মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮ | বাংলার জন্য ক্লিক করুন
  
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

   এক্সক্লুসিভ -
                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                 
পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের বিকাশে করণীয়

মোঃ মস্তাক আহমদ: পর্যটন শিল্পকে আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ ও দ্রুত বর্ধনশীল শিল্প হিসাবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পর্যটন শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একটি পর্যটন শিল্পের দেশ হিসাবে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নতুন ভাবে তার অবস্থান জানান দিতে যাচ্ছে। এই শিল্পের পরিকল্পিত উন্নয়ন সাধন করা গেলে দেশের জিডিপি বর্ধনে এই শিল্প অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের অর্থাৎ রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পর্যটন শিল্পের বিকাশ সাধনে সমস্যা, সম্ভাবনা ও করণীয় সম্পর্কে এই নিবন্ধে আলোকপাত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
পর্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রকৃতিক সৌন্দর্য স্থানীয় এবং বিদেশী পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম। এই অঞ্চলের পাহাড় এবং উপত্যকাগুলো অত্যন্ত মনমুগ্ধকর। বৈশিষ্টগত দিক থেকে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে ভারতের দার্জিলিং এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনেকটা মিল পরিলক্ষিত হয়। এই অঞ্চলের পাহাড়, উপত্যকা, মেঘের আনাগোনা অথবা সকালের সূূর্যোদয় কিংবা সন্ধ্যার সূর্যাস্ত সবকিছুর সাথেই দার্জিলিং এর সৌন্দর্যের এক মিলবন্ধন দৃষ্টিগোচর হয়। দার্জিলিং এর অর্থনীতি পুরোপুরি পর্যটন শিল্প নির্ভর।
দার্জিলিং এর মত একই ধরণের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং আকর্ষণ থাকা সত্বেও আমরা এই শিল্প হতে কাঙ্খিত পরিমাণ রাজস্ব আহরণ করতে পারছি না। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে আমাদের পর্যটন শিল্পের বিকাশে সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব। আমরা আমাদের পাহাড়ী জমির অপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করছি। যেখানে সেখানে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মান করছি এমনকি পাহাড়ের চূড়ায় আমরা অপরিকল্পিত বাজার স্থাপন করছি। এই সব নির্মাণ ও স্থাপনা আমাদের পর্যটন শিল্পের বিকাশে অন্তরায় হয়ে দাড়িয়েছে। আমাদের পর্যটকরা এই সব অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত স্থাপনা দেখে বিরক্তিবোধ করছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের বিকাশের অন্তরায় সমূহ হচ্ছে একটি সমান্বিত পর্যটন পরিকল্পনার অভাব; পর্যটন সহায়ক অবকাঠামো যথা- রাস্তা, হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, নর্দমা নিষ্কাষণ ব্যবস্থা ইত্যাদির অভাব; মানসম্মত পর্যটন সেবার অভাব; প্রশিক্ষিত জনশক্তির অভাব; পর্যটন সম্পর্কিত প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব; প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাব এবং নিরাপত্তার অভাব।
সুতরাং, একটি পর্যটন শিল্প নির্ভর অর্থনীতির উন্নয়ন এবং পর্যটক আকৃষ্ট করার পূর্বশর্ত হচ্ছে সকল অংশীদারদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরী। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনা তৈরী এখন সময়ের দাবী। সরকার এ বিষয়ে একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানারস (বিআইপি) এর নবীন ও প্রবীন পরিকল্পনাবিদগণ এ বিষয়ে সরকার ও সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর বা সংস্থাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করতে পারেন।
একটি সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনা প্রণয়ণের পর উক্ত পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পর্যটন শিল্প উন্নয়নে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর বা সংস্থাকে এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর নজরদারী রাখতে হবে যাতে পরিকল্পনার বাইরে কোন ধরণের স্থাপনা নির্মান বা উন্নয়ন না হয়। পরিকল্পনা মোতাবেক পর্যটন সহায়ক অবকাঠামো যথা রাস্তা, হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, নর্দমা নিষ্কাষণ ব্যবস্থা ইত্যাদির উন্নয়ন করতে হবে। এছাড়াও পরিকল্পনা মোতাবেক পর্যটন বিকাশে কিছু বিশেষ অবকাঠামো যেমন-পার্ক, জাদুঘর, রিভার রাফটিং সুবিধাদি, প্যারা গ্লাইডিং গ্রাউন্ড ইত্যাদির নির্মাণ বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিভিন্ন ধরনের সেবা সমূহ অত্যন্ত দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সাথে প্রদান করতে হবে। স্থানীয় জনগণ এবং বিভিন্ন সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্টানকে পর্যটন সেবা প্রদান বিষয়ে আরও সচেতন এবং পেশাদার হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। সেবা সমূহের মধ্যে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ব্যববস্থানা, যাতায়াত ব্যবস্থাপনা, বিনোদন ব্যবস্থাপনা, পর্যটন গাইড ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয় অন্তভূক্ত থাকবে। সকল সেবা সমূহের সমন্বয়ে বিভিন্ন প্যাকেজ ব্যবস্থার প্রচলন করা যেতে পারে।
পর্যটন শিল্পের বিকাশে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে হবে। প্রয়োজনে পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন উন্নয়নে বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন ধরণের প্রনোদনা প্রদান করতে হবে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমেও এ অঞ্চলে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যেতে পারে। ব্যাংক ও বিভিন্ন অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান সমূহকে এ অঞ্চলের পর্যটন শিল্পের বিকাশে বিশেষ করে অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন তফসিলী ব্যাংক সমূহকে নির্দিষ্ট হারে এ অঞ্চলের পর্যটন বিকাশে বিনিয়োগের নির্দেশনা প্রদান করতে পারে।
পর্যটন শিল্পের বিকাশে নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পূর্বের যে কোন সময়ের চেয়ে বর্তমানে অনেক ভাল তারপরও এই শিল্প বিকাশে এই নিরাপত্তার ধারা অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ সেনাবহিনী, বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ ও অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারীবহিনীর সদস্যদের সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমে এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে যেন কোন পর্যটকের মনে নিরাপত্তা নিয়ে ন্যূনতম সংশয় না থাকে।
সর্বোপরি, পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য এই অঞ্চলের পর্যটনের প্রচার ও বাজারজাতকরণ একান্ত আবশ্যক। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন অন্যান্য সকল অংশীদারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এই অঞ্চলের পর্যটন শিল্পের বিকাশে পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, প্রচার ও বাাজারজাত করণে প্রয়োজনীয় সকল কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
উপর্যুক্ত সকল প্রস্তাবনা সমূহের বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে বিশ্ব দরবারে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে উপস্থাপন করা সম্ভবপর হবে। পাশাপাশি এ অঞ্চল সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে আশা করা যায়। শুধুমাত্র একটি বাস্তবমুখী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে পর্যাপ্ত পরিমাণ রাজস্ব আহরণ সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। একটি বাস্তবমুখী পরিকরল্পনা প্রণয়ন ও এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশী এবং বিদেশী প্রচুর পর্যটক আকর্ষণ করা সমম্ভবপর হবে। শুধুমাত্র দেশী পর্যটকদের দার্জিলিং থেকে যদি পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমুখী করা যায় তাহলেও প্রচুর পরিমাণ রাজস্ব আহরণ সম্ভব হবে। আরও শুধুমাত্র একুট সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে পর্যটকদের পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমুখী করা যেতে পারে কেননা প্রকৃতি এই অঞ্চলের শুভা বর্ধনে কোন প্রকার কার্পণ্য করেন নি। তাছাড়া যদি পার্বর্ত্য চট্টগ্রামে কম খরচে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন সেবা সরবরাহ করা যায় তাহলে দেশী পর্যটকের বিচরণ আপনাআপনি অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়।
*লেখক- ব্যাংকার এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানারস (বিআইপি) এর একজন সদস্য।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের বিকাশে করণীয়
                                  

মোঃ মস্তাক আহমদ: পর্যটন শিল্পকে আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ ও দ্রুত বর্ধনশীল শিল্প হিসাবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পর্যটন শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একটি পর্যটন শিল্পের দেশ হিসাবে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নতুন ভাবে তার অবস্থান জানান দিতে যাচ্ছে। এই শিল্পের পরিকল্পিত উন্নয়ন সাধন করা গেলে দেশের জিডিপি বর্ধনে এই শিল্প অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের অর্থাৎ রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পর্যটন শিল্পের বিকাশ সাধনে সমস্যা, সম্ভাবনা ও করণীয় সম্পর্কে এই নিবন্ধে আলোকপাত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
পর্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রকৃতিক সৌন্দর্য স্থানীয় এবং বিদেশী পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম। এই অঞ্চলের পাহাড় এবং উপত্যকাগুলো অত্যন্ত মনমুগ্ধকর। বৈশিষ্টগত দিক থেকে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে ভারতের দার্জিলিং এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনেকটা মিল পরিলক্ষিত হয়। এই অঞ্চলের পাহাড়, উপত্যকা, মেঘের আনাগোনা অথবা সকালের সূূর্যোদয় কিংবা সন্ধ্যার সূর্যাস্ত সবকিছুর সাথেই দার্জিলিং এর সৌন্দর্যের এক মিলবন্ধন দৃষ্টিগোচর হয়। দার্জিলিং এর অর্থনীতি পুরোপুরি পর্যটন শিল্প নির্ভর।
দার্জিলিং এর মত একই ধরণের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং আকর্ষণ থাকা সত্বেও আমরা এই শিল্প হতে কাঙ্খিত পরিমাণ রাজস্ব আহরণ করতে পারছি না। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে আমাদের পর্যটন শিল্পের বিকাশে সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব। আমরা আমাদের পাহাড়ী জমির অপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করছি। যেখানে সেখানে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মান করছি এমনকি পাহাড়ের চূড়ায় আমরা অপরিকল্পিত বাজার স্থাপন করছি। এই সব নির্মাণ ও স্থাপনা আমাদের পর্যটন শিল্পের বিকাশে অন্তরায় হয়ে দাড়িয়েছে। আমাদের পর্যটকরা এই সব অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত স্থাপনা দেখে বিরক্তিবোধ করছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের বিকাশের অন্তরায় সমূহ হচ্ছে একটি সমান্বিত পর্যটন পরিকল্পনার অভাব; পর্যটন সহায়ক অবকাঠামো যথা- রাস্তা, হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, নর্দমা নিষ্কাষণ ব্যবস্থা ইত্যাদির অভাব; মানসম্মত পর্যটন সেবার অভাব; প্রশিক্ষিত জনশক্তির অভাব; পর্যটন সম্পর্কিত প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব; প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাব এবং নিরাপত্তার অভাব।
সুতরাং, একটি পর্যটন শিল্প নির্ভর অর্থনীতির উন্নয়ন এবং পর্যটক আকৃষ্ট করার পূর্বশর্ত হচ্ছে সকল অংশীদারদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরী। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনা তৈরী এখন সময়ের দাবী। সরকার এ বিষয়ে একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানারস (বিআইপি) এর নবীন ও প্রবীন পরিকল্পনাবিদগণ এ বিষয়ে সরকার ও সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর বা সংস্থাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করতে পারেন।
একটি সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনা প্রণয়ণের পর উক্ত পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পর্যটন শিল্প উন্নয়নে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর বা সংস্থাকে এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর নজরদারী রাখতে হবে যাতে পরিকল্পনার বাইরে কোন ধরণের স্থাপনা নির্মান বা উন্নয়ন না হয়। পরিকল্পনা মোতাবেক পর্যটন সহায়ক অবকাঠামো যথা রাস্তা, হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, নর্দমা নিষ্কাষণ ব্যবস্থা ইত্যাদির উন্নয়ন করতে হবে। এছাড়াও পরিকল্পনা মোতাবেক পর্যটন বিকাশে কিছু বিশেষ অবকাঠামো যেমন-পার্ক, জাদুঘর, রিভার রাফটিং সুবিধাদি, প্যারা গ্লাইডিং গ্রাউন্ড ইত্যাদির নির্মাণ বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিভিন্ন ধরনের সেবা সমূহ অত্যন্ত দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সাথে প্রদান করতে হবে। স্থানীয় জনগণ এবং বিভিন্ন সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্টানকে পর্যটন সেবা প্রদান বিষয়ে আরও সচেতন এবং পেশাদার হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। সেবা সমূহের মধ্যে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ব্যববস্থানা, যাতায়াত ব্যবস্থাপনা, বিনোদন ব্যবস্থাপনা, পর্যটন গাইড ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয় অন্তভূক্ত থাকবে। সকল সেবা সমূহের সমন্বয়ে বিভিন্ন প্যাকেজ ব্যবস্থার প্রচলন করা যেতে পারে।
পর্যটন শিল্পের বিকাশে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে হবে। প্রয়োজনে পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন উন্নয়নে বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন ধরণের প্রনোদনা প্রদান করতে হবে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমেও এ অঞ্চলে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যেতে পারে। ব্যাংক ও বিভিন্ন অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান সমূহকে এ অঞ্চলের পর্যটন শিল্পের বিকাশে বিশেষ করে অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন তফসিলী ব্যাংক সমূহকে নির্দিষ্ট হারে এ অঞ্চলের পর্যটন বিকাশে বিনিয়োগের নির্দেশনা প্রদান করতে পারে।
পর্যটন শিল্পের বিকাশে নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পূর্বের যে কোন সময়ের চেয়ে বর্তমানে অনেক ভাল তারপরও এই শিল্প বিকাশে এই নিরাপত্তার ধারা অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ সেনাবহিনী, বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ ও অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারীবহিনীর সদস্যদের সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমে এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে যেন কোন পর্যটকের মনে নিরাপত্তা নিয়ে ন্যূনতম সংশয় না থাকে।
সর্বোপরি, পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য এই অঞ্চলের পর্যটনের প্রচার ও বাজারজাতকরণ একান্ত আবশ্যক। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন অন্যান্য সকল অংশীদারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এই অঞ্চলের পর্যটন শিল্পের বিকাশে পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, প্রচার ও বাাজারজাত করণে প্রয়োজনীয় সকল কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
উপর্যুক্ত সকল প্রস্তাবনা সমূহের বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে বিশ্ব দরবারে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে উপস্থাপন করা সম্ভবপর হবে। পাশাপাশি এ অঞ্চল সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে আশা করা যায়। শুধুমাত্র একটি বাস্তবমুখী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে পর্যাপ্ত পরিমাণ রাজস্ব আহরণ সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। একটি বাস্তবমুখী পরিকরল্পনা প্রণয়ন ও এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশী এবং বিদেশী প্রচুর পর্যটক আকর্ষণ করা সমম্ভবপর হবে। শুধুমাত্র দেশী পর্যটকদের দার্জিলিং থেকে যদি পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমুখী করা যায় তাহলেও প্রচুর পরিমাণ রাজস্ব আহরণ সম্ভব হবে। আরও শুধুমাত্র একুট সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে পর্যটকদের পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমুখী করা যেতে পারে কেননা প্রকৃতি এই অঞ্চলের শুভা বর্ধনে কোন প্রকার কার্পণ্য করেন নি। তাছাড়া যদি পার্বর্ত্য চট্টগ্রামে কম খরচে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন সেবা সরবরাহ করা যায় তাহলে দেশী পর্যটকের বিচরণ আপনাআপনি অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়।
*লেখক- ব্যাংকার এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানারস (বিআইপি) এর একজন সদস্য।

সেলুলয়েডে ‘অপারেশন জ্যাকপট’: সংরক্ষণ হচ্ছে যুদ্ধ স্মারক এমভি ইকরাম
                                  

বশীর আহমেদ:
মুক্তিবাহিনীর অকুতোভয় নৌ-কমান্ডোদের বিধ্বংসী অপারেশন অবলম্বনে নির্মিতব্য চলচ্চিত্র ‘অপারেশন জ্যাকপট’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত রাখার প্রয়াসে বড় ধরণের উদ্যোগ- বলেছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্ম মুক্তিযোদ্ধাদের নজিরবিহীন দেশপ্রেম ও আতœত্যাগের অজানা ইতিহাস সঠিকভাবে জানতে পারছে না। অথচ এগুলো জানবার প্রবল আগ্রহ রয়েছে তাদের। আমাদের নবীন প্রজন্মের সে আগ্রহ নিরসন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রজন্মের দুয়ারে অবারিত রাখবার দায়বোধ থেকে মুক্তিবাহিনীর ব্যাপক-বিধ্বংসী কমান্ডো অপারেশন জ্যাকপট অবলম্বনে ডকুমেন্টারী তৈরীর ভাবনাটি মাথায় আসে- বলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী।

অপারেশন জ্যাকপট চলচ্চিত্র নির্মানের প্রেক্ষাপট নিয়ে দৈনিক স্বাধীন বাংলা’র সাথে একান্ত আলাপচারিতায় এভাবেই নিজের অনভূতি প্রকাশ করেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, এম.পি। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, অপারেশন জ্যাকপট সিনেমার শুভ-মহরত আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে। ‘মনপুরা’ সিনেমাখ্যাত সফল পরিচালক গিয়াস উদ্দিন সেলিমকে দেয়া হয়েছে ছবিটি পরিচালনার দায়িত্ব।

নৌপরিবহনমন্ত্রী জানান, কেবলমাত্র অপারেশন জ্যাকপট ডকুমেন্টারীই নয়, মুক্তিযুদ্ধে স্বেচ্ছায় জীবন উৎসর্গকারী নৌ-কমান্ডোদের লিম্পেট মাইন হামলায় বিধ্বস্ত জাহাজ এম ভি ইকরাম সংরক্ষণেও তিনি উদ্যোগ নিয়েছেন। একাত্তরের ৩০ অক্টোবর চাঁদপুর নদীবন্দরের কাছে ডাকাতিয়া নদী মোহনায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সমরাস্ত্র বোঝাই জাহাজ এম ভি ইকরাম সুইসাইডাল নৌ-কমান্ডোরা ধ্বংস করেছিলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান খান বলেন, সৌভাগ্যবশত মুক্তিযুদ্ধের ৩৭ বছর পর নিমজ্জিত সে জাহাজটি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত জাহাজটি নৌ-কমান্ডো অপারেশনের খুঁজে পাওয়া একমাত্র নিদর্শন। বিষয়টি নিয়ে অন্য এক মন্ত্রণালয় বিগত প্রায় ৯ বছর কাজ করলেও তা কঙ্খিত পরিণতি লাভ করেনি। এক পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের অতি মূল্যবান এই স্মারকটির বিষয় তার নজরে আসে এবং ঐতিহাসিক নিদর্শনটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণে তিনি উদ্যোগী হন। নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবান যুদ্ধস্মারকটি চট্টগ্রাম মেরিন যাদুঘরে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের কাজ এখন চুড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুক্তিবাহিনীর নৌ-কমান্ডো অপারেশন জ্যাকপট ছিল মুক্তিযুদ্ধের সবচাইতে বিধ্বংসী কমান্ডো অপারেশন যা বাংলাদেশে চলমান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার নজর কাড়তে এবং বিশ্বব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচার ও জনমত গঠনে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল। এ অপারেশন মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী হওয়ার সমুহ আশঙ্কা ও বিজয়ের অনিশ্চিতি পেছনে ঠেলে তৈরী করেছিল নতুন সম্ভাবনা। মুক্তিযুদ্ধের দুঃসহ দিনগুলোতে অপারেশন জ্যাকপটের অভূতপূর্ব সাফল্য কার্যকর ভাবে ভেঙ্গে দিতে সক্ষম হয়েছিল দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেরুদন্ড।

একাত্তরে মুক্তিবাহিনীর নৌ-কমান্ডোদের সমন্বিত আক্রমন পরিকল্পনার সাঙ্কেতিক নাম ছিল অপারেশন জ্যাকপট, যা সংঘটিত  হয়েছিল আজ থেকে সাতচল্লিশ বছর আগে ১৫ আগষ্ট গভীর রাতে। তবে মূল পরিকল্পনায় আক্রমনের নির্দ্ধারিত সময় ছিল ১৪ আগষ্ট মধ্যরাতের পর, যে রাতের আগের দিনটি ছিল পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত বাধার মুখে কমান্ডোদল সময়মত টার্গেট এলাকায় পৌছাতে ব্যর্থ হলে আক্রমন পরিকল্পনা পূর্ব-নির্দ্ধারিত ভাবেই পরিবর্তন হয় এবং একদিন পর পরিচালিত হয় কমান্ডো অপারেশনটি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিñিদ্র নিরাপত্তা ভেঙ্গে অকুতোভয় নৌ-কমান্ডোরা এক রাতে চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, মংলা এবং নারায়ণগঞ্জ নৌবন্দরে অত্যন্ত সফলতার সাথে পাকিস্তানীদের দখলে থাকা প্রায় ১ লাখ টনের অধিক জাহাজ এবং নৌ-স্থাপনা ধংস করে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে বলে পাকিস্তান সরকার যে দাবী করে আসছিল অপারেশন জ্যাকপটের সাফলতা প্রথমবারের মত তা নস্যাৎ করে দেয়।


মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী স্মারক এম ভি ইকরাম। জাহাজটি সংরক্ষণের কাজ চুড়ান্ত পর্যায়ে।-স্বাধীন বাংলা

একাত্তর সালের ৩০ অক্টোবর রাতে এম ভি ইকরাম অপারেশনে অংশগ্রহণকারী চাঁদপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা, নৌ-কমান্ডো মোঃ শাহজাহান কবির, বীরপ্রতীক জানান, নৌ-কমান্ডো হামলায় বিধ্বস্ত ও নিমজ্জিত এম ভি ইকরাম জাহাজকে কেন্দ্র করে ডাকাতিয়া নদী চ্যানেলে ধীরে ধীরে বিশাল এক বালুচরের গোড়াপত্তন ঘটে। এক পর্যায়ে ‘কাইশা বনে’ আচ্ছাদিত হলে চরটি মেইনল্যান্ডের কৃষকদের পশুচারণ ভূমিতে পরিণত হয়। এভাবে বালুচরের গভীরে লুকিয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী স্মারক এম ভি ইকরামের কথা কালক্রমে হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অতলে।

১৯৮০ সালে চাঁদপুরের এক ব্যবসায়ী সর্বপ্রথম জাহাজটি বালি খুঁড়ে উদ্ধারের চেষ্টা শুরু করলে সাড়া পড়ে যায় চাঁদপুরে। উৎসুক মানুষের আলোচনায় ফিরে আসে একাত্তরের ভূলে যাওয়া ইতিহাস। প্রায় ২ বছরের সে উদ্ধার প্রচেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হলে জাহাজটি উদ্ধার অসম্ভব বলে ধরে নেন চাঁদপুরবাসী। এভাবে সুদীর্ঘ ২৭ বছর এম ভি ইকরাম উদ্ধারের চেষ্টা চলেছে- কখনো জোরেশোরে আবার কখনো বা ধীর গতিতে। কিন্তু জাহাজটি আর উঠে আসেনি বালি-মাটির গভীর তলা থেকে।

এম ভি ইকরাম উদ্ধারকারীদের সূত্র জানায়, ২০০৭ সালে এর সর্বশেষ মালিকপক্ষ উদ্ধার কাজে হাত দিলে ৩৭ বছর বালি-মাটিতে ঢেকে থাকা এম ভি ইকরাম প্রথমবারের মত খোলা পানির দেখা পায়। পরে ক্রেন দিয়ে টেনে তোলা হয় পানির সমান্তরালে এবং শক্তিশালী পাম্প দিয়ে জাহাজের ভেতরকার পানি-বালি অপসারণ করা হয়। এক পর্যায়ে নজরে আসে জাহাজের তলদেশ। মাইন বিষ্ফোরণে ৩টি বড় আকারের ছিদ্র হয়েছিল জাহাজের তলায়। সেখানে লোহার প্লেট ওয়েল্ডিং করে বসিয়ে পানি ওঠা বন্ধ করা হয়। পরে ট্রলারে বেঁধে ভাসমান এম ভি ইকরাম টেনে নেওয়া হয় চাঁদপুর লন্ডন ঘাটে। এ ঘটনা ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসের।  

মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় নৌ-কমান্ডো হামলার নিদর্শন এম ভি ইকরাম চাঁদপুরে সংরক্ষণের দাবীতে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন মিছিল-মিটিং, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচী আরম্ভ করলে নিরাপত্তার স্বার্থে ২০০৮ সালের ১৪ অক্টোবর জাহাজটি টাগবোটে বেঁধে নারায়ণগঞ্জের সোনাকান্দায় সরিয়ে আনা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের দুর্লভ এ স্মারকটি সংরক্ষণে সরকারী সিদ্ধান্তের পর বিআইডব্লিউটিএ ২০০৮ সালের ১৫ অক্টোবর জাহাজটির মালিকপক্ষকে ‘যেখানে যে অবস্থায় আছে-সে অবস্থায়’ সংরক্ষণের নির্দেশ জারি করে। পরে সংরক্ষণের কাজ স্থানান্তরিত হয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু ২০১৭ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এ ব্যাপারে আর কোন বাস্তব কোন অগ্রগতি হয়নি। ২০১৭ সালের ২ জুলাই নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান জাহাজটি স্থায়ী সংরক্ষণে ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগী হন। এক বছরের প্রানান্তকর চেষ্টায় অবশেষে এম ভি ইকরাম চট্টগ্রাম মেরিন যাদুঘরে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের কাজ এখন প্রায় চুড়ান্ত পর্যায়ে অগ্রসর হয়েছে বলে জানা গেছে।   

অগ্নিঝরা মার্চ
                                  

১৯৭১-এর সালের ১১ মার্চ ছিল বৃহস্পতিবার। ১৯৭১ সালের রক্তঝরা মার্চের উত্তাল অসহযোগ আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ের আজ চতুর্থ দিবস। সারাদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুর ডাকে শান্তিপূর্ণভাবে সর্বাÍক অসহযোগ পালন করে। গত কয়েক দিন ধরেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সর্বত্র ‘সংগ্রাম পরিষদ’ গড়ে তোলার কাজ চলতে থাকে। আমরা নিজেদের উজাড় করে দিয়ে উদয়াস্ত এ কাজেই নিয়োজিত থাকি। কোন গণশত্রু বা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি যেন কোথাও বিশৃ´খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে না পারে সে জন্য আমাদের দলের স্বেচ্ছাসেবকগণ বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে রাজধানীতে নৈশকালীন টহল কার্যক্রম শুরু করে। এতে শান্তি শৃ´খলার অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটে। সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে দেয়া বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মোতাবেক যে সব যানবাহন চলার কথা সেগুলো চলাচল শুরু করে; যে সব বেসরকারী অফিস খোলা থাকার কথা সে সব খোলা থাকে। যথারীতি সরকারী দফতরগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মেনে চলে এবং সর্বত্র যা দৃশ্যমান হয় সেটি হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সমগ্র বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছে। স্বাধিকারের দাবিতে অটল-অবিচল সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে যাচ্ছে। ১৯৭১-এর মার্চের এদিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। হাইকোর্টের বিচারপতিসহ সরকারী ও আধা সরকারী প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরের কর্মচারীগণ তাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অফিস বর্জন করেছেন। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো, অসহযোগ সমর্থনকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংস্থা, পেশাজীবীগণ, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বঙ্গবন্ধুর কর্মসূচীর সমর্থনে সোচ্চার হয়ে ওঠে। দেশজুড়ে মানুষের মনে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের অবিচল সংগ্রামী মনোভাব বিরাজ করতে থাকে। এদিন বর্ষীয়ান মজলুম নেতা মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলে এক জনসভায় সকল রাজনৈতিক পক্ষকে উদ্দেশ করে বলেন, “সাত কোটি বাঙালীর নেতা শেখ মুজিবের নির্দেশ পালন করুন।” অপরদিকে জাতীয় লীগ প্রধান আতাউর রহমান খান সামরিক সরকারের উদ্দেশে এক বিবৃতিতে বলেন, “এক রাষ্ট্রের জোয়ালে আবদ্ধ না থাকলেও দুটি স্বাধীন ভ্রাতৃরাষ্ট্র হিসেবে আমরা পরস্পরের এবং বিশ্বের এই অংশের সমৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারব।” ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে তাঁর সঙ্গে একান্ত বৈঠকে মিলিত হন। পাঞ্জাব প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব খুরশীদ হক বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর বাসভবনে এক বৈঠক করেন। বৈঠকে জনাব খুরশীদ আগের দিন রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে তার বৈঠকের বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুকে অবহিত করেন। এদিন পশ্চিম পাকিস্তানের কাম্বেলপুর হতে নির্বাচিত কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতা পীর সাইফুদ্দীন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রায় ১ ঘণ্টা বৈঠক করেন। বৈঠকে রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্কট উত্তরণের উপায় এবং কাউন্সিল মুসলিম লীগ সভাপতি মিয়া মমতাজ দৌলতানার একটি পত্র বঙ্গবন্ধুর কাছে হস্তান্তর করেন। এদিন ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের উপ-আবাসিক প্রতিনিধি মি. কে. উলফ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর বাসভবনে সাক্ষাত করেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে যতদিন খুশি বাংলাদেশে থাকার অনুরোধ করে বলেন, “পাকিস্তান সেনাবাহিনী দেশে গণহত্যা চালানোর পাঁয়তারা করছে।” এ অবস্থায় মানবতা রক্ষায় তাদের দেশ না ছাড়তে অনুরোধ করেন। এদিকে সদ্য ঢাকা ত্যাগকারী এয়ার মার্শাল আসগর খান করাচী প্রত্যাবর্তন করে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, “কুর্মিটোলার ক্যান্টনমেন্ট ব্যতীত অন্য কোথাও পাকিস্তানের পতাকা আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। কার্যত পূর্ব পাকিস্তানে প্রশাসনের সচিব ও কর্মকর্তাগণ শেখ মুজিবের নির্দেশ পালন করে চলছে। সরকারের এখন উচিত শেখ সাহেব প্রদত্ত শর্তসমূহ মেনে অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।” সমগ্র পাকিস্তানের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল রাজনৈতিক বাস্তবতা উপলব্ধি করে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সমর্থনসূচক ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলেও জনাব ভুট্টো এবং ইয়াহিয়ার কিছু বশংবদ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বঙ্গবন্ধুকে ৬ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন না করে আপোস-সমঝোতার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ দিতে থাকে। এমতাবস্থায় আজ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার জন্য ন্যাপ প্রধান ওয়ালী খান ঢাকায় আগমন করেন।
এদিন হাইকোর্টের বিচারপতিসহ সরকারী-আধাসরকারী প্রতিষ্ঠানের সকল বিভাগের কর্মচারীরা তাদের সংশ্লিষ্ট অফিস-আদালত বর্জন অব্যাহত রাখে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত সময়সূচী অনুযায়ী স্টেট ব্যাংক, বিভিন্ন তফসিলী ব্যাংক, ট্রেজারি অফিসে লেনদেন চলে। স্বাভাবিকভাবেই রেল ও বিমান চলাচল করে। অভ্যন্তরীণ ডাক, টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। রাজধানীর বিপণি কেন্দ্র ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। স্বাধিকার আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে এদিনও প্রধান বিচারপতির বাসভবনসহ সকল অফিস এবং বাড়িতে-গাড়িতে কালো পতাকা উত্তোলিত থাকে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশানুযায়ী সিনেমা হলগুলোর মালিকগণ প্রমোদকর ব্যতীত চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে। বরিশালে এদিন কারাগার ভেঙ্গে ২৪ কয়েদী পালিয়ে যায় এবং পুলিশের গুলিতে ২ জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়। কুমিল্লাতেও অনুরূপ ঘটনায় পুলিশের গুলিতে ৫ জন নিহত ও শতাধিক লোক আহত হয়।
বিগত কয়েক দিনের ন্যায় আজও বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ব্যক্তিবর্গ নিহত ও আহতদের সাহায্যার্থে গঠিত সাহায্য তহবিলে উদারহস্তে অর্থ সাহায্য প্রদান করেন। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃ চতুষ্টয় এক বিবৃতিতে সামরিক সরকার প্রদত্ত যাবতীয় খেতাব, উপাধি বর্জনের আহ্বান জানান। সামরিক বাহিনীর চলাচলের ব্যাপারে জনসাধারণকে সহযোগিতা না করার অনুরোধ করেন এবং প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনার পূর্বে ছাত্রনেতৃবৃন্দ শর্তারোপ করে বলেন, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার পূর্বে ইয়াহিয়া প্রদত্ত ৬ মার্চের বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে।
বঙ্গবন্ধু নীতির প্রশ্নে অবিচল থেকে বাংলাদেশের জনগণের নামে প্রতিদিন একের পর এক নির্দেশ জারি অব্যাহত রাখেন। জনসাধারণের নামে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদের স্বাক্ষরিত নয়া নির্দেশ জারি করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, “জনগণের আন্দোলন নজিরবিহীন তীব্রতা লাভ করেছে। বাংলাদেশে জনগণের নামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে সব নির্দেশ প্রদান করেছেন প্রতিটি লোক আপন স্থানে থেকে পবিত্র দায়িত্ব জ্ঞানে তার সবগুলো কার্যকর করেছে বলেই অসহযোগ আন্দোলন এরূপ সর্বাÍক হয়ে উঠেছে। জীবনের প্রতিটি স্তরের লোকজনের এই উচ্চ দায়িত্ববোধ সকলের জন্যই অনুপ্রেরণার উৎস। এই সংগ্রাম অব্যাহত রাখার সঙ্গে সঙ্গে সর্বোচ্চ হারে উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং আমাদের অর্থনীতিকে পরিপূর্ণভাবে চালু রাখার জন্যও আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। আমাদের অর্থনীতি ধ্বংস করার এবং আমাদের বুভুক্ষু জনসাধারণকে দুঃখ-দুর্দশায় নিপতিত করার কায়েমী স্বার্থবাদী এবং গণবিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্র নস্যাত করে দিতে আমরা বদ্ধপরিকর। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য জনসাধারণ উৎপাদনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের সকল শক্তি নিয়োগ করতে প্রস্তুত রয়েছে। একই সঙ্গে তারা কঠোর কৃচ্ছ্র পালনেও প্রস্তুত। জনগণের বিজয় সুনিশ্চিত করার জন্য অর্থনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত সকল লোক প্রতিটি ক্ষেত্রে অবশ্যই সুকঠোর শৃ´খলা পালন করবে।” এ সব উদ্দেশ্য সামনে রেখে এদিন থেকে কিছু বিষয় হরতালের আওতামুক্ত রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। যেমনÑব্যাংকিং কার্যক্রমে ব্যাংক, স্টেট ব্যাংক যে সব ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক লেনদেন অনুমোদিত হয়েছে সেগুলো সাপেক্ষে ছুটির দিনসহ নির্দেশিত সময়সূচী অনুযায়ী চলবে। মজুরি ও বেতন পরিশোধের ক্ষেত্রে শ্রমিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সার্টিফায়েড পে-বিলের মাধ্যমে তা করতে হবে। এ ছাড়াও কৃষি তৎপরতা, বন্দর পরিচালনা, ইপিআইডিসি ফ্যাক্টরি পরিচালনা, সাহায্য, পুনর্বাসন ও পল্লী উন্নয়ন কাজ, প্রাইমারী স্কুল শিক্ষকদের বেতন পরিশোধ, সরকারী কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে এজি অফিস আংশিক সময় খোলা রাখা, কারাগারের ওয়ার্ড অফিস খোলা রাখা, আনসারদের দায়িত্ব পালন, বিদ্যুত ও পানি সরবরাহ চালু রাখতে সংশ্লিষ্ট দফতর খোলা রাখাসহ সকল ইন্স্যুরেন্স অফিস খোলার রাখার নির্দেশ প্রদান করা হয়। এ ছাড়াও তাজউদ্দীন আহমেদ চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কঠোর শৃ´খলা রক্ষার আহ্বান জানান। অর্থনৈতিক বিষয়াবলির জন্য নির্ধারিত টিম সদস্যদের পরামর্শক্রমেই এ ব্যবস্থাদি অবলম্বিত হয়।
বঙ্গবন্ধুর একান্ত সান্নিধ্যে থেকে এ সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অবলোকনের সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। অতুলনীয় দক্ষ সংগঠক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। প্রতিটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ গ্রহণের জন্য পৃথক পৃথক টিম ছিল বঙ্গবন্ধুর। তাদের সকলের সঙ্গে আলোচনা করে তারপর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ জাতীয় চার নেতার সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হতেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। আমার মনে আছে, কখনও কখনও আলোচনার প্রয়োজনে যেতে হতো সহকর্মী বা টিম সদস্যদের বাড়িতে। সঙ্গে থাকতেন জাতীয় চার নেতার কখনও তিনজন বা দু’জন আর আমি। সে সময় ঢাকা শহরে খুব কম মানুষের গাড়ি ছিল। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের মধ্যে কেবল বঙ্গবন্ধুরই গাড়ি ছিল। যখন কোথাও যেতে হতো তখন গাড়ির সামনের আসনে চালক এবং বঙ্গবন্ধুর মাঝের স্থানে বসতাম আমি, পেছনে জাতীয় নেতৃবৃন্দ। সবাইকে তাদের স্ব-স্ব বাসভবন থেকে তুলে নিতেন বঙ্গবন্ধু। আবার কাজ শেষে প্রত্যেককে তাদের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে তবে বাড়ি ফিরতেন। একবার বঙ্গবন্ধু সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন মগবাজারের চাঁপাইনবাবগঞ্জের ধনাঢ্য এক ব্যক্তির বাড়িতে। বাড়ির নাম মালদা হাউস। সে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন আমাদের প্রিয় মজু ভাই, সৈয়দ মুজতবা আহসান খান। বঙ্গবন্ধুর খুব কাছের প্রিয় একজন মানুষ, দুর্দিনের সহযোগী, পরম শুভানুধ্যায়ী, বিশ্বস্ত বন্ধু। আমাদের অনেকেই তাঁর কাছে ঋণী। তিনি ব্যবসায়ী ছিলেন। তাঁর বাসায় বঙ্গবন্ধু গিয়েছিলেন পাকিস্তানের কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করতে। সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন জেনারেল পীরজাদা, জেনারেল হামিদ, জেনারেল মিঠ্ঠা। আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গিয়েছি, পাশের একটি কক্ষে অপেক্ষা করছি। আলোচনার এক পর্যায়ে হঠাৎ চিৎকার দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলছেন, ডযধঃ ফড় ুড়ঁ ঃযরহশ ড়ভ সব? উড় ুড়ঁ ঃযরহশ ঃযধঃ ঝযবরশয গঁলরন রিষষ ংঁৎৎবহফবৎ? ঘড়, ঝযবরশয গঁলরন রিষষ মরাব যরং ষরভব নঁঃ যব রিষষ হড়ঃ ংঁৎৎবহফবৎ ধহুনড়ফু বষংব. অর্থাৎ পাকিস্তান সামরিক কর্তৃপক্ষ তাঁকে কোন আপোস প্রস্তাব দিয়েছিল, যাতে উত্তেজিত হয়ে তিনি এ কথাগুলো উচ্চারণ করেছিলেন।
অসহযোগ আন্দোলনের এই দিনগুলোতে কেবলই মনে পড়ত ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের কথা। ১৯৬৬ থেকে ’৬৯ এ সময়টা ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের ড্রেস রিহার্সেল পর্ব। আমরা চারজন শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও আমি, আমরা আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর ভওয়াগন গাড়িতে চেপে রাতের বেলায় পোস্টার, দেয়াল লিখন লিখতে বের হতাম। গাড়ির সামনের সিটে আমি, পেছনে অপর তিনজন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু নিজেই গাড়ি চালাতেন। চালকের আসনে বসা মঞ্জু সব সময় গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রাখতেন। আমরা নিজ হাতে দেয়ালে পোস্টার সাঁটতাম।
সেদিন আমাদের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে নেতাকে আমরা কারামুক্ত করেছিলাম, ফাঁসির মঞ্চ থেকে মুক্তমানব হিসেবে বের করে এনেছিলাম। আজ সেই নেতার নেতৃত্বে ও নির্দেশে স্বাধিকার আন্দোলনে গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করছে। নেতার নৈকট্যে থেকে দেখেছি, শিখেছি কী করে কোন্ প্রক্রিয়ায় জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হয়। কিভাবে একটি সর্বাÍক অসহযোগ সফলভাবে এগিয়ে নিতে হয়। ধানম-ির বঙ্গবন্ধুর বাসভবনটি এ সময় সমাজের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ ও লোকজনে সরগরম থাকত। বঙ্গবন্ধু সকলের সঙ্গে কথা বলতেন, প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করতেন। প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংবিধানিক সকল বিষয়ে টিম সদস্যদের নিকট থেকে বাস্তবসম্মত পরামর্শ গ্রহণ করে শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে তবেই তিনি পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। আজ যখন স্মৃতির পাতা থেকে সে সব ঘটনা স্মরণ করি কেবলই মনে হয়, সবাইকে ঘিরে সূর্যের মতো দেদীপ্যমান এই মহান মানুষটি গভীর সঙ্কটকালেও হাস্যোজ্জ্বল মুখে সবাইকে সময় দিয়েছেন। আন্তরিকভাবে সবার কথা শুনেছেন এবং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে, সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেই তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে অগ্রসর হয়েছেন।

কেন্দ্রীয় সম্মেলন নিয়ে ছাত্রলীগের মধ্যে ক্ষোভ-হতাশা
                                  

মাহবুবুল আম্বিয়া: বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ২৯তম কেন্দ্রীয় সম্মেলন সহসা হওয়া না হওয়া নিয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে হতাশা ও ক্ষোভ। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা মার্চের মধ্যেই কেন্দ্রীয় সম্মেলন সম্পন্ন করার জন্য ছাত্রলীগকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত ৬ জানুয়ারি রাজধানীতে ছাত্রলীগের একটি অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগকে মার্চের মধ্যেই জাতীয় সম্মেলন করার নির্দেশ দেন। এটি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ইচ্ছা-সেটিও জানিয়ে দেন তিনি।

কিন্তু সম্মেলন করে নতুনদের হাতে নেতৃত্ব ছেড়ে দিতে একাংশের আপত্তি আছে। এ ক্ষেত্রে তারা আগামী জাতীয় নির্বাচনকে অযুহাত হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছেন। সম্মেলন করতে না চাওয়ার জায়গা থেকে ছাত্রলীগে সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ এবং সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বও মিটে গেছে বলে নিশ্চিত করেছেন জাকিরের ঘনিষ্ঠ একজন নেতা।

সম্মেলন না করতে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের মধ্যে যারা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আছেন, তাদের কাছে ধর্ণা দিচ্ছেন ছাত্রলীগ নেতারা। তাদের মাধ্যমে শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছার চেষ্টা চলছে। তবে আওয়ামী লীগের প্রধান অগ্রাধিকার ৭ মার্চের জনসভা। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের স্মরণে এই জনসভা সফল করতেই ব্যস্ত আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগসহ সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন। এই সমাবেশের পরই আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে সম্মেলন পিছিয়ে দেয়ার পরামর্শ নিয়ে বসতে চান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা।

২০১৫ সালের ২৬ ও ২৭ জুলাই ২৮তম জাতীয় সম্মেলনে কাউন্সিলরদের ভোটের মাধ্যমে সভাপতি হিসেবে  সাইফুর রহমান সোহাগ দুই হাজার ৬৯০ ভোট পেয়ে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে জাকির হোসেন পেয়েছেন দুই হাজার ৬৭৬ ভোট। কাউন্সিল অধিবেশনে ভোট গণনার ফল ঘোষণার পর সাবেক ও বর্তমান নেতাদের উপস্থিতিতে নতুন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে পরিচয় করিয়ে দেন তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম।

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বর্তমান কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। কিন্তু ছাত্রলীগের এ দু’শীর্ষ নেতার কারো মুখেই সম্মেলন নিয়ে কোন কথা নেই। দু’ নেতার ভাবখানা এমন, ক্ষমতার চেয়ারে বসে থাকতেই যেন স্বাচ্ছন্দ্য তাদের। ছাত্রলীগের বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে রীতিমতো আ’লীগের ভ্রাতৃপ্রতীম এ সংগঠনে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। আর এ অস্থিরতা ও কোন্দল প্রকাশ্যে আসে গত বছরের ১২ জুলাই। সংগঠনের ওই সাধারণ সভায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস.এম.জাকির হোসাইন নেতা-কর্মীদের তোপের মুখে পড়েন।

দলীয় নেতা-কর্মীরা জানান, নানান কারণে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ওপর বেশিরভাগ নেতা-কর্মী ক্ষুব্ধ। এর মধ্যে খোদ দলীয় গঠনতন্ত্র না মানার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতি দু’মাস পরপর নির্বাহী সংসদের সভা হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান কমিটি মাত্র একটি সাধারণ সভা করেছে।

এছাড়া কাউন্সিলর, কেন্দ্রীয় কমিটি, সম্পাদকমণ্ডলীর সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। গঠনতন্ত্রে কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ ৩০১ সদস্য নিয়ে গঠিত হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে এই সংখ্যা সাড়ে ৪’শ ছাড়িয়েছে। দলীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক শুধু নিজেদের এবং অনুগত অনুসারীদের নিয়ে ব্যস্ত থাকায় দলটির গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতাই দলীয় রাজনীতিতে নিজেদের নিষ্ক্রিয় করে রেখেছেন। এর পেছনে রয়েছে তাদের অবমূল্যায়নের বিষয়টি।

ছাত্রলীগের ৭০ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতেও নতুন করে সম্মেলনের দাবি জোরালো হয়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগেই এ কমিটিকে মেয়াদোত্তীর্ণ ঘোষণা দিয়ে মাঠ গরম করেন কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েক নেতা।

সূত্র মতে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও বেশ কয়েকবার দ্রুত সময়ের মধ্যে ছাত্রলীগের সম্মেলন হবে জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আলোর মুখে দেখেনি দলের অন্যতম নীতি নির্ধারক এ নেতার বক্তব্য। বরং প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি করার যে নির্দেশ ওবায়দুল কাদের দিয়েছিলেন সে সময়ই ছাত্রলীগের একাধিক নেতা সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে নজিরবিহীন ভাবে ওবায়দুল কাদেরকে আক্রমণ করে কথা বলেছেন।

সূত্র জানায়, সোহাগ ও জাকির মেয়াদোত্তীর্ণ এ কমিটিকে আরো প্রলম্বিত করতে চান। তাদের টার্গেট একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তারা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্তর্ভূক্ত অনেক ইউনিটে সম্মেলন বাকী রয়েছে। এসব কমিটি করে তবেই সম্মেলনের দিনক্ষণ নির্ধারিত হবে।

কিন্তু তাদের এ টার্গেটে রীতিমতো বাঁধ সেধেছে নিজ কমিটিরই অনেক নেতা। দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা না আসলে তারা আবারো নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে নামতে পারেন। ছাত্রলীগের রাজনীতিকে আরো গতিশীল ও চাঙ্গা করতে মেয়াদোত্তীর্ণ এ কমিটির শীর্ষ দু’ নেতার হাত থেকে নতুন নেতৃত্বের হাতে ছাত্রলীগকে তুলে দিতে চান তাঁরা।

দলীয় পরিমন্ডলে শোনা যাচ্ছে, ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস.এম.জাকির হোসাইন তাদের ‘মেন্টর’ হিসেবে পরিচিত কয়েক নেতার সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করছেন। যে কোন মূল্যে আরো কিছু সময় চান তাঁরা। কথিত ‘মেন্টর’ এসব নেতারা যাতে করে বিষয়টি আ’লীগের শীর্ষ নেতাদের বুঝাতে পারেন এজন্যও শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি বড় অংশ  সম্মেলন দাবিতে নাছোড়বান্দা ভূমিকায় থাকায় এ নেতারা গভীর চিন্তায় পড়ে গেছেন।

ওবায়দুল কাদেরর ৬ জানুয়ারির নির্দেশের পর বিষয়টি নিয়ে জানতে দুই দিন পর গণভবনে যান ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ এবং সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন। সেদিন শেখ হাসিনা এই দুই নেতাকে ৩১ মার্চের মধ্যে সম্মেলন করার নির্দেশ দেন বলে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। এই হিসাবে ছাত্রলীগের হাতে সময় বেশি নেই। এই সময়ে সম্মেলনের জন্য নানা প্রস্তুতি চোখে পড়ার কথা ছিল। কিন্তু তার কিছুই হয়নি।

প্রতিবারই সম্মেলনের অন্তত এক মাস বাকি থাকতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে সম্মেলন পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলন ও সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু এর কিছুই করা হয়নি এখনও। আবার সম্মেলনের তারিখ ও স্থানও নির্ধারণ করা হয়নি। এসব কারণে সম্মেলন হবে কি না এ নিয়ে শঙ্কা কাটছেনা মাঠ পযায়ে থাকা নেতাকর্মী ও পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে।

তবে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন, ‘সম্মেলন যথাসময়েই হবে, আমরা সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদপ্রত্যাশী বেশ কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বলেন, ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সম্মেলন চাইছেন না। তারা চান সম্মেলন হোক সংসদ নির্বাচনের পর। আবার জাতীয় সম্মেলনের আগে সংগঠনের সারাদেশের মেয়াদউত্তীর্ণ শাখার সম্মেলন করা হয়। কিন্তু ১১০টি ইউনিটের মধ্যে এখন পর্যন্ত সম্মেলন করা হয়েছে ৬৪টির।

যেসব কমিটির সম্মেলন এখনও হয়নি তার মধ্যে আছে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, তীতুমীর কলেজ, তেজগাঁও কলেজ, চট্টগ্রাম মহানগর, বগুড়া, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, নাটোর প্রভৃতি।

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এক বছর, কোনোটি তিন বছর, কোনোটি আড়াই বছর, কোনোটি তিন বছর পার করেছে।

তবে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ‘ছাত্রলীগের কিছু নেতিবাচক কর্মকান্ডে সাধারণ মানুষ ও দলের (আওয়ামী লীগ) নেতৃবৃন্দ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন। আর ছাত্রলীগের এই দৃশ্যমান নীতিবাচক বিষয়গুলো নিয়ে যাতে সাধারণ মানুষ কোন কথা বলতে না পারে, তাই এই সম্মেলনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যাতে দল (আওয়ামী লীগ) তার ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের (ছাত্রলীগ) জন্য নতুন দুই দায়িত্ববান ও যোগ্য প্রার্থীকে খুঁজে বের করতে পারেন, যারা সত্যিকার অর্থেই দলকে গতিশীল করবে।’

এই জন্যই দুই মাস আগেই সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছিল বলে জানান দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘সম্মেলন পূর্বঘোষিত সময় অনুযায়ী হবে,এতে কোন সন্দেহ নেই।’

সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকার বিষয়ে আওয়ামী লীগের অন্য একজন কেন্দ্রীয় এক নেতা বলেন, ‘এটা তো স্বাভাবিক বিষয় যে, সহজে কেউ ক্ষমতা ছাড়তে চায় না । তবে এখন থেকে পুরোপুরি এক মাস সময় আছে আর ছাত্রলীগের সম্মেলনের প্রস্তুতির জন্য ১০ দিনের বেশি সময় লাগবে না।’

অগ্নিঝরা মার্চ: ৬ মার্চ সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়
                                  

১৯৭১ সালের ৬ মার্চ সারাদেশে হরতাল পালিত হয়। গত কয়েকদিনে সেনাবাহিনীর নির্বিচার হত্যাকা-ের প্রতিবাদে সর্বস্তরের মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পী, সাংবাদিকসহ সকলেই স্ব-স্ব অবস্থান থেকে প্রতিবাদ মিছিলে শামিল হতে থাকে। এ কয়দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনার জন্য বঙ্গবন্ধু ও বাংলার জনগণকে দায়ী করে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এদিন বেতারে ভাষণ দেন। ৫ মার্চ ইয়াহিয়া এবং জনাব ভুট্টো ৫ ঘণ্টা গোপনে বৈঠক করে যে খসড়া তৈরি করেছিলেন বক্তৃতায় সেটিই প্রতিফলিত হয়। এদিন ঢাকাসহ সারাদেশে সর্বাÍক হরতাল পালিত হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ভেঙ্গে ৩৪১ জন কারাবন্দী পলায়নকালে পুলিশের গুলিতে ৭ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হয়। এদিন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক শাসক লে. জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খানকে সরিয়ে তদস্থলে ‘বেলুচিস্তানের কসাই’ খ্যাত লে. জেনারেল টিক্কা খানকে উভয় পদে নিযুক্ত করার ঘোষণা দেয়া হয়। এয়ার মার্শাল আসগর খান বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দ্বিতীয় দফা বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, “পরিস্থিতি রক্ষা করার জন্য আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। বাকি বিষয় আগামীকাল শেখ মুজিবের বক্তৃতায় জানতে পারবেন।” কার্যত, সারা দেশের মানুষ এদিন থেকে অধীর আগ্রহে প্রহর গুনতে থাকে ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে পরবর্তী দিকনির্দেশনা জানার। এদিন আমি এক বিবৃতিতে ৭ মার্চের ভাষণ রেসকোর্স থেকে সরাসরি প্রচারের জন্য ঢাকা বেতার কেন্দ্রের প্রতি আহ্বান জানাই।
একাত্তরে ৭ মার্চেই সমান্তরাল সরকার গঠিত হয়
পাকিস্তানী মিডিয়া
বাংলাদেশ কাল বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ভাষণ স্মরণ করার অপেক্ষা করছে। পাকিস্তানী গণমাধ্যম ও তাদের সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে ৪১ বছর আগে ওই ভাষণই পাকিস্তানী শাসনের অবসান ঘটায়।
পাকিস্তানের অন্যতম জনপ্রিয় পত্রিকা ডন তার অনলাইন ভার্সনে সম্প্রতি এক মন্তব্য প্রতিবেদনে বলেছে, ‘(১৯৭১ সালের ৭ মার্চ) এক সমান্তরাল সরকার কার্যকর হয়। ১৯৪২ সালে সিন্ধুতে সামরিক শাসন জারির পর (বিভাগ-পূর্ব) উপমহাদেশে এটা ছিল দ্বিতীয় সমান্তরাল সরকার।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ‘জুলফিকার আলী ভুট্টো যখন করাচীতে সংবাদ সম্মেলন করছিলেন, তখন ঢাকায় মুজিব এক জনসমাবেশে ভাষণ দিচ্ছিলেন। সব সরকারী, আধাসরকারী ও বেসরকারী ভবনে জাতীয় পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো হয়।’
‘এ লিফ ফ্রম হিস্ট্রি : এ প্যারালাল গবর্নমেন্ট টেকিং ওভার’ শিরোনামে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মুজিবের বাড়িতে একই পতাকা উত্তোলন করা হয়।’
এতে বলা হয়, ১৯ মার্চ ‘ইয়াহিয়া ও মুজিবের বৈঠক কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়। পরের দিন আলোচনা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর আরও গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিবাহিত হতে থাকে।’ এর আগে কয়েকজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ওই ভাষণকে ‘ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান’ অবসানের রূপরেখা বলে অভিহিত করার পর গত সপ্তাহে ডন এই পর্যালোচনামূলক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। লে. জেনারেল কামাল মতিন উদ্দিন তার ‘ট্র্যাজেডি অব এরর : ইস্ট পাকিস্তান ক্রাইসিস ১৯৬৮-১৯৭১’ বইতে লেখেন, ‘১৯৭১ সালের ৭ মার্চ মূলত বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়।
পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান বাহিনীর কমান্ডার লে. জেনারেল এএকে নিয়াজী তার ‘বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান’ বইতে লেখেন, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ‘মুজিব মূলত শাসক হিসেবে পরিগণিত হন।’ তিনি লেখেন, ‘তাঁর বাড়ি প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে পরিণত হয়, কেন্দ্রীয় সরকারের কমান্ড অস্বীকার করা শুরু হয়।’
তবে ভাষণ ও ওইদিনের দৃশ্য সম্পর্কে অপেক্ষাকৃত আরেকজন জুনিয়র কর্মকর্তার লেখায় তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানী সামরিক জান্তার উদ্বেগের কথা উলেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, রমনা রেসকোর্স ময়দানে কয়েক লাখ লোকের বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণে কি থাকতে পারে এবং এর কি প্রতিক্রিয়া হতে পারে সে ব্যাপারে সামরিক জান্তা দারুণভাবে উদ্বিগ্ন ছিল।
তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক অবশ্যই বিষয়টি পাকিস্তানী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছেন। তবে তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রশংসা থেকে বিরত থাকতে পারেননি। তিনি তাঁর ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ বইতে এর বিশদ বর্ণনা করেছেন। সালিক লেখেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ ৭ মার্চ যতই ঘনিয়ে আসছিল ঢাকা ততই গুজব ও আতঙ্কে উত্তাল হয়ে উঠছিল।’ তিনি লেখেন, পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের সদর দফতর ঢাকা রেডিও স্টেশনে এই ‘ননসেন্স’ সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। তিনি নিজে এই নির্দেশ রেডিও স্টেশনকে জানান। তিনি বলেন, এই নির্দেশে বঙ্গবন্ধু তীব্রভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, আমরা যদি সাড়ে ৭ কোটি মানুষের কণ্ঠ সম্প্রচার করতে না পারি তাহলে আমরা কাজ করতে অস্বীকৃতি জানাব’ একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে রেডিওর সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়।
বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে মুজিব মঞ্চে উঠে তাঁর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ঘোষণা শোনার অপেক্ষায় সমবেত বিশাল জনতাকে স্বাগত জানান। মুজিব তাঁর স্বভাবসুলভ বজ্রকণ্ঠে বক্তৃতা শুরু করেন। তবে তাঁর বক্তৃতার বিষয়বস্তুকে পরিবেশ উপযোগী করে তুলতে তিনি ধীরে ধীরে তাঁর কণ্ঠস্বর নিচের দিকে নিয়ে আসেন।
তিনি একতরফাভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা (ইউডিআই) দেননি। তবে ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের জন্য তিনি ৪টি পূর্বশর্ত আরোপ করেন।
এগুলো হলো সামরিক আইন প্রত্যাহার, জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর, সেনাবাহিনীর ব্যারাকে ফিরে যাওয়া এবং বাঙালী হত্যাকা-ের একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন। ‘জলোচ্ছ্বাসের স্রোত নেমে যাওয়ার মতো করে জনগণ রেসকোর্স ময়দান থেকে চলে যেতে থাকে। মনে হচ্ছিল সন্তোষজনক বাণী শোনার পর মসজিদ বা চার্চের মতো কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে তারা ফিরে যাচ্ছে।’ পাকিস্তানী ওই মেজর তার বইতে লেখেন ‘তাদের মধ্যে ক্রোধ ছিল না। তারা ক্রোধানি¦ত হলে হয়ত ক্যান্টনমেন্টের ওপর চড়াও হতো। আর আমাদের অনেকেই এজন্য আতঙ্কিত ছিল।’

পুশব্যাকের শঙ্কায় আসামের দেড় কোটি বাংলাভাষী
                                  

স্বাধীন বাংলা ডেস্ক: চীন ও পাকিস্তানের সাহায্য নিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতে বাংলাদেশীরা অনুপ্রবেশ করছে বলে ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াতের মন্তব্যকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করেন তারা। রোহিঙ্গাদের মতো আসামের বাংলাভাষী মুসলমান নাগরিকদের জোর করে বাংলাদেশে ঠেলেদেয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ভারতের থাকতে পারে বলে শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন।

গত মাসে আসাম রাজ্য সরকার ন্যাশনাল সিটিজেন রেজিস্টার নামে দেশটির নাগরিকদের নামের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। যেখানে ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। যার বেশির ভাগ মুসলমান। জেনারেল রাওয়াত বুধবার দিল্লিতে এক সেমিনারে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, ভারতের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধের অংশ হিসেবেই পাকিস্তান উত্তর-পূর্ব ভারতে বাংলাদেশীদের অনুপ্রবেশে মদদ দিচ্ছে- আর সে কাজে তাদের সাহায্য করছে চীন। ভারত ও বাংলাদেশের সরকার যখন দাবি করছে দুই দেশের মধ্যে ব্যাপকভিত্তিক সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে তখন ভারতের সেনাপ্রধানের এই বক্তব্য নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে।

বিডিআরের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব:) আ ল ম ফজলুর রহমান ভারতের সেনাপ্রধানের এই বক্তব্যকে বাংলাদেশের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেনার পর থেকে ভারতের সেনাকর্মকর্তারা বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নির্মূল অভিযানে দেশটি মিয়ানমারকে সমর্থন দিয়েছে। এর মাধ্যমে মুসলিমদের বিতাড়নের একটি পরীক্ষা তারা করেছে। এখন আসাম থেকে মুসলমান বিতাড়নের পরিকল্পনা থাকতে পারে। তবে তিনি মনে করেন এ ধরনের চেষ্টা হবে মারাত্মক ভুল। এ পদক্ষেপ এ অঞ্চলকে অস্থির করে তুলতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বড় ধরনের সশস্ত্র তৎপরতার ঝুঁকি বাড়বে, যা ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ভারতের সেনাপ্রধানের এই বক্তব্যের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আসামে যখন নাগরিকত্ব নিয়ে নানা প্রক্রিয়া চলছে তখন এমন বক্তব্য বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। মমতা ব্যনার্জি বলেছেন, সেখানে কোনো অবৈধ বাংলাদেশী নেই। যদি কেউ পশ্চিম বাংলায় আসতে চায় তাদেরকে স্বাগত জানাবেন। সেখানে ভারতের সেনাপ্রধান ভিন্ন রকম বক্তব্য দিচ্ছেন। যদি আসামের বাংলাভাষী নাগরিকদের পুশব্যাক করার চেষ্টা করা হয় তাহলে বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের সঙ্কট তৈরি করবে।’

আসামের জনবিন্যাস পাল্টে দেয়ার জন্য ভারতের বিজেপি সরকার যে মুসলিমবিদ্বেষী উসকানিমূলক প্রচারণা চালাচ্ছেন ভারতের সেনাপ্রধান তার বক্তব্যের মাধ্যমে তার প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন দিয়েছেন। বিজেপি প্রকাশ্যেই গত কয়েক বছর ধরে বলে আসছে আসাম থেকে ‘অবৈধ’ বাংলাভাষী মুসলমানদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। গত মাসে নাগরিক তালিকা প্রকাশের আগে থেকেই আসামের বাংলাভাষীরা নানাভাবে ধরপাকড়-নিপীড়নের মধ্যে আছে। বেশ কয়েকটি ডিটেনশন সেন্টার তৈরি করা হয়েছে।

আসামের অন্তত ছয়টি স্থানে অবৈধ অভিবাসী চিহ্নিত করে (গোয়ালপাড়া, কোকড়াঝাড়, শিলচর, দিব্রুগড়, জোড়হাট, তেজপুর) কারাগারের মতো করে ডিটেনশন সেন্টার তৈরি করা হয়েছে বলে ভারতের গণমাধ্যমে খবর এসেছে। বাংলাভাষীদের বন্দী করে রাখা হয়েছে সন্দেহজনক মানুষ তথা ‘ডি-ভোটার’ (ডাউটফুল ভোটার) এবং ‘বিদেশী’ হিসেবে চিহ্নিত করে। আসামের গোয়ালপাড়াতে ২০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত হচ্ছে ভারতের সবচেয়ে বড় ডিটেনশন সেন্টার। ভারতের প্রদেশগুলোর মধ্যে আসাম প্রধানতম দারিদ্র্যকবলিত অঞ্চল।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে আসামের জনসংখ্যার ৩২ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। ফলে বাংলাদেশ থেকে মানুষ আসামে যাচ্ছে বলে ভারতের অভিযোগ যুক্তিগ্রাহ্য নয় বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। আসাম প্রদেশের সাথে বাংলাদেশের সীমান্ত রয়েছে ২৬২ কিলোমিটার। এর মধ্যে ২০০ কিলোমিটারের বেশি কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে ভারত।
গত মাসে আসামের নাগরিকদের নামের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে তাতে বেশির ভাগ মুসলমানের নাম বাদ দেয়া হয়।

এর মধ্যে আসামের অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (এআইইউডিএফ) নামে একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ও ৯ বছর ধরে লোকসভার সদস্য বদরুদ্দিন আজমলের নামও ছিল না। ভারতের সেনাপ্রধান এই রাজনৈতিক দলটিকেও আক্রমণ করেছেন। কোনো বৈধ রাজনৈতিক দলের সমালোচনা সেনাপ্রধান করতে পারেন কি না তা নিয়ে ভারতের ভেতরে এখন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

জেনারেল রাওয়াত নয়াদিল্লিতে বলেছেন, ‘এআইইউডিএফ বলে সেখানে একটা দল আছে। বিজেপির চেয়েও দ্রুতগতিতে তাদের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। তিনি আরো বলেন, আমার তো মনে হয় না এখন আর সেখানে জনসংখ্যার ডায়নামিক্সেকোনো পরিবর্তন করা সম্ভব। আসামে যেই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, এই প্রবণতা (মুসলিমদের সংখ্যাবৃদ্ধি) সেখানে ঘটেই চলেছে।’ সেনাপ্রধানের এই বক্তব্যের জবাবে এআইইউডিএফ নেতা বদরুদ্দিন আজমল টুইটারে মন্তব্য করেছেন, ‘শকিং! জেনারেল রাওয়াত তো রাজনৈতিক বিবৃতি দিচ্ছেন! গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি রাজনৈতিক দল যদি বিজেপির চেয়ে বেশি ফুলে ফেঁপে ওঠে, তাতে সেনাপ্রধানের কিসের মাথাব্যথা?

বড় দলগুলোর কুশাসনের জন্যই এআইইউডিএফ বা আম আদমি পার্টর মতো বিকল্প দলগুলোর উত্থান হচ্ছে।’

আসামে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট। এই দলের প্রধান বদরুদ্দিন আজমল আসামের নওগাঁ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পারিবারিকভাবে আসামের বড় ব্যবসায়ী। আগর ব্যবসায়ী আজমল আসামে বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজের সাথে জড়িত। ২০০৫ সালে তিনি এই রাজনৈতিক দল গড়ে তোলেন। জন্মের ছয় মাসের মাথায় এই দল নির্বাচনে (২০০৬) অংশ নিয়ে আসন পায় ১২৬-এর মধ্যে ১০টি; পরের নির্বাচনে পায় ১৮টি এবং সর্বশেষ নির্বাচনে পেয়েছে ১৩টি। এখন ভারতের পার্লামেন্টে তাদের তিনজন এমপি আছেন।

আসামের সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠী বাংলাভাষী মুসলমানরা এই দলের সমর্থকদের একটা বড় অংশ। বাংলাভাষী এই মুসলমানরা অতীতে বিভিন্ন দলের সামান্যই মনোযোগ পেতো। কিন্তু বদরুদ্দিন আজমল তাদের পৃথকভাবে সংগঠিত করা শুরু করলে রাজ্যটির ভোটের হিসাব-নিকাশ পাল্টাতে শুরু করে।

এরপর আসামের বাংলাভাষী মুসলমানদের নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা শুরু হয়। আসাম ভারতের দ্বিতীয় মুসলমান প্রধান রাজ্য হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশীরা আসামে অবৈধভাবে বসবাস করছে এবং তাদের ফেরত পাঠাতে হবে বলে দাবি উঠতে থাকে। এ ধরনের উসকানিমূলক প্রচারণার প্রধান কারণ হচ্ছে আসামের ১২৬টি নির্বাচনী এলাকার ৩৫টিতে বাংলাভাষী মুসলমানরা সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য।

ব্যাংক খাতে কোনঠাসা ‘বাংলা’
                                  

দেশের ব্যাংকিং খাতে মাতৃভাষা বাংলা চরমভাবে অবহেলিত। বাংলা আন্তর্জাতিক ভাষা হওয়া সত্ত্বেও ব্যাংক খাতে ইংরেজি ভাষার দাপট চলছে যুগের পর যুগ। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকও ইংরেজির দাপট থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে ৪৮টি ব্যাংকই দেশি উদ্যোক্তাদের। এছাড়া আমানতকারীদের মধ্যে বাঙালি গ্রাহকের সংখ্যা ১০ কোটিরও বেশি। শুধু তাই নয়, যারা এই খাত থেকে ঋণ নিচ্ছেন, তারাও শতভাগ বাঙালি। অথচ ব্যাংক খাতের যাবতীয় দালিলিক কর্মকাণ্ড চলছে ইংরেজি ভাষায়। ব্যাংকের পর্ষদে উপস্থাপন হচ্ছে ইংরেজি ভাষার বিভিন্ন ডকুমেন্ট। কোটি কোটি গ্রাহককে বাংলার পরিবর্তে ইংরেজি কাগজে সই করতে হচ্ছে। তাদের লেনদেনও করতে হয় ইংরেজি ফরমে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লেনদেনের ক্ষেত্রে ইংরেজি জরুরি হলেও দেশের অভ্যন্তরীণ লেনদেনের ক্ষেত্রে ইংরেজি একেবারেই জরুরি নয়। তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ সব ধরনের লেনদেন, ডকুমেন্ট, ও আদেশ-নির্দেশ বাংলা ভাষায় হওয়া উচিত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত কয়েকটি ব্যাংকে সীমিত আকারে বাংলা ভাষার ব্যবহার চললেও বেশিরভাগ ব্যাংকের কার্যক্রম চলছে ইংরেজিতে। বাংলাদেশ ব্যাংক এক্ষেত্রে কোনও ভূমিকাই রাখতে পারছে না। বরং দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকটিতেও বাংলা ভাষা উপেক্ষিত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবগুলো বিভাগের নামই রাখা হয়েছে ইংরেজিতে। ব্যাংকটির প্রজ্ঞাপন জারি থেকে শুরু করে অধিকাংশ প্রতিবেদন ইংরেজিতে তৈরি করা হয়। ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয় ইংরেজিতেই।

অবশ্য গত বছর ব্যাংক খাতে বাংলা ব্যবহার বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে তা খুব বেশি কাজে আসেনি। গত বছরের ১ এপ্রিলের মধ্যে সব ব্যাংককে হিসাব খোলার অভিন্ন আবেদন ফর্ম ও গ্রাহক পরিচিতি সম্পর্কিত ফরম চালু করার নির্দেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।

বিএফআইইউ’র নির্দেশ অনুযায়ী, হিসাব খোলার আবেদন ফর্ম ও গ্রাহক পরিচিতি বাংলা অথবা ইংরেজি অথবা উভয় ভাষায় মুদ্রণ করার কথা বলা হয়েছিল।

এ প্রসঙ্গে  বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র জি এম আবুল কালাম আজাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যাংক খাতে বাংলার ব্যবহার আরও বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে দেশের অভ্যন্তরীণ লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো ইচ্ছে করলে গ্রাহকদের সঙ্গে বাংলা ভাষায় করসপন্ডিং করতে পারে। তবে বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে ইংরেজিতিই করসপন্ডিং করতে হয়। ফলে এই ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষাটাও গুরুত্বপূর্ণ।’

অবশ্য রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, অগ্রণী, জনতাসহ কয়েকটি ব্যাংকের কার্যক্রম বাংলায় পরিচালিত হচ্ছে। তবে বিদেশি ও বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর আবেদনপত্র ও বিভিন্ন দলিলে বাংলার অনুপস্থিতির কারণে অনেকেই সমস্যায় পড়েন। যদিও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে বাংলা ভাষা প্রচলন আইনও  পাস হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরাস্তু খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ইসলামী ব্যাংকে বিদেশি শেয়ার হোল্ডার থাকার কারণে আমাদের বোর্ডে সব কাগজপত্রই উপস্থাপন হয় ইংরেজিতে। তবে গ্রাহক পর্যায়ে বাংলা ভাষার প্রচলন বাড়ানো দরকার।’ তিনি মনে করেন, যে সব ব্যাংকে বিদেশিদের কোনও অংশ নেই, তারা বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়াতে পারে।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে বাংলার প্রচলন না থাকার কারণে  সাধারণ মানুষকেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে এ নিয়ে। কেউ ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে চাইলে তাকে কয়েকটি ইংরেজি ফরম দেওয়া হয়। স্বল্প শিক্ষিতদের পক্ষে এটা পূরণ করা সম্ভব নয়। এসব ফরমে ২০টিরও বেশি স্বাক্ষর দিতে হলেও সেখানে কী কী শর্ত লেখা থাকে, তা অনেকেই বুঝতে পারেন না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যাংক খাতে বাংলা ভাষার ব্যবহার আগের চেয়ে হয়তো কিছু বেড়েছে। তবে আরও  বাড়ানো জরুরি।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘এ খাতে বাংলার প্রচলন বৃদ্ধি করা গেলে আমাদের মর্যাদা আরও বাড়বে।’

জানা গেছে, দেশের ৫৭টি তফসিলভুক্ত ব্যাংকের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ব্যাংকের হিসাব খোলার আবেদনপত্র ইংরেজিতে লেখা। ব্যাংক খাতে লেনদেনের অন্যতম ঋণপত্রের (এলসি) আবেদন, ঋণ বা বিনিয়োগ আবেদন, আমানত জমাপত্র বা ভাউচার, লকারে সম্পদ রাখার আবেদন ফর্ম, চেক বইয়ের জন্য আবেদনপত্র, চেক বই, টাকা স্থানান্তরপত্র, আরটিজিএস ফরম এবং বিভিন্ন স্কিমের আবেদনপত্রও ইংরেজিতে লেখা। ব্যাংকগুলোর ওয়েবসাইটেরও একই অবস্থা। প্রায় সব সরকারি ও বেসরকারি  ব্যাংকের ওয়েবসাইটে যাবতীয় তথ্য লেখা থাকে ইংরেজিতে। ব্যাংকের পরিচিতি, বিভিন্ন ঋণপণ্য ও আমানতের তথ্যও থাকে ইংরেজিতে।

যদিও প্রতিবেশী দেশ ভারতে ব্যাংকগুলোতে প্রতিটি কাগজপত্র তিনটি ভাষায় লেখা হয়। ব্যাংকের শাখা যে রাজ্যে, সেই রাজ্যের নিজস্ব ভাষার পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষা হিন্দি ও ইংরেজিতে লেখা থাকে সব কিছু।


সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

বাংলাদেশে গণহত্যা: পর্ব- ২ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং ইতিহাসের দায়মোচন
                                  

 

বশীর আহমেদ  
বিশ শতক কালপর্ব যেমন মানব সভ্যতার অভাবনীয় অগ্রগতির, তেমনি সভ্যতার চরম অধোগতির কালিমালিপ্ত ঘটনাতেও আকীর্ণ সে ইতিহাস। এ শতকে বিশ্ববাসী মানবতার চরম অবমাননা প্রত্যক্ষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে, যখন হিটলারের নাৎসী জার্মানী জাতিগত ইহুদী নিধন অভিযানকে সুসংগঠিত ও সুবিস্তৃত আকার দেয়। হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের গ্যাস চেম্বারে অগণিত মানুষকে পুড়িয়ে ছাই করার তথ্যটুকু পর্যন্ত যুদ্ধ চলাকালে জানা দূরে থাক- কেউ ধারণা পর্যন্ত করতে পারেনি। এত সঙ্গোপনে চালানো হয়েছিল সে নিধনযজ্ঞ। যুদ্ধের একেবারে চুড়ান্ত লগ্নে সোভিয়েত লাল ফৌজ এবং মার্কিন বাহিনী জার্মান ভূখন্ডে প্রবেশ করলে আবিস্কৃত হয় গ্যাস চেম্বাররুপী রক্তহীম করা জল্লাদখানা।  মানব নিধনের লোমহর্ষক পদ্ধতি ও ব্যাপকতা দেখে স্তম্ভিত হয় বিশ্ববাসী।
দ্বিতীয় মহাসমর শেষ হলে পর যুদ্ধকালে সংঘটিত গণহত্যা তথা মানবতার বিরুদ্ধে পরিচালিত অপরাধের নৃশংসতম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হতবিহবল বিশ্বসমাজ সুবিচারের আশায় গড়ে তোলে ন্যুরেমবার্গ মিলিটারী ট্রাইব্যুনাল এবং টোকিও ট্রাইব্যুনালের মত আন্তর্জাতিক আদালত। ট্রাইব্যুনালের জন্য বিচারনীতি প্রণয়ন ও বিচার কাজ পরিচালনা করতে গিয়ে মানবেতিহাসের ভয়ঙ্করতম ওই যুদ্ধাপরাধ সম্পর্কে বেশ কিছু নিবিড় উপলব্ধি আহরণের সুযোগ পায় ট্রাইব্যুনাল।
বাস্তব পর্যবেক্ষণে দেখা যায় - একটি নৃগোষ্ঠি, জাতি অথবা ধর্মীয় গোষ্ঠিকে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে উৎখাতের অভিপ্রায়ে যখন রাষ্ট্র অথবা সেমত সংগঠিত শক্তি উদ্যোগী হয়, তখন যে ব্যাপক পরিধি বা ধরণ নিয়ে নৃশংসতা ঘটে তা আলাদাভাবে বিশ্লেষণ বা বিচার করা অসম্ভব একটি কাজ। কারণ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে সংঘটিত প্রতিটি অপরাধের আলাদা বিচার করতে গেলে সে ক্ষেত্রে কেবলমাত্র ইহুদী নিধনের অভিযোগে লাখ লাখ মামলার অবতরণা করতে হত নাৎসী বাহিনীর বিরুদ্ধে। সেই সাথে শারিরীক নিপীড়ন, ধর্ষণ, লুন্ঠন, গুম, অগ্নিসংযোগ, সম্পদ বিনাশ, জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানো  (হেট ক্যাম্পেইন), দেশান্তরকরণসহ ছিল আরও কত ধরণের যে অপরাধ। পুঞ্জিভূত সে সব অপরাধের মোকাবেলা করে মানব সমাজ কিভাবে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করবে - সেটাই তখন সব চাইতে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয়।
এ অবস্থায় ন্যুরেমবার্গ ও টোকিও ট্রাইব্যুনাল যুদ্ধ-সংঘাতকালীন ব্যাপকতর মাত্রার এমন সব অপরাধকে তাই গণহত্যা বা জেনোসাইড, মানবতা ও শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধ হিসাবে সজ্ঞায়িত করে। এ সজ্ঞায় বর্ণিত অপরাধসমুহের প্রকৃতি ও ধরণ সম্পর্কেও উপলব্ধি গড়ে উঠতে থাকে বিচারালয় প্রতিষ্ঠা এবং বিচার পরিচালনাকালীন অর্জিত বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।
ফলশ্রুতিতে, আদালত এরুপ ভয়ঙ্কর ও নৃশংস অপরাধের জন্য অগণীত অপরাধীদের নয় - বরং অপরাধ সংঘটনের মূল হোতা বা প্রধান কুশীলবদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে থাকে। এভাবে স্বীকৃত হয় - এমন অপরাধ যারা পরিচালনা করবে, বাস্তবায়নে অংশ নেবে, যোগসাজসে থাকবে, উস্কানী দেবে এমন কি - অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে জেনেও যারা তা বন্দ করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পদক্ষেপ নেবে না, তারাও সমান অপরাধী। আরও সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মূল হোতাদের বিচারের পাশাপাশি গণহত্যার শিকার জাতি-রাষ্ট্রগুলো চাইলে তারা নিজেরাও স্বদেশে জাতীয়ভাবে আইন প্রণয়ন করে এ ধরণের অপরাধের বিচারানুষ্ঠান পরিচালনা করতে পারবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের এরুপ সিদ্ধান্তের পর অধিকৃত জার্মানীর পূর্ব-পশ্চিম প্রান্তে মার্কিন, বৃটিশ, ফরাসী এবং রুশ নিয়ন্ত্রিত অংশে প্রতিষ্ঠা করা হয় পৃথক আদালত। জার্মান নাগরীক - যারা সদ্যসমাপ্ত বিশ্বযুদ্ধকালে গুরুতর অপরাধ সংঘটনে অভিযুক্ত হয়েছিল, ওই সমস্ত আদালত তাদের বিচার ও দন্ড দেয়া শুরু করে।
যুদ্ধ-সংঘাতের অনুসঙ্গ যুদ্ধাপরাধ তথা মানবতার বিরুদ্ধে পরিচালিত অপরাধ প্রচলিত অপরাধ থেকে ভিন্নতর হবার কারণে এরুপ অপরাধ বিচারের জন্য যে আলাদা আইন ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন সে শিক্ষা মানবজাতি প্রথম উপলব্ধি করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের নির্মমতা প্রত্যক্ষ করার পর। বিশ্বযুদ্ধের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অতঃপর বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠা করে জাতিসংঘ এবং ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক সার্বজনীন মানবাধিকার সনদ গৃহীত হওয়ার পাশাপাশি প্রণয়ন করা হয় জেনোসাইড কনভেনশন।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ন্যুরেমবার্গ ও টোকিও ট্রাইব্যুনালের পথ বেয়ে জেনোসাইড কনভেনশন প্রণীত হয়েছিল বটে তবে পরবর্তী দিনগুলোতে বিশ্ব পরাশক্তিগুলো নিজেদের  প্রভাব বলয় সৃষ্টির অনৈতিক খেলায় জড়িয়ে পড়লে নিপীড়িত মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোর মত লক্ষ্যণীয় আর কোন আন্তর্জাতিক উদ্যোগ দেখা যায়নি।
আন্তর্জাতিক মহলের এরুপ ব্যর্থতা ও নিস্ক্রীয়তার মুখে যুদ্ধাপরাধের মত মানবসৃষ্ট ভয়ানক বিপর্যয় মোকাবিলা বা প্রতিকারের ব্যাপারে যুদ্ধ বিধ্বস্ত  বাংলাদেশ কি করতে পেরেছিল সে বিষয়টি তাৎপর্যময় নিঃসন্দেহে। মুক্তিযুদ্ধের পর-পরই বাংলাদেশ সরকার দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এদেশীয় সহযোগীদের বিচারের জন্য জারি করে দালাল আইন। অতঃপর বাংলাদেশের মাটিতে সংঘটিত গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ তথা মানবতার বিরুদ্ধে নয় মাসব্যাপী সুসংগঠিত প্রক্রিয়ার চালানো অপরাধের ব্যাপকতা খতিয়ে দেখতে এবং বিচার অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠনের জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহবান জানায় বাংলাদেশ সরকার। এ আহবানে আন্তর্জাতিক মহলের কোন সাড়া না মিললেও দেশের মাটিতে সংঘটিত গণহত্যার বিচার নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের আগ্রহ ও ভাবনার সাথে যোগাযোগ ঘটে আন্তর্জাতিক অপরাধ মোকাবেলায় আইনী ব্যবস্থা দাঁড় করাতে উদ্যোগী আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের।
                                                                                                                                                   Ñ চলবে

বাংলাদেশে গণহত্যা: পর্ব-১ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং ইতিহাসের দায়মোচন
                                  

বশীর আহমেদ

পাকিস্তানের একসময়কার ডাকসাইটে মিডিয়া ম্যাগনেট, ল’ইয়ার ও পলিটিশিয়ান - ‘৫৮ সালে পাকিস্তানী প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নূন ক্যাবিনেটের অর্থমন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরী একাত্তর সালে ছিলেন ইয়াহিয়া খানের ঘনিষ্ট সহযোগী ও দোসর। বাংলাদেশের বিপন্ন মানুষ যখন দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মরনপণ লড়াইয়ে ব্যস্ত, ইয়াহিয়ার এই বাঙালি দোসর  সে সময় আমেরিকা সফরে যান পাকিস্তানের জন্য মার্কিন যুদ্ধ সরজ্ঞাম ও আর্থিক অনুদান বরাদ্দের দালালী করতে। সফরের এক ফাঁকে পাকিস্তানের তৎকালীন ওয়াশিংটন দূতাবাস থেকে স্বপক্ষত্যাগকারী বাঙালী কূটনীতিক আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সাথে বাংলাদেশে চলমান মুক্তিযুদ্ধ, পাকিস্তান     সেনাবাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা এবং জাতিগত নিশ্চিহ্নকরণ অভিযান নিয়ে একান্তে কথা বলেন হামিদুল হক। প্রায় অর্ধ শতাব্দিকাল আগেকার সে আলাপচারিতা সম্পর্কে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থমন্ত্রী এম এ মুহিত নিজের স্মৃতিকথায় লিখেছেন-‘হামিদুল হক চৌধুরী এসে উঠলেন ওয়াশিংটনে পাকিস্তান এমবেসির সন্নিকটে ‘এমবেসি রো’ হোটেলে। তার ডাকে একদিন অপরাহ্নে হোটেলে গেলাম। আশ্চর্যের ব্যাপার যে, বাংলাদেশে চলমান হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে তিনি সত্য ভাষণ করলেন। হামিদুল হক বললেন যে, এমন কোন পরিবার বাংলাদেশে নেই - যাদের কেউ না কেউ হয়তো সামরিক বাহিনীর হাতে না হয় বিহারীদের হাতে মারা গেছে। তিনি তার নিজের কিছু আতœীয় স্বজনের নাম উল্লেখ করলেন। স্বীকার করলেন হামিদুল হক - আগামী কয়েক বছর, হয়তো এক দশক - বাঙালীদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসাবে থাকতে হবে। কথাবার্তার এক পর্যায়ে উত্তেজিত, মহা-বিরক্ত হামিদুল হক চৌধুরী বললেন, গোল্লায় যাক তোমাদের বাংলাদেশ, সেখানে আমাকে কখনও পাবে না।’
ভাগ্যেরই পরিহাস, বঙ্গবন্ধুর শাহাদত-পরবর্তী রাজনৈতিক হাওয়া বদলের সুযোগে নিজের কৃতকর্মের জন্য ‘৭২ সালে বাংলাদেশ সরকারের হাতে নাগরীকত্ব খোয়ানো এই নির্লজ্জ্ব বাঙালী মীরজাফর হামিদুল হক ‘৭৮ সালে অতি সঙ্গোপনে এসে হাজির হয় তারই তা"িছল্যপূর্ণ উক্তি - তোমাদের বাংলাদেশে। ১০ এপ্রিল ‘৭১, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৪তম ডিভিশন হেডকোয়ার্টার্সের অপারেশন কক্ষে উর্ধতন সেনা কমান্ডারদের সভায় লে.জে. নিয়াজীর মুখখিস্তি -‘এই জারজ জাতির চেহারা আমি পাল্টে দেব - ওরা আমাকে কি মনে করেছে।’ এপ্রিলের শেষ দিকে যশোর সফরকালে নিয়াজির উক্তি - ‘বাঙালীরা মুসলমান ছিল, তবে এখন হিন্দু হয়ে গেছে। ওদের আমরা আবার মুসলমান বানাব।’ এর মাত্র আট মাস পর আল্লাহ’র ইচ্ছায় বাংলাদেশের লুঙ্গিপরা মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে সেনানিবাসের নিরাপদ বাঙ্কারে লুকাতে বাধ্য হয় দাম্ভিক এই পুঙ্গব জেনারেল। ‘ইসলামী রাষ্ট্রের মুসলমান সৈনিক হিসাবে ওই সকল ব্যক্তিকে খতম করতে হবে - যারা পাকিস্তান ও ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে’- একাত্তরে ইসলামী ছাত্র সংঘের দলীয় সম্মেলনে এ ছিল ওই সংগঠনের শীর্ষ নেতা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর নির্দেশ। কপাল মন্দ নিজামীর, পরিশেষে নিজেই সে অতীতের গুরুত্বহীন ঘটনা মাত্র।
মহান আল্লাহ’র বিধান এমনটাই যে - তিনি মজলুমের ফরিয়াদে সাড়া দেন আর দাম্ভিকের পতন ঘটান। আলহামদুলিল্লাহ! একাত্তর সালে মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে অত্যাচারী পাকিস্তানীদের দর্প চূর্ণ করতে তিনি নিরুপায় বাঙ্গালী জাতিকেই সাহায্য করেছিলেন।
১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে ২৩ বছরের পাকিস্তান রাষ্ট্রে আয়োজিত হয় সাধারণ নির্বাচন। একাত্তরের শুরুর দিনগুলোতে নির্বাচনে বিজয়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের ‘ডি-ফেক্টো’ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাজনৈতিক সঙ্কট মিমাংসায় সহনীয়তার চুড়ান্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। তাঁর আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও বাঙালী বিদ্বেষী পাকিস্তানের অবাঙালী সামরিক-বেসামরিক নেতারা তাদের তেইশ বছর পুষে রাখা জিঘাংসার চুড়ান্ত ফয়সালা টানতে অচিরেই অগ্রসর হয়। ২৫ মার্চ গভীর রাতে ইসলামের অজেয় শক্তির দাবীদার পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকায় আরম্ভ করে বাঙালীর বিরুদ্ধে জাতিগত শুদ্ধিসমর - অপারেশন সার্চলাইট। ওই বাহিনীর কমান্ডারগন আক্রমনকালে সৈন্যদের চরম ধূর্ততা, আকস্মিকতা, ধোকাবাজী ও দ্রুততা অবলম্বনের আদেশ দেয়। নির্দেশ পালন করতে গিয়ে অনুগত সৈন্যরা পাইকারীহারে গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, সম্পদ বিনাশ এবং নারীর ওপর বীভৎস অত্যাচারে যে পারদর্শিতা দেখায় তা ছিল ভয়বহতায় অকল্পনীয়।
আক্রমনকালে নিষ্ঠুরতা প্রয়োগ করার হুকুম কত কঠোরভাবে নির্দেশ করা ছিল তা বোঝা যায় এপ্রিলের শুরুতে উত্তরবঙ্গ অভিমুখি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৫৭তম পাঞ্জাব ব্রিগেডের নতুন নামকরণ থেকে। উত্তরবঙ্গে অভিযান পরিচালনাকালে ওই ব্রিগেড চলার পথে যে অকল্পনীয় হত্যা, ধ্বংস আর নিষ্ঠুরতার নমুনা রেখে যায় তার স্বীকৃতি হিসেবে পরে আদর করে ব্রিগেডটির নাম রাখা হয় ‘ফায়ার ব্রিগেড’। জাতিগত ক্রোধের আগুন নিয়ে এভাবে পাকিস্তানীরা বাংলাদেশে সূচনা করে স্বরণকালের নিষ্ঠুরতম গণহত্যা আর যুদ্ধাপরাধের ভয়ঙ্কর উপাখ্যান।
২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর কালবিলম্ব না করে পাকিস্তানী সৈন্যরা পবিত্র ইসলাম ধর্মের দোহাই দিয়ে চরম নিষ্ঠুরতায় ‘মালে গনিমত’ বাংলাদেশের নগর জনপদ পুড়িয়ে বিরান করতে থাকে। ব্যাপক লুন্ঠন, পাইকারী গণনিধন, জোর করে বাঙালী নারীর গর্ভে পাকিস্তানী সৈন্যদের সন্তান জন্মদান, বেপরোয়া দেশান্তরকরণ শুরু করা হয় জোরেশোরে। দখলদার সৈন্যদের বাছবিচারহীন নারী ধর্ষণের ব্যাপকতা বাঙালীর বিরুদ্ধে পাকিস্তানীদের পদ্ধতিগত নিশ্চিহ্নকরণ এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে ‘ডি-গ্রেডেশন’ করার পরিকল্পনা স্পষ্ট করে তোলে। বাঙালীর ‘রেজিম চেঞ্জ’ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে পাকিস্তানী সেনা তত্বাবধানে খান্ডারনী প্রকৃতির ভাড়াটে অবাঙালী নারীদের বাঙালী পরিবারে সন্তান জন্মদানে নিয়োজিত করাটাও তখন কোন অসম্ভব ঘটনা ছিল না।
এ প্রক্রিয়ায় বাঙালীর পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ বিধ্বংসের মধ্য দিয়ে বাঙালী জাতির পারিবার প্রথাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা ছিল পাকিস্তানীদের সুচিন্তিত পরিকল্পনার অংশ। এভাবে কালক্রমে বাঙালী নারীর গর্ভে ধারণ করা পাকিস্তানীদের ঔরস্যজাত সন্তান আর অবাঙালী নারীর গর্ভে জন্ম নেয়া বাঙালীর সন্তানদের সংমিশ্রণে বাংলাদেশে এক সঙ্কর জাতির নতুন প্রজন্ম উৎপাদন করে বাঙালীর জাতীয় চেহারা বদলাবার অভিনব পদ্ধতি বাংলাদেশে কার্যকর করতে অগ্রসর হয় পাকিস্তানীরা। অপরদিকে, বাঙালীর সকল অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে গুটিকয় মীরজাফর বাদে গোটা জাতিকে ভারবাহী পশুর কাতারে টেনে নামিয়ে অনুগত ক্রীতদাসে পরিণত করার নীলনকশাও বাস্তবায়নে উঠে পড়ে লাগে পাকিস্তানী সেনা কর্তৃপক্ষ।
বস্তুত, পাকিস্তানী শত্রুসেনা কবলিত বাংলাদেশে বাঙালীর নাগরিক মর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণীতে অবদমন, বাঙালী জাতির চেহারা বদলানো আর নতুন করে মুসলমান বানানো এবং পাকিস্তানের কল্পিত শত্রুদের খতম করার হুকুম দেবার অন্তরালবর্তী অর্থ যে কি ছিল তা সহসাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই প্রেক্ষাপটে ইয়াহিয়ার ঘনিষ্ট বাঙালী সহযোগী ও দোসর হামিদুল হক চৌধুরী - যার ভাল করে জানা ছিল পাকিস্তানীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান নিয়াজী - যে ছিল পাকিস্তানী পরিকল্পনার প্রধান বাস্তবায়নকারী এবং দখলদার পাকিস্তানী সেনাদের অন্যতম এদেশীয় সহযোগী নিজামীর উল্লেখিত হুমকীতে বাঙালী জাতি বিনাশী যে সামগ্রীক চক্রান্তের আভাস ছিল, ২৫ মার্চের অল-আউট মিলিটারী অপারেশন এবং পরবর্তী নয় মাসব্যাপী বাংলাদেশ জুড়ে সুসংগঠিত-সুবিস্তৃত নৃসংসতা তারই জ্বাজুল্যমান প্রমান রেখেছে।    (চলবে)

কে হচ্ছেন ১৯ হেয়ার রোডের বাসিন্দা
                                  

বিশেষ প্রতিবেদক: সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পদত্যাগের পর ২২তম প্রধান বিচারপতি কে হবেন তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়ে গেছে। সংবিধান অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত করার ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্রপতির। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও একই কথা বলেছেন।

রমনার ১৯ হেয়ার রোডে প্রধান বিচারপতির সরকারি বাসভবন। কার আবাস হচ্ছে এই বাসভবন সেদিকে তাকিয়ে সবাই।

বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘(১) প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন।’

৬৭ বৎসর বয়স পূর্ণ হলে বিচারকরা অবসরে যাবেন। রেওয়াজ অনুযায়ী আপিল বিভাগের বিচারপতিরাই প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। সাধারণত জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিই প্রধান বিচারপতি হন। তবে বিভিন্ন সময়ে জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে ডিঙিয়ে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়ার রেওয়াজও দেখা গেছে।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মোট বিচারপতি ছিল নয় জন। এর মধ্যে গত ১ জানুয়ারি বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। বাকি আট জনের মধ্যে বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা ৭ জুলাই এবং বিচারপতি মো. নিজামুল হক ১৪ মার্চ অবসরে যান।

শনিবার (১১ নভেম্বর) পদত্যাগ করেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। আর এ পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতি গ্রহণ করেছেন বলে মঙ্গলবার (১৪ নভেম্বর) জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব।

এখন আপিল বিভাগের রয়েছেন পাঁচজন বিচারপতি। এদের মধ্যে আপিল বিভাগে জ্যেষ্ঠতার ক্রম অনুসারে বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা ২০১৮ সালের ১০ নভেম্বর, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ২০২১ সালের ৩০ ডিসেম্বর অবসরে যাবেন। এদের মধ্যে মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণের অজানা ইতিহাস
                                  


বশীর আহমেদ: ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দান– বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া ঐতিহাসিক ভাষণের পেছনে রয়েছে আরও অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা।

স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৬২ সালের প্রথমার্ধে তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক এবং কাজী আরেফ আহমেদ এর সমন্বয়ে ৩ সদস্য বিশিষ্ট গোপন সংগঠন ‘নিউক্লিয়াস’ গঠিত হয়। এই নিউক্লিযাসই আবার স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ নামেও পরে অভিহিত হয়েছে। এই গোপন সংগঠনের রাজনৈতিক শাখা হিসেবে একসময় গঠন করা হয় বিএলএফ যা মুািক্তযুদ্ধের সময় মুজিব বাহিনী হিসাবে পরিচিতি অর্জন করে। পল্টনের আউটার ষ্টেডিয়ামে সে সময় ভলিবল খেলার যে মাঠ ছিল তার কাঠের গ্যালারীতে গভীর রাতে একাধিক বৈঠকে বসে এই নিউক্লিয়াস গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।

১৯৬২ সাল থেকে ‘৭০ সাল পর্যন্ত নিউক্লিয়াস’র তত্বাবধানে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অতি গোপনে প্রায় সাত হাজার সদস্য সংগৃহীত হয়। ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসের প্রথম দিকে সিরাজুল আলম খান ও আবদুর রাজ্জাক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে বৈঠক করেন। সে বৈঠকে নিউক্লিয়াস ও  বিএলএফ গঠন এবং এর কর্মপদ্ধতি, সাংগঠনিক বিস্তৃতি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুকে প্রথমবারের মত অবহিত করা হয়। সিরাজুল আলম খান ও আবদুর রাজ্জাক বৈঠকে বঙ্গবন্ধুকে আশ্বস্ত করেন যে, স্বাধীনতার প্রশ্নে নিউক্লিয়াস ও বিএলএফ’র প্রশিক্ষিত কর্মী বাহিনী দেশের সর্বত্র এমন কি প্রতিটি থানা পর্যায়ে জনসমর্থন গড়তে কাজ করে যাচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরীণ যে কোন অনুকূল পরিািস্থতি কাজে লাগিয়ে এই কর্মীরা দেশজুড়ে রাজনৈতিক গণ-অন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম। ‘৭০ সালেই বঙ্গবন্ধু ফজলুল হক মনি ও তোফায়েল আহমেদকে বিএলএফ হাইকমান্ডে অন্তর্ভূক্ত করতে বলেন।

বঙ্গবন্ধুর সাথে অনুষ্ঠিত নভেম্বরের সে বৈঠকে নিউক্লিয়াস-বিএলএফ’র দুই নেতা বলেন, স্বাধীনতার প্রশ্নে এখন প্রয়োজন বিদেশের সাথে বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে যোগাযোগ স্থাপনসহ ভবিষ্যতে কোন বিদেশী সাহায্য সহযোগিতার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহন এবং প্রয়োজনবোধে সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ আর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

 বৈঠকের কয়েকদিন পর বঙ্গবন্ধু লন্ডন সফরে যান। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ দূতের সাথে বাঙ্গালীর স্বাধীনতার বিষয়ে লন্ডনে আলোচনা করেন বঙ্গবন্ধু। দেশে ফেরার পর তিনি নিউক্লিয়াস নেতাদের ডেকে ভারতের সাথে যোগাযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। আলোচনার সূত্র ধরে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের দু’টি সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারত থেকে অস্ত্র সংগ্রহের ব্যবস্থা সুসম্পন্ন করেন নিউক্লিয়াস নেতারা। এর পর পরই মার্চের ২৫ তারিখ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্র্যাকডাউন করলে অস্ত্র আনার ব্যাপারটি অত:পর  ভিন্নখাতে প্রবাহিত হয় যা পরবর্তী কালে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধের রুপ ধারণ করে।

১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসের শেষদিকে বিএলএফ’র চার নেতা সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, শেখ ফজলুল হক মনি এবং তোফায়েল আহমেদকে বঙ্গবন্ধু ভারতীয় নাগরিক চিত্তরঞ্জন সুতারের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। প্রথম সাক্ষাতেই চিত্তরঞ্জন সুতার বিএলএফ নেতাদের ২১ নং ড. রাজেন্দ্র রোড, নর্দান পার্ক, ভবানীপুর, কোলকাতা-৭০০০২১ ঠিকানাটি মনে রাখতে বলেন। নিউক্লিয়াস নেতারা ঠিকানাটি তিন-চারবার মুখে উচ্চারণ ও মুখস্ত করেন। বঙ্গবন্ধু নিজেও কয়েকবার আওড়ান ঠিকানাটি।

‘৭১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ১৮/১৯ তারিখ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাজউদ্দিন আহমেদকে নিয়ে বিএলএফ’র চার নেতার সাথে স্বাধীনতার বিষয়ে আলোচনায় বসেন। সে বৈঠকে স্বাধীনতার প্রশ্নে বিএলএফ’র তৎপরতা এবং চার নেতা সম্পর্কে তাজউদ্দিনকে অবহিত করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি পরামর্শ দেন, ভবিষ্যতে কখনো তার অনুপস্থিতি ঘটলে বিএলএফ’র চার নেতা তাজউদ্দিন আহমেদের সাথে আলোচনা করেই স্বাধীনতার সমস্ত কৌশল নির্ধারণ করবেন। সে বৈঠকে ভারতের সাথে যোগাযোগের বিষয়টিও তিনি পূণরায় তাজউদ্দিন আহমেদসহ চার নেতাকে স্বরণ করিয়ে দেন এবং ২১ নং ড. রাজেন্দ্র রোড, নর্দান পার্ক, ভবানীপুর, কোলকাতা-৭০০০২১ ঠিকানাটি তাদের মনে রাখতে বলেন।

১৯৭১ সালের ১লা মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান বেতার ভাষণে ৩রা মার্চ তারিখে আহুত গণপরিষদের পূর্বনির্ধারিত অধিবেশন বাতিল করলে ছাত্র-জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। এ সময় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দিলকুশা এলাকায় হোটেল পূর্বাণীতে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারী দলের বৈঠক চলছিল। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলে [তিনি নিউক্লিয়াসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুকুম দেন। শুরু হয় স্বাধীনতার জন্য প্রত্যক্ষ লড়াই।

নিউক্লিয়াসের পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২ মার্চ ডাকসু’র ভিপি আ শ ম আব্দুর রব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাবেশে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ৩ মার্চ ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে স্বাধীনতাকামী ছাত্র-জনতার বিশাল সমাবেশে ছাত্র লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন। সমাবেশে স্বাধীনতার পক্ষে চার ছাত্র নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, আ শ ম আব্দুর রব এবং আবদুল কুদ্দুস মাখন শপথ বাক্য পাঠ শেষে ‘জয় বাংলা বাহিনী’র ডেপুটি চীফ কামরুল আলম খান খসরু আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘গান ফায়ার’ করে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দেন।

মার্চ মাসের ৩ তারিখ রাত ১১/১২টার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিএলএফ’র চার নেতার সাথে বৈঠক করেন। স্বাধীনতা অন্দোলনের বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় সে বৈঠকে। বিশেষ করে- আর তিন দিন পর মার্চের ৭ তারিখে রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠেয় জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ব্যাপার নিয়ে আওয়ামী লীগের একটি ‘হাইকমান্ড’ গঠনের প্রস্তাব দেন বিএলএফ’র চার নেতা। বঙ্গবন্ধু জানান, তিনি নিজেও এ রকমই ভেবেছেন।

৪ মার্চ বঙ্গবন্ধু বিএলএফ’র চার নেতা সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, শেখ ফজলুল হক মনি এবং তোফায়েল আহমেদকে ডেকে নেন এবং আওয়ামী লীগের ‘হাইকমান্ড’ গঠন সম্পর্কে তাদের অবহিত করেন। তিনি জানান, তার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড গঠন করা হয়েছে এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, খন্দকার মোশতাক আহমেদ এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে তাতে সদস্য রাখা হয়েছে। আওয়ামী লীগের ‘হাইকমান্ড’ গঠনের পর থেকে বঙ্গবন্ধু প্রতি রাতে আন্দোলনের সকল বিষয় নিয়ে আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডের চার নেতা এবং বিএলএফ’র চার নেতার সঙ্গে আলোচনায় বসতেন।

৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে বঙ্গবন্ধু মার্চ মাসের ৫ তারিখ প্রথমে বিএলএফ হাইকমান্ডের চার নেতার সাথে আলোচনা করেন। একই দিন বিষয়টি নিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডের সাথে এবং বিএলএফ’র প্রস্তাবসমুহ তাদের অবহিত করেন। বঙ্গবন্ধু সেদিন আবারো বিএলএফ নেতাদের সাথে আলোচনায় বসেন তার ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে। একাধিকবার আলোচনার পর অবশেষে অধিক রাতে ভাষণের ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত হয়।

বিএলএফ‘র প্রস্তাবে বলা হয় যে, বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি হতে হবে অত্যন্ত আবেগময়ী এবং মূল ভাষণটিকে বিভক্ত করা হয় তিন ভাগে। সিদ্ধান্ত হয়, পরের দিন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডের কাছে এ প্রস্তাব তুলে ধরবেন। আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড প্রস্তাবটি নীতিগত ভাবে মেনে নেন এবং একই সাথে চলমান অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত রাখার উপর গুরুত্বারোপ করেন।

মূল ভাষণটিকে যেভাবে তিন স্তরে বিন্যস্ত করা হয় তা হ’ল, প্রথমে- অতীত ইতিহাস সংক্ষেপে, অত:পর- নির্বাচনের ম্যান্ডেট অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সবশেষে- অন্যথায় অসহযোগ আন্দোলনের পাশাপাশি স্বাধীনতার আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া।  

৫ মার্চ গভীর রাতে বিএলএফ হাইকমান্ড শেষবারের মত বঙ্গবন্ধুকে যে তিনটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিয়ে ৭ মার্চের বক্তৃতা দেবার পরামর্শ দেন তা হ’ল - সংক্ষেপে অতীত ইতিহাসের বর্ণনা, অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত ভাবে পরিচালনা করা এবং স্বাধীনতার আহবান উল্লেখ করে বক্তৃতা শেষ করা।

৬ মার্চ সকাল থেকে বঙ্গবন্ধু বিএলএফ ও আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডের নেতাদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করেন। এক পর্য্যায়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ হাই কমান্ড ‘মুক্তির সংগ্রাম’ শব্দটি দিয়ে বক্তৃতা শেষ করার কথা বলেছে। এ কথা জানার পর বিএলএফ হাইকমান্ড নেতৃবৃন্দ স্পষ্টভাবেই বলেন, ‘মুক্তির সংগ্রাম ও স্বাধীনতার সংগ্রাম’ কথাগুলো বক্তৃতার এক লাইনে থাকতে হবে এবং সেই লাইন দিয়েই বক্তৃতা শেষ করতে হবে। বিষয়টি বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডের কাছে তুলে ধরেন। বিকাল নাগাদ বঙ্গবন্ধু বিএলএফ নেতৃবৃন্দকে জানান, ’এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’- এই ভাবে বক্তৃতার শেষ লাইনটি ঘোষণা দেয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড একমত হয়েছে।

বলে রাখা ভাল যে, মার্চ মাসের চার, পাঁচ ও ছয় - এই তিন দিন প্রতি ২/৩ ঘন্টা অন্তর আওয়ামী লীগ এবং বিএলএফ হাইকমান্ডের পৃথক ও যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হত। প্রতিটি সভাতেই প্রসঙ্গ থাকতো বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তৃতা এবং সে সম্পর্কীত বিষয়াদি। ৬ মার্চ সন্ধ্যায় বিএলএফ’র পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুকে জানানো হয়, তার বক্তৃতার জন্য নির্ধারিত শেষ লাইন ’এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’ কথাটি বক্তৃতায় ঘুরিয়ে বলতে হবে। অর্থাৎ শেষ লাইনটি হবে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম - এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।

এর কিছু সময় পর বঙ্গবন্ধু বিএলএফ হাইকমান্ডকে জানান, আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড বিএলএফ’র প্রস্তাবে একমত হয়েছে। বিএলএফ হাইকমান্ড নেতারা অত:পর ৭ মার্চের বক্তৃতার জন্য বঙ্গবন্ধুকে পয়েন্টগুলো লিখে দেন।

প্রায় দুই ঘন্টা পর বঙ্গবন্ধু প্রথমবারের মত বিএলএফ হাইকমান্ডকে শোনালেন - তিনি কিভাবে জনসভায় বক্তৃতাটি করবেন। একই দিন রাত ১২টায় বিএলএফ হাইকমান্ডের সাথে পূনরায় আলোচনা করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি আবারও আওড়ান বক্তৃতাটি এবং ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম-এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’  বলে বক্তৃতা শেষে জিজ্ঞেস করেন- কেমন হলো?

আলোচনার এই পর্বে এসে বিএলএফ হাইকমান্ড খুবই সূক্ষ্ম একটি বিষয়ের প্রতি বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’ বলার পর জনসভা থেকে যে মুহুর্মুহু করতালি ও গর্জন উঠবে, সে শব্দে বক্তৃতার সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ কথাগুলো ভালভাবে শোনা যাবে না। সে কারণে জনতার গর্জন শেষ হওয়ার পর ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম - এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ লাইনটি যেন বঙ্গবন্ধু আর একবার উল্লেখ করেন এবং ‘জয় বাংলা’ বলে বক্তৃতা শেষ করেন।

আজ অনেকের কাছে বিষয়টি তুচ্ছ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একাত্তরের উত্তাল মার্চে স্বাধীকার আদায়ে উদগ্রীব- উম্মাাতাল বাঙালী জাতির জন্য বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার ওই শেষ লাইন - বিশেষত শেষ বাক্য ‘এবারের সংগ্রাম-স্বাধীনতার সংগ্রাম’ কথা কয়টি ছিল ঐশী বাণীর মত। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের অসম্পাদিত বক্তৃতায় এখনো  ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম - এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ দুইবার শোনা যায় এবং ঠিকই প্রথমবার জনতার জয়ধনির কারণে বক্তৃতার শেষ লাইনের সর্বশেষ অংশটি আড়ালে পড়ে গিয়েছিল।  

৬ মার্চ মধ্যরাতের সে চুড়ান্ত আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে বলেন, প্রথমবার সত্যই যদি এমন ঘটনা ঘটে তাহলে বিষয়টি যেন তৎক্ষণাৎ মঞ্চ থেকেই তাকে কোন না কোন ভাবে মনে করিয়ে দেয়া হয়। সে কথার প্রসঙ্গ ধরে আ শ ম আবদুর রব-কে দায়িত্ব দেয়া হয় সেরুপ পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর জামা-পাজামায় একটু টান দিয়ে ব্যাপারটা মনে করিয়ে দেবার।

আজ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি যখন মাঠে-ময়দানে, জনসমাবেশে বাজানো হয়, তখন বক্তৃতার শেষাংশে বঙ্গবন্ধুর বলা দ্বিতীয়বারের কথাটি শোনা যায়। প্রথমবারে বলা অংশটুকু সম্পাদনা করে বক্তৃতা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ বেতার-এর আর্কাইভে বঙ্গবন্ধুর অসম্পাদিত সে বক্তৃতাটি আজও সংরক্ষিত রয়েছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে।


তথ্য : সিরাজুল আলম খান পাঠচক্র‘র পুস্তিকা ও অন্যান্য সূত্র।

বিশ্বে শক্তিশালী পাসপোর্টের শীর্ষে সিঙ্গাপুর, বাংলাদেশ ৯০তম
                                  

স্বাধীন বাংলা ডেস্ক: ‘বৈশ্বিক পাসপোর্ট সূচক-২০১৭’ এ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্ট হিসেবে জায়গা করে নিল সিঙ্গাপুর। দেশটির পাসপোর্টধারীরা এখন বিনা ভিসায় বা ভিসা প্রক্রিয়াধীন থাকাকালে বিশ্বের ১৫৯টি দেশে ভ্রমণ করতে পারবেন। গতবছর এ তালিকার শীর্ষে ছিল জার্মানী। আর এ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৯০তম। ফলে বাংলাদেশের পাসপোর্টধারীরা ৩৫টি দেশে ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকারের সুবিধা পাবে।

৫১টি দেশে ভিসামুক্ত প্রবেশ সুবিধা পেয়ে প্রতিবেশি ভারত ৭৫তম ও পাকিস্তান (২৬) ৯৩তম।

গ্লোবাল এডভাইসরি ফার্ম ‘আর্টন ক্যাপিটাল’ জানায়, এর মাধ্যমে প্রথমবারের মত এশিয়ার কোনো দেশ এই সূচকের শীর্ষস্থান অর্জন করল।

সূচক প্রকাশের পর আর্টন ক্যাপিটালের সিঙ্গাপুর কার্যালয়ের পরিচালক ফিলিপ মে বলেন, সিঙ্গাপুরের অংশগ্রহণমূলক কূটনৈতিক সম্পর্ক ও কার্যকর পররাষ্ট্রনীতির ফল এই অর্জন।

সূচকে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা জার্মানির (১৫৮) পর যৌথভাবে তৃতীয় স্থানে আছে সুইডেন ও দক্ষিণ কোরিয়া (১৫৭)। চতুর্থ স্থানে আছে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, নরওয়ে, জাপান, যুক্তরাজ্য (১৫৬)। লুক্সেমবার্গ, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল আছে পঞ্চম স্থানে (১৫৫) । ষষ্ঠ স্থানে আছে মালয়েশিয়া, আয়ারল্যান্ড, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র (১৫৪)। সপ্তম স্থানে রয়েছে গ্রিস ও নিউজিল্যান্ড (১৫৩)। মালটা, চেক রিপাবলিক, আইসল্যান্ড (১৫২) রয়েছে অষ্টম স্থানে। নবম স্থানে এককভাবে অবস্থান করছে হাঙ্গেরি (১৫০)। অন্যদিকে ১৪৯ টি দেশে ভিসা মুক্ত চলাচলের সুবিধা নিয়ে সেরা দশের সর্বশেষ তালিকায় অবস্থান করছে ইইউভুক্ত দেশ স্লোভেনিয়া, স্লোভাকিয়া, পোল্যান্ড, লিথুনিয়া ও লাটভিয়া।

আগে থেকে কোনো ভিসা নেওয়া ছাড়াই বা গন্তব্য দেশে পৌঁছানোর পর ভিসা পাওয়ার ভিত্তিতে পাসপোর্টের শক্তি বিবেচনা করা হয়। এতদিন সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্টের তালিকায় ইউরোপের দেশগুলোর জয়জয়কার ছিল। গত দুই বছরও শীর্ষে ছিল জার্মানির পাসপোর্ট। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে র‌্যাংকিংয়ে পিছিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সূত্র: বিজনেস ইনসাইডার, গ্লোবাল ইনডেক্স।

ফারাক্কা বাঁধ ‘ডি-কমিশন’ সময়ের দাবী
                                  

বশীর আহমেদ

দু‘হাজার পনের সালের জানুয়ারী মাসের তৃতীয় সপ্তায় বাংলাদেশে শুভেচ্ছা সফরে এসেছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রী শ্রীমতি মমতা ব্যানার্জী। সফরকালে পদ্মা নদীর ইলিশ মাছ তার রসনাতৃপ্তির রসদ হবার খবর তখন পড়েছিলাম পত্রিকায়। ঢাকায় বসে পদ্মা নদীর ইলিশের স্বাদ আস্বাদন করার অভিজ্ঞতাই আলাদা। সে অভিজ্ঞতার স্বাদ নিয়েছিলেন মমতা। আশা করি, ঢাকায় অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকে তিনি অনুভব করেছিলেন- বঙ্গসন্তান কেন পদ্মা নদীর ইলিশের জন্য পাগল।

 বাংলাদেশ সফরের সময় অনেক কথা বলেছিলেন মমতা ব্যানার্জী। বলেছিলেন- ‘তি¯Íা নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ নেই। ব্ংালাদেশ ও ভারতের মধ্যে সেতুবন্ধে কাঠ-বিড়ালী হয়ে কাজ করে যাব। সব বাধা ভেঙ্গে যেহেতু এসেছি তখন বাধা সব ঘুচে যাবে।’

 তবে সব কিছু ছাপিয়ে পদ্মার ইলিশ কি করে আরো বেশি বেশি কোলকাতায় পাঠানো যায় তা নিয়ে যেন উদ্বেগের অন্ত ছিল না মমতার।  নিজের মুখে তা বলতেও তিনি দ্বিধা করেননি। বস্তুত, ইলিশ নিয়ে বাংলা ভূখন্ডের পশ্চিম প্রান্তে গণ-অস্ব¯িÍ বরাবরই জোরালো। আর সেটাই মনে হয়েছিল ইলিশের জন্য ঢাকা সফরকালে মমতার আর্তিতে।
   
কোলকাতার সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বাশুড়িরা তাদের প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী জামাইষষ্ঠির দিনে স্নেহের জামাইদের প্রাণভরে পদ্মার ইলিশ খাওয়াতে পারেন না- এমন খবর হামেশা ছাপা হয় পত্রিকায়। ব্যাপারটা নিয়ে বোধকরি দারুন ক্ষুুব্ধ সেখানকার স্নেহময়ী শাশুড়িকূল। সংগত কারণে এতে বেজায় অখুশি হয়তো জামাইরাও। ইলিশ খেতে পছন্দ করেন জামাই বাবুরা, আর শাশুড়িরা চান জামাইদের প্রাণভরে ইলিশ মাছ খাওয়াতে। কিন্তু ইলিশ কোথায়? কোলকাতার বাজারে ইলিশের বড় আকাল।
 
পশ্চিমবঙ্গে দুর্ভাগ্যজনক এ ইলিশ সংকটের নেপথ্য কারণ হচ্ছে বাংলাদেশ আর আগের মত ইলিশ রপ্তানী করতে পারছে না। ইলিশ নেই বাংলাদেশেও। জনসংখ্যা বাড়ছে এখানে। তাছাড়া ইলিশ তো আর মাঠে ময়দানে জন্মায় না। সুস্বাদু ইলিশের আবাস বাংলাদেশের পদ্মা নদী। সে নদীতে পানি নেই। এককালের প্রমত্তা নদী পদ্মা পানি শুন্যতায় অনেক আগেই শুকিয়ে মরা খালে উপনীত হয়েছে। পানির বদলে তার বুকে বালুচরের মিছিল। সেখানে ‘কিউসেক’ ডোবানো মুশকিল। শুকনো মওসুমে পায়ে হেঁটে মানুষ এখন পার হয় পদ্মা নদী। কাজেই পানিশুন্য পদ্মায় ইলিশ আসবে কোত্থেকে? এ পরিস্থিতিতে পদ্মা নদীর পানি শুন্যতা দূর না হলে কোন সুখবর নেই কোলকাতার জামাই অন্ত:প্রাণ শাশুড়িকূলের।

আজ থেকে প্রায় ৪২ বছর আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না। বিশাল নদী পদ্মা তখন বিপুল জলরাশি নিয়ে সগর্জনে বঙ্গোপসাগর অভিমুখে প্রবাহিত হতো। নদীর বুকে ঝাঁক বেঁধে সাঁতার কেটে বেড়াতো লাখো-কোটি রূপালি ইলিশ। উজানে ধেয়ে চলা ইলিশের ঝাঁক পদ্মা পেরিয়ে নির্বিবাদে বিনা পাসপোর্টে ঢুকে পড়তো বাংলার ভারতীয় অংশের গঙ্গা নদীতে। বাংলা-ভূমির দু‘প্রান্তে প্রবাহিত পদ্মা-গঙ্গার অবিমিশ্র স্রোতধারায় বিচরণকারী রাশিরাশি রুপালী  ইলিশ কোলাহল জাগাতো নদী পাড়ের জেলে পলøীগুলোতে। ইলিশে ইলিশময় থাকতো বাংলার হাট বাজার। মাছে-ভাতে বাঙালী সন্তানদের হাজার বছরের ইতিহাসে ঐতিহ্যবাহী ইলিশ মাছের রসনাতৃপ্তিতে কোনদিন ছন্দপতন ঘটেনি। ইলিশের অভাব কখনো দেখা দেয়নি বাংলায়। বেহিসেবী মানুষদের অপরিণামদর্শিতা ধ্বংস করেছে প্রকৃতির দানে ধন্য বাঙালীর মহা-মূল্যবান সে ইলিশের খনি। এপার-ওপার দু‘পারে এখন বাঙালীরা ইলিশের অভাবে দিশেহারা। অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে,তাতে পদ্মার ইলিশ একসময় জাদুঘরে জায়গা পেলে অবাক হওয়া যাবে না।
 
ইলিশ নিয়ে বাঙলায় মহা-সংকটের সুত্রপাত ষাটের দশকে। সে সময় পদ্মার উজানে গঙ্গার ফারাক্কা পয়েন্টে বাঁধ নির্মানের পরিকল্পনা করে ভারত। গঙ্গা বেসিনের বি¯তৃতি হচ্ছে ভারত-বাংলাদেশ-নেপাল এবং চীনের কিছু এলাকা নিয়ে। এছাড়া
শুকনো মৌসুমে গঙ্গা নদীতে প্রবাহিত প্রায় সমুদয় পানির উৎস হচ্ছে নেপাল। এ বা¯Íবতায় গঙ্গা আন্ত-সীমান্তে প্রবাহমান একটি আন্তর্জাতিক নদী। জাতিসংঘের কনভেনশন অনুযায়ী এর প্রবাহ নিয়ন্ত্রীত হওয়াই কাম্য। যে কনভেনশন আন্তর্জাতিক নদীর উজানের দেশকে পানি প্রত্যাহারের অধিকার দেয়নি। কিন্তু ভারত ফারাক্কায় একতরফা পানি প্রত্যাহারের পর থেকে সূচনা হয় বাঙালী জাতির ইলিশ সংকটের।
 
সে যাই হোক, ফারাক্কা বাঁধের নির্মাণ কাজ ‘৭৪ সালে শেষ হলে পর ‘৭৫ এর একুশ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৪১ দিনের জন্য বাঁধটি পরীক্ষামূলক চালু করার অঙ্গীকার করে ভারত। মূলত: ইলিশের নদী পদ্মার অস্থিত্ব সংহারী যাবতীয় সমস্যার শুরু তার পর থেকেই।

দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, ফারাক্কা বাঁধের ৪১ দিনের পরীক্ষা পরবর্তী ৪২ বছরেও ভারত শেষ করেনি। বরং উজান থেকে গঙ্গার প্রায় সমুদয় পানি একতরফা সরিয়ে নেয়াতে ভাটিতে পদ্মা নদী কার্যত জীবন হারিয়েছে। এতে মারত্বক পরিবেশ বিপর্যয় ঘটেছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের দক্ষিণ- পশ্চিমাঞ্চলে এক সময় প্রবাহমান পদ্মার শাখা নদীগুলোতে পানি প্রবাহ থেমে যাওয়ায় সাগরের লোনা পানি ধেয়ে আসছে উজানে। লবণাক্ততার কারণে ইউনেষ্কো ঘোষিত ’ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ সুন্দরবনের অস্থিত্ব এখন হুমকির মুখে। পদ্মায় পানির ¯Íর নেমে যাওয়াতে দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প ’জি-কে’ প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হয়েছে পাকশী কাগজ কল। দারুণভাবে হ্রাস পেয়েছে এ অঞ্চলের শিল্প ও কৃষি উৎপাদন।

পদ্মায় পানি না থাকায় বন্ধ হয়েছে অসংখ্য নৌপথ। লাখ লাখ জেলে পরিবার তাদের আয়ের উৎস হারিয়ে দুঃসহ জীবন যাপন করছে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম এবং রাজশাহী অঞ্চলে প্রায় ২০% ফসলি জমি অনাবাদি হয়ে গেছে। উৎপাদন কমে গেছে প্রায় ৩০% জমিতে। এতে করে এ অঞ্চলের প্রায় ৫ কোটি মানুষের জীবন জীবিকা বিপর্য¯Í এবং পরিবেশ ও জীব-বৈচিত্র ধ্বংসের সম্মুখীন হয়েছে অপরিমেয় মাত্রায়।

‘৭৭ সালে গঙ্গার পানি ভাগ নিয়ে সর্বপ্রথম ভারত-বাংলাদেশ ৫ বছর মেয়াদী চুক্তি স্বাক্ষর করে। সে চুক্তির গ্যারান্টি ক্লজ অনুযায়ী প্রবাহিত পানিতে বাংলাদেশের প্রাপ্য অংশ ছিল ৮০%, যা কোন অবস্থাতেই ৩০ হাজার কিউসেক’র কম হওয়ার সুযোগ ছিল না। সে  চুক্তিতে আরো অন্তর্ভূক্ত ছিল অরব্রিটেশন ক্লজ। ফলে কোন বিরোধ দেখা দিলে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় গ্রহণযোগ্য সমাধান পাওয়ার সুযোগ ছিল। ‘৮২ সালের অক্টোবরে এ ব্যাপারে পূনরায় ২ বছর মেয়াদী এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়। এতে প্র্রথমবারের মত বাদ দেয়া হয় গ্যারান্টি এবং অরব্রিটেশন ক্লজ।

‘৯৬ সালের ডিসেম্বরে এ নিয়ে স্বাক্ষরিত সর্বশেষ ৩০ সালা চুক্তি যা এখন বলবৎ রয়েছে তাতেও অন্তর্ভূক্ত রাখা হয়নি সর্বনিম্ন পানি প্রাপ্তি এবং অরব্রিটেশন ক্লজ। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। বিগত দিনগুলোতে ফারাক্কার ভাটিতে পানি প্রবাহ কমে গেছে অকল্পনীয় মাত্রায়। এর পরিমাণ কখনো এমনকি ৫ হাজার কিউসেক-এর নীচেও নেমে আসে। এভাবে ইলিশের নদী পদ্মাই যখন অ¯িÍত্ব হারানোর মুখে, তখন ইলিশের প্রশ্ন একেবারেই অবান্তর।

ফারাক্কা বাঁধ চালু করা হয়েছিল ৪২ বছর আগে পরীক্ষামূলক ভাবে। বাঁধটি স্থায়ীভাবে কমিশনিং করার কথা তখন একবারও বলা হয়নি। এ বাঁধ পশ্চিমবঙ্গে বাঙালির কোন উপকারে আসেনি। বরং মুর্শিদাবাদে নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়েছেন ব্যাপক এলাকার অগণিত মানুষ। সুতরাং ফারাক্কা বাঁধ যে বাঙালী জনগোষ্ঠির গলায় প্রকৃত অর্থে মরণ ফাঁদ হয়ে আটকে গেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

২০১৫ সালের ২৩ অগাষ্ট, জাতীয় প্রেস ক্লাবে আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি আয়োজিত ’ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প ঃ বাংলাদেশের পানি বিপর্যয় এবং করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে জাতিসংঘের সাবেক পরিবেশ ও পানি বিশেষজ্ঞ ড: এস আই
খান গভীর উদ্বেগের সাথে জানিয়েছিলেন, শুধু ফারাক্কায় নয়- ভারত সরকার বাংলাদেশে প্রবাহিত সবগুলো অভিন্ন নদীতে বাঁধ দিয়ে এক তরফা পানি প্রত্যাহার করছে। আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের কাজ জোরেশোরে আরম্ভ করার প্রস্তুতি নিয়েছে ভারত সরকার। তিনি বলেীছলেন, ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের বিরুপ প্রতিক্রিয়ায় ইতিমধ্যে বাংলাদেশ অভ্যন্তরে সাগরের লোনা পানি ঢুকতে শুরু করেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে অল্প দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ভূখন্ডের প্রায় ৬০%এলাকা লবণাক্ততায় গ্রাস করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন বর্ষিয়ান এ পরিবেশবিদ। বাংলাদেশের জন্য মহা-বিপর্যয়কর এ সমস্যাটি জরুরীভাবে আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরারও আহবান জানিয়েছিলেন তিনি।

পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়ায় আমেরিকায় ৫ হাজারের বেশি বাঁধ ডি-কমিশন করা হয়েছে। একই কারণে জাপানে ডি-কমিশন করা বাঁধের সংখ্যা ৩ হাজারেরও বেশি। বাঁধ ডি-কমিশনের পর সেখানকার নদীগুলোকে আগের প্রাকৃতিক অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে। ফারাক্কা বাঁধ যাতে বাংলা ভূ-খন্ডের পরিবেশ, প্রাণবৈচিত্র এবং মানুষের জীবন-জীবিকা ধ্বংস করতে না পারে সে জন্য অবিলম্বে বাঁধটি ডি-কমিশনের উদ্যেগ নেয়া এখন সময়ের দাবি। এ পদক্ষেপ গঙ্গা নদীকে ফিরিয়ে নেবে তার আগের প্রাকৃতিক অবস্থায়। আর আমরাও ফিরে পাব হারিয়ে যাওয়া প্রমত্তা নদী পদ্মা এবং এর সু-স্বাদু রূপালী ইলিশ। তাহলেই কেবল কোলকাতার কোন মমতাময়ী শাশুড়িকে আর জামাইষষ্ঠির দিনে স্নেহের জামাইকে পদ্মার ইলিশ না খাওয়াতে পারার মর্মযাতনায় কষ্ট পেতে হবে না।

ইলিশের আকাল স্বত্তে¡ও বাংলাদেশ বিশেষ ব্যবস্থায় ইলিশ মাছের চালান পাঠিয়েছে কোলকাতায়। দু’দেশের মিডিয়াতে হরহামেশা ইলিশ সংকটের উদ্বেগজনক খবর ছাপা হয়। কাজেই বাঙলাভাষী জনগোষ্ঠির ক্রমবর্ধমান  ইলিশ সংকটের একটি স্থায়ী সমাধান অবশ্যই দরকার। এ জন্য বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গকে একাট্টা হয়ে ঘুচাতে হবে ইলিশ সঙ্কট সৃষ্টির সকল বাধা। যেমন বলেছিলেন তি¯Íার পানি ভাগাভাগি নিয়ে নিজের ওয়াদা এখনো ঝুলিয়ে রাখা কোলকাতার মমতাময়ী শাশুড়ী মমতা ব্যানার্জী। এ জন্য ইলিশের রাজ্য পদ্মা নদীর নাব্যতা আগে ফিরিয়ে আনতে হবে আগের জায়গায়। এক কন্ঠে দাবী তুলতে হবে, ইলিশের পূণ্যভূমি গঙ্গা-পদ্মায় আমরা আগের মত পানির প্রবাহ দেখতে চাই। ফারাক্কা বাঁধ ডি-কমিশনের দাবী এ কারণে। ইলিশ-প্রিয় বাঙালীর পক্ষে তাহলেই কেবল পদ্মা নদীর উপাদেয় ইলিশের মন মাতানো ঘ্রাণে তৃপ্ত করা সম্ভব হবে বাংলা-ভ‚মির ভবিষ্যত বংশধারাকে।

নৌ-কমান্ডোরা পূর্ব পাকিস্তানকে নৌ-যানবিহীন অবরুদ্ধ দেশে পরিণত করে
                                  

অপারেশন জ্যাকপট পরিকল্পনায় চট্টগ্রামে ৬০ কমান্ডো ৩টি দলে ভাগ হয়ে আক্রমনের প্রস্তুতি গ্রহন করে। কিন্তু একটি দল পাকিস্তানী সেনাদের কঠোর নজরদারীর কারণে সময়মত টার্গেট এলাকায় পৌছতে ব্যর্থ হয়। অপর দুটি দলে ৪০ কমান্ডোর ৯ জন শেষ মুহুর্তে অপারেশনে যেতে অস্বীকৃতি জানালে অবশিষ্ট ৩১ কমান্ডো আক্রমনের জন্য পূর্ব- নির্ধারিত ২২ জাহাজের মধ্যে ১০টিতে সাফল্যের সাথে লিম্পেট মাইন বসাতে সমর্থ হয়। রাত পৌণে দু‘টা থেকে সোয়া দুটাের মধ্যে মাইন বিষ্ফোরণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯ হাজার টন অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ ডুবে যায় এমভি আল-আব্বাস, এমভি হরমুজ এবং ৬ নং ওরিয়েন্ট বার্জ। অত:পর ডুবতে থাকে মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অপর ৭টি বার্জ ও জাহাজ।

চাঁদপুর বন্দরে ২০ কমান্ডো আক্রমনের দায়িত্ব পায়। এদের মধ্যে শেষ মুহুর্তে ২ জন অপারেশনে যেতে অস্বীকার করলে ১৮ কমান্ডো ৬টি দলে বিভক্ত হয়ে ৪টি জাহাজ ও ৩টি ষ্টিমার মাইন বিষ্ফোরণে ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়। নারায়ণগঞ্জে ২০ কমান্ডো আক্রমন চালিয়ে ৪টি জাহাজ নিমজ্জিত করে। মংলা বন্দর অপারেশনে অংশ নেয় ৬০ কমান্ডো, ৫টি দলে বিভক্ত কমান্ডোদের ৪টি দল ৬টি জাহাজে মাইন বসায় এবং একটি দলকে পাঠানো হয় ভিন্ন এক মিশনে।
 
১৫ আগষ্ট নৌ-কমান্ডোদের সমন্বিত সফল হামলার সচিত্র খবর বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক দখলকৃত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে বলে যে দাবী করা হচ্ছিল তা মুখ থুবড়ে পড়ে। এই নৌ-অপারেশন সম্পর্কে পরে পাকিস্তানী সেনা তদন্তে উপসংহার টেনে বলা হয় - ‘নো ওয়ান হ্যাড ইমাজিন্ড মুক্তিবাহিনী ক্যাপাবল অফ কন্ডাক্টিং সাস অ্যান অপারেশন’।

প্রশিক্ষক-প্রশিক্ষণার্থী মিলিয়ে সি২পি ক্যাম্পে অবস্থান করেন মুক্তিবাহিনীর সর্বোমোট ৫১৫ নৌ-কমান্ডো। আগষ্ট-ডিসেম্বর পর্যন্ত অপারেশনে অংশ নিতে গিয়ে নিহত ৮ আর আহত হন ৩৪ জন, ১৫ কমান্ডো আটক হন পাকিস্তানী সেনাদের হাতে। এ সময়ে নেভাল কমান্ডোরা ১২৬টি বিভিন্ন ধরণের জাহাজ, কোষ্টার, ফেরীবোট এবং নৌ-পল্টুন ধ্বংস অথবা ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হন যার পরিমান ১ লাখ টনের অধিক। এর ফলে পোর্টগুলোর ল্যান্ডিং ষ্টেশন অকার্যকর, নৌ-চ্যানেলসমুহ বন্ধ এবং  জাহাজ চলাচলের জন্য বিপজ্জনক হয়ে পড়ে। পাকিস্তান নেভীর আক্রমন-সক্ষমতা স্তিমিত হয় অতি দ্রুত। সমন্বিত এই নৌ- হামলায় কমান্ডোরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে কার্যত একটি নৌযান-বিহীন অবরুদ্ধ দেশে পরিণত করে।
   
আগষ্টের অপারেশন শেষ হলে সকল কমান্ডো ভারতে ফিরে যান। অত:পর এ ধরণের আর কোন সমন্বিত কমান্ডো হামলার পরিকল্পনা নেয়া না হলেও বিচ্ছিন্ন ভাবে কতিপয় টার্গেটে হামলার জন্য কিছু কমান্ডো গ্রুপকে পরবর্তীতে কাজে লাগানো হয়। মুক্তিযুদ্ধের অবশিষ্ট দিনগুলোতে কমান্ডোরা তাদের সুবিধা মত টার্গেট নির্ধারণ ও হামলা করে পাকিস্তানী সেনাদের সন্ত্রস্ত করে রাখেন।

অপারেশন জ্যাকপটের সফলতা একেবারে বদলে দেয় মুক্তিযুদ্ধের গতিপথ। উদ্ধত পাকিস্তানী সেনারা প্রথমবারের মত সংযত হতে বাধ্য হয়। রণাঙ্গণে মুক্তিবাহিনীর মনোবল পৌছে সর্বোচ্চ স্তরে। নভেম্বর মাস পর্যন্ত মুক্তিবাহিনীর ৩টি নিয়মিত ব্রিগেডের অধীনে ৮টি ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটেলিয়ন যাতে সমবেত ছিল এফএফসহ ৩০ হাজার নিয়মিত সৈনিক এবং প্রায় ১ লাখ প্রশিক্ষিত গেরিলাযোদ্ধা শত্রু-বাহিনীকে সেনাছাউনিগুলোতে অবরুদ্ধ করতে সক্ষম হয়। এ সময় পর্যন্ত যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী  ২৩১টি ব্রিজ-কালভার্ট, ১২২টি জায়গার রেল লাইন এবং ৯০টি পাওয়ার ষ্টেশন ধংস করে। আর হতাহতের মধ্যে মুক্তিবাহিনীর আক্রমনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২৩৭ অফিসার, ১৩৬ জেসিও-এনসিও, অসংখ্য ‘ইফকাফ’ সদস্য, প্রায় ৫ হাজারের অধিক রাজাকার-আলবদর নিহতসহ আহত হয় অগণিত সংখ্যার সামরিক জনবল।  মুক্তিবাহিনীর সমন্বিত আক্রমনের চাপ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে দেয়, জরুরী প্রয়োজন না হলে তারা ক্যাম্পের বাইরে আসা বন্ধ করে এবং পাকিস্তানীদের পরাজয় এগিয়ে আসে অতি দ্রুত।
 
অপারেশন জ্যাকপট ইভেন্টে নিহত কমান্ডোরা-আব্দুর রকিব-ফুলছড়ি ঘাট অপারেশনে,  হোসেন ফরিদ-দ্বিতীয়বার চট্টগ্রাম বন্দর অপারেশনে ধরা পড়লে পাকিস্তানী সৈন্যরা তাকে হাড়গোড় বিচুর্ণ না হওয়া পর্যন্ত মুচড়িয়ে হত্যা করে, খবিরুজ্জামান-দ্বিতীয়বার ফরিদপুর অপারেশনে নিহত হন। যাদের হতাহত সম্পর্কে কোন তথ্য জানা যায়নি তারা হলেন-সিরাজুল ইসলাম, এম আজিজ, আফতাব উদ্দিন ও রফিকুল ইসলাম।
 
নৌ-কমান্ডোদের বীরত্বপূর্ণ খেতাবপ্রাপ্তরা হলেন-এ ডব্লিউ চৌধুরী-বীর উত্তম, বদিউল আলম-বীর উত্তম, ডা: শাহ আলম-বীর উত্তম, মাজহার উল্লাহ-বীর উত্তম, শেখ মোঃ আমিন উল্লাহ-বীর উত্তম, আবিদুর রহমান-বীর উত্তম, মোশাররফ হোসেন-বীর উত্তম, মোহাম্মদ খবিরুজ্জামান- বীর বিক্রম, মমিনউল্লাহ পাটোয়ারী- বীর প্রতীক, শাহজাহান কবীর-বীর প্রতীক, ফারুক-ই-আজম-বীর প্রতীক, মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ-বীর প্রতীক, মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন-বীর প্রতীক এবং আমীর হোসেন-বীর প্রতীক।
 
জ্যাকপটের কথা লিখতে গিয়ে স্মৃতির আয়নায় ভেসে উঠছে ৪৬ বছর আগে ফেলে আসা রণাঙ্গণ-সেখানকার দুঃখ কষ্ট, শত্রুর ঘাতক বুলেট আর পরিচিত মুখগুলো। রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার স্বনামখ্যাত নৌ-কমান্ডো খলিলুর রহমান প্রয়াত হয়েছেন অনেকদিন। লেখালেখি সূত্রে পরিচয়, অত:পর ঘনিষ্টতা বেড়েছিল তার সাথে। একাত্তর সালে ট্রেনিং মিশনে ফ্রান্সে অবস্থানকারী পাকিস্তান নেভীর সাবমেরিনে বিদ্রোহ সংঘটন এবং জীবনের ঝুকি নিয়ে ইনডিয়া পৌছে মুক্তিবাহিনীর নেভাল কমান্ডো ইউনিট গড়ে তোলায় অক্লান্ত পরিশ্রমী সাবমেরিনার, পেশাগত জীবনে ঘনিষ্ট হওয়া খুলনার শ্রদ্ধেয় নেভাল লেফটেন্যান্ট গাজি রহমতউল্লাহ  দাদু ভাই, বীর প্রতীকের কথা মনে পড়ে। চাঁদপুর নৌ-বন্দর প্রথম অপারেশন, দাউদকান্দি ঘাট অপারেশনসহ অনেকগুলো সুইসাইডাল মিশনের দূর্ধর্ষ নেভাল কমান্ডো নজরুল ইসলাম খোকন ভাইয়ের অসুখের খবরটি জানা হল অতি সম্প্রতি। মুক্তিবাহিনীর দুর্বিনীত এই সন্তানদের প্রায় সবাই এখন জীবন থেকে বিদায় নেবার পথে। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের প্রয়োজনেই লিখে রাখা দরকার ছিল এই বীর সেনানীদের যুদ্ধদিনের স্মৃতিকথা।
 
পরিহাস এই যে, জীবন-জয়ী এই মুক্তিসেনানীদের নামের তালিকায় বিভিন্ন কৌশলে নাম লিখিয়েছেন হাজারে হাজার দুরাচারী ব্যক্তি  যারা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের ধারেকাছেও ছিলেন না। এ নিয়ে দারুণ ক্ষুব্ধ বীর মুক্তিযোদ্ধারাসহ গোটা দেশবাসী। তথাপি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় ভূয়া ব্যক্তিবর্গের নাম লেখানোর নিন্দনীয় প্রবণতার রাশ কেন টানা যাচ্ছে না ? যারা জীবন দিল, বুকের রক্ত ঢেলে তৈরী করল নতুন জাতিরাষ্ট্রের নবতর ইতিহাস, জাতির শ্রেষ্ঠ সেই সন্তানদের নামের তালিকা নিখুঁতভাবে সংরক্ষণের কাজ কি এতই অ-দরকারী! অনাগত কালপর্বের কোন এক সময় কেউ একজন হয়তো বা উদ্যোগী হবেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস নির্মাতাদের গর্বিত নামগুলোর তালিকা কলঙ্কিত করার হিসাব নেবেন কড়ায় গন্ডায়। সে প্রত্যাশায় অতিক্রান্ত হোক জীবন-মৃত্যূর দোলাচলে গড়ানো একাত্তরের সূর্য্য-সারথীদের অন্তিম সময়গুলো।
 
তথ্য: অনির্দিষ্ট সংখ্যক বই, পত্রিকা ও ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে ট্রাম্পের সাহায্য আশা করা যায় না: প্রধানমন্ত্রী
                                  

স্বাধীন বাংলা ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংকট নিরসনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে তিনি কোনো সহায়তা আশা করছেন না। স্থানীয় সময় গতকাল সোমবার রোহিঙ্গা শরণার্থী বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলার পর রয়টার্সকে দেওয়া বিশেষ এক সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে স্থানীয় সময় গতকাল ট্রাম্পের আয়োজনে জাতিসংঘের সংস্কার বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের সভায় যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রয়টার্সের সাংবাদিক মিশেল নিকোলসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাসিনা জানান, সভাস্থল ছাড়ার পর ট্রাম্পকে তিনি কয়েক মিনিটের জন্য থামান। এ সময় ট্রাম্প বাংলাদেশের খবর জানতে চান। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি বলি, বাংলাদেশ খুব ভালো অবস্থায় আছে। তবে আমাদের একমাত্র সমস্যা মিয়ানমার থেকে আসা শরণার্থীরা। কিন্তু ট্রাম্প শরণার্থীদের নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।’

‘‘তিনি (ট্রাম্প) শুধু জিজ্ঞাসা করেছেন, ‘বাংলাদেশের অবস্থা কী?’ আমি বলেছি, খুব ভালো চলছে, তবে মিয়ানমার থেকে আসা শরণার্থীরাই আমাদের একমাত্র সমস্যা। তবে তিনি (ট্রাম্প) শরণার্থীদের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি,’’ বলেন প্রধানমন্ত্রী।

গত ২৪ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা ও পুলিশ চৌকিতে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার পর প্রাণঘাতী অভিযান শুরু হয়। এই অভিযানের পর থেকে এখন পর্যন্ত চার লাখ ১০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

জাতিসংঘ এই অভিযানকে ‘জাতিগত নির্মূলকরণ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। মিয়ানমার সরকারের দাবি, দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধে প্রায় ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন।

এমন বাস্তবতায় সমবেত বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি রয়টার্সকে বলেন, শরণার্থীদের বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান পরিষ্কার। সুতরাং রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে সাহায্য চাওয়ার কোনো মানে নেই।

‘আমেরিকা এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে তারা কোনো শরণার্থীকে ঢুকতে দেবে না’, বলেন শেখ হাসিনা।

ট্রাম্পের মানসিকতার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তাদের, বিশেষত প্রেসিডেন্টের (ট্রাম্প) কাছ থেকে কী-ই বা আশা করতে পারি। তিনি এরই মধ্যে তাঁর মনোভাব জানিয়ে দিয়েছেন....তাই আমি কেন তাঁর (সাহায্য) চাইব?’

‘বাংলাদেশ ধনী দেশ নয় তবে আমরা যদি ১৬ কোটি মানুষকে খাওয়াতে পারি, তাহলে আরো পাঁচ বা সাত লাখ মানুষকে কেন নয়, আমরা এটা করে দেখাতে পারি।’
শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘(মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চিকে) মানতে হবে যে এই মানুষগুলো তাঁর দেশের এবং মিয়ানমারই তাদের দেশ। তাদের ফিরিয়ে নিতে হবে। এই মানুষগুলো দুর্ভোগে রয়েছে।’


মুক্তিযুদ্ধে ‘অপারেশন জ্যাকপট’ ও কিছু কথা: পর্ব-২
                                  

বশীর আহমেদ: এপ্রিল মাসের মধ্যেই বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিমূলক জটিল পরিস্থিতি সামলে উঠতে সক্ষম হন। মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব নেন কর্ণেল এম এ জি ওসমানী। তিনি গোটা রণাঙ্গণকে বিন্যস্ত করেন ১১টি সেক্টরে এবং ৯নং সেক্টরকে আলাদা রাখেন শুধুমাত্র নেভাল অপারেশন পরিচালনার জন্য । মে মাসের মধ্যে ভারতীয় এলাকায় গড়ে তোলা মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ শিবিরগুলো প্রশিক্ষণার্থী রিক্রুট আরম্ভ  করে। যুদ্ধকালীন তথ্য আদান-প্রদান, শত্রুকবলিত এলাকায় গেরিলাদের সেফহাউস ও সরবরাহ লাইন প্রতিষ্ঠা এবং কনভেনশনাল ফোর্স পূণর্গঠনের কাজও এগিয়ে যায় অনেকদূর।
মুক্তিবাহিনীর হাইকমান্ড শুরুতে পরিকল্পনা করেন অল্প সময়ের মধ্যে বেশি সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশের ভেতর সক্রিয় রাখতে। এ লক্ষ্য অর্জনে মুক্তিবাহিনীকে মাত্র ৪ থেকে ৬ সপ্তার সংক্ষিপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণ দেবার ব্যবস্থা নেয়া হয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে প্রশিক্ষিত যোদ্ধার সংখ্যা বেড়ে গেলে সমরাস্ত্রের অভাবে রণাঙ্গণে সকল যোদ্ধাকে অস্ত্র দেয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তখন সমস্যা ছিল আরও অনেক ক্ষেত্রে। মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ শিবিরগুলোর অবস্থান ছিল ভারতীয় এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে। পক্ষান্তরে, গেরিলা বেসগুলো ছিল বাংলাদেশের ভেতর দুর্গম এলাকায়। এতে করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সতর্ক নজর এড়িয়ে মুক্তিবাহিনীর সরবরাহ লাইন নিয়মিত রাখা এবং যুদ্ধ পরিচালনা ছিল অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ ও দু:সাধ্য।
এ পরিস্থিতিতে নৌ-কমান্ডো প্রশিক্ষণের একটি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য ৯নং সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিলসহ কর্ণেল এম এ জি ওসমানী  ভারতীয় পক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনা কমান্ডার ভট্টাচার্জি এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক শীর্ষ সেনা কমান্ডারদের সাথে আলোচনায় বসেন। অত:পর ২৩ মে পশ্চিম বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলায় পলাশির কাছে ভাগীরথি নদীর তীরে প্রতিষ্ঠা করা হয় মুক্তিবাহিনীর নৌ-কমান্ডো প্রশিক্ষণের গোপন কেন্দ্র -‘সি২পি’ যার সাঙ্কেতিক নাম।
প্রাথমিকভাবে মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন সেক্টর থেকে ৩শ প্রশিক্ষণার্থীকে নৌ-কমান্ডো প্রশিক্ষণের জন্য মনোনীত করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত ৪৯৯ জন কমান্ডো ওই গোপন কেন্দ্রে প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। প্রশিক্ষণ কোর্সে দীর্ঘপাল্লার সাঁতার, আত্বরক্ষার কৌশল, লিম্পেট মাইনের ব্যবহার, হাতাহাতি যুদ্ধ এবং নেভিগেশন সম্পর্কে হাতে-কলমে শেখানো হয় কমান্ডোদের।
আগষ্ট  মাসের প্রথম দিকে নৌ-কমান্ডোদের প্রথম ব্যাচ প্রশিক্ষণ শেষ করে অপারেশনের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। সি২পি’র দায়িত্বপ্রাপ্ত ভারতীয় নৌবাহিনীর কমান্ডার এম এন সামান্থ, ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটর লে. কমান্ডার জি. মার্টিস, ৮ বিদ্রোহী বাঙালী সাবমেরিনার এবং ২০ ভারতীয় ট্রেনারসহ অন্যান্যরা সন্তুষ্টির সাথে অবলোকন করেন কমান্ডোদের পাস-আউট ।
পাকিস্তানী সামরিক গোয়েন্দারা কড়া নিরাপত্তায় ঘেরা এই গোপন ট্রেনিং ক্যাম্পের হদিস খুজে বের করে। জুলাই মাসে ক্যাম্পটিতে কমান্ডো হামলার চেষ্টা চালায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। কিন্তু ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী কোন অন্তর্ঘাত ঘটার আগেই তা রুখে দেয় এবং আটক করে অনুপ্রবেশকারীদের।
জুলাই মাসের শেষদিকে নৌ-কমান্ডোদের প্রশিক্ষণ তখনও চলছে - মুক্তিবাহিনীর হাইকমান্ড নিñিদ্র নিরাপত্তায় অপারেশন জ্যাকপট পরিকল্পনার সেট-আপ চুড়ান্ত করেন। মুক্তিবাহিনীর গোয়েন্দা অনুসন্ধানের সহায়তায় টার্গেট এলাকায় বন্দরের সার্বিক অবস্থা, নদীর ¯্রােত, ঢেউয়ের প্রকৃতি, বন্দরে পল্টুন ও জাহাজের অবস্থান, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার খুটিনাটি তথ্য সংগ্রহ হতে থাকে প্রতিদিন।
অপারেশনে গুরুত্বপূর্ণ আইটেম ছিল পানির তলায় যে অস্ত্র দিয়ে কমান্ডোরা জাহাজ ধংস করবেন - সেই লিম্পেট মাইন। বাঙালীর দু:সময়ে সে অভাব পূরণে এগিয়ে আসেন সাবেক যুগোস্লাভিয়ার মহান নেতা মার্শাল জোসেফ ব্রোজ টিটো, তার অস্ত্রাগারে থেকে যাওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার লিম্পেট মাইন তিনি উপহার দেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের।
সকল আয়োজন শেষ হলে অপারেশনের জন্য চুড়ান্তভাবে বাছাই করা কমান্ডোদলকে সতর্ক পাহারায় সি২পি থেকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বেসক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। সেখানে তাদের শেষবারের মত ব্রিফ করা হয় অপারেশনের সামগ্রিক বিষয়গুলো। মুক্তিবাহিনীর ১নং সেক্টর চট্টগ্রাম, ২নং সেক্টর চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ আর ৯ নং সেক্টর মংলায় আক্রমনের জন্য নির্বাচিত কমান্ডোদের টার্গেট এলাকায় পৌছানো এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহন করে।
বেস ক্যাম্প থেকে প্রত্যেক কমান্ডোকে সাঁতারের পাখনা, কমান্ডো নাইফ, অক্সিজেন ট্যাংক, গগলস এবং একটা করে লিম্পেট মাইন দেয়া হয়। এ ছাড়া প্রত্যেক দলকে কম্পাস, হ্যান্ড গ্রেনেড, ষ্টেনগান এবং দলনেতাকে দেয়া হয় ট্রানজিষ্টার রেডিও। কমান্ডোদলগুলো তাদের অস্ত্র সম্ভার নিয়ে ৩ থেকে ৯ আগষ্টের মধ্যে শত্রু কবলিত ভূখন্ডে প্রবেশ করে এবং ১২ আগষ্টের মধ্যে স্থানীয়ভাবে সক্রিয় মুক্তিবাহিনী নেটওয়ার্কের সহায়তায় নিরাপদে টার্গেট এলাকায় অবস্থান নিতে সক্ষম হন।
হামলা শুরু করার সঙ্কেত বার্তাটি ছিল এক জোড়া রবীন্দ্র সঙ্গীত যা এক নির্দিষ্ট সময়ে আকাশবাণী বেতারে ১৩ এবং ১৪ আগষ্ট সম্প্রচারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। প্রথম সঙ্গীতটি ছিল - আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শশুরবাড়ী এবং দ্বিতীয়টি - আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান তার বদলে চাইনি কোন দান। সঙ্কেত বার্তার বিষয়টি কেবলমাত্র জানা ছিল দলনেতা ও উপ-দলনেতার। আর এ জন্যই তাদের দেয়া হয়েছিল রেডিও ট্রানজিষ্টার।
১৫ আগষ্ট মধ্যরাতের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিস্ময়ভরা চোখের সামনে চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, মংলা এবং নারায়ণগঞ্জ নৌবন্দরে একের পর এক বিষ্ফোরণ ঘটতে থাকলে পতেঙ্গায় বহির্নোঙ্গরে অবস্থানকারী বিদেশী জাহাজগুলো তৎক্ষণাৎ সে খবর আন্তর্জাতিক মেরিটাইম দপ্তরকে জানিয়ে দেয়। আর বিশ্বব্যাপী মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অভাবনীয় নেভাল অপারেশনের শ্বাসরুদ্ধকর সংবাদ।
এ হামলার পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বন্দরগুলো বিপদজনক ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম দপ্তর। বিদেশী জাহাজ চট্টগ্রাম ও মংলা পোর্ট এড়িয়ে চলা শুরু করলে নৌ-পরিবহনে পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে গোটা বিশ্ব থেকে। পরে তিনগুণ অর্থ ইনসুরেন্স কাভারেজ দিয়ে বিদেশী জাহাজ পূর্ব পাকিস্তানের বন্দরে আনতে বাধ্য হয় পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ। এর ফলে আমদানী-রপ্তানী বানিজ্যে ধস নামলে মারাত্বক অর্থনৈতিক চাপে পড়ে পাকিস্তান সরকার।


   Page 1 of 3
     এক্সক্লুসিভ
পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের বিকাশে করণীয়
.............................................................................................
সেলুলয়েডে ‘অপারেশন জ্যাকপট’: সংরক্ষণ হচ্ছে যুদ্ধ স্মারক এমভি ইকরাম
.............................................................................................
অগ্নিঝরা মার্চ
.............................................................................................
কেন্দ্রীয় সম্মেলন নিয়ে ছাত্রলীগের মধ্যে ক্ষোভ-হতাশা
.............................................................................................
অগ্নিঝরা মার্চ: ৬ মার্চ সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়
.............................................................................................
পুশব্যাকের শঙ্কায় আসামের দেড় কোটি বাংলাভাষী
.............................................................................................
ব্যাংক খাতে কোনঠাসা ‘বাংলা’
.............................................................................................
বাংলাদেশে গণহত্যা: পর্ব- ২ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং ইতিহাসের দায়মোচন
.............................................................................................
বাংলাদেশে গণহত্যা: পর্ব-১ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং ইতিহাসের দায়মোচন
.............................................................................................
কে হচ্ছেন ১৯ হেয়ার রোডের বাসিন্দা
.............................................................................................
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণের অজানা ইতিহাস
.............................................................................................
বিশ্বে শক্তিশালী পাসপোর্টের শীর্ষে সিঙ্গাপুর, বাংলাদেশ ৯০তম
.............................................................................................
ফারাক্কা বাঁধ ‘ডি-কমিশন’ সময়ের দাবী
.............................................................................................
নৌ-কমান্ডোরা পূর্ব পাকিস্তানকে নৌ-যানবিহীন অবরুদ্ধ দেশে পরিণত করে
.............................................................................................
রোহিঙ্গা ইস্যুতে ট্রাম্পের সাহায্য আশা করা যায় না: প্রধানমন্ত্রী
.............................................................................................
মুক্তিযুদ্ধে ‘অপারেশন জ্যাকপট’ ও কিছু কথা: পর্ব-২
.............................................................................................
একটি সংবাদের পোস্টমর্টেম
.............................................................................................
স্রোতের বেগে আসছে ভারতীয় গরু, আতঙ্কে দেশীয় খামারিরা
.............................................................................................
মুক্তিযুদ্ধে ‘অপারেশন জ্যাকপট’ ও কিছু কথা: পর্ব- ১
.............................................................................................
কুরুচির থাবা ছিনিয়ে নিল ঊর্মির প্রাণ
.............................................................................................
বাঙালির স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিব
.............................................................................................
মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব
.............................................................................................
শোকের মাস
.............................................................................................
২০ জুন রাতে সৌদি রাজপ্রাসাদে যা ঘটেছিল!
.............................................................................................
লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত ছাতকের আনিক বাঁচতে চায়
.............................................................................................
নাম সর্বস্ব রাজনৈতিক দল! লাভ কার?
.............................................................................................
লালমনিরহাটে গরুর গাড়ি এখন শুধুই স্মৃতি
.............................................................................................
শিশুবিবাহ: বর্তমান প্রেক্ষাপট
.............................................................................................
কমিটি নিয়ে বিএনপি নেতাদের মধ্যে বাড়ছে সন্দেহ-অবিশ্বাস
.............................................................................................
রাজনীতিতে টিকে থাকার কৌশল খুঁজছে জামায়াত
.............................................................................................
কাউন্সিলে নতুন কিছু আশা করছে বিএনপি
.............................................................................................
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নে সাংসদদের কাছেই ধরনা
.............................................................................................
মহাসচিব কে হচ্ছেন? -গুঞ্জন বিএনপি’তে
.............................................................................................
ঘোষিত রায় পরে লেখা অবৈধ মনে করছেন না বিচারপতি আমির
.............................................................................................
জঙ্গি নির্মূলে মাদ্রাসার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকেও নজর দিতে হবে
.............................................................................................
এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৮৬৪২
.............................................................................................
বিজয়ের মাস ডিসেম্বর
.............................................................................................
বিজয়ের মাস ডিসেম্বর
.............................................................................................
বেকার যুবকদের ভাগ্য বদলে বিশেষ ঋণ
.............................................................................................
খাদ্য নিরাপত্তায় এখনও অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ
.............................................................................................
খুলনায় মাদক সম্রাট শাহজাহান আটক
.............................................................................................
স্থানীয় নির্বাচন: ক্ষমতাসীন দলে তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দলের আশঙ্কা
.............................................................................................
নাশকতার আশঙ্কায় দেশে সর্বোচ্চ সতর্কতা
.............................................................................................
গম উঠাচ্ছে না মিলাররা
.............................................................................................
বর্জ্য পরিশোধনের নামে বিদেশী প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা
.............................................................................................
নিষিদ্ধ ঘোষিত ওষুধ অবাধে বিক্রি হচ্ছে বাজারে
.............................................................................................
কোরবানির গরু ফুলানো হচ্ছে ভিটামিন দিয়ে
.............................................................................................
‘ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্ত্রীর উদ্দেশে যা বলেছিলেন এরশাদ শিকদার’
.............................................................................................

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আখলাকুল আম্বিয়া
নির্বাহী সম্পাদক: মাে: মাহবুবুল আম্বিয়া

সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: স্বাধীনতা ভবন (৩য় তলা), ৮৮ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০। Editorial & Commercial Office: Swadhinota Bhaban (2nd Floor), 88 Motijheel, Dhaka-1000.
সম্পাদক কর্তৃক রঙতুলি প্রিন্টার্স ১৯৩/ডি, মমতাজ ম্যানশন, ফকিরাপুল কালভার্ট রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত ।
ফোন : ০২-৯৫৫২২৯১ মোবাইল: ০১৬৭০৬৬১৩৭৭

Phone: 02-9552291 Mobile: +8801670 661377
ই-মেইল : dailyswadhinbangla@gmail.com , editor@dailyswadhinbangla.com, news@dailyswadhinbangla.com

 

    2015 @ All Right Reserved By dailyswadhinbangla.com

Developed By: Nytasoft