোই এগিয়ে যেতে পারে না। বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জল করা ও দেশকে এগিয়ে নিতে হলে হাওয়াই মিঠাই ও মাকাল ফল বেশধারী অপরাধীদের শক্ত হাতে ধমন করতেই হবে।

শিক্ষার্থী
ডিপ্লোমা ইন জার্নালিজম
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব জার্নালিজম অ্যান্ড ইলেকট্রনিক মিডিয়া(বিজেম)।

মুখোশের আড়ালে আমরা সবাই হাওয়াই মিঠাই
                                  

জুবায়ের আহমেদ

শিরোনামটি বাংলাদেশের জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী ও বাংলা সঙ্গীতের যুবরাজখ্যাত  আসিফ আকবরের গান থেকে নেয়া। এটি গানের কথা হলেও এই বাক্যটির তাৎপর্য অনেক বেশি। বাংলাদেশে আমরা নিজ নিজ জায়গা থেকে কমবেশ সকলেই যে হাওয়াই মিঠাই। যারা মুখোশের আড়ালে সব অপকর্ম করে, স্বার্থ হাসিলের জন্য হেন কোন কাজ নেই যা করে না, তারা স্বার্থ উদ্ধারের জন্য মানুষ খুনও করতে পারে, প্রতারণা, জালিয়াতি, মিথ্যার আশ্রয়, দূর্নীতি, অনিয়ম, গুম সহ সকল অপরাধজনক কর্মকান্ড করে বেড়ায়। লোক ঠকানোর অভ্যাস তাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। কিন্তু সমাজের চোখে তারা সাধু, বুদ্ধিজীবি, দানবীর, নীতিবান, সম্মানিত ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তাদেরকে মাকাল ফলের সাথেও তুলনা করা যায়, তাদের বাহিরটা দেখতে সুন্দর, ভেতরটা কুৎসিত। শুধু সম্পদ বা ক্ষমতার জন্যই নয়, আমরা ছোট বড় সকল স্বার্থ উদ্ধারের জন্যই আমরা মুখোশের আড়ালে কূটকৌশলের আশ্রয় নেই।

বাংলাদেশে প্রতারণার মাধ্যমে লোক ঠকিয়ে হাজার কোটি টাকার মালিক হওয়া এতো সহজ কিভাবে? এই প্রশ্ন উঠলে উত্তর আসে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ভালো নয় এবং বিচার ব্যবস্থা পক্ষপাত দুষ্ট। পাশাপাশি তোষামোদ শিল্পের পর্যায়ে চলে আসায় ক্ষমতায় থাকা রাজনীতিবিদ ও দলের ছত্রছায়ায় থেকে তোষামোদি করে চললেই স্বার্থ উদ্ধার করা সহজ হয়ে যায়। এসএসসি ও এইচএসসি পাশ ব্যক্তি হয়ে যায় দেশ বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী শিক্ষিত, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, অর্থাৎ রাজনীতিবিদদের সুনজরে থাকতে পারলেই ঘুরে যায় ভাগ্যের চাকা, ধরাকে সরাজ্ঞান করা যায় সহজে, যা মন চায় তা করা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

এই সকল মুখোশধারী প্রতারকেরা এতোই  দূরন্ধর ও অমানবিক যে, করোনা মহামারির মতো মানবিক বিপর্যয়ের সময়েও তাদের প্রতারনা বন্ধ রাখতে পারেনি, অর্থ লিপ্সায় উম্মাদ হয়ে ভূয়া সার্টিফিকেট প্রদানের মাধ্যমে দেশের মান সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। করোনা ভাইরাসের মতো একটি ছোঁয়াচে রোগের নমূনা সংগ্রহ করলেও পরীক্ষা না করে পজেটিভ-নেগেটিভ রিপোর্ট দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে স্বাস্থ্যজনিত হুমকিতে ফেলেছে গোটা দেশকে। সেই সাথে অনেকেই লাইসেন্স ছাড়াই পরিচালনা করছে হাসপাতাল। রাজনৈতিক পরিচয় ও বড় বড় নেতাদের সাথে তোলা ছবিকে পুঁজি করে অবৈধ ব্যবসা খোলে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। নিঃশ্ব হচ্ছে বহু পরিবার। ভুক্তভোগীরা মামলা করলেও এসব মামলা আলোর মুখ দেখে না, ফাইলবন্দী হয়ে পড়ে থাকে।

বিগত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি ঘটনা প্রকাশ হয়েছে বাংলাদেশে, সেসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে ভালো মানুষের মুখোশ পরে থাকলেও তাদের ভেতরটা মাকাল ফলের মতো। মুখোশের আড়ালে এরা মাদক ব্যবসা, সুন্দরী নারীদের দিয়ে দেহ ব্যবসা, ক্যাসিনো/জুয়ার ব্যবসা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, শিক্ষা বানিজ্য, লবিংয়ের মাধ্যমে অসাধু কাজ করা সহ এমন কোন প্রতারনা ও অপরাধজনক কাজ নেই যে তারা করে না, যার মাধ্যমে দেশ ও জাতির অপূরনীয় ক্ষতিসাধিত হচ্ছে। বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

প্রতারকেরা তাদের স্বার্থসিদ্ধি করতে রাজনীতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, ক্ষমতাসীন দলের কোন নেতা কিংবা সরকারের উচ্চ পদস্থ কোন কর্মকর্তার আস্থা অর্জন করতে পারলেই এরা অবৈধ সব কাজে জড়িয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে। এদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও  বিচার হয় না, মামলার কথা প্রকাশ্যে আসে না, বাদীকে খুন গুমের ভয় দেখিয়ে ধমিয়ে রাখে, ফলে বিচার না হওয়ার কারনে এদের অপকর্ম আড়ালে থাকে। এই ধরনের অপরাধীদের মধ্যে অনেকেই রাজনীতির মাঠে সরব থাকার পাশাপাশি মিডিয়াতেও বুদ্ধিজীবির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, নিজেদের অপকর্মের বিপরীতে দেশপ্রেমিক সাজে। তাদের দেখে বুঝা যায় না, তাদের আসল চরিত্র।

দুঃখজনক বিষয় এই যে, ভদ্রলোকের বেশ ধরে থাকা অপরাধীদের বড় কেলেঙ্কারি প্রকাশের আগে বিভিন্ন অপরাধের বিষয়ে দেশের বিভিন্ন থানায় তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকলেও সেসব মামলায় বিচার না হওয়ায় তারা প্রতারনার মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়, নিজেদেরকে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অংশ মনে করে। তাদের কাজে কেউ বাঁধা হয়ে দাড়াতে চাইলে গুম করা সহ নিজেদের অবৈধ টর্চার সেলের মাধ্যমে অমানবিক নির্যাতন করে। মিডিয়ার মাধ্যমে এমন খবরও প্রকাশিত হচ্ছে অহরহ। আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকাই এর বড় কারণ হিসেবে মনে করছে  সচেতন নাগরিক সমাজ।

বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ, বর্তমান সরকারের অধীনে দেশ এগিয়ে গেলেও দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কর্মচারী এবং রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা পেশাদার অপরাধীদের অপকর্মের কারনে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে দেশ বিদেশে, ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দেশের মানুষ, নষ্ট হচ্ছে যুব সমাজ, অপরাধ বাড়ছে দিনদিন। দেশের সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। চাকুরী ক্ষেত্রে যোগ্যরা মূল্য পাচ্ছে না, অযোগ্যরা সব দলখ করে বসে আছে। গ্রাম থেকে শহর, তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় রাজনীতি, সর্বত্রই অপরাধী ও প্রতারকেরা সুবিধা হাসিলের জন্য উৎপেতে থাকে। এ ধরনের মুখোশধারী প্রতারকদের চিরুনি অভিযান চালিয়ে ধৃত করে আইনের আওতায় এনে কঠিন শাস্তি প্রদানের কোন বিকল্প নেই। একটি দেশকে এগিয়ে নিতে দুর্নীতি মুক্ত করতেই হয়, দুর্নীতিতে নিমজ্জিত দেশ ও জাতি কখনোই এগিয়ে যেতে পারে না। বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জল করা ও দেশকে এগিয়ে নিতে হলে হাওয়াই মিঠাই ও মাকাল ফল বেশধারী অপরাধীদের শক্ত হাতে ধমন করতেই হবে।

শিক্ষার্থী
ডিপ্লোমা ইন জার্নালিজম
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব জার্নালিজম অ্যান্ড ইলেকট্রনিক মিডিয়া(বিজেম)।

করোনাভাইরাস ও আমরা
                                  

করোনা ভাইরাস ডিজিজ -২০১৯, যার অ্যাক্রোনিম হলো COVID-19.CO হলো করোনা, VI হলো ভাইরাস এবং D হলো ডিজিজ। আর ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯- এ প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হয় বিধায় ১৯ সংখ্যাটি জুড়ে বসেছে COVID- এর সঙ্গে। চীনের উহান প্রদেশ থেকে যাত্রা শুরু করে এরই মধ্যে বিশ্ব ভ্রমণ শেষ করে ফেলেছে এই ভাইরাস। তাণ্ডব চালিয়েছে ইতালি, ফ্রান্স ও স্পেনের মতো দেশে, চালাচ্ছে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এর হাত থেকে নিস্তার মিলছে না রাজা- প্রজা, বাদশাহ-ফকির, ধনি-গরিব করোরই। মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এই করোনায় আমরা প্রকৃতির হারানো রূপ দেখতে পেরেছি। যেখানে পুরো বিশ্ব ব্যস্ত করোনায় আক্রান্ত ও মারা যাওয়া মানুষের হিসাব নিয়ে, সেখানে প্রকৃতি যেন তার উল্টা হিসাবে ব্যস্ত। সে যেন বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন নয়। মনুষ্য তাণ্ডবের আড়ালে আবডালেই চলছে তার হঠাৎ জাগরণের খেলা। নীরব, নির্জন কোলাহলমুক্ত পরিবেশে মায়াময় প্রকৃতি নিজের সুষমা, সৌন্দর্যরাশি যেন একের পর এক তুলে ধরেছে। গত ১৮ মার্চ থেকে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে সব পর্যটনকেন্দ্রে। নিষেধাজ্ঞার এ সারণিতে রয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতও। কোলাহলপূর্ণ সৈকত যেন আজ হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে। সৈকত রাজ্যের এ সুনসান নীরবতায় সবুজ গালিচা তৈরিতে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে সাগরলতা। সবুজ এ জালের মধ্যে ফুটে উঠেছে অগণিত জাতের নাম না জানা বাহারি রঙের সব ফুল। কোলাহলমুক্ত সৈকত পেয়েই সাগরলতা ডালপালা মেলে দিয়ে শান্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারের পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সেন বাঞ্চু। সাগরলতা (Ipomea pes-caprae) একটি লতানো ও দ্রুত বর্ধনশীল উদ্ভিদ। এর ইংরেজি নাম রেলরোড, যার বাংলা অর্থ ‘রেলপথ লতা’। একটি সাগরলতা ১০০ ফুটের বেশি লম্বা হতে পারে।বিশিষ্ট পরিবেশবিজ্ঞানী রাগিবউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সাগরলতা সৈকতের অন্য প্রাণী যেমন কাঁকড়া ও পাখির টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর সবুজ পাতা মাটিকে সূর্যের কিরণ থেকে এমনভাবে রক্ষা করে,যাতে সূর্যের তাপ মাটি থেকে অতিরিক্ত পানি বাষ্পীভূত করতে না পারে। এতে তারা মাটির নিচের স্তরের উপকারী ব্যাকটেরিয়াসহ অন্য প্রাণীর জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয়। উন্নত বিশ্বে সাগরলতাকে সৌন্দর্যবর্ধনের সঙ্গে সঙ্গে সৈকতের মাটির ক্ষয় রোধ ও সংকটাপন্ন পরিবেশ পুনরুদ্ধারের কাজে লাগানো হয়। এই সাগরলতার আরো উপকারী দিক আছে। যেমনঃ সাগরলতার জালে শুকনো উড়ন্ত বালুরাশি আটকে তৈরি হয় বালিয়াড়ি, যা সাগরের রক্ষাকবচ নামেও পরিচিত। এই বালিয়াড়ি বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের সময় উপকূলকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম। এ পসরায় সাগরপাড়ে আরও যুক্ত হয়েছে কচ্ছপের অবাধ বিচরণ। বিনা বাঁধায় সমুদ্রের বিশাল বালুকা বেলাভূমিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে কচ্ছপের দল। ইতিমধ্যে ডিম পাড়াও শুরু করেছিলো তারা। বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় থাকা সামুদ্রিক এ কচ্ছপ সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়, বিশেষ করে খাদ্যশৃঙ্খল বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া সাগরের ময়লা-আবর্জনা খেয়ে পানি পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে তারা। অন্যদিকে বহু বছর পর লোকালয়ের একদম কাছে এসে ডিগবাজিতে মেতেছিলো ডলফিনের দল। দেশের এ ক্রান্তিলগ্নেও ডলফিনের এ মনোমুগ্ধকর নৃত্য যেন অপার মহিমাভরা পরিবেশ- প্রকৃতির জাগরণে মেতে ওঠার প্রমাণিত তথ্য। শুধু কি কক্সবাজারের নিরুপদ্রব সমুদ্র আনন্দ খেলায় মেতেছে? মোটেই না! সাগরকন্যা খ্যাত পর্যটননগরী কুয়াকাটাও তার সৌন্দর্য উন্মোচনে ব্যস্ত। এঁকেবেঁকে পুরো বেলাভূমিতে লাল কাঁকড়ার আলপনা আকার দৃশ্য তারই নজির, যেন দীর্ঘদিন পর সৈকত নিজেদের দখলে পাওয়ার আনন্দ উপভোগে ব্যস্ত তারা প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসটি রোধে বাংলাদেশ পুলিশের অবদান অসামান্য।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী শুধু হোম কোয়ারেন্টাইন বা লকডাউনেই বাংলাদেশ পুলিশ সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং খাদ্য সহায়তার জন্য বাংলাদেশ পুলিশ এগিয়ে এসেছে। বিভিন্ন এলাকায় জীবাণুনাশক ছিটিয়ে জীবাণু মুক্ত করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ বাংলাদেশ পুলিশ হাতে নিয়েছে। এমনকি ডাক্তারদের হাসপাতালে যাতায়াতের ব্যবস্থাও বাংলাদেশ পুলিশ করেছে। যদি কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছে, সেক্ষেত্রে পুলিশ দাফনের ব্যবস্থা করেছে। এমনকি পুলিশের সদস্যরা তাদের প্রাপ্য বৈশাখী ভাতা, একদিনের বেতনসহ প্রায় ২০ কোটি টাকা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত তহবিলে জমা দিয়েছে। এই মহান দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক পুলিশ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিয়েছে। তারা তাদের পরিবার পরিজনের কথা চিন্তা না করে নিজ দায়িত্ব পালন করে গেছে এই প্রাণঘাতী করোনায় ডাক্তারদের ভূমিকাও ছিল অনস্বীকার্য। তারা তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোনো নিরাপদ সামগ্রী ছাড়াই আক্রান্তদের সেবা করে গিয়েছে। না খেয়ে, না ঘুমিয়ে দিনরাত আক্রান্তদের সেবা করে গেছে। তারা এটাও জানতো না যখন তারা ঘর থেকে বের হচ্ছে সেই ঘরে আবার ফিরে আসতে পারবে কিনা। সম্পূর্ণ অনিরাপদে তারা নিরলসভাবে মানুষদের সেবা দিয়ে দিয়েছে বরং এখনও করছে।

তবে এই মহামারী করোনায় বিশ্ব মানুষের নিষ্ঠুর, নির্দয় রূপ অবলোকন করেছে। করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তি অবহেলায় মারা গিয়েছে। অনেক সময় সুস্থ ব্যক্তি সামান্য সর্দি-ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হলেও করোনার কারণে অবহেলায় মৃত্যুবরণ করেছে। করোনায় আক্রান্ত না হয়েও আমরা অনেককে অবহেলা করেছি। স্ত্রী, প্রবাসী স্বামী দেশে আসলে দূরে চলে গেছে, প্রবাসী ছেলেকে দেখে মা বাবা তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। কেউ কাউকে চিনছে না। স্বজনের লাশ হাসপাতালের বারান্দায় পড়ে থাকতে দেখেছে মানুষ। করোনার ভয়ে মৃত ব্যক্তির লাশের দান, সৎকারও ঠিক মতো হয়নি। পুরো দেশ লকডাউনে চলে যাওয়ায়, গরিব-দুঃখী মানুষরা অনাহারে দিন কাটিয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙ্গে গেছে। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য সরকার দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেন। এপ্রিলে অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিলো এইচ. এস. সি পরীক্ষা। লকডাউনের জন্য এইচ.এস.সি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। সাথে সাথে সকল চাকরি পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করা হয়। এরই মধ্যে অনেক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান অনলাইনে ক্লাস কার্যক্রম চালিয়ে যান। যেটা আসলেই প্রশংসাযোগ্য। ধীরে ধীরে সরকার আরও কিছু পদক্ষেপ নিবেন শিক্ষা কার্যক্রম সচল করার জন্য। সরকার অনেক প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। যা অর্থনৈতিক অবস্থাকে সচল রাখতে সাহায্য করবে। সর্বোপরি, করোনায় বিশ্ব অর্জন করেছে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। আমরা সঠিক জানি না এই করোনা পরিস্থিতি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে। তবে অনেক দেশই এখন করোনা পরিস্থিতি অনেকটাই সামাল দিতে পেরেছে। আমাদের দেশে দিন দিন করোনা আক্রান্ত রোগী ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। এ জন্য সঠিক বলা যাচ্ছে না আমরা কবে করোনা পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হবো। তবে এখন জীবনযাত্রা অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ইনশাআল্লাহ আমরা ধীরে ধীরে এই মহামারী কাটিয়ে উঠবো।

-শারমিন আক্তার
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

করোনা বাস্তবতায় ভার্চুয়াল কোর্ট বনাম অ্যাকচুয়াল কোর্ট
                                  

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিভাগের একটি হলো বিচার বিভাগ। বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট থেকে শুরু করে জেলা আদালতগুলোর মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার হাজার মামলার বিচার কাজসহ মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জনস্বার্থে ভূমিকা পালন করে আসছে আদালতের বিচারক, আইনজীবীসহ আদালত সংশ্লিষ্টরা। প্রতিদিন লাখ লাখ বিচার প্রার্থী দেশের আদালতগুলোতে ভীড় করে থাকে। বিগত ২৬ মার্চ থেকে চলমান করোনা মহামারীর ছুটি ও লকডাউনে নিয়মিত আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও গত ৯ মে মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারিকৃত তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ ২০২০ এর মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থা সচল রাখতে আপদকালীন ব্যবস্থা হিসাবে আমাদের বৃটিশ আমলের সনাতনী কোর্ট পদ্ধতিতে ভার্চুয়াল কোর্ট চালু হয়। উক্ত অধ্যাদেশের ৫ ধারার ক্ষমতাবলে গত ১০ মে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে আদালতে শারীরিক উপস্থিতি ছাড়া শুধু জামিন শুনানীর জন্য উচ্চ আদালতসহ অধস্তন আদালতের জন্য বিশেষ প্যাকটিস নির্দেশনা জারি করেন।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী গত ১১ মে থেকে ২৫ জুন, ২০২০ ইং পর্যন্ত ৩০ কার্য দিবসে সারা দেশের অধস্তন আদালতে ভার্চুয়াল শুনানীতে মোট ৮৪ হাজার ৬৫৭ টি জামিন আবেদন নিষ্পত্তি করে মোট ৪৪ হাজার ৮০২ জন আসামীকে জামিন দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে করোনা কালীন সময়ে আদালতের এই কার্যক্রম বিচারপ্রার্থীদের কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। কিন্তু এই কার্যক্রমের বিষয়ে আরো বিশদ চিন্তা ভাবনা এবং সিদ্ধান্তের অবকাশ রযেছে। এই পদ্ধতিতে কাজ করতে গিয়ে প্রতারণা করে জামিন প্রাপ্তিসহ নানা বিষয়ে বিচারকগণ যেমন সমস্যায় পড়েছেন, তেমনি আইনজীবীগণও ইনটারনেটের কম গতি, শুনানীর সময় সংযোগ বিছিন্ন হয়ে যাওয়া, স্ক্যানার ব্যবহার করা, তদবীর করে মামলা লিস্টে এনে শুনানী করে জামিন পাবার পর সেই মামলা লিস্ট আউট দেখানোসহ বহু জটিলতার সম্মুখীন হয়েছেন। এছাড়াও মামলা পরিচালনা করার জন্য ওকালতনামা, বেইলবন্ড, রিলিজ ইত্যাদি ক্রয় করতে আইনজীবীদের সশরীরে কোর্টে যেতেই হচ্ছে। তাছাড়াও যাদের ক্রিমিনাল/জামিনের প্যাকটিস তেমন নেই তারা এই ভার্চুয়াল কোর্ট পদ্ধতিতে হতাশা ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

করোনা পরিস্থিতি আর কতদিন বিদ্যমান থাকবে সেটা হলফ করে বলা অসম্ভব। সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশের মানুষের জীবন জীবিকায় এর মারাত্মক প্রভাব লক্ষণীয়। ব্যবসা- বানিজ্য মন্দা, কল কারখানায় উৎপাদন সীমিত, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে বিদেশী ক্রেতাদের আনাগোনা নেই, মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত, দিনমজুর, শ্রমজীবী মানুষেরা বেকার। করোনার প্রাদুর্ভাব জীবনের স্বাভাবিক গতিকেই থামায় নি বরং মানুষকে সেই আদিম লড়াই অর্থাৎ বেচেঁ থাকার বা টিকে থাকার লড়াইয়ে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে। করোনার প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেনি দেশের আদালত পাড়া। বিচার কার্যের দীর্ঘসূত্রিতা, বিচার প্রার্থীদের হাহাকার, আইনজীবীদের জীবন জীবিকার উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। আইনের সেবা আইনজীবীদের পেশা হলেও এই পেশায় সাধারণ আইনজীবীগণ সরকার কর্তৃক কোন বেতন বা ভাতা পান না। বাংলাদেশে প্রায় ৬০ হাজার আইনজীবী রয়েছেন তার মধ্যে প্রায় ১০ হাজার আইনজীবী আছেন সুপ্রীম কোর্টে। সব মিলিয়ে ৫ হাজার আইনজীবী সিনিয়র ও সরকারী পদের সুযোগ-সুবিধা পেলেও বাকী সবাই দিনে আনি দিনে খায় অবস্থায় জীবন যাপন করেন। জীবিকা বন্ধ থাকলেও জীবন থেমে নেই কারো। থেমে নেই হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, আত্মসাৎসহ অন্যান্য অপরাধও। আমরা জানি Justice delayed is justice denied. বর্তমান ভার্চুয়াল কোর্টে  কেবল মাত্র  হাজতী আসামীর জামিন আবেদন ছাড়া অন্য কোন আবেদন শুনানীর সুযোগ নেই। তদন্তের প্রয়োজনে রিমান্ড কিংবা শ্যোন এরেস্টের আবেদন কিংবা স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পনের জামিন আবেদন কোনটাই নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অভিযুক্ত যেমন প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জামিন ও ন্যায় বিচার লাভের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তেমনি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে আদালত সংশ্লিষ্ট সকলের জীবিকা।

সারাদেশে ইতোমধ্যে সাধারণ ছুটির মেয়াদ শেষে সব সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মার্কেটগুলো খুলে দেয়া হয়েছে। আইনজীবীদের মাঝেও স্বাভাবিক কর্ম তৎপরতা শুরু হয়েছে। এমতাবস্থায় দেশের আদালতগুলোর প্রবেশ পথে থার্মাল স্ক্যানার, জীবাণুনাশক বুথ ও পর্যাপ্ত হ্যান্ড সেনিটাইজারের ব্যবস্থা করে অ্যাকচুয়াল আদালত চালু করার জন্য আইনজীবীদের পক্ষ থেকে প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করা হয়েছে। আইনজীবীদের অভিভাবক বাংলাদেশ বার কাউন্সিলও দেশের সকল বার ও আদালতে স্বাস্থ্যবিধি মান্য বিষয়ক নির্দেশনা প্রদান করেছেন। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টে প্রধান বিচারপতি ও বার এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বিচারপতিদের জন্য সীমিত পরিসরে নিরাপত্তা সামগ্রীর ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং আইনজীবী ও আদালত সংশ্লিষ্টদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন করোনা টেস্ট বুথ স্থাপন করা কয়েছে। এছাড়াও আইনজীবীদের চিকিৎসা সেবার জন্য কয়েকটি হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। তাই সবশেষে বলব করোনা ভয়ে ঘরে না লুকিয়ে আসুন সচেতন থেকে সাস্থ্যবিধি মেনে সহজ কিছু অভ্যাস তৈরী করি। অ্যাকচুয়াল আদালত এখন সময়ের দাবী।


তামান্না আফরিন
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।

ইসরায়েলি দখলদারিত্বে অস্তিত্ব সংকটে ফিলিস্তিন
                                  

আরবদের সাথে ইসরায়েলের দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়; বেশ পুরনো। বিংশশতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত বেশ কয়েকটা বড়সড় যুদ্ধও হয়েছে। ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ মানুষের প্রাণ কেঁড়ে নেয় এবং প্রকৃতিকে সর্বস্বান্ত করলেও দীর্ঘমেয়াদি একটা সমাধান দিয়ে যায়। উভয় পক্ষই শান্তি আলোচনা করে কিংবা চুক্তি স্বাক্ষর করে। যাতে বার বার যুদ্ধের দামামা না বেজে ওঠে। ইতিহাসের বড় বড় যুদ্ধগুলোর দিকে তাকালে আমরা সেই প্রমাণই দেখতে পাই। পৃথিবীর ইতিহাসে দুটি বিশ্বযুদ্ধও কিন্তু শেষ হয়েছে—শান্তির সমাধান দিয়ে। কিন্তু আরব-ইসরায়েলের যুদ্ধগুলো বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে শেষ হলেও তাদের বিরোধ এখনও বিরাজমান।

যাযাবর ইহুদিদের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ছিল জেরুজালেমে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। তাদের জায়োন আন্দোলনের জোরালো ভূমিকায় ১৯৪৮ সালে তা বাস্তবতার মুখ দেখে। বস্তুত, ব্রিটেনের তৎকালীন (১৯১৭) পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড আর্থার জেমস বেলফোর বিষয়টি জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন ইহুদি আন্দোলনের নেতা ব্যারন রথসচাইল্ডকে। তৎকালীন ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সে চিঠি ইতিহাসে ‘বেলফোর ডিক্লারেশন’ হিসেবে পরিচিত। অস্ট্রিয়ার ইহুদী সাংবাদিক ও জায়োন আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ থিয়োডর হার্জেলের ষড়যন্ত্রমূলক প্রচেষ্টা ইসরায়েলে  ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পিছনে বেশ ইন্ধন জোগায়। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বনেতৃবৃন্দের সহানুভূতি কুঁড়িয়ে ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনের ভূমি দখলের নোংরা খেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। শুরু হয় ফিলিস্তিনি ভূমি গ্রাসের অবৈধ প্রতিযোগিতা। যার প্রলয়লীলা আজও চলছে। পশ্চিমা বিশ্বের মদদপুষ্ট হয়ে দিনের পর দিন ইসরায়েল তার ষড়যন্ত্রমূলক সব কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। তারা বেশিরভাগ কাজেই আন্তর্জাতিক আইনের নিয়মিত লঙ্ঘন করে যাচ্ছে। এমনকি জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাকেও কোন তোয়াক্কা করছে না। আমেরিকা শুধু মদদ দিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না ইসরায়েলর অবৈধসব কার্যক্রমকেও প্রত্যক্ষ সমর্থনও দিয়ে যাচ্ছে। মধ্যস্থতার নামে একতরফা এ রকম সব সিদ্ধান্ত দিয়ে যাচ্ছে।

২০১৭ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘ, আরব ও মুসলমান-অধ্যুষিত দেশ, এমনকি মার্কিন মিত্রদের আপত্তি উপেক্ষা করে পবিত্র জেরুজালেম শহরকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এবং খুব ঢাকঢোল পিটিয়ে তেল আবিব থেকে তাদের দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর করেন। বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝর ওঠলেও তারা তাতে কোন কর্ণপাতই করেননি। চলতি বছরের শুরুর দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট মধ্যপ্রাচ্যে শান্তিচুক্তির নামে আরও একটি নাটক মঞ্চায়িত করেছেন। ফিলিস্তিনিদের প্রবল বিরোধিতা উপেক্ষা করে ‘ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি’র নামে প্রহসনমূলক একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করেন ট্রাম্প। ইহুদী ঘেঁষা তথাকথিত শান্তিচুক্তিতে ফিলিস্তিনিদের অধিকার হরণ করা হয়েছে। মার্কিন-ইহুদিবাদী এই পরিকল্পনায় ঐতিহাসিক জেরুজালেমর আল-কুদস শহরকে ইসরাইলি ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেইসাথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত ফিলিস্তিনি শরণার্থীদেরকে তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া, জর্দান নদীর পশ্চিম তীরের অবশিষ্ট অংশ ও গাজা উপত্যকা নিয়ে একটি দুর্বল ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছে। বস্তুত, ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর ইহুদিরা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের মাধ্যমে তাদের দীর্ঘদিনের ষড়যন্ত্রমূলক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে চলছে। তাদের এই ষড়যন্ত্রের ইতি কবে ঘটবে তা ভাবনার বাইরে।

সম্প্রতি ইসরায়েলে লিকুদ পার্টির প্রধান বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট পার্টির প্রধান জেনারেল বেনি গান্তজ নতুন কোয়ালিশন সরকার গঠন করে। চু্ক্িত অনুসারে নেতানিয়াহু ১৮ মাস ক্ষমতায় থাকবেন। কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত ১৭ এপ্রিল এক টেলিভিশন ভাষণে ‘অল্প কয়েক মাসের মধ্যে’ পশ্চিম তীরের ‘অবৈধ ইহুদি বসতি’ জোরপূর্বক ইসরায়েলের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার ঘোষণা দেন। পরক্ষণেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন লুফে নেন। এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে পশ্চিম তীর দখলের হুঙ্কার দেন এই যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী। বলেন, বড় কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই নতুন করে ফিলিস্তিনের জর্দান নদীসংলগ্ন প্রায় দুই হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করবেন। নেতানিয়াহু যে এলাকাটি দখল করার ঘোষণা দিয়েছিলেন—সেটাকে ফিলিস্তিনিদের ‘খাদ্য বাস্কেট’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ, পশ্চিম তীরের উৎপাদিত সবজির প্রায় ৬০ শতাংশই ওই এলাকায় উৎপাদিত হয়। ইসরায়েল কয়েকদিন আগে তাদের বিদ্বেষী চরিত্রের আরো একটি নগ্নরূপ প্রকাশ করেছে। এতদিন তো বসৎ বাড়ি, মসজিদ, পর্যটন কেন্দ্র দখল করেছে—কিন্তু এবার কবর স্থানও দখলে নিয়েছে। ফিলিস্তিনের বন্দর নগরী জাফার প্রাচীন একটি কবরস্থান গুঁড়িয়ে গত ১৫ জুন সেখানে বসতি স্থাপন করেছে ইসরাইল। ১৫ জুন সকালে কবরস্থানটি দখলদার ইসরাইল বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়। শত শত কবর মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়! এটা কোন ধরণের বর্ববরতা?

ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনি ভূমি পশ্চিম তীর ও জর্ডান সীমান্ত পর্যন্ত অংশ দখলের পরিকল্পনা পরিত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। গত সপ্তাহের সুরক্ষা কাউন্সিলের ভার্চুয়াল বৈঠকের বক্তব্যে গুতেরেস বলেন, ‘ফিলিস্তিনের ভূমি ইসরায়েলের দখলের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত হবে। আমি ইসরায়েলি সরকারের প্রতি ফিলিস্তিনি ভূমি দখলের পরিকল্পনা বাতিল করার আহ্বান জানাচ্ছি। আর তারা যদি সেটা করে তাহলে দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের সম্ভাবনা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। ফিলিস্তিনসহ আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যে সমঝোতার বিষয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল সেটি হুমকির মুখে পড়বে।’ কিন্তু ইসরায়েল এই আহ্বানে সাড়া দিবে কি? জাতিসংঘ থেকে এরূপ আহ্বান অতীতেও এসেছিল। কিন্তু তারা সে আহ্বানে সাড়া না দিয়ে একের পর এক ভূমি দখলের অবৈধ  পদক্ষেপ নিয়েছে এবং নিচ্ছে। যে পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সম্প্রসারণবাদী ইহুদীরা ‘জোর যার মুল্লুক তার’ এই ধারণা লালন করে ফিলিস্তিনকে সংকুচিত করে ইসরায়েলকে প্রশস্ত করে তুলেছে। তাদের অবৈধ সম্প্রসারণবাদ বাস্তবায়নের পেছনে রয়েছে তাদের চিরাচরিত উগ্রবাদ। ফিলিস্তিনের জনগণের সুখ কেড়ে নিয়েছে এই উগ্রবাদী ইসরায়েল সরকার। কখন কোন স্থানে বিমান হামলা চালায়, সেনাবাহিনী এসে ধরে নিয়ে যায় সেই অসুখকর চিন্তা পাকড়াও করে বেড়ায় ফিলিস্তিনের প্রতিটি নাগরিককে। মাঝে মধ্যে কয়েকটি স্থানে ফিলিস্তিনিদের চলাচলের উপর বিধিনিষেধও আরোপ করে ইসরায়েল।

বিবিসির তথ্যমতে, ইসরায়েল প্রতি বছর ৫০০ ফিলিস্তিনি তরুণকে ধরে নিয়ে যায়। যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। ইউনিসেফ জানায়, পশ্চিম তীরে এমন নিষ্ঠুর ঘটনা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। পৃথিবীতে ইসরায়েল একমাত্র দেশ, যারা সামরিক আদালতের মাধ্যমে কিশোরদের বিচার করে। যাদের বয়স ১৮ হয়নি। নিজেদের দেশে নিজেরা স্বাধীনভাবে চলতে পারে না। নিজ ভূমে পরবাসী হয়ে থাকতে হয়। যুগের পর যুগ ইসরায়েলি আগ্রাসন যদি এভাবে চলতে থাকে তবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রটির ভূখণ্ড টিকবে কি? কিংবা ফিলিস্তিন বলে কোন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকবে কি? ভূমি-ক্ষুধার্ত ইসরায়েল ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড গ্রাস করে উদরসাৎ করে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন করতে পাঁয়তারা করছে।

১৯৪৮ সালের মানচিত্র ও বর্তমান মানচিত্রের দিকে দৃষ্টি দিলে খুব সহজেই ইসরায়েলি দখলদারিত্বের নগ্নরূপ দেখতে পাই। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রটিকে বাঁচাতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশ্ব নেতাদের এখনই এগিয়ে আসা প্রয়োজন। অন্যথায়, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রটি একসময় প্রাচীন রোম নগরীর মত ইতিহাস হয়ে যাবে। শুধু নিন্দা জ্ঞাপন ও ফিলিস্তিনি শান্তিকামী সংগঠন হামাস, পিএলও’র লড়াইয়ে সমর্থন দিলে ইসরায়েলের দখলদারিত্বের অবসান ঘটবে না। ওআইসি, আরব লীগ ও জাতিসংঘ একত্র হয়ে উদ্যোগ নিলে ফিলিস্তিনের সার্বভৌমত্ব রক্ষা পাবে। শুধু এরদোয়ান কিংবা ইমরানখান সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিলে ইসরায়েলের একঘেঁয়েমি বন্ধ হবে না। প্রশ্ন থেকে যায় যে, ইসরায়েলের পরম মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘে ইসরায়েলের স্বার্থ হানি হয় এমন বিলে কি ভেটো প্রদান করবে না? হ্যাঁ, ভেটো দেওয়ার সম্ভাবনা অনেক। কারণ ভেটো না দিলে তো তাদের কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র ব্যবসায় ধস নামবে! তবুও অনেকগুলো দেশ, সংগঠন এবং বাঘা বাঘা নেতৃত্ববৃন্দ মিলে যৌথ উদ্যোগ নিলে তা সফল হওয়ার সম্ভাবনাও কিন্তু ঢের। আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গের জন্য ইসরায়েলের প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় আনলে অন্তত নমনীয় হতে বাধ্য হবে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিকে যে ভাবে বশে আনা হয়েছিল সেই পন্থা অবলম্বন করা যেতে পারে ইহুদীবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েলের ব্যাপারেও। কারণ, ইসরায়েল শুধু ফিলিস্তিনের সাথেই দ্বন্দ্বে জড়ায়নি; ইসরায়েলের সীমান্ত ঘেঁষা সিরিয়া, জর্ডান, মিশর, লেনাননসহ কয়েকটি দেশের দেশের সাথেই বিরোধ রয়েছে। ইসরায়েলি দখলদারিত্বের সমাপ্তি টানতে আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে জাতিসংঘের নেতৃত্বে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের জন্য ভূমি নির্দিষ্ট করে দেওয়া উচিৎ। নিজেদের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষেরও তা মেনে নেওয়াটা সমীচীন হবে। অন্যথায়, বছরের পর বছর ইসরায়েল অবৈধভাবে শুধু দাবি করেই যাবে। হবে হামলা ও পাল্টা হামলা। দ্বন্দ্বেরও অবসান হবে না। পুরো পৃথিবী এক মেরুতে আর ইসরায়েল অন্য মেরুতে। তবুও তাদের অবৈধ কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারা পুরো পৃথিবীর জন্য ব্যর্থতাও বটে। ব্যর্থতার গ্লানি মুছে পৃথিবীর শান্তিকামী রাষ্ট্র, মুসলিম উম্মাহর স্বার্থ রক্ষায় তৎপর এমন সংগঠন ও মানবতাবাদী সংগঠনগুলো ইসরায়েলি আগ্রাসন রুখে ফিলিস্তিনের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারবে কি না সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সাইফুল ইসলাম হাফিজ
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

চীন সীমান্তে নাস্তানাবুদ অথচ বাংলাদেশ সীমান্তে গুলি, ভারত কি চায়?
                                  

সম্প্রতি চীন ও ভারতের সীমান্ত বিরোধ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। চীন যেন কিছুতেই পিছু হটছে না। লাদাখ সীমান্তে তাদের সৈন্য ও সমরাস্ত্রের মজুদ দিন দিন বাড়িয়ে চলেছে। এমনকি বিস্তীর্ণ ভারতীয় ভূখণ্ড দখল করে নিয়েছে, ভারত প্রথমে কিছুটা নমনীয় থাকলেও সম্প্রতিক সময়ে তারাও সীমান্তে তাদের সৈন্য ও যুদ্ধাস্ত্র বাড়িয়েছে, পরিস্থিতি যে একেবারেই মুখোমুখি সে কথা বলাই বাহুল্য।

প্রাথমিক পর্যায়ে ভারতের ভরসা ছিল ১৯৯৬ সালের চীন-ভারত সীমান্ত চুক্তিতে, যেখানে ভারত ও চীন কোন পক্ষই সীমান্তে অস্ত্র কিংবা বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহার করতে পারবে না। কিন্তু দেখা গেল চীনা সেনারা non-lethal অর্থাৎ ভোঁতা অস্ত্র দিয়েই ২০ জন ভারতীয় সেনাকে হত্যা করে, আর এর মাধ্যমে বিরোধিতার পারদ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এখন ভারতের স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে সামনের ৪ মাস চীনা সেনাদের আগ্রাসন কোন মতো রুখে দেওয়া, এরপর শুরু হবে তুষারপাত, প্রচন্ড শীতে হয়তো চীনা সেনারা ওই অঞ্চল ছেড়ে চলে যাবে, আর তখনই ভারত ঐ অঞ্চল তাদের নিজেদের আয়ত্ত নিবে। কিন্তু সে গুড়ে বালি, স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা যাচ্ছে চীনা সেনারা রীতিমতো ওই অঞ্চলে স্থাপনা নির্মাণ শুরু করে দিয়েছে। ১৯৬২ সালের পর এই প্রথম ভারত ও চীন এত ব্যাপক সীমান্ত বিরোধে জড়িয়ে পড়ল, এই বিরোধের পারদ যে সহজে নামবে না সে কথা সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে।

অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে ভারতের এই কোণঠাসা পরিস্থিতিতে তার খুব কাছের বন্ধু রাষ্ট্র নেপাল ও ভুটান ভারতের সঙ্গে রীতিমত বৈরী আচরণ করছে। কিছুদিন আগে নেপাল পুলিশ ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকে স্থানীয় ভারতীয়দের বেদম প্রহার করেছে, ভুটান ভারতীয় কৃষকদের পানি বন্ধ করে দিয়েছে। শ্রীলংকা ও মালদ্বীপ অনেক আগ থেকেই ভারতের সঙ্গে নেই। পাকিস্তানের সাথে তো সাপে-নেউলে, বেচারা বাংলাদেশের  কুল রাখি না শ্যাম রাখি অবস্থা । কথা হচ্ছে, তথাকথিত পরাশক্তি ও স্বল্প সময়ে কল্পিত বিশ্ব অর্থনীতিতে পোক্ত আসন  দখল করে নিবে যে ভারত তার অবস্থা এত মলিন কেন? কোন একজন প্রতিবেশী আজ ভারতের পাশে নেই। ভারত কি কখনো এই উত্তরগুলো গভীরে যেয়ে খোঁজার চেষ্টা করেছে? প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে শুনেছি তাদের সাউথ ব্লকের থিংক ট্যাংক এর মাথামোটা একটা বিভাগ আছে। সে বিভাগ কি কখনো শোষিত নেপাল কিংবা ভুটানের কান্না, বাংলাদেশীদের পানির কষ্ট সরকারপ্রধানদের কাছে তুলে ধরতে পেরেছে?
উপরন্তু, চীনের সাথে এই সীমান্ত বিরোধের প্রাক্কালে ভারত চীনের কাছে যতটা নাস্তানাবুদ বা মার খাচ্ছে, ঠিক ততটা মারমুখী ও আগ্রাসী ভূমিকা চালাচ্ছে সীমান্তে বসবাসরত নিরীহ বাংলাদেশিদের উপর। বিগত ছয় মাসে সীমান্তে অন্তত ২৫ জন সাধারণ মানুষ ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের হাতে নিহত হয়েছে, অথচ বাংলাদেশ সরকার এখনও ভারতকে বন্ধু মনে করেন, নেপাল কিংবা ভুটানের মত চোখ এখনও রাঙাইনি । তিস্তার পানি নিয়ে বাংলাদেশে চোখ রাঙাতে পারে, অবৈধ ভারতীয়দের বাংলাদেশে চাকরি করা নিয়ে চোখ রাঙাতে পারে, বাণিজ্য বৈষম্য নিয়ে চোখ রাঙাতে পারে, নামমাত্র মূল্যে ট্রানজিটের বিরুদ্ধে চোখ রাঙাতে পারে। বাংলাদেশ সেটা করেনি, এখন দেখা যাচ্ছে বিএসএফ বিনা উস্কানিতে বাংলাদেশ সীমান্তে পাখির মতো নিরীহ বাংলাদেশীদের হত্যা করছে। তাহলে কি ভারত চাইছে বাংলাদেশও অস্তিত্বরক্ষার প্রয়োজনে  চীনের সঙ্গে হাত মেলাক অন‍্য প্রতিবেশীদের মতো। ভারতকে তার নিজের স্বর্থেই উত্তর খুঁজতে হবে এবং সৎ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করতে হবে।

পরিশেষে বলি ভারতীয় কর্তাব্যক্তিদের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক, দুঃসময়ে পাগলও বোঝে কিভাবে তাকে চলতে হবে।

মো: ফেরদৌস রেজা
সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক

পূর্বাভাসহীন শত্রুর তান্ডবে বিধ্বস্ত বিশ্ব
                                  

বিশ্ব আজ থমকে গেছে করোনা ভাইরাসের ভয়াল তান্ডবে। বাতাস ভারী হয়ে গেছে  লাশের গন্ধে। পৃথিবীর আজ বড্ড অসুখ। সৃষ্টির সেরাজীব আশরাফুল মাখলুকাত মানব জাতি আজ বড্ড অসহায় হয়ে পড়েছে করোনা নামক এই অদৃশ্যে শত্রুর কাছে। পূর্বাভাস  ছাড়াই যেনো স্তব্ধ হয়ে গেছে সারা বিশ্ব।

বিজ্ঞান অসহায় হয়ে পড়েছে চোখেও দেখা যায় এতো ক্ষুদ্র এক ভাইরাসের কাছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়তো এটাই। ভাইরাসের সাথে মানুষের যুদ্ধ অতপর, মানুষের অপূরণীয় ক্ষতি।
 
পৃথিবীর সকল স্বাভাবিক  নিয়মের পরিবর্তন ঘটেছে। পৃথিবীর মানুষের আজ বেহাল দশা, পথে ঘাটে পড়ে থাকছে লাশ, ভয়ে আতঙ্কে কেউ এগিয়ে আসতেও যেনো নারাজ। নিষ্ঠুর এই  ভাইরাসটা এসেছেই যেনো, মানুষের উপর এক নির্মম প্রতিশোধ নিতে।

চীনের উহান প্রদেশ থেকে শুরু হয়েছিল এই অদৃশ্যে শত্রুর ভয়াল তান্ডব। এক এক করে  ইতালি, স্পেন, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইরান, সৌদি আরব, ভারত, বাংলাদেশ সহ বিশ্বের ২১৩টি দেশ ও অঞ্চলে তার  অস্তিত্বের জানান দিয়েছে। করোনার এই তান্ডব শেষে বিশ্বের কি পরিমাণ ক্ষতি হবে বা কত মানুষের প্রাণ কেড়ে নেবে, সে সম্পর্কে  আমরা এখনো  অবগত নয়।

ইতোপূর্বে, ১৭২০ সালে  প্লেগে ১ লাখ, ১৮২০ সালে কলেরায় ১ লাখ, ১৯১৮-২০ তে স্প্যানিশ ফ্লুতে ১০ কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল।
 
কাকতালীয় ভাবেই, দীর্ঘ ১০০ বছর পর আবার পৃথিবীর বুকে হানা দিয়েছে করোনা বা পড়ারফ-১৯ নামক মহামারী। করোনা আক্রান্ত কারো সংস্পর্শে আসলেই ভাইরাসটি অন্যের মাঝে তার অস্তিত্বের জানান দেওয়ার সুযোগ পায়। চীন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও বিশ্বের অন্যান্যা রাষ্ট্রের অবস্থা ভয়াবহ এবং দিন দিন  আরো জটিল হচ্ছে।

বিশ্ব আজ রুপ নিয়েছে এক ভয়াল মৃত্যুপুরীতে। এখন পর্যন্ত, কোন ওষুধ বা ভ্যাকসিন আবিষ্কার করাও সম্ভব হয়নি এই ভাইরাসটির। জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত এই রাষ্ট্রগুলো আজ পরাস্ত হয়ে, আতœসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে করোনার কাছে।

বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ৮ মার্চ করোনা তার অস্তিত্বের জানান দেয়। দিন দিন সংখ্যাটা যেনো গণহারে বেড়েই চলছে। বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা ১লাখ ৫০ হাজার ছুঁই ছুঁই। করোনা নিয়ে সারাদেশে মৃত্যুর সংখ্যা ১৮০০ এর ও অধিক এবং করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ও কিন্ত করোনায় মৃত্যুর থেকেও বেশি। এখন প্রতিদিনই ৪০০০ এর কাছাকাছি শনাক্ত আর ৪০ এর ঘরে মৃত্যুর হার লক্ষণীয়।
সারাদেশব্যাপী, আরো ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে যাওয়ার আগেই, নিয়ন্ত্রণের জন্য সকল ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এই মুহূর্তে, আমাদের দায়িত্বশীল, সুনাগরিকের পরিচয় দিতে হবে। এই তান্ডব থেকে বাঁচতে হলে, আমাদের  আরো সচেতন হতে হবে। এবারের যুদ্ধ থেকে নিজে, পরিবার এবং দেশকে রক্ষা করতে হলে শারীরিক দূরত্ব রক্ষা করে নিজ নিজ ঘরে  অবস্থান করতে হবে। মনে রাখতে হবে করোনায়, জনসচেতনতাই বড় প্রতিষেধক। তাই এই মুহূর্তে ঘরে থাকায় সর্বোৎকৃষ্ট কাজ।

এখন, মানুষের সংস্পর্শে আসা মানেই, নিজের জীবনকে বিপন্ন করা, পরিবারের সদস্যদের জীবনকে হুমকির মধ্যে ফেলে দেওয়া এবং এই মহামারীকে দেশব্যাপী গণহারে ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করা। অসচেতন থেকে নিজের ক্ষতি করা এবং অন্যকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া যেমন কোন সচেতন নাগরিকের গুণ নয়, তেমনি  কোন সঠিক মুসলিমের গুণ ও নয়।

আর রোগের উপসর্গ বা লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও, ঘরে অবস্থান না করে মানুষের মাঝে যাওয়াতো ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে হত্যার মতোই অপরাধ। তাই এই মুহূর্তে, জরুরী  প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাহিরে হওয়া থেকে বিরত থাকুন।

মহানবী (সা.) এ সম্পর্কে বলেন, জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন করা, আর মহামারীর এলাকা থেকে পলায়ন একই বিষয়। জিহাদের ময়দান থেকে পালিয়ে আসা যেমন হারাম তেমনি মহামারীর সময় এলাকা ছাড়াও হারাম।

মহানবী (সা.) বলেন, “যে কোনো ব্যক্তি মহামারীর সময় নিজেকে ঘরে রুদ্ধ রাখবে ধৈর্য সহকারে, সওয়াবের আশায় এবং এই বিশ্বাস নিয়ে যে, আল্লাহ তার ভাগ্যে যা লিখেছেন এর বাইরে কিছুই ঘটবে না, সে শহীদের মর্যাদা ও বিনিময় লাভ করবে।”

আপনার বেপরোয়া চলাফেরার কারণে যদি অন্য কেউ আপনার দ্বারা সংক্রমিত হয়, তাহলে এর দায়িত্ব কে নেবে? এক্ষেত্রে নিশ্চয়ই আপনি বান্দার হক নষ্টকারী হবেন। তাই এই মুহূর্তে আমদের সবাইকে আরো সচেতন হতে হবে, নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এবং দেশ ও দেশের মানুষের জন্য। তাই বিনা প্রয়োজনে ঘরের বাহিরে বের হওয়া থেকে সম্পূর্ণরুপে বিরত থাকুন। জরুরী প্রয়োজনে বাহিরে গেলে অবশ্যই মাস্ক পরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাহির যাাবেন। এছাড়াও ঘন ঘন সাবান দিয়ে ২০ সেকেন্ড, ভালোভাবে হাত ধৌত করুন। হাঁচি কাশির সময় রুমাল ব্যবহার করুন। নাকে মুখে, চোখে হাত দিবেন না। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এরকম পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করুন।

করোনাকালীন বিত্তশালীরা মানবিকতার পরিচয় দিন আপনার আশেপাশের গরিব, অসহায় মানুষের জন্য সাহায্যর হাত বাড়িয়ে দিন। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে, কেউ যেন ক্ষুধার অভাবে মারা না যায়, অথবা কারো যেন খাবারের জন্য এই মুহূর্তে ঘর থেকে বের হতে না হয়, সেই জন্য সরকারের পাশাপাশি সকল বিত্তবান মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশেকে এই মহামারীর প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হলে, সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

সরকারকেও এই মুহূর্তে কিছু জরুরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যে সকল জায়গা বেশি ছড়িয়ে পড়েছে সেসকল জায়গা লকডাউন কার্যকর করতে হবে। ডাক্তারদের যথাযথ, সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। যতো বেশি সম্ভব  পরীক্ষা  করাতে হবে। আক্রান্তদের পুরোপুরি আলাদা করে যথাযথ চিকিৎসা, সেবা প্রদান করতে হবে। গরীব অসহায় জনগণের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়ে তাদের ঘরে খাবার পৌছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। বরাদ্দকৃত অর্থের যেন যথাযথ বন্টন হয়, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে, যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সৃষ্টিকর্তার কাছে পৃথিবী সুস্থের জন্য দোয়া করতে হবে। কোন এক ভোরে পৃথিবী থেকে করোনা বিদায় নিবে। পৃথিবী আবার সুস্থ  হবে, সেই সাথে সুস্থ হবে প্রিয় স্বদেশ। তাই আসুন এই মুহূর্তে ঘরে থাকি নিরাপদ থাকি, মাতৃভূমিকে নিরাপদ রাখি।

লেখক;- মোঃ হাসানুর রহমান
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ,
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

করোনা মোকাবেলায় অতন্দ্র প্রহরী “গণমাধ্যম”
                                  

মহামারী করোনায় গোটা বিশ্ব আজ নিস্তব্ধ। এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে লকডাউন চলছে দেশে দেশে। তবুও এর লাগাম টানা যাচ্ছে না। প্রাণসংহারক ক্ষুদ্র অণুজীবের তান্ডব থামাতে যখন হিমশিম খাচ্ছে সমগ্র বিশ্ব। ঠিক তখনই করোনা মেকাবেলায় ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে গণমাধ্যম। উহানের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেঙে তথ্য বের করে এনেছে বিশ্ববাসীর কাছে। চিন থেকে শুরু করে সর্বত্র রাষ্ট্র যখন তথ্য গোপনের চেষ্টায় ব্যস্ত, তখনই গর্জে উঠেছে গণমাধ্যমকর্মীরা। নিজেদের দায়িত্বে অবিচল থেকে নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে সংবাদ সংগ্রহ করছেন তারা। সচেতনতার প্রসার ঘটিয়ে নীরবে বাঁচিয়ে চলেছে বহু মানুষের প্রাণ।
 
বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া এ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। থেমে নেই মৃত্যুর ঘন্টাও। যা দুঃখজনক এবং উদ্বেগজনকও বটে। কিন্তু এই ভাইরাসটি যে শুধু ক্ষতিই করেছে তা নয়, বরং আমাদেরকে অনেক শিক্ষাও দিয়েছে। স্মরণ করিয়ে দিয়েছে পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব। বুঝিয়ে দিয়েছে দেশের স্বাস্থ্য-খাত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা। এবং সর্বোপরি আরও একবার প্রমাণ করেছে গণমাধ্যমের উপযোগিতা।

সংক্রামক যেকোনো রোগের বিস্তার ঠেকাতে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকে৷ কারণ সঠিক তথ্যটি দ্রুত মানুষের কাছে পৌছানোটা অত্যন্ত জরুরি৷ মহামারী বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় গুজব প্রতিরোধ করে জনসাধারণকে সচেতন ও সতর্ক করতে গণমাধ্যমকর্মীরা দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন করেন। ফলে জনগণ বিভ্রান্ত ও আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়। একবার ভাবুন তো, এই মহামারীর সময় যদি গণমাধ্যম না থাকত, তবে বাড়ির ড্রয়িং-রুমে বসে করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে আদৌ কি জানা সম্ভব হতো? গণমাধ্যমের অনুপস্থিতিতে সরকারকে যদি বাড়ি বাড়ি গিয়ে লকডাউন তথা সামাজিক দূরত্বের গুরুত্ব বোঝাতে হত, তাহলে এতদিনে করোনার ভয়াবহ তান্ডব ঠেকানো কতটুকু সম্ভব ছিলো?

একটা সময়ে দেশে কলেরা বা ডায়রিয়ায় মানুষের মৃত্যু ছিল স্বাভাবিক ঘটনা৷ কিন্তু সহজ, স্বল্পমূল্যের সমাধান ওরস্যালাইনের কথা এখন দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষটিরও জানা। নাগরিকদের সচেতন করার মাধ্যমে পোলিও, পক্স ও প্লেগসহ বিভিন্ন রোগের বিস্তারও ঠেকানো গেছে বাংলাদেশে৷ এক্ষেত্রেও গণমাধ্যমের ভূমিকা অস্বীকার করা যাবে না৷

‘বাড়িতে থাকুন, সুস্থ থাকুন’ গণমাধ্যম এই বার্তা যদি আমাদের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে না দিত, তাহলে হয়তো এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ আকার ধারণ করতো। তখন হয়তো হাজার চেষ্টাতেও দেশজুড়ে সর্বাত্মক লকডাউন সম্ভব হত না। দেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে কোথায় সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছে, লকডাউনের জেরে কার ঘরে হাঁড়ি জ্বলছে না, এসব খবর থেকে শুরু করে, করোনার বিরুদ্ধে যারা সামনে থেকে লড়াই করছেন তাঁদের কুর্ণিশ জানানো পর্যন্ত, সর্বত্রই জনসাধারণের অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকায় কাজ করে চলেছে গণমাধ্যম।

লকডাউন চলাকালীন কোথায় অনিয়ম হচ্ছে, কোথায় মানুষ সামাজিক দূরত্ব মানছে না এসব তথ্যও কিন্তু করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হাতিয়ার হয়ে উঠছে। গণমাধ্যমের দৌলতেই কমছে মানুষের দুর্ভোগ, সচেতনতার প্রচারের মাধ্যমে বাড়ছে সামাজিক দূরত্ব ও বেঁচে যাচ্ছে বহু মানুষের প্রাণ।

করোনার ছোবল বিশ্বের কোনো দেশ এবং কোনো জনগোষ্ঠীকেই যেহেতু ছাড় দেয়নি, সেহেতু গণমাধ্যমকর্মীরাও আজ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মানুষ জীবনযাত্রার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে করোনা মোকাবেলায় কার্যকরী সহায়ক ভূমিকা পালন করছে এই গণমাধ্যম। কিন্তু প্রয়োজনীয় অনুপাতে নিরাপত্তা বঞ্ছিত হচ্ছে গণমাধ্যমকর্মীরা। এজন্য সরকারের গণমাধ্যম কর্মীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর জোরদার প্রয়োজন।

মুতাছিম বিল্লাহ রিয়াদ
শিক্ষার্থী: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

জিপিএ ফাইভ ও উচ্চ শিক্ষাই মেধাবী নির্ণয়ের মাপকাঠি নয়
                                  

জুবায়ের আহমেদ

জ্ঞানার্জন করা প্র্যতেক নর নারীর উপর ফরজ। ইসলাম ধর্ম ছাড়াও প্রত্যেক ধর্মেই জ্ঞানার্জনের তাগাদা দেওয়া হয়েছে। জ্ঞানার্জনের বড় মাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। একটি শিশু কথা বলতে শেখার পরই মা, বাবা ও পরিবারের সদস্যদের কাছে থেকে কথা বলা শেখে, পরিবারের সদস্যদের কথাবার্তা, আচার আরচণ শিখে। শিশুরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়েও বেশি নৈতিক শিক্ষা পায় মা বাবার কাছে। পরিবার ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে। নৈতিক শিক্ষা পাওয়া একজন শিশু পরবর্তীতে বেশি লেখাপড়া না করলেও একজন ভালো মানুষ হতে পারে সহজেই। পেশাগত জীবনেও সফল হতে পারে নম্রতা ভদ্রতা ও পাশাপাশি নিজের ইচ্ছা শক্তি ও মেধা দিয়ে।

বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও দিন দিন শিক্ষিত ব্যক্তির সংখ্যা বাড়ছে। স্বাক্ষরতার হার এখন ৭৩.৯ শতাংশ। সেই সাথে বিগত এক যুগ আগেও যেখানে একটি গ্রামে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী থাকতো বড়জোর ৪ থেকে ৫ জন, সেখানে বর্তমানে ২০ থেকে ২৫ জন, আবার তারও বেশি অনেক গ্রামে। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে উচ্চ শিক্ষার্থীর সংখ্যাও এখন পূর্বের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। প্রাথমিক থেকে  পূর্বে বহু শিক্ষার্থী ঝড়ে যেতো, যা এখন মাধ্যমিকে এসেছে। বাল্য বিয়ে বন্ধের ফলে যে সকল কিশোরীরা প্রাথমিক শেষেই বাল্য বিয়ের বলী হতো তা এখন মাধ্যমিক শেষে উচ্চ মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়েছে। ছেলেদের বেলাতেও তাই। পূর্বে যেখানে এসএসসির আগেই ছেলেরা প্রবাসে চলে যেতো বা দেশেই কাজে লেগে  যেতো সেখানে এখন প্রবাস গমনে জাতীয় পরিচয় পত্র বাধ্যতামূলক, করা এবং মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির ফলে ছেলেদের লেখাপড়া করাচ্ছে অন্তত এসএসসি পর্যন্ত।

দেশব্যাপী অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন এবং উচ্চ শিক্ষিতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষা এখন ভালো রেজাল্টের প্রতিযোগিতা, শুধু ভালো চাকুরী এবং পেশাগত জীবনে সফলতার মূল অস্ত্র হিসেবে পরিণত হয়েছে। যার ফলে অভিভাবকদের চাপে ছোট থেকেই শিশুরা বইয়ের বোঝা কাঁধে নিয়ে পড়ার চাপে হারাচ্ছে আনন্দঘন শৈশব। পাঠ্য বইয়ের চাপে নৈতিক শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। পড়ার চাপে মানুষের সাথে ঠিকমতো না মেশার কারনে  শেখা হচ্ছে না বাস্তব জীবনের কোন কিছুই। সেই সাথে ওর মতো,এর মতো ভালো রেজাল্ট করতেই হবে, ভালো রেজাল্ট মানেই মেধাবী ছাত্র, ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, অভিভাবকদের এই ধরনের মানসিকার বলি হচ্ছে বহু শিশু, যারা পড়ার চাপ নিতে না পেরে আত্মহত্যা করছে। ভালো রেজাল্ট না করতে পারলে আত্মহত্যা করছে। প্রতিবেশীদের কটুক্তির কারনে মূল্যবান জীবন শেষ করে দিচ্ছে।

বাংলাদেশে ততই শিক্ষিতের হার বাড়ছে ততই শিক্ষা হয়ে যাচ্ছে গৌরবের অহংকারের। সকলেই লেখাপড়া করায় এখন কাউকে অশিক্ষিত বলে তাচ্ছিল্য করার বিপরীতে তুই, তুমি জিপিএ ফাইভ পাওনি, তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছো না বা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করছো না মানে তুমি মেধাবী নও। খারাপ ছাত্র ছিলে তাই পারনি। এমন মানসিকতা সবার মাঝে। স্বয়ং অভিভাবকেরাও সন্তানরা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারলে হতাশ হন, কথা শোনান, মেধা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জিপিএ ফাইভ না পাওয়াকে দায়ী করেন। প্রতিবেশী বা সহপাঠীরাও দূরে সরে যান শুধুমাত্র ভালো রেজাল্ট করতে না পারায়। সবাই ধরে নেয় যে, সে এ প্লাস বা এ গ্রেড পায়নি মানেই ভালো ছাত্র নয়। এই ধারণাটা আমাদের সমাজ ও দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, যার বলী হচ্ছে বহু শিক্ষার্থী। অথচ পাঠ্য বই নিয়মিত পড়লেও সব বিষয়ে সবার ভালো জ্ঞান থাকে না, সবাই ভালো বুঝে না, প্রয়োজনও নেই বুঝার। যে বিষয়ে ছাত্রটি ভালো বুঝে সে বিষয়ে ভালো করলেই হয়। আর ডি গ্রেড পেয়ে পাশ করা ছাত্রও কোন না কোন বিষয়ে ভালো বুঝে। এটা প্রকৃতিগত বিষয়। ভালো বুঝার বিষয়টি দিয়েই প্রমাণ হয় সে মেধাবী,না হয় সে কোন বিষয়েই ভালো বুঝতো না। আবার লেখাপড়া কম করেও অনেকে ভালো রেজাল্ট করছে। এর মানেই সে মেধাবী নয়।

যার বিবেক বুদ্ধি আছে সেই মেধাবী। মেধাবী হতে পারে একজন ড্রাইভার, কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ক্রীড়াবিদ ও মিস্ত্রি সহ যেকোন পেশার মানুষ। একজন মেধাবী মানুষের পরিচয় হলো সে যে কাজটি করবে তা বুদ্ধি খাটিয়ে করে সফলতা অর্জন করা। চৌকসতার সাথে কাজটি সম্পন্ন করার মাঝেই মেধার স্বাক্ষর রাখা যায়। মেধাবী মানেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ, ভালো রেজাল্ট বা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণই নয়। নৈতিক শিক্ষা পাওয়া, বিবেকবোধ জাগ্রত রাখা এবং নিজ কাজে সফল হওয়ার চেয়ে বড় মেধাবী আর কেউ হতে পারে না। অথচ এখন মেধাবী নির্ধারণ করা হয় শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, ভালো রেজাল্ট এবং উচ্চ শিক্ষা দিয়ে। যারা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, জজ, ব্যারিস্টার, বিসিএস ক্যাডার হওয়া সহ বড় বড় মাধ্যমে ভালো চাকুরী করে তাদেরকেই মেধাবী হিসেবে গন্য করা হয়। একজন নার্স তার কাজে সবসময় সফল হলেও তাকে মেধাবী মনে করা হয় না, কারন সে ডাক্তার নয়। একজন কৃষককে মনে করা হয় মূর্খ, কারন সে লেখাপড়া করেনি। অথচ একজন কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রম, ভালো জীব বপন এবং প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে বীজ থেকে উৎপাদিত ফসলকে খাদ্য উপযোগী করে তোলার মাঝে মেধার স্বাক্ষর রাখে। দেশের মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণ করে। খাদ্যের যোগান না হলে, খাদ্য না থাকলে অন্যসব বড় বড় পেশাজীবির কি মূল্য আছে।

শুধুমাত্র ভালো রেজাল্ট, উচ্চ শিক্ষা বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই যে মেধাবী নির্ধারণের মাধ্যম নয় তা বুঝার ও মানার জন্য মুসলিমদের প্রিয় নবী হযরত  মোহাম্মদ (সঃ) এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কি হতে পারে। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন না করলেও তিনি সর্বোচ্চ জ্ঞানী ও মেধাবী ছিলেন। বিশ্বের সেরা একশত মনিষীর মধ্যেও তিনি প্রথম স্থানে জায়গা করে নিয়েছেন। বাংলাদেশে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কি হতে পারে। তিনি শুধুমাত্র মক্তবে ধর্মীয় ও প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেও সাহিত্যকর্মে ভূবন জয় করেছেন। আজ কাজী নজরুলের সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করে ডক্টটের ডিগ্রি লাভ করছেন বহুজন। বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেলাতেও তাই। মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এর উচ্চ শিক্ষার সনদ ছিলো না, প্রযুক্তিবিদ স্টিভস জবস কলেজ সনদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে সফল স্থপতি ফ্র্যাংক লয়েড রাইট বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ নিতে পারেননি। আজকের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষ করতে পারেননি। স্যার আইজাক নিউটন খেলাপড়ায় খারাপ ছাত্র ছিলেন। বাংলাদেশেও বহু সফল ব্যক্তি আছে যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। এখন তাদের গড়া ও সফলতা অর্জন করা প্রতিষ্ঠানে কাজ করে শত শত  উচ্চ শিক্ষিতরা।

বাংলাদেশের পারিপার্শ্বিক অবস্থাও এক্ষেত্রে অনেকটা দায়ী। পাশাপাশি মানুষের হীনমন্যতা, দাম্ভিকতা,অহংকার এবং লেখাপড়া করা না করা সকল কর্মহীনদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকাও বড় কারণ। যার ফলে যারা কাজে লেগে যায় বা বড় মাধ্যমে কাজ করে তাদেরকে মেধাবী গন্য করে অন্যদের তাচ্ছিল্য করা হয়। যথেষ্ট কর্মসংস্থান থাকলে এবং সকলেই কাজে নিযুক্ত হতে পারলে স্ব স্ব দক্ষতা অনুযারী কাজ করে মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারতো। মানুষের ভাবনার পরিবর্তনের পাশাপাশি কোন কাজকেই ছোট করে না দেখে কর্ম সম্পাদনকারীর অবদানকে মূল্যায়ন করা জরুরি। সেই সাথে সকল কর্মহীনদের স্ব স্ব দক্ষতার বিষয়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে কাজে লাগিয়েই দেশকে এগিয়ে নেয়ার বিকল্প নেই। জিপিএ পাওয়া বা উচ্চ শিক্ষাই নয়, কাজে সফলতা অর্জন করাতেই মেধাবীর পরিচয় পাওয়া যায়, এই মানসিকতা সবার মাঝে তৈরী হবে।

 

শিক্ষার্থী
ডিপ্লোমা ইন জার্নালিজম
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব জার্নালিজম অ্যান্ড ইলেকট্রনিক মিডিয়া (বিজেম)

আসুন, অসহায়দের মুখে হাসি ফোটাই
                                  

মুতাছিম বিল্লাহ রিয়াদ
শতাব্দীর ভয়াবহ আতঙ্ক নিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে হাজির হয়েছে মহামারী করোনা ভাইরাস। এর লাগাম টানতে লকডাউন চলছে দেশে দেশে। বাংলাদেশও বাদ পড়েনি এর তান্ডব থেকে। করোনা সংক্রমণ, লকডাউন ও কর্মহীনতায় বিপর্যস্থ হয়ে পড়েছে দেশের নিন্ম আয়ের মানুষগুলো। দৈনিক রোজগার করতে না পেরে দু’বেলা দুমুঠো খাবার গ্রহণে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছে তারা। তাই, জীবন বাঁচানোর তাগিদে সংক্রমণের ঝুঁকি সত্ত্বেও অনেকেই ঘর থকে বের হয়ে আসছে। একটু সাহায্যের আশায় ছুটে বেড়াচ্ছে দিগ্বিদিক। এ অবস্থায় কর্মহীন অসহায় ও দরিদ্রদের মাঝে বিভিন্ন ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক, সামাজিক ও স্বেচ্ছাস্বেবী সংগঠনগুলোও খাদ্যসামগ্রী বিতরণে কাজ করে যাচ্ছে। দিন যত যাচ্ছে, দূর্ভোগ তত বাড়ছে। সেই সাথে বাড়ছে কর্মহীন হয়ে পড়া অসহায় পরিবারের সংখ্যা। দেশের অভাবগ্রস্থ এ বিশাল জনগোষ্ঠীর মুখে হাসি ফোটাতে এগিয়ে আসতে হবে সকলকে। নিজের স্বার্থের জন্যই তো কেবল জীবন নয়। সুখে-দুঃখে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মাঝেই রয়েছে জীবনের প্রকৃত স্বার্থকতা। আমারা সমাজবদ্ধ ও সহানুভূতিশীল জীব বলেই আত্নস্বার্থে মগ্ন থাকা আমাদের স্বভাব বিরুদ্ধ। বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্রে, পবিত্র কুরআনে, রামায়ণ-মহাভারতে, মহাকাব্য ও পুরাণে জনসেবাই শ্রেষ্ঠ ধর্মের কথা বলা হয়েছে। ইতিহাস থেকে দেখা যায়, যে জাতিতে খাঁটি জনসেবকের সংখ্যা যতবেশি সে জাতির ঐক্য, জাতীয়তাবোধ এবং উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে ততবেশি। তাই, দেশের এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে ব্যক্তিস্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে জনসেবাই আত্ননিয়োগ করি। কথায় আছে, শুধু ধন নয়, সাহায্য করতে মনের প্রয়োজন। এসব অসহায় মানুষদের চাহিদাও খুব বেশি নয়, মাত্র দু’বেলা দু’মুঠো ভাত পেলেই এরা খুঁশি। তাই আসুন, সবাই মিলে তাদের পাশে দাঁড়াই। নিজ নিজ স্থান থেকে স্বাধ্য মত সাহায্য করার চেষ্টা করি। অসহায় মানুষদের মুখে ফুটিয়ে তুলি নির্ভরতার হাসি।

শিক্ষার্থী- ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

কি হবে বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও তাদের শিক্ষকদের!
                                  

কোভিভ-১৯ এর পরিস্থিতি দিনে দিনে খারাপের দিকে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি কবে নাগাদ ঠিক হবে সেটা কেউ বলতে পারবে না। এমতাবস্থায় বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও তাদের শিক্ষক কর্মকর্তা-কর্মচারী এখন কোন প্রকার বেতনাদি পাচ্ছেন না। তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিছুদিন আগে বলেছেন, অবস্থার উন্নতি না হলে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে ছাত্রছাত্রীরা হয়তো বাসায় বসেই পড়াশোনা করতে পারবে। তাদের শিক্ষা কারিকুলাম হয়তো শিক্ষা মন্ত্রণালয় নির্দিষ্ট করে দিবে।

কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে শুধু ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষাই জড়িত নয়, এখানে জড়িত রয়েছে অনেকগুলো পরিবারের বাঁচা মরার লড়াই। স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষিকা, অন্যান্য স্টাফদের জীবিকা নির্বাহ হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই। ১/২ মাস মাস হলে কষ্ট করে ম্যানেজ করা যেতো, কিন্তু ৭/৮ মাসের ধাক্কা স্বল্প আয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষে সামাল দেয়া কি সম্ভব? সরকার নিবন্ধিত স্কুল কলেজগুলো দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও যথাসময়ে তারা বেতন-ভাতা পাবেন। কিন্তু অনিবন্ধিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে হাজার হাজার কওমি মাদ্রাসা, হেফজখানা এবং ব্যক্তি পর্যায়ের স্কুল কোচিং এগুলোর সাথে যারা জড়িত তাদের বেতন কে পরিশোধ করবে?


এসব প্রতিষ্ঠান এর আয়ের উৎস হল শিক্ষার্থীদের বেতন, ফি এবং ডোনারদের প্রদত্ত অনুদান। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের বেতন বন্ধ, এমনকি ডোনারদের অনুদানও বন্ধ। এই অবস্থায় প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে জড়িত লক্ষ লক্ষ মানুষের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। একদিকে নিজেদের বেতনের উৎস বন্ধ, অপরদিকে ভাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বাসা ভাড়া পরিশোধ করতে গিয়ে চোখে সর্ষেফুল দেখছেন প্রতিষ্ঠানের পরিচালকরা।

সরকার প্রণোদনা ঘোষণা দিয়ে সেই টাকা যদি শুধুমাত্র পুঁজিপতিদের বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের পিছনে ব্যয় করে, তাহলে মানুষ গড়ার কারিগর এসব শিক্ষকদের ভবিষ্যৎ কি হবে? আর শিক্ষকরা যদি নিঃস্ব হয়ে যান, স্বল্পপুজির এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎই বা কী হবে?

সম্মানি এসব মানুষ না পারবেন কারো কাছে হাত পাততে, না পারবেন খেয়ে পরে বাঁচতে। এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবশ্যই ভাবতে হবে। সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

শিক্ষার সাথে জড়িত এসব মানুষ গড়ার কারিগরদের খেয়ে-পরে বাঁচার জন্য বিনাশর্তে অনুদানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের বাসা ভাড়া মওকুফের ব্যবস্থা করতে হবে। ভবিষ্যতে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করতে হবে।

শুধু নিম্নবিত্ত এবং উচ্চবিত্তের কথা ভাবলে চলবে না, মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা এসব বিপদে পড়া মানুষদেরও রক্ষা করার কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে সরকারকেই। আর বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে অচিরেই দেশে আরো বেশি অর্থ সংকট হবে এবং অনেক মানুষ অর্থহীন হয়ে পড়বে। ফলে দেশের অর্থনীতি ধসে পড়বে।

 

মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ 
শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
৭ই জুন স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে উত্তরণের দিবস
                                  

নূরে আলম সিদ্দিকী

মুজিব ভাই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বেরিয়ে এসে রেসকোর্সে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “মনু মিয়া আমার আলমের কাছে বলে গেছে, সে ৬ দফার জন্য রক্ত দিয়ে গেছে, বাংলার মুক্তির জন্য রক্ত দিয়ে গেছে। আমি এই জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে শপথ নিয়ে গেলাম- তার রক্তের সঙ্গে শেখ মুজিব কখনো বেঈমানী করবে না।”
৬৫-এর যুদ্ধে ভারতের কাছে চরম মূল্য দিয়ে আইয়ুব খানকে তাসখন্দ চুক্তির ভিত্তিতে রক্ষা পেতে হয়। এই অবস্থার প্রেক্ষাপটে পিডিএম একটি সর্বদলীয় গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করে। মুজিব ভাই (তখন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক) ওই বৈঠকে পূর্ব-পাকিস্তানের অস্তিত্ব রক্ষার আঙ্গিকে ৬ দফা প্রস্তাবটি পেশ করেন। আহমদ ফজলুর রহমান, রুহুল কুদ্দুস, শামসুর রহমান খান (জনসন ভাই) ও রেহমান সোবহান ৬ দফা কর্মসূচিটি প্রণয়ন করে মুজিব ভাইয়ের হাতে তুলে দেন। গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানকারী সকল দলই এটিকে আন্দোলনের কর্মসূচির অন্তর্ভূক্ত করতে অক্ষমতা প্রকাশ তো করলোই, বরং তারস্বরে অপপ্রচার শুরু করলো- শেখ মুজিব ৬ দফা কর্মসূচি প্রদান করে সর্ব-পাকিস্তানী আইয়ুব উৎখাতের আন্দোলনকে পিছিয়ে দিল। মুজিব ভাই (তখন তিনি আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ) পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ফিরে এসে ৬ দফাকে দলীয় কর্মসূচি হিসেবে অনুমোদন লাভের জন্য দলের বর্ধিত সভায় পেশ করেন। দুঃখজনক হলেও বাস্তব, ওই বর্ধিত সভায়ও সেটা অনুমোদিত হয়নি।

এ অবস্থায় ছাত্রলীগের তদানীন্তন সভাপতি সৈয়দ মাযহারুল হক বাকী ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাককে ডেকে তাদের হাতে ৬ দফার একটি খসড়া তুলে দিয়ে মুজিব ভাই বললেন, এটি মূলত জাতির মুক্তিসনদ। আমি ছাত্রলীগের হাতে এই মুক্তিসনদটি তুলে দিলাম। সেদিন অকুতোভয়ে ছাত্রলীগ নেতৃত্ব এই কর্মসূচিকে বাস্তবায়িত করার দায়িত্ব গ্রহণ না করলে ৬ দফা আঁতুড়ঘরেই মৃত্যুবরণ করতো, আলোর মুখ আর দেখতো না। ছাত্রলীগ নেতৃত্ব এই কর্মসূচিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিরলস প্রচেষ্টায় ছাত্রলীগকে সংগঠিত করতে থাকে। ৬ দফা প্রদানের পরপরই মুজিব ভাই আওয়ামীলীগের কাউন্সিল ডাকেন। কাউন্সিলে ৬ দফা অনুমোদিত হয় এবং সর্বসম্মতিক্রমে মুজিব ভাই সভাপতি নির্বাচিত হন। তবুও ৬ দফাকে বাংলার মানুষের মননশীলতায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়ার মূল শক্তি ও প্রতীতির জায়গা ছিল ছাত্রলীগ। কিন্তু মুজিব ভাই বাংলাদেশের প্রতিটি মহকুমায় সফর করার সিদ্ধান্ত নেন; সেটিও সফল করার দায়িত্ব নেয় ছাত্রলীগ। কয়েকটি মহকুমা শহরে সভা করার পর জেলাভিত্তিক সভা করার পর জেলাভিত্তিক সভা করার পরই যশোরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলো। জামিন পেলে আবার খুলনায় গ্রেপ্তার করা হলো, আবার মুক্তি পেলেন। এভাবে গ্রেপ্তার ও জামিনে আলো-আঁধারের খেলা চলতে চলতে সরকার সিদ্ধান্ত নিল, ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুলস্-এ তাঁকে কারারুদ্ধ করার, যেখানে জামিনের কোন ব্যবস্থা ছিল না। মুজিব ভাই ও তাঁর সহকর্মীসহ রাজবন্দীদের মুক্তি এবং ৬ দফাকে জাতীয় কর্মসূচিতে রূপদানের আঙ্গিকে ৭ জুন পূর্ব-পাকিস্তানব্যাপী পূর্ণদিবস হরতাল আহ্বান করা হয়। মূল নেতৃত্বের একটি অংশ ৬ দফাকে সমর্থন না করা এবং একটি অংশ কারাগারে থাকায় জনাব মিজানুর রহমান চৌধুরী ও আমেনা বেগম আওয়ামীলীগকে সংগঠন হিসেবে কোনরকমে টিকিয়ে রেখেছিলেন। ইতোমধ্যে মানিক ভাইও ৬ দফার প্রতি তাঁর সমর্থন ও প্রতীতি ঘোষনা করেন (এই সমর্থন আদায়ে শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন ও সৈয়দ মাযহারুল হক বাকী’র অদম্য প্রচেষ্টার সঙ্গে আমিও সম্পৃক্ত ছিলাম)।

একদিকে ইত্তেফাক, অন্যদিকে ছাত্রলীগ (তখনও আওয়ামীলীগের অধিকাংশ নেতৃত্বের মধ্যে ৬ দফার পক্ষে প্রতীতি ও প্রত্যয়ের জন্ম হয়নি) ৭ জুনের হরতালের পক্ষে সুদৃঢ় অবস্থান নেয়। ছাত্রলীগের প্রাক্তন নেতৃত্বের মধ্যে শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খানসহ ছাত্রলীগের অসংখ্য প্রাক্তন নেতৃত্ব ৭ জুন সফল করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে এসে অবস্থান নেন। তখন আমাদের সামনে ঘনঘোর অমানিশা। এনএসএফ থেকে শুরু করে ছাত্র ইউনিয়নসহ ডান-বাম সকল সংগঠনই ৬ দফাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের ঘোরতর বিরোধী। আমরা যখন বাঙালীর মননশীলতার আঙ্গিকে ৬ দফার মাধ্যমে স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর তখন ডানপন্থীরা তো বটেই, বামপন্থীরাও তারস্বরে চিৎকার করছেন, শেখ মুজিব দেশদ্রোহী, সিআইএ’র দালাল, ভারতের অনুচর। তার মৃত্যুদন্ডই তাদের প্রচারণার মূখ্য বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে।

তখনও শ্রমিক লীগের জন্ম হয়নি। কিন্তু শ্রমিকদেরকে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করতে না পারলে ৭ জুন হরতাল পালন অসম্ভব ও অবাস্তব ছিল। সর্বজনাব খালেদ মোহাম্মদ আলী, কামরুজ্জামান টুকু, ফিরোজ নূন ও আমার উপর দায়িত্ব পড়ে তেজগাঁও এলাকাকে হরতালের পক্ষে সংগঠিত করার। তেজগাঁও পলিটেকনিক ইনষ্টিটিউটের ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি রহমত উল্লাহ আমাদের সাথে যোগ দেন। আমাদের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ স্থানীয় প্রভাবশালী শ্রমিক নেতা রুহুল আমিন ভূইয়া’র (তাঁর বাড়ী নোয়াখালী) সমর্থন কিছুটা আদায় করতে সক্ষম হন। উনি পরোক্ষ সমর্থন দিলেও প্রত্যক্ষভাবে আমাদের সাথে কোন মিটিং বা মিছিলে কখনো আসেন নি।

৩ জুনে তেজগাঁ’র একটি ময়দানে বিশাল(!) জনসমাবেশে কামরুজ্জামান টুকু সাহেব ও আমাকে পাঠানো হয় বক্তৃতা করার জন্য। যথাসময়ে পৌঁছে দেখলাম, সেখানে বিশাল তো দূরে থাক, জনাপাঁচেক লোকও উপস্থিত নেই। হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি, হঠাৎ একজন যুবক এসে পরিচয় দিল- “আমার নাম শহীদুল্লাহ, আমি তেজগাঁও থানা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক।” আমার সমস্ত শরীর তখন রাগে, ক্ষোভে কাঁপছে। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিলাম ৪/৫ কেজি লজেন্স কিনতে হবে। পথশিশু-কিশোরদের যতটা সম্ভব জড়ো করে একটি খন্ড মিছিল করে হলেও ৭ জুন হরতালের বিষয়টি জানান দিতে হবে। প্রথমে ১৫/২০ জন ছেলে সমবেত হল। তারমধ্যে একটি চটপটে ছেলেকে দায়িত্ব দেয়া হল। সে লজেন্স বিলি করবে এবং যতটা সম্ভব পথপার্শ্ব এবং মহল্লার ছেলেদের মিছিলে সম্পৃক্ত করবে। আমি আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলাম তেজগাঁও ষ্টেশন এলাকায় যখন সভার জন্য দাঁড়ালাম ততক্ষণে প্রায় দুই আড়াইহাজার লোক সেই মিছিলে যুক্ত হয়ে গেছে। একটা হ্যান্ডমাইকও কোথা থেকে যেন জোগাড় হয়ে গেল। একঘন্টারও বেশি সময় ধরে আমি প্রবল উত্তেজনা নিয়ে বক্তৃতা করলাম। সেদিনের সেই সভায় আমি নিজে কেঁদেছিলাম, উপস্থিত জাগ্রত জনতাকেও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখেছিলাম। ৬ জুন রাতে আমরা দায়িত্ব ভাগ করে দিয়ে তেজগাঁ’র শ্রমিকদের মেসগুলোতে গিয়ে অনুরোধ-উপরোধ করতে থাকলাম। ৩ তারিখ থেকে ৭ তারিখ সকাল পর্যন্ত প্রায় তিন-চারশ লোক প্রতিশ্রুতি দিলেন তারা সর্বাত্বক সহায়তা করবেন। আমরা তখন মনু মিয়াকে চিনতাম না। ৭ জুন ভোর থেকে শত চেষ্টা করেও একটা কার্যকর মিছিল বের করা সম্ভব হয়নি। যেটুকু হয়েছিল সেটাকে ঝটিকা মিছিল বলাই বাঞ্চনীয়। প্রকাশ্যে মিছিল করতে ব্যর্থ হয়ে আমরা কয়েকজন সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমরা ৭ই জুন সকালে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামমুখি এক্সপ্রেস ট্রেনটির গতি রোধ করে দেব। তখন আমার নিজের মধ্যে একটা নেশা ধরেছিল, যেকোন উপায়ে একটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতেই হবে। সংখ্যায় আমরা ২৫/৩০ জন হব। প্রচন্ড আবেগে আমরা রেললাইনের উপর শুয়ে পড়ে রেলের গতিরোধ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। সেই আঙ্গিকে আমি অপেক্ষাকৃত একটু উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে অন্য দু’জনের কাঁধে ভর দিয়ে উত্তেজক বক্তৃতা করছিলাম। সে খবর কোনভাবে পুলিশের কাছে পৌঁছেছিল বিধায় তারা স্বতন্ত্র একটি ট্রেনের ইঞ্জিন নিয়ে ১০/১৫ জন পুলিশ পাইলটিং করে আগলে নিয়ে এগোচ্ছিল ওই এলাকাটি পার করে দেয়ার জন্য। আমাদের কাছাকাছি এসে পুলিশভর্তি ইঞ্জিনটি থেকে একজন গুলি ছুঁড়ে (সেদিন নারায়ণগঞ্জ ও সদরঘাটেও গুলি হয়েছিল)। যে দু’জনের ঘাড়ে ভর দিয়ে আমি বক্তৃতা করছিলাম তাদের একজন মাটিতে পড়ে গেলেন; তিনিই মনু মিয়া। তাঁকে সাথে সাথে তেজগাঁ’র একটি ক্লিনিকে নিয়ে গেলাম। তখনও তিনি জীবিত এবং জ্ঞান রয়েছে। বিন্দুমাত্র চিকিৎসা তাঁর শুরু হয়নি, আমার কোলে মাথা রেখে মনু মিয়া বিড়বিড় করে বললেন, “মুজিব ভাই’র সাথে দেখা হলে বলবেন, আমি ৬ দফার জন্য জীবন দিয়ে গেলাম।” তেজগাঁও রেলগেটের কাছে পুলিশ আমাদের কাছ থেকে লাশ ছিনিয়ে নিয়ে গেল। ধস্তাধস্তিতে আমার শার্ট ছিড়ে গেছে, মনু মিয়া’র রক্তে আমার শরীর ভিজে গেছে। মনু মিয়া’র রক্তাক্ত গেঞ্জিটি আমি হাতছাড়া হতে দেইনি।
 
ওই গেঞ্জিটি একটি লাঠির মাথায় বেঁধে সেটিকে উড্ডীয়মান রেখে জঙ্গি মিছিল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে এগোতে থাকলাম। পুলিশ লাঠিচার্জ করলে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যেত, আবার মুহুর্তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়া লোকগুলো একত্রিত হয়ে উদ্বেলিত চিত্তে শ্লোগান দিয়ে এগোতে থাকতো। মনু মিয়া’র মৃত্যুর পর আশ্চর্যজনকভাবে সমগ্র তেজগাঁও এলাকায় চরম উত্তেজনা ও মারাত্মক উন্মাদনা সৃষ্টি হয়। পথের পাশের দোকানগুলো ঝটপট তাদের ঝাপ বন্ধ করতে থাকে। মিছিল কর্তৃক আক্রান্ত হয়ে দোকান লুটপাটের আশঙ্কায় নয়, সেটি আমি নিশ্চিত। কারণ, আমি দেখেছি দোকান বন্ধ করে তারা সটকে পড়েনি, নীরবে নিভৃতে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেনি। বরং অকুতোভয়ে দৃপ্ত পদে মিছিলে অংশ নিয়েছিল। গগণবিদারী কণ্ঠে শ্লোগান দিয়ে সমগ্র মিছিলটিকে একটি অদ্ভূত উত্তেজনায় তারা মাতিয়ে তুলেছিল। সে দৃশ্য অবর্ণনীয়। আজকের প্রেক্ষাপটে অকল্পনীয়ও বটে। আজকে পুলিশের গুলিতে অথবা হিংস্র পাশবিক কোন সন্ত্রাসীর গুলিতে পিচঢালা পথে রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকলে মানুষ নির্বিকার চিত্তে হেঁটে চলে যায়। মিছিল করে বজ্রনির্ঘোষে গগণবিদারী শ্লোগান দেয়া তো দূরে থাক, কোনরকমে আত্মরক্ষায় অথবা প্রাণ বাঁচাতে দ্রুত পদে তারা যে যার মতো সটকে পড়ে। এর পেছনের বাস্তবতাটি হলো, সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের যত উষ্মা-ক্ষোভই থাকুক না কেন, বিরোধী দলের প্রতি আস্থা ও প্রতীতি তাদের নাই। কারণ, আজকের প্রধান বিরোধী দল- তাদের শাসনের আমলের অত্যাচার নির্যাতন-নিগ্রহ মানুষের স্মৃতিতে আজও ভাস্বর।
 
সে যাই হোক, পথিপার্শ্ব মানুষের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মিছিলটির কলেবর বেশ বৃদ্ধি পায়। মিছিলটি যখন শাহবাগের মোড়ে, তখন দেখি, ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেন তাঁর সন্তান শাহীন রেজা নূরের হাত ধরে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে গর্বিত চিত্তে হাত নেড়ে মিছিলটিকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। এই দৃশ্যটি দেখে আমাদেরÑ বিশেষ করে আমার উত্তেজনা এতই বৃদ্ধি পেল যে, শাহবাগ চত্ত্বরের পাদপীঠে দাঁড়িয়ে আমি প্রচন্ড জ্বালাময়ী ভাষণ দিতে শুরু করলাম। ভাষণের ফাঁকে ফাঁকে শ্লোগান দিচ্ছিলাম- ‘মনু মিয়ার রক্তে স্বাধীন হল বাংলাদেশ’, ‘পিন্ডি না ঢাকা? ঢাকা ঢাকা’, ‘আইয়ুব না মুজিব? মুজিব মুজিব’। মিছিলটি নিয়ে যখন কার্জন হলে পৌঁছালাম, তখন দেখলাম, মনি ভাই, সিরাজ ভাই (সিরাজুল আলম খান), বাকী ভাই, রাজ্জাক ভাই, সাচ্চু ভাই, শহীদুল হক মুন্সী ভাই, আসমত আলী শিকদার ভাই, বাশার ভাইসহ ছাত্রলীগের অনেক বিদায়ী জ্যেষ্ঠ নেতা আমাদের জন্য অপেক্ষমান রয়েছেন। হয়তো তারা ইতোমধ্যেই আমাদের মিছিল সম্পর্কে অবগত হয়েছিলেন। মনু মিয়ার রক্তভেজা গেঞ্জি নিয়ে সেই মিছিলটি শুধু রাতারাতি আমাকে ভিন্নমাত্রায় উপস্থাপিত করেনি,১৯৬৬ সালের ৭ জুনের ঐতিহাসিক কর্মকা-ে সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রেক্ষাপটে এই জীবনসায়াহ্নে এসে আজও আমি পুলকিত বোধ করি। গর্ব, আনন্দ আজও আমার সমগ্র সত্তাকে প্রচ-ভাবে নাড়া দেয়।
 
আমাদের জ্যেষ্ঠ নেতারা তো বটেই, জেলখানা থেকে চিরকূট পাঠিয়ে মুজিব ভাইও অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। ৭ জুনের কয়েকদিন পর আমি ডিপিআর আইনে গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গেলে সৌভাগ্যক্রমে মুজিব ভাইয়ের পাশের সেলেই আমাকে রাখা হয়। প্রথম সুযোগেই মৃত্যুপথযাত্রী মনু মিয়া’র কথাগুলো মুজিব ভাইকে আমি গভীর আবেগতাড়িত হৃদয়ে বর্ণনা করেছিলাম। তারই বহিঃপ্রকাশ মুজিব ভাই করেছিলেন রেসকোর্স ময়দানে। মঞ্চে বসা অবস্থায় আমি আবার ডুকরে কেঁদে উঠেছিলাম।

আমার স্পষ্ট মনে আছে, মুজিব ভাই এক সন্ধ্যায় তাঁর খাটে অর্ধশায়িত। ভাবী মোড়ায় বসে পান বানাচ্ছেন। আরেকটি মোড়ায় বঙ্গবন্ধুর শিয়রের কাছে আমি বসা। বঙ্গবন্ধু তাঁর অতীত জীবনের অভিজ্ঞতালব্ধ এবং আবেগতাড়িত কিছু একটা বলছিলেন। হঠাৎ ভাবী আমাকে অপ্রস্তুত করার জন্যই বোধহয় বললেন- ভাই মনু মিয়ার মা তো একজন লেখাপড়া না জানা অতি সাধারণ মহিলা। মঞ্চে দাঁড়িয়ে আপনি মনু মিয়ার মাকে উদ্ধৃত করে অশ্রুসিক্ত নয়নে যে বয়ান করেন, ওই পল্টন ময়দানে দর্শকদের মধ্যে তো মনু মিয়ার মা-ও থাকতে পারেন। বলা তো যায় না, যদি কখনো উনি দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলেন, না আমি তো কখনো আপনাকে মনু সম্পর্কে এত কথা বলিনি! আপনি কারাগারে যাওয়ার আগেও বলিনি, কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার পরে তো বলিইনি। আপনি কোথা থেকে এত কথা পেলেন? আমি বিন্দুমাত্র হতচকিত না হয়ে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে তার জবাবে বলেছিলাম- ভাবী, আমি এ ধরনের অবস্থার মুখোমুখি কখনোই হব না। তার কারণ, পল্টন ময়দানে আমার বক্তৃতায় মনু মিয়া সম্পর্কে আমি যা বলি তার কোনোটাই বিন্দুমাত্র মিথ্যা নয়। মনু মিয়া মারা গেছে এটি সত্য। আমার বাঁ পাশেই সে দাঁড়ানো ছিল সেটাও সত্য। শুধু মরণের বুলেটটা আমার বক্ষ বিদীর্ণ না করে নির্মম আঘাতে মনু মিয়াকে হত্যা করেছে। সত্যি মনু মিয়া কোনোদিন তার মাকে আর মা বলে ডাকতে পারবে না। এই নিরেট সত্যটাকে বুকে লালন করে আমি পল্টনের জাগ্রত উদ্গত, উদ্যত, উদ্ধত কালজয়ী জনতাকে উদ্দেশ্য করে বক্তৃতা করার সময় মনু মিয়ার মৃত্যুর ঘটনাটিকে আমার অনুভূতিপ্রবণ হৃদয়ের সবটুকু আবির মাখিয়ে আমার উদ্দীপ্ত হৃদয়ের স্পর্শ দিয়ে যখন তুলে ধরতাম, তখন স্মৃতির বেদনায় আমি কাঁদতাম, জনস্রোতকেও কাঁদাতাম। আমি আমার ভাষায় মনু মিয়ার মৃত্যুর ঘটনা, মৃত্যুর পরপরই তার মায়ের সঙ্গে দেখা করার ঘটনা, প্রায় তিন বছর পর কারাগার থেকে অবমুক্ত হয়ে আবার তার মায়ের কাছে যাওয়ার ঘটনা- এসব বাস্তবতাকে যখন তুলে ধরতাম, তাতে মিথ্যার কোনো প্রলেপ থাকত না। শুধু সত্যের সঙ্গে আমার আবেগ-উচ্ছ্বাস এবং উদ্বেলিত হৃদয়ের আবির মাখানো থাকত। আমি সেদিন মানুষকে শুধু কাঁদাইনি, কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও আমাকে প্রভাবিত করেনি। আবেগ আমাকে এতটাই তাড়িত করত যে, আমি পাগলপ্রায় হয়ে যেতাম। আমার সব সত্ত্বা, চিন্তা-চেতনা, চাওয়া-পাওয়া- সবকিছু মনু মিয়ার বিদেহী আত্মার সঙ্গে আমার অজান্তেই মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত। আমি বক্তৃতা করতাম না, উন্মাদের মতো আমার হৃদয়ের অনুভূতিকে তুলে ধরতাম। মনু মিয়ার মা আমাকে মাতৃস্নেহে জড়িয়ে ধরে যা বলত, সেটি সত্যিই তার নিজস্ব অভিব্যক্তি। সেটিকেই আমার অনুভূতির রং চড়িয়ে আমার হৃদয়ের তুলি দিয়ে মনু মিয়ার মায়ের অশ্রুর অভিব্যক্তির ছবি আঁকতাম। এটি আমার হৃদয়-নিংড়ানো নিরেট সত্য। এখানে আমার ভাষা, আমার প্রকাশভঙ্গি সন্দেহাতীতভাবে মনু মিয়ার মায়ের অভিব্যক্তি থেকে ভিন্নতর ছিল কিন্তু ব্যতিক্রম ছিল না।

পুলিশের ছোঁড়া যে বুলেটটি মনু মিয়ার বক্ষ বিদীর্ণ করেছে, সেই বুলেটটি আমার বুকেও বিঁধতে পারত। মনু মিয়ার মতো আমিও শহীদ হতে পারতাম। আমি শহীদ হলে অন্য কেউ নিজের হৃদয়ের আবির মাখিয়ে অথবা চোখের জলে বুক ভাসিয়ে পল্টনের লাখ লাখ লোকের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আমার মতো করে বর্ণনা করত কিনা জানি না, মনু মিয়ার পরিবর্তে আমি শহীদ হলে আমার লাশ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে ওইরূপ ধস্তাধস্তি করত কিনা তাও জানি না- যেরূপ আমরা করেছিলাম। এখানে এই নিবন্ধে আমি একটি সত্যকেই তুলে ধরতে চাই; ঘটনাপ্রবাহ একটি, সেটিকে কে কীভাবে উপস্থাপন করবেন তা তার নিজস্ব মনন, নিজস্ব মানসিকতা, ভাষা ও আবেগের ওপর নির্ভর করে। এত বিস্তারিত না বললেও মূল ও সারকথা বললে মুজিব ভাই তো বটেই, সেই সন্ধ্যায় ভাবীর চোখও ছলছল করে ওঠে। মুজিব ভাই আবেগাপ্লুত হয়ে বলে ওঠেন- “ব্র্যাভো বয়। বাপকা বেটা সিপাইকা ঘোড়া, কিছু না মিলে তো মিলে থোড়া থোড়া।”

পল্টনের লাখ লাখ মানুষ তখন আমার সামনে ছিল না কিন্তু তাদের বিশাল উপস্থিতি ছিল আমার হৃদয়ের ক্যানভাসে। পাকিস্তানের যে কোনো শোষণ-বঞ্চনার বিস্তীর্ণ ঘটনার বর্ণনা দিতে গেলে আমি পাগলপ্রায় হয়ে যেতাম। এখন জীবনসায়াহ্নে এসে আবেগ অনেকটাই স্তিমিত, তবু সেদিনের সেই রক্তস্নাত স্মৃতিগুলো আজও আমার হৃদয়কে আপ্লুত করে বলেই পরবর্তীতে পদ ও পদবির কিছুই না পাওয়া সত্ত্বেও আমি আমার হৃদয়ের গভীরে পরিতৃপ্ত ও আত্মহারা।

স্বায়ত্বশাসনের ছলে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। তবুও আজকের ৭ জুন গণতন্ত্রের প্রশ্নে মৌলিক অধিকার-বিবর্জিত। ৬৬-এর ৭ জুনে পূব পাকিস্তান ছিল গণতন্ত্রের জন্য উদ্যত উদ্ধত সংগ্রামরত একটি জ¦লন্ত আবাসভূমি। আজকের ৭ জুনে সেই বাংলাদেশ নীরব, নিথর, নিস্তব্ধ প্রতিবাদহীন এক জনপদ।

নিউ নর্মাল, বদলে যাওয়া পৃথিবী
                                  

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান

কথিত চেক জালিয়াতির অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিসে জর্জ ফ্লয়েড নামক এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিকে পুলিশ কর্তৃক প্রকাশ্যে শ্বাসরোধ করে হত্যা এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিক্ষোভ-দাঙ্গা-লুটপাট এবং বিক্ষোভ দমনে পুলিশের গুলিতে এ পর্যন্ত আরো ১৪ জন নিহত ও নয় হাজার গ্রেপ্তার হওয়া; অথবা লিবিয়ায় মানবপাচারকারীদের অতিসম্প্রতি ২৬ জন বাংলাদেশিকে হত্যা; অথবা ভারতে একটি গর্ভবতী হাতিকে পিটিয়ে হত্যা; এর কোনোটাই করোনা পরবর্তী নতুন বিশ্বের ধনাত্মক কোনো আলামত নয়।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি বলেছেন, ‘...নিজেদের সুবিধার জন্য নয়া উদারবাদীরা যে ব্যবস্থাটা তৈরি করেছে, তারাই আরেকটি কঠোর সংস্করণ সামনে আনার জন্য সচেষ্ট।’ ধনাত্মক বা ঋণাত্মক যাই হোক, পরিবর্তন হবেই। মানুষ চেষ্টা করেও আর আগের অবস্থাটা পুরোপুরি হুবহু ধরে রাখতে পারবে না। যেমনটি বলেছেন মহামারি বিশেষজ্ঞ রব ওয়ালেস, ‘...পুঁজিবাদের সংকট প্রকাশিত হয়েছে স্বাস্থ্য সংকটের রূপে এবং মানুষ আর আগের স্বাভাবিক রূপে ফিরতে পারবে না।’ নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার কলামিস্ট টম ফ্রিয়েডম্যান (Tom Friedman) সম্প্রতি এক লেখায় বলেছেন, ‘চলতি প্রজন্ম কাল নির্ধারণী দুটি এব্রিবিয়েশন শিখবে তা হচ্ছে, BC (Before Carona) এবং AC (After Corona)।’ অর্থাৎ করোনা পরবর্তী পরিবর্তনটা খুবই সুস্পষ্ট হবে।

১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু’র পর এত বড় থমকে যাওয়ার ঘটনা বিশ্বে আর ঘটেনি। দুনিয়াজোড়া লকডাউনের ঘটনা তো একেবারেই বিরল। আমাদের এই অঞ্চলের লকডাউন একেবারেই অচেনা। ২৬ এপ্রিল ১৯৮৬ চেরনোবিল দুর্ঘটনার পর ৩০ বর্গমাইলের মধ্যে থাকা ৯০০০০ মানুষকে অপসারণ করে এলাকাটি লকডাউন করে দেয়া হয়। ইউক্রেন এবং রাশিয়ায় এটাকে অনেকটা বিদেশি শক্তির বিপরীতে জয় হিসেবে দেখা হয়।

২০১৫ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী Svettana Alexievich তার বই, ‘Voice From Chernobyl: The Oral History of Nuclear Disaster’-এ ‘যুদ্ধ’ আর ‘দুর্যোগকে’ মিশিয়ে ফেলার বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর (নাইন/ইলেভেন) টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটন ডিসিতে সবাইকে বাড়িতে রেখেই কয়েকদিনের জন্য ‘লকডাউন’ করা হয়। ১৩ নভেম্বর ২০১৫ তে আইএস জঙ্গিরা প্যারিসে হামলা করলে সবাইকে ঘরে রেখেই ব্রাসেলসে চারদিনের লকডাউন দেয়া হয়। করোনার শুরুতে কোভিড-১৯ এর উৎপত্তিস্থল চীনের উহানে সবাইকে ঘরে রেখে লকডাউন করা হয়। উহানে লকডাউনের সফলতার কারণ হলো চীনাদের ২০০৩ সালের সার্স ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা। বাদবাকি দুনিয়ায় বিচ্ছিন্নভাবে এক দুটি শহরে বা অঞ্চলে সফল হলেও লকডাউন সে অর্থে দুনিয়ার কোথাও পরিপূর্ণভাবে সফল হয়নি। বাংলাদেশ শুরুতে মিরপুরের টোলারবাগ এবং মাদারীপুরের শিবচরে যেভাবে কার্যকর করা গিয়েছিল পরবর্তীতে দেশব্যাপী সেটা কার্যকর করা যায়নি। আরো বেশি কার্যকর হলেও এ দিয়ে করোনার হাত থেকে পরিপূর্ণ মুক্তি পাওয়া সম্ভব ছিল কিনা বা কতটা ফলদায়ক হতো তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

করোনা মহামারি মোকাবিলার অভিজ্ঞতা বিশ্বে কারো ছিল না। বাংলাদেশের তো নয়ই। বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও ‘trial and error’ বেসিসে সবকিছু চলছে। শুরুতে বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্যানারের স্বল্পতা নিয়ে ব্যাপক শোরগোল হয়েছিল। কিছুদিনের মধ্যে স্ক্যানিং ব্যবস্থার উন্নয়ন হলো। থার্মাল স্ক্যানিং পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার পর খবর আসলো জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তিরা স্ক্যানারের সামনে আসার আগে নির্দিষ্ট সময় হিসেব করে প্যারাসিটামল খেয়ে শরীর ঠান্ডা করে স্ক্যানার অতিক্রম করেছে। একপর্যায়ে তো যাত্রীরা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি স্ক্যানার ভেঙেই ফেলল। এ নিয়ে অনেক হৈচৈ হলো। অনেকদিন পর এখন আবার দেখছি লঞ্চে, বাসে, ট্রেনে যাত্রী উঠানোর আগে দূর থেকেই জ্বর মাপা যায় এমন থার্মোমিটার দিয়ে তাপমাত্রা মেপে যাত্রীদের পরিবহনে উঠানো হচ্ছে।
 
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে এখন বলা হচ্ছে করোনায় সংক্রমিত ২৫ শতাংশেরও বেশি লোকের ক্ষেত্রে কোনো উপসর্গ থাকে না। জ্বর কাশি কিছুই না। স্ক্যানিং এর ফলে জ্বর আছে (জ্বর মানুষের বিভিন্ন কারণেই হতে পারে) এমন নন-করোনা যাত্রী পরিবহনে উঠতে পারলো না। উপসর্গবিহীন কিন্তু নিশ্চিত করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি (টেস্টে পজেটিভ) পরিবহনে উঠে অনেককেই সংক্রমিত করতে পারে। আরেকটি প্রহসন চলছে, জীবাণুনাশক টানেলের নামে ইথানল, ব্লিসিং আর ক্লোরিনের মিশ্রণে পানি ছিটানোর ফলে গায়ে লেগে থাকা করোনার আরএনএ কতটা মরে এটা কোনো অনুজীববিজ্ঞানীকে জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে। কিছুদিন আগে সিটি কর্পোরেশনের গাড়িতে করে রাস্তায় পানি মিশ্রিত জীবাণুনাশক ছিটাতে দেখা গেছে। করোনা মোকাবিলায় এগুলো একেবারেই হাস্যকর পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে ভাইরাস মারা তো দূরের কথা ত্বকের এবং চোখের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

বিভিন্ন অপকর্ম করে অর্থ জালিয়াতি এবং লোক দেখানো কর্মকাণ্ড ছাড়া এগুলোর আর কোনো তাৎপর্য নাই। আসলে করোনা মোকাবিলার পদ্ধতি নিয়ে কারো কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রতিদিন নতুন নতুন সুপারিশ আসছে। আমি নিজে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সেক্রেটারি জেনারেলকে বলতে শুনেছি, ‘মাস্ক পরে করোনার সংক্রমণ রোধ করা যাবে না। সকলের মাস্ক পরার দরকার নেই।’ একই ব্যক্তিকে আবার কয়েকদিন পরে সবাইকে মাস্ক পরার জন্য বলতে শুনেছি। পরিবহনে পাশের সিট খালি থাকলেও সামনের ও পিছনের সিটের দুরত্ব ‘স্বাস্থ্য বিধি’ অনুযায়ী বজায় থাকছে কিনা সেটা দেখার বিষয়। স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হলে অতিরিক্ত ভাড়া দেয়ার কোনো যুক্তি নেই।

হোম কোয়ারেন্টাইন আমাদের সংস্কৃতিতে প্রায় অসম্ভব একটি প্রপঞ্চ। আইসোলেশন আমাদের নৃতাত্ত্বিক ও সামাজিক বৈশিষ্ট্যের বিপরীতে। ‘আটকে রাখা’ বা ‘ঘিরে রাখা’ (containment) এর সফলতা অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে পরীক্ষার মাধ্যমে সঠিকভাবে শনাক্ত করা, চিকিৎসা দেওয়া, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের আলাদা করা এবং সংক্রমণের স্থান ও বস্তু ভাইরাস মুক্ত করা। ‘আইসোলেশন’ উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলোর বিকল্প নয়। একা থাকা সত্যিই কষ্টকর। ফরাসিরা বলে, ‘isolation is nothing, but a bad solitude.’ কতদিন দূরে থাকবো, কত দূরে থাকবো, সে হিসাবে গরমিল দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যেই বিশেষজ্ঞরা বলছে ১৪ দিন যথেষ্ট না। তিন ফুট দূরত্ব খুব কম হয়, ছয় ফুট হলে ভালো হয়।

এখন বলা হচ্ছে করোনার অতিক্ষুদ্র কণাগুলো পাখা না থাকলেও বাতাসে ভর করে অনেক দূর উড়তে পারে। অতএব আরো দূরে যাও। কাউকে গায়ের কাছে ঘেঁষতে দেয়া যাবে না। মাস্কের সাথে বর্ম হিসেবে ফেশশিল্ড ব্যবহার করতে পরামর্শ আসছে। মাস্ক না পরলে তো জেল-জরিমানা থাকছেই। পকেটে থাকতে হবে স্যানিটাইজার, ঘণ্টায় ঘণ্টায় হাতে মাখতে হবে। সবচেয়ে ভালো হচ্ছে কোনো কিছু স্পর্শ না করা, সবই fomite। হাত দুটো সবসময় প্যান্ট অথবা কোটের পকেটে রাখা গেলেই ভালো। হেডফোন ব্যবহার করা যাবে না। স্পিকার ব্যবহার করুন। জীবনে গোপনীয় আর কিছু থাকবে না। ভিড়ের মধ্যে পাবলিক পরিবহন পরিহার করুন। সাইকেল সবচেয়ে নিরাপদ। মার্চ মাসের পর থেকে আমেরিকায় সাইকেলের চাহিদা দ্বিগুণ বেড়েছে।

টাকা বা কয়েন হচ্ছে সবচেয়ে বিপদজনক। ‘ক্যাশলেস’ হয়ে যাবে সমাজ। যেটা সুইজারল্যান্ড শুরু করেছে এক দশক আগে। বিভিন্ন অজুহাতে সফলতা শতভাগ আসেনি। করোনা এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে। কিছুদিনের মধ্যেই ঢাকা শহরের রিকশাওয়ালারা জিজ্ঞেস করবে পেমেন্ট কীভাবে করবেন? বিকাশে করবেন তো? নগদ টাকা নেই না। জাল টাকার ঝামেলা, ভাঙতি টাকার ঝামেলা, অনেক কিছুই কমে যাবে। নগদ টাকা না থাকলে ঘুষ প্রদানও কমে যাবে। ঘড়ি, আংটি; জুয়েলারি অনেকেই পরবে না। উপহারও নেবে না। চাহিদা বাড়বে কলমের, সবাই কলম সাথে রাখবে। কারো কলম কেউ ব্যবহার করবে না। দরজার হ্যান্ডেল থাকবে না, রিমোট কন্ট্রোল দরজা চালু হবে। লিফটের বাটন থাকবে না, ভয়েস কমান্ডে লিফট চলবে। শিশুদের ডে-কেয়ার বন্ধ হয়ে যাবে হয়তো। কারণ শিশুরা খেলনা ভাগাভাগি করতে পারবে না। বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে টিউশনি বন্ধ হয়ে যাবে।

অভিভাবকরা বাইরের কাউকে বাড়িতে গ্রহণ করবে না। টিউশনিরও অনলাইন ভার্সন চালু হবে। বিদেশ গেলে প্রথম ১৪ দিন থাকতে হবে সেলফ আইসোলেশনে। ইমিগ্রেশনে পৌঁছার আগেই জানিয়ে দিতে হবে আপনার নতুন অবস্থানের ঠিকানা ও ফোন নম্বর। জায়গামতো পাওয়া না গেলে লক্ষ টাকা জরিমানা। ক্রেডিট কার্ড ও মানিব্যাগের ব্যবহার সীমিত হয়ে যাবে। মোবাইল ট্রান্সফার বেশি হবে। পাসপোর্ট হবে বায়োমেট্রিক| স্পর্শবিহীন ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন চলে আসবে। ইমিগ্রেশনে কাজ করবে ক্যামেরা, কেনো মানুষ থাকবে না। চোখের মনি স্ক্যান করে সঠিক ব্যক্তি শনাক্ত হলে গেট খুলে যাবে।

পাবলিক কলের পানি খাওয়া যাবে না। সবাইকে সাথে পানি নিয়েই চলতে হবে। পানি কাউকে শেয়ার করা যাবে না। অনেক কাজ চলে গেলেও মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও ওয়ার্কশপের কাজ বাড়বে। কারণ আরো অন্তত দুই বছর স্থায়ী পণ্য ক্রয় বিলম্বিত করবে অনেকেই। অনেকেরই কাজের দক্ষতা বাড়বে প্রক্রিয়া সরলীকরণে মাধ্যমে। ব্যবসার খরচ কমিয়ে লাভবান হবে অনেকেই। দরিদ্ররাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে বিনোদন ও পর্যটন খাতের সংশ্লিষ্টদের অবস্থা বেশি খারাপ হবে। ‘বাড়ি থেকে কাজ করা যায়‘ এমন পেশার লোকদের আয় কিছুটা কমলেও হয়তো বেকার হবে না। কিন্তু প্রত্যক্ষ সেবা প্রদানের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যেমন রেস্টুরেন্ট বয়, ট্যুর গাইড এদের কাজ থাকবে না। ভার্চুয়াল ট্যুরিজম অনেকটা প্রচলিত ট্যুরিজমের জায়গা দখল করে নেবে। যারা যত দ্রুত নতুন অবস্থার সাথে খাপ খাওয়ানোর প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষতা অর্জন করতে পারবে তারাই টিকে যাবে। অদক্ষ লোকদের কাজ ও আয় কমে যাওয়ায় বৈষম্য আরো বাড়বে বৈ কমবে না।

লেখক: উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

পরিবেশ রক্ষায় আমরা কতটা সচেতন?
                                  

গোপাল অধিকারী


একটি সুন্দর বাড়ি করতে হবে, বাড়িতে মজবুত লোহা, জানালা-দড়জা লাগাতে হবে, ভাল সিমেন্ট দিতে হবে ইত্যাদি বিষয়ে কিন্তু আমরা অনেকেই সচেতন। কিন্তু পৃথিবীটাকে যদি আপনি বাড়ি মনে করেন তবে তাকে ভাল রাখতে কি কি করা প্রয়োজন, সেই বিষয়ে আপনার আমার কতটা রয়েছে সচেতন তা কিন্তু  জানা ও জানানো প্রয়োজন। ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের মানবিক পরিবেশ সংক্রান্ত আর্ন্তজাতিক সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) উদ্যোগে প্রতিবছর সারা বিশ্বের শতাধিক দেশে ৫ জুন ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে সরকারী-বেসরকারীভাবে পালিত হয় দিবসটি। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশ সংগঠনের প থেকে পরিবেশ দিবস উপলে বিভিন্ন কর্মসূচী হাতে নেয়া হয়। পরিবেশ দিবস উপলে পরিবেশ মেলা, বৃমেলা, জাতীয় পত্রিকাসমূহে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ, প্রচারপত্র প্রকাশ, স্মরণিকা প্রকাশ, বেতার-টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান নির্মাণ ও সম্প্রচারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সারা দেশে জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে নিজ নিজ জেলার নির্ধারিত সময়সূচী অনুযায়ী জাতীয় কর্মসূচীর আদলে কর্মসূচী পালন করা হয়। কিন্তু এই বছর কর্মসূচী সীমিত হবে করোনার কারণে আশংকা করছি। প্রতিবছরই কোন না কোন প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখেই দিবসটি পালিত হয়। পূর্বের কয়েকটি প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘আসুন প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করি’ এবং ¯েøাগান ‘প্লাস্টিক পুনঃব্যবহার করি, না পারলে বর্জন করি’। ‘বণ্যপ্রাণী ও পরিবেশ বাঁচায়, প্রকৃতি বাঁচায় দেশ। প্রত্যেকটি দিবস পালনের একটি তাৎপর্য রয়েছে। দিবস কিন্তু সাধারণ বিষয় না। একটি বিষয়বস্তু বা সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে সর্তকতা বা করনীয় জানতে বা জানাতে দিবস স্বীকৃতি দেওয়া হয় ও পালন করা হয়। ঠিক পরিবেশ দিবসটিও তেমনি। পরিবেশের প্রতি মানুষের সচেতনতা বাড়াতে, পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখতে এই আয়োজন। কিন্তু প্রতিবছর দিবস পালন করার পরও আমরা কতটা সচেতন হচ্ছি? পরিবেশ নিয়ে আমরা কতটা ভাবছি? কতটা পরিবেশ রক্ষায় আমরা কাজ করছি সেই পরিসংখ্যানটাও ভেবে দেখা দরকার। দিবসটি পালন করছি এবং করতে হবে এই বিষয়ে আমি দ্বিমত পোষণ করছি না। কারণ নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে, জানতে হবে পরিবেশ কি? কত প্রকার? পরিবেশ দূষণ কি? কিভাবে পরিবেশ দূষিত হয় এবং কিভাবে পরিবেশকে সংরক্ষণ করা যায়। তাছাড়া পরিবেশ আমাদের জন্য কি করে, কিভাবে থাকলে ভাল থাকব বা কেন পরিবেশ সংরক্ষণ করা প্রয়োজন সেটাও জানতে হবে। কিন্তু আমরা যদি দিবসটি পালন যথাযথ মর্যাদায় করার পাশাপাশি যথাযথ ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত না নেই তাহলে মনে হয় দিবসটি পালন সার্থক হবেনা। দিন দিন আমাদের পরিবেশের পরিসংখ্যান হুমকির দিকে এগিয়ে যাবে। পরিবেশটা আমার কাছে ফেসবুকের মত। একটির সাথে অন্যটি জড়িত। যেমন মাটি, পানি, বায়ু একে অপরের সাথে জড়িত। আর এইগুলোর উপর নির্ভর করে মানুষকূল ও প্রাণীকূল। বায়ু দূষণের কারণে বিশ্বে প্রতিবছর ৭০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। পৃথিবীর ৯১ শতাংশ মানুষ এমন জায়গায় বসবাস করে যেখানে বায়ু দূষণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি। বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন দূষিত বায়ু সেবন করে বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৭ নামক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণের ক্রমমাত্রায় আমাদের ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। এ প্রতিবেদন বলছে, গত ২৫ বছরে বায়ুদূষণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভারত ও বাংলাদেশে। যদিও চীন এ তালিকায় আগে প্রথম অবস্থানে ছিল। আমাদের দেশ বায়ু দূষণের বড় কারণ হচ্ছে, যাচ্ছেতাই ভাবে উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করা। কলকারখানার কালো ধোঁয়া, নগরায়নের কাজ সময়মতো শেষ না হওয়া এবং যথেষ্ট সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে এমন উন্নয়ন কাজ পরিচালনার কারণে বাতাস ভয়াবহভাবে দূষিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দূষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি তিগ্রস্থ তার একটি বাংলাদেশ। বাংলাদেশে প্রতিবছর যত মানুষের মৃত্যু হয় তার ২৮ শতাংশই মারা যায় পরিবেশ দূষণজনিত অসুখ-বিসুখে। সারাবিশ্বে এ ধরনের মৃত্যুর হার ১৬ শতাংশ। ২০১৫ সালের এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে বিশ্বব্যাংক বলেছে, শহরাঞ্চলে এই দূষণের মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। দূষণের কারণে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পরিবেশ দূষিত হওয়ার এই মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বায়ু, পানি ও শব্দ দূষণ যেন আজ স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে যার প্রভাব পড়ছে জীববৈচিত্রের ওপর। জলবায়ুর প্রতিকূল প্রভাবও পরিবেশের ওপর পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে বিভিন্ন প্রাণীর জটিল ও কঠিন রোগ দেখা দিচ্ছে। পরিবেশের ওপর জলবায়ুর প্রভাবের জন্য ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত, খাদ্যাভাবজনিত রোগসহ নানা জটিল ও অপরিচিত রোগ হয়ে থাকে। বেড়ে গেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। পরিবেশ ও জীবন একে অপরের পরিপূরক। পরিবেশ অনুকূলে থাকলে অব্যাহত থাকে জীবনচক্র। তবে মানুষের জীবনচক্রে গৃহপালিত প্রাণীর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। আবার প্রাণীদেরও বেঁচে থাকতে নির্ভর করতে হয় পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর। পরিবেশের বিপর্যয় মানে জীবনের বিপর্যয়। প্রাণিস্বাস্থ্য, প্রাণী উৎপাদন ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তন একটি আন্তঃসম্পর্কিত জটিল প্রক্রিয়া, যার ওপর অনেকাংশেই নির্ভর করে রোগের প্রাদুর্ভাব, উৎপাদন ব্যবস্থাসহ আরও অনেক কিছু। বৈরী জলবায়ুর করাল গ্রাস থেকে রেহাই পাচ্ছে না বাংলাদেশও। এর পাশাপাশি যোগ হয়েছে পরিবেশ দূষণ। দূষণের দোষে দূষিত হয়ে উঠছে চারপাশ। অতিবৃষ্টি, উচ্চতাপমাত্রা এবং খরার ফলে মানুষের অজান্তেই সৃষ্টি হচ্ছে একের পর এক শক্তিশালী ভাইরাস। সৃষ্টি হচ্ছে নতুন পরিবেশ, যা অনেক েেত্রই মানুষের জন্য বাসযোগ্য হয়ে ওঠে না। গত এক যুগে দূষণ ও পরিবেশের বিচারে বাংলাদেশ পিছিয়েছে। খাবার, পানি আর বায়ু ছাড়া জীবজগতের অসিস্ত কল্পনা করা যায় না। যদিও খাবার বা পানি ছাড়া আমরা বেশ কিছুদিন বেঁচে থাকতে পারি। কিন্তু বায়ু ছাড়া দিন, ঘণ্টা দূরে থাক; আমরা সর্বোচ্চ তিন মিনিট পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারি। ফলে নির্মল বায়ুসেবন প্রতিমুহূর্তের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। অথচ আমাদের চারপাশের পরিবেশের এই বিপর্যয়ের একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে বায়ু দূষণ। যার ভয়াবহতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশে ১৯৯৫ সালে পরিবেশ সংরণ আইন পাস হয়েছে। কিন্তু জনবিস্ফোরণ, বনাঞ্চলের অভাব ও ঘাটতি এবং শিল্প ও পরিবহন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাবের দরুন দেশের পরিবেশ এক জটিল অবস্থার দিকে পৌঁছতে যাচ্ছে।  উপরোক্ত পরিসংখ্যান ও চিত্র আমাদের জন্য নির্মল ও স্বস্তিদায়ক পৃথিবীর ইঙিগত দেয় বলে আপনার মনে হয় কি? উপরোক্ত ভয়াবহ পরিসংখ্যানের জন্য আপনি বা আমি দায়ী নয় বলতে পারি কি? হয়ত আমি আমার মত পরিবেশ দূষণ রোধে ব্যবস্থা নিচ্ছি কিন্তু পাশের কেউ পরিবেশ দূষণ করলে আমার দায়িত্ব নেই কি? অবশ্যই আছে। নিজেকে ও পরিবেশকে বাঁচাতে আমাদের সকলকেই পরিবেশ রক্ষা করে চলতে হবে এবং জেনে বুঝে কেউ পরিবেশের ক্ষতি করলে আইনের আশ্রয় নেওয়া প্রয়োজন।  কেউ না জানলে তাকে জানাতে হবে পরিবেশ কি এবং কেন পরিবেশ সংরক্ষণ প্রয়োজন। বিজ্ঞানে পড়েছি , আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে সকল কিছু নিয়েই আমাদের পরিবেশ। অথ্যাৎ গাছপালা, নদী-সাগর, মাটি, পানি, বায়ু সকল কিছুই পরিবেশের অর্ন্তভুক্ত। আর পরিবেশের স্বাভাবিক অবস্থা ক্ষতিগ্রস্থ হলে তাকে পরিবেশদূষণ বলে। পরিবেশ দূষণের ফলে আমাদের জীবন-যাত্রা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।  যেমন কারখানার কালো ধোয়া বায়ু দূষণ করে। বায়ুদূষণের ফলে দূষিতবায়ু প্রবেশ করে শ্বাসনালীকে বিষাক্ত করছে। ফলে শ্ব^াসকষ্টহ বিভিন্ন রোগ-ব্যাধী তৈরি হচ্ছে। এইবার আসি পরিবেশ সংরক্ষণে। পরিবেশ সংরক্ষণ করতে হলে কলকারাখানার কালো ধোয়া নির্গত বন্ধ করতে হবে। শুধু কালো ধোয়া নয় উদাহরন দিতে একটি বললাম। এই যে এমন পরিবেশ দূষনের বিষয়গুলো আছে আমরা যদি সচেতন হয়ে সেগুলো দূষণ রোধ করি ও পরিবেশ সংরক্ষণ করি তাহলে বাঁচবে  জীবন, বাঁচবে পরিবেশ। পাবো নির্মল বাতাস। কথায় বলে, দাঁত থাকতে আমরা দাঁতের মর্ম বুঝি না । আসলেই তাই কেউ কি ভেবেছি করোনা আমাদের ঘরবন্দী করে ফেলবে?? কেউ কি ভেবেছি করোনার কারণে এতটা ক্ষতি হবে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতির? আমিও ভাবিনি করোনার কারণে পড়ালেখার লম্বা ক্ষতি হবে ছাত্র-ছাত্রীর। আমাদের করোনার থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। করোনা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ঠিক একইভাবে পরিবেশকে যদি আমরা রক্ষা না করে দিনের পর দিন ব্যবহার করে ধ্বংস করি তাহলে এমন বা এ থেকে ভয়াবহ দুর্যোগ কড়া নাড়বে আমাদের সন্নিকটে। তখন হয়ত রক্ষা করার নিয়মনীতি থাকবে না। সম্প্রতি আম্পানের কথা সকলেরই মনে থাকার কথা। এই ভয়াবহ ঝড়টি রক্ষা করেছে সুন্দরবন। সুন্দরবনের এমন রক্ষা করার ইতিহাস আরও আছে। কয়জন মানুষ আছে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে আমাদের বাঁচাতে পারে?? তাই আসুন পরিবেশ দিবস থেকেই আমরা পরিবেশ রক্ষায় উদ্যোগ নেই। পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হই। শুধু বাড়ি মজবুত নয় ধরত্রী মজবুত রাখতে ভূমিকা রাখি। সরকারকেও বলব পরিবেশ রক্ষায় আরও সতর্ক হোন। পরিবেশ রক্ষায় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করুন।


লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

বাড়ছে জনসংখ্যা, কমছে মানুষ
                                  

বর্তমানে আমরা নিজেদের উন্নত ও সভ্য সমাজের নাগরিক দাবি করি। সময়ের ব্যবধানে আমাদের জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন হয়েছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, রুচিসহ সব কিছুতেই আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। স্বাধীনতা লাভের সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যা ৮ কোটি হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ১৮ কোটির অধিকে পরিণত হয়েছে। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে দেশের প্রথম জাতীয় বাজেটের পরিমাণ ৭৮৬ কোটি টাকা থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটিতে পরিণত হয়েছে। নব্য বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবার সময় মাত্র ৪টি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও বর্তমানে পাবলিক ও বেসরকারী মিলিয়ে প্রায় তা দেড় শতাধিক! দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নতি সাধন হয়েছে; পরিবর্তন ঘটেনি শুধু আমাদের মনুষ্যত্বের। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের সময় বঙ্গবন্ধু আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য সাড়ে সাত কোটি কম্বল আনলাম। কিন্তু আমার কম্বল কই? সবাই পায় সোনার খনি, আমি পেলাম চোরের খনি’। সত্যিই যেন তাই! স্বাধীনতার ৪৯ বছরেও আমরা নৈতিকতার প্রশ্নে উর্ত্তীণ হতে পারিনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন দক্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নয়নের দিকে ধাবিত করছেন, তখন তিনিও একই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন যেমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন তার পিতা ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্মুখীন হয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর বারবার দূর্নীতি নামক কঠিন শিলায় বাংলাদেশের স্বাভাবিক অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্থ হয়েছে।

সারাবিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশ আজ চরম সংকটময় পরিস্থিতি অতিক্রম করছে। করোনাভাইরাসে কাজ হারানো, অসহায়, দুঃস্থ হতদরিদ্রদের জন্য সরকার ত্রাণ সহায়তা পাঠাচ্ছে দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে। কিন্তু আমাদের দেশের কতিপয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের নৈতিকতা এতটা নি¤œ থেকে নি¤œতর পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অসহায়, দুঃস্থদের ত্রাণ সামগ্রী পর্যন্ত আত্মসাৎ করে নিচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারদলীয় প্রভাবশালী নেতা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কর্তৃক সরকারের স্বল্পমূল্যের চাল চুরির ঘটনা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। দুস্থ ও বিধবাদের জন্য সরকারের বরাদ্দকৃত নিয়মিত যে ভাতা আসে তাও গো-গ্রাস করেছেন অনেক ইউপি চেয়ারম্যান। এছাড়াও সরকার সমর্থক নাগরিক না হলে স্থানীয় নেতাদের থেকে ত্রাণসামগ্রী না পাবারও অভিযোগ উঠে এসেছে। আবার দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগসহ সরকার দলীয় সংগঠনের স্থানীয় নেতাকর্মীদের দ্বারা ত্রাণ ছিনতাইয়েরও অভিযোগ প্রায়ই পত্রিকায় শোভা পাচ্ছে। স্বাধীন দেশে এমন দিনডাকাতি সরকারের ভাবমূর্তিকে চরম মাত্রায় ক্ষুন্ন করছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। দূর্নীতিই যেন এখন সমাজের অনেক জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালীদের মূলনীতিতে পরিণত হয়েছে।

স্বাধীনতার পর ৭৫ পরবর্তী সময় থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতির অবস্থা মোটেও স্থিতিশীল নয়। বারবার নোংরা রাজনীতির কাছে আমারদের হেরে যেতে হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজমান মনে হলেও মোটেও তা নয়। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা ও প্রায় দুই বছর দলীয়প্রধান কারাগারে থাকায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সাংগঠনিকভাবে নেতিয়ে পড়েছে। অন্যদিকে তাদের মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যুদ্ধপরাধের দায়ে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে ফাঁসির মঞ্চে বিদায় জানালেও তারা বসে নেই। তবে তারা সুযোগ পেলেই যে তারা ক্ষমতার লড়াইয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করবে সেটিও প্রায় নিশ্চিতভাবে বলা যায়। আমাদের দেশে রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য ক্ষমতার গদিতে আসীন হওয়া। এজন্য একটি প্রবাদ বলা হয়ে থাকে- বাংলাদেশের রাজনীতিতে যদি আয়ের উৎস না থাকত, তবে দেশের ৯০ শতাংশ রাজনীতিবিদ রাজনীতি ত্যাগ করতো।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বলা হয় আদর্শ নাগরিক তৈরির কারখানা। আর শিক্ষকরা আদর্শ নাগরিক তৈরির কারিগর হিসেবে পরিচিত হন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষকদের নৈতিকতার অবক্ষয় পুরো জাতিকে হতবাক করেছে। ভিকারুন নূন নিসা স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক পরিমল জয়ধরের উত্তরসূরী যেন চেপে বসেছে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি যেন ডাল ভাতে পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয়। বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার কেন্দ্রস্থল হলেও মুষ্টিমেয় শিক্ষক তা করছেন। কাঁচা টাকার গন্ধে সন্ধ্যাকালীন কোর্সের গভীর থেকে গভীরতর মনোযোগ দিচ্ছেন। অপরদিকে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের বহু পুরাতন নোট-পত্র বিতরণ করেই নিজ দায়িত্ব শেষ করছেন।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন নায্য দাবি আদায়ে ছাত্ররাজনীতির প্রচলন হলেও তা নিতান্তই বৃহত্তর রাজনৈতিক সংগঠনের স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে কিংবা দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রায়ই অস্ত্রের ঝংকারে কেঁপে উঠে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। বর্তমানের অধিকাংশ ছাত্রনেতারা মাদক, ছিনতাই, টেন্ডার, চাঁদাবাজি, নারী কেলেঙ্কারীসহ বিভিন্ন অপকর্মের সাথে জড়িত। তারা যেন শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ এবং আবাসিক হলের স্বাভাবিক পরিবেশের হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আবার ধর্মীয় শিক্ষায় দীক্ষিত করে আদর্শ চরিত্রবান মানুষরূপে গড়ে তোলার ক্ষেত্র হচ্ছে মাদরাসাসমূহ। কিন্তু এখানেও নিরাপদ নয় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। প্রায়ই ঘটে যাওয়া মাদরাসার শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থী বলাৎকারের ঘটনাসমূহ সাধারণ মানুষের ধারণাকে ক্ষত বিক্ষত করেছে। আবার দাখিল, আলিম, ফাজিল, কামিলসহ বিভিন্ন বোর্ড পরীক্ষায় গ্রামাঞ্চলের প্রায় সকল মাদরাসা শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীদের নকল করতে সহযোগিতা করাও যেন অনেকটা সমাজস্বীকৃত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

দেশের মানুষের নীতি-নৈতিকতা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যেও মাত্রাতিরিক্ত ধস নেমেছে। নরপশুদের লোলুপ কামনার শিকার হয়ে চলেছে শিশু ও নারী। বাংলাদেশ পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে ২০১৯ সালে দেশে ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টা বা নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৫৪০০টি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে বাংলাদেশে ২০১৯ সালে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৪১৩ জন নারী। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ধর্ষক কোন না কোন দিক দিয়ে সরকারদলীয় ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যায়। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা আমাদের দেশের অপরাধমাত্রার অন্যতম কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।

আমাদের দেশের ব্যবসায়ীসমাজও মাত্রাতিরিক্ত নীতিহীন। প্রতিবছর মুসলমানদের রোজা আসলেই বাড়তে থাকে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য। এছাড়াও সিন্ডিকেট করে মাঝেমাঝেই চাল, তেল, চিনি, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন দ্রব্যের মূল্য লাগামহীনভাবে বাড়ানো হয়। এতেই ক্ষান্ত হননা কেউ কেউ। খাদ্যে ভেজাল এখন আমাদের নিত্য সঙ্গী। গরীব-মিসকিনদের অধিকার কোরবানির পশুর চামড়া নিয়েও সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হতে হয়েছে দেশের মানুষকে। কিন্তু আমাদের দেশের অতীত ইতিহাস বলছে, এসব সিন্ডিকেটকারীরা অজানা কোন কারণে বিচারের আওতামুক্ত থেকে যায়। ফলে একই অপরাধ ঘটতে থাকে বারবার। জাতীয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর খাদ্যে ভেজাল ও বাজার তদারকির কাজ করে থাকলেও সেটি অপ্রতুল। লোকবল ঘাটতি এবং অদৃশ্য চাপের মুখে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনা সরকারি এই সংস্থাগুলো।

মাত্র কয়েক বছর আগেও ওয়াজ মাহফিল আমাদের দেশে উৎসবের আমাজের সৃষ্টি করতো। কিন্তু এখন ওয়াজ মাহফিল যেন বক্তাদের কাঁদা ছোড়াছুড়ি, ইসলামের নানা বিষয়ে নিজস্ব মনগড়া বক্তব্য দিয়ে অপব্যাখ্যার করা আর নারীর বিরুদ্ধে বিষেদাগার বক্তব্য প্রদানের স্থানে পরিণত হয়েছে। ওয়াজে কেউ আবার অবান্তর হাসি ঠাট্টায় মাতিয়ে ফেলছেন, দেখলে যেন মনে হবে এটি কোন কমেডি শো।

সরকারি অফিস সমূহের অবস্থা আরো করুণ। সেবা নিতে গিয়ে হয়রানি আর বিড়ম্বনার শিকার হননি এমন ব্যক্তিকে অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজতে হবে। ঘুষ ছাড়া কোন কাজই যেন গতি পায় না। অন্যদিকে দেশের চাকুরী ব্যবস্থায় আর্থিক লেনদেন প্রায় সামাজিক স্বীকৃতি পেতে বসেছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন- আমরা যা বলি তা করিনা, যা করি তা বলিনা। তার এই উক্তি আজ বাস্তবে রূপ পেয়েছে। সমাজে আজ যে নেতা দিনের বেলায় বক্তৃতার মঞ্চে গরীব, দুঃখী, মেহনতি মানুষের জন্য গগন বিদারী আর্তনাদ করেন রাতের আঁধারে তিনিই ত্রাণ সামগ্রী এদিকে সেদিক করার পাঁয়তারা করেন। যে ছাত্রনেতা মাদক আর যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকেন, মিছিল শেষে একটু মাদক সেবন না করলে তার নিজেরই স্বস্তি মেলে না। রাতে নারীদের উত্ত্যক্ত না করলে তার ঘুম আসে না। এভাবে রাষ্ট্রের সর্বত্রই যেন অনিয়ম নিয়মে পরিণত হয়েছে। যতদিন আমাদের দেশের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার সুষ্ঠু পরিকল্পনা তৈরি করা না হবে, যতদিন সকল মতাদর্শের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জাতীয় ঐক্য গড়ে না তুলতে পারবেন, সমাজ বদলের জন্য নতুন স্লোগানের প্রচলন না করবেন, দেশ এক মরীচিকার পেছনে ছুটে চলবে। জনসংখ্যা ক্রমেই বাড়বে, কিন্তু প্রকৃত মানুষ বাড়বে না; ফলস্বরূপ দেশের কাক্সিক্ষত উন্নয়নও সম্ভব হবে না।

মোঃ আখতার হোসেন আজাদ
শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

সভাপতি
বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

অস্তিত্ব রক্ষায় বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা
                                  

মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক


প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ উপহার বৃক্ষ। সৃষ্টিকর্তা মানুষের জন্য ভূপৃষ্ঠের প্রয়োজনীয় জীবনোপকরণ হিসেবে ফলবান বৃক্ষরাজি ও সবুজ-শ্যামল বনভূমির দ্বারা একে সুশোভিত ও সৌন্দর্যমন্ডিত করেছেন। বনাঞ্চল, বনজাত গাছপালা দ্বারা ভূমন্ডলের পরিবেশ ও প্রকৃতির ভারসাম্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। আল্লাহর অপরূপ সৌন্দর্যলীলার মধ্যে বৃক্ষরাজি অন্যতম, বৃক্ষ ছাড়া প্রাণিকুলের জীবন-জীবিকার কোনো উপায় নেই। মানুষ না থাকলে গাছের কোনো অসুবিধে হতো না, কিন্তু বৃক্ষ না থাকলে পৃথিবীর মানব জাতির অস্তিত্ত্বই বিলীন হয়ে পড়ত। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী বৃক্ষের উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভশীল। বৃক্ষ পরিবেশ ও প্রকৃতির পরম বন্ধু। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্বাহে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বৃক্ষ। দৈনন্দিন জীবনে আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অতিব জরুরি অক্সিজেন আসে বৃক্ষ থেকেই। বৃক্ষ মানুষের জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
 
বন আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য, জাতীয় অর্থনীতি, আবহাওয়া এবং জলবায়ু সহ প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনায়নের গুরুত্ব অপরিসীম। বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, খরা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি ও খরা প্রতিরোধে বৃক্ষের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বৃক্ষের অবদান অপরিসীম। বৃক্ষ ছাড়া পৃথিবীতে বসবাস চিন্তা করা যায় না। পৃথিবীতে মানুষের খাদ্য, ঔষধ, বস্ত্র, ঘরবাড়ি তৈরি, মাটির ক্ষয়রোধ, আবহাওয়া ও জলবায়ু সঠিক রাখা, পরিষ্কার পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা, কৃষি জমির উৎপাদন বৃদ্ধি করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষের কল্যাণ সাধন ও বেকারত্ব দূর করা ক্ষেত্রে বৃক্ষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গাছ না থাকলে পৃথিবীর মধ্যে বন ও বন্যপ্রাণী থাকতো না। বৃক্ষ আল্লাহ প্রদত্ত এক অমূল্য সম্পদ। বৃক্ষছাড়া যেকোনো দেশ ও জাতির জন্য অভিশাপ স্বরূপ।
 
গাছ ও পরিবেশের মধ্যে একটা নিবিড় সম্পর্ক অন্তর্নিহিত। গাছ আমাদের পরম বন্ধু; কিন্তু বন্ধুর প্রতি কতটুকু যত্নশীল? আমরা কোনো কারণ ছাড়াই অথবা সামান্য কারণে বন উজাড় করি। অথচ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। গাছপালা শুধু কার্বন ড্রাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং অক্সিজেন ত্যাগ করে উপকারের পরিসমাপ্তি ঘটায়, তা না। বড় বৃক্ষ বজ্রপাত প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য প্রতিদিন বজ্রপাতে মানুষ মারা যাচ্ছে। দেশে বজ্রপাত, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ধস, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব দিন দিন বৃদ্ধিই পাচ্ছে। তাই ইচ্ছেমতো গাছ কাটা ও বনভূমি উজাড় করা ঠিক নয়। বনাঞ্চল না থাকলে প্রাকৃতিক পরিবেশ হয়ে উঠত উষ্ণ, পৃথিবী হয়ে উঠত মরুভূমি এবং মানুষের অস্তিত্ত্ব হতো বিপন্ন।
 
প্রকৃতি ও পরিবেশরক্ষায় বনায়নের বিকল্প নেই। আধুনিক সুরম্য অট্টালিকা আর ইট-কাঠের নগরজীবন সত্ত্বেও বনাঞ্চল ছাড়া মানুষের বাঁচতে পারে না। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষ অপরিহার্য। পৃথিবীতে লাখ লাখ প্রাণী ও উদ্ভিদের বসবাস হলেও গাছ কাটার কারণে গহিন অরণ্যের জীববৈচিত্য লোপ পাচ্ছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিঘ্নিত করার জন্য মানুষই একমাত্র দায়ী। কিছু স্বার্থপর ব্যক্তি বন-জঙ্গল উজাড় করছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য মানুষের ঘরবাড়ি, চাষাবাদ ও শিল্পায়নের জন্য প্রচুর জমিজমা লাগছে। তাই বন-জঙ্গল কেটে প্রয়োজন মেটানো হচ্ছে। ফলে পশুপাখি অন্ন ও বাসস্থান হারা এবং অন্য জীববৈচিত্য লোপ পাচ্ছে। পরিবেশ ভারসাম্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্ঘটনা বাড়ছে। ফল-ফসল ও প্রাণহানি ঘটছে। এমন মহাবিপর্যয় পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে সামাজিক বনায়ন একান্ত জরুরি।
 
জনসংখ্যার চাপে বনভূমি ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছে। উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে বনভূমির পরিমাণ নেমে আসায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে আবহাওয়ায়। বৃক্ষ নিধনের ফলে বাতাস দূষিত, মাটি ক্ষয় ও পরিবেশ সংকটময় হচ্ছে। পর্যাপ্ত বনভূমি না থাকায় অনাবৃষ্টি এবং নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। হারিয়ে যাচ্ছে অতুলনীয় সবুজ সৌন্দর্য। মানুষ ও প্রাণীর অস্তিত্বের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে সবুজ বৃক্ষরাজি ও বনায়নের গুরুত্ব অপরিসীম। বনাঞ্চল একদিকে নিসর্গে শোভা বাড়ায়, অন্যদিকে প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অসাধারণ ভূমিকা পালন করছে। বনভূমি বায়ুমন্ডলকে বিশুদ্ধ ও শীতল রাখতে সাহায্য করে। যেখানে গাছপালা ও বনভূমি বেশি, সেখানে ভালো বৃষ্টিপাত হয়। ফলে ভূমিতে পানির পরিমাণ বাড়ে, চাষাবাদ ও ফসল ভালো হয়। বৃক্ষ মাটির উর্বরতা বাড়ায়, ভূমির ক্ষয়রোধ, ঝড়-বৃষ্টি ও বন্যা প্রতিরোধেও সহায়তা করে। প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ, দূষণমুক্ত পরিবেশ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচনে বৃক্ষরোপণ ও বনায়ন রক্ষা এবং পরিকল্পিত একটি বাগানই হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাসযোগ্য সুন্দর পৃথিবী গড়তে গাছ নিধন নয়, সৃজনই হোক লক্ষ্য।


লেখক: প্রাবন্ধিক

গণতন্ত্র বনাম ‘বুট-থেরাপী’
                                  

বশীর আহমেদ

সময়টা এখন গতির। গতিময় এই পৃথিবীতে স্থান নেই গতিহীন কারো। আমাদের যাপিত জীবনের প্রতিক্ষণে আমরা অনুভব করছি গতির তীব্র প্রতিযোগিতা। সবকিছুকেই এখন মেপে নেয়া হচ্ছে গতির পাল্লায়। গতির বাইরে যার অবস্থান তাকে পড়ে থাকতে হচ্ছে স্থবির ম্রিয়মান হয়ে। তাই গতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না জানলে যতিময় স্থবিরতাই যে বিধিলিপি তাতে কোন সন্দেহ নেই।

গতির কথাই যখন উঠলো, এই গতি নিয়ে হাল যমানার মানুষেরা কি সব কান্ড করে বেড়াচ্ছেন তার কাসুন্দি ঘাঁটা যাক। এই যে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সব সমরবাজ তাদের জনগণের কাঁড়ি কাঁড়ি সম্পদ ব্যয় করে সুপারসনিক অর্থাৎ কিনা শব্দের চাইতে দ্রুত গতির সমরাস্ত্র উৎপাদন করে আসছিলেন- তা হঠাৎই যেন পাল্টা গতির আঘাতে ধরাশায়ী হয়ে গেল। গতির কম্পিটিশনে সবাইকে টেক্কা দিয়ে সম্প্রতি রাশিয়া উদ্ভাবন করেছে শব্দের চাইতে সাতগুণ দ্রুতগতির হাইপারসনিক মিসাইল- যার সামনে আপতত বাধা হয়ে দাঁড়ানোর মত আর কিছুই থাকলো না।

অথচ এই সুপারসনিক সমরাস্ত্র নিয়ে বিশ্ব মোড়লদের কতই না মাতামাতি। এক মোড়ল যেন আরেক মোড়লের ঘাড়ের উপর মিসাইল ফেলতে না পারেন সেজন্য মোড়লেরা আবার যার যার কৌশলগত এলাকায় বসিয়েছিলেন ‘এন্টি-ব্যালেষ্টিক মিসাইল শীল্ড’ এবং আরও কত শত ইলেকট্রোনিক গ্যাজেট।

এখন ঘটনাটা তাহলে কি দাঁড়াল! রাশিয়ার এই হাইপারসনিক মিসাইল থেকে মাথা বাঁচাতে নিদেনপক্ষে সমগতির মিসাইল উদ্ভাবন ছাড়া আর বিকল্প রইলো না। সুতরাং তামাম দুনিয়ার অস্ত্র ভান্ডারে এখনকার মওজুদ মিলিয়ন্স অব বিলিয়ন্স অব ট্রিলিয়ন ডলারের মিসাইল এবং তজ্জনিত মোতায়েন এন্টি-ব্যালেষ্টিক মিসাইল শীল্ড অক্ষম-অকেজো পড়ে থাকবে লাঠিবৎ। অর্থাৎ রাশিয়ান হাইপারসনিক মুগুর ঠেকাতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি আপডেটের নামে প্রতিযোগী দেশগুলোতে এখন বাড়তি বাজেট বরাদ্দ ছাড়া ‘গোলাম নেই- উপায় হোসেন’ অবস্থা। বলাবাহুল্য, এর তাৎপর্য- বিশ্বজুড়ে সমরাস্ত্র-প্রতিযোগিতার নতুন এক ডাইমেনশন শুরু হয়ে গেল।

গতি নামের এই ম্যাজিক সমরাস্ত্র প্রযুক্তির বাইরেও সমানভাবে ক্রিয়াশীল। গতির ভেল্কিবাজি কাজে লাগিয়ে বুদ্ধিমান আদম সন্তান পৃথিবীর যোগাযোগ ব্যবস্থা আমুল বদলে দেবার দ্বারপ্রান্তে প্রায় পৌঁছে গেছেন। যোগাযোগ সেক্টরে শিগগীরই আসছে বিস্ময়কর ‘হাইপার লুপ’ প্রযুক্তি যা বর্তমানকালের সর্বাধিক গতিসম্পন্ন পরিবহন বিমানের চাইতেও তিনগুণ দ্রুত গতিতে গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে। অতএব গতি এবং গতিই যে আধুনিক সময়ে সবার উপরে বড় ভিলেন এবং অন্য কথায় পরম আরাধ্য ত্রাণকর্তাও বটে- সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

সে যাই হোক, একদা কাজ পাগল এক জাপানী ঘড়েল স্বীয় কর্মপোলক্ষে ‘আম-গো দ্যাশে’ ছিলেন অনেক দিন। বঙ্গভূমির গোল্ডেন অঞ্চল পরিদর্শনের প্রথম দিন রাজধানী ঢাকার রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে বেচারা বেহুদা তিন ধাক্কা খাওয়ার পর হতভম্ভ-ভয়ার্ত অবস্থায় তড়িঘড়ি ঘরে ফিরেছিলেন। অতঃপর পরদেশে বেঘোরে পৌত্রিক জীবন খোয়ানোর আশঙ্কায় তিনি আর রাস্তায় বের হননি; ঘরের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েই মনোযোগ সহকারে এই রাজধানীর অবাক করা সব নাগরিক বৈশিষ্ট বোঝার চেষ্টা করেছিলেন।

এক পান-ভোজন অনুষ্ঠানে ভদ্রলোক তার পর্যবেক্ষণ বর্ণনাকালে এখানকার নাগরিক সমাজের পায়ে হাঁটার ভঙ্গি নিজেই নকল করে দেখিয়েছিলেন। চলতি পথে ভীড়ের ভেতর কেমন করে সেঁধিয়ে গিয়ে মোচড় মেরে বেরিয়ে আসতে হয়; রানিং ট্রাফিকের ভেতর প্যাঁকাল মাছের মত এঁকেবেঁকে রাস্তা পারাপারের দর্শনীয় আবেগ রচনা করা যায়- তাও দেখিয়েছিলেন পারফেক্টলী। পরে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, তার দেখা মতে বিশ্বের আর কোন জনবহুল নগরে তদীয় ভাষায়- এমন ‘গজেন্দ্রগমন’ নাকি একেবারেই অকল্পনীয়।
হায় কপাল, এমন অসাধারণ ঘটনা অবশেষে কি না নজরদারীতে পড়লো এক বিদেশীর! অথচ আমরা তো দেখছি- চলছি ফিরছি নিত্যদিন- নির্বিকারভাবে।

তো, আলোচনা হচ্ছিল গতির কথা নিয়ে। প্রায় দুই-আড়াই কোটি আদম সন্তান পরম মমতায় গর্ভে ধারণ করেছেন যে কংক্রিটের নগরী ঢাকা; তার বিপুল জনগোষ্ঠির বৃহৎ এক অংশ প্রাণ বাঁচানোর ফরজ আদায়ে কোন না কোনভাবে কর্মব্যস্ত সময় কাটান প্রতিদিন। কর্মের প্রয়োজনে তাদের ছুটতে হয় এক স্থান থেকে অন্যত্র। এই ছোটাছুটির নিত্য-কর্মে পাগলপারা ব্যস্ত মানুষগুলোর চলার পথের অবস্থাটা কেমন?

রাজধানীর রাজপথ ঘেঁষে নির্মিত যে নিতান্তই সরু পায়ে চলার ফুটপাত সেখানে দখলীস্বত্ত্ব কায়েম করেছেন স্বল্পপুঁজির ব্যবসায়ী ভাইজানেরা। না, ওখানে তারা একা নন; এই ফুটপাত বাণিজ্যের আয়-বরকত যেন কোনও ভাবে বেহাত হতে না পারে তজ্জনিত দায়বদ্ধতা পরিলক্ষণে আছেন রাজনীতির লেবেলধারী আরও একদল বড় ভাই। এই সুমহান দায়িত্ব তারা নিতান্তই জনসেবার নামে স্বেচ্ছায় আপন এখতিয়ারে প্রতিপালন করে আসছেন। ফুটপাত জবরদখলকারী এই রথি-মহারথিদের সম্মিলিত কর্মযজ্ঞের বেপরোয়া তান্ডবে বেচারা পায়ে হাঁটা নগরবাসী অবশেষে নেমে পড়তে বাধ্য হচ্ছেন গাড়ী চলার রাস্তায় এবং বলাবাহুল্য, বেঘোরে প্রাণত্যাগ- নিদেনপক্ষে পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে ফিরছেন আপন ডেরায়।

বেচারা কর্মজীবী নগরবাসীর সন্মুখগতি রুদ্ধকারী ফুটপাত দখলের দূরাচারিতা চলে আসছে বছরের পর বছর। মহামান্য উচ্চ আদালতের একাধিক কঠোর নির্দেশনা সত্ত্বেও এ থেকে নিস্কৃতি মেলেনি নগরবাসীর। আইন চিৎকার করে দাঁত-কপাটি খেলেও তা দেখবার যেন কেউ নেই। সবাই জানেন, এ ক্ষেত্রে ক্ষমতার রাজনীতি সদিচ্ছা জাগ্রত না করলে সুরাহা মিলবে না। কিন্তু সরকার আসে- সরকার যায়; ফুটপাত জবরদখলমুক্ত হয় না আর কোনদিন। বিশ্বের আর কোথাও এমন নজির আছে কিনা সন্দেহ।

এটুকুনই সব নয়। ওই যে জনসেবাধন্য ফুটপাত বাণিজ্য- তার ফাঁক-ফোঁকর গলে তাড়া খাওয়ার গরজে কেউ যে আবার তাড়াতাড়ি একটু আগুয়ান হবেন সে গুড়ে বালি। ওখানে হেলেদুলে পথচলায় মশগুল আছেন যেন চিত্তজয়ের আনন্দে আত্মহারা কিছু নির্বিকারী ভাই বেরাদর! তাদের কনুইয়ের গুঁতো হজম না করে- অনিচ্ছায় অন্যের পায়ে পাড়া না দিয়ে কাজের তাড়ায় ব্যস্ত নাগরিকের এগিয়ে যাবার সুযোগ নেই।

আর রাজপথ! সেখানে তো সমান তালে চলছে দ্রুত গতি-মৃদু গতির যন্ত্রচালিত চারিচক্র এবং মানবচালিত ত্রি-চক্রযান; যেন তারা পরম মমতায় একে অপরের সাথে মিলেমিশে রাজপথে আছে। যন্ত্রচালিত বাহনগুলো চলছে যেন মানবচালিত রিকশার পাহারায়; গতির সামর্থ্য থাকলেও এগিয়ে যাবার সুযোগ নেই তার; সামনে-পেছনে প্রায় গতিহীন রিকশার মিছিল।

এক্ষেত্রে আপনি হয়তো বলতে পারেন, রিকশা তুলে দিলেই তো হয়। স র্ব না শ- এও কি সম্ভব! রিকশা হলো ঢাকা নগরীর ঐতিহাসিক নিদর্শন। একদা ইরানী এক প্রেসিডেন্ট যার নামটা খেয়াল নেই- এদেশ সফরে এসে রিকশা দর্শনে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি বুলেট প্রুফ গাড়ী ফেলে আমাদের সিনেমার তৎকালীন বিখ্যাত নায়িকা শাবানা-ববিতার লাস্যময়ী র্পোট্রেইট আঁকা অদ্ভূতদর্শণ ত্রি-চক্রযানে নগর ভ্রমন করেছিলেন। শুধু কি তাই, যাবার সময় তিনি একটি সুসজ্জিত তিন চাকার রিকশা বডিতে অঙ্কিত নায়িকাদের আবেগ জাগানিয়া সিন-সিনারীসহ প্লেনে চড়িয়ে ইরান সফরেও নিয়েছিলেন। এও কি কম কথা!

এবার বুঝুন- রিকশার মত এমন ঐতিহ্যবাহী পরিবেশবান্ধব বাহন দুনিয়ায় আর আছে কি একটিও! গরীব-দুঃখী লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা বাঁধা পড়ে আছে এই যাদুকরী বাহনের প্যাডেলে। তাকে বিতাড়ন? মাই গড! এই রিকশা তুলে দিলে লাখো ‘প্রলেতারিয়েত’ ভাইয়ের তাহলে খাওয়া-পরার কি ব্যবস্থা হবে? অতএব, গতির যুক্তি মুর্দাবাদ!

কথা আরও আছে। নাগরিক সমাজের সড়ক পারাপার নিরাপদ করতে নগর জুড়ে নির্মিত যে অসংখ্য ফুটওভার ব্রিজ, সেখানে আরোহন মনে হয় বড় কষ্টের কাজ। তারচে বরং সহজ সমাধান ‘যায় যাবে প্রাণ- রাখিব দেশের মান’ জাতীয় উদ্দীপনামূলক গানের কলি মনে মনে আউড়ে চলন্ত ট্রাফিকের ভেতর প্রথমত. এলোপাথাড়ি ঝাঁপিয়ে পড়া; অতঃপর নানা ‘অ্যাক্রোব্যাটিক মুদ্রা’ দেখিয়ে প্রাণ হাতে করে হলেও রাস্তা পারাপার হওয়াটাই যেন এই নগরবাসী মহা-বীরত্বের কাজ বিবেচনা করেছেন।

এতে হামেশাই ঘটছে প্রাণঘাতি দুর্ঘটনা। ঘটুক, তাতে কি? আমরা না স্বাধীন জাতি? মহান স্বাধীনতার গৌরবজ্জ্বল গরিমা জগৎ-সংসারে বহমান রাখতে সামান্য দু’একটা দুর্ঘটনা অথবা প্রাণহানী তো নস্যি! হ্যাঁ, এভাবে- এবং এইভাবে আমাদের গণতন্ত্র বাবাজি বলতে গেলে সার্থকভাবেই পৌঁছে গেছেন একেবারে জনগণের দোরগোড়ায়।

কথা হচ্ছে- এমন কেন হলো। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী কড়া নাড়ছে আমাদের দুয়ারে। সুদীর্ঘ এ সময়টিতে আমাদের রাজধানী নগরী কেমন করে নগরবাসীর জন্য নিরাপদ-বাসযোগ্য রাখা যাবে তার পরীক্ষা-নিরীক্ষাই যেন শেষ করা গেল না। এই নগরে আমাদের চলাচল, রাজপথ-ফুটপাত, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কেমন করে সুশৃঙ্খল ও নিবিঘ্ন রাখা হবে সেটাই সুনির্দিষ্ট হলো না। প্রতিদিনের অসহনীয় যানজট কেড়ে নিচ্ছে মানুষের মূল্যবান কর্মঘন্টা এবং ধসিয়ে দিচ্ছে জাতীয় অর্থনীতি। রাজপথে বেপরোয়া যন্ত্রদানব যেন নিয়ম করেই হরণ করছে নগরবাসীর জীবন। তা নিয়ে কিছুদিন হৈচৈ অতঃপর সব শুমসাম। এর সাথে পরিবেশ দূষণ যে কোন মাত্রায় গিয়ে ঠেকেছে তা এখন চোখ রাঙিয়ে- চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছেন ‘মিজ করোনা’ উপলক্ষে সংবেদনশীল দয়ালু প্রকৃতি; দেখাচ্ছেন উচ্ছৃঙ্খল-বিশৃঙ্খল গতিহীন গড্ডালিকা প্রবাহের মজেজা।

ভাল কথা; করোনা মহামারি সাক্ষী রেখে ব্যাপারটা খোলাসা করায় সুবিধা আছে। এই রাজধানী ঢাকার চারপাশ বেষ্টন করে আছে প্রকৃতির অনুপম আশির্বাদ যে চার-চারটি মিষ্টিপানির প্রবাহমান নদী; প্রকৃতির এমন আশির্বাদ পৃথিবীর আর কোন রাজধানী শহরের ভাগ্যে জোটেনি। অথচ এমন দুষ্প্রাপ্য সম্পদ আমরা বিনষ্ট করছি চরম অবজ্ঞায়। প্রতিদিন আমরা টনকে টন ক্ষতিকর ধুলো খাওয়াচ্ছি রাজধানীর বিলুপ্তপ্রায় গাছগুলোকে; ধুলোর আস্তরণে মৃতপ্রায় গাছেরা হাঁসফাঁস করে বাঁচার আকুতি জানালেও আমরা ‘টনক নড়ানোর টনিক’ হারিয়েছি। প্রকৃতি-বিধংসী অত্যাচারী মানুষ করোনা হামলায় ঘরে আটক আছেন বলেই না উৎফুল্ল নদী আর গাছগাছালি এখন কথা কইছে আরম্ভ করেছে।

কোথায় যেন শুনেছি, গোটা বাংলাদেশ নাকি একটা গ্রাম। তাহলে কি আমাদের চেতনার গভীরে অবচেতনভাবে অস্তিত্ববান রয়েই গেছে গতিহীন নিস্তরঙ্গ গ্রামীন জীবনের অবশেষ? না হলে খোদ রাজধানী- যেখানে গতিই হওয়ার কথা জীবন, সেখানে বাস করে কিভাবে গতিহীনতার চক্রাবর্তে আমরা নির্বিকার দিন কাটাতে পারছি? এ অবস্থা খতিয়ে দেখতে সমাজ বিজ্ঞানীরা কাজ করতে পারেন। তবে উপস্থিত ক্ষেত্রে অন্তত এটুকুন বলা অত্যুক্তি হবে না যে, সমস্যা রয়ে গেছে আমাদের চেতনাগত চরিত্রের ভেতর; রয়ে গেছে জাতীয় মেধায় মননে- গোটা অস্থি মজ্জায়।

সেনা নিবাসের অভ্যন্তরে যে গাড়ী চালক বা পথচারী ট্রাফিক আইন এবং জনশৃঙ্খলা মেনে চলেন নির্দ্বিধায়, তারাই আবার অন্যত্র তা উপেক্ষা করেন কেন? এ তো সাদা চোখেই দারুণ এক ‘বুট থেরাপী’র জাজ¦ল্যমান নমুনা- যে কারণে ওই সংরক্ষিত এলাকায় আইন ভাঙতে সবাই অনিচ্ছুক। আর বাইরে এলেই গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতার অপার মহিমা উপভোগের জাতিগত বেপরোয়া আবেগ যেন আত্মপ্রকাশের তীব্র বেদনায় ফেটে পড়তে চায়। এই নিন্দনীয় উপসর্গ একটি অদম্য সৃষ্টিশীল স্বাধীন জাতির জন্য একেবারেই বেমানান। আমাদেরই ভাঙতে হবে এই অক্ষমতার নিগড়। পেছনে না তাকিয়ে শিখতে হবে গতির সাথে পথ চলার তরিকা। গণতন্ত্র কাউকে আর যাই হোক- উচ্ছৃঙ্খল-বেপরোয়া হতে শেখায় না। বাংলাদেশ অমর হোক; সোনার বাংলা কায়েম হোক। বিজয়ী হোক বাংলাদেশের অবদমিত মানুষজন।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, দৈনিক স্বাধীন বাংলা।


   Page 1 of 9
     উপসম্পাদকীয়
মুখোশের আড়ালে আমরা সবাই হাওয়াই মিঠাই
.............................................................................................
করোনাভাইরাস ও আমরা
.............................................................................................
করোনা বাস্তবতায় ভার্চুয়াল কোর্ট বনাম অ্যাকচুয়াল কোর্ট
.............................................................................................
ইসরায়েলি দখলদারিত্বে অস্তিত্ব সংকটে ফিলিস্তিন
.............................................................................................
চীন সীমান্তে নাস্তানাবুদ অথচ বাংলাদেশ সীমান্তে গুলি, ভারত কি চায়?
.............................................................................................
পূর্বাভাসহীন শত্রুর তান্ডবে বিধ্বস্ত বিশ্ব
.............................................................................................
করোনা মোকাবেলায় অতন্দ্র প্রহরী “গণমাধ্যম”
.............................................................................................
জিপিএ ফাইভ ও উচ্চ শিক্ষাই মেধাবী নির্ণয়ের মাপকাঠি নয়
.............................................................................................
আসুন, অসহায়দের মুখে হাসি ফোটাই
.............................................................................................
কি হবে বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও তাদের শিক্ষকদের!
.............................................................................................
৭ই জুন স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে উত্তরণের দিবস
.............................................................................................
নিউ নর্মাল, বদলে যাওয়া পৃথিবী
.............................................................................................
পরিবেশ রক্ষায় আমরা কতটা সচেতন?
.............................................................................................
বাড়ছে জনসংখ্যা, কমছে মানুষ
.............................................................................................
অস্তিত্ব রক্ষায় বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা
.............................................................................................
গণতন্ত্র বনাম ‘বুট-থেরাপী’
.............................................................................................
গণতন্ত্র বনাম ‘বুট-থেরাপী’
.............................................................................................
করোনা রোগীদের প্রতি অমানবিক আচরণ কেন ?
.............................................................................................
কম্বাইন্ড হার্ভেস্টারের চাকায় পিষ্ট বঙ্গবন্ধুর ‘দাওয়াল’
.............................................................................................
বিধি নিষেধ কতটা যৌক্তিক
.............................................................................................
কৃষিই বাঁচাতে পারে বাংলাদেশকে
.............................................................................................
বীমার অর্থনীতি পুনর্গঠন হবে বড় চ্যালেঞ্জ
.............................................................................................
সবার জন্য নিশ্চিত হোক নিরাপদ পানি
.............................................................................................
বিয়ে চুক্তিতে সমতার চারা
.............................................................................................
সভ্যতার সংকট : সামাজিক অবক্ষয়
.............................................................................................
প্রবৃদ্ধি অর্জনে আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্ব
.............................................................................................
আরো কমেছে ধানের দাম
.............................................................................................
সরকারের ৬ মাস : একটি পর্যালোচনা
.............................................................................................
নয়ন বন্ড বনাম সামাজিক নিরাপত্তা
.............................................................................................
প্রাথমিক শিক্ষায় সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য
.............................................................................................
এত নিষ্ঠুরতা-অমানবিকতা আর সহ্য হয় না
.............................................................................................
সামনে আলো ঝলমল দিন, দুর্নীতির অন্ধকারে যেন হারিয়ে না যায়
.............................................................................................
করারোপ বাড়িয়ে তামাক রোধ কি সম্ভব?
.............................................................................................
শিক্ষা পণ্যের বিশ্বায়ন
.............................................................................................
গণপরিবহন কবে নিরাপদ হবে
.............................................................................................
জামায়াতীদের নাগরিক মর্যাদা
.............................................................................................
অার নয় যৌতুক
.............................................................................................
আমাদের গণতন্ত্রের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যত
.............................................................................................
১৭ নভেম্বর মওলানা ভাসানীর মাজার, জনতার মিলন মেলা
.............................................................................................
পুলিশের ভালো-মন্দ এবং অতিবল
.............................................................................................
চালে চালবাজী: সংশ্লিষ্টদের চৈতন্যোদয় হোক
.............................................................................................
একাদশ সংসদ নির্বাচন, ভোটাধিকার এবং নির্বাচন কমিশন
.............................................................................................
নির্বাচনে সেনা মোতায়েন প্রত্যাশা এবং সিইসির দৃশ্যপট
.............................................................................................
৩ মাসের মধ্যে ধর্ষকের ফাঁসি এবং বিজয় বাংলাদেশ
.............................................................................................
শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বাংলাদেশ
.............................................................................................
মানবিক মূল্যবোধ বিনষ্ট হলে মানুষ পশু সমতুল্য হয়ে পড়ে
.............................................................................................
ফিরে ফিরে আসে ১৫ আগস্ট : কিন্তুু যা শেখার ছিল তা শেখা হলো না
.............................................................................................
ক্ষুদ্রঋণ সহায়তার নামে সুদখোরদের অত্যাচার কবে বন্ধ হবে
.............................................................................................
খেলাপি ঋণের অভিশাপ মুক্ত হোক ব্যাংক খাত
.............................................................................................
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও ১৫ আগষ্ট
.............................................................................................

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আখলাকুল আম্বিয়া
নির্বাহী সম্পাদক: মাে: মাহবুবুল আম্বিয়া
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: প্রদ্যুৎ কুমার তালুকদার

সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: স্বাধীনতা ভবন (৩য় তলা), ৮৮ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০। Editorial & Commercial Office: Swadhinota Bhaban (2nd Floor), 88 Motijheel, Dhaka-1000.
সম্পাদক কর্তৃক রঙতুলি প্রিন্টার্স ১৯৩/ডি, মমতাজ ম্যানশন, ফকিরাপুল কালভার্ট রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত ।
ফোন : ০২-৯৫৫২২৯১ মোবাইল: ০১৬৭০৬৬১৩৭৭

Phone: 02-9552291 Mobile: +8801670 661377
ই-মেইল : dailyswadhinbangla@gmail.com , editor@dailyswadhinbangla.com, news@dailyswadhinbangla.com

 

    2015 @ All Right Reserved By dailyswadhinbangla.com

Developed By: Nytasoft